ঢাকা ০৩:৪০ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৬ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম

অবক্ষয়ের তিমিরে সততার ধ্রুবতারা নায়েব আবদুর রহিম ভূঁইয়া

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১০:১৪:১৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ৬১ বার

Oplus_16908288

রফিকুল ইসলামঃ চারপাশে আজ এক অদ্ভুত আঁধার। আজকাল খবরের কাগজ খুললেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে দুর্নীতি ও ঘুষ বাণিজ্যের চটকদার সব খবর। কোথাও কোটি টাকার কেলেঙ্কারি, কোথাও ক্ষমতার দম্ভে আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়া আমলাদের বিলাসী জীবনের চিত্র।

সততা শব্দটা যেন আজ অভিধানের পাতায় বন্দি। যেন এক দুর্লভ পণ্য, যাকে বর্তমান সমাজ ‘বোকাদের ভূষণ’ বলে উপহাস করতেও ছাড়ে না। এই নৈতিক দেউলিয়াত্ব আর অন্ধকারের চাদরে ঢাকা সমাজে যখন দম আটকে আসে, ঠিক তখনই আমাদের স্মৃতি খুঁড়ে বের করে আনতে হয় আলো ছড়ানো কিছু মানুষকে।

আজ থেকে প্রায় সাত দশক আগে, ১৯৫০-এর দশকের সেই ধুলোবালি মাখা দিনগুলোয়, যখন ক্ষমতার মসনদ আর কাঁচা টাকার লোভ হাতছানি দিত, তখনও একজন মানুষ বুক চিতিয়ে সৎ থেকেছেন। ভূমি প্রশাসনের সাধারণ এক নায়েব বা কানুনগো পদের বিপুল ক্ষমতা হাতে নিয়েও যিনি পকেটে পুরেননি অন্যায়ের একটা পয়সাও। আজ এই ক্ষয়িষ্ণু সমাজের বিবেককে চাবুক মারতে, আমাদের নিজেদের আয়নার সামনে দাঁড় করাতে, সেই ন্যায়পরায়ণ নায়েব ও কানুনগোর জীবনগাথা ধুলো ঝেড়ে পত্রিকার পাতায় আনা কেবল জরুরিই নয়, বরং এক পরম ঐতিহাসিক দায়।

এছাড়া ইতিহাস থেকে এই সৎ মানুষদের টেনে এনে আলোতে রাখা পত্রিকার বা লেখকের শুধু দায়িত্ব নয়, সমাজের প্রতি ঋণ শোধ করাও।

এটি কেবল একজন ব্যক্তির জীবনের গল্প নয়, বরং এটি ভেঙে পড়া সামাজিক মূল্যবোধকে পুনর্নির্মাণ করার একটি শক্তিশালী মাধ্যম বৈকি।

“একচল্লিশের দীর্ঘ পথ, ন্যায়ের হাতলে অবিচল হাত, / রহিম ভুঁইয়া এক সততার নাম, এক দীপ্ত প্রভাত। / নায়েব পদের খাতায় খাতায় রেখে গেছেন অক্ষয় কীর্তিগাথা, / লোভের হাটে বিকায়নি যাঁর শুভ্র ও উন্নত মাথা।”

আজকের ক্ষয়িষ্ণু সমাজে যখন সততা এক দুর্লভ পণ্য, তখন স্মৃতির পাতা উল্টে ফিরে তাকাতে হয় এমন কিছু মানুষের দিকে, যাঁরা জীবনকে সঁপে দিয়েছিলেন আদর্শের কষ্টিপাথরে। ১৯৫১ থেকে ১৯৮৯—দীর্ঘ ৩৮টি বছর ভূমি রাজস্ব বিভাগে নায়েব ও কানুনগো পদে চাকরি করা মানে সেসময়ে গ্রামীণ সমাজে তাদের প্রভাব, প্রতিপত্তি এবং ক্ষমতা কোনো জমিদারের চেয়ে কম ছিল না। এমনই এক পদে দায়িত্ব পালন করেও যিনি লোভ-লালসার পঙ্কিলতায় নিজের হাত ও অন্তর কলঙ্কিত করেননি।

বরং ভূসম্পত্তি, সোনা-দানার প্রাচুর্যে নয়, আজীবন ধনী ছিলেন তাঁর অনন্য চরিত্রের আভায়। পদমর্যাদাকে ক্ষমতার দাপট না বানিয়ে, যিনি সেটিকে রূপ দিয়েছিলেন জনসেবা ও ন্যায়ের মূর্ত প্রতীকে।

মো. আবদুর রহিম ভুঁইয়া হলেন সেই কিংবদন্তিতুল্য বিরল ব্যক্তিত্ব। তাঁর বাড়ি কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলা গোপদিঘী ইউনিয়নে অবস্থিত প্রত্যন্ত ধলাই গ্রামে।

মো. আবদুর রহিম ভুঁইয়া ১৯৩০ সালের ৩১শে অক্টোবরে এক সমভ্রান্ত ও রক্ষণশীল মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মো. আবদুল মজিদ ভুঁইয়া ও মাতার নাম মোছা. রমসানের নেছা। ঐতিহ্যগতভাবে তিনি ‘বড়বাড়ি’র সন্তান। শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন সংযত, শান্তশিষ্ট, ধীরস্থির, পরহেজগার, প্রখর মেধাশক্তির অধিকারী এবং নীতিবাগীশ। এছাড়া ছিলেন চৌকস, বিচক্ষণ, তুখোড় ক্রীড়াবিদ ও সংস্কৃতিমনা লোক।

আবদুর রহিম ভুঁইয়া ছিলেন একজন সৎ, ন্যায়পরায়ণ এবং অনন্য চরিত্রের অধিকারী, যাঁর জীবনগাথা নতুন প্রজন্মের জন্য এক অনুকরণীয় আদর্শ। ঔপনিবেশিক আমল ও পরবর্তী সময়ে গ্রামবাংলার সামাজিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থায় ‘নায়েব ও কানুনগো’ পদটি ছিল অত্যন্ত প্রভাবশালী। অনেকেই যখন এই পদের ক্ষমতা ব্যবহার করে নিজস্ব আখের গোছাতে ব্যস্ত থাকতেন, তখন তিনি সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। সততা, চারিত্রিক দৃঢ়তা এবং পরোপকারের এক অনন্য উপাখ্যান ছিল তাঁর পুরো জীবন।

এর নেপথ্যে প্রধান কারণ পারিবারিক শিক্ষা ও ধর্মীয় মূল্যবোধের লালন ও চর্চা। তাঁর বাবা মো. আবদুল মজিদ ভুঁইয়া সবসময় তাঁকে একটি শিক্ষা দিতেন—”জীবন চলে যাবে, কিন্তু সততা ও ন্যায়পরায়ণতা যেন কখনো নষ্ট না হয়।” বাবার এই একটি উপদেশই ছিল তাঁর জীবনের মূল চালিকাশক্তি।

আবদুর রহিম ভুঁইয়ার চাকরি জীবনের গভীরে প্রবেশের আগে তৎকালীন পূর্ববঙ্গের আর্থ-সামাজিক চালচিত্রটি বোঝা জরুরি।

১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর অর্থনীতিতে এক ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়েছিল। হিন্দু জমিদার ও মহাজনদের একটি বড় অংশ সপরিবারে সীমান্ত পার হয়ে চলে যাওয়ায় গ্রামীণ অর্থনৈতিক লেনদেন ও ঋণ ব্যবস্থাপনায় ধস নামে। নতুন পাকিস্তানি শাসনামলে পাটের ন্যায্য মূল্য না পাওয়া, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আকাশচুম্বী দাম এবং উপর্যুপরি ফসলহানি সাধারণ কৃষক সমাজকে চরম দারিদ্র্যের মুখে ঠেলে দিয়েছিল।

সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি এসেছিল ভূমি ব্যবস্থায়। ১৯৫০ সালের জমিদারি উচ্ছেদ আইন পাসের পর পুরোনো সামন্ততান্ত্রিক অভিজাত শ্রেণি তাদের ক্ষমতা হারানোর ভয়ে মরিয়া হয়ে উঠেছিল। তারা প্রজাদের কাছ থেকে বকেয়া খাজনা আদায়ের নামে জুলুম বাড়াচ্ছিল, যাতে চলে যাওয়ার আগে যতটুকু সম্ভব সম্পদ লুটে নেওয়া যায়। অন্যদিকে, সরকারি তহবিলে রাজস্ব জমা দেওয়ার চাপও ছিল তীব্র।

এই সাঁড়াশি চাপের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন নায়েবরা। তৎকালীন সমাজে নায়েব মানেই ছিল চাবুক, লাঠিয়াল বাহিনী, জোরপূর্বক ধান কেড়ে নেওয়া এবং উৎকোচ বা ঘুষের বিনিময়ে জমি পত্তন দেওয়া। এই কলুষিত ও শোষণের বাতাবরণে আবদুর রহিম ভুঁইয়া নামের একজন মানুষ কীভাবে নিজের সততা অক্ষুণ্ণ রেখেছিলেন, তা এক পরম বিস্ময়।

১৯৫০-এর দশকের প্রেক্ষাপটটা একটু কল্পনা করুন। বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ ছিল বাঙালি জীবনের এক চরম রূপান্তরের কাল। ১৯৫১ সাল—দেশভাগের মাত্র চার বছর পরের এক জটিল ও ক্ষতবিক্ষত সময়। একদিকে ঔপনিবেশিক শাসনের দীর্ঘ ছায়া, অন্যদিকে নতুন রাজনৈতিক সীমানার ভেতরে এক নতুন সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিন্যাসের জন্ম হচ্ছিল। জমিদারি প্রথা উচ্ছেদের চূড়ান্ত আইনি প্রক্রিয়া তখন সবেমাত্র বাস্তবায়নের পথে। এমনই এক যুগসন্ধিক্ষণে গ্রামীণ বাংলার প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর অন্যতম মেরুদণ্ডে ছিলেন ‘নায়েব’ বা ভূস্বামী-জমিদারের প্রতিনিধিরা। প্রজাদের ওপর শোষণ, ক্ষমতার অপব্যবহার আর দুর্নীতির সমার্থক হয়ে ওঠা এই ‘নায়েব’ পদের সমান্তরালে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী এক চরিত্র ছিলেন আবদুর রহিম ভুঁইয়া, যিনি অনন্য মানব চরিত্রের এক জীবন্ত ইশতেহার।

১৯৫০ সালের রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনের মাধ্যমে জমিদারী প্রথা বিলুপ্ত হওয়ার পর, ১৯৫১ সাল থেকে সাবেক জমিদারদের খাজনা আদায়কারী নায়েব বা তহশিলদারেরা সরাসরি সরকারি কাঠামোয় যুক্ত হন।অর্থাৎ জমিদারদের অধীনতা থেকে মুক্ত হয়ে সরকারের রাজস্ব বিভাগের অধীনে আসেন।

বাস্তবিকই ১৯৫০ সালের জমিদারি উচ্ছেদ ও প্রজাস্বত্ব আইনের মাধ্যমে ১৯৫১ সালে ব্রিটিশ আমলের প্রথাগত জমিদারী ব্যবস্থার আনুষ্ঠানিক বিলুপ্তি ঘটে। জমিদারদের হাত থেকে জমির মালিকানা ও রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব সরাসরি সরকারের হাতে চলে গেলে এই বিশাল দায়িত্ব পড়ে নায়েব ও কানুনগোদের ওপর। ফলে সাধারণ মানুষের কাছে তারা ‘নতুন জমিদার’ হিসেবে আবির্ভূত হন।

পাকিস্তান আমল থেকে শুরু করে স্বাধীন বাংলাদেশ আমল পর্যন্ত তৃণমূল পর্যায়ে সরকারের সরাসরি প্রতিনিধি হিসেবে নায়েব ও কানুনগোরাই ছিলেন মুখ্য ব্যক্তি ও উজ্জীবক।

একজন নায়েব বা তহশিলদার একক ক্ষমতাবলে যেকোনো নথিপত্র পরিবর্তন, জালিয়াতি বা গায়েব করে দিতে পারতেন। উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের তদারকি কম থাকায় মাঠপর্যায়ের এই কর্মকর্তারাই হয়ে উঠেছিলেন ভূমির দণ্ডমুণ্ডের কর্তা।

১৯৫১ সাল থেকে ১৯৮৯ সালের মধ্যে মাঠপর্যায়ের ভূমি প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে অসদুপায় বা দুর্নীতি অবলম্বনের সুযোগ ছিল অসীম এবং একচেটিয়া। মূলত ১৯৫০ সালের জমিদারি অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন পাসের পর থেকে শুরু করে ১৯৮০-এর দশকের শেষভাগ পর্যন্ত প্রযুক্তিহীন শাসনব্যবস্থার কারণে একজন নায়েব ও কানুনগো আক্ষরিক অর্থেই যেকোনো ভূমির ‘ভাগ্যবিধাতা’ বনে গিয়েছিলেন।

তাদের এই অবাধ দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট ক্ষেত্র ও সুযোগগুলো ছিল বেশুমার। জমিদারি উচ্ছেদের পর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে জরুরি ভিত্তিতে ভূমির মালিকানা নির্ধারণে ‘এসএ রেকর্ড’ তৈরি করা হয়। নথিপত্র হালনাগাদের এই মহাযজ্ঞের সময় কানুনগো ও নায়েবদের হাতে ছিল প্রশ্নহীন ক্ষমতা। মাঠপর্যায়ে কে জমির প্রকৃত মালিক, তা তদারকি করার মতো শক্তিশালী কোনো ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ছিল না। ফলে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে তারা এক শরিকের জমি অন্য শরিকের নামে কিংবা অন্যের জোত-জমি সম্পূর্ণ প্রভাবশালী বা জালিয়াত চক্রের নামে খতিয়ানভুক্ত করে দিয়েছিলেন।

আইন অনুযায়ী হাট-বাজার, জলমহাল, ফেরিঘাট এবং জমিদারের পরিত্যক্ত জমি সরাসরি সরকারের (খাস জমি) অধীনে চলে আসে। এই কোটি কোটি টাকার সরকারি খাস জমি ভূমিহীনদের দেওয়ার কথা থাকলেও নায়েব-কানুনগোরা যোগসাজশ করে ভুয়া ব্যক্তিমালিকানা বা পত্তন (লিজ) দেখিয়ে নিজেদের নামে বা বিত্তশালীদের নামে রেকর্ড করে দিয়েছেন।

জমিদারি আমলের পুরোনো ও ব্যাকডেটেড (অতীতের তারিখের) খাজনা আদায়ের রসিদ বা দাখিলা জালিয়াতি করা ছিল তাদের বাঁহাতের খেল। টাকার বিনিময়ে জমিদারের ভুয়া পত্তনমূল তৈরি করে রাতারাতি একটি খাস জমিকে ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি হিসেবে সরকারি নথিতে ঢুকিয়ে দেওয়া হতো।

১৯৫০ সালের আইনে পরিবারপ্রতি জমির সর্বোচ্চ সীমা (সিলিং) প্রথমে ৩৭৫ বিঘা এবং পরবর্তীকালে তা আরও কমিয়ে আনা হয়। অতিরিক্ত জমি সরকারের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ধনী জোতদার ও জমিদাররা তাদের উদ্বৃত্ত জমি টিকিয়ে রাখতে নায়েব ও কানুনগোদের শরণাপন্ন হতেন। এই কর্মকর্তারা বিপুল ঘুষের বিনিময়ে বেনামি (ভুয়া ব্যক্তির নামে) দলিল বা আত্মীয়স্বজনের নামে জমি ভাগ করে দিয়ে সিলিং আইন ফাঁকি দিতে সাহায্য করতেন।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় এবং তার পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে বহু হিন্দু পরিবার এবং পাকিস্তানপন্থী মানুষ দেশ ত্যাগ করে। তাদের ফেলে যাওয়া এই বিশাল ‘পরিত্যক্ত সম্পত্তি’ এবং ‘শত্রু সম্পত্তি’ দেখাশোনার একক চাবিকাঠি ছিল ইউনিয়ন তহশিল অফিস (নায়েব) এবং সেটেলমেন্ট অফিসের (কানুনগো) কাছে। তারা এই জমিগুলো সরকারের খাতায় না তুলে জালিয়াতির মাধ্যমে নিজেদের আত্মীয়স্বজন বা প্রভাবশালী দখলদারদের নামে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত করে দিতেন।

সেই সময়ে সাধারণ প্রজারা ছিলেন চরম অশিক্ষিত এবং ভূমি আইন সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ। সমস্ত ল্যান্ড রেকর্ড (যেমন আরএস বা সিএস পর্চা) কানুনগোদের সেটেলমেন্ট অফিস বা নায়েবদের তহশিল অফিসে কাপড়ের গাঁটুরিতে বন্দি থাকত। সাধারণ মানুষের পক্ষে তা দেখা বা যাচাই করার কোনো সুযোগ ছিল না। নায়েব বা কানুনগো মুখে যা বলতেন, গ্রামীণ সমাজে সেটাই আইন হিসেবে গণ্য হতো।

নায়েব বা কানুনগোরা বেতনভুক্ত সরকারি কর্মচারী হলেও তাদের প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার কারণে বিপুল অর্থ ও সম্পদের মালিক হওয়ার বিস্তর সুযোগ ছিল।

প্রচলিত সামাজিক বাস্তবতায় এই পদগুলো ছিল বিপুল অবৈধ অর্থ উপার্জনের প্রলোভনে ঘেরা। ১৯৫১ সাল থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত দুর্বল তদারকি এবং কাগজে-কলমে বন্দি ভূমি ব্যবস্থার কারণে তৎকালীন নায়েব ও কানুনগোদের একটি বড় অংশ সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে রাতারাতি বিপুল অবৈধ সম্পদের মালিক হওয়ার সুযোগ পেয়েছিল।

কাগজে-কলমে জমিদারি বিলুপ্ত হলেও, সাধারণ মানুষের জমি রক্ষা ও খাজনা দেওয়ার জন্য এই পদাধিকারীদের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল থাকতে হতো। আর এই অসীম ক্ষমতার কারণেই লোকমুখে বলা হতো যে, সে সময়ে নায়েব বা কানুনগো হওয়া মানেই ‘জমিদার’ হওয়া।

সাধারণ মানুষের কাছে তাদের কলমের এক একটি খোঁচা ছিল ভাগ্য নির্ধারণের শামিল। ঘুষ, জবরদখল আর প্রভাবশালীদের তোষামোদি করে রাতারাতি ধনকুবের বনে যাওয়া যেখানে ছিল অলিখিত নিয়ম, সেখানে আবদুর রহিম ভুঁইয়া হেঁটেছিলেন সম্পূর্ণ উল্টো পথে। লোভের সেই উত্তাল সমুদ্রে তিনি ছিলেন এক অটল বাতিঘর।

তাঁর কর্মজীবনের ফাইলগুলো ঘাটলে দেখা যেত, কোনো এক প্রভাবশালী জমিদার বা জোতদার হয়তো বিঘার পর বিঘা জমি নিজের নামে লিখিয়ে নিতে বিপুল অর্থের লোভ দেখিয়েছেন, কিংবা দিয়েছেন চাকরিচ্যুতির হুমকি। কিন্তু এই মানুষটি মাথা নোয়াননি। তাঁর কাছে সরকারের আমানত আর গরিব চাষার হাহাকার ছিল নিজের জীবনের চেয়েও বড়। তিনি জানতেন, তাঁর একটা ভুল দস্তখত একটি পরিবারকে রাস্তায় বসিয়ে দিতে পারে। ফলে লোভের লালসাকে তিনি পায়ে ঠেলেছেন পরম অবহেলায়। আর এর মূল্যও তাঁকে চকাতে হয়েছে বারবার—অযাচিত বদলি, সহকর্মীদের বিদ্রূপ কিংবা ওপরমহলের কোপানলে পড়ে।

আবদুর রহিম ভুঁইয়ার সৎ থাকার পথটি কখনোই মসৃণ ছিল না। ক্ষমতার শীর্ষে থেকেও তাঁর ঘর ছিল টিনের চালের, তিনি সৌখিন ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন পুরুষ হলেও চলতেন গরিবী হালে। সন্তানদের হয়তো দামি কোনো আবদার তিনি মেটাতে পারেননি, কিন্তু তাদের খাইয়েছেন হালাল অন্ন। রাতে যখন তিনি ঘুমোতে যেতেন, তাঁর বুকে কোনো অপরাধবোধের পাথর চেপে বসত না। এই যে সততার কারণে এক ধরনের বৈরাগ্য ও সরল জীবনযাপন, এটাই ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ।

সৎভাবে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সৎ কর্মকর্তারা প্রায়শই আর্থিক টানাপোড়েনের মুখোমুখি হতেন। আবদুর রহিম ভূঁইয়া তেমনই একজন। বেতনের টাকায় সংসার চালাতে না পেরে পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি করে বা বাড়ি থেকে চাল ও টাকা এনে ঘাটতি পূরণ করতেন। এটি প্রমাণ করে যে, নিজের আদর্শ ও সততা ধরে রাখতে তিনি এবং তাঁর পরিবার কতটা বড় ত্যাগের মধ্য দিয়ে গেছেন।

কিশোরগঞ্জের মিঠামইন হাওর অঞ্চল ঐতিহাসিকভাবেই একটি প্রতিকূল, জনবিচ্ছিন্ন এবং সংগ্রামী এলাকা। ১৯৩৩ সাল থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত ওই সময়ে যাতায়াত ও জীবনযাত্রা আজকের চেয়েও অনেক বেশি কঠিন ছিল। এমন একটি প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে ওঠে এসে সরকারি চাকরিতে (তা-ও আবার ভূমি রাজস্ব বিভাগের মতো লোভনীয় শাখায়) দীর্ঘ ৩৮ বছর নিজের নীতিতে অটল থাকা এবং অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করা সত্যিই এক পর্বতসম ব্যক্তিত্বের পরিচয় দেয়।

ক্ষয়িষ্ণু সমাজে এই গল্প বড় বেশি প্রয়োজন:

আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি যেখানে সমাজ সফলতার সংজ্ঞা বদলে ফেলেছে। আজ যার যত টাকা, সে সমাজে তত বেশি সম্মানিত—তা সেই টাকা চুরির হোক কিংবা দুর্নীতির। এই করপোরেট আর বৈষয়িক ইঁদুরদৌড়ে আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের এই গৌরবোজ্জ্বল সৎ অতীতকে ভুলে যাচ্ছি। এই নায়েব ও কানুনগোর গল্প আজ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সমাজ সবসময় এতটা কলুষিত ছিল না। এই মাটি এমন মানুষদেরও জন্ম দিয়েছে যারা নীতিকে টাকার দাঁড়িপাল্লায় বিক্রি করেননি। বর্তমান আমলাতন্ত্র, যারা জনগণের সেবক না হয়ে শাসক বনে যান, তাদের জন্য এই জীবনগাথা একটি ‘নৈতিক কম্পাস’ হিসেবে কাজ করতে পারে।

নায়েব ও কানুনগো পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা হয়েও আবদুর রহিম ভুঁইয়া যে সৎ জীবনযাপন করে গেছেন, তা ধলাই নামক একটি গ্রামেই শুধু নয়, দেশ ও সমাজের জন্য একটি স্থায়ী অহংকার। বেতনের ঘাটতি মেটাতে গিয়ে বাড়ি থেকে বা পৈতৃক সম্পত্তি থেকে চাল ও টাকা এনে সংসার চালানো—আজকের যুগে যেখানে মানুষ অবৈধ উপায়ে সম্পদ গড়ার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত, সেখানে তাঁর এই গল্প নতুন প্রজন্মের কাছে হয়তো রূপকথার মতো মনে হবে।

রাষ্ট্রীয় বা প্রাতিষ্ঠানিক নথিতে অনেক সময় শুধু জন্ম-মৃত্যু আর চাকুরির মেয়াদটুকুই লেখা থাকে। কিন্তু একজন মানুষের আসল চরিত্র ও সততার সত্য ইতিহাস পরিবারের পরবর্তী প্রজন্ম, তাঁদের সহকর্মী অথবা স্থানীয় প্রবীণদের মুখে মুখে বা কোনো আঞ্চলিক স্মারকগ্রন্থে বেঁচে থাকে। অনেক সময় পরবর্তী প্রজন্ম বা কোনো লেখক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কিংবা কোনো সাংবাদিক পত্রিকায় নিবন্ধে এমন মানুষদের স্মৃতিচারণ করেন, যা বর্তমানের অবক্ষয়গ্রস্ত সমাজের জন্য একটি বড় বার্তা।

১৯৫০-এর দশকে নায়েব আবদুর রহিম ভুঁইয়া সরকারি চাকরির প্রশাসনিক ব্যস্ততার পাশাপাশি সমাজ সংস্কার, শিক্ষার আলো বিস্তার এবং জনকল্যাণমূলক কাজে নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে একজন প্রকৃত সামাজিক মানুষ, শিক্ষানুরাগী ও জনহিতৈষী হিসেবে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন।

মো. আবদুর রহিম ভুঁইয়া ১৯৪৭ সালে তদানীন্তন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে কৃতিত্বের সাথে মেট্রিকুলেশন পাশ করেন। অবিভক্ত ভারতের ঐতিহাসিক সময়ে বর্তমানে বাংলাদেশের জনবিচ্ছিন্ন হাওরাঞ্চলের এক অজপাড়াগাঁ থেকে মেট্রিকুলেশন পাশ করাটাই ছিল দুঃসাধ্য ও মেধার পরিচয়।

শিক্ষাজীবন শেষ করেই তিনি ১৯৪৭ সালের সুনামগঞ্জ জেলার জামালগঞ্জের সাচনায় কৃষি অফিসার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। তৎকালীন পূর্ব বাংলায় অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা ও প্রান্তিক গ্রামীণ ভূপ্রকৃতির রূপ পরিবর্তনে তিনি যে অবদান রেখেছিলেন, তা আজও লোকের মুখে মুখে। তিনি কৃষকের ফসল বন্যার কবল থেকে রক্ষা করতে সাচনায় হাওর রক্ষা বাঁধ নির্মাণ করেন। সেই যুগে প্রযুক্তি বা আধুনিক যন্ত্রপাতি না থাকায় এবং স্বল্প খরচে মাটি কাটতে নিজের এলাকা থেকে শ্রমিক এনে, অন্যদিকে হাতি দিয়ে মাটি মাড়িয়ে শক্ত করে সেই বাঁধ তৈরি করা হয়েছিল। সরকারের বরাদ্দকৃত অর্থ থেকে ২০ হাজার টাকা বাচিয়ে সরকারি কোষাগারে ফেরত দিয়ে বিপুল প্রশংসিত হন। ঐতিহাসিক এই কীর্তির কথা শ্রদ্ধাভরে আজও উচ্চারিত হয়।

কিন্তু অসাধু প্রশাসনের কোপানলে পড়ে দীর্ঘ পাঁচ বছরেও পদোন্নতি না হওয়ায় কৃষি বিভাগের চাকরি ছেড়ে দিয়ে নায়েব পদে ১৯৪৭ সালে ময়মনসিংহ জেলার নান্দাইলের মনোহরদী ভূমি অফিসে প্রথম যোগদান করে আরও চ্যালেঞ্জিং ও বন্ধুর পথ বেছে নেন।

মো. আবদুর রহিম ভুঁইয়া কেবল পঞ্চাশের দশকের একজন নায়েব বা ইতিহাসের পাতা থেকে হারিয়ে যাওয়া কোনো নাম নন; তিনি ছিলেন এক কালজয়ী আদর্শের মূর্ত প্রতীক। এমন এক যুগে তিনি জীবন অতিবাহিত করেছেন, যেখানে সততা বজায় রাখা ছিল জ্বলন্ত কয়লা হাতে রাখার মতো কঠিন। কিন্তু লোভ-লালসা আর জাগতিক মোহ কখনই তাঁর আত্মিক শক্তি ও নৈতিকতার দেয়াল ভাঙতে পারেনি।

তিনি ১৯৯২ সালের ১৬ ফেব্রয়ারি নিজ বাড়িতে মৃত্যুবরণ করেন। ৯০-এর দশকে তাঁর মহাপ্রয়াণের মধ্য দিয়ে একটি যুগের অবসান ঘটেছে সত্য, কিন্তু তিনি যে সততার বীজ বুনে গেছেন, তার সুবাস আজও সমাজকে ঋণী করে। আজ যখন চারদিকে মূল্যবোধের চরম আকাল, তখন আবদুর রহিম ভুঁইয়ার মতো মানুষদের জীবনের প্রতিটি পৃষ্ঠা আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়, সততার পথে চলার সাহস জোগায়।

ইতিহাসের ধুলোবালি থেকে এই সৎ মানুষদের টেনে এনে আলোতে রাখা কোনো স্রেফ স্মৃতিকথা নয়; এটি বর্তমান অবক্ষয় রুখতে সমাজের প্রতি আমাদের ঋণ শোধ করার প্রয়াস। সমাজকে বাঁচাতে হলে আমাদের আবার সেই ১৯৫০-এর দশকে ফিরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই, কিন্তু সেই যুগের কানুনগোর বুকের ভেতরের যে নীতি ও আদর্শ ছিল, তাকে আজকের তরুণদের বুকে ধারণ করতে হবে। বাতিটি নিভে যাওয়ার আগেই আমাদের এই সততার আলো ছড়াতে হবে, নয়তো আগামী প্রজন্ম অন্ধকারের তীব্রতায় পথ হারাবে।

তিনি পার্থিব পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেও বেঁচে আছেন মানুষের হৃদয়ে, শ্রদ্ধায় ও ভালোবাসায়। কারণ, শরীর নশ্বর হলেও আদর্শ অবিনশ্বর। তাই বিদায়বেলার সেই বিষাদকে ছাপিয়ে তাঁর রেখে যাওয়া কীর্তিই যেন আজও উচ্চস্বরে ঘোষণা করে—”তোমার কীর্তির চেয়ে তুমি যে মহৎ, / তাই তব জীবনের রথ।”

লেখক: সহযোগী সম্পাদক, আজকের সূর্যোদয়, ঢাকা

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

বিদ্যুৎ গিলে খাচ্ছে অটোরিকশা

অবক্ষয়ের তিমিরে সততার ধ্রুবতারা নায়েব আবদুর রহিম ভূঁইয়া

আপডেট টাইম : ১০:১৪:১৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রফিকুল ইসলামঃ চারপাশে আজ এক অদ্ভুত আঁধার। আজকাল খবরের কাগজ খুললেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে দুর্নীতি ও ঘুষ বাণিজ্যের চটকদার সব খবর। কোথাও কোটি টাকার কেলেঙ্কারি, কোথাও ক্ষমতার দম্ভে আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়া আমলাদের বিলাসী জীবনের চিত্র।

সততা শব্দটা যেন আজ অভিধানের পাতায় বন্দি। যেন এক দুর্লভ পণ্য, যাকে বর্তমান সমাজ ‘বোকাদের ভূষণ’ বলে উপহাস করতেও ছাড়ে না। এই নৈতিক দেউলিয়াত্ব আর অন্ধকারের চাদরে ঢাকা সমাজে যখন দম আটকে আসে, ঠিক তখনই আমাদের স্মৃতি খুঁড়ে বের করে আনতে হয় আলো ছড়ানো কিছু মানুষকে।

আজ থেকে প্রায় সাত দশক আগে, ১৯৫০-এর দশকের সেই ধুলোবালি মাখা দিনগুলোয়, যখন ক্ষমতার মসনদ আর কাঁচা টাকার লোভ হাতছানি দিত, তখনও একজন মানুষ বুক চিতিয়ে সৎ থেকেছেন। ভূমি প্রশাসনের সাধারণ এক নায়েব বা কানুনগো পদের বিপুল ক্ষমতা হাতে নিয়েও যিনি পকেটে পুরেননি অন্যায়ের একটা পয়সাও। আজ এই ক্ষয়িষ্ণু সমাজের বিবেককে চাবুক মারতে, আমাদের নিজেদের আয়নার সামনে দাঁড় করাতে, সেই ন্যায়পরায়ণ নায়েব ও কানুনগোর জীবনগাথা ধুলো ঝেড়ে পত্রিকার পাতায় আনা কেবল জরুরিই নয়, বরং এক পরম ঐতিহাসিক দায়।

এছাড়া ইতিহাস থেকে এই সৎ মানুষদের টেনে এনে আলোতে রাখা পত্রিকার বা লেখকের শুধু দায়িত্ব নয়, সমাজের প্রতি ঋণ শোধ করাও।

এটি কেবল একজন ব্যক্তির জীবনের গল্প নয়, বরং এটি ভেঙে পড়া সামাজিক মূল্যবোধকে পুনর্নির্মাণ করার একটি শক্তিশালী মাধ্যম বৈকি।

“একচল্লিশের দীর্ঘ পথ, ন্যায়ের হাতলে অবিচল হাত, / রহিম ভুঁইয়া এক সততার নাম, এক দীপ্ত প্রভাত। / নায়েব পদের খাতায় খাতায় রেখে গেছেন অক্ষয় কীর্তিগাথা, / লোভের হাটে বিকায়নি যাঁর শুভ্র ও উন্নত মাথা।”

আজকের ক্ষয়িষ্ণু সমাজে যখন সততা এক দুর্লভ পণ্য, তখন স্মৃতির পাতা উল্টে ফিরে তাকাতে হয় এমন কিছু মানুষের দিকে, যাঁরা জীবনকে সঁপে দিয়েছিলেন আদর্শের কষ্টিপাথরে। ১৯৫১ থেকে ১৯৮৯—দীর্ঘ ৩৮টি বছর ভূমি রাজস্ব বিভাগে নায়েব ও কানুনগো পদে চাকরি করা মানে সেসময়ে গ্রামীণ সমাজে তাদের প্রভাব, প্রতিপত্তি এবং ক্ষমতা কোনো জমিদারের চেয়ে কম ছিল না। এমনই এক পদে দায়িত্ব পালন করেও যিনি লোভ-লালসার পঙ্কিলতায় নিজের হাত ও অন্তর কলঙ্কিত করেননি।

বরং ভূসম্পত্তি, সোনা-দানার প্রাচুর্যে নয়, আজীবন ধনী ছিলেন তাঁর অনন্য চরিত্রের আভায়। পদমর্যাদাকে ক্ষমতার দাপট না বানিয়ে, যিনি সেটিকে রূপ দিয়েছিলেন জনসেবা ও ন্যায়ের মূর্ত প্রতীকে।

মো. আবদুর রহিম ভুঁইয়া হলেন সেই কিংবদন্তিতুল্য বিরল ব্যক্তিত্ব। তাঁর বাড়ি কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলা গোপদিঘী ইউনিয়নে অবস্থিত প্রত্যন্ত ধলাই গ্রামে।

মো. আবদুর রহিম ভুঁইয়া ১৯৩০ সালের ৩১শে অক্টোবরে এক সমভ্রান্ত ও রক্ষণশীল মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মো. আবদুল মজিদ ভুঁইয়া ও মাতার নাম মোছা. রমসানের নেছা। ঐতিহ্যগতভাবে তিনি ‘বড়বাড়ি’র সন্তান। শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন সংযত, শান্তশিষ্ট, ধীরস্থির, পরহেজগার, প্রখর মেধাশক্তির অধিকারী এবং নীতিবাগীশ। এছাড়া ছিলেন চৌকস, বিচক্ষণ, তুখোড় ক্রীড়াবিদ ও সংস্কৃতিমনা লোক।

আবদুর রহিম ভুঁইয়া ছিলেন একজন সৎ, ন্যায়পরায়ণ এবং অনন্য চরিত্রের অধিকারী, যাঁর জীবনগাথা নতুন প্রজন্মের জন্য এক অনুকরণীয় আদর্শ। ঔপনিবেশিক আমল ও পরবর্তী সময়ে গ্রামবাংলার সামাজিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থায় ‘নায়েব ও কানুনগো’ পদটি ছিল অত্যন্ত প্রভাবশালী। অনেকেই যখন এই পদের ক্ষমতা ব্যবহার করে নিজস্ব আখের গোছাতে ব্যস্ত থাকতেন, তখন তিনি সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। সততা, চারিত্রিক দৃঢ়তা এবং পরোপকারের এক অনন্য উপাখ্যান ছিল তাঁর পুরো জীবন।

এর নেপথ্যে প্রধান কারণ পারিবারিক শিক্ষা ও ধর্মীয় মূল্যবোধের লালন ও চর্চা। তাঁর বাবা মো. আবদুল মজিদ ভুঁইয়া সবসময় তাঁকে একটি শিক্ষা দিতেন—”জীবন চলে যাবে, কিন্তু সততা ও ন্যায়পরায়ণতা যেন কখনো নষ্ট না হয়।” বাবার এই একটি উপদেশই ছিল তাঁর জীবনের মূল চালিকাশক্তি।

আবদুর রহিম ভুঁইয়ার চাকরি জীবনের গভীরে প্রবেশের আগে তৎকালীন পূর্ববঙ্গের আর্থ-সামাজিক চালচিত্রটি বোঝা জরুরি।

১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর অর্থনীতিতে এক ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়েছিল। হিন্দু জমিদার ও মহাজনদের একটি বড় অংশ সপরিবারে সীমান্ত পার হয়ে চলে যাওয়ায় গ্রামীণ অর্থনৈতিক লেনদেন ও ঋণ ব্যবস্থাপনায় ধস নামে। নতুন পাকিস্তানি শাসনামলে পাটের ন্যায্য মূল্য না পাওয়া, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আকাশচুম্বী দাম এবং উপর্যুপরি ফসলহানি সাধারণ কৃষক সমাজকে চরম দারিদ্র্যের মুখে ঠেলে দিয়েছিল।

সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি এসেছিল ভূমি ব্যবস্থায়। ১৯৫০ সালের জমিদারি উচ্ছেদ আইন পাসের পর পুরোনো সামন্ততান্ত্রিক অভিজাত শ্রেণি তাদের ক্ষমতা হারানোর ভয়ে মরিয়া হয়ে উঠেছিল। তারা প্রজাদের কাছ থেকে বকেয়া খাজনা আদায়ের নামে জুলুম বাড়াচ্ছিল, যাতে চলে যাওয়ার আগে যতটুকু সম্ভব সম্পদ লুটে নেওয়া যায়। অন্যদিকে, সরকারি তহবিলে রাজস্ব জমা দেওয়ার চাপও ছিল তীব্র।

এই সাঁড়াশি চাপের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন নায়েবরা। তৎকালীন সমাজে নায়েব মানেই ছিল চাবুক, লাঠিয়াল বাহিনী, জোরপূর্বক ধান কেড়ে নেওয়া এবং উৎকোচ বা ঘুষের বিনিময়ে জমি পত্তন দেওয়া। এই কলুষিত ও শোষণের বাতাবরণে আবদুর রহিম ভুঁইয়া নামের একজন মানুষ কীভাবে নিজের সততা অক্ষুণ্ণ রেখেছিলেন, তা এক পরম বিস্ময়।

১৯৫০-এর দশকের প্রেক্ষাপটটা একটু কল্পনা করুন। বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ ছিল বাঙালি জীবনের এক চরম রূপান্তরের কাল। ১৯৫১ সাল—দেশভাগের মাত্র চার বছর পরের এক জটিল ও ক্ষতবিক্ষত সময়। একদিকে ঔপনিবেশিক শাসনের দীর্ঘ ছায়া, অন্যদিকে নতুন রাজনৈতিক সীমানার ভেতরে এক নতুন সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিন্যাসের জন্ম হচ্ছিল। জমিদারি প্রথা উচ্ছেদের চূড়ান্ত আইনি প্রক্রিয়া তখন সবেমাত্র বাস্তবায়নের পথে। এমনই এক যুগসন্ধিক্ষণে গ্রামীণ বাংলার প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর অন্যতম মেরুদণ্ডে ছিলেন ‘নায়েব’ বা ভূস্বামী-জমিদারের প্রতিনিধিরা। প্রজাদের ওপর শোষণ, ক্ষমতার অপব্যবহার আর দুর্নীতির সমার্থক হয়ে ওঠা এই ‘নায়েব’ পদের সমান্তরালে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী এক চরিত্র ছিলেন আবদুর রহিম ভুঁইয়া, যিনি অনন্য মানব চরিত্রের এক জীবন্ত ইশতেহার।

১৯৫০ সালের রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনের মাধ্যমে জমিদারী প্রথা বিলুপ্ত হওয়ার পর, ১৯৫১ সাল থেকে সাবেক জমিদারদের খাজনা আদায়কারী নায়েব বা তহশিলদারেরা সরাসরি সরকারি কাঠামোয় যুক্ত হন।অর্থাৎ জমিদারদের অধীনতা থেকে মুক্ত হয়ে সরকারের রাজস্ব বিভাগের অধীনে আসেন।

বাস্তবিকই ১৯৫০ সালের জমিদারি উচ্ছেদ ও প্রজাস্বত্ব আইনের মাধ্যমে ১৯৫১ সালে ব্রিটিশ আমলের প্রথাগত জমিদারী ব্যবস্থার আনুষ্ঠানিক বিলুপ্তি ঘটে। জমিদারদের হাত থেকে জমির মালিকানা ও রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব সরাসরি সরকারের হাতে চলে গেলে এই বিশাল দায়িত্ব পড়ে নায়েব ও কানুনগোদের ওপর। ফলে সাধারণ মানুষের কাছে তারা ‘নতুন জমিদার’ হিসেবে আবির্ভূত হন।

পাকিস্তান আমল থেকে শুরু করে স্বাধীন বাংলাদেশ আমল পর্যন্ত তৃণমূল পর্যায়ে সরকারের সরাসরি প্রতিনিধি হিসেবে নায়েব ও কানুনগোরাই ছিলেন মুখ্য ব্যক্তি ও উজ্জীবক।

একজন নায়েব বা তহশিলদার একক ক্ষমতাবলে যেকোনো নথিপত্র পরিবর্তন, জালিয়াতি বা গায়েব করে দিতে পারতেন। উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের তদারকি কম থাকায় মাঠপর্যায়ের এই কর্মকর্তারাই হয়ে উঠেছিলেন ভূমির দণ্ডমুণ্ডের কর্তা।

১৯৫১ সাল থেকে ১৯৮৯ সালের মধ্যে মাঠপর্যায়ের ভূমি প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে অসদুপায় বা দুর্নীতি অবলম্বনের সুযোগ ছিল অসীম এবং একচেটিয়া। মূলত ১৯৫০ সালের জমিদারি অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন পাসের পর থেকে শুরু করে ১৯৮০-এর দশকের শেষভাগ পর্যন্ত প্রযুক্তিহীন শাসনব্যবস্থার কারণে একজন নায়েব ও কানুনগো আক্ষরিক অর্থেই যেকোনো ভূমির ‘ভাগ্যবিধাতা’ বনে গিয়েছিলেন।

তাদের এই অবাধ দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট ক্ষেত্র ও সুযোগগুলো ছিল বেশুমার। জমিদারি উচ্ছেদের পর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে জরুরি ভিত্তিতে ভূমির মালিকানা নির্ধারণে ‘এসএ রেকর্ড’ তৈরি করা হয়। নথিপত্র হালনাগাদের এই মহাযজ্ঞের সময় কানুনগো ও নায়েবদের হাতে ছিল প্রশ্নহীন ক্ষমতা। মাঠপর্যায়ে কে জমির প্রকৃত মালিক, তা তদারকি করার মতো শক্তিশালী কোনো ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ছিল না। ফলে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে তারা এক শরিকের জমি অন্য শরিকের নামে কিংবা অন্যের জোত-জমি সম্পূর্ণ প্রভাবশালী বা জালিয়াত চক্রের নামে খতিয়ানভুক্ত করে দিয়েছিলেন।

আইন অনুযায়ী হাট-বাজার, জলমহাল, ফেরিঘাট এবং জমিদারের পরিত্যক্ত জমি সরাসরি সরকারের (খাস জমি) অধীনে চলে আসে। এই কোটি কোটি টাকার সরকারি খাস জমি ভূমিহীনদের দেওয়ার কথা থাকলেও নায়েব-কানুনগোরা যোগসাজশ করে ভুয়া ব্যক্তিমালিকানা বা পত্তন (লিজ) দেখিয়ে নিজেদের নামে বা বিত্তশালীদের নামে রেকর্ড করে দিয়েছেন।

জমিদারি আমলের পুরোনো ও ব্যাকডেটেড (অতীতের তারিখের) খাজনা আদায়ের রসিদ বা দাখিলা জালিয়াতি করা ছিল তাদের বাঁহাতের খেল। টাকার বিনিময়ে জমিদারের ভুয়া পত্তনমূল তৈরি করে রাতারাতি একটি খাস জমিকে ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি হিসেবে সরকারি নথিতে ঢুকিয়ে দেওয়া হতো।

১৯৫০ সালের আইনে পরিবারপ্রতি জমির সর্বোচ্চ সীমা (সিলিং) প্রথমে ৩৭৫ বিঘা এবং পরবর্তীকালে তা আরও কমিয়ে আনা হয়। অতিরিক্ত জমি সরকারের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ধনী জোতদার ও জমিদাররা তাদের উদ্বৃত্ত জমি টিকিয়ে রাখতে নায়েব ও কানুনগোদের শরণাপন্ন হতেন। এই কর্মকর্তারা বিপুল ঘুষের বিনিময়ে বেনামি (ভুয়া ব্যক্তির নামে) দলিল বা আত্মীয়স্বজনের নামে জমি ভাগ করে দিয়ে সিলিং আইন ফাঁকি দিতে সাহায্য করতেন।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় এবং তার পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে বহু হিন্দু পরিবার এবং পাকিস্তানপন্থী মানুষ দেশ ত্যাগ করে। তাদের ফেলে যাওয়া এই বিশাল ‘পরিত্যক্ত সম্পত্তি’ এবং ‘শত্রু সম্পত্তি’ দেখাশোনার একক চাবিকাঠি ছিল ইউনিয়ন তহশিল অফিস (নায়েব) এবং সেটেলমেন্ট অফিসের (কানুনগো) কাছে। তারা এই জমিগুলো সরকারের খাতায় না তুলে জালিয়াতির মাধ্যমে নিজেদের আত্মীয়স্বজন বা প্রভাবশালী দখলদারদের নামে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত করে দিতেন।

সেই সময়ে সাধারণ প্রজারা ছিলেন চরম অশিক্ষিত এবং ভূমি আইন সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ। সমস্ত ল্যান্ড রেকর্ড (যেমন আরএস বা সিএস পর্চা) কানুনগোদের সেটেলমেন্ট অফিস বা নায়েবদের তহশিল অফিসে কাপড়ের গাঁটুরিতে বন্দি থাকত। সাধারণ মানুষের পক্ষে তা দেখা বা যাচাই করার কোনো সুযোগ ছিল না। নায়েব বা কানুনগো মুখে যা বলতেন, গ্রামীণ সমাজে সেটাই আইন হিসেবে গণ্য হতো।

নায়েব বা কানুনগোরা বেতনভুক্ত সরকারি কর্মচারী হলেও তাদের প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার কারণে বিপুল অর্থ ও সম্পদের মালিক হওয়ার বিস্তর সুযোগ ছিল।

প্রচলিত সামাজিক বাস্তবতায় এই পদগুলো ছিল বিপুল অবৈধ অর্থ উপার্জনের প্রলোভনে ঘেরা। ১৯৫১ সাল থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত দুর্বল তদারকি এবং কাগজে-কলমে বন্দি ভূমি ব্যবস্থার কারণে তৎকালীন নায়েব ও কানুনগোদের একটি বড় অংশ সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে রাতারাতি বিপুল অবৈধ সম্পদের মালিক হওয়ার সুযোগ পেয়েছিল।

কাগজে-কলমে জমিদারি বিলুপ্ত হলেও, সাধারণ মানুষের জমি রক্ষা ও খাজনা দেওয়ার জন্য এই পদাধিকারীদের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল থাকতে হতো। আর এই অসীম ক্ষমতার কারণেই লোকমুখে বলা হতো যে, সে সময়ে নায়েব বা কানুনগো হওয়া মানেই ‘জমিদার’ হওয়া।

সাধারণ মানুষের কাছে তাদের কলমের এক একটি খোঁচা ছিল ভাগ্য নির্ধারণের শামিল। ঘুষ, জবরদখল আর প্রভাবশালীদের তোষামোদি করে রাতারাতি ধনকুবের বনে যাওয়া যেখানে ছিল অলিখিত নিয়ম, সেখানে আবদুর রহিম ভুঁইয়া হেঁটেছিলেন সম্পূর্ণ উল্টো পথে। লোভের সেই উত্তাল সমুদ্রে তিনি ছিলেন এক অটল বাতিঘর।

তাঁর কর্মজীবনের ফাইলগুলো ঘাটলে দেখা যেত, কোনো এক প্রভাবশালী জমিদার বা জোতদার হয়তো বিঘার পর বিঘা জমি নিজের নামে লিখিয়ে নিতে বিপুল অর্থের লোভ দেখিয়েছেন, কিংবা দিয়েছেন চাকরিচ্যুতির হুমকি। কিন্তু এই মানুষটি মাথা নোয়াননি। তাঁর কাছে সরকারের আমানত আর গরিব চাষার হাহাকার ছিল নিজের জীবনের চেয়েও বড়। তিনি জানতেন, তাঁর একটা ভুল দস্তখত একটি পরিবারকে রাস্তায় বসিয়ে দিতে পারে। ফলে লোভের লালসাকে তিনি পায়ে ঠেলেছেন পরম অবহেলায়। আর এর মূল্যও তাঁকে চকাতে হয়েছে বারবার—অযাচিত বদলি, সহকর্মীদের বিদ্রূপ কিংবা ওপরমহলের কোপানলে পড়ে।

আবদুর রহিম ভুঁইয়ার সৎ থাকার পথটি কখনোই মসৃণ ছিল না। ক্ষমতার শীর্ষে থেকেও তাঁর ঘর ছিল টিনের চালের, তিনি সৌখিন ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন পুরুষ হলেও চলতেন গরিবী হালে। সন্তানদের হয়তো দামি কোনো আবদার তিনি মেটাতে পারেননি, কিন্তু তাদের খাইয়েছেন হালাল অন্ন। রাতে যখন তিনি ঘুমোতে যেতেন, তাঁর বুকে কোনো অপরাধবোধের পাথর চেপে বসত না। এই যে সততার কারণে এক ধরনের বৈরাগ্য ও সরল জীবনযাপন, এটাই ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ।

সৎভাবে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সৎ কর্মকর্তারা প্রায়শই আর্থিক টানাপোড়েনের মুখোমুখি হতেন। আবদুর রহিম ভূঁইয়া তেমনই একজন। বেতনের টাকায় সংসার চালাতে না পেরে পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি করে বা বাড়ি থেকে চাল ও টাকা এনে ঘাটতি পূরণ করতেন। এটি প্রমাণ করে যে, নিজের আদর্শ ও সততা ধরে রাখতে তিনি এবং তাঁর পরিবার কতটা বড় ত্যাগের মধ্য দিয়ে গেছেন।

কিশোরগঞ্জের মিঠামইন হাওর অঞ্চল ঐতিহাসিকভাবেই একটি প্রতিকূল, জনবিচ্ছিন্ন এবং সংগ্রামী এলাকা। ১৯৩৩ সাল থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত ওই সময়ে যাতায়াত ও জীবনযাত্রা আজকের চেয়েও অনেক বেশি কঠিন ছিল। এমন একটি প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে ওঠে এসে সরকারি চাকরিতে (তা-ও আবার ভূমি রাজস্ব বিভাগের মতো লোভনীয় শাখায়) দীর্ঘ ৩৮ বছর নিজের নীতিতে অটল থাকা এবং অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করা সত্যিই এক পর্বতসম ব্যক্তিত্বের পরিচয় দেয়।

ক্ষয়িষ্ণু সমাজে এই গল্প বড় বেশি প্রয়োজন:

আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি যেখানে সমাজ সফলতার সংজ্ঞা বদলে ফেলেছে। আজ যার যত টাকা, সে সমাজে তত বেশি সম্মানিত—তা সেই টাকা চুরির হোক কিংবা দুর্নীতির। এই করপোরেট আর বৈষয়িক ইঁদুরদৌড়ে আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের এই গৌরবোজ্জ্বল সৎ অতীতকে ভুলে যাচ্ছি। এই নায়েব ও কানুনগোর গল্প আজ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সমাজ সবসময় এতটা কলুষিত ছিল না। এই মাটি এমন মানুষদেরও জন্ম দিয়েছে যারা নীতিকে টাকার দাঁড়িপাল্লায় বিক্রি করেননি। বর্তমান আমলাতন্ত্র, যারা জনগণের সেবক না হয়ে শাসক বনে যান, তাদের জন্য এই জীবনগাথা একটি ‘নৈতিক কম্পাস’ হিসেবে কাজ করতে পারে।

নায়েব ও কানুনগো পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা হয়েও আবদুর রহিম ভুঁইয়া যে সৎ জীবনযাপন করে গেছেন, তা ধলাই নামক একটি গ্রামেই শুধু নয়, দেশ ও সমাজের জন্য একটি স্থায়ী অহংকার। বেতনের ঘাটতি মেটাতে গিয়ে বাড়ি থেকে বা পৈতৃক সম্পত্তি থেকে চাল ও টাকা এনে সংসার চালানো—আজকের যুগে যেখানে মানুষ অবৈধ উপায়ে সম্পদ গড়ার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত, সেখানে তাঁর এই গল্প নতুন প্রজন্মের কাছে হয়তো রূপকথার মতো মনে হবে।

রাষ্ট্রীয় বা প্রাতিষ্ঠানিক নথিতে অনেক সময় শুধু জন্ম-মৃত্যু আর চাকুরির মেয়াদটুকুই লেখা থাকে। কিন্তু একজন মানুষের আসল চরিত্র ও সততার সত্য ইতিহাস পরিবারের পরবর্তী প্রজন্ম, তাঁদের সহকর্মী অথবা স্থানীয় প্রবীণদের মুখে মুখে বা কোনো আঞ্চলিক স্মারকগ্রন্থে বেঁচে থাকে। অনেক সময় পরবর্তী প্রজন্ম বা কোনো লেখক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কিংবা কোনো সাংবাদিক পত্রিকায় নিবন্ধে এমন মানুষদের স্মৃতিচারণ করেন, যা বর্তমানের অবক্ষয়গ্রস্ত সমাজের জন্য একটি বড় বার্তা।

১৯৫০-এর দশকে নায়েব আবদুর রহিম ভুঁইয়া সরকারি চাকরির প্রশাসনিক ব্যস্ততার পাশাপাশি সমাজ সংস্কার, শিক্ষার আলো বিস্তার এবং জনকল্যাণমূলক কাজে নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে একজন প্রকৃত সামাজিক মানুষ, শিক্ষানুরাগী ও জনহিতৈষী হিসেবে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন।

মো. আবদুর রহিম ভুঁইয়া ১৯৪৭ সালে তদানীন্তন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে কৃতিত্বের সাথে মেট্রিকুলেশন পাশ করেন। অবিভক্ত ভারতের ঐতিহাসিক সময়ে বর্তমানে বাংলাদেশের জনবিচ্ছিন্ন হাওরাঞ্চলের এক অজপাড়াগাঁ থেকে মেট্রিকুলেশন পাশ করাটাই ছিল দুঃসাধ্য ও মেধার পরিচয়।

শিক্ষাজীবন শেষ করেই তিনি ১৯৪৭ সালের সুনামগঞ্জ জেলার জামালগঞ্জের সাচনায় কৃষি অফিসার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। তৎকালীন পূর্ব বাংলায় অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা ও প্রান্তিক গ্রামীণ ভূপ্রকৃতির রূপ পরিবর্তনে তিনি যে অবদান রেখেছিলেন, তা আজও লোকের মুখে মুখে। তিনি কৃষকের ফসল বন্যার কবল থেকে রক্ষা করতে সাচনায় হাওর রক্ষা বাঁধ নির্মাণ করেন। সেই যুগে প্রযুক্তি বা আধুনিক যন্ত্রপাতি না থাকায় এবং স্বল্প খরচে মাটি কাটতে নিজের এলাকা থেকে শ্রমিক এনে, অন্যদিকে হাতি দিয়ে মাটি মাড়িয়ে শক্ত করে সেই বাঁধ তৈরি করা হয়েছিল। সরকারের বরাদ্দকৃত অর্থ থেকে ২০ হাজার টাকা বাচিয়ে সরকারি কোষাগারে ফেরত দিয়ে বিপুল প্রশংসিত হন। ঐতিহাসিক এই কীর্তির কথা শ্রদ্ধাভরে আজও উচ্চারিত হয়।

কিন্তু অসাধু প্রশাসনের কোপানলে পড়ে দীর্ঘ পাঁচ বছরেও পদোন্নতি না হওয়ায় কৃষি বিভাগের চাকরি ছেড়ে দিয়ে নায়েব পদে ১৯৪৭ সালে ময়মনসিংহ জেলার নান্দাইলের মনোহরদী ভূমি অফিসে প্রথম যোগদান করে আরও চ্যালেঞ্জিং ও বন্ধুর পথ বেছে নেন।

মো. আবদুর রহিম ভুঁইয়া কেবল পঞ্চাশের দশকের একজন নায়েব বা ইতিহাসের পাতা থেকে হারিয়ে যাওয়া কোনো নাম নন; তিনি ছিলেন এক কালজয়ী আদর্শের মূর্ত প্রতীক। এমন এক যুগে তিনি জীবন অতিবাহিত করেছেন, যেখানে সততা বজায় রাখা ছিল জ্বলন্ত কয়লা হাতে রাখার মতো কঠিন। কিন্তু লোভ-লালসা আর জাগতিক মোহ কখনই তাঁর আত্মিক শক্তি ও নৈতিকতার দেয়াল ভাঙতে পারেনি।

তিনি ১৯৯২ সালের ১৬ ফেব্রয়ারি নিজ বাড়িতে মৃত্যুবরণ করেন। ৯০-এর দশকে তাঁর মহাপ্রয়াণের মধ্য দিয়ে একটি যুগের অবসান ঘটেছে সত্য, কিন্তু তিনি যে সততার বীজ বুনে গেছেন, তার সুবাস আজও সমাজকে ঋণী করে। আজ যখন চারদিকে মূল্যবোধের চরম আকাল, তখন আবদুর রহিম ভুঁইয়ার মতো মানুষদের জীবনের প্রতিটি পৃষ্ঠা আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়, সততার পথে চলার সাহস জোগায়।

ইতিহাসের ধুলোবালি থেকে এই সৎ মানুষদের টেনে এনে আলোতে রাখা কোনো স্রেফ স্মৃতিকথা নয়; এটি বর্তমান অবক্ষয় রুখতে সমাজের প্রতি আমাদের ঋণ শোধ করার প্রয়াস। সমাজকে বাঁচাতে হলে আমাদের আবার সেই ১৯৫০-এর দশকে ফিরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই, কিন্তু সেই যুগের কানুনগোর বুকের ভেতরের যে নীতি ও আদর্শ ছিল, তাকে আজকের তরুণদের বুকে ধারণ করতে হবে। বাতিটি নিভে যাওয়ার আগেই আমাদের এই সততার আলো ছড়াতে হবে, নয়তো আগামী প্রজন্ম অন্ধকারের তীব্রতায় পথ হারাবে।

তিনি পার্থিব পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেও বেঁচে আছেন মানুষের হৃদয়ে, শ্রদ্ধায় ও ভালোবাসায়। কারণ, শরীর নশ্বর হলেও আদর্শ অবিনশ্বর। তাই বিদায়বেলার সেই বিষাদকে ছাপিয়ে তাঁর রেখে যাওয়া কীর্তিই যেন আজও উচ্চস্বরে ঘোষণা করে—”তোমার কীর্তির চেয়ে তুমি যে মহৎ, / তাই তব জীবনের রথ।”

লেখক: সহযোগী সম্পাদক, আজকের সূর্যোদয়, ঢাকা