রফিকুল ইসলামঃ ‘চোখের আড়াল হলে কী হবে, / স্মৃতির পাতায় তুমি চিরভাস্বর; / ছিলে মানুষ গড়ার শৈল্পিক কারিগর, / সমাজ বিনির্মাণে ছিলে অবিনশ্বর।’
আলহাজ্ব মো. আজিজুর রহমানের স্মরণে আমার পঙক্তিতে এই শ্রদ্ধার্ঘ্য। তিনি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষক না হলেও নিজ পরিবারে ও সমাজে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে, আদর্শ শিক্ষা দিয়ে প্রকৃত অর্থেই একজন সমাজ-শিক্ষক বা জাতির শিক্ষক হয়ে উঠেছিলেন।
তিনি সত্যিকার্থে আদর্শ মানব সৃষ্টির শৈল্পিক কারিগর। তাঁর মূল্যবোধ, দৃষ্টিভঙ্গি, নির্দেশনা, আদর্শ ও কর্মনিষ্ঠা স্থান, কাল, পাত্র, জাতি, ধর্ম ও বর্ণভেদের ঊর্ধ্বে ওঠে মানবতার কল্যাণে ব্যাপৃত ছিল। তিনি পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রের পর্যায়েও সমান্তরাল বহুবিধ দায়িত্বপূর্ণ কর্তব্য সম্পন্ন করে গেছেন।
তাঁর বাড়ি কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলার মহিষারকান্দি গ্রামে। পীরে কামেল হজরত মাওলানা মতলেব উদ্দিন আনোয়ারী (রহ.)-এর বংশধর বলে ‘মৌলভীবাড়ি’ খ্যাতি লাভ করেছে।
তিনি ছিলেন ৭ ছেলে ও ৭ মেয়ের জনক। সন্তানদের সফলতায় তাঁর সহধর্মিণী আলহাজ্ব মোছা. মায়মুনা আক্তার ‘রত্নগর্ভা’ উপাধিতে ভূষিত হন।
প্রথমত আলহাজ্ব মো. আজিজুর রহমান একজন আদর্শ ও শ্রেষ্ঠ পিতা। তিনি একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, মিঠামইন উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান, তিনবারের কিশোরগঞ্জ জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান/প্রশাসক ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট মো. জিল্লুর রহমানের স্বনামধন্য ও গর্বিত পিতা।
তাঁর অন্য ছেলেরা নিজনিজ অবস্থানে সুপ্রতিষ্ঠিত এবং সমাজ ও দেশের জন্য নিবেদিত প্রাণ। মো. এনায়েতুর রহমান গোলাপ – অব. প্রকৌশলী, মো. শফিকুর রহমান কামাল – অব. বিশিষ্ট ব্যাংকার, মো. জামালুর রহমান জামাল – কিশোরগঞ্জ গুরুদয়াল সরকারি কলেজের অব. অধ্যক্ষ, মো. লুৎফর রহমান বাদল – স্বনামধন্য ব্যাংকার, মো. সাইদুর রহমান বাবুল – সরকারি শিক্ষক, মো. মিজানুর রহমান বুলবুল – কিশোরগঞ্জ গুরুদয়াল সরকারি কলেজের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক। সেইসাথে মেয়েরাও পেয়েছেন উত্তম শিক্ষা ও ঘর-সংসার।
আজিজুর রহমান নিজের সব কষ্ট ও ত্যাগ হাসিমুখে আড়াল করে সন্তানদের মুখে হাসি ফুটিয়েছেন এবং সঠিক মূল্যবোধ ও নৈতিকতা শিক্ষা দিয়ে আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলে গেছেন। সন্তানদের কেবল অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করা নয়, বরং তাদের মনুষ্যত্ববোধ ও মানবিক গুণাবলিতে বলীয়ান, মানসিক নিরাপত্তা এবং আত্মবিশ্বাসী মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারাটাই ছিল একজন পিতা হিসেবে প্রকৃত শ্রেষ্ঠত্বের আখ্যান।
সন্তানকে মানুষের মতো মানুষ করে গড়ে তোলাই বাবা-মায়ের শ্রেষ্ঠ এবং সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ – এটি তিনি প্রত্যন্ত অজপাড়া গাঁয়ে থেকেও বুঝতে সক্ষম হয়েছিলেন। জাগতিক সম্পদের চেয়েও এই মানবিক ও নৈতিক উত্তরাধিকার দেওয়া সত্যিই বিরল ও অনন্যসাধারণ।
আর একজন আদর্শ পিতা হিসেবে তিনি সন্তানের জীবনের সবচেয়ে বড় আশ্রয়, অনুপ্রেরণা এবং পথপ্রদর্শক। তিনি কেবল নিজ পরিবারের অভিভাবকই ছিলেন না বরং সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়ার কারিগর ছিলেন। আবার কেবল সন্তানদের অভিভাবকই ছিলেন না, ছিলেন শিক্ষক, বন্ধু এবং আজীবন চলার পথের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা।
পবিত্র কুরআনের দৃষ্টিতে পিতৃত্ব কোনো ‘নিরঙ্কুশ ক্ষমতা’ নয়; বরং এটি হলো একটি রোল মডেল হওয়া এবং সন্তানদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশ নিতে অভ্যস্ত করা।
সত্যিই তাই। তাঁকে দেখলেই মনে হতো তিনি শুধু একজন সাধারণ মানুষ ছিলেন না, আবার স্রেফ একটি সম্পর্কের নামও নয়! তাঁর মাঝে যেন জড়িয়ে ছিল পিতৃত্বে বিশালত্বের এক অদ্ভুত মায়াবী প্রকাশ!
তাঁর এই জ্ঞান বিতরণ কেবল নিজ পরিবারের গন্ডির মধ্যেই আবদ্ধ রাখেননি, শিক্ষাদানে তিনি ছিলেন সবার জন্য সমভাবে উদার। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা ক্লাসরুমের শিক্ষক ছিলেন না; কিন্তু তাঁর দর্শন ও জ্ঞানচর্চার মাধ্যমে তিনি পিছিয়ে পড়া সমাজকে নতুন দিশা দিয়েছিলেন।
এছাড়াও বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান করিয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন অনেকেরই শিক্ষক। প্রাতিষ্ঠানিক বা প্রথাগত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যেমন: স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডির বাইরে থেকেও তিনি সমাজে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে, আদর্শ শিক্ষা দিয়ে প্রকৃত অর্থেই একজন সমাজ-শিক্ষক বা জাতির শিক্ষক হয়ে উঠেছিলেন।
তেমনিভাবে তিনি আমারও শিক্ষক, বিশেষ করে মাধ্যমিকের। কিশোরগঞ্জ শহরে নগুয়াস্থ তাঁর বাসার সংলগ্নই আমাদের বাসা ছিল ‘ভূঁইয়া নিবাস’। তিনি গ্রাম থেকে শহরের বাসায় গেলেই একধরনের স্নায়ুচাপে ভুগতাম; আমি না শুধু – সবাই, যারা যারা ছিলাম।
যার ফলে আগে থেকেই বিশেষ করে গণিত, ইংরেজি ও বিজ্ঞান বই টেবিলের সামনে রেডি রাখতাম। কোনটা কিংবা কোত্থেকে ধরে বসে আগামাথা নেই তো! অবশ্য, পাঠদান পদ্ধতি এবং শিখন-শেখানোর কৌশল ছিল অসাধারণ। তাতে না বুঝে উপায় ছিল না যে!
শিক্ষাদানের এমন শৈলী শিক্ষার্থীদের শেখার প্রক্রিয়াকে আনন্দদায়ক ও কার্যকর করে তুলতেন। জটিল বিষয়গুলোকে সহজ উদাহরণ, বাস্তব অভিজ্ঞতা ও প্র্যাকটিক্যাল ডেমোনস্ট্রেশনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মনের ভেতর খুব সুন্দরভাবে গেঁথে দিতেন।
শিক্ষার্থীদের মনে সুকুমার বৃত্তির অনুশীলনে উৎসাহ ও উদ্দীপনা সৃষ্টি, তাদের মধ্যে শ্রমশীলতা, সহনশীলতা, ধৈর্য, নিজ ও অন্যের ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীলতা এবং অধ্যবসায়ের অভ্যাস গঠন; কুসংস্কারমুক্ত, দেশপ্রেমিক ও কর্মকুশল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা ছিল যেন তাঁর ব্রত। অন্তত তাঁর সান্নিধ্য পেয়ে অনেকের মতো ধন্য আমিও।
আজিজুর রহমান ছিলেন বই পড়ুয়া মানুষ ও বইয়ের প্রতি ছিল দুর্বার আসক্তি। কিশোরগঞ্জের বাসায় গেলে আমার কাছ থেকে চেয়ে আউট বই নিয়ে পড়তেন।
তিনি নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াতের পাশাপাশি ধর্মীয় কিতাবাদী ও বিভিন্ন প্রচুর বই পড়তেন এবং বই পড়ার প্রতি তাঁর প্রবল আগ্রহ বা নেশা ছিল। অবসর সময় পেলেই তিনি বইয়ের জগতে হারিয়ে যেতেন। জ্ঞানপিপাসাসু হয়ে নতুন বিষয় জানা ও জ্ঞানের পরিধি বাড়ানোর জন্য তিনি প্রচুর অধ্যয়ন করতেন। মননশীলতায় বই পড়ার অভ্যাস তাঁর চিন্তাশক্তি ও দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রসারিত এবং জীবনকে সমৃদ্ধ করেছিল। তাঁর নামে নিজ গ্রামে গণ-পাঠাগার রয়েছে।
আজিজুর রহমান ছিলেন একজন সমাজসেবক ও সমাজসংস্কারক এবং সালিশি ন্যায়বিচারক। সমাজে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, সামাজিক কর্মকাণ্ডে নেতৃত্বদান, সংগঠিত মনোভাব সৃষ্টি এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে নির্দেশনা প্রদান করে গেছেন আজীবন।
তিনি সমাজ থেকে কুসংস্কার ও অন্যায় দূর করে একটি সুন্দর, বাসযোগ্য ও সমতাভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলতে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। সমাজের প্রচলিত ক্ষতিকর প্রথা, অন্ধবিশ্বাস এবং বৈষম্যমূলক রীতিনীতি পরিবর্তন করে ইতিবাচক ও প্রগতিশীল পরিবর্তন-সহ মানুষের চিন্তাভাবনার উন্নয়ন ঘটানো এবং সমাজকে আধুনিক ও সময়োপযোগী করে গড়ে তুলতে সর্বদা সচেষ্ট ছিলেন।
এছাড়া দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমে অংশগ্রহণ, সামাজিক বিবাদ-মীমাংসা, অপরাধপ্রবণতা রোধে করণীয় নির্ধারণ এবং সামগ্রিক উন্নয়ন অংশগ্রহণ করে ধৈর্যশীল, বিনম্র ও ইতিবাচক জীবনবোধের পরিচয় দিয়ে গেছেন।
একজন সমাজসংস্কারক মূলত সমাজের মূল ভিত্তি ও দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের জন্য কাজ করেন, আর একজন সালিশি ন্যায়বিচারক সেই সমাজকে সুচারুভাবে পরিচালনার জন্য আইন ও নৈতিকতার প্রয়োগ নিশ্চিত করেন – তিনি ঠিক তেমনটিই।
আজিজুর রহমান ছিলেন সংস্কৃতি এবং ফুটবলপ্রেমী একজন মানুষ; একই সাথে নান্দনিকতা ও শারীরিক উত্তেজনার এক দারুণ সমন্বয় উপভোগ করতেন। তিনি একদিকে যেমন শিল্প, সাহিত্য ও ঐতিহ্যের মাঝে মানসিক প্রশান্তি খুঁজতেন, অন্যদিকে ঠিক তেমনি ফুটবল মাঠের ক্ষিপ্রতা, দলীয় ঐক্য এবং জয়ের রোমাঞ্চে আবেগাপ্লুত হতেন।
একইসাথে তিনি ছিলেন রন্ধন শিল্পীও। রন্ধনশিল্পে তাঁর অসাধারণ সৃজনশীলতা, নান্দনিকতা এবং গভীর জ্ঞান প্রশংসিত ছিল।
আজিজুর রহমান ছিলেন ক্ষণজন্মা বিচক্ষণ, দূরদর্শীসম্পন্ন আদর্শ মানুষ ও বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। সততা,সত্যবাদীতা, ন্যায়পরায়ণতা, পরোপকারী, জীবনসত্তা নয় – ছিলেন মানবসত্তার অধিকারী। এককথায় তিনি ছিলেন – Ten out of ten. অর্থাৎ, দশে দশ।
আলহাজ্ব মো. আজিজুর রহমান সম্পর্কে আমার খালু ও তালই হয়। তিনি ২০০৫ সালের ৫ই মে রবের সান্নিধ্যে চলে যান। তিনি সকলের মাঝে রবেন চির স্মরণীয় হয়ে –
‘নিভে যায় দীপ, থাকে শুধু তার ঘ্রাণ,
তেমনি রেখেছো তুমি কীর্তির অম্লান।’
তাঁর দিদার লাভ এবং জান্নাতুল ফেরদাউস নসিব হোক।
Reporter Name 























