ঢাকা ১১:২৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ০১ এপ্রিল ২০২৬, ১৮ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
বাগদান সম্পন্ন, বিয়ে হবে দেশের আইন মেনে : লুবাবা ফ্যামিলি ও কৃষক কার্ডের টাকা ছাপিয়ে দিচ্ছি না: প্রধানমন্ত্রী আন্দোলনে যাচ্ছে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট হেফাজতের আমির মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সাথে সাক্ষাৎ : ফটিকছড়িতে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২০০ মার্কিন পাইলটের আবাসন গুঁড়িয়ে দিলো ইরান, বেশ কয়েকটি যুদ্ধবিমান ধ্বংস আওয়ামী লীগের আমলে পাচার হয়েছে ২৩৪ বিলিয়ন ডলার : প্রধানমন্ত্রী বাসস এমডি মাহবুব মোর্শেদের নিয়োগ বাতিল করে প্রজ্ঞাপন সরকারি চাকরিতে শূন্যপদ ৪ লাখ ৬৮ হাজার ২২০ তরমুজের নাম বেঙ্গল টাইগার! জেনে নিন তরমুজের ইতিহাস, পুষ্টিগুণ, স্বাস্থ্য উপকারিতা এবং পাকা তরমুজ চেনার উপায় বুধবার শুরু ডিজিটাল ডিভাইস অ্যান্ড ইনোভেশন এক্সপো

বাড়ছে হামে আক্রান্ত শিশু: হাসপাতালে মা-বাবার অদৃশ্য যুদ্ধ

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ০৯:৫৫:৩৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ১ এপ্রিল ২০২৬
  • ২ বার

“তিন দিন ধরে জ্বর, তারপর শরীরে লাল দানা উঠতে শুরু করে, ভেবেছিলাম সাধারণ ঠান্ডা-জ্বর। কিন্তু যখন চোখ লাল হয়ে গেল, খাওয়াদাওয়া বন্ধ-তখনই হাসপাতালে নিয়ে আসি।” বলছিলেন পাঁচ বছরের শিশুর মা শারমিন আক্তার।

কথা বলতে বলতে সন্তানের দিকে তাকিয়ে তার চোখে স্পষ্ট আতঙ্ক।

গতকাল মঙ্গলবার রাতে রাজধানীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে সারিবদ্ধভাবে বসে আছেন উদ্বিগ্ন অভিভাবকরা। কারও চোখে ঘুম নেই, কারও হাতে প্রার্থনার তসবিহ, আবার কেউ সন্তানের কপালে হাত রেখে বারবার জ্বর মাপছেন।

হাসপাতালের বেডে শুয়ে থাকা শিশুরা কেউ কাঁদছে, কেউ আবার ক্লান্তিতে নিস্তেজ। তাদের পাশে বসে থাকা বাবা-মায়েরা এক ধরনের অদৃশ্য যুদ্ধ লড়ছেন—রোগের সঙ্গে যেমন, তেমনি নিজের ভেতরের ভয়-উদ্বেগের সঙ্গেও।

একজন বাবা, রিকশাচালক মোহাম্মদ আলী, বলেন, “দিনে যা আয় করি, সবই এখানে খরচ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু টাকার চিন্তার চেয়ে বড় হলো বাচ্চাটা সুস্থ হবে তো?” তার কণ্ঠে অসহায়ত্বের সুর।

মহাখালীর এই হাসপাতালটিতে বর্তমানে শয্যার চেয়ে হামের রোগীর সংখ্যা বেশি। ফলে বাধ্য হয়ে অনেক রোগীকে করিডোর ও হাসপাতালের বারান্দায় রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এতে সংক্রমণ আরও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

আইসিইউতে দায়িত্বে থাকা সেবিকা মাহমুদা আক্তার বলেন, ঈদের পর থেকেই রোগীর চাপ বেড়েছে। এখন পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।

জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের এক চিকিৎসক জানান, সেখানকার শিশু ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন রোগীর বড় অংশই হামে আক্রান্ত। ফলে তাদের মূল চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অবস্থিত শিশু হাসপাতাল সূত্র জানায়, হামে আক্রান্ত ৫২ শিশু এই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এর মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় ভর্তি করা হয়েছে ২২টি শিশুকে। হাসপাতালে শয্যা না থাকায় রোগী এলেও ভর্তি করা সম্ভব হচ্ছে না।

অভিভাবকদের আরেকটি বড় উদ্বেগ—হাসপাতালের ভিড় ও সংক্রমণের আশঙ্কা। “এক ওয়ার্ডে এত রোগী, ভয় লাগে আরও কিছু না হয়,” বলছিলেন আরেক মা, রোজিনা বেগম।

এই সংকটের মধ্যে সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি চোখে পড়ে, তা হলো—অভিভাবকদের অদম্য ধৈর্য ও ভালোবাসা। নিজেদের ক্লান্তি, অর্থকষ্ট, অনিশ্চয়তা—সবকিছুর ঊর্ধ্বে তারা একটাই প্রার্থনা করছেন: “আমার সন্তানটা সুস্থ হয়ে উঠুক।”

রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ওয়ার্ডে নীরবতা নেমে এলেও অভিভাবকদের চোখে ঘুম নামে না। কেউ মোবাইলে আত্মীয়দের আপডেট দিচ্ছেন, কেউ ডাক্তার আসার অপেক্ষায়। এই অপেক্ষা যেন শেষই হতে চায় না।

দেশে চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে হামের উদ্বেগজনক বিস্তার ঘটেছে। এই সময়ে ৬৭৬ শিশুর শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৭৫ গুণ বেশি। ২০২৫ সালের একই সময়ে আক্রান্ত ছিল মাত্র ৯ জন, ২০২৪ সালে ছিল ৬৪ জন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের আট বিভাগেই হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে। সরকারিভাবে এখনো মৃত্যুর তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। তবে বিভিন্ন হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, হামে অর্ধশতাধিক শিশু মারা গেছে।’

আজ সচিবালয়ে এক ব্রিফিয়ে জানানো হয়, মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে ২৫ শিশু; বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে ৬; ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৫; চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৪; রাজশাহী, পাবনা ও গোপালগঞ্জে একজন করে এবং বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন জেলায় ৮ জনসহ ৪৮ জন শিশু মারা গেছে। এদের মধ্যে সবাই হামে আক্রান্ত হয়ে মারা যায় নি।

চলতি বছর ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি ২৪৫ জন (৩৬.২৪ শতাংশ) আক্রান্ত শনাক্ত হয়েছে। এরপর রাজশাহীতে ১৩৭ জন (২০.২৬ শতাংশ), চট্টগ্রামে ৯৩ জন (১৩.৭৫ শতাংশ), ময়মনসিংহে ৮০ জন (১১.৮৩ শতাংশ), বরিশাল ও খুলনায় ৫১ জন করে (৭.৫৪ শতাংশ), সিলেটে ১৩ জন (১.৯২ শতাংশ) এবং রংপুরে ছয়জন (০.৮৮ শতাংশ) হাম আক্রান্ত রোগী পাওয়া গেছে।

ইপিআই সারা বছর যে ১২টি রোগের জন্য ১০টি টিকা দেয়, সেগুলোর মধ্যে হাম ও রুবেলা রোগ প্রতিরোধে এমআর টিকাও রয়েছে। হাম প্রতিরোধে ইপিআইয়ের অধীনে ৯-১৫ মাস বয়সী শিশুদের নিয়মিত টিকা দেওয়া হয়। এই কর্মসূচিতে ৮৬ থেকে ৯০ শতাংশ শিশু টিকা পায়।

এদিকে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে নয় মাসের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ বৃদ্ধি। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) উপপরিচালক ডা. মোহাম্মদ শাহরিয়ার সাজ্জাদ বলেন, ‘এই বয়সে শিশুদের টিকা নেওয়ার কথা নয়। অথচ টিকা পাওয়ার আগেই তারা আক্রান্ত হচ্ছে, এটি বড় উদ্বেগের বিষয়।’

বিশেষজ্ঞদের মতে, একচেটিয়া বুকের দুধ খাওয়ানোর হার কমে যাওয়া, অপুষ্টি এবং জীবনযাত্রার পরিবর্তনের কারণে শিশুদের প্রাকৃতিক প্রতিরোধ ক্ষমতাও দুর্বল হয়ে পড়ছে। পাশাপাশি ঈদের সময় মানুষের ব্যাপক যাতায়াত সংক্রমণ বিস্তারে ভূমিকা রাখতে পারে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. আহমদ পারভেজ জাবীন চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, সম্প্রসারিত টীকাদান ও জনস্বাস্থ্যে টীকাদান বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়েছে। এরফলে হাম ও শিশুমৃত্যু বেড়েছে। সচেতনতা বাড়ানো এবং নিয়মিত টিকাদান নিশ্চিত করলেই এ ধরনের পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। পাশাপাশি বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা প্রণয়নে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

সচিবালয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, আগামী রোববার থেকে ইমারজেন্সি ভ্যাকসিনেশনের কাজ শুরু হবে । ৬ মাস বয়স থেকে শুরু করে দশ বছর বয়সেই শিশুদের এই টিকা দেয়া হবে। আপৎকালীন ব্যবস্থা হিসেবে গ্যাভির (ভ্যাকসিন ব্যবস্থাপনার বৈশ্বিক জোট গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাকসিন ইনিশিয়েটিভ) কাছ থেকে ২১ দশমিক ৯ মিলিয়ন ডোজ হামের টিকা ধার হিসেবে নিচ্ছে সরকার। পরবর্তী সময়ে এটা তাদের এই টিকা দিয়ে দেয়া হবে। আগামীকাল ও এরপরের দিনের মধ্যে টিকা ও সিরিঞ্জ কালেক্ট করে সারা দেশে পাঠিয়ে দিবো।’

সারা দেশে টিকা কার্যক্রম ভালোভাবে সম্পন্ন করতে স্বাস্থ্যকর্মীদের সব ছুটি বাতিল করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

হাম মোকাবিলায় প্রস্তুতির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশের সব মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও শিশু হাসপাতালে হামের জন্য পৃথক ওয়ার্ড চালুর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ডিএনসিসি হাসপাতালের সব নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) প্রস্তুত রাখতেও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে হাম মোকাবেলায় পর্যাপ্ত ভেন্টিলেটর প্রস্তুত রয়েছে। প্রয়োজনীয় সংখ্যক শয্যাও প্রস্তুত করা হয়েছে।

চিকিৎসকদের মতে, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা শিশুদের জন্য মারাত্মক হতে পারে যদি সময়মতো চিকিৎসা না নেওয়া হয়। তবে সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ হলো টিকাদান। তবুও অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, টিকা না নেওয়া বা দেরিতে নেওয়ার কারণে ঝুঁকি বাড়ছে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

বাগদান সম্পন্ন, বিয়ে হবে দেশের আইন মেনে : লুবাবা

বাড়ছে হামে আক্রান্ত শিশু: হাসপাতালে মা-বাবার অদৃশ্য যুদ্ধ

আপডেট টাইম : ০৯:৫৫:৩৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ১ এপ্রিল ২০২৬

“তিন দিন ধরে জ্বর, তারপর শরীরে লাল দানা উঠতে শুরু করে, ভেবেছিলাম সাধারণ ঠান্ডা-জ্বর। কিন্তু যখন চোখ লাল হয়ে গেল, খাওয়াদাওয়া বন্ধ-তখনই হাসপাতালে নিয়ে আসি।” বলছিলেন পাঁচ বছরের শিশুর মা শারমিন আক্তার।

কথা বলতে বলতে সন্তানের দিকে তাকিয়ে তার চোখে স্পষ্ট আতঙ্ক।

গতকাল মঙ্গলবার রাতে রাজধানীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে সারিবদ্ধভাবে বসে আছেন উদ্বিগ্ন অভিভাবকরা। কারও চোখে ঘুম নেই, কারও হাতে প্রার্থনার তসবিহ, আবার কেউ সন্তানের কপালে হাত রেখে বারবার জ্বর মাপছেন।

হাসপাতালের বেডে শুয়ে থাকা শিশুরা কেউ কাঁদছে, কেউ আবার ক্লান্তিতে নিস্তেজ। তাদের পাশে বসে থাকা বাবা-মায়েরা এক ধরনের অদৃশ্য যুদ্ধ লড়ছেন—রোগের সঙ্গে যেমন, তেমনি নিজের ভেতরের ভয়-উদ্বেগের সঙ্গেও।

একজন বাবা, রিকশাচালক মোহাম্মদ আলী, বলেন, “দিনে যা আয় করি, সবই এখানে খরচ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু টাকার চিন্তার চেয়ে বড় হলো বাচ্চাটা সুস্থ হবে তো?” তার কণ্ঠে অসহায়ত্বের সুর।

মহাখালীর এই হাসপাতালটিতে বর্তমানে শয্যার চেয়ে হামের রোগীর সংখ্যা বেশি। ফলে বাধ্য হয়ে অনেক রোগীকে করিডোর ও হাসপাতালের বারান্দায় রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এতে সংক্রমণ আরও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

আইসিইউতে দায়িত্বে থাকা সেবিকা মাহমুদা আক্তার বলেন, ঈদের পর থেকেই রোগীর চাপ বেড়েছে। এখন পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।

জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের এক চিকিৎসক জানান, সেখানকার শিশু ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন রোগীর বড় অংশই হামে আক্রান্ত। ফলে তাদের মূল চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অবস্থিত শিশু হাসপাতাল সূত্র জানায়, হামে আক্রান্ত ৫২ শিশু এই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এর মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় ভর্তি করা হয়েছে ২২টি শিশুকে। হাসপাতালে শয্যা না থাকায় রোগী এলেও ভর্তি করা সম্ভব হচ্ছে না।

অভিভাবকদের আরেকটি বড় উদ্বেগ—হাসপাতালের ভিড় ও সংক্রমণের আশঙ্কা। “এক ওয়ার্ডে এত রোগী, ভয় লাগে আরও কিছু না হয়,” বলছিলেন আরেক মা, রোজিনা বেগম।

এই সংকটের মধ্যে সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি চোখে পড়ে, তা হলো—অভিভাবকদের অদম্য ধৈর্য ও ভালোবাসা। নিজেদের ক্লান্তি, অর্থকষ্ট, অনিশ্চয়তা—সবকিছুর ঊর্ধ্বে তারা একটাই প্রার্থনা করছেন: “আমার সন্তানটা সুস্থ হয়ে উঠুক।”

রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ওয়ার্ডে নীরবতা নেমে এলেও অভিভাবকদের চোখে ঘুম নামে না। কেউ মোবাইলে আত্মীয়দের আপডেট দিচ্ছেন, কেউ ডাক্তার আসার অপেক্ষায়। এই অপেক্ষা যেন শেষই হতে চায় না।

দেশে চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে হামের উদ্বেগজনক বিস্তার ঘটেছে। এই সময়ে ৬৭৬ শিশুর শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৭৫ গুণ বেশি। ২০২৫ সালের একই সময়ে আক্রান্ত ছিল মাত্র ৯ জন, ২০২৪ সালে ছিল ৬৪ জন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের আট বিভাগেই হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে। সরকারিভাবে এখনো মৃত্যুর তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। তবে বিভিন্ন হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, হামে অর্ধশতাধিক শিশু মারা গেছে।’

আজ সচিবালয়ে এক ব্রিফিয়ে জানানো হয়, মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে ২৫ শিশু; বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে ৬; ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৫; চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৪; রাজশাহী, পাবনা ও গোপালগঞ্জে একজন করে এবং বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন জেলায় ৮ জনসহ ৪৮ জন শিশু মারা গেছে। এদের মধ্যে সবাই হামে আক্রান্ত হয়ে মারা যায় নি।

চলতি বছর ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি ২৪৫ জন (৩৬.২৪ শতাংশ) আক্রান্ত শনাক্ত হয়েছে। এরপর রাজশাহীতে ১৩৭ জন (২০.২৬ শতাংশ), চট্টগ্রামে ৯৩ জন (১৩.৭৫ শতাংশ), ময়মনসিংহে ৮০ জন (১১.৮৩ শতাংশ), বরিশাল ও খুলনায় ৫১ জন করে (৭.৫৪ শতাংশ), সিলেটে ১৩ জন (১.৯২ শতাংশ) এবং রংপুরে ছয়জন (০.৮৮ শতাংশ) হাম আক্রান্ত রোগী পাওয়া গেছে।

ইপিআই সারা বছর যে ১২টি রোগের জন্য ১০টি টিকা দেয়, সেগুলোর মধ্যে হাম ও রুবেলা রোগ প্রতিরোধে এমআর টিকাও রয়েছে। হাম প্রতিরোধে ইপিআইয়ের অধীনে ৯-১৫ মাস বয়সী শিশুদের নিয়মিত টিকা দেওয়া হয়। এই কর্মসূচিতে ৮৬ থেকে ৯০ শতাংশ শিশু টিকা পায়।

এদিকে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে নয় মাসের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ বৃদ্ধি। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) উপপরিচালক ডা. মোহাম্মদ শাহরিয়ার সাজ্জাদ বলেন, ‘এই বয়সে শিশুদের টিকা নেওয়ার কথা নয়। অথচ টিকা পাওয়ার আগেই তারা আক্রান্ত হচ্ছে, এটি বড় উদ্বেগের বিষয়।’

বিশেষজ্ঞদের মতে, একচেটিয়া বুকের দুধ খাওয়ানোর হার কমে যাওয়া, অপুষ্টি এবং জীবনযাত্রার পরিবর্তনের কারণে শিশুদের প্রাকৃতিক প্রতিরোধ ক্ষমতাও দুর্বল হয়ে পড়ছে। পাশাপাশি ঈদের সময় মানুষের ব্যাপক যাতায়াত সংক্রমণ বিস্তারে ভূমিকা রাখতে পারে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. আহমদ পারভেজ জাবীন চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, সম্প্রসারিত টীকাদান ও জনস্বাস্থ্যে টীকাদান বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়েছে। এরফলে হাম ও শিশুমৃত্যু বেড়েছে। সচেতনতা বাড়ানো এবং নিয়মিত টিকাদান নিশ্চিত করলেই এ ধরনের পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। পাশাপাশি বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা প্রণয়নে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

সচিবালয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, আগামী রোববার থেকে ইমারজেন্সি ভ্যাকসিনেশনের কাজ শুরু হবে । ৬ মাস বয়স থেকে শুরু করে দশ বছর বয়সেই শিশুদের এই টিকা দেয়া হবে। আপৎকালীন ব্যবস্থা হিসেবে গ্যাভির (ভ্যাকসিন ব্যবস্থাপনার বৈশ্বিক জোট গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাকসিন ইনিশিয়েটিভ) কাছ থেকে ২১ দশমিক ৯ মিলিয়ন ডোজ হামের টিকা ধার হিসেবে নিচ্ছে সরকার। পরবর্তী সময়ে এটা তাদের এই টিকা দিয়ে দেয়া হবে। আগামীকাল ও এরপরের দিনের মধ্যে টিকা ও সিরিঞ্জ কালেক্ট করে সারা দেশে পাঠিয়ে দিবো।’

সারা দেশে টিকা কার্যক্রম ভালোভাবে সম্পন্ন করতে স্বাস্থ্যকর্মীদের সব ছুটি বাতিল করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

হাম মোকাবিলায় প্রস্তুতির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশের সব মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও শিশু হাসপাতালে হামের জন্য পৃথক ওয়ার্ড চালুর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ডিএনসিসি হাসপাতালের সব নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) প্রস্তুত রাখতেও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে হাম মোকাবেলায় পর্যাপ্ত ভেন্টিলেটর প্রস্তুত রয়েছে। প্রয়োজনীয় সংখ্যক শয্যাও প্রস্তুত করা হয়েছে।

চিকিৎসকদের মতে, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা শিশুদের জন্য মারাত্মক হতে পারে যদি সময়মতো চিকিৎসা না নেওয়া হয়। তবে সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ হলো টিকাদান। তবুও অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, টিকা না নেওয়া বা দেরিতে নেওয়ার কারণে ঝুঁকি বাড়ছে।