ঢাকা ০১:০১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর ২০২৬, ১৫ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
জনমুখী পুলিশিংয়ের মূল ভিত্তি হলো জনগণের আস্থা অর্জন : আইজিপি এআই-সেমিকন্ডাক্টর ও রোবটিক্সে গবেষণায় তরুণদের নীতিসহায়তার প্রতিশ্রুতি প্রধানমন্ত্রীর: স্বপন প্রধানমন্ত্রীর ফেনী সফর ঘিরে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ৪ স্তরের নিরাপত্তা প্রবীণদের আর্থিক নিরাপত্তা ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করবে সরকার : প্রধানমন্ত্রী নৌপথের ভাড়া বাড়িয়ে প্রজ্ঞাপন জারি দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা ও পরিকল্পনার কথা বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপিসহ তিন কমিটি বিলুপ্ত, বহিষ্কার ১৪ সঠিক প্যারেন্টিং যেভাবে গড়ে দেয় শিশুর ভবিষ্যৎ তারপরও দলে উন্নতির ছাপ দেখছেন হামজা মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি কাটেনি, নীতি সুদহার ৯.৫০ শতাংশে অপরিবর্তিত

মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি কাটেনি, নীতি সুদহার ৯.৫০ শতাংশে অপরিবর্তিত

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১২:১০:৫৪ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর ২০২৬
  • ৭ বার

মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও এর অন্তর্নিহিত চাপ এখনো পুরোপুরি কাটেনি। এর মধ্যে আগেভাগে মুদ্রানীতি শিথিল করলে মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশা আবারও বেড়ে যেতে পারে- এমন আশঙ্কায় নীতি সুদহার ৯ দশমিক ৫০ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতিপ্রকৃতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

অক্টোবর-ডিসেম্বর ২০২৬ প্রান্তিকের ত্রৈমাসিক মুদ্রানীতি ঘোষণা উপলক্ষে বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত অনুষ্ঠানে এসব তথ্য জানান ডেপুটি গভর্নর ড. হাবিবুর রহমান। তিনি জানান, গত ২৩ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত মুদ্রানীতি কমিটির (এমপিসি) ১৪তম সভায় নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

এর ফলে নীতি সুদহার ৯ দশমিক ৫০ শতাংশই থাকছে। একই সঙ্গে স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটি (এসএলএফ) ১১ শতাংশ এবং স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি (এসডিএফ) ৭ দশমিক ৫০ শতাংশে বহাল রাখা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মূল্যায়নে, সাম্প্রতিক সময়ে মূল্যস্ফীতির হার কমলেও দীর্ঘমেয়াদে তা নিয়ন্ত্রণে এসেছে- এমন পর্যাপ্ত প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। বরং বৈশ্বিক জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, হরমুজ প্রণালিতে সম্ভাব্য অচলাবস্থা, দেশে নিয়ন্ত্রিত জ্বালানির দামের ঊর্ধ্বমুখী সমন্বয় এবং নতুন বেতন কাঠামোর সম্ভাব্য প্রভাব মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন করে চাপ তৈরি করতে পারে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করছে, এই পরিস্থিতিতে আগেভাগে মুদ্রানীতি শিথিল করা হলে মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশা বাড়তে পারে। এতে মূল্যস্ফীতিকে লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

কমেছে খাদ্য মূল্যস্ফীতি, চাপ রয়ে গেছে খাদ্যবহির্ভূত পণ্যে

মুদ্রানীতির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুনে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। আগস্টে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে, যা গত ১০ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। খাদ্য মূল্যস্ফীতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে ৭ দশমিক ০২ শতাংশে নেমে আসাই সার্বিক মূল্যস্ফীতি কমার অন্যতম কারণ।

যদিও স্বস্তির পুরো চিত্র পাওয়া যাচ্ছে না খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের ক্ষেত্রে। আগস্টে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৩২ শতাংশ। ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও বিভিন্ন সেবার ব্যয় এখনো সাধারণ মানুষের ওপর উল্লেখযোগ্য চাপ তৈরি করছে।

এর সঙ্গে জ্বালানির মূল্য বাড়লে পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি জাতীয় বেতন কাঠামোর আংশিক বাস্তবায়ন মানুষের আয় ও চাহিদা বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করতে পারে বলে মনে করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

প্রবৃদ্ধিতে ধীরগতি, সংকুচিত শিল্প উৎপাদন

মূল্যস্ফীতির পাশাপাশি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতিও এখনো দুর্বল। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ। তবে ওই অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি মাত্র ২ দশমিক ২ শতাংশ হতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছে। একই সময়ে শিল্প উৎপাদন ০ দশমিক ২৮ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, শিল্প ও বিদ্যুৎ উৎপাদন, জ্বালানি সরবরাহ এবং বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধিসহ বিভিন্ন সূচক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মন্থরতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। যদিও ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে অর্থনীতিতে কিছুটা পুনরুদ্ধারের লক্ষণ দেখা গেছে।

উচ্চ সুদে অর্থায়ন, জ্বালানি ঘাটতি, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং দেশি-বিদেশি চাহিদা নিয়ে অনিশ্চয়তাকে প্রবৃদ্ধির প্রধান বাধা হিসেবে চিহ্নিত করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

পুনরুদ্ধারে ৬০ হাজার কোটি টাকার সহায়তা

অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে বিভিন্ন খাতে সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বন্ধ কারখানা পুনরায় চালুর জন্য ২০ হাজার কোটি টাকাসহ মোট ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজের কথা মুদ্রানীতিতে তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি কৃষি, ক্ষুদ্র, কুটির, ছোট ও মাঝারি শিল্প এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণে পুনঃঅর্থায়ন প্রকল্পের মাধ্যমে অর্থায়ন বাড়ানোর উদ্যোগ রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, শুধু মুদ্রানীতির মাধ্যমে অর্থনীতির সরবরাহসংক্রান্ত বাধা দূর করা সম্ভব নয়। বিনিয়োগ ও উৎপাদন বাড়াতে আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি কাঠামোগত সংস্কারও প্রয়োজন।

বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি মাত্র ৪.৭৫ শতাংশ

গত ২ আগস্ট নীতি সুদহার ৫০ ভিত্তি পয়েন্ট কমিয়ে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ কার্যকর করা হলেও বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা ও বিতরণে বড় ধরনের গতি ফেরেনি। আগস্টে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, বিনিয়োগে মন্থরতা, ঋণগ্রহীতাদের উচ্চ ঝুঁকি এবং ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা বেসরকারি ঋণের চাহিদা কম থাকার অন্যতম কারণ।

অন্যদিকে ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতাও অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে রয়েছে। ২০২৬ সালের জুনে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের অনুপাত বেড়ে ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এ পরিস্থিতিতে ব্যাংক পুনর্গঠন, সুশাসন নিশ্চিত করা, মূলধন পুনরুদ্ধার এবং ঋণ শৃঙ্খলা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

রেমিট্যান্সে স্বস্তি, লেনদেন ভারসাম্যে ঘাটতি

বৈদেশিক খাতে অবশ্য কিছুটা স্বস্তি রয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের ব্যালেন্স অব পেমেন্টস বা বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যে ৬ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারের উদ্বৃত্ত হয়েছে। তবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে সামগ্রিক লেনদেন ভারসাম্যে ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এর প্রধান কারণ আর্থিক হিসাবের ঘাটতি।

এ সময়ে রেমিট্যান্স প্রবাহ ১৮ দশমিক ৯০ শতাংশ বেড়েছে। পাশাপাশি বিনিময় হার মোটামুটি স্থিতিশীল থাকায় আমদানিজনিত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণেও সহায়তা মিলেছে।

দ্রুত নয়, ধীরগতির পুনরুদ্ধারের প্রত্যাশা

আগামী অর্থবছরে দেশের অর্থনীতিতে দ্রুত পুনরুদ্ধারের পরিবর্তে ধীরগতির পুনরুদ্ধার হতে পারে বলে ধারণা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর পূর্বাভাসেও রয়েছে ভিন্নতা।

বিশ্বব্যাংক ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৬ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) তাদের আগের ৪ দশমিক ৩ শতাংশের পূর্বাভাস কমিয়ে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ করেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করছে, আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ধীরে ধীরে কমতে পারে। তবে সেই পতনের গতি নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে।

মূল্যস্ফীতি ও প্রবৃদ্ধিতে বহুমুখী ঝুঁকি

আগামী দিনের অর্থনীতির জন্য বেশ কয়েকটি ঝুঁকি চিহ্নিত করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর মধ্যে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত, হরমুজ প্রণালিতে সম্ভাব্য বিঘ্ন, বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও সারের উচ্চমূল্য এবং কঠোর বৈশ্বিক মুদ্রানীতি।

দেশের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, রাজস্ব খাতের চাপ, জাতীয় বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন এবং ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতাকেও অর্থনীতির জন্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, মূল্যস্ফীতি কমানোর প্রক্রিয়া ব্যাহত না করে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সহায়তা করাই এখন মুদ্রানীতির প্রধান চ্যালেঞ্জ। এ জন্য বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিতে সুনির্দিষ্ট ঋণ সহায়তা, কাঠামোগত সংস্কার, আর্থিক খাতকে শক্তিশালী করা এবং বিনিময় হারকে সুশৃঙ্খলভাবে নমনীয় রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মূল্য স্থিতিশীলতা, বৈদেশিক খাতের ভারসাম্য ও আর্থিক ব্যবস্থার দৃঢ়তা বজায় রেখে টেকসই অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার নিশ্চিত করাই এখন মুদ্রানীতির মূল লক্ষ্য।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

জনমুখী পুলিশিংয়ের মূল ভিত্তি হলো জনগণের আস্থা অর্জন : আইজিপি

মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি কাটেনি, নীতি সুদহার ৯.৫০ শতাংশে অপরিবর্তিত

আপডেট টাইম : ১২:১০:৫৪ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর ২০২৬

মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও এর অন্তর্নিহিত চাপ এখনো পুরোপুরি কাটেনি। এর মধ্যে আগেভাগে মুদ্রানীতি শিথিল করলে মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশা আবারও বেড়ে যেতে পারে- এমন আশঙ্কায় নীতি সুদহার ৯ দশমিক ৫০ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতিপ্রকৃতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

অক্টোবর-ডিসেম্বর ২০২৬ প্রান্তিকের ত্রৈমাসিক মুদ্রানীতি ঘোষণা উপলক্ষে বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত অনুষ্ঠানে এসব তথ্য জানান ডেপুটি গভর্নর ড. হাবিবুর রহমান। তিনি জানান, গত ২৩ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত মুদ্রানীতি কমিটির (এমপিসি) ১৪তম সভায় নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

এর ফলে নীতি সুদহার ৯ দশমিক ৫০ শতাংশই থাকছে। একই সঙ্গে স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটি (এসএলএফ) ১১ শতাংশ এবং স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি (এসডিএফ) ৭ দশমিক ৫০ শতাংশে বহাল রাখা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মূল্যায়নে, সাম্প্রতিক সময়ে মূল্যস্ফীতির হার কমলেও দীর্ঘমেয়াদে তা নিয়ন্ত্রণে এসেছে- এমন পর্যাপ্ত প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। বরং বৈশ্বিক জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, হরমুজ প্রণালিতে সম্ভাব্য অচলাবস্থা, দেশে নিয়ন্ত্রিত জ্বালানির দামের ঊর্ধ্বমুখী সমন্বয় এবং নতুন বেতন কাঠামোর সম্ভাব্য প্রভাব মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন করে চাপ তৈরি করতে পারে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করছে, এই পরিস্থিতিতে আগেভাগে মুদ্রানীতি শিথিল করা হলে মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশা বাড়তে পারে। এতে মূল্যস্ফীতিকে লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

কমেছে খাদ্য মূল্যস্ফীতি, চাপ রয়ে গেছে খাদ্যবহির্ভূত পণ্যে

মুদ্রানীতির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুনে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। আগস্টে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে, যা গত ১০ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। খাদ্য মূল্যস্ফীতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে ৭ দশমিক ০২ শতাংশে নেমে আসাই সার্বিক মূল্যস্ফীতি কমার অন্যতম কারণ।

যদিও স্বস্তির পুরো চিত্র পাওয়া যাচ্ছে না খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের ক্ষেত্রে। আগস্টে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৩২ শতাংশ। ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও বিভিন্ন সেবার ব্যয় এখনো সাধারণ মানুষের ওপর উল্লেখযোগ্য চাপ তৈরি করছে।

এর সঙ্গে জ্বালানির মূল্য বাড়লে পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি জাতীয় বেতন কাঠামোর আংশিক বাস্তবায়ন মানুষের আয় ও চাহিদা বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করতে পারে বলে মনে করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

প্রবৃদ্ধিতে ধীরগতি, সংকুচিত শিল্প উৎপাদন

মূল্যস্ফীতির পাশাপাশি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতিও এখনো দুর্বল। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ। তবে ওই অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি মাত্র ২ দশমিক ২ শতাংশ হতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছে। একই সময়ে শিল্প উৎপাদন ০ দশমিক ২৮ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, শিল্প ও বিদ্যুৎ উৎপাদন, জ্বালানি সরবরাহ এবং বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধিসহ বিভিন্ন সূচক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মন্থরতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। যদিও ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে অর্থনীতিতে কিছুটা পুনরুদ্ধারের লক্ষণ দেখা গেছে।

উচ্চ সুদে অর্থায়ন, জ্বালানি ঘাটতি, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং দেশি-বিদেশি চাহিদা নিয়ে অনিশ্চয়তাকে প্রবৃদ্ধির প্রধান বাধা হিসেবে চিহ্নিত করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

পুনরুদ্ধারে ৬০ হাজার কোটি টাকার সহায়তা

অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে বিভিন্ন খাতে সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বন্ধ কারখানা পুনরায় চালুর জন্য ২০ হাজার কোটি টাকাসহ মোট ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজের কথা মুদ্রানীতিতে তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি কৃষি, ক্ষুদ্র, কুটির, ছোট ও মাঝারি শিল্প এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণে পুনঃঅর্থায়ন প্রকল্পের মাধ্যমে অর্থায়ন বাড়ানোর উদ্যোগ রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, শুধু মুদ্রানীতির মাধ্যমে অর্থনীতির সরবরাহসংক্রান্ত বাধা দূর করা সম্ভব নয়। বিনিয়োগ ও উৎপাদন বাড়াতে আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি কাঠামোগত সংস্কারও প্রয়োজন।

বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি মাত্র ৪.৭৫ শতাংশ

গত ২ আগস্ট নীতি সুদহার ৫০ ভিত্তি পয়েন্ট কমিয়ে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ কার্যকর করা হলেও বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা ও বিতরণে বড় ধরনের গতি ফেরেনি। আগস্টে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, বিনিয়োগে মন্থরতা, ঋণগ্রহীতাদের উচ্চ ঝুঁকি এবং ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা বেসরকারি ঋণের চাহিদা কম থাকার অন্যতম কারণ।

অন্যদিকে ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতাও অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে রয়েছে। ২০২৬ সালের জুনে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের অনুপাত বেড়ে ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এ পরিস্থিতিতে ব্যাংক পুনর্গঠন, সুশাসন নিশ্চিত করা, মূলধন পুনরুদ্ধার এবং ঋণ শৃঙ্খলা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

রেমিট্যান্সে স্বস্তি, লেনদেন ভারসাম্যে ঘাটতি

বৈদেশিক খাতে অবশ্য কিছুটা স্বস্তি রয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের ব্যালেন্স অব পেমেন্টস বা বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যে ৬ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারের উদ্বৃত্ত হয়েছে। তবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে সামগ্রিক লেনদেন ভারসাম্যে ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এর প্রধান কারণ আর্থিক হিসাবের ঘাটতি।

এ সময়ে রেমিট্যান্স প্রবাহ ১৮ দশমিক ৯০ শতাংশ বেড়েছে। পাশাপাশি বিনিময় হার মোটামুটি স্থিতিশীল থাকায় আমদানিজনিত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণেও সহায়তা মিলেছে।

দ্রুত নয়, ধীরগতির পুনরুদ্ধারের প্রত্যাশা

আগামী অর্থবছরে দেশের অর্থনীতিতে দ্রুত পুনরুদ্ধারের পরিবর্তে ধীরগতির পুনরুদ্ধার হতে পারে বলে ধারণা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর পূর্বাভাসেও রয়েছে ভিন্নতা।

বিশ্বব্যাংক ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৬ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) তাদের আগের ৪ দশমিক ৩ শতাংশের পূর্বাভাস কমিয়ে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ করেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করছে, আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ধীরে ধীরে কমতে পারে। তবে সেই পতনের গতি নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে।

মূল্যস্ফীতি ও প্রবৃদ্ধিতে বহুমুখী ঝুঁকি

আগামী দিনের অর্থনীতির জন্য বেশ কয়েকটি ঝুঁকি চিহ্নিত করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর মধ্যে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত, হরমুজ প্রণালিতে সম্ভাব্য বিঘ্ন, বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও সারের উচ্চমূল্য এবং কঠোর বৈশ্বিক মুদ্রানীতি।

দেশের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, রাজস্ব খাতের চাপ, জাতীয় বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন এবং ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতাকেও অর্থনীতির জন্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, মূল্যস্ফীতি কমানোর প্রক্রিয়া ব্যাহত না করে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সহায়তা করাই এখন মুদ্রানীতির প্রধান চ্যালেঞ্জ। এ জন্য বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিতে সুনির্দিষ্ট ঋণ সহায়তা, কাঠামোগত সংস্কার, আর্থিক খাতকে শক্তিশালী করা এবং বিনিময় হারকে সুশৃঙ্খলভাবে নমনীয় রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মূল্য স্থিতিশীলতা, বৈদেশিক খাতের ভারসাম্য ও আর্থিক ব্যবস্থার দৃঢ়তা বজায় রেখে টেকসই অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার নিশ্চিত করাই এখন মুদ্রানীতির মূল লক্ষ্য।