ঢাকা ১২:২৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
মিঠামইনের ওসি মনোয়ারের সাফল্যের দীপ্তিতে আক্ষেপের ছায়া ব্যাটারিচালিত তিন-চাকার যান হঠাৎ বন্ধ নয়, নীতিমালার আওতায় আসছে: প্রতিমন্ত্রী সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকার পরিশোধিত জ্বালানি তেল কিনছে সরকার মির্জা আব্বাসের সময়োপযোগী সতর্কবার্তা ‘আমলারা সবাই চোর’ কাণ্ডজ্ঞানহীন বক্তব্য কেন শাকিবের দুই স্ত্রী অপু-বুবলীকে নিয়ে যা বললেন নূতন ‘আলহামদুলিল্লাহ’—বার্সায় যোগ দিয়ে শুকরিয়া আদায় হামজার মালয়েশিয়া গেলেন মির্জা আব্বাস একাদশে ভর্তির প্রথম ধাপের ফল প্রকাশ, জানবেন যেভাবে সৌরবিদ্যুতে ঋণ দিতে ৩ প্রতিষ্ঠানকে দেড় হাজার কোটি টাকা দিচ্ছে সরকার ‘ইনশা আল্লাহ’ বলায় পশ্চিমবঙ্গে আইপিএস কর্মকর্তা বদলি, বিতর্ক

মিঠামইনের ওসি মনোয়ারের সাফল্যের দীপ্তিতে আক্ষেপের ছায়া

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১০:৪৩:০১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ৩৮ বার

রফিকুল ইসলামঃ জল ও জীবনের কাব্য এবং এক রুদ্র প্রহরীর আগমন যেখানে দিগন্ত বিস্তৃত জলরাশি আকাশের নীল সীমানাকে আলতো করে ছুঁয়ে যায়, যেখানে মেঘের ছায়া জলের বুকে তৈরি করে এক অলৌকিক ক্যানভাস, সেই কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলা কেবল কোনো ভৌগোলিক মানচিত্রের অংশ নয়—এটি এক জীবন্ত ও শ্বাশত মহাকাব্য।

বর্ষায় সাগরের মতো উত্তাল, তরঙ্গে তরঙ্গে ক্ষুব্ধ আর শুকনা মৌসুমে মাইলের পর মাইল ধূ ধূ সবুজ ধানের প্রান্তর। এই বৈপরীত্যের মধ্যেই যুগ যুগ ধরে বেঁচে রয়েছে হাওরবাসীর সরল ও জীবনসংগ্রামী মানুষ। প্রকৃতি যেমন এখানে অকৃপণভাবে রূপ ঢেলে দিয়েছে, তেমনই দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থান এই অঞ্চলকে করে তুলেছিল অপরাধীদের এক নিরাপদ অভয়ারণ্য।

যখনই নিঝুম রাতের অন্ধকারে হাওরের বুকে বাতাস তীব্র গতিতে বয়ে যেত, তখন সেই বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দের সাথে মিশে থাকত এক অব্যক্ত আতঙ্ক। মাঝ-হাওরে লাশবাহী ও পণ্যবাহী ট্রলারের মাঝি, ট্রলারের যাত্রী কিংবা সাধারণ মৎস্যজীবীদের বুকের ভেতর দুরুদুরু কাঁপন উঠত। অমাবস্যার আঁধারে ডাকাতদের দেশীয় অস্ত্রের ঝিলিক আর হুঙ্কার গ্রাস করত গ্রামীণ জনপদের শান্তি।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাধারণ টহল বা নজরদারি যেখানে হাওরের বিশাল ঢেউয়ের কাছে প্রায়শই থমকে যেত, ঠিক সেই ক্রান্তিলগ্নে কিশোরগঞ্জের মিঠামইন থানার হাল ধরলেন এক নির্ভীক ও আপসহীন পুলিশ কর্মকর্তা—অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মনোয়ার মোহাম্মদ।

তার এই আগমন কেবল একটি নিয়মিত বদলি বা প্রশাসনিক রদবদল ছিল না; তা ছিল শোষিত, জিম্মি ও আতঙ্কিত হাওরবাসীর বুকে এক নতুন ভোরের আস্বাদ, এক পরম শান্তির আশ্বাস। যার দুচোখে ছিল ন্যায়ের প্রদীপ্ত শিখা আর হৃদয়ে ছিল অপরাধের অন্ধকারকে সমূলে উপড়ে ফেলার বজ্রকঠিন প্রতিজ্ঞা; সেই রুদ্র প্রহরীর কর্মনিষ্ঠার আলোয় ধুয়ে যেতে শুরু করল ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রামের সমস্ত কলঙ্ক।

তিনি একদিকে যেমন সাধারণ মানুষের জন্য অত্যন্ত ‘জনবান্ধব’ ও কোমল, অন্যদিকে অপরাধীদের দমনে ততটাই ‘কঠোর’ ও আপসহীন। সমসাময়িক পুলিশিং সংস্কারের এই যুগে তিনি আইনি সেবাকে সরাসরি জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে এক অনন্য ভূমিকা পালন করছেন।

মিঠামইনের বিশাল জলরাশি যখন রূপালী চাদর বিছিয়ে শান্ত থাকে, তখন বোঝার উপায় থাকে না যে এর তলে কতটা নৃশংসতার জাল বোনা হতে পারে। ভৌগোলিক দুর্গমতার পূর্ণ সুযোগ নিয়ে সংঘবদ্ধ ডাকাত দল গভীর রাতে হানা দিত মাঝ-হাওরে। কোনো সাধারণ ইঞ্জিনচালিত নৌকা যখন যাত্রী নিয়ে শহরের দিকে রওনা হতো কিংবা জেলেরা যখন সারাদিনের ক্লান্তি শেষে জাল গুটিয়ে ফিরত, তখন জলের বুক চিরে কালনাগিনীর মতো ধেয়ে আসত ডাকাত বা জলদস্যুদের দ্রুতগামী নৌকা। অস্ত্রের মুখে সর্বস্ব কেড়ে নেওয়া, ট্রলারের আরোহীদের জখম করা এবং অনেক সময় নির্মমভাবে অথৈ জলে ছুড়ে ফেলার মতো পৈশাচিক ঘটনা হাওরের নৈমিত্তিক ট্র্যাজেডিতে পরিণত হয়েছিল। সাধারণ মানুষ থানায় আসার সাহস পেত না, কারণ পথ দুর্গম এবং অপরাধীদের জাল ছিল অনেক গভীরে বিস্তৃত।

ওসি মনোয়ার মোহাম্মদ দায়িত্ব গ্রহণ করেই বুঝতে পেরেছিলেন, টেবিল-চেয়ারে বসে কিংবা চার দেয়ালের ভেতর থেকে এই হাওরকে শৃঙ্খলার মধ্যে আনা অসম্ভব। তিনি নিজে মাঠপর্যায়ে নামার সিদ্ধান্ত নিলেন। জেলা পুলিশ সুপারের নির্দেশে তার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনায় গঠিত হলো বিশেষ স্পিডবোট ও ট্রলার স্কোয়াড। মধ্যরাতে যখন পুরো মিঠামইন নিঝুম শান্তিতে ঘুমিয়ে থাকে, যখন আকাশের মেঘের আড়ালে চাঁদ মুখ লুকায়, তখন পুলিশের এই বিশেষ দল নিয়ে উত্তাল হাওরে ভেসে পড়তেন ওসি মনোয়ার মোহাম্মদ। বর্ষার ভয়ঙ্কর ঝড়েও তার এই রুটিন থমকে যায়নি। অপরাধীদের গোপন আস্তানা আর গভীর জলপথের সংযোগস্থলগুলোতে শুরু হলো অতর্কিত হানা।

পুলিশের এই আক্রমণ ছিল যেন হাওরের বুকে কালবৈশাখীর ঝড়ের মতো। ডাকাতদের স্বর্গ সাম্রাজ্যে এর আগে এমন সরাসরি এবং প্রাণঘাতী আঘাত কেউ হানতে দেখেনি কেউ। একের পর এক কুখ্যাত ডাকাত দল কোণঠাসা হতে শুরু করল। ওসি মনোয়ার মোহাম্মদের রণকৌশলের কাছে পরাস্ত হয়ে কেউ কেউ গ্রেপ্তার কেউবা এলাকা ছাড়লো। ডাকাতদের বড় বড় আস্তানা গুঁড়িয়ে দিয়ে সেখান থেকে উদ্ধার করা হলো বিপুল পরিমাণ দেশীয় ও আগ্নেয়াস্ত্র।

যে হাওরের জলে একদা রক্তের দাগ মিশে যেত, সেই জলের বুক এখন মাঝরাতে ডাকাতদের ত্রাস থেকে মুক্ত। ঢেউয়ের গর্জনের চেয়েও এখন বড় হয়ে উঠেছে এই রুদ্র প্রহরীর সাহসিকতার অভয় বাণী।

একটি সমাজকে ধ্বংস করার জন্য অস্ত্রের চেয়েও মারাত্মক অস্ত্র হলো মাদক। মিঠামইনের দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থান এবং নৌপথের সহজ লভ্যতাকে কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ চোরাকারবারিরা এই অঞ্চলকে মাদকের একটি ট্রানজিট রুট হিসেবে গড়ে তোলার অপচেষ্টা চালাচ্ছিল। ভারতের সীমান্ত অঞ্চল কিংবা দেশের বড় বড় মাদক পয়েন্ট থেকে অভিনব কায়দায় নৌকার তলদেশে বা মাটির নিচে লুকিয়ে মাদক প্রবেশ করছিল হাওরের জনপদে। এর ফলে ধ্বংসের মুখে পড়ছিল হাওরের অমিত সম্ভাবনাময় তরুণ সমাজ। ঘরে ঘরে শুরু হয়েছিল পারিবারিক অশান্তি আর মাদক সেবনের টাকা জোগাড় করতে গিয়ে ডাকাতিসহ চুরি ও ছিনতাইয়ের ঘটনা জ্যামিতিক হারে বাড়ছিল।

এই মরণব্যাধির বিরুদ্ধে ওসি মনোয়ার মোহাম্মদ ঘোষণা করলেন ‘জিরো টলারেন্স’ বা শূন্য সহনশীলতা নীতি। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, মাদকের সাথে জড়িত কোনো ব্যক্তি, সে যতই প্রভাবশালী বা রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকুক না কেন, তাকে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।

শুরু হলো ইতিহাসের অন্যতম কঠোর মাদকবিরোধী সাঁড়াশি অভিযান। রাতের অন্ধকারে দুর্গম হাওরাঞ্চলের ঝোপঝাড়, নদীর পাড় ও প্রত্যন্ত গ্রামের মাদক স্পটগুলোতে হানা দেওয়া শুরু করল ওসি মনোয়ার মোহাম্মদের নেতৃত্ব পুলিশ বাহিনী।

তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার এবং নিজস্ব বিশ্বস্ত সোর্স নেটওয়ার্ক গড়ে তুলে একের পর এক মাদকের বড় বড় চালান জব্দ করতে লাগলেন তিনি। শত শত কেজি গাঁজা, হাজারো বোতল ফেনসিডিল ও মরণঘাতী ইয়াবার চালানসহ আটক হতে লাগল কুখ্যাত সব মাদক ব্যবসায়ী ও মাদকসেবিরা। বহু পরিবার যখন তাদের সন্তানদের অন্ধকার ভবিষ্যতের কথা ভেবে দিশেহারা ছিল, তখন ওসি মনোয়ার মোহাম্মদের এই আপসহীন ভূমিকা তাদের জীবনে আশার আলো জ্বালল। মিঠামইনের প্রতিটি পাড়ায়, প্রতিটি চায়ের দোকানে এখন অনেকটা মাদকের আড্ডা উধাও। মাদক কারবারিরা আজ এলাকা ছেড়ে পলাতক অথবা শ্রীঘরের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে দিন গুনছে। যুবসমাজকে অন্ধকারের অতল গহ্বর থেকে আলোর পথে ফিরিয়ে আনার এই মানবিক লড়াইয়ে ওসি মনোয়ার মোহাম্মদ নিজেকে একজন সমাজ সংস্কারক হিসেবে প্রমাণ করেছেন।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ক্ষেত্রে মিঠামইনে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় পরীক্ষাটি এসেছিল উপজেলা বিএনপির সভাপতি জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীর হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডটি পুরো এলাকায় তীব্র উত্তেজনা, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সাধারণ মানুষের মনে চরম ভীতি তৈরি করেছিল। এমন একটি স্পর্শকাতর ঘটনায় গ্রামীণ দাঙ্গা বা প্রতিশোধমূলক সহিংসতার দাবানল জ্বলে ওঠা ছিল সময়ের ব্যাপার মাত্র। এলাকার শান্তিপ্রিয় মানুষেরা যখন আশঙ্কা করছিলেন যে মিঠামইন হয়তো আবারও রক্তাক্ত লাঠিয়াল ও পেশিশক্তির লড়াইয়ের ময়দানে পরিণত হতে যাচ্ছে, ঠিক তখনই বুক চিতিয়ে দাঁড়ালেন ওসি মনোয়ার মোহাম্মদ।

হত্যাকাণ্ডের পরমুহূর্ত থেকেই তিনি রাজনৈতিক বা সামাজিক কোনো ধরনের চাপের কাছে নতিস্বীকার করেননি। তার প্রথম ও একমাত্র লক্ষ্য ছিল—আইন সবার জন্য সমান এবং অপরাধীর কোনো সুনির্দিষ্ট পরিচয় নেই; অপরাধী কেবলই অপরাধী। তার তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তা এবং প্রত্যক্ষ নির্দেশনায় পুরো উপজেলা জুড়ে শুরু হলো এক নজিরবিহীন ও সাঁড়াশি অভিযান। পুলিশ দিন-রাত এক করে প্রতিটি সন্দেহভাজন এলাকায় হানা দিল। ওসির স্পষ্ট বক্তব্য ছিল, ঘটনার মূল হোতা ও পরিকল্পনাকারীদের যতক্ষণ না আইনের আওতায় আনা হচ্ছে, ততক্ষণ পুলিশের এই লড়াই থামবে না।

চমকপ্রদ তদন্ত কৌশল এবং নির্ভুল তথ্যের ভিত্তিতে একের পর এক মূল আসামিকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হলেন ওসি মনোয়ার মোহাম্মদ। এই চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলায় একে একে মোট ১৩ জন আসামিকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়। এর ফলে এলাকা জুড়ে যে অস্থিরতার মেঘ জমেছিল, তা নিমেষেই কেটে গেল।

ওসির এই কঠোর ও নিরপেক্ষ অবস্থানের কারণে মিঠামইনে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর সহিংসতা বা প্রতিশোধমূলক পাল্টা হামলা ঘটতে পারেনি। সাধারণ মানুষ দেখল, কীভাবে আইনি শক্তির সঠিক প্রয়োগের মাধ্যমে সমাজে ন্যায়ের শাসন প্রতিষ্ঠা করা যায় এবং অপরাধীদের মনে আইনের প্রতি ভয় তৈরি করা যায়।

একজন দক্ষ পুলিশ অফিসারের সার্থকতা কেবল অপরাধী দমনেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং তা প্রকাশ পায় সাধারণ মানুষের মনে কতটা নিরাপত্তা ও আস্থার জায়গা তিনি তৈরি করতে পেরেছেন তার ওপর।

ওসি মনোয়ার মোহাম্মদ সেই বিরল গুণের অধিকারী, যিনি লাঠির শাসন আর অস্ত্রের গর্জন দিয়ে নয়, বরং তার মানবিকতা, সততা ও অমায়িক ব্যবহার দিয়ে মিঠামইনের মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছেন। তিনি থানাকে একটি ভয়ের জায়গা থেকে সাধারণ মানুষের শেষ আশ্রয়স্থলে পরিণত করেছেন।

তার কার্যালয়ের দরজা সবসময় খোলা থাকে সমাজের সবচেয়ে সুবিধাবঞ্চিত অসহায় মানুষটির জন্য। এমনকি মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা থেকে তিনি থানায় বীর মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য একটি বিশেষ সম্মানজনক আসনের ব্যবস্থা করেছেন, যা তার উন্নত মানসিকতা ও দেশপ্রেমেরই বহিঃপ্রকাশ।

অপরাধীদের কাছে যিনি সাক্ষাৎ যমদূত, সাধারণ মানুষের কাছে তিনি ততটাই কোমল ও ভরসার প্রতীক। সামাজিক যেকোনো বিরোধ বা জটিলতা তিনি তাঁর দূরদর্শিতা দিয়ে আদালতের বাইরেই সুষ্ঠু মীমাংসা করে দিয়েছেন, যার ফলে গ্রামীণ হানাহানি অনেকটাই কমে এসেছে।

মহাকালের নিয়মে মানুষ আসে এবং মানুষ চলে যায়, কিন্তু তাদের কীর্তি থেকে যায় ইতিহাসের পাতায়। কিশোরগঞ্জের মিঠামইন হাওরের উত্তাল জলতরঙ্গে আর ধূ ধূ ফসলি মাঠের বাতাসে ওসি মনোয়ার মোহাম্মদের নাম আজ একটি বিশেষ শ্রদ্ধার আসনে অধিষ্ঠিত। তিনি প্রমাণ করেছেন, সদিচ্ছা, সততা আর অসীম সাহস থাকলে যেকোনো দুর্গম ও অপরাধপ্রবণ অঞ্চলকেও শান্তির নীড়ে রূপান্তর করা সম্ভব।

তার হাত ধরে মিঠামইন আজ অনেকটা ডাকাতমুক্ত, মাদকমুক্ত এবং এক শান্তিময় জনপদ। জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীর হত্যাকাণ্ডের মতো জটিল ও সংবেদনশীল ঘটনার সফল ও দ্রুততম তদন্তের মাধ্যমে তিনি পুলিশের প্রতি জনগণের আস্থা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছেন। ওসি মনোয়ার মোহাম্মদ কেবল একজন সরকারি কর্মকর্তা নন, তিনি মিঠামইনের হাওরের এক রুদ্র প্রহরী, এক আধুনিক ট্রয়লান বীর।

হাওরের জল যতদিন বইবে, যতদিন মাঝিরা গান গাইবে নির্ভয়ে নদীর বুকে, ততদিন এই নির্ভীক প্রহরীর সফলতার গল্প কিশোরগঞ্জের ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে খোদাই করা থাকবে। তার শৌর্য ও শান্তির এই মহাকাব্য আগামী প্রজন্মের পুলিশ কর্মকর্তাদের জন্য এক অনন্ত অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।

কেননা, এমন একটি দুর্গম অঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং সাধারণ মানুষের মনে পুলিশের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত কঠিন কাজ। আর এই কঠিন কাজটিকেই অত্যন্ত সহজ ও মানবিক করে তুলেছেন মিঠামইন থানার ওসি মনোয়ার মোহাম্মদ।

সাফল্যের দীপ্তিতে আক্ষেপের ছায়া:

সাফল্যের দীপ্তিতে আক্ষেপ ও বিহাগের করুণ সুর ডানা মেলছে। চরম বাস্তবতার নির্মম পরিহাস হলো, এতসব প্রশংসনীয় এবং জনমুখী অর্জনের পরও কাজের যথাযোগ্য স্বীকৃতিস্বরূপ বিভাগীয় বা সরকারিভাবে কোনো রাষ্ট্রীয় পদক কিংবা বিশেষ পুরস্কার এখনো ওসি মনোয়ার মোহাম্মদের ভাগ্যে জুটেনি।

একজন নিষ্ঠাবান পুলিশ অফিসারের কাছে মাঠপর্যায়ের কঠোর ডিউটি ও সামাজিক দায়িত্ব পালনের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা হলো প্রাতিষ্ঠানিক ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। দিন-রাত এক করে, পরিবার-পরিজনের সান্নিধ্য দূরে ঠেলে যখন একজন মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা সমাজকে নিরাপদ করার ও বদলে দেওয়ার লড়াই করেন, তখন সরকারি পুরস্কার কিংবা পদক কেবল একটি মেডেল হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা হয়ে ওঠে তার সততা, নিষ্ঠা, সাহসিকতা ও ত্যাগের এক সর্বোচ্চ প্রাতিষ্ঠানিক দলিল, যা তার পেশাগত আত্মবিশ্বাসকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

কিন্তু দুঃখজনকভাবে, হাওরের জল-কাদায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করা এই পুলিশ কর্মকর্তার কপালে সেই বহু আকাঙ্ক্ষিত মূল্যায়ন জুটেনি।

তবে পেশাগত জীবনের এই গৌরবময় সফলতার পাশাপাশি তার কাজের পেছনে লুকিয়ে রয়েছে কিছু গভীর আক্ষেপ, যা একজন নিষ্ঠাবান পুলিশ অফিসারের ভেতরের মানবিক সত্ত্বাকে উন্মোচন করে।

ওসি মনোয়ার মোহাম্মদ সাড়ে সাত কোটি টাকা মূল্যের কয়েক লক্ষ পিস ইয়াবা জব্দ করার এক মামলার ঘটনায়
গত ১৫ই সেপ্টেম্বর ঢাকা দায়রা জজ আদালত ৮ -এ এসেছিলেন সাক্ষী দিতে। ওইদিন ভঙ্গুর হৃদয়ে একটি ফেসবুক পোস্ট দেন তিনি।

তাতে তিনি লেখেন, পেশার প্রতি নিবেদিতপ্রাণ সত্ত্বেও ওই ঘটনায় উল্লেখ করার মতো জাতীয় পর্যায়ে পুরস্কৃত হতে পারেননি।

তিনি উল্লেখ করেন, কিশোরগঞ্জের ইটনা থানায় ওসি হিসেবে কাজ করার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পাওয়া মাসে সাহসিকতার সাথে অনেক জননিরাপত্তা ও জনসেবা প্রদানকারী কার্যক্রম গ্রহণের মাধ্যমে নিজেকে শুধু যোগ্যই নয় অধিকন্তু নিজেকে নির্লোভ ও বিনয়ী হিসেবে প্রমাণ করতে পেরেছি বলে নিজে নিজে ভুল ভেবে থাকলেও ওই মাসে মাত্র ৭ দিন কাজ করেই তখনকার নব্য নিয়োগকৃত যোগ্য ওসি ঠিকই জেলার শ্রেষ্ঠ ওসি হিসেবে বিবেচিত হয়েছিলেন!

তার আক্ষেপের যেন শেষ নেই। তাই লেখেন, আসলে পুরস্কার পাওয়ার মতো যোগ্যতা আমার হয়তো এখনো অর্জিত হয়নি, আর এ জীবনে হবে বলে মনেও হয় না।

ওসি মনোয়ার মোহাম্মদ সপরিবার মিঠামইন বাস করলেও
তাদেরকে বঞ্চিত করে দিনের পর দিন থানায় আগত সেবা প্রার্থীদের কথা শুনে গেছেন। উজানে বেড়ে ওঠা মানুষটি অপরিচিত হাওরের উত্তাল ঢেউ আর সশস্ত্র ডাকাতদের আক্রমণের ভয় ও ঝড়-তুফান উপেক্ষা করে বৃষ্টিতে ভিজে আর খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে অভুক্ত থেকে রাতের পর রাত হাওরের সীমাহীন জলরাশির উপরেই ডিংগি নৌকায় ভেসে ভেসে কাটিয়েছেন।

এতে স্ত্রী-সন্তানদেরকে সময় না দিতে দিতে ওদের কাছে নিজেকে অপ্রয়োজনীয়, অযোগ্য আর নিজেকে একজন অপরিচিত মানুষে পরিণত করে তুলেছেন তিনি।

নৈসর্গিক হাওরের সৌন্দর্য দেখতে রাজধানী ঢাকা-সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে অতিরিক্ত ডিউটি করার কারণে স্ত্রী-সন্তানদের রূপসী হাওরটাকে পর্যন্ত দেখাতে পারেননি; না পেরেছেন ইটনার ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ উপভোগের সুযোগ। অথচ যেদিন মিঠামইন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা-সহ জেলার সকল কর্তাব্যক্তি এবং সমগ্র হাওর অঞ্চলের আপামর জনগণ আনন্দ-উল্লাসে মত্ত ছিলেন, সেদিন তিনি ও তার পরিবার কেন যাননি – তা কেবল সশস্ত্র ডাকাতদলই ভালো জানবে!

এছাড়া হাওরের পরিবেশ ডাকাত বিহীন ও নিরাপদ করতে লাখো-কোটি মানুষের কাতারে সামিল না হয়ে বিশ্বকাপ ফুটবল ফাইনাল খেলা দেখা হতে নিজেকে ও পরিবারকে বঞ্চিত করে ওই রাতটাও হাওরের জলরাশিতে ডিউটিতে কাটাতে হয়েছে তার।

এমনকি ফেসবুক লাইভে ওই রাতের পুরোটা সময় জুড়ে তার ও তার ফোর্সের নৌ টহল জনতাকে দেখিয়ে জনগণকে নিরাপত্তার সর্বোচ্চ বার্তা আর অনুভূতি দিতে সচেষ্ট থেকেছেন। এর মাঝে একধরনের সুখ ও আত্মতৃপ্তি অনুভব করেছেন তিনি।

ওসি মনোয়ার মোহাম্মদের আক্ষেপ, দিন দেশে কেবলই তিনি কামলা। এই বিশেষ আক্ষেপটি কেবল একজন ব্যক্তির ক্ষোভ কিংবা মান-অভিমান নয়; বরং তা মাঠপর্যায়ে দিনরাত পরিশ্রম করা যোগ্য ও সৎ কর্মকর্তাদের মূল্যায়নের ক্ষেত্রে আমাদের প্রচলিত আমলাতান্ত্রিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার এক প্রচ্ছন্ন উদাসীনতা এবং কাঠামোগত দুর্বলতাকেই আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।

প্রায়শই দেখা যায়, প্রচারের আলোয় থাকা কিংবা সমতলের সুবিধাজনক স্থানে দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ কর্মকর্তারা দ্রুত লাইমলাইটে চলে আসেন এবং পুরস্কারের তালিকায় জায়গা করে নেন। অথচ হাওরের মতো চরম প্রতিকূল অঞ্চলে যারা আড়ালে থেকে নিরলসভাবে সমাজকে শান্ত ও নিরাপদ রাখতে লড়াই চালিয়ে যান, তাদের শ্রম অনেক সময় নথিপত্রের আড়ালেই চাপা পড়ে থাকে।

বিভাগীয় এই অবহেলা এবং রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিহীনতার গভীর আক্ষেপ বুকে চেপেও ওসি মনোয়ার মোহাম্মদ অবশ্য তার মূল দায়িত্ব থেকে এক চুলও বিচ্যুত হননি। নিজের ভেতরের এই নীরব বেদনাকে একপাশে সরিয়ে রেখে তিনি প্রতিদিন নিয়ম করে লড়ে যাচ্ছেন হাওরের প্রতিটি মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য, দালালি প্রথা উচ্ছেদ করে সাধারণ মানুষের সরাসরি আইনি সেবা নিশ্চিত করতে।

সরকারি কোনো মেডেল বা কাগজের সনদ তার ভাগ্যে না জুটলেও, সাধারণ মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসা আর বীর মুক্তিযোদ্ধাদের চোখেমুখে ফুটে ওঠা পরম শ্রদ্ধাবোধই আজ তাকে এক অনন্য সম্মানের আসনে বসিয়েছে। এই নীরব আক্ষেপ জয় করে সাধারণ মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নেওয়ার এই যে অনন্য গৌরব, তা প্রাতিষ্ঠানিক যেকোনো পুরস্কার বা মেডেলের চেয়েও অনেক বড় মর্যাদায় তাকে আসীন করেছে।

অবশ্য এ কথা চিরন্তন যে, মানুষের কাজের ভেতরগত প্রেরণা বড় ভূমিকা রাখলেও, বাহ্যিক স্বীকৃতি বা পুরস্কার কাজের গতি টিকিয়ে রাখতে অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। এর অনুপস্থিতি হতাশা তৈরি করে।

পুনর্বলন তত্ত্বে মনোবিজ্ঞানে বিএফ স্কিনারের মতে, ইতিবাচক কাজের উপযুক্ত মূল্যায়ন বা পুরস্কার না পেলে সেই কাজের পুনরাবৃত্তি বা প্রচেষ্টা ধীরে ধীরে হ্রাস পায়।
একটানা ঝুঁকি নিয়ে বা সফলভাবে দায়িত্ব পালনের পর যখন কোনো মূল্যায়ন মেলে না, তখন মস্তিষ্কে এক ধরনের মানসিক ক্লান্তি বা ‘বার্নআউট’ তৈরি হয়। কর্মী যখন মনে করেন যে তার কাজের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক মূল্য নেই, তখন তার ভেতর থেকে কাজের প্রতি আন্তরিকতা ও দায়বোধ কমতে শুরু করে।

লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও কলামিস্ট;
সহযোগী সম্পাদক, আজকের সূর্যোদয়, ঢাকা

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

মিঠামইনের ওসি মনোয়ারের সাফল্যের দীপ্তিতে আক্ষেপের ছায়া

মিঠামইনের ওসি মনোয়ারের সাফল্যের দীপ্তিতে আক্ষেপের ছায়া

আপডেট টাইম : ১০:৪৩:০১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রফিকুল ইসলামঃ জল ও জীবনের কাব্য এবং এক রুদ্র প্রহরীর আগমন যেখানে দিগন্ত বিস্তৃত জলরাশি আকাশের নীল সীমানাকে আলতো করে ছুঁয়ে যায়, যেখানে মেঘের ছায়া জলের বুকে তৈরি করে এক অলৌকিক ক্যানভাস, সেই কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলা কেবল কোনো ভৌগোলিক মানচিত্রের অংশ নয়—এটি এক জীবন্ত ও শ্বাশত মহাকাব্য।

বর্ষায় সাগরের মতো উত্তাল, তরঙ্গে তরঙ্গে ক্ষুব্ধ আর শুকনা মৌসুমে মাইলের পর মাইল ধূ ধূ সবুজ ধানের প্রান্তর। এই বৈপরীত্যের মধ্যেই যুগ যুগ ধরে বেঁচে রয়েছে হাওরবাসীর সরল ও জীবনসংগ্রামী মানুষ। প্রকৃতি যেমন এখানে অকৃপণভাবে রূপ ঢেলে দিয়েছে, তেমনই দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থান এই অঞ্চলকে করে তুলেছিল অপরাধীদের এক নিরাপদ অভয়ারণ্য।

যখনই নিঝুম রাতের অন্ধকারে হাওরের বুকে বাতাস তীব্র গতিতে বয়ে যেত, তখন সেই বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দের সাথে মিশে থাকত এক অব্যক্ত আতঙ্ক। মাঝ-হাওরে লাশবাহী ও পণ্যবাহী ট্রলারের মাঝি, ট্রলারের যাত্রী কিংবা সাধারণ মৎস্যজীবীদের বুকের ভেতর দুরুদুরু কাঁপন উঠত। অমাবস্যার আঁধারে ডাকাতদের দেশীয় অস্ত্রের ঝিলিক আর হুঙ্কার গ্রাস করত গ্রামীণ জনপদের শান্তি।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাধারণ টহল বা নজরদারি যেখানে হাওরের বিশাল ঢেউয়ের কাছে প্রায়শই থমকে যেত, ঠিক সেই ক্রান্তিলগ্নে কিশোরগঞ্জের মিঠামইন থানার হাল ধরলেন এক নির্ভীক ও আপসহীন পুলিশ কর্মকর্তা—অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মনোয়ার মোহাম্মদ।

তার এই আগমন কেবল একটি নিয়মিত বদলি বা প্রশাসনিক রদবদল ছিল না; তা ছিল শোষিত, জিম্মি ও আতঙ্কিত হাওরবাসীর বুকে এক নতুন ভোরের আস্বাদ, এক পরম শান্তির আশ্বাস। যার দুচোখে ছিল ন্যায়ের প্রদীপ্ত শিখা আর হৃদয়ে ছিল অপরাধের অন্ধকারকে সমূলে উপড়ে ফেলার বজ্রকঠিন প্রতিজ্ঞা; সেই রুদ্র প্রহরীর কর্মনিষ্ঠার আলোয় ধুয়ে যেতে শুরু করল ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রামের সমস্ত কলঙ্ক।

তিনি একদিকে যেমন সাধারণ মানুষের জন্য অত্যন্ত ‘জনবান্ধব’ ও কোমল, অন্যদিকে অপরাধীদের দমনে ততটাই ‘কঠোর’ ও আপসহীন। সমসাময়িক পুলিশিং সংস্কারের এই যুগে তিনি আইনি সেবাকে সরাসরি জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে এক অনন্য ভূমিকা পালন করছেন।

মিঠামইনের বিশাল জলরাশি যখন রূপালী চাদর বিছিয়ে শান্ত থাকে, তখন বোঝার উপায় থাকে না যে এর তলে কতটা নৃশংসতার জাল বোনা হতে পারে। ভৌগোলিক দুর্গমতার পূর্ণ সুযোগ নিয়ে সংঘবদ্ধ ডাকাত দল গভীর রাতে হানা দিত মাঝ-হাওরে। কোনো সাধারণ ইঞ্জিনচালিত নৌকা যখন যাত্রী নিয়ে শহরের দিকে রওনা হতো কিংবা জেলেরা যখন সারাদিনের ক্লান্তি শেষে জাল গুটিয়ে ফিরত, তখন জলের বুক চিরে কালনাগিনীর মতো ধেয়ে আসত ডাকাত বা জলদস্যুদের দ্রুতগামী নৌকা। অস্ত্রের মুখে সর্বস্ব কেড়ে নেওয়া, ট্রলারের আরোহীদের জখম করা এবং অনেক সময় নির্মমভাবে অথৈ জলে ছুড়ে ফেলার মতো পৈশাচিক ঘটনা হাওরের নৈমিত্তিক ট্র্যাজেডিতে পরিণত হয়েছিল। সাধারণ মানুষ থানায় আসার সাহস পেত না, কারণ পথ দুর্গম এবং অপরাধীদের জাল ছিল অনেক গভীরে বিস্তৃত।

ওসি মনোয়ার মোহাম্মদ দায়িত্ব গ্রহণ করেই বুঝতে পেরেছিলেন, টেবিল-চেয়ারে বসে কিংবা চার দেয়ালের ভেতর থেকে এই হাওরকে শৃঙ্খলার মধ্যে আনা অসম্ভব। তিনি নিজে মাঠপর্যায়ে নামার সিদ্ধান্ত নিলেন। জেলা পুলিশ সুপারের নির্দেশে তার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনায় গঠিত হলো বিশেষ স্পিডবোট ও ট্রলার স্কোয়াড। মধ্যরাতে যখন পুরো মিঠামইন নিঝুম শান্তিতে ঘুমিয়ে থাকে, যখন আকাশের মেঘের আড়ালে চাঁদ মুখ লুকায়, তখন পুলিশের এই বিশেষ দল নিয়ে উত্তাল হাওরে ভেসে পড়তেন ওসি মনোয়ার মোহাম্মদ। বর্ষার ভয়ঙ্কর ঝড়েও তার এই রুটিন থমকে যায়নি। অপরাধীদের গোপন আস্তানা আর গভীর জলপথের সংযোগস্থলগুলোতে শুরু হলো অতর্কিত হানা।

পুলিশের এই আক্রমণ ছিল যেন হাওরের বুকে কালবৈশাখীর ঝড়ের মতো। ডাকাতদের স্বর্গ সাম্রাজ্যে এর আগে এমন সরাসরি এবং প্রাণঘাতী আঘাত কেউ হানতে দেখেনি কেউ। একের পর এক কুখ্যাত ডাকাত দল কোণঠাসা হতে শুরু করল। ওসি মনোয়ার মোহাম্মদের রণকৌশলের কাছে পরাস্ত হয়ে কেউ কেউ গ্রেপ্তার কেউবা এলাকা ছাড়লো। ডাকাতদের বড় বড় আস্তানা গুঁড়িয়ে দিয়ে সেখান থেকে উদ্ধার করা হলো বিপুল পরিমাণ দেশীয় ও আগ্নেয়াস্ত্র।

যে হাওরের জলে একদা রক্তের দাগ মিশে যেত, সেই জলের বুক এখন মাঝরাতে ডাকাতদের ত্রাস থেকে মুক্ত। ঢেউয়ের গর্জনের চেয়েও এখন বড় হয়ে উঠেছে এই রুদ্র প্রহরীর সাহসিকতার অভয় বাণী।

একটি সমাজকে ধ্বংস করার জন্য অস্ত্রের চেয়েও মারাত্মক অস্ত্র হলো মাদক। মিঠামইনের দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থান এবং নৌপথের সহজ লভ্যতাকে কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ চোরাকারবারিরা এই অঞ্চলকে মাদকের একটি ট্রানজিট রুট হিসেবে গড়ে তোলার অপচেষ্টা চালাচ্ছিল। ভারতের সীমান্ত অঞ্চল কিংবা দেশের বড় বড় মাদক পয়েন্ট থেকে অভিনব কায়দায় নৌকার তলদেশে বা মাটির নিচে লুকিয়ে মাদক প্রবেশ করছিল হাওরের জনপদে। এর ফলে ধ্বংসের মুখে পড়ছিল হাওরের অমিত সম্ভাবনাময় তরুণ সমাজ। ঘরে ঘরে শুরু হয়েছিল পারিবারিক অশান্তি আর মাদক সেবনের টাকা জোগাড় করতে গিয়ে ডাকাতিসহ চুরি ও ছিনতাইয়ের ঘটনা জ্যামিতিক হারে বাড়ছিল।

এই মরণব্যাধির বিরুদ্ধে ওসি মনোয়ার মোহাম্মদ ঘোষণা করলেন ‘জিরো টলারেন্স’ বা শূন্য সহনশীলতা নীতি। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, মাদকের সাথে জড়িত কোনো ব্যক্তি, সে যতই প্রভাবশালী বা রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকুক না কেন, তাকে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।

শুরু হলো ইতিহাসের অন্যতম কঠোর মাদকবিরোধী সাঁড়াশি অভিযান। রাতের অন্ধকারে দুর্গম হাওরাঞ্চলের ঝোপঝাড়, নদীর পাড় ও প্রত্যন্ত গ্রামের মাদক স্পটগুলোতে হানা দেওয়া শুরু করল ওসি মনোয়ার মোহাম্মদের নেতৃত্ব পুলিশ বাহিনী।

তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার এবং নিজস্ব বিশ্বস্ত সোর্স নেটওয়ার্ক গড়ে তুলে একের পর এক মাদকের বড় বড় চালান জব্দ করতে লাগলেন তিনি। শত শত কেজি গাঁজা, হাজারো বোতল ফেনসিডিল ও মরণঘাতী ইয়াবার চালানসহ আটক হতে লাগল কুখ্যাত সব মাদক ব্যবসায়ী ও মাদকসেবিরা। বহু পরিবার যখন তাদের সন্তানদের অন্ধকার ভবিষ্যতের কথা ভেবে দিশেহারা ছিল, তখন ওসি মনোয়ার মোহাম্মদের এই আপসহীন ভূমিকা তাদের জীবনে আশার আলো জ্বালল। মিঠামইনের প্রতিটি পাড়ায়, প্রতিটি চায়ের দোকানে এখন অনেকটা মাদকের আড্ডা উধাও। মাদক কারবারিরা আজ এলাকা ছেড়ে পলাতক অথবা শ্রীঘরের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে দিন গুনছে। যুবসমাজকে অন্ধকারের অতল গহ্বর থেকে আলোর পথে ফিরিয়ে আনার এই মানবিক লড়াইয়ে ওসি মনোয়ার মোহাম্মদ নিজেকে একজন সমাজ সংস্কারক হিসেবে প্রমাণ করেছেন।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ক্ষেত্রে মিঠামইনে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় পরীক্ষাটি এসেছিল উপজেলা বিএনপির সভাপতি জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীর হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডটি পুরো এলাকায় তীব্র উত্তেজনা, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সাধারণ মানুষের মনে চরম ভীতি তৈরি করেছিল। এমন একটি স্পর্শকাতর ঘটনায় গ্রামীণ দাঙ্গা বা প্রতিশোধমূলক সহিংসতার দাবানল জ্বলে ওঠা ছিল সময়ের ব্যাপার মাত্র। এলাকার শান্তিপ্রিয় মানুষেরা যখন আশঙ্কা করছিলেন যে মিঠামইন হয়তো আবারও রক্তাক্ত লাঠিয়াল ও পেশিশক্তির লড়াইয়ের ময়দানে পরিণত হতে যাচ্ছে, ঠিক তখনই বুক চিতিয়ে দাঁড়ালেন ওসি মনোয়ার মোহাম্মদ।

হত্যাকাণ্ডের পরমুহূর্ত থেকেই তিনি রাজনৈতিক বা সামাজিক কোনো ধরনের চাপের কাছে নতিস্বীকার করেননি। তার প্রথম ও একমাত্র লক্ষ্য ছিল—আইন সবার জন্য সমান এবং অপরাধীর কোনো সুনির্দিষ্ট পরিচয় নেই; অপরাধী কেবলই অপরাধী। তার তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তা এবং প্রত্যক্ষ নির্দেশনায় পুরো উপজেলা জুড়ে শুরু হলো এক নজিরবিহীন ও সাঁড়াশি অভিযান। পুলিশ দিন-রাত এক করে প্রতিটি সন্দেহভাজন এলাকায় হানা দিল। ওসির স্পষ্ট বক্তব্য ছিল, ঘটনার মূল হোতা ও পরিকল্পনাকারীদের যতক্ষণ না আইনের আওতায় আনা হচ্ছে, ততক্ষণ পুলিশের এই লড়াই থামবে না।

চমকপ্রদ তদন্ত কৌশল এবং নির্ভুল তথ্যের ভিত্তিতে একের পর এক মূল আসামিকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হলেন ওসি মনোয়ার মোহাম্মদ। এই চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলায় একে একে মোট ১৩ জন আসামিকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়। এর ফলে এলাকা জুড়ে যে অস্থিরতার মেঘ জমেছিল, তা নিমেষেই কেটে গেল।

ওসির এই কঠোর ও নিরপেক্ষ অবস্থানের কারণে মিঠামইনে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর সহিংসতা বা প্রতিশোধমূলক পাল্টা হামলা ঘটতে পারেনি। সাধারণ মানুষ দেখল, কীভাবে আইনি শক্তির সঠিক প্রয়োগের মাধ্যমে সমাজে ন্যায়ের শাসন প্রতিষ্ঠা করা যায় এবং অপরাধীদের মনে আইনের প্রতি ভয় তৈরি করা যায়।

একজন দক্ষ পুলিশ অফিসারের সার্থকতা কেবল অপরাধী দমনেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং তা প্রকাশ পায় সাধারণ মানুষের মনে কতটা নিরাপত্তা ও আস্থার জায়গা তিনি তৈরি করতে পেরেছেন তার ওপর।

ওসি মনোয়ার মোহাম্মদ সেই বিরল গুণের অধিকারী, যিনি লাঠির শাসন আর অস্ত্রের গর্জন দিয়ে নয়, বরং তার মানবিকতা, সততা ও অমায়িক ব্যবহার দিয়ে মিঠামইনের মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছেন। তিনি থানাকে একটি ভয়ের জায়গা থেকে সাধারণ মানুষের শেষ আশ্রয়স্থলে পরিণত করেছেন।

তার কার্যালয়ের দরজা সবসময় খোলা থাকে সমাজের সবচেয়ে সুবিধাবঞ্চিত অসহায় মানুষটির জন্য। এমনকি মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা থেকে তিনি থানায় বীর মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য একটি বিশেষ সম্মানজনক আসনের ব্যবস্থা করেছেন, যা তার উন্নত মানসিকতা ও দেশপ্রেমেরই বহিঃপ্রকাশ।

অপরাধীদের কাছে যিনি সাক্ষাৎ যমদূত, সাধারণ মানুষের কাছে তিনি ততটাই কোমল ও ভরসার প্রতীক। সামাজিক যেকোনো বিরোধ বা জটিলতা তিনি তাঁর দূরদর্শিতা দিয়ে আদালতের বাইরেই সুষ্ঠু মীমাংসা করে দিয়েছেন, যার ফলে গ্রামীণ হানাহানি অনেকটাই কমে এসেছে।

মহাকালের নিয়মে মানুষ আসে এবং মানুষ চলে যায়, কিন্তু তাদের কীর্তি থেকে যায় ইতিহাসের পাতায়। কিশোরগঞ্জের মিঠামইন হাওরের উত্তাল জলতরঙ্গে আর ধূ ধূ ফসলি মাঠের বাতাসে ওসি মনোয়ার মোহাম্মদের নাম আজ একটি বিশেষ শ্রদ্ধার আসনে অধিষ্ঠিত। তিনি প্রমাণ করেছেন, সদিচ্ছা, সততা আর অসীম সাহস থাকলে যেকোনো দুর্গম ও অপরাধপ্রবণ অঞ্চলকেও শান্তির নীড়ে রূপান্তর করা সম্ভব।

তার হাত ধরে মিঠামইন আজ অনেকটা ডাকাতমুক্ত, মাদকমুক্ত এবং এক শান্তিময় জনপদ। জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীর হত্যাকাণ্ডের মতো জটিল ও সংবেদনশীল ঘটনার সফল ও দ্রুততম তদন্তের মাধ্যমে তিনি পুলিশের প্রতি জনগণের আস্থা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছেন। ওসি মনোয়ার মোহাম্মদ কেবল একজন সরকারি কর্মকর্তা নন, তিনি মিঠামইনের হাওরের এক রুদ্র প্রহরী, এক আধুনিক ট্রয়লান বীর।

হাওরের জল যতদিন বইবে, যতদিন মাঝিরা গান গাইবে নির্ভয়ে নদীর বুকে, ততদিন এই নির্ভীক প্রহরীর সফলতার গল্প কিশোরগঞ্জের ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে খোদাই করা থাকবে। তার শৌর্য ও শান্তির এই মহাকাব্য আগামী প্রজন্মের পুলিশ কর্মকর্তাদের জন্য এক অনন্ত অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।

কেননা, এমন একটি দুর্গম অঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং সাধারণ মানুষের মনে পুলিশের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত কঠিন কাজ। আর এই কঠিন কাজটিকেই অত্যন্ত সহজ ও মানবিক করে তুলেছেন মিঠামইন থানার ওসি মনোয়ার মোহাম্মদ।

সাফল্যের দীপ্তিতে আক্ষেপের ছায়া:

সাফল্যের দীপ্তিতে আক্ষেপ ও বিহাগের করুণ সুর ডানা মেলছে। চরম বাস্তবতার নির্মম পরিহাস হলো, এতসব প্রশংসনীয় এবং জনমুখী অর্জনের পরও কাজের যথাযোগ্য স্বীকৃতিস্বরূপ বিভাগীয় বা সরকারিভাবে কোনো রাষ্ট্রীয় পদক কিংবা বিশেষ পুরস্কার এখনো ওসি মনোয়ার মোহাম্মদের ভাগ্যে জুটেনি।

একজন নিষ্ঠাবান পুলিশ অফিসারের কাছে মাঠপর্যায়ের কঠোর ডিউটি ও সামাজিক দায়িত্ব পালনের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা হলো প্রাতিষ্ঠানিক ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। দিন-রাত এক করে, পরিবার-পরিজনের সান্নিধ্য দূরে ঠেলে যখন একজন মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা সমাজকে নিরাপদ করার ও বদলে দেওয়ার লড়াই করেন, তখন সরকারি পুরস্কার কিংবা পদক কেবল একটি মেডেল হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা হয়ে ওঠে তার সততা, নিষ্ঠা, সাহসিকতা ও ত্যাগের এক সর্বোচ্চ প্রাতিষ্ঠানিক দলিল, যা তার পেশাগত আত্মবিশ্বাসকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

কিন্তু দুঃখজনকভাবে, হাওরের জল-কাদায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করা এই পুলিশ কর্মকর্তার কপালে সেই বহু আকাঙ্ক্ষিত মূল্যায়ন জুটেনি।

তবে পেশাগত জীবনের এই গৌরবময় সফলতার পাশাপাশি তার কাজের পেছনে লুকিয়ে রয়েছে কিছু গভীর আক্ষেপ, যা একজন নিষ্ঠাবান পুলিশ অফিসারের ভেতরের মানবিক সত্ত্বাকে উন্মোচন করে।

ওসি মনোয়ার মোহাম্মদ সাড়ে সাত কোটি টাকা মূল্যের কয়েক লক্ষ পিস ইয়াবা জব্দ করার এক মামলার ঘটনায়
গত ১৫ই সেপ্টেম্বর ঢাকা দায়রা জজ আদালত ৮ -এ এসেছিলেন সাক্ষী দিতে। ওইদিন ভঙ্গুর হৃদয়ে একটি ফেসবুক পোস্ট দেন তিনি।

তাতে তিনি লেখেন, পেশার প্রতি নিবেদিতপ্রাণ সত্ত্বেও ওই ঘটনায় উল্লেখ করার মতো জাতীয় পর্যায়ে পুরস্কৃত হতে পারেননি।

তিনি উল্লেখ করেন, কিশোরগঞ্জের ইটনা থানায় ওসি হিসেবে কাজ করার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পাওয়া মাসে সাহসিকতার সাথে অনেক জননিরাপত্তা ও জনসেবা প্রদানকারী কার্যক্রম গ্রহণের মাধ্যমে নিজেকে শুধু যোগ্যই নয় অধিকন্তু নিজেকে নির্লোভ ও বিনয়ী হিসেবে প্রমাণ করতে পেরেছি বলে নিজে নিজে ভুল ভেবে থাকলেও ওই মাসে মাত্র ৭ দিন কাজ করেই তখনকার নব্য নিয়োগকৃত যোগ্য ওসি ঠিকই জেলার শ্রেষ্ঠ ওসি হিসেবে বিবেচিত হয়েছিলেন!

তার আক্ষেপের যেন শেষ নেই। তাই লেখেন, আসলে পুরস্কার পাওয়ার মতো যোগ্যতা আমার হয়তো এখনো অর্জিত হয়নি, আর এ জীবনে হবে বলে মনেও হয় না।

ওসি মনোয়ার মোহাম্মদ সপরিবার মিঠামইন বাস করলেও
তাদেরকে বঞ্চিত করে দিনের পর দিন থানায় আগত সেবা প্রার্থীদের কথা শুনে গেছেন। উজানে বেড়ে ওঠা মানুষটি অপরিচিত হাওরের উত্তাল ঢেউ আর সশস্ত্র ডাকাতদের আক্রমণের ভয় ও ঝড়-তুফান উপেক্ষা করে বৃষ্টিতে ভিজে আর খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে অভুক্ত থেকে রাতের পর রাত হাওরের সীমাহীন জলরাশির উপরেই ডিংগি নৌকায় ভেসে ভেসে কাটিয়েছেন।

এতে স্ত্রী-সন্তানদেরকে সময় না দিতে দিতে ওদের কাছে নিজেকে অপ্রয়োজনীয়, অযোগ্য আর নিজেকে একজন অপরিচিত মানুষে পরিণত করে তুলেছেন তিনি।

নৈসর্গিক হাওরের সৌন্দর্য দেখতে রাজধানী ঢাকা-সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে অতিরিক্ত ডিউটি করার কারণে স্ত্রী-সন্তানদের রূপসী হাওরটাকে পর্যন্ত দেখাতে পারেননি; না পেরেছেন ইটনার ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ উপভোগের সুযোগ। অথচ যেদিন মিঠামইন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা-সহ জেলার সকল কর্তাব্যক্তি এবং সমগ্র হাওর অঞ্চলের আপামর জনগণ আনন্দ-উল্লাসে মত্ত ছিলেন, সেদিন তিনি ও তার পরিবার কেন যাননি – তা কেবল সশস্ত্র ডাকাতদলই ভালো জানবে!

এছাড়া হাওরের পরিবেশ ডাকাত বিহীন ও নিরাপদ করতে লাখো-কোটি মানুষের কাতারে সামিল না হয়ে বিশ্বকাপ ফুটবল ফাইনাল খেলা দেখা হতে নিজেকে ও পরিবারকে বঞ্চিত করে ওই রাতটাও হাওরের জলরাশিতে ডিউটিতে কাটাতে হয়েছে তার।

এমনকি ফেসবুক লাইভে ওই রাতের পুরোটা সময় জুড়ে তার ও তার ফোর্সের নৌ টহল জনতাকে দেখিয়ে জনগণকে নিরাপত্তার সর্বোচ্চ বার্তা আর অনুভূতি দিতে সচেষ্ট থেকেছেন। এর মাঝে একধরনের সুখ ও আত্মতৃপ্তি অনুভব করেছেন তিনি।

ওসি মনোয়ার মোহাম্মদের আক্ষেপ, দিন দেশে কেবলই তিনি কামলা। এই বিশেষ আক্ষেপটি কেবল একজন ব্যক্তির ক্ষোভ কিংবা মান-অভিমান নয়; বরং তা মাঠপর্যায়ে দিনরাত পরিশ্রম করা যোগ্য ও সৎ কর্মকর্তাদের মূল্যায়নের ক্ষেত্রে আমাদের প্রচলিত আমলাতান্ত্রিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার এক প্রচ্ছন্ন উদাসীনতা এবং কাঠামোগত দুর্বলতাকেই আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।

প্রায়শই দেখা যায়, প্রচারের আলোয় থাকা কিংবা সমতলের সুবিধাজনক স্থানে দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ কর্মকর্তারা দ্রুত লাইমলাইটে চলে আসেন এবং পুরস্কারের তালিকায় জায়গা করে নেন। অথচ হাওরের মতো চরম প্রতিকূল অঞ্চলে যারা আড়ালে থেকে নিরলসভাবে সমাজকে শান্ত ও নিরাপদ রাখতে লড়াই চালিয়ে যান, তাদের শ্রম অনেক সময় নথিপত্রের আড়ালেই চাপা পড়ে থাকে।

বিভাগীয় এই অবহেলা এবং রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিহীনতার গভীর আক্ষেপ বুকে চেপেও ওসি মনোয়ার মোহাম্মদ অবশ্য তার মূল দায়িত্ব থেকে এক চুলও বিচ্যুত হননি। নিজের ভেতরের এই নীরব বেদনাকে একপাশে সরিয়ে রেখে তিনি প্রতিদিন নিয়ম করে লড়ে যাচ্ছেন হাওরের প্রতিটি মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য, দালালি প্রথা উচ্ছেদ করে সাধারণ মানুষের সরাসরি আইনি সেবা নিশ্চিত করতে।

সরকারি কোনো মেডেল বা কাগজের সনদ তার ভাগ্যে না জুটলেও, সাধারণ মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসা আর বীর মুক্তিযোদ্ধাদের চোখেমুখে ফুটে ওঠা পরম শ্রদ্ধাবোধই আজ তাকে এক অনন্য সম্মানের আসনে বসিয়েছে। এই নীরব আক্ষেপ জয় করে সাধারণ মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নেওয়ার এই যে অনন্য গৌরব, তা প্রাতিষ্ঠানিক যেকোনো পুরস্কার বা মেডেলের চেয়েও অনেক বড় মর্যাদায় তাকে আসীন করেছে।

অবশ্য এ কথা চিরন্তন যে, মানুষের কাজের ভেতরগত প্রেরণা বড় ভূমিকা রাখলেও, বাহ্যিক স্বীকৃতি বা পুরস্কার কাজের গতি টিকিয়ে রাখতে অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। এর অনুপস্থিতি হতাশা তৈরি করে।

পুনর্বলন তত্ত্বে মনোবিজ্ঞানে বিএফ স্কিনারের মতে, ইতিবাচক কাজের উপযুক্ত মূল্যায়ন বা পুরস্কার না পেলে সেই কাজের পুনরাবৃত্তি বা প্রচেষ্টা ধীরে ধীরে হ্রাস পায়।
একটানা ঝুঁকি নিয়ে বা সফলভাবে দায়িত্ব পালনের পর যখন কোনো মূল্যায়ন মেলে না, তখন মস্তিষ্কে এক ধরনের মানসিক ক্লান্তি বা ‘বার্নআউট’ তৈরি হয়। কর্মী যখন মনে করেন যে তার কাজের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক মূল্য নেই, তখন তার ভেতর থেকে কাজের প্রতি আন্তরিকতা ও দায়বোধ কমতে শুরু করে।

লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও কলামিস্ট;
সহযোগী সম্পাদক, আজকের সূর্যোদয়, ঢাকা