ঢাকা ০৯:২৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ২২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
মুক্তিযোদ্ধা রতন: স্বদেশপ্রেমে কেঁদেছিল যাঁর মন শিশুর হাতে বই তুলে দেওয়ার দায়িত্ব রাষ্ট্রেরও প্রতিযোগিতা আমি নিজের সঙ্গেই করি : অপু বিশ্বাস ফ্যাসিবাদী আ. লীগের এ দেশে আর রাজনীতির সুযোগ হবে না : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশকে এআই প্রয়োগ ও উদ্ভাবনে সক্ষম দেশে পরিণত করতে হবে: রাষ্ট্রপতি আমির হামজার ‘নারীসংক্রান্ত অডিও ও ভিডিও’ পাওয়ার দাবি রাশেদ খানের শান্তি ফিরেছে শিল্পাঞ্চলে, ছুটির দিনেও কর্মচাঞ্চল্য জলবায়ু ঝুঁকিতে বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৯ কোটি বাস্তুচ্যুত মানুষ আইজেনকোটকে ৬৭ এমপির সমর্থন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী কে হবেন নির্ধারণ রোববার মানবিক মূল্যবোধ, পেশাগত দক্ষতা ও সততাই আইনজীবীর প্রধান শক্তি: আইনমন্ত্রী

মুক্তিযোদ্ধা রতন: স্বদেশপ্রেমে কেঁদেছিল যাঁর মন

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ০৮:২৯:৪৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬
  • ৯ বার

রফিকুল ইসলামঃ ‘কী-রে, দেশমুক্তির জন্য যুদ্ধ করতে পারবি?’ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের এমন প্রশ্নের উত্তরে সেদিন কিশোর রতন সিংহগর্জনে বলেছিলেন, ‘পারুম!’

সেটি ছিল নিছক একজন কিশোরের আবেগময় উচ্চারণ নয়; ছিল মাতৃভূমিকে শত্রুমুক্ত করার এক দুর্দমনীয় শপথ।

সেই শপথের মর্যাদা রাখতে তিনি একাত্তরে হাতে তুলে নিয়েছিলেন অস্ত্র। জীবন বাজি রেখে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন মহান মুক্তিযুদ্ধে। স্বাধীনতার লাল-সবুজ পতাকা ছিনিয়ে আনলেও যুদ্ধের ক্ষত বয়ে বেড়াতে হয়েছে আমৃত্যু।

অথচ দেশপ্রেম, ত্যাগ আর আদর্শের এমন এক উজ্জ্বল নাম রফিকুল আলম রতন আজও কতটা আলোচিত, কতটা স্মরণীয়?

আজ ৬ নভেম্বর, বীর মুক্তিযোদ্ধা, রাজনীতিক, আইনজীবী ও সাংবাদিক কমরেড রফিকুল আলম রতনের ১৩তম মৃত্যুবার্ষিকী।

২০১৩ সালের এই দিনে মাত্র ৫৮ বছর বয়সে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন তিনি। রেখে যান প্রিয়তমা স্ত্রী রওশন আরা শারমিন দিবা ওরফে রেখা, দুই কন্যা প্রজ্ঞা পারমিতা ইন্দিরা অবন্তী ও বিশাখা প্রিয় দর্শিনী ছোঁয়া অজন্তা, একমাত্র ছেলে শাশ্বত মুজিব অরোরা জয়, ছোট ভাই বীর মুক্তিযোদ্ধা শফিকুল আলম মানিক, আত্মীয়স্বজন, সহযোদ্ধা এবং অসংখ্য গুণগ্রাহীকে। কিন্তু তাঁর আদর্শ, দেশপ্রেম ও মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা আজও স্মৃতির পাতায় অমলিন।

কমরেড রফিকুল আলম রতন ছিলেন দুবারের নির্বাচিত সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের আদরের ভাতিজা এবং কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলা সদর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মো. আবদুল গণির জ্যেষ্ঠ সন্তান।

পারিবারিক পরিচয় তাঁকে পরিচিতি দিলেও নিজের যোগ্যতা, মেধা, সাহস, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও মানুষের প্রতি গভীর দায়বদ্ধতা দিয়েই তিনি অর্জন করেছিলেন স্বতন্ত্র অবস্থান।

তিনি ছিলেন সাম্য, মৈত্রী, মানবিকতা ও সৌহার্দ্যের এক নিবেদিতপ্রাণ কর্মী। কৃষক, শ্রমিক ও মেহনতি মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে ছিলেন আপসহীন। শোষণহীন সমাজব্যবস্থা, অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি এবং প্রগতিশীল চিন্তাচেতনা ছিল তাঁর জীবনদর্শনের মূল ভিত্তি।

নির্লোভ, নিরহংকার ও স্পষ্টবাদী এই মানুষটি কখনো ব্যক্তিস্বার্থকে আদর্শের ঊর্ধ্বে স্থান দেননি। অন্যায় দেখলে প্রতিবাদ করেছেন, অসহায়ের পাশে দাঁড়িয়েছেন, আর সত্য উচ্চারণে কখনো কুণ্ঠিত হননি।

১৯৫৫ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলার ধুবাজোড়া গ্রামে নানার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন রফিকুল আলম রতন। শৈশব থেকেই তাঁর মধ্যে ছিল অসাধারণ মেধা, অনুসন্ধিৎসু মন এবং নেতৃত্বের সহজাত গুণ।

১৯৬৭ সালে বাবা মো. আবদুল গণির সিদ্ধান্তে কিশোরগঞ্জ সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয় ছেড়ে মাতৃভূমির টানে মিঠামইনে ফিরে আসেন। ভর্তি হন নবপ্রতিষ্ঠিত মিঠামইন জুনিয়র হাইস্কুলে, যা বর্তমানে রাষ্ট্রপতির পিতার নামে প্রতিষ্ঠিত হাজী তায়েব উদ্দিন উচ্চবিদ্যালয়।

সেখানেই তাঁর জীবনের চিন্তাজগতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেন প্রগতিশীল স্বদেশি বিপ্লবী চেতনার ধারক শিক্ষক বাবু বনবাসী দাস। তাঁর সাহচর্যে রতনের মধ্যে অসাম্প্রদায়িকতা, মানবিক মূল্যবোধ ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক চেতনার বিকাশ ঘটে।

অল্প বয়সেই ছাত্ররাজনীতিতে যুক্ত হন। প্রথমে ছাত্রলীগ, পরে ঢাকা কলেজে অধ্যয়নকালে ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। রাজনীতি তাঁর কাছে ক্ষমতা কিংবা পদ-পদবি অর্জনের সিঁড়ি ছিল না; ছিল মানুষের মুক্তি ও অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম।

১৯৭০ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মিঠামইন সফরে এলে কিশোর ছাত্রনেতা রতনের ব্যক্তিত্ব, বাগ্মিতা ও সাহসী উপস্থিতি তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করে। বঙ্গবন্ধু স্নেহভরে কাঁধে হাত রেখে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘কী-রে, দেশমুক্তির জন্য যুদ্ধ করতে পারবি?’ রতনের দৃপ্ত উত্তর ছিল, ‘পারুম!’

সময়ের পরিক্রমায় সেই উচ্চারণই হয়ে ওঠে তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় অঙ্গীকার।

একাত্তরের ১লা সেপ্টেম্বর মিঠামইনের ধুবাজোড়া গ্রামে পাকিস্তানি বাহিনীর ক্র্যাকডাউনের পর তিনি ভারতের মেঘালয় রাজ্যের খাসিয়া ও জয়ন্তিয়া হিলস জেলার বালাটে চলে যান।

সেখানে তাঁর চাচা মো. আবদুল হামিদ মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছিলেন। তিনি পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের সদস্য থাকাকালে মুক্তিবাহিনী ও মুক্তিযুদ্ধের বেসামরিক নেতৃত্বের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের বেসামরিক প্রধান, FF ও BLF রিক্রুটিং কমিটির চেয়ারম্যান এবং BLF-এর সুনামগঞ্জ-কিশোরগঞ্জ সাব-সেক্টরের কমান্ডার হিসেবে তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

চাচার মাধ্যমেই রফিকুল আলম রতন আসামের হাফলং গেরিলা প্রশিক্ষণকেন্দ্রে প্রশিক্ষণের সুযোগ পান। সেখানে E ব্যাচের প্রশিক্ষণার্থী হিসেবে প্রায় দেড় মাস ধরে ডেমোলিশন বা বিস্ফোরকসংক্রান্ত প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। বোমা, মাইন ও বিস্ফোরক ব্যবহারের মতো ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিয়ে তিনি সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। বঙ্গবন্ধুর কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি তিনি রেখেছিলেন জীবন দিয়ে, সাহস দিয়ে, রক্ত দিয়ে।

কিন্তু স্বাধীনতার জন্য সেই লড়াই তাঁকে দিতে হয়েছে চরম মূল্য। সম্মুখ রণাঙ্গনের সশস্ত্র সংগ্রামে মেরুদণ্ডে মারাত্মক আঘাত পান তিনি। সেই আঘাতের পরিণতি তাঁকে আমৃত্যু বহন করতে হয়েছে।

একসময় রাজধানী ঢাকার সম্ভাবনাময় জীবন, কর্মব্যস্ততা ও আলোকিত পরিসর ছেড়ে ফিরে আসতে হয় জন্মভূমি মিঠামইনে। কিন্তু শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তাঁর মনোবলকে পরাস্ত করতে পারেনি। বরং জীবনের অবশিষ্ট সময়টুকু তিনি ব্যয় করেছেন অন্যায়-অবিচার, কুসংস্কার ও সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে।

তাঁর ৫৮ বছরের জীবনের মধ্যে প্রায় সাত বছর পাঁচ মাস কেটেছে দেশ-বিদেশের হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে। সোভিয়েত ইউনিয়নে সরকারের আমন্ত্রণে উন্নত চিকিৎসার সুযোগ পেলেও স্বাভাবিক জীবন আর ফিরে পাননি।

তবু হতাশার কাছে আত্মসমর্পণ করেননি। অসুস্থ শরীর নিয়েও মানুষের সঙ্গে থেকেছেন, সমাজের কথা ভেবেছেন, অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছেন। তাঁর কাছে জীবন মানে কেবল নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা ছিল না; জীবন মানে ছিল অন্যের মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা।

শিক্ষাজীবনেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৭৮ সালে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অনার্সসহ মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। পরে ১৯৮৩ সালে এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করে ঢাকা সুপ্রিম কোর্টে আইন পেশায় যুক্ত হন।

তাঁর পেশাগত জীবনের পরিসরও ছিল বহুমাত্রিক। নতুন ধারার দৈনিক ‘আজকের কাগজ’-এর সহকারী সম্পাদক এবং পরবর্তী সময়ে সাপ্তাহিক ‘মুক্তি’ পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। মাঝখানে ঢাকার একটি কলেজে শিক্ষকতাও করেছেন।

রাজনীতি, আইন, সাংবাদিকতা ও শিক্ষা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি নিজের মেধা ও মননের স্বাক্ষর রেখেছেন। নিরলস পাঠাভ্যাসের কারণে দেশ-বিদেশের রাজনীতি, সমাজনীতি, ইতিহাস, শিক্ষা ও সংস্কৃতির বিষয়ে তাঁর জ্ঞান ছিল বিস্তৃত।

তীক্ষ্ণ বুদ্ধি ও প্রখর স্মরণশক্তির অধিকারী এই মানুষটি আলোচনায় যেমন ছিলেন যুক্তিনিষ্ঠ, তেমনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে ছিলেন আপসহীন। গবেষণার প্রতিও ছিল তাঁর গভীর আগ্রহ। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়ে কৃষক-শ্রমিকের অর্থনৈতিক মুক্তির সংগ্রামে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন।

মৃত্যুর বহু আগে থেকেই আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকলেও পদ-পদবির মোহ তাঁকে কখনো আচ্ছন্ন করেনি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছিল তাঁর রাজনীতির প্রাণশক্তি।

তিনি বিশ্বাস করতেন, স্বাধীনতার প্রকৃত তাৎপর্য কেবল একটি ভূখণ্ডের মানচিত্র কিংবা পতাকা অর্জনে সীমাবদ্ধ নয়; স্বাধীনতার পূর্ণতা আসে মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি, সামাজিক ন্যায়বিচার, সাম্য, মানবিক মর্যাদা এবং অসাম্প্রদায়িক সমাজ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে।

এ কারণেই কৃষক, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ের প্রশ্নে তিনি ছিলেন সোচ্চার।

পারিবারিকভাবেও মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে তাঁর আত্মিক সম্পর্ক ছিল গভীর। নিজে মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তান এবং নানার বাড়ির দিক থেকেও শহিদ পরিবারের উত্তরসূরি হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় উত্তরাধিকার বহন করেছেন তিনি। এই উত্তরাধিকার তাঁর কাছে কেবল গর্বের বিষয় ছিল না; ছিল দায়িত্ব পালনের এক নিরন্তর তাগিদ।

বীর মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল আলম রতনের সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল তিনি মানুষের মানুষ। তাঁর স্পষ্টবাদিতা অনেকের কাছে কঠিন মনে হলেও তাঁর অন্তরে ছিল অসাধারণ কোমলতা। মানুষের বিপদে এগিয়ে যাওয়া, অসহায়ের পাশে দাঁড়ানো এবং সমাজের কল্যাণে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার মধ্যে তিনি জীবনের সার্থকতা খুঁজে পেতেন।

তাঁর বন্ধুত্ব ছিল অকৃত্রিম, ভালোবাসা ছিল নিঃস্বার্থ, আর আদর্শের প্রশ্নে অবস্থান ছিল দৃঢ়।

আজ তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে প্রশ্ন জাগে, আমরা কি যথাযথভাবে স্মরণ করছি সেই মানুষটিকে, যিনি বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে যুদ্ধের ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন? যিনি স্বাধীনতার জন্য মেরুদণ্ডে আঘাত নিয়ে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সংগ্রাম করেছেন? যিনি নিজের সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে মানুষের কল্যাণে কাজ করে গেছেন?

একজন মুক্তিযোদ্ধার যথার্থ সম্মান কেবল আনুষ্ঠানিক শ্রদ্ধা নিবেদনে নয়; তাঁর আদর্শ, ত্যাগ ও স্বপ্নকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার মধ্যেই নিহিত।

আজকের সমাজে যখন ব্যক্তিস্বার্থ, ক্ষমতার মোহ, অসহিষ্ণুতা ও বিভাজনের প্রবণতা আমাদের মানবিক মূল্যবোধকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়, তখন রফিকুল আলম রতনের জীবন আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখায়। তাঁর জীবন বলে দেয়, দেশপ্রেম মানে শুধু মুখের স্লোগান নয়; দেশপ্রেম মানে দেশের মানুষের জন্য ত্যাগ স্বীকার, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো এবং আজীবন আদর্শের প্রতি বিশ্বস্ত থাকা।

বীর মুক্তিযোদ্ধা রতনের জীবন ও কর্ম থেকে নতুন প্রজন্ম সত্যনিষ্ঠা, সাহস, মানবিকতা ও স্বদেশপ্রেমের শিক্ষা গ্রহণ করুক—এমন প্রত্যাশা রতন-সুহৃদ মঞ্চের কর্তৃপক্ষের।

তাঁর স্মৃতি সংরক্ষণ, জীবনসংগ্রাম নিয়ে গবেষণা এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে তাঁর অবদান যথাযথভাবে তুলে ধরা সময়ের দাবি।

একাত্তরের সম্মুখ রণাঙ্গনের অকুতোভয় এই বীর মুক্তিযোদ্ধার ছোট ভাই, কিশোরগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সাবেক চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা শফিকুল আলম মানিক তাঁর প্রয়াত ভাইসহ সকল কবরবাসীর আত্মার মাগফিরাত ও শান্তির জন্য দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়েছেন।

মানুষ চলে যায়, কিন্তু আদর্শের মৃত্যু হয় না। রফিকুল আলম রতনও আজ আমাদের মাঝে নেই; আছে তাঁর সাহসী উচ্চারণ, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, মানুষের প্রতি ভালোবাসা এবং দেশপ্রেমের অনন্য দৃষ্টান্ত।

বঙ্গবন্ধুর সেই প্রশ্নের উত্তরে কিশোর রতনের ‘পারুম’ উচ্চারণ আজও যেন সময়ের বুক চিরে প্রতিধ্বনিত হয়। সেই প্রতিধ্বনি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—স্বাধীনতা অর্জনের চেয়েও বড় দায়িত্ব স্বাধীনতার মর্যাদা রক্ষা করা।

বীর রতন, আপনার সেই অঙ্গীকার, আত্মত্যাগ ও স্বদেশপ্রেমের কাছে আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা।

লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও কলামিস্ট;
সহযোগী সম্পাদক, আজকের সূর্যোদয়, 

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

মুক্তিযোদ্ধা রতন: স্বদেশপ্রেমে কেঁদেছিল যাঁর মন

মুক্তিযোদ্ধা রতন: স্বদেশপ্রেমে কেঁদেছিল যাঁর মন

আপডেট টাইম : ০৮:২৯:৪৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬

রফিকুল ইসলামঃ ‘কী-রে, দেশমুক্তির জন্য যুদ্ধ করতে পারবি?’ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের এমন প্রশ্নের উত্তরে সেদিন কিশোর রতন সিংহগর্জনে বলেছিলেন, ‘পারুম!’

সেটি ছিল নিছক একজন কিশোরের আবেগময় উচ্চারণ নয়; ছিল মাতৃভূমিকে শত্রুমুক্ত করার এক দুর্দমনীয় শপথ।

সেই শপথের মর্যাদা রাখতে তিনি একাত্তরে হাতে তুলে নিয়েছিলেন অস্ত্র। জীবন বাজি রেখে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন মহান মুক্তিযুদ্ধে। স্বাধীনতার লাল-সবুজ পতাকা ছিনিয়ে আনলেও যুদ্ধের ক্ষত বয়ে বেড়াতে হয়েছে আমৃত্যু।

অথচ দেশপ্রেম, ত্যাগ আর আদর্শের এমন এক উজ্জ্বল নাম রফিকুল আলম রতন আজও কতটা আলোচিত, কতটা স্মরণীয়?

আজ ৬ নভেম্বর, বীর মুক্তিযোদ্ধা, রাজনীতিক, আইনজীবী ও সাংবাদিক কমরেড রফিকুল আলম রতনের ১৩তম মৃত্যুবার্ষিকী।

২০১৩ সালের এই দিনে মাত্র ৫৮ বছর বয়সে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন তিনি। রেখে যান প্রিয়তমা স্ত্রী রওশন আরা শারমিন দিবা ওরফে রেখা, দুই কন্যা প্রজ্ঞা পারমিতা ইন্দিরা অবন্তী ও বিশাখা প্রিয় দর্শিনী ছোঁয়া অজন্তা, একমাত্র ছেলে শাশ্বত মুজিব অরোরা জয়, ছোট ভাই বীর মুক্তিযোদ্ধা শফিকুল আলম মানিক, আত্মীয়স্বজন, সহযোদ্ধা এবং অসংখ্য গুণগ্রাহীকে। কিন্তু তাঁর আদর্শ, দেশপ্রেম ও মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা আজও স্মৃতির পাতায় অমলিন।

কমরেড রফিকুল আলম রতন ছিলেন দুবারের নির্বাচিত সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের আদরের ভাতিজা এবং কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলা সদর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মো. আবদুল গণির জ্যেষ্ঠ সন্তান।

পারিবারিক পরিচয় তাঁকে পরিচিতি দিলেও নিজের যোগ্যতা, মেধা, সাহস, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও মানুষের প্রতি গভীর দায়বদ্ধতা দিয়েই তিনি অর্জন করেছিলেন স্বতন্ত্র অবস্থান।

তিনি ছিলেন সাম্য, মৈত্রী, মানবিকতা ও সৌহার্দ্যের এক নিবেদিতপ্রাণ কর্মী। কৃষক, শ্রমিক ও মেহনতি মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে ছিলেন আপসহীন। শোষণহীন সমাজব্যবস্থা, অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি এবং প্রগতিশীল চিন্তাচেতনা ছিল তাঁর জীবনদর্শনের মূল ভিত্তি।

নির্লোভ, নিরহংকার ও স্পষ্টবাদী এই মানুষটি কখনো ব্যক্তিস্বার্থকে আদর্শের ঊর্ধ্বে স্থান দেননি। অন্যায় দেখলে প্রতিবাদ করেছেন, অসহায়ের পাশে দাঁড়িয়েছেন, আর সত্য উচ্চারণে কখনো কুণ্ঠিত হননি।

১৯৫৫ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলার ধুবাজোড়া গ্রামে নানার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন রফিকুল আলম রতন। শৈশব থেকেই তাঁর মধ্যে ছিল অসাধারণ মেধা, অনুসন্ধিৎসু মন এবং নেতৃত্বের সহজাত গুণ।

১৯৬৭ সালে বাবা মো. আবদুল গণির সিদ্ধান্তে কিশোরগঞ্জ সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয় ছেড়ে মাতৃভূমির টানে মিঠামইনে ফিরে আসেন। ভর্তি হন নবপ্রতিষ্ঠিত মিঠামইন জুনিয়র হাইস্কুলে, যা বর্তমানে রাষ্ট্রপতির পিতার নামে প্রতিষ্ঠিত হাজী তায়েব উদ্দিন উচ্চবিদ্যালয়।

সেখানেই তাঁর জীবনের চিন্তাজগতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেন প্রগতিশীল স্বদেশি বিপ্লবী চেতনার ধারক শিক্ষক বাবু বনবাসী দাস। তাঁর সাহচর্যে রতনের মধ্যে অসাম্প্রদায়িকতা, মানবিক মূল্যবোধ ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক চেতনার বিকাশ ঘটে।

অল্প বয়সেই ছাত্ররাজনীতিতে যুক্ত হন। প্রথমে ছাত্রলীগ, পরে ঢাকা কলেজে অধ্যয়নকালে ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। রাজনীতি তাঁর কাছে ক্ষমতা কিংবা পদ-পদবি অর্জনের সিঁড়ি ছিল না; ছিল মানুষের মুক্তি ও অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম।

১৯৭০ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মিঠামইন সফরে এলে কিশোর ছাত্রনেতা রতনের ব্যক্তিত্ব, বাগ্মিতা ও সাহসী উপস্থিতি তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করে। বঙ্গবন্ধু স্নেহভরে কাঁধে হাত রেখে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘কী-রে, দেশমুক্তির জন্য যুদ্ধ করতে পারবি?’ রতনের দৃপ্ত উত্তর ছিল, ‘পারুম!’

সময়ের পরিক্রমায় সেই উচ্চারণই হয়ে ওঠে তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় অঙ্গীকার।

একাত্তরের ১লা সেপ্টেম্বর মিঠামইনের ধুবাজোড়া গ্রামে পাকিস্তানি বাহিনীর ক্র্যাকডাউনের পর তিনি ভারতের মেঘালয় রাজ্যের খাসিয়া ও জয়ন্তিয়া হিলস জেলার বালাটে চলে যান।

সেখানে তাঁর চাচা মো. আবদুল হামিদ মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছিলেন। তিনি পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের সদস্য থাকাকালে মুক্তিবাহিনী ও মুক্তিযুদ্ধের বেসামরিক নেতৃত্বের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের বেসামরিক প্রধান, FF ও BLF রিক্রুটিং কমিটির চেয়ারম্যান এবং BLF-এর সুনামগঞ্জ-কিশোরগঞ্জ সাব-সেক্টরের কমান্ডার হিসেবে তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

চাচার মাধ্যমেই রফিকুল আলম রতন আসামের হাফলং গেরিলা প্রশিক্ষণকেন্দ্রে প্রশিক্ষণের সুযোগ পান। সেখানে E ব্যাচের প্রশিক্ষণার্থী হিসেবে প্রায় দেড় মাস ধরে ডেমোলিশন বা বিস্ফোরকসংক্রান্ত প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। বোমা, মাইন ও বিস্ফোরক ব্যবহারের মতো ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিয়ে তিনি সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। বঙ্গবন্ধুর কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি তিনি রেখেছিলেন জীবন দিয়ে, সাহস দিয়ে, রক্ত দিয়ে।

কিন্তু স্বাধীনতার জন্য সেই লড়াই তাঁকে দিতে হয়েছে চরম মূল্য। সম্মুখ রণাঙ্গনের সশস্ত্র সংগ্রামে মেরুদণ্ডে মারাত্মক আঘাত পান তিনি। সেই আঘাতের পরিণতি তাঁকে আমৃত্যু বহন করতে হয়েছে।

একসময় রাজধানী ঢাকার সম্ভাবনাময় জীবন, কর্মব্যস্ততা ও আলোকিত পরিসর ছেড়ে ফিরে আসতে হয় জন্মভূমি মিঠামইনে। কিন্তু শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তাঁর মনোবলকে পরাস্ত করতে পারেনি। বরং জীবনের অবশিষ্ট সময়টুকু তিনি ব্যয় করেছেন অন্যায়-অবিচার, কুসংস্কার ও সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে।

তাঁর ৫৮ বছরের জীবনের মধ্যে প্রায় সাত বছর পাঁচ মাস কেটেছে দেশ-বিদেশের হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে। সোভিয়েত ইউনিয়নে সরকারের আমন্ত্রণে উন্নত চিকিৎসার সুযোগ পেলেও স্বাভাবিক জীবন আর ফিরে পাননি।

তবু হতাশার কাছে আত্মসমর্পণ করেননি। অসুস্থ শরীর নিয়েও মানুষের সঙ্গে থেকেছেন, সমাজের কথা ভেবেছেন, অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছেন। তাঁর কাছে জীবন মানে কেবল নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা ছিল না; জীবন মানে ছিল অন্যের মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা।

শিক্ষাজীবনেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৭৮ সালে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অনার্সসহ মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। পরে ১৯৮৩ সালে এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করে ঢাকা সুপ্রিম কোর্টে আইন পেশায় যুক্ত হন।

তাঁর পেশাগত জীবনের পরিসরও ছিল বহুমাত্রিক। নতুন ধারার দৈনিক ‘আজকের কাগজ’-এর সহকারী সম্পাদক এবং পরবর্তী সময়ে সাপ্তাহিক ‘মুক্তি’ পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। মাঝখানে ঢাকার একটি কলেজে শিক্ষকতাও করেছেন।

রাজনীতি, আইন, সাংবাদিকতা ও শিক্ষা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি নিজের মেধা ও মননের স্বাক্ষর রেখেছেন। নিরলস পাঠাভ্যাসের কারণে দেশ-বিদেশের রাজনীতি, সমাজনীতি, ইতিহাস, শিক্ষা ও সংস্কৃতির বিষয়ে তাঁর জ্ঞান ছিল বিস্তৃত।

তীক্ষ্ণ বুদ্ধি ও প্রখর স্মরণশক্তির অধিকারী এই মানুষটি আলোচনায় যেমন ছিলেন যুক্তিনিষ্ঠ, তেমনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে ছিলেন আপসহীন। গবেষণার প্রতিও ছিল তাঁর গভীর আগ্রহ। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়ে কৃষক-শ্রমিকের অর্থনৈতিক মুক্তির সংগ্রামে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন।

মৃত্যুর বহু আগে থেকেই আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকলেও পদ-পদবির মোহ তাঁকে কখনো আচ্ছন্ন করেনি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছিল তাঁর রাজনীতির প্রাণশক্তি।

তিনি বিশ্বাস করতেন, স্বাধীনতার প্রকৃত তাৎপর্য কেবল একটি ভূখণ্ডের মানচিত্র কিংবা পতাকা অর্জনে সীমাবদ্ধ নয়; স্বাধীনতার পূর্ণতা আসে মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি, সামাজিক ন্যায়বিচার, সাম্য, মানবিক মর্যাদা এবং অসাম্প্রদায়িক সমাজ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে।

এ কারণেই কৃষক, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ের প্রশ্নে তিনি ছিলেন সোচ্চার।

পারিবারিকভাবেও মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে তাঁর আত্মিক সম্পর্ক ছিল গভীর। নিজে মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তান এবং নানার বাড়ির দিক থেকেও শহিদ পরিবারের উত্তরসূরি হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় উত্তরাধিকার বহন করেছেন তিনি। এই উত্তরাধিকার তাঁর কাছে কেবল গর্বের বিষয় ছিল না; ছিল দায়িত্ব পালনের এক নিরন্তর তাগিদ।

বীর মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল আলম রতনের সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল তিনি মানুষের মানুষ। তাঁর স্পষ্টবাদিতা অনেকের কাছে কঠিন মনে হলেও তাঁর অন্তরে ছিল অসাধারণ কোমলতা। মানুষের বিপদে এগিয়ে যাওয়া, অসহায়ের পাশে দাঁড়ানো এবং সমাজের কল্যাণে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার মধ্যে তিনি জীবনের সার্থকতা খুঁজে পেতেন।

তাঁর বন্ধুত্ব ছিল অকৃত্রিম, ভালোবাসা ছিল নিঃস্বার্থ, আর আদর্শের প্রশ্নে অবস্থান ছিল দৃঢ়।

আজ তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে প্রশ্ন জাগে, আমরা কি যথাযথভাবে স্মরণ করছি সেই মানুষটিকে, যিনি বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে যুদ্ধের ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন? যিনি স্বাধীনতার জন্য মেরুদণ্ডে আঘাত নিয়ে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সংগ্রাম করেছেন? যিনি নিজের সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে মানুষের কল্যাণে কাজ করে গেছেন?

একজন মুক্তিযোদ্ধার যথার্থ সম্মান কেবল আনুষ্ঠানিক শ্রদ্ধা নিবেদনে নয়; তাঁর আদর্শ, ত্যাগ ও স্বপ্নকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার মধ্যেই নিহিত।

আজকের সমাজে যখন ব্যক্তিস্বার্থ, ক্ষমতার মোহ, অসহিষ্ণুতা ও বিভাজনের প্রবণতা আমাদের মানবিক মূল্যবোধকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়, তখন রফিকুল আলম রতনের জীবন আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখায়। তাঁর জীবন বলে দেয়, দেশপ্রেম মানে শুধু মুখের স্লোগান নয়; দেশপ্রেম মানে দেশের মানুষের জন্য ত্যাগ স্বীকার, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো এবং আজীবন আদর্শের প্রতি বিশ্বস্ত থাকা।

বীর মুক্তিযোদ্ধা রতনের জীবন ও কর্ম থেকে নতুন প্রজন্ম সত্যনিষ্ঠা, সাহস, মানবিকতা ও স্বদেশপ্রেমের শিক্ষা গ্রহণ করুক—এমন প্রত্যাশা রতন-সুহৃদ মঞ্চের কর্তৃপক্ষের।

তাঁর স্মৃতি সংরক্ষণ, জীবনসংগ্রাম নিয়ে গবেষণা এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে তাঁর অবদান যথাযথভাবে তুলে ধরা সময়ের দাবি।

একাত্তরের সম্মুখ রণাঙ্গনের অকুতোভয় এই বীর মুক্তিযোদ্ধার ছোট ভাই, কিশোরগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সাবেক চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা শফিকুল আলম মানিক তাঁর প্রয়াত ভাইসহ সকল কবরবাসীর আত্মার মাগফিরাত ও শান্তির জন্য দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়েছেন।

মানুষ চলে যায়, কিন্তু আদর্শের মৃত্যু হয় না। রফিকুল আলম রতনও আজ আমাদের মাঝে নেই; আছে তাঁর সাহসী উচ্চারণ, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, মানুষের প্রতি ভালোবাসা এবং দেশপ্রেমের অনন্য দৃষ্টান্ত।

বঙ্গবন্ধুর সেই প্রশ্নের উত্তরে কিশোর রতনের ‘পারুম’ উচ্চারণ আজও যেন সময়ের বুক চিরে প্রতিধ্বনিত হয়। সেই প্রতিধ্বনি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—স্বাধীনতা অর্জনের চেয়েও বড় দায়িত্ব স্বাধীনতার মর্যাদা রক্ষা করা।

বীর রতন, আপনার সেই অঙ্গীকার, আত্মত্যাগ ও স্বদেশপ্রেমের কাছে আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা।

লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও কলামিস্ট;
সহযোগী সম্পাদক, আজকের সূর্যোদয়,