২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সময় দেশের রাজপথের পাশাপাশি বিশ্বজুড়েও চলতে থাকে প্রবাসী বাংলাদেশিদের অভূতপূর্ব প্রতিবাদ। রাজপথের বিক্ষোভ, রেমিট্যান্স বয়কট, আন্তর্জাতিক জনমত গঠন ও বিকল্প তথ্য প্রচারের মাধ্যমে প্রবাসীরা এই গণ-অভ্যুত্থানে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেন। আমাদের আজকের আয়োজনে থাকছে বিশ্বজুড়ে প্রবাসীদের সেই সাহসী ও কার্যকর ভূমিকার চিত্র।
রেমিট্যান্স শাটডাউন
২০২৪ সালের জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময়ে তৎকালীন সরকার যখন সাধারণ শিক্ষার্থী ও আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতার ওপর মাত্রাতিরিক্ত বলপ্রয়োগ, গণগ্রেপ্তার এবং নির্বিচারে টিয়ার গ্যাস ও গুলি চালানো শুরু করে, তখন সারাবিশ্বের প্রবাসীদের মাঝে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। দেশে যখন ১৮ জুলাই রাত থেকে সম্পূর্ণ ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট জারি করে পুরো দেশকে যোগাযোগবিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছিল, তখন বাইরের বিশ্বে অবস্থানরত প্রবাসীরা অনুধাবন করেন যে এই সরকারের প্রধান চালিকাশক্তি হলো দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ।
তৎকালীন রাষ্ট্রযন্ত্রের রাজকোষে অর্থ জোগান বন্ধ করার উদ্দেশ্যে প্রবাসীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে ডাক দেন ‘রেমিট্যান্স শাটডাউন’ বা অফিশিয়াল ব্যাংকিং মাধ্যমে রেমিট্যান্স বয়কটের। সামাজিক মাধ্যম ফেসবুক, এক্স (সাবেক টুইটার), ইনস্টাগ্রাম এবং হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপগুলোতে একযোগে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। ‘নট এ সিঙ্গল পেনি টু দিস গভর্নমেন্ট’ (এই সরকারকে একটি পয়সাও নয়) কিংবা ‘নো রেমিট্যান্স আনটিল রিফর্ম’- এ ধরনের স্লোগান প্রবাসীদের প্রধান মূলমন্ত্রে পরিণত হয়। প্রবাসে কর্মরত লাখ লাখ শ্রমিক, প্রকৌশলী, চিকিৎসক এবং ব্যবসায়ীরা দেশে টাকা পাঠানো বন্ধ রাখার প্রতিজ্ঞা নেন।
পরিসংখ্যান ও অর্থনীতিতে আঘাত
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংগৃহীত প্রাতিষ্ঠানিক পরিসংখ্যান ও অর্থনীতিবিদদের পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২৪ সালের জুন মাসে অফিশিয়াল ব্যাংকিং চ্যানেলে দেশে প্রবাসী আয় এসেছিল রেকর্ড ২.৫৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। কিন্তু প্রবাসীদের এই বয়কট আন্দোলনের কারণে জুলাই মাসে তা এক ধাক্কায় নেমে আসে মাত্র ১.৯১ বিলিয়ন ডলারে। অর্থাৎ, মাত্র চার সপ্তাহের ব্যবধানে অফিশিয়াল ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্সের পতন ঘটে প্রায় ২৫ শতাংশ।
বিশেষ করে ১৯ থেকে ২৪ জুলাই- যে সময়টিতে ইন্টারনেট সম্পূর্ণ বন্ধ ছিল এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বিচ্ছিন্নের দোহাই দিয়ে ব্যাংক পরিচালনা স্থবির ছিল- সেই দিনগুলোতে ব্যাংকিং চ্যানেলে দৈনিক রেমিট্যান্সের পরিমাণ প্রায় শূন্যের কোঠায় গিয়ে ঠেকে। অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশের অর্থনীতি যেখানে আগে থেকেই চরম ডলার সংকট, মূল্যস্ফীতি এবং রিজার্ভের সংকটে ভুগছিল, সেখানে প্রবাসীদের এই অর্থনৈতিক বয়কট তৎকালীন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়কে চরম কোণঠাসা অবস্থায় ফেলে দেয়। এটি তৎকালীন শাসনব্যবস্থার ওপর তীব্র মনস্তাত্ত্বিক ও রাজকোষগত চাপ সৃষ্টি করে, যা আন্দোলনকে দ্রুত বিজয়ের দিকে নিয়ে যেতে অন্যতম বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছিল।
সংযুক্ত আরব আমিরাতে বিক্ষোভ
যা ঘটেছিল সেখানে : মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে রাজনৈতিক সভা, সভা-সমাবেশ, মিছিল বা বিক্ষোভের ক্ষেত্রে অত্যন্ত কঠোর আইন প্রচলিত রয়েছে। বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাতে যেকোনো ধরনের পূর্বানুমতি ছাড়া প্রকাশ্য প্রতিবাদ বা জমায়েত করা সম্পূর্ণ বেআইনি এবং দেশটির আইন অনুযায়ী রাষ্ট্রদ্রোহ ও জননিরাপত্তা বিঘ্নের অভিযোগে এর শাস্তি অত্যন্ত ভয়াবহ। কিন্তু দেশের মাটিতে ছাত্র-জনতার ওপর চলা সহিংসতা দেখে বিদেশের কঠোর আইন ও নিজের ভবিষ্যৎ জীবিকার হুমকিকেও পরোয়া করেননি আরব আমিরাতে থাকা বাংলাদেশিরা।
২০২৪ সালের জুলাইয়ের তৃতীয় সপ্তাহে দুবাই, শারজাহ এবং আবুধাবির রাজপথে একযোগে নেমে আসেন শত শত প্রবাসী বাংলাদেশি। তারা জাতীয় পতাকা হাতে নিয়ে ছাত্র হত্যার বিচার ও তৎকালীন সরকারের পদত্যাগের দাবিতে উচ্চকণ্ঠে স্লোগান দেন। বিদেশের মাটিতে এই বিরল এবং সাহসিকতাপূর্ণ প্রতিবাদ দেখে স্তম্ভিত হয়ে যায় স্থানীয় প্রশাসন।
গ্রেপ্তার, সংক্ষিপ্ত বিচার এবং নজিরবিহীন সাজার আইন : সংযুক্ত আরব আমিরাতের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিক্ষোভস্থলে গিয়ে দ্রুত কঠোর ব্যবস্থা নেয় এবং ঘটনাস্থল থেকে অন্তত ৫৭ জন প্রবাসী বাংলাদেশিকে গ্রেপ্তার করে। দেশটির ফেডারেল কোর্ট অব আপিল খুব দ্রুত একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে বিচারকার্য সম্পাদন করে। আদালতের রায়ে ৩ জন প্রবাসীকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, ৫৩ জনকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ১ জনকে ১১ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। একই সঙ্গে মেয়াদ শেষে সবাইকে নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর আদেশের পাশাপাশি সব ধরনের ডিজিটাল নথি বাজেয়াপ্ত করা হয়।
এই কঠোর শাস্তির খবর যখন বিবিসি, রয়টার্স, আলজাজিরা এবং খালিজ টাইমসের মতো শীর্ষ আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে উঠে আসে, তখন বিশ্বজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়। প্রবাসীরা নিজেদের রক্ত পানি করা উপার্জন, ভিসা ও জীবনকে বাজি রেখে দেশের মানুষের জন্য যেভাবে আত্মত্যাগ করেছিলেন, তা জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ইতিহাসের এক অভূতপূর্ব অধ্যায়। এসব প্রবাসীর অধিকাংশ পরিবারই ছিল তাদের উপার্জনের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল, ফলে দেশে অবস্থানরত পরিবারগুলো রাতারাতি ঘোর অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হয়।
কূটনৈতিক তৎপরতা ও ঐতিহাসিক সাধারণ ক্ষমা : ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ৮ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত হয় নতুন অন্তর্র্বর্তী সরকার। দায়িত্ব গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গেই প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস এই সাজাপ্রাপ্ত ৫৭ জন প্রবাসীর মুক্তির বিষয়টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হিসেবে গ্রহণ করেন। তিনি ব্যক্তিগতভাবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের সঙ্গে টেলিফোনে দীর্ঘ আলোচনা করেন এবং সার্বিক পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে প্রবাসীদের মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখার অনুরোধ জানান।
প্রধান উপদেষ্টার এই আন্তরিক ও কৌশলগত কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ফলে, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে আমিরাতের প্রেসিডেন্ট এক নির্বাহী আদেশে সেই ৫৭ জন প্রবাসীকে সম্পূর্ণ সাধারণ ক্ষমা (Presidential Pardon) ঘোষণা করে মুক্তি দেন। পরবর্তীতে তাদের দেশে ফিরিয়ে আনা এবং অনেকের পুনর্দখল নিশ্চিত করার প্রক্রিয়ায় তৎকালীন কূটনৈতিক সফলতা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রশংসা কুড়ায়।
দূতাবাস ঘেরাও ও আন্তর্জাতিক লবিং
দেশের রাজপথ যখন সান্ধ্য আইন (কারফিউ) ও সাউন্ড গ্রেনেডের শব্দে অবরুদ্ধ, ঠিক তখনই যুক্তরাজ্যের লন্ডন, যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক ও ওয়াশিংটন ডিসি, কানাডার টরন্টো, অস্ট্রেলিয়ার সিডনি, জার্মানির বার্লিন, ফ্রান্সের প্যারিস এবং জাপানের টোকিওর রাজপথ উত্তাল হয়ে ওঠে প্রবাসীদের প্রতিবাদে।
ঐতিহাসিক স্থানগুলোতে অবস্থান : লন্ডনের বিখ্যাত ট্রাফালগার স্কয়ার, হোয়াইটহল, নিউইয়র্কের টাইমস স্কয়ার এবং জাতিসংঘের সদর দপ্তরের সামনে প্রতিদিন হাজার হাজার প্রবাসী বাংলাদেশি একত্রিত হয়ে ব্যানার, প্ল্যাকার্ড ও আলোকচিত্র নিয়ে জড়ো হন। লন্ডনের বাংলাদেশ হাইকমিশনের বাইরে প্রবাসী তরুণরা দিনরাত অবস্থান নেন। এ সময় অনেক স্থানে দূতাবাসের কার্যক্রম অবরুদ্ধ করা হয় এবং বেশ কিছু কূটনৈতিক মিশনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও তার সরকারের প্রতীকী ছবি ও পোস্টার সরিয়ে ফেলার মতো প্রতিবাদী ঘটনাও দেখা যায়।
পেশাজীবীদের একাত্মতা ও এমপিদের চিঠি : কেবল সাধারণ শ্রমিক বা শিক্ষার্থীরাই নন; প্রবাসী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, আইনজীবী, প্রযুক্তিবিদ ও মানবাধিকারকর্মীরা এক হয়ে কাজ শুরু করেন। যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকার সংসদ সদস্য (MP) এবং কংগ্রেস সদস্যদের কাছে প্রবাসীরা হাজার হাজার ই-মেইল ও চিঠি পাঠান। এসব চিঠিতে বাংলাদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে নিজ নিজ দেশের সরকারকে বাংলাদেশের সাবেক সরকারের বিরুদ্ধে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপের দাবি জানানো হয়। অনেক দেশে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যবহারের জন্য রপ্তানি করা অস্ত্র, টিয়ার গ্যাস কিংবা দমন-পীড়ন সামগ্রী স্থগিত করার জন্য আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করা হয়।
ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট ও বিকল্প তথ্যযুদ্ধ
১৮ জুলাই রাত থেকে টানা কয়েকদিন এবং পরবর্তীতে ৫ আগস্টের আগে বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশে সরকার সম্পূর্ণ ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে দেয়। সরকারের লক্ষ্য ছিল দেশের ভেতরে ঘটে চলা দমন-পীড়ন ও হতাহতের খবর যেন আন্তর্জাতিক মিডিয়া এবং বাইরের বিশ্ব জানতে না পারে। কিন্তু প্রবাসীরা দ্রুত সময়ের মধ্যে এক বিকল্প ও শক্তিশালী ‘তথ্য সেনাবাহিনী’ হিসেবে কাজ শুরু করেন।
প্রামাণ্য তথ্য সংগ্রহ ও প্রচার : দেশ পুরোপুরি যোগাযোগবিচ্ছিন্ন হলেও আন্তর্জাতিক ফোনকল, স্যাটেলাইট সংযোগ কিংবা বিশেষ কিছু বিকল্প চ্যানেলে পাওয়া ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অডিও বার্তা, ছবি ও খণ্ড খণ্ড ভিডিও ক্লিপ সংগ্রহ করতে থাকেন প্রবাসী অ্যাক্টিভিস্ট ও প্রবাসের তরুণসমাজ। এরপর ইউকে, ইউএসএ এবং ইউরোপ থেকে পরিচালিত সামাজিক মাধ্যম অ্যাকাউন্ট ও পেজগুলো থেকে সেগুলো দ্রুত অনলাইনে ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
বিবিসি, আলজাজিরা, রয়টার্স, সিএনএন, দ্য গার্ডিয়ান এবং নিউইয়র্ক টাইমসের স্টুডিও এবং সিনিয়র সাংবাদিকদের কাছে প্রবাসীরা সরাসরি বাংলাদেশে চলা বলপ্রয়োগের ভৌগোলিক অবস্থান ও সময় যাচাইকৃত (Geolocated) ভিডিও তথ্য পাঠাতে শুরু করেন। সামাজিক মাধ্যমে #SaveBangladeshiStudents, #StepDownHasina এবং #QuotaReform হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের নজর বাংলাদেশের দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়। দেশের ভেতরের মানুষের কণ্ঠ যখন স্তব্ধ করা হয়েছিল, প্রবাসীরা তখন বাইরে থেকে বিশ্ববাসীর কাছে সেই কণ্ঠস্বর পৌঁছে দিয়েছিলেন।
বিশ্ব গণমাধ্যমে জোরালো কাভারেজ
আন্দোলনকালে বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক মিডিয়াগুলোতে যেসব সংবাদ পরিবেশিত হয়েছে, তার সিংহভাগ তথ্যই প্রাথমিক পর্যায়ে জোগাড় করেছিলেন প্রবাসীরা। নিউইয়র্ক টাইমস, দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট, বিবিসি ওয়ার্ল্ড নিউজ, আলজাজিরা ইংরেজি সার্ভিস এবং এএফপির (AFP) মতো মিডিয়াগুলোতে বাংলাদেশের আন্দোলন প্রতিদিনের প্রধান শিরোনামে রূপ নেয়।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও জাতিসংঘের অবস্থান : বিশ্ব মিডিয়ায় এই লাগাতার কাভারেজের ফলে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক মহলে বড় ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর (US State Dept), ইউরোপীয় ইউনিয়নের বৈদেশিক নীতিবিষয়ক বিভাগ, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (HRW) এবং রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স একের পর এক কঠোর বিবৃতি জারি করতে শুরু করে।
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার টুর্ক বাংলাদেশে মাত্রাতিরিক্ত বলপ্রয়োগ, নির্বিচারে গুলি ও ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের তীব্র সমালোচনা করেন এবং ঘটনার স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের জোর দাবি জানান। আন্তর্জাতিক এই বহুমাত্রিক চাপ সাবেক সরকারের ওপর এক বিরাট কূটনৈতিক সংকট তৈরি করে এবং তাদের বিশ্বমঞ্চে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে।
বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবাদ
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোতে যখন শিক্ষার্থীদের আন্দোলন দমন করার চেষ্টা চলছিল, তখন বিদেশের নামিদামি সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রাঙ্গণ উত্তাল হয়ে ওঠে বাংলাদেশি গবেষক ও শিক্ষার্থীদের সোচ্চার কণ্ঠে।
আইভি লিগ থেকে শুরু করে এশিয়ার সেরা ক্যাম্পাস : যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়, ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (MIT), কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, প্রিন্সটন, যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড, কেমব্রিজ, লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস (LSE), কিংস কলেজ লন্ডন, অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয় এবং প্রতিবেশী ভারতের জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় (JNU) ও দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশি শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা লাগাতার অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন।
ক্যাম্পাসগুলোতে নিয়মিত মোমবাতি প্রজ্বালন, মানববন্ধন, বিক্ষোভ ও আলোচনাসভা অনুষ্ঠিত হয়। তারা স্থানীয় বিদেশি শিক্ষার্থী ও অধ্যাপকদের সামনে বাংলাদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ভয়াবহতা তুলে ধরেন। প্রবাসের শিক্ষার্থীসমাজ বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাবশালী অধ্যাপক, নোবেল বিজয়ী এবং খ্যাতিমান গবেষকদের স্বাক্ষর সংগ্রহ করে যৌথ খোলা চিঠি ও বিবৃতি প্রকাশ করে। এই বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিরোধ আন্তর্জাতিক একাডেমিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের সাধারণ শিক্ষার্থীদের দাবির পক্ষে অত্যন্ত শক্তিশালী একটি বিশ্বজনমত তৈরি করেছিল।
ব্যাংকিং চ্যানেলের বিকল্প পন্থা
‘রেমিট্যান্স শাটডাউন’ চলাকালে দেশে অবস্থানরত পরিবার-পরিজনের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা, খাদ্যপণ্য ক্রয় এবং বিশেষ করে আহতদের জরুরি চিকিৎসা ও হাসপাতালের ব্যয় মেটাতে অর্থনৈতিক লেনদেনের প্রশ্নটি সামনে আসে। অফিশিয়াল ব্যাংকিং চ্যানেল বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তের পর প্রবাসীদের একটি বড় অংশ বিকল্প ও অনানুষ্ঠানিক অর্থ স্থানান্তর প্রক্রিয়ার দিকে নজর দেন।
আইনি বাধ্যবাধকতা ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি জেনেও অনেকে দেশে জরুরি টাকা পাঠাতে প্রথাগত হুন্ডি নেটওয়ার্ক কিংবা ডিজিটাল ব্লকচেইনভিত্তিক পি২পি (Peer-to-Peer) ক্রিপ্টোকারেন্সি (যেমন- USDT বা স্টেবলকয়েন) ব্যবহার করেন। সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোতে প্রবাসী তরুণরা অনানুষ্ঠানিক উপায়ে কীভাবে দেশে স্বজনদের জরুরি তহবিল পাঠানো যায়, তা নিয়ে নানা দিকনির্দেশনা ও টিউটোরিয়াল শেয়ার করতে থাকেন।
যদিও প্রথাগত হুন্ডি বা ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে লেনদেন অনানুষ্ঠানিক ও আইনি কাঠামোর বাইরে, তবে তৎকালীন অবরুদ্ধ প্রেক্ষাপটে সরকারি রিজার্ভে ডলার না পাঠিয়ে কেবল পরিবারের বেঁচে থাকার খরচ পৌঁছে দেওয়াই ছিল তাদের মূল উদ্দেশ্য। প্রবাসীদের এই সিদ্ধান্তে বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থপ্রবাহ হঠাৎ কমে যাওয়ায় তৎকালীন সরকারের অর্থনীতি ও রিজার্ভের ওপর নজিরবিহীন সংকট তৈরি হয়, যা সরকারকে অর্থনৈতিকভাবে চরম কোণঠাসা অবস্থায় নিয়ে যায়।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে স্থবিরতা
জুলাই আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলোতে টানা কয়েকদিনের সম্পূর্ণ ইন্টারনেট বন্ধ রাখা, সান্ধ্য আইন (কারফিউ) জারিকরণ এবং চট্টগ্রাম বন্দরসহ দেশের প্রধান প্রধান সমুদ্র ও স্থলবন্দরের কার্যক্রম অচল হয়ে পড়ার ফলে দেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও সামষ্টিক অর্থনীতি মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।
তৈরি পোশাক খাতে চাপ : বাংলাদেশের প্রধান বৈশ্বিক আয়ের খাত তৈরি পোশাক শিল্পে বায়ারদের ক্রয়াদেশ স্থগিত হওয়ার উপক্রম হয়। এইচঅ্যান্ডএম, জারা, ওয়ালমার্টসহ বিশ্বখ্যাত ইউরোপীয় ও আমেরিকান ব্র্যান্ডগুলো সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে। প্রবাসীরা বিদেশে অবস্থিত এসব বায়িং হাউস ও ব্র্যান্ডগুলোর করপোরেট হেডকোয়ার্টারে ই-মেইল ও চিঠি পাঠিয়ে সার্বিক পরিস্থিতির জন্য তৎকালীন সরকারের ব্যর্থতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনকে দায়ী করে সরকারের ওপর ব্যবসায়িক চাপ সৃষ্টির আবেদন জানান।
বন্দরগুলো অচল থাকা এবং প্রবাসীদের পক্ষ থেকে বাণিজ্যিক চ্যানেলে অর্থ লেনদেন কমিয়ে দেওয়ার কারণে দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য থমকে দাঁড়ায়। এতে একদিকে তৈরি পোশাক খাতের বিদেশি ব্র্যান্ডগুলো যেমন তাদের আদেশ অন্য দেশে সরিয়ে নেওয়ার সংকেত দেয়, অন্যদিকে রেমিট্যান্স পতনের কারণে ডলার সংকট তীব্র রূপ ধারণ করে। সরকারের অর্থনীতিতে তৈরি হওয়া এই অচলাবস্থা রাষ্ট্রযন্ত্র পরিচালনার ভিত্তিকে আরও দুর্বল করে তোলে।
ডিজিটাল মানবাধিকার প্রমাণ সংগ্রহ
দেশের ভেতরে যখন স্বাধীন সাংবাদিকতার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে এবং ইন্টারনেট সেন্সরশিপের কারণে তথ্য প্রকাশ রুদ্ধ করা হয়, তখন প্রবাসী বাংলাদেশিরা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রামাণ্য তথ্যের প্রধান সরবরাহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করেন।
মানবাধিকার সংস্থায় তথ্য নথিভুক্তকরণ : বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি প্রবাসী প্রকৌশলী ও তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা দেশের ভেতর থেকে গোপনে আসা শত শত ভিডিও, ছবি, অডিও রেকর্ড এবং নিহত ও আহতদের তালিকা সংকলন ও যাচাইকরণের দায়িত্ব নেন। তারা ডিজিটাল ফরেনসিক প্রক্রিয়ায় ভিডিওগুলোর সময় ও স্থান নিরূপণ করেন, যাতে পরবর্তীতে কেউ এগুলোকে ‘গুজব’ বা ‘ভুয়া তথ্য’ বলে উড়িয়ে দিতে না পারে।
এই নির্ভুল তথ্য প্রমাণের নথিগুলো অতি দ্রুত অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (HRW), জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশন (OHCHR) এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন আইনজীবী ফোরামের কাছে হস্তান্তর করা হয়। প্রবাসীদের পাঠানো বৈজ্ঞানিকভাবে পরীক্ষিত প্রমাণপত্রের ওপর ভিত্তি করেই আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো তৎকালীন বাংলাদেশ সরকারের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের আনুষ্ঠানিক রিপোর্ট তৈরি করতে সমর্থ হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন দেশে বসবাসকারী প্রবাসীরা নিজ নিজ দেশের জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে নিজ নিজ দেশের সংসদ ভবনে বাংলাদেশে দমন-পীড়নে ব্যবহৃত অস্ত্র রপ্তানি অবিলম্বে স্থগিত করার প্রস্তাব উত্থাপনের জোরালো দাবি জানান।
বিপ্লবের নেপথ্য বাতিঘর তারেক রহমান
২০২৪ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশের মাটিতে যখন ছাত্র-জনতার বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন এক ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের রূপ নিচ্ছিল, তখন সুদূর প্রবাসে নির্বাসিত জীবন কাটিয়েও আন্দোলনের রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন বিএনপির শীর্ষনেতা তারেক রহমান। দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে লন্ডনে অবস্থান করলেও দেশের প্রতিটি রাজনৈতিক স্পন্দন ও জন-আকাক্সক্ষাকে তিনি ধারণ করেছিলেন সুনিপুণ দূরদর্শিতায়। জুলাই বিপ্লবের সেই উত্তাল দিনগুলোতে তার ভার্চুয়াল উপস্থিতি, সময়োপযোগী দিকনির্দেশনা এবং ছাত্র-জনতার প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন ফ্যাসিবাদের পতনকে ত্বরান্বিত করতে নজিরবিহীন অবদান রেখেছিল।
আন্দোলনের শুরু থেকেই যখন রাষ্ট্রীয় শক্তি সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর বর্বর দমন-পীড়ন ও ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট জারি করে সব তথ্য ধামাচাপা দিতে চেয়েছিল, তখন তারেক রহমান প্রবাস থেকেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এক বিশাল প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। তিনি বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা দলীয় নেতাকর্মী, প্রবাসী বুদ্ধিজীবী এবং মানবাধিকারকর্মীদের একতাবদ্ধ করে বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া গণহত্যার সচিত্র প্রমাণ বৈশ্বিক ফোরাম ও জাতিসংঘে তুলে ধরার নির্দেশ দেন। তার এই আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক নেটওয়ার্ক তৎকালীন স্বৈরাচারী শাসকগোষ্ঠীর ওপর চরম বৈশ্বিক চাপ সৃষ্টি করেছিল।
দেশের ভেতরে যখন তীব্র সংকট তখন প্রবাস থেকে পাঠানো বার্তায় তারেক রহমান দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ছাত্র আন্দোলনের পক্ষে রাজপথে নামার জন্য দেশের সর্বস্তরের মানুষকে আহ্বান জানান। তিনি তার দলের ছাত্র ও যুব সংগঠনসহ সাধারণ জনগণকে অহিংস প্রতিরোধ টিকিয়ে রাখার জন্য প্রতিনিয়ত মনস্তাত্ত্বিক সাহস ও কৌশলগত রসদ জুগিয়েছিলেন। তার সেই অবিচল রাজনৈতিক অবস্থানের ফলে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে দেশের আপামর জনতা এক কাতারে এসে দাঁড়িয়েছিল।
৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক বিজয়ের পর এবং পরবর্তীতেও জুলাইয়ের বীর শহীদ ও আহত যোদ্ধাদের সম্মান জানাতে তিনি ছিলেন অগ্রণী। তিনি দ্ব্যর্থহীন কন্ঠে এটাও জানিয়ে দেন, বিজয়ীর কাছে পরাজিতরা নিরাপদ থাকলে বিজয়ের আনন্দ মহিমান্বিত হয়।
ভৌগোলিক দূরত্ব যে একটি দেশের জনগণের মুক্তির লড়াইয়ে কোনো বাধা হতে পারে না, ২০২৪-এর জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে দূর পরবাসে থেকে তারেক রহমানের দেওয়া দূরদর্শী নেতৃত্ব ও দিকনির্দেশনা তারই এক অনন্য ও অবিনশ্বর ইতিহাস।
Reporter Name 
























