ঢাকা ০৮:০৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৮ মার্চ ২০২৬, ৪ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
মহাসড়কের বুক চিরে প্রকৃতির রঙিন সৌন্দর্য বিদ্যালয়ে ভর্তিতে লটারি বাতিলের দাবি মেধাভিত্তিক মূল্যায়নের দাবিতে ভিকারুননিসা অ্যালামনাইয়ের ব্যাখ্যা যে ৭ সবজি অতিরিক্ত খেলে কিডনির ক্ষতি হতে পারে যে পাঁচটি সিনেমা ভ্রমণপিপাসুদের অবশ্যই দেখা উচিত সৌদিতে মিসাইল হামলায় দগ্ধ প্রবাসী মামুনের মৃত্যু ঈদের ছুটিতে প্রায় ফাঁকা রাজধানী দেশে প্রথমবারের মতো চালু পেট অ্যাম্বুলেন্স, নেটিজেনদের প্রশংসা নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ অঙ্গীকারবদ্ধ : পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিরাপত্তা প্রধান লারিজানি হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার ঘোষণা ইরানের অনলাইন প্রতারণা ঠেকাতে নুতন এআই টুল আনছে মেটা

সত্যবাদী ও সত্যবাদিতা

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১২:৪৫:৩৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ২০ অক্টোবর ২০১৮
  • ৩৭৪ বার

হাওর বার্তা ডেস্কঃ মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। মানুষের অঙ্গগুলো সুন্দরভাবে সঠিক পথে চলতে থাকলে মানুুষও আলোকিত পথে চলতে থাকে। লোকজনও তাকে মানুষ হিসেবে চেনে ও জানে। ভালো মানুষের চরিত্র অন্যদের সঙ্গে হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক ও সৌজন্য বোধের হয়। সে কাউকে কষ্ট দেয় না এবং কষ্টের কথাও বলে না। কথা বলে বুঝে-শুনে। মুখে যা এসে যায়, তা-ই বলে না।

মানুষের একটি উল্লেখযোগ্য অঙ্গ জিহ্বা। আমাদের প্রতিটি কথা ফেরেশতারা আমাদের আমলনামায় লিপিবদ্ধ করেন। তারা প্রতিদিন আমলনামা আল্লাহর কাছে পেশ করেন। আল্লাহওয়ালারা কথা বলার সময় এ অনুভূতি জাগরুক রাখেন, আমার আমলনামা আল্লাহর দরবারে পেশ করা হবে। অনেক বুজুর্গের নিয়ম ছিল, তারা যা বলতেন, তা কাগজে নোট করে রাখতেন। রাতে সেটা খতিয়ে দেখতেন, যা কিছু বলা হয়েছে, তা ঠিক ছিল কি না। ঠিক না হলে রাতেই আল্লাহর কাছে তওবা করে নিতেন।

তরবারির আঘাত লাগে দেহে, মুখের আঘাত লাগে অন্তরে। তবে তরবারির আঘাত শুকিয়ে মিলিয়ে যায়। আর অন্তরের আঘাত মৃত্যু পর্যন্ত থেকে যায়। এজন্য আল্লাহ তায়ালা বলেন ‘হে মোমিনরা! কেউ যেন কাউকে উপহাস না করে। কেননা যাকে অবজ্ঞা করা হয় সে অবজ্ঞাকারী অপেক্ষা উত্তম হতে পারে।’ (সূরা হুজরাত : ১১)।
এজন্য আল্লাহওয়ালারা কথা বলেন কম, চুপ থাকেন বেশি। তবে ইলমি বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। জ্ঞানীরা বলে থাকেন, বুদ্ধিমানরা কথা বলে ভেবেচিন্তে। পক্ষান্তরে নির্বোধরা প্রথমে কথা বলে, তারপর ভাবে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন ‘আমি উত্তম চরিত্র শিক্ষাদানের জন্য প্রেরিত হয়েছি।’ (বোখারি ও মুসলিম)।

মানুষ উত্তম কথা বলবে এটাই মানুষের শিক্ষা। ভালো চরিত্রের ভিত্তি হলো সত্য কথা বলা। ইসলাম ধর্মের শেকড় ও খুঁটি হলো সত্যবাদিতা। যে মানুষটির জীবনে সত্যবাদিতা নেই, তার ধার্মিকতা অন্তঃসারশূন্য। হাদিসে এসেছে, ‘বান্দা যখন মিথ্যায় অভ্যস্ত হয়ে পড়ে, তখন একটা সময় এসে আল্লাহ ফেরেশতাদের বলে দেন, এ ব্যক্তির নাম মিথ্যুকদের তালিকায় রাখো।’

উম্মতের মধ্যে আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় হলেন ‘সিদ্দিক’ তথা মহাসত্যবাদী। যেমন আবু বকর (রা.) ছিলেন উম্মতের সিদ্দিক। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন ‘যারা সত্য নিয়ে এসেছে এবং সত্যকে সত্য বলে জেনেছে তারাই তো আল্লাহভীরু।’ (সূরা জুমার : ৩৩)।

সত্যবাদিতা আল্লাহ তায়ালার খুবই পছন্দনীয়। সত্যবাদিতা ছিল নবীদের গুণ। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেছেন ‘আপনি এ কিতাবে ইবরাহিমের কথা বলুন, নিশ্চয়ই তিনি ছিলেন সত্যবাদী নবী।’ (সূরা মরিয়ম : ৪১)।
‘এ কিতাবে ইসমাইলের কথা বলুন, নিশ্চয়ই তিনি ছিলেন প্রতিশ্রুতি পালনে সত্যাশ্রয়ী এবং তিনি ছিলেন রাসুল ও নবী।’ (সূরা মরিয়ম : ৫৪)।

‘কিতাবটিতে ইদরিসের আলোচনা করুন, নিশ্চয়ই তিনি ছিলেন সত্যবাদী নবী।’ (সূরা মরিয়ম : ৫৬)।
আল্লাহ তাঁর কিতাবে প্রিয় বান্দাদের সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন, তারা ছিলেন সত্যবাদী। সুতরাং সত্যবাদীদের এই পবিত্র কাফেলার সঙ্গে মিথ্যাবাদীরা চলতে পারবে না।

নবী করিম (সা.) বলেছেন ‘তোমরা আমার কাছে ছয়টি বিষয়ের জিম্মাদার হও, আমি তোমাদের জন্য জান্নাতের জিম্মাদার হব। তাহলো ১. যখন তোমরা কথা বলবে, সত্য বলবে, ২. অঙ্গীকার করলে তা পূরণ করবে, ৩. আমানত যথাযথ আদায় করবে, ৪. তোমাদের গুপ্তাঙ্গ সংরক্ষণ করবে, ৫. তোমাদের দৃষ্টি নিম্নগামী রাখবে এবং ৬. অন্যায় কাজ থেকে তোমাদের হাত ফিরিয়ে রাখবে।’ (মুসনাদে আহমদ)।

ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন ‘যদি তোমার মাঝে চারটি স্বভাব পাওয়া যায়, তবে দুনিয়ার সবকিছু ধ্বংস হলেও তোমার কোনো ক্ষতি হবে না। তাহলো ১. আমানত রক্ষা করা, ২. সত্যবাদী হওয়া, ৩. সচ্চরিত্রবান হওয়া এবং ৪. হালাল খাবার খাওয়া।’ (মুসনাদে আহমদ)।

আবু বকর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন ‘তোমরা নিজেদের জন্য সত্যবাদিতা অপরিহার্য করে নেবে। কেননা তা সৎকাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত। আর এ দুটি গুণের অধিকারী জান্নাতি।’ (ইবনু হিব্বান)।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন ‘তোমরা সর্বাত্মকভাবে সত্য অবলম্বন করো। অর্থাৎ সত্যের পেছনে লেগে থাকো। যদিও বাহ্যিকদৃষ্টিতে তার মধ্যে ধ্বংস দেখতে পাও। অর্থাৎ পরিস্থিতি এমন যে, তোমাদের কাছে দৃশ্যত মনে হচ্ছে, সত্য বললে বিপদে পড়বে। তবু সত্য বল। কেননা আল্লাহ সত্যের মধ্যে মুক্তি রেখেছেন।’ (ইবনু আবিদ্দুনয়া)।
অপর হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন ‘সত্য মুক্তি দেয়, মিথ্যা ধ্বংস করে।’

ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ‘চারটি গুণের মাধ্যমে মানুষ কামিয়াবি লাভ করে। তাহলো ১. সত্য বলা, ২. লজ্জাশীলতা, ৩. উত্তম চরিত্র এবং ৪. শোকর আদায় করা।’

ওয়াহাব ইবনে মুনাব্বিহ (রহ.) বলেন, আমি তাওরাতের টীকায় বাইশটি বাক্য দেখেছি, যেগুলো বনু ইসরাইলের আলেমরা তাদের মজলিসে সম্মিলিতভাবে পাঠ করতেন। বাক্যগুলো ছিল নিম্নরূপ : ইলম থেকে উপকারী সম্পদ নেই। গোস্বা থেকে নিকৃষ্ট গরিমা নেই। আমল থেকে সাজ-সজ্জাশীল সঙ্গী নেই। মূর্খতা থেকে বেশি দোষ অন্বেষণকারী সাথি নেই। তাকওয়া থেকে বড় কোনো আভিজাত্য নেই। প্রবৃত্তির তাড়না উপেক্ষা করা থেকে বড় কাজ নেই। জিকির থেকে উৎকৃষ্ট আমল নেই।

সবর থেকে বড় সৎকর্ম নেই। অহংকার থেকে বড় লাঞ্ছনাকারী আর নেই। নম্রতার চেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তারকারী সাক্ষী নেই। বোকামি থেকে বেশি কষ্টদানকারী রোগ নেই। লোভ থেকে বেশি ইজ্জতহরণকারী দরিদ্রতা নেই। সম্পদ সঞ্চিত রাখার চেয়ে নিৎকৃষ্ট অভ্যাস নেই। সুস্থতার চেয়ে উৎকৃষ্ট জীবন নেই। শালীনতাবোধের চেয়ে উত্তম জীবন নেই। আল্লাহমুখিতার চেয়ে উত্তম ইবাদত নেই। অল্পতুষ্টির চেয়ে উত্তম ধার্মিকতা নেই। চুপ থাকার চেয়ে বেশি তৎপর পাহাদার কেউ নেই। মৃত্যুর চেয়ে নিকটবর্তী কোনো অদৃশ্যমান বস্তু নেই এবং সত্যবাদিতার চেয়ে শ্রেষ্ঠ উপদেশদানকারী দলিল নেই।

যারা সত্য কথা বলে তাদের চারটি নিদর্শন আছে
এক. মিষ্টিকথা। সত্যবাদীদের কথা শুনতে ভালো লাগে। তাদের কথা অন্তরে দাগ কাটে। হৃদয় স্পর্শ করে।
দুই. ব্যক্তিত্ব। আল্লাহ তায়ালা তাদের ব্যক্তিত্ব দান করেন। যেমন নবীজি (সা.) বলেছেন ‘আল্লাহ আমাকে ব্যক্তিত্বদান করে সাহায্য করেছেন।’

তিন. সত্যবাদীদের চেহারায় লাবণ্য থাকে। ফুলের পাপড়ির মতো হাস্যমুখ থাকে। এটা আল্লাহর জিকিরের কারণেও হয়। চার. সত্যবাদীদের অন্তর থাকে শান্ত। পেরেশানি সবার জীবনেই আসে। সত্যবাদীদের জীবনেও আসে। কিন্তু তারা পেরেশানির জগতে থেকেও অন্তরের দিক থেকে প্রশান্ত থাকেন।

আল্লাহ তায়ালা সত্যাচারী ব্যক্তিকে কিছু বিশেষ নেয়ামত দান করেন। যেমন ঈমানি অন্তর্দৃষ্টি। যিনি যত বেশি সত্যকথা বলবে আল্লাহ তাকে তত বেশি গভীর অন্তর্দৃষ্টি দান করবেন। তিনি তত বেশি মানুষের অন্তর বুঝতে সক্ষম হবেন। অন্তরের রোগনির্ণয়ে দক্ষতা তাঁর বেড়ে যাবে। হাদিসে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর কাছে সত্য প্রার্থনা করে, আল্লাহ তাকে একটি আয়না দান করেন, যেখানে সে হক ও বাতিল দেখতে পায়।’ অর্থাৎ আল্লাহ তায়ালা তাকে ‘ফুরকান’ তথা হক-বাতিলের মাঝে পার্থক্য নির্ণয়কারী মাপকাঠি দান করেন।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

জনপ্রিয় সংবাদ

মহাসড়কের বুক চিরে প্রকৃতির রঙিন সৌন্দর্য

সত্যবাদী ও সত্যবাদিতা

আপডেট টাইম : ১২:৪৫:৩৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ২০ অক্টোবর ২০১৮

হাওর বার্তা ডেস্কঃ মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। মানুষের অঙ্গগুলো সুন্দরভাবে সঠিক পথে চলতে থাকলে মানুুষও আলোকিত পথে চলতে থাকে। লোকজনও তাকে মানুষ হিসেবে চেনে ও জানে। ভালো মানুষের চরিত্র অন্যদের সঙ্গে হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক ও সৌজন্য বোধের হয়। সে কাউকে কষ্ট দেয় না এবং কষ্টের কথাও বলে না। কথা বলে বুঝে-শুনে। মুখে যা এসে যায়, তা-ই বলে না।

মানুষের একটি উল্লেখযোগ্য অঙ্গ জিহ্বা। আমাদের প্রতিটি কথা ফেরেশতারা আমাদের আমলনামায় লিপিবদ্ধ করেন। তারা প্রতিদিন আমলনামা আল্লাহর কাছে পেশ করেন। আল্লাহওয়ালারা কথা বলার সময় এ অনুভূতি জাগরুক রাখেন, আমার আমলনামা আল্লাহর দরবারে পেশ করা হবে। অনেক বুজুর্গের নিয়ম ছিল, তারা যা বলতেন, তা কাগজে নোট করে রাখতেন। রাতে সেটা খতিয়ে দেখতেন, যা কিছু বলা হয়েছে, তা ঠিক ছিল কি না। ঠিক না হলে রাতেই আল্লাহর কাছে তওবা করে নিতেন।

তরবারির আঘাত লাগে দেহে, মুখের আঘাত লাগে অন্তরে। তবে তরবারির আঘাত শুকিয়ে মিলিয়ে যায়। আর অন্তরের আঘাত মৃত্যু পর্যন্ত থেকে যায়। এজন্য আল্লাহ তায়ালা বলেন ‘হে মোমিনরা! কেউ যেন কাউকে উপহাস না করে। কেননা যাকে অবজ্ঞা করা হয় সে অবজ্ঞাকারী অপেক্ষা উত্তম হতে পারে।’ (সূরা হুজরাত : ১১)।
এজন্য আল্লাহওয়ালারা কথা বলেন কম, চুপ থাকেন বেশি। তবে ইলমি বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। জ্ঞানীরা বলে থাকেন, বুদ্ধিমানরা কথা বলে ভেবেচিন্তে। পক্ষান্তরে নির্বোধরা প্রথমে কথা বলে, তারপর ভাবে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন ‘আমি উত্তম চরিত্র শিক্ষাদানের জন্য প্রেরিত হয়েছি।’ (বোখারি ও মুসলিম)।

মানুষ উত্তম কথা বলবে এটাই মানুষের শিক্ষা। ভালো চরিত্রের ভিত্তি হলো সত্য কথা বলা। ইসলাম ধর্মের শেকড় ও খুঁটি হলো সত্যবাদিতা। যে মানুষটির জীবনে সত্যবাদিতা নেই, তার ধার্মিকতা অন্তঃসারশূন্য। হাদিসে এসেছে, ‘বান্দা যখন মিথ্যায় অভ্যস্ত হয়ে পড়ে, তখন একটা সময় এসে আল্লাহ ফেরেশতাদের বলে দেন, এ ব্যক্তির নাম মিথ্যুকদের তালিকায় রাখো।’

উম্মতের মধ্যে আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় হলেন ‘সিদ্দিক’ তথা মহাসত্যবাদী। যেমন আবু বকর (রা.) ছিলেন উম্মতের সিদ্দিক। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন ‘যারা সত্য নিয়ে এসেছে এবং সত্যকে সত্য বলে জেনেছে তারাই তো আল্লাহভীরু।’ (সূরা জুমার : ৩৩)।

সত্যবাদিতা আল্লাহ তায়ালার খুবই পছন্দনীয়। সত্যবাদিতা ছিল নবীদের গুণ। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেছেন ‘আপনি এ কিতাবে ইবরাহিমের কথা বলুন, নিশ্চয়ই তিনি ছিলেন সত্যবাদী নবী।’ (সূরা মরিয়ম : ৪১)।
‘এ কিতাবে ইসমাইলের কথা বলুন, নিশ্চয়ই তিনি ছিলেন প্রতিশ্রুতি পালনে সত্যাশ্রয়ী এবং তিনি ছিলেন রাসুল ও নবী।’ (সূরা মরিয়ম : ৫৪)।

‘কিতাবটিতে ইদরিসের আলোচনা করুন, নিশ্চয়ই তিনি ছিলেন সত্যবাদী নবী।’ (সূরা মরিয়ম : ৫৬)।
আল্লাহ তাঁর কিতাবে প্রিয় বান্দাদের সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন, তারা ছিলেন সত্যবাদী। সুতরাং সত্যবাদীদের এই পবিত্র কাফেলার সঙ্গে মিথ্যাবাদীরা চলতে পারবে না।

নবী করিম (সা.) বলেছেন ‘তোমরা আমার কাছে ছয়টি বিষয়ের জিম্মাদার হও, আমি তোমাদের জন্য জান্নাতের জিম্মাদার হব। তাহলো ১. যখন তোমরা কথা বলবে, সত্য বলবে, ২. অঙ্গীকার করলে তা পূরণ করবে, ৩. আমানত যথাযথ আদায় করবে, ৪. তোমাদের গুপ্তাঙ্গ সংরক্ষণ করবে, ৫. তোমাদের দৃষ্টি নিম্নগামী রাখবে এবং ৬. অন্যায় কাজ থেকে তোমাদের হাত ফিরিয়ে রাখবে।’ (মুসনাদে আহমদ)।

ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন ‘যদি তোমার মাঝে চারটি স্বভাব পাওয়া যায়, তবে দুনিয়ার সবকিছু ধ্বংস হলেও তোমার কোনো ক্ষতি হবে না। তাহলো ১. আমানত রক্ষা করা, ২. সত্যবাদী হওয়া, ৩. সচ্চরিত্রবান হওয়া এবং ৪. হালাল খাবার খাওয়া।’ (মুসনাদে আহমদ)।

আবু বকর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন ‘তোমরা নিজেদের জন্য সত্যবাদিতা অপরিহার্য করে নেবে। কেননা তা সৎকাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত। আর এ দুটি গুণের অধিকারী জান্নাতি।’ (ইবনু হিব্বান)।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন ‘তোমরা সর্বাত্মকভাবে সত্য অবলম্বন করো। অর্থাৎ সত্যের পেছনে লেগে থাকো। যদিও বাহ্যিকদৃষ্টিতে তার মধ্যে ধ্বংস দেখতে পাও। অর্থাৎ পরিস্থিতি এমন যে, তোমাদের কাছে দৃশ্যত মনে হচ্ছে, সত্য বললে বিপদে পড়বে। তবু সত্য বল। কেননা আল্লাহ সত্যের মধ্যে মুক্তি রেখেছেন।’ (ইবনু আবিদ্দুনয়া)।
অপর হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন ‘সত্য মুক্তি দেয়, মিথ্যা ধ্বংস করে।’

ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ‘চারটি গুণের মাধ্যমে মানুষ কামিয়াবি লাভ করে। তাহলো ১. সত্য বলা, ২. লজ্জাশীলতা, ৩. উত্তম চরিত্র এবং ৪. শোকর আদায় করা।’

ওয়াহাব ইবনে মুনাব্বিহ (রহ.) বলেন, আমি তাওরাতের টীকায় বাইশটি বাক্য দেখেছি, যেগুলো বনু ইসরাইলের আলেমরা তাদের মজলিসে সম্মিলিতভাবে পাঠ করতেন। বাক্যগুলো ছিল নিম্নরূপ : ইলম থেকে উপকারী সম্পদ নেই। গোস্বা থেকে নিকৃষ্ট গরিমা নেই। আমল থেকে সাজ-সজ্জাশীল সঙ্গী নেই। মূর্খতা থেকে বেশি দোষ অন্বেষণকারী সাথি নেই। তাকওয়া থেকে বড় কোনো আভিজাত্য নেই। প্রবৃত্তির তাড়না উপেক্ষা করা থেকে বড় কাজ নেই। জিকির থেকে উৎকৃষ্ট আমল নেই।

সবর থেকে বড় সৎকর্ম নেই। অহংকার থেকে বড় লাঞ্ছনাকারী আর নেই। নম্রতার চেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তারকারী সাক্ষী নেই। বোকামি থেকে বেশি কষ্টদানকারী রোগ নেই। লোভ থেকে বেশি ইজ্জতহরণকারী দরিদ্রতা নেই। সম্পদ সঞ্চিত রাখার চেয়ে নিৎকৃষ্ট অভ্যাস নেই। সুস্থতার চেয়ে উৎকৃষ্ট জীবন নেই। শালীনতাবোধের চেয়ে উত্তম জীবন নেই। আল্লাহমুখিতার চেয়ে উত্তম ইবাদত নেই। অল্পতুষ্টির চেয়ে উত্তম ধার্মিকতা নেই। চুপ থাকার চেয়ে বেশি তৎপর পাহাদার কেউ নেই। মৃত্যুর চেয়ে নিকটবর্তী কোনো অদৃশ্যমান বস্তু নেই এবং সত্যবাদিতার চেয়ে শ্রেষ্ঠ উপদেশদানকারী দলিল নেই।

যারা সত্য কথা বলে তাদের চারটি নিদর্শন আছে
এক. মিষ্টিকথা। সত্যবাদীদের কথা শুনতে ভালো লাগে। তাদের কথা অন্তরে দাগ কাটে। হৃদয় স্পর্শ করে।
দুই. ব্যক্তিত্ব। আল্লাহ তায়ালা তাদের ব্যক্তিত্ব দান করেন। যেমন নবীজি (সা.) বলেছেন ‘আল্লাহ আমাকে ব্যক্তিত্বদান করে সাহায্য করেছেন।’

তিন. সত্যবাদীদের চেহারায় লাবণ্য থাকে। ফুলের পাপড়ির মতো হাস্যমুখ থাকে। এটা আল্লাহর জিকিরের কারণেও হয়। চার. সত্যবাদীদের অন্তর থাকে শান্ত। পেরেশানি সবার জীবনেই আসে। সত্যবাদীদের জীবনেও আসে। কিন্তু তারা পেরেশানির জগতে থেকেও অন্তরের দিক থেকে প্রশান্ত থাকেন।

আল্লাহ তায়ালা সত্যাচারী ব্যক্তিকে কিছু বিশেষ নেয়ামত দান করেন। যেমন ঈমানি অন্তর্দৃষ্টি। যিনি যত বেশি সত্যকথা বলবে আল্লাহ তাকে তত বেশি গভীর অন্তর্দৃষ্টি দান করবেন। তিনি তত বেশি মানুষের অন্তর বুঝতে সক্ষম হবেন। অন্তরের রোগনির্ণয়ে দক্ষতা তাঁর বেড়ে যাবে। হাদিসে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর কাছে সত্য প্রার্থনা করে, আল্লাহ তাকে একটি আয়না দান করেন, যেখানে সে হক ও বাতিল দেখতে পায়।’ অর্থাৎ আল্লাহ তায়ালা তাকে ‘ফুরকান’ তথা হক-বাতিলের মাঝে পার্থক্য নির্ণয়কারী মাপকাঠি দান করেন।