ঢাকা ০৯:১২ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৩ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
ডেইলি ট্রেডিংয়ের ১০ লটে ৩ লাখ ৮০ হাজার টন সার অনিশ্চিত সংবিধানে ফিরছে ‘আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা’; জানুয়ারিতে সংশোধন বিল, পাস হলেই গণভোট ধ্বংসস্তূপ থেকে যেভাবে উদ্ধার করা হয়েছিল অলৌকিকভাবে বেঁচে যাওয়া মুজতবা খামেনিকে আন্তঃদেশীয় অপরাধ মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় গুরুত্বারোপ আইনমন্ত্রীর জুলাই-আগস্টে ৮ হাজার ৬২৬ কোটি টাকার বিদেশি ঋণ পরিশোধ নিয়ন্ত্রণে আসছে রুট-জোনভিত্তিক কোটা জাসদ কার্যালয় থেকে আটক ২৪৯ জনকে ছেড়ে দিয়েছে পুলিশ নিয়োগপত্র হাতে না পাওয়া পর্যন্ত কর্মসূচি চালিয়ে যাবেন প্রাথমিকের বঞ্চিতরা সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলার ‘মূল পরিকল্পনাকারী’ গ্রেপ্তার শেখ হাসিনা আসবেন না, দিল্লিতে বসে ষড়যন্ত্র করছেন: মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী

ডেইলি ট্রেডিংয়ের ১০ লটে ৩ লাখ ৮০ হাজার টন সার অনিশ্চিত

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ০৮:৪০:৫৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ৫ বার

Oplus_16908288

লে-ক্যান পেরোলেও জাহাজের হদিস নেই, তবু কেন বারবার কার্যাদেশ?

হাওর বার্তা ডেক্সঃ রবি মৌসুম সামনে রেখে সার সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকার যখন বিপুল পরিমাণ সার আমদানি ও আগাম মজুতের উদ্যোগ নিয়েছে, ঠিক তখনই সরকারি সংস্থার সার পরিবহন কার্যাদেশ ঘিরে উঠেছে নানা প্রশ্ন। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ডেইলি ট্রেডিং নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে মরক্কো ও সৌদি আরব থেকে জিটুজি ব্যবস্থায় আমদানি করা টিএসপি ও ডিএপি সার পরিবহনের জন্য মোট ১০টি লটে প্রায় ৩ লাখ ৮০ হাজার মেট্রিক টনের কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে।

তবে কার্যাদেশ পাওয়া প্রতিষ্ঠানটির প্রথম আটটি লটের লে-ক্যানের সময়সীমা ২৭ সেপ্টেম্বরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময়ে সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলো লোডিং বন্দরে পৌঁছেছে কি না, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। জাহাজের বর্তমান অবস্থান, কখন লোডিং হবে এবং কবে সার দেশে পৌঁছাবে—এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে সুস্পষ্ট তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না।

একদিকে কার্যাদেশ, অন্যদিকে লে-ক্যানের সময়সীমা অতিক্রম—এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে, আগের লটগুলোর বাস্তবায়ন পরিস্থিতি স্পষ্ট না হওয়ার পরও একই প্রতিষ্ঠানকে পরবর্তী লটগুলোর জন্য কার্যাদেশ দেওয়ার প্রক্রিয়া কীভাবে এগোল?
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সার পরিবহনে লে-ক্যান হচ্ছে জাহাজের নির্ধারিত লোডিং সময়সীমা। এ সময়ের মধ্যে জাহাজ লোডিং বন্দরে না পৌঁছালে সার লোডিং পিছিয়ে যেতে পারে। এরপর সমুদ্রযাত্রা, বন্দরে জাহাজ ভেড়ানো, খালাস, ব্যাগিং, পরিবহন এবং গুদামে পৌঁছানোর মতো একাধিক ধাপ রয়েছে। ফলে শুরুতেই বিলম্ব হলে তার প্রভাব পুরো সরবরাহ ব্যবস্থায় পড়তে পারে।

বিশেষ করে রবি মৌসুমের আগে এ ধরনের বিলম্বের গুরুত্ব আরও বেশি। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবর মাসে দেশে টিএসপির চাহিদা ৭০ হাজার ৫২ টন, ডিএপির ১ লাখ ৫০ হাজার ৯১০ টন এবং এমওপির ৯৩ হাজার ৬৫৪ টন নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে সরকার রবি-বোরো মৌসুমের জন্য আগাম সার মজুত ও সরবরাহ নিশ্চিত করার কথা জানিয়েছে। এ সময়ে নির্ধারিত চালান সময়মতো দেশে না এলে সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় বাড়তি চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

১০ লটে কেন একই প্রতিষ্ঠান?

ডেইলি ট্রেডিংয়ের নামে ধারাবাহিকভাবে ১০টি লটে প্রায় ৩ লাখ ৮০ হাজার টন সার পরিবহনের কার্যাদেশ দেওয়ার বিষয়টিই এখন সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোনো প্রতিষ্ঠানকে একাধিক লটে বিপুল পরিমাণ সার পরিবহনের দায়িত্ব দেওয়া হলে প্রতিটি লটের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটির সক্ষমতা, আগের কাজের পারফরম্যান্স, জাহাজ সংগ্রহের সক্ষমতা, চার্টারারের সক্ষমতা এবং নির্ধারিত সময়ে পণ্য পরিবহনের সামর্থ্য মূল্যায়ন করা হয়েছিল কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন।

বিশেষ করে প্রথম কয়েকটি লটের বাস্তবায়ন পরিস্থিতি যখন প্রশ্নের মুখে, তখন পরবর্তী লটের কার্যাদেশ কীভাবে অনুমোদিত হলো—এ প্রশ্নের উত্তরও প্রয়োজন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র অনুযায়ী, ডেইলি ট্রেডিংয়ের ৯ম ও ১০ম লটের লে-ক্যান নির্ধারিত রয়েছে ৭ থেকে ৯ অক্টোবর। প্রথম আটটি লটের জাহাজ, লোডিং এবং সরবরাহ পরিস্থিতি স্পষ্ট হওয়ার আগেই পরবর্তী দুটি লটের পরিবহন পরিকল্পনা কীভাবে এগোল, সেটিও এখন খতিয়ে দেখার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চুক্তির শাস্তিমূলক ধারা কার্যকর হয়েছে কি?
লে-ক্যান অতিক্রমের পর চুক্তির শর্ত অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

একজন সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, লে-ক্যান পেরিয়ে গেলে প্রথমেই জাহাজ কোথায় রয়েছে এবং কেন সময়মতো পৌঁছাতে পারেনি, তা যাচাই করা প্রয়োজন। এরপর চুক্তির শর্ত অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি সামনে আসে।
তার মতে, সংশ্লিষ্ট জাহাজের নাম, আইএমও নম্বর, চার্টার পার্টি, লোডিং পোর্ট এবং জাহাজের সর্বশেষ অবস্থান যাচাই করা হলে কার্যাদেশ বাস্তবায়নের প্রকৃত চিত্র অনেকটাই স্পষ্ট হতে পারে।

বিএডিসির ক্রয় কর্মকর্তার বক্তব্য

বিষয়টি নিয়ে বিএডিসির ম্যানেজার (ক্রয়) আহমেদ হাসান আল মাহমুদের কাছে জানতে চাওয়া হয়—লে-ক্যানের মধ্যে জাহাজ না পৌঁছালে চুক্তি অনুযায়ী কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলোর নাম ও বর্তমান অবস্থান কী, জাহাজ ও চার্টারার যাচাই করা হয়েছিল কি না, আগের লটগুলোর বাস্তবায়ন মূল্যায়ন করা হয়েছিল কি না এবং বিলম্বের জন্য কোনো জরিমানা বা ক্ষতিপূরণ আদায়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে কি না।

এ ছাড়া আগের কার্যাদেশের বাস্তবায়ন স্পষ্ট না হওয়ার পরও একই প্রতিষ্ঠানকে পরবর্তী কার্যাদেশ দেওয়ার কারণ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় বিএডিসি ও বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) কোন কর্মকর্তারা যুক্ত ছিলেন—এসব বিষয়েও জানতে চাওয়া হয়।

জবাবে তিনি বলেন, “আমি একটু পরে কল করছি।”
এরপর একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

মন্ত্রণালয়ের নজরে বিষয়টি

বিষয়টি নিয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বিএডিসির সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলা হয়েছে। ডেইলি ট্রেডিংয়ের বিরুদ্ধে আইনানুগভাবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি জানান।

তবে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, কিংবা এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু হয়েছে কি না, তা প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত বিস্তারিত জানা যায়নি।

যোগসাজশের অভিযোগ

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ডেইলি ট্রেডিংকে ধারাবাহিকভাবে কার্যাদেশ দেওয়ার ক্ষেত্রে বিএডিসি ও বিএসসির কিছু কর্মকর্তার সঙ্গে যোগসাজশ এবং আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

তবে এ অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে টেন্ডার নথি, দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির কার্যবিবরণী, কার্যাদেশ, অনুমোদন নোট, চুক্তিপত্র, সংশ্লিষ্ট জাহাজের তথ্য, চার্টারার নিয়োগসংক্রান্ত কাগজপত্র এবং অর্থ পরিশোধের নথি পর্যালোচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বড় আমদানি পরিকল্পনার মধ্যে পরিবহন নিয়ে প্রশ্ন
রবি-বোরো মৌসুম সামনে রেখে সরকার ইতোমধ্যে বড় পরিসরে সার আমদানির অনুমোদন দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২৪ আগস্টের এক বৈঠকে ৩ লাখ ৬৫ হাজার টন সার আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়। এর মধ্যে মরক্কো থেকে জিটুজি ব্যবস্থায় ডিএপি ও টিএসপি আমদানির একাধিক লট রয়েছে।

এ ছাড়া ১৬ সেপ্টেম্বর আরও ১০ লাখ ৭৫ হাজার টন সার আমদানির বিভিন্ন প্রস্তাব অনুমোদিত হয়েছে। এর মধ্যেও মরক্কো থেকে ডিএপি আমদানির একাধিক লট রয়েছে।

সরকারের আমদানি পরিকল্পনা বড় হলেও আমদানি করা সার সময়মতো দেশে পৌঁছানো এবং মাঠপর্যায়ে সরবরাহ নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। পরিবহন পর্যায়ে লে-ক্যান অতিক্রম, জাহাজের অনিশ্চয়তা কিংবা কার্যাদেশ বাস্তবায়নে বিলম্ব হলে আমদানির অনুমোদন থাকলেও মাঠপর্যায়ে সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় চাপ তৈরি হতে পারে।

ডেইলি ট্রেডিংয়ের ১০টি লটে প্রায় ৩ লাখ ৮০ হাজার টন সার পরিবহনের ঘটনায় এখন অন্তত তিনটি প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন। লে-ক্যান অতিক্রান্ত প্রথম আটটি লটের জাহাজগুলো কোথায়? নির্ধারিত সময়ে জাহাজ না পৌঁছালে চুক্তি অনুযায়ী বিএডিসি কী ব্যবস্থা নিয়েছে? আর আগের কার্যাদেশগুলোর বাস্তবায়ন পরিস্থিতি স্পষ্ট হওয়ার আগেই একই প্রতিষ্ঠানকে পরবর্তী কার্যাদেশ দেওয়ার যৌক্তিকতা কী?

এসব প্রশ্নের উত্তর শুধু একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কার্যাদেশের হিসাব নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার, সার আমদানি ও পরিবহন ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা এবং রবি মৌসুমে কৃষকের প্রয়োজনীয় সার সময়মতো মাঠে পৌঁছানোর বিষয়টি।

তাই কার্যাদেশ থেকে জাহাজ, লে-ক্যান থেকে লোডিং, সমুদ্রযাত্রা থেকে খালাস এবং শেষ পর্যন্ত গুদাম ও ডিলার পর্যায়ে সরবরাহ—পুরো প্রক্রিয়াটি নথিভিত্তিকভাবে যাচাই করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
লে-ক্যান পেরিয়েও যদি জাহাজের অবস্থান স্পষ্ট না হয়, আগের কার্যাদেশের বাস্তবায়নও যদি পরিষ্কার না হয়, তাহলে একই প্রতিষ্ঠানের নামে ধারাবাহিক কার্যাদেশের দায় ও সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক। এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকেই এসব প্রশ্নের স্পষ্ট জবাব প্রত্যাশিত।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

ডেইলি ট্রেডিংয়ের ১০ লটে ৩ লাখ ৮০ হাজার টন সার অনিশ্চিত

ডেইলি ট্রেডিংয়ের ১০ লটে ৩ লাখ ৮০ হাজার টন সার অনিশ্চিত

আপডেট টাইম : ০৮:৪০:৫৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

লে-ক্যান পেরোলেও জাহাজের হদিস নেই, তবু কেন বারবার কার্যাদেশ?

হাওর বার্তা ডেক্সঃ রবি মৌসুম সামনে রেখে সার সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকার যখন বিপুল পরিমাণ সার আমদানি ও আগাম মজুতের উদ্যোগ নিয়েছে, ঠিক তখনই সরকারি সংস্থার সার পরিবহন কার্যাদেশ ঘিরে উঠেছে নানা প্রশ্ন। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ডেইলি ট্রেডিং নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে মরক্কো ও সৌদি আরব থেকে জিটুজি ব্যবস্থায় আমদানি করা টিএসপি ও ডিএপি সার পরিবহনের জন্য মোট ১০টি লটে প্রায় ৩ লাখ ৮০ হাজার মেট্রিক টনের কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে।

তবে কার্যাদেশ পাওয়া প্রতিষ্ঠানটির প্রথম আটটি লটের লে-ক্যানের সময়সীমা ২৭ সেপ্টেম্বরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময়ে সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলো লোডিং বন্দরে পৌঁছেছে কি না, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। জাহাজের বর্তমান অবস্থান, কখন লোডিং হবে এবং কবে সার দেশে পৌঁছাবে—এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে সুস্পষ্ট তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না।

একদিকে কার্যাদেশ, অন্যদিকে লে-ক্যানের সময়সীমা অতিক্রম—এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে, আগের লটগুলোর বাস্তবায়ন পরিস্থিতি স্পষ্ট না হওয়ার পরও একই প্রতিষ্ঠানকে পরবর্তী লটগুলোর জন্য কার্যাদেশ দেওয়ার প্রক্রিয়া কীভাবে এগোল?
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সার পরিবহনে লে-ক্যান হচ্ছে জাহাজের নির্ধারিত লোডিং সময়সীমা। এ সময়ের মধ্যে জাহাজ লোডিং বন্দরে না পৌঁছালে সার লোডিং পিছিয়ে যেতে পারে। এরপর সমুদ্রযাত্রা, বন্দরে জাহাজ ভেড়ানো, খালাস, ব্যাগিং, পরিবহন এবং গুদামে পৌঁছানোর মতো একাধিক ধাপ রয়েছে। ফলে শুরুতেই বিলম্ব হলে তার প্রভাব পুরো সরবরাহ ব্যবস্থায় পড়তে পারে।

বিশেষ করে রবি মৌসুমের আগে এ ধরনের বিলম্বের গুরুত্ব আরও বেশি। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবর মাসে দেশে টিএসপির চাহিদা ৭০ হাজার ৫২ টন, ডিএপির ১ লাখ ৫০ হাজার ৯১০ টন এবং এমওপির ৯৩ হাজার ৬৫৪ টন নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে সরকার রবি-বোরো মৌসুমের জন্য আগাম সার মজুত ও সরবরাহ নিশ্চিত করার কথা জানিয়েছে। এ সময়ে নির্ধারিত চালান সময়মতো দেশে না এলে সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় বাড়তি চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

১০ লটে কেন একই প্রতিষ্ঠান?

ডেইলি ট্রেডিংয়ের নামে ধারাবাহিকভাবে ১০টি লটে প্রায় ৩ লাখ ৮০ হাজার টন সার পরিবহনের কার্যাদেশ দেওয়ার বিষয়টিই এখন সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোনো প্রতিষ্ঠানকে একাধিক লটে বিপুল পরিমাণ সার পরিবহনের দায়িত্ব দেওয়া হলে প্রতিটি লটের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটির সক্ষমতা, আগের কাজের পারফরম্যান্স, জাহাজ সংগ্রহের সক্ষমতা, চার্টারারের সক্ষমতা এবং নির্ধারিত সময়ে পণ্য পরিবহনের সামর্থ্য মূল্যায়ন করা হয়েছিল কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন।

বিশেষ করে প্রথম কয়েকটি লটের বাস্তবায়ন পরিস্থিতি যখন প্রশ্নের মুখে, তখন পরবর্তী লটের কার্যাদেশ কীভাবে অনুমোদিত হলো—এ প্রশ্নের উত্তরও প্রয়োজন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র অনুযায়ী, ডেইলি ট্রেডিংয়ের ৯ম ও ১০ম লটের লে-ক্যান নির্ধারিত রয়েছে ৭ থেকে ৯ অক্টোবর। প্রথম আটটি লটের জাহাজ, লোডিং এবং সরবরাহ পরিস্থিতি স্পষ্ট হওয়ার আগেই পরবর্তী দুটি লটের পরিবহন পরিকল্পনা কীভাবে এগোল, সেটিও এখন খতিয়ে দেখার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চুক্তির শাস্তিমূলক ধারা কার্যকর হয়েছে কি?
লে-ক্যান অতিক্রমের পর চুক্তির শর্ত অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

একজন সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, লে-ক্যান পেরিয়ে গেলে প্রথমেই জাহাজ কোথায় রয়েছে এবং কেন সময়মতো পৌঁছাতে পারেনি, তা যাচাই করা প্রয়োজন। এরপর চুক্তির শর্ত অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি সামনে আসে।
তার মতে, সংশ্লিষ্ট জাহাজের নাম, আইএমও নম্বর, চার্টার পার্টি, লোডিং পোর্ট এবং জাহাজের সর্বশেষ অবস্থান যাচাই করা হলে কার্যাদেশ বাস্তবায়নের প্রকৃত চিত্র অনেকটাই স্পষ্ট হতে পারে।

বিএডিসির ক্রয় কর্মকর্তার বক্তব্য

বিষয়টি নিয়ে বিএডিসির ম্যানেজার (ক্রয়) আহমেদ হাসান আল মাহমুদের কাছে জানতে চাওয়া হয়—লে-ক্যানের মধ্যে জাহাজ না পৌঁছালে চুক্তি অনুযায়ী কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলোর নাম ও বর্তমান অবস্থান কী, জাহাজ ও চার্টারার যাচাই করা হয়েছিল কি না, আগের লটগুলোর বাস্তবায়ন মূল্যায়ন করা হয়েছিল কি না এবং বিলম্বের জন্য কোনো জরিমানা বা ক্ষতিপূরণ আদায়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে কি না।

এ ছাড়া আগের কার্যাদেশের বাস্তবায়ন স্পষ্ট না হওয়ার পরও একই প্রতিষ্ঠানকে পরবর্তী কার্যাদেশ দেওয়ার কারণ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় বিএডিসি ও বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) কোন কর্মকর্তারা যুক্ত ছিলেন—এসব বিষয়েও জানতে চাওয়া হয়।

জবাবে তিনি বলেন, “আমি একটু পরে কল করছি।”
এরপর একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

মন্ত্রণালয়ের নজরে বিষয়টি

বিষয়টি নিয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বিএডিসির সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলা হয়েছে। ডেইলি ট্রেডিংয়ের বিরুদ্ধে আইনানুগভাবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি জানান।

তবে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, কিংবা এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু হয়েছে কি না, তা প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত বিস্তারিত জানা যায়নি।

যোগসাজশের অভিযোগ

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ডেইলি ট্রেডিংকে ধারাবাহিকভাবে কার্যাদেশ দেওয়ার ক্ষেত্রে বিএডিসি ও বিএসসির কিছু কর্মকর্তার সঙ্গে যোগসাজশ এবং আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

তবে এ অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে টেন্ডার নথি, দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির কার্যবিবরণী, কার্যাদেশ, অনুমোদন নোট, চুক্তিপত্র, সংশ্লিষ্ট জাহাজের তথ্য, চার্টারার নিয়োগসংক্রান্ত কাগজপত্র এবং অর্থ পরিশোধের নথি পর্যালোচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বড় আমদানি পরিকল্পনার মধ্যে পরিবহন নিয়ে প্রশ্ন
রবি-বোরো মৌসুম সামনে রেখে সরকার ইতোমধ্যে বড় পরিসরে সার আমদানির অনুমোদন দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২৪ আগস্টের এক বৈঠকে ৩ লাখ ৬৫ হাজার টন সার আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়। এর মধ্যে মরক্কো থেকে জিটুজি ব্যবস্থায় ডিএপি ও টিএসপি আমদানির একাধিক লট রয়েছে।

এ ছাড়া ১৬ সেপ্টেম্বর আরও ১০ লাখ ৭৫ হাজার টন সার আমদানির বিভিন্ন প্রস্তাব অনুমোদিত হয়েছে। এর মধ্যেও মরক্কো থেকে ডিএপি আমদানির একাধিক লট রয়েছে।

সরকারের আমদানি পরিকল্পনা বড় হলেও আমদানি করা সার সময়মতো দেশে পৌঁছানো এবং মাঠপর্যায়ে সরবরাহ নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। পরিবহন পর্যায়ে লে-ক্যান অতিক্রম, জাহাজের অনিশ্চয়তা কিংবা কার্যাদেশ বাস্তবায়নে বিলম্ব হলে আমদানির অনুমোদন থাকলেও মাঠপর্যায়ে সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় চাপ তৈরি হতে পারে।

ডেইলি ট্রেডিংয়ের ১০টি লটে প্রায় ৩ লাখ ৮০ হাজার টন সার পরিবহনের ঘটনায় এখন অন্তত তিনটি প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন। লে-ক্যান অতিক্রান্ত প্রথম আটটি লটের জাহাজগুলো কোথায়? নির্ধারিত সময়ে জাহাজ না পৌঁছালে চুক্তি অনুযায়ী বিএডিসি কী ব্যবস্থা নিয়েছে? আর আগের কার্যাদেশগুলোর বাস্তবায়ন পরিস্থিতি স্পষ্ট হওয়ার আগেই একই প্রতিষ্ঠানকে পরবর্তী কার্যাদেশ দেওয়ার যৌক্তিকতা কী?

এসব প্রশ্নের উত্তর শুধু একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কার্যাদেশের হিসাব নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার, সার আমদানি ও পরিবহন ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা এবং রবি মৌসুমে কৃষকের প্রয়োজনীয় সার সময়মতো মাঠে পৌঁছানোর বিষয়টি।

তাই কার্যাদেশ থেকে জাহাজ, লে-ক্যান থেকে লোডিং, সমুদ্রযাত্রা থেকে খালাস এবং শেষ পর্যন্ত গুদাম ও ডিলার পর্যায়ে সরবরাহ—পুরো প্রক্রিয়াটি নথিভিত্তিকভাবে যাচাই করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
লে-ক্যান পেরিয়েও যদি জাহাজের অবস্থান স্পষ্ট না হয়, আগের কার্যাদেশের বাস্তবায়নও যদি পরিষ্কার না হয়, তাহলে একই প্রতিষ্ঠানের নামে ধারাবাহিক কার্যাদেশের দায় ও সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক। এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকেই এসব প্রশ্নের স্পষ্ট জবাব প্রত্যাশিত।