ঢাকা ০৩:৪৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১৯ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সুবীরদা, আপনার চলে যাওয়ায় কী যেন হারিয়ে গেল!

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ০২:৩২:২৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬
  • ৩২ বার

Oplus_16908288

রফিকুল ইসলামঃ কিছু মানুষের চলে যাওয়া কেবল মৃত্যুসংবাদ নয়; তা হৃদয়ের গভীরে এমন এক শূন্যতা তৈরি করে, যার কোনো পরিমাপ নেই, কোনো সান্ত্বনা নেই। তাঁদের অনুপস্থিতিতে চারপাশের সবকিছু আগের মতোই থাকে – সকাল হয়, সন্ধ্যা নামে, মানুষ কথা বলে, জীবন তার নিজস্ব নিয়মে এগিয়ে চলে; শুধু কোথায় যেন একটি পরিচিত মুখের অনুপস্থিতি প্রতিটি মুহূর্তকে বিষণ্ন করে তোলে।

মনে হয়, জীবনের খুব আপন কিছু একটা হারিয়ে গেল। এমন কিছু, যা আর কোনো দিন ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়। প্রবীণ সাংবাদিক, বিশিষ্ট ছড়াকার, লেখক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সুবীর বসাকের প্রয়াণে আজ আমার হৃদয়ে ঠিক তেমনই এক শূন্যতার জন্ম হয়েছে। বারবার মনে হচ্ছে, কী যেন হারালাম!

দৈনিক ইত্তেফাকের কিশোরগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি সুবীর বসাক আর আমাদের মাঝে নেই। ২ নভেম্বর সোমবার সন্ধ্যায় হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে কিশোরগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে তিনি শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭০ বছর।

পরদিন সকালে মানে আজ মঙ্গলবার (৩রা নভেম্বর) তাঁর মৃত্যুসংবাদটি চোখে পড়তেই যেন মুহূর্তের জন্য সবকিছু থমকে গিয়েছিল। আগের রাতে পেশাগত ব্যস্ততায় ফেসবুকে যাওয়া হয়নি। সকালে সংবাদটি দেখে প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না। যে মানুষটিকে মাত্র কদিন আগেও লিখতে দেখেছি, ছবি প্রকাশ করতে দেখেছি, যাঁর সঙ্গে তিন দশকেরও বেশি সময়ের স্মৃতি জড়িয়ে আছে, তিনি কী করে এত দ্রুত আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন!

মৃত্যুর আগের দিনও স্কুলজীবনের এক শিক্ষকের সঙ্গে ছবি তুলে ফেসবুকে শেয়ার করেছিলেন তিনি। কদিন আগেও লিখেছিলেন কবিতা, নিজের ব্যক্তিগত ফেসবুক অ্যাকাউন্টে প্রকাশ করেছিলেন সেই সৃজনশীলতার আনন্দ। কী স্বাভাবিক, কী প্রাণবন্ত ছিল তাঁর সাম্প্রতিক উপস্থিতি! কে জানত, সেই ছবিই হয়ে থাকবে তাঁর জীবনের শেষ ফেসবুক পোস্ট! কে জানত, আর কোনো দিন তাঁর দেয়ালে নতুন কবিতা প্রকাশিত হবে না, নতুন কোনো ছবি দেখে পরিচিতজনেরা মন্তব্য করার সুযোগ পাবেন না!

এ এক অদ্ভুত নির্মমতা। যে মানুষটি গত পরশুও ছিলেন, লিখেছেন, ছবি তুলেছেন, স্মৃতি ভাগ করে নিয়েছেন, আজ তিনি শুধুই স্মৃতি। তাঁর ফেসবুকের পাতায় পুরোনো কবিতাগুলো থেকে যাবে, ছবিগুলোও থেকে যাবে। বন্ধুরা হয়তো মাঝেমধ্যে সেখানে গিয়ে থমকে দাঁড়াবেন।

কিন্তু যিনি সেসব লিখেছেন, যিনি ছবির পেছনের মানুষটি, তিনি আর কোনো দিন ফিরে আসবেন না। প্রযুক্তি তাঁর স্মৃতি ধরে রাখতে পারবে, কিন্তু তাঁর কণ্ঠ ফিরিয়ে দিতে পারবে না। এভাবেই একজন জীবন্ত মানুষ একদিন পরিচিতজনদের কাছে স্মৃতির মানুষ হয়ে যান।

 ১৯৯২ থেকে শুরু, তিন দশকেরও বেশি আত্মিক সম্পর্ক

সুবীরদার সঙ্গে আমার পরিচয় ১৯৯২ সালে। তখন আমি ঢাকায় একটি পত্রিকার স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে কর্মরত। সেই সময় থেকেই তাঁর সঙ্গে পরিচয়, ক্রমে ঘনিষ্ঠতা, আর একসময় সেই সম্পর্ক পেশাগত পরিচয়ের গণ্ডি ছাড়িয়ে পারিবারিক আন্তরিকতায় রূপ নেয়। তিন দশকেরও বেশি সময়ের সেই সম্পর্কের দিকে ফিরে তাকালে মনে হয়, কত দীর্ঘ পথ পেরিয়েছি আমরা! কত কথা, কত আড্ডা, কত অভিজ্ঞতা বিনিময়, কত সুখ-দুঃখের স্মৃতি জমে আছে মনের গভীরে!

কতবার যে তাঁর বাসায় গিয়েছি! কতবার যে বউদির আন্তরিক আতিথেয়তা গ্রহণ করেছি, তার হিসাব নেই। আজও যেন চোখের সামনে ভেসে ওঠে সেই পরিচিত পরিবেশ।

সুবীরদা ও বউদি দুজনই ছিলেন অত্যন্ত সজ্জন, বিনয়ী ও অতিথিপরায়ণ। তাঁদের কাছে গেলে কখনো নিজেকে অতিথি মনে হয়নি; মনে হয়েছে, আপনজনের ঘরে এসেছি। মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য যে বড় আয়োজনের প্রয়োজন হয় না, প্রয়োজন শুধু আন্তরিকতা, সৌজন্য ও হৃদয়ের টান – তাঁরা ছিলেন তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

সুবীরদার ব্যক্তিত্বের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য ছিল তাঁর সহজ-সরল জীবনবোধ। তিনি ছিলেন মৃদুভাষী, শান্ত ও নিরহংকারী। কথাবার্তায় ছিল সংযম, আচরণে ছিল সৌজন্য, আর মানুষের সঙ্গে মেশার মধ্যে ছিল এক ধরনের সহজাত আন্তরিকতা। নিজেকে বড় করে দেখানোর কোনো প্রবণতা তাঁর মধ্যে দেখিনি। অথচ দীর্ঘ পেশাগত অভিজ্ঞতা, সাহিত্যচর্চা ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে বিচরণের মধ্য দিয়ে তিনি নিজের জন্য তৈরি করেছিলেন সম্মানজনক অবস্থান। তিনি উচ্চকণ্ঠ ছিলেন না, কিন্তু তাঁর কর্ম ও ব্যক্তিত্বই ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয়।

প্রায় পাঁচ দশকের সাংবাদিকতা: একটি জনপদের জীবন্ত ইতিহাস

সুবীর বসাকের সাংবাদিকতা জীবন ছিল প্রায় পাঁচ দশকের দীর্ঘ সাধনা। দৈনিক ইত্তেফাকে প্রথমে মহকুমা প্রতিনিধি এবং পরবর্তী সময়ে কিশোরগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এই পেশার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সংবাদমাধ্যমের পরিবর্তন, প্রযুক্তির বিবর্তন, সংবাদ পরিবেশনের ধরন বদলে যাওয়া – সবকিছুর মধ্যেও তিনি নিজের পেশাগত দায়িত্ব থেকে সরে যাননি।

একজন সাংবাদিকের কর্মজীবনকে শুধু চাকরির মেয়াদ দিয়ে বিচার করা যায় না। তাঁর প্রতিবেদনের মধ্য দিয়ে কত মানুষের কথা ওঠে এসেছে, কত সামাজিক সমস্যা কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিগোচর হয়েছে, কত জনপদের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষিত হয়েছে, কত ঘটনার সাক্ষ্য সংবাদপত্রের পাতায় জায়গা পেয়েছে – সেসবও বিবেচনায় নিতে হয়।
এই বিবেচনায় সুবীর বসাকের দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবন কিশোরগঞ্জের গণমাধ্যমের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

একজন জেলা প্রতিনিধির কাজ কেবল সংবাদ সংগ্রহ ও পাঠিয়ে দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁকে জানতে হয় জনপদের মানুষের জীবন, মাটি, ইতিহাস, ঐতিহ্য, অর্থনীতি, সামাজিক সংকট ও সম্ভাবনার কথা। প্রশাসন থেকে সাধারণ মানুষ, সাংস্কৃতিক কর্মী থেকে সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী – সবার সঙ্গে যোগাযোগ রেখে একটি জেলার বহুমাত্রিক চিত্র তুলে ধরতে হয়।

সুবীরদা দীর্ঘদিন ধরে সেই দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর প্রতিবেদনে কিশোরগঞ্জের সামাজিক-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, ঐতিহ্য, উন্নয়ন, জনজীবনের সমস্যা এবং বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগের কথা ওঠে এসেছে। ঐতিহ্যবাহী শোলাকিয়া ঈদগাহ, হাওরাঞ্চলের নারী উন্নয়ন, ছড়া উৎসব, প্রতিধ্বনি থিয়েটারের সাংস্কৃতিক আয়োজন ও সামাজিক আন্দোলনের মতো বিষয়ও তাঁর সাংবাদিকতার পরিসরে স্থান পেয়েছে।

এখানেই একজন অভিজ্ঞ স্থানীয় সাংবাদিকের প্রকৃত গুরুত্ব। রাজধানীকেন্দ্রিক সংবাদপ্রবাহের বাইরে জেলা ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের জীবনসংগ্রাম, সমস্যা, সম্ভাবনা ও অর্জন জাতীয় পরিসরে তুলে ধরার ক্ষেত্রে তাঁদের ভূমিকা অপরিসীম। সুবীর বসাকের মতো সাংবাদিকেরা স্থানীয় ঘটনাকে জাতীয় সংবাদপ্রবাহের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। তাঁদের সংগৃহীত সংবাদ শুধু তাৎক্ষণিক তথ্য নয়, সময়ের ব্যবধানে হয়ে ওঠে একটি অঞ্চলের সামাজিক ইতিহাসের উপাদান।

ছড়াকার ও সাহিত্য সংগঠক: সাংবাদিকতার বাইরেও এক সৃজনশীল জীবন

সুবীরদার পরিচয় শুধু সাংবাদিকতায় সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি ছিলেন একজন সমকালীন ছড়াকার, লেখক ও সাহিত্য-সংস্কৃতির নিবেদিত কর্মী। দৈনিক আমাদের সময়েও তিনি নিয়মিত ছড়া লিখতেন। তাঁর ছড়াসাহিত্যচর্চা তাঁকে সাহিত্যাঙ্গনে আলাদা পরিচিতি এনে দিয়েছিল। সমকালীন ছড়াকার হিসেবে দেশ-বিদেশে তাঁর পরিচিতি ও বিভিন্ন সম্মাননা অর্জনের তথ্যও সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।

কিশোরগঞ্জের সাহিত্যচর্চার ইতিহাসে তাঁর একটি উল্লেখযোগ্য অবদান ১৯৭৬ সালে। সে বছর কবি সৈয়দ আজিজুল বারীর সঙ্গে যৌথভাবে তিনি ‘উত্তরণ’ নামে একটি সাহিত্যপত্র সম্পাদনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের সাহিত্যচর্চার বিকাশপর্বে জেলা শহরগুলোতে লিটল ম্যাগাজিন বা ছোট কাগজের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সীমিত সামর্থ্য, স্বল্প প্রচার ও নানা প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও এসব সাহিত্যপত্র নতুন লেখক, কবি ও সৃজনশীল মানুষের জন্য তৈরি করেছিল প্রকাশের ক্ষেত্র।

কিশোরগঞ্জের সাহিত্য-সংস্কৃতির বিকাশেও এ ধরনের উদ্যোগের ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। ‘উত্তরণ’ সম্পাদনায় সুবীর বসাকের সম্পৃক্ততা প্রমাণ করে, তাঁর সাহিত্যিক পরিচয় শুধু নিজের কবিতা বা ছড়া প্রকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; নতুন সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্র তৈরিতেও তিনি ভূমিকা রেখেছেন।

২০১৪ সালে কিশোরগঞ্জ ছড়াকার সংসদের দ্বিতীয় আঞ্চলিক ছড়া সম্মেলনে তিনি সভাপতিত্ব করেন। দেশের ৪০টি জেলা থেকে ছড়াকারদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত ওই সম্মেলন ছিল আঞ্চলিক সাহিত্যচর্চাকে বৃহত্তর পরিসরে যুক্ত করার একটি উল্লেখযোগ্য আয়োজন। একজন ছড়াকার হিসেবে তাঁর এমন দায়িত্ব পালন সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে তাঁর গ্রহণযোগ্যতারই পরিচায়ক।

ছড়া সাহিত্যের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, অল্প কথায় গভীর ভাব প্রকাশ করা। কখনো হাস্যরস, কখনো ব্যঙ্গ, কখনো সামাজিক অসংগতি, আবার কখনো জীবনের সরল সত্য – ছড়ার মাধ্যমে সহজেই মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়। একজন ভালো ছড়াকারকে তাই শুধু শব্দের কারিগর হলেই চলে না; তাঁকে হতে হয় সমাজ ও সময়ের সংবেদনশীল পর্যবেক্ষক। সুবীরদার দীর্ঘ সাহিত্যচর্চার মধ্যেও এই সৃজনশীল পরিচয়টি ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

 সাংগঠনিক নেতৃত্ব ও সাংবাদিক সমাজে ভূমিকা

সুবীর বসাক কিশোরগঞ্জ প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮৪ থেকে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্বে ছিলেন। সাংবাদিকদের পেশাগত যোগাযোগ, পারস্পরিক সহযোগিতা, সংগঠন পরিচালনা এবং স্থানীয় গণমাধ্যমের বিকাশে প্রেসক্লাবের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই সাংগঠনিক দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে তিনি সাংবাদিক সমাজের সঙ্গেও নিবিড়ভাবে যুক্ত ছিলেন।

তাঁর কর্মজীবনের এই দিকটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কারণ একজন সাংবাদিক ব্যক্তিগতভাবে যত ভালো প্রতিবেদনই তৈরি করুন না কেন, পেশার বৃহত্তর স্বার্থে সহকর্মীদের সঙ্গে সমন্বয়, সংগঠন পরিচালনা ও পারস্পরিক সহযোগিতার মানসিকতাও জরুরি। সুবীরদা সাংবাদিকতা, সাহিত্য ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড – এই তিনটি ক্ষেত্রেই নিজের সম্পৃক্ততার পরিচয় রেখে গেছেন।

সাহিত্য ও সাংবাদিকতায় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি বিভিন্ন পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন। তবে আমার কাছে তাঁর সবচেয়ে বড় অর্জন কোনো পদ-পদবি কিংবা পুরস্কার নয়; তাঁর সবচেয়ে বড় অর্জন মানুষের ভালোবাসা। কারণ পদ-পদবি সময়ের সঙ্গে বদলে যায়, পুরস্কারের স্মারক একসময় শোকেসে পড়ে থাকে, কিন্তু মানুষের হৃদয়ে তৈরি হওয়া ভালোবাসার জায়গাটি সহজে মুছে যায় না।

 যিনি অন্যের খবর লিখতেন, আজ তাঁকে নিয়েই শোকের সংবাদ

ভাবতে অবাক লাগে, যিনি দীর্ঘদিন অন্যের খবর মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন, যিনি অসংখ্য ঘটনা, দুর্ঘটনা, আনন্দ-বেদনা ও মৃত্যুসংবাদ সংবাদমাধ্যমে তুলে ধরেছেন, আজ তাঁকে নিয়েই আমাদের লিখতে হচ্ছে শোকের কথা। যিনি জীবনের প্রায় পাঁচ দশক সংবাদ সংগ্রহে ব্যয় করেছেন, তাঁর নিজের জীবনের শেষ সংবাদটি আজ আমাদের হৃদয়কে বিদীর্ণ করছে।

সাংবাদিকতার ইতিহাসে অনেকের নাম বড় বড় পদ, পুরস্কার কিংবা জাতীয় পরিচিতির কারণে স্মরণীয় হয়ে থাকে। আবার অনেক সাংবাদিক আছেন, যাঁরা নীরবে একটি অঞ্চলের সংবাদজগতকে সমৃদ্ধ করেন। তাঁরা প্রতিদিন সংবাদ সংগ্রহ করেন, তথ্য যাচাই করেন, মানুষের সঙ্গে কথা বলেন, ঘটনার পেছনের বাস্তবতা খুঁজে বের করেন।

তাঁদের শ্রমের অনেকটাই সাধারণ পাঠকের চোখের আড়ালে থেকে যায়। সুবীর বসাক ছিলেন এমন একজন দীর্ঘদিনের মাঠপর্যায়ের সংবাদকর্মী, যাঁর পেশাগত জীবনকে কেবল পদবি দিয়ে মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়।

কিশোরগঞ্জের সাংবাদিকতা ও সাহিত্য-সংস্কৃতির অঙ্গনে তাঁর মৃত্যু যে শূন্যতা তৈরি করেছে, তা শুধু একজন প্রবীণ সংবাদকর্মীর অভাব দিয়ে পরিমাপ করা যাবে না। তাঁর সঙ্গে হারিয়ে গেল একটি সময়ের অভিজ্ঞতা, পেশাগত শৃঙ্খলা, সাহিত্যিক মনন এবং মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরির এক বিশেষ সংস্কৃতির জীবন্ত প্রতিনিধি।

নতুন প্রজন্মের সাংবাদিকদের কাছে তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবন হতে পারে নিষ্ঠা ও ধারাবাহিকতার শিক্ষা। সাহিত্যচর্চায় তাঁর সম্পৃক্ততা হতে পারে সৃজনশীলতার অনুপ্রেরণা। আর তাঁর ব্যক্তিগত জীবন হতে পারে বিনয়, সৌজন্য ও মানবিকতার এক নীরব পাঠ।

 ব্যক্তিগত শূন্যতা: কিছু স্মৃতি কখনো পুরোনো হয় না

আজ ব্যক্তিগতভাবে আমার সবচেয়ে বেশি কষ্ট হচ্ছে এই ভেবে যে, এত দীর্ঘ পরিচয়ের মানুষটির সঙ্গে আর কোনো দিন দেখা হবে না। হয়তো কোনো একদিন হঠাৎ মনে হবে, সুবীরদাকে ফোন করি। কোনো সংবাদ বা ঘটনার প্রসঙ্গে তাঁর সঙ্গে কথা বলি। হয়তো কিশোরগঞ্জ গেলে তাঁর বাসায় যাওয়ার পুরোনো অভ্যাস মনে পড়ে যাবে।

কিন্তু পরক্ষণেই মনে পড়বে, সেই মানুষটি আর নেই। এই যে অভ্যাসের ভেতরেও একজন মানুষের উপস্থিতি থেকে যায়, তাঁর চলে যাওয়ার পর সেই অভ্যাসগুলোই কখনো কখনো সবচেয়ে বেশি কাঁদায়।

বউদির কথা ভাবলেও মন ভারী হয়ে আসে। দীর্ঘদিনের জীবনসঙ্গীকে হারানোর বেদনা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। যাঁর সঙ্গে প্রতিদিনের জীবন, স্মৃতি, সুখ-দুঃখ ও ভবিষ্যতের স্বপ্ন ভাগ করে নেওয়া হয়েছে, তাঁর অনুপস্থিতি কতটা অসহনীয় হতে পারে, তা কেবল শোকাহত হৃদয়ই জানে।

এই কঠিন সময়ে বউদি ও পরিবারের সদস্যদের প্রতি রইল গভীর সমবেদনা। প্রার্থনা করি, তাঁরা যেন এই অপূরণীয় শোক সহ্য করার শক্তি পান।

জীবন আসলে কত অদ্ভুত! আমরা ভাবি, আগামীকাল আবার দেখা হবে, পরে কথা হবে, আরেকদিন বসে গল্প করা যাবে। অথচ সেই আগামীকালটি যে কারও জীবনে শেষ আগামীকাল হয়ে আসতে পারে, তা আমরা বুঝতেই চাই না।

সুবীরদার সাম্প্রতিক কবিতা, শেষ ছবিটি এবং তাঁর স্বাভাবিক উপস্থিতির স্মৃতি আজ আমাকে সেই নির্মম সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। মানুষ কত পরিকল্পনা করেন, কত স্বপ্ন বোনেন, কত কথা জমিয়ে রাখেন; অথচ কখন যে জীবনের সব আয়োজন থেমে যায়, কেউ জানে না।

তবে মানুষ কি সত্যিই হারিয়ে যান? শারীরিকভাবে চলে গেলেও যাঁরা তাঁদের কর্ম, সৃষ্টি, ভালোবাসা ও মানবিক আচরণ দিয়ে মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেন, তাঁরা অন্যভাবে বেঁচে থাকেন।

সুবীরদা বেঁচে থাকবেন তাঁর সংবাদ ও লেখায়, তাঁর ছড়ায়, ‘উত্তরণ’ সম্পাদনার স্মৃতিতে, কিশোরগঞ্জের সাংবাদিকতা ও সংস্কৃতির ইতিহাসে। বেঁচে থাকবেন সহকর্মীদের স্মৃতিতে, বন্ধুদের আড্ডায়, পরিচিতজনদের হৃদয়ে। আর আমার মতো মানুষের কাছে বেঁচে থাকবেন ১৯৯২ সাল থেকে শুরু হওয়া এক দীর্ঘ সম্পর্কের অসংখ্য স্মৃতির মধ্যে।

সুবীরদা, আপনার চলে যাওয়াটা মেনে নিতে বড় কষ্ট হচ্ছে। এত বছরের পরিচয়, এত আন্তরিকতা, এত স্মৃতি – সবকিছু যেন এক মুহূর্তে অতীত হয়ে গেল। আপনার শান্ত মুখ, মৃদু কণ্ঠ, স্নেহমাখা আচরণ, বউদির আতিথেয়তা – সবকিছুই আজ বড় বেশি মনে পড়ছে।

আপনার ফেসবুকের পাতায় আর নতুন কবিতা আসবে না, কোনো ছবির নিচে আপনার নিজের লেখা নতুন কোনো অনুভূতি পাওয়া যাবে না। অথচ আপনার পুরোনো লেখাগুলো দেখলেই মনে হবে, আপনি বুঝি এখনো কোথাও আছেন, লিখছেন, ভাবছেন, আমাদের সঙ্গে কথা বলছেন।

কিছু বিদায় শুধু চোখের জল ঝরায় না; মানুষের ভেতরে দীর্ঘস্থায়ী এক নীরবতা তৈরি করে। কিছু শূন্যতা কোনো শব্দে পূরণ হয় না, কোনো সান্ত্বনায় মুছে যায় না। কিছু মানুষ চলে যাওয়ার পর উপলব্ধি হয়, তাঁরা আমাদের জীবনের কতখানি জায়গাজুড়ে ছিলেন। সুবীরদার প্রয়াণ আমার কাছে তেমনই এক অপূরণীয় শূন্যতা।

সুবীরদা, আপনি চলে গেলেন। কিন্তু আপনার সঙ্গে যেন হারিয়ে গেল আমার জীবনের একটি দীর্ঘ পরিচিত সময়, অসংখ্য স্মৃতির উষ্ণতা এবং এক আপনজনের সান্নিধ্য।
আজ আপনার মৃত্যুসংবাদ লিখতে গিয়ে মনে পড়ছে, একদিন আপনি অন্যের খবর লিখতেন, অন্যের জীবনের গল্প তুলে ধরতেন।

আজ আপনার গল্পই আমাদের স্মৃতির পাতায় লিখতে হচ্ছে। এ কেমন নিয়তি! আপনার রেখে যাওয়া সৃষ্টি, কর্ম ও ভালোবাসা আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবে। কিন্তু সেই পরিচিত মানুষটির অভাব কোনো দিন পূরণ হবে না।

অমর্ত্যলোকে ভালো থাকবেন, প্রিয় সুবীরদা। আপনার কলম থেমে গেছে, কিন্তু আপনার সৃষ্টি থামবে না; আপনার কণ্ঠ নিঃশব্দ হয়েছে, কিন্তু আপনার স্মৃতি নিঃশেষ হবে না।

লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও কলামিস্ট;

সহযোগী সম্পাদক, আজকের সূর্যোদয়, ঢাকা

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

সুবীরদা, আপনার চলে যাওয়ায় কী যেন হারিয়ে গেল!

আপডেট টাইম : ০২:৩২:২৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬

রফিকুল ইসলামঃ কিছু মানুষের চলে যাওয়া কেবল মৃত্যুসংবাদ নয়; তা হৃদয়ের গভীরে এমন এক শূন্যতা তৈরি করে, যার কোনো পরিমাপ নেই, কোনো সান্ত্বনা নেই। তাঁদের অনুপস্থিতিতে চারপাশের সবকিছু আগের মতোই থাকে – সকাল হয়, সন্ধ্যা নামে, মানুষ কথা বলে, জীবন তার নিজস্ব নিয়মে এগিয়ে চলে; শুধু কোথায় যেন একটি পরিচিত মুখের অনুপস্থিতি প্রতিটি মুহূর্তকে বিষণ্ন করে তোলে।

মনে হয়, জীবনের খুব আপন কিছু একটা হারিয়ে গেল। এমন কিছু, যা আর কোনো দিন ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়। প্রবীণ সাংবাদিক, বিশিষ্ট ছড়াকার, লেখক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সুবীর বসাকের প্রয়াণে আজ আমার হৃদয়ে ঠিক তেমনই এক শূন্যতার জন্ম হয়েছে। বারবার মনে হচ্ছে, কী যেন হারালাম!

দৈনিক ইত্তেফাকের কিশোরগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি সুবীর বসাক আর আমাদের মাঝে নেই। ২ নভেম্বর সোমবার সন্ধ্যায় হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে কিশোরগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে তিনি শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭০ বছর।

পরদিন সকালে মানে আজ মঙ্গলবার (৩রা নভেম্বর) তাঁর মৃত্যুসংবাদটি চোখে পড়তেই যেন মুহূর্তের জন্য সবকিছু থমকে গিয়েছিল। আগের রাতে পেশাগত ব্যস্ততায় ফেসবুকে যাওয়া হয়নি। সকালে সংবাদটি দেখে প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না। যে মানুষটিকে মাত্র কদিন আগেও লিখতে দেখেছি, ছবি প্রকাশ করতে দেখেছি, যাঁর সঙ্গে তিন দশকেরও বেশি সময়ের স্মৃতি জড়িয়ে আছে, তিনি কী করে এত দ্রুত আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন!

মৃত্যুর আগের দিনও স্কুলজীবনের এক শিক্ষকের সঙ্গে ছবি তুলে ফেসবুকে শেয়ার করেছিলেন তিনি। কদিন আগেও লিখেছিলেন কবিতা, নিজের ব্যক্তিগত ফেসবুক অ্যাকাউন্টে প্রকাশ করেছিলেন সেই সৃজনশীলতার আনন্দ। কী স্বাভাবিক, কী প্রাণবন্ত ছিল তাঁর সাম্প্রতিক উপস্থিতি! কে জানত, সেই ছবিই হয়ে থাকবে তাঁর জীবনের শেষ ফেসবুক পোস্ট! কে জানত, আর কোনো দিন তাঁর দেয়ালে নতুন কবিতা প্রকাশিত হবে না, নতুন কোনো ছবি দেখে পরিচিতজনেরা মন্তব্য করার সুযোগ পাবেন না!

এ এক অদ্ভুত নির্মমতা। যে মানুষটি গত পরশুও ছিলেন, লিখেছেন, ছবি তুলেছেন, স্মৃতি ভাগ করে নিয়েছেন, আজ তিনি শুধুই স্মৃতি। তাঁর ফেসবুকের পাতায় পুরোনো কবিতাগুলো থেকে যাবে, ছবিগুলোও থেকে যাবে। বন্ধুরা হয়তো মাঝেমধ্যে সেখানে গিয়ে থমকে দাঁড়াবেন।

কিন্তু যিনি সেসব লিখেছেন, যিনি ছবির পেছনের মানুষটি, তিনি আর কোনো দিন ফিরে আসবেন না। প্রযুক্তি তাঁর স্মৃতি ধরে রাখতে পারবে, কিন্তু তাঁর কণ্ঠ ফিরিয়ে দিতে পারবে না। এভাবেই একজন জীবন্ত মানুষ একদিন পরিচিতজনদের কাছে স্মৃতির মানুষ হয়ে যান।

 ১৯৯২ থেকে শুরু, তিন দশকেরও বেশি আত্মিক সম্পর্ক

সুবীরদার সঙ্গে আমার পরিচয় ১৯৯২ সালে। তখন আমি ঢাকায় একটি পত্রিকার স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে কর্মরত। সেই সময় থেকেই তাঁর সঙ্গে পরিচয়, ক্রমে ঘনিষ্ঠতা, আর একসময় সেই সম্পর্ক পেশাগত পরিচয়ের গণ্ডি ছাড়িয়ে পারিবারিক আন্তরিকতায় রূপ নেয়। তিন দশকেরও বেশি সময়ের সেই সম্পর্কের দিকে ফিরে তাকালে মনে হয়, কত দীর্ঘ পথ পেরিয়েছি আমরা! কত কথা, কত আড্ডা, কত অভিজ্ঞতা বিনিময়, কত সুখ-দুঃখের স্মৃতি জমে আছে মনের গভীরে!

কতবার যে তাঁর বাসায় গিয়েছি! কতবার যে বউদির আন্তরিক আতিথেয়তা গ্রহণ করেছি, তার হিসাব নেই। আজও যেন চোখের সামনে ভেসে ওঠে সেই পরিচিত পরিবেশ।

সুবীরদা ও বউদি দুজনই ছিলেন অত্যন্ত সজ্জন, বিনয়ী ও অতিথিপরায়ণ। তাঁদের কাছে গেলে কখনো নিজেকে অতিথি মনে হয়নি; মনে হয়েছে, আপনজনের ঘরে এসেছি। মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য যে বড় আয়োজনের প্রয়োজন হয় না, প্রয়োজন শুধু আন্তরিকতা, সৌজন্য ও হৃদয়ের টান – তাঁরা ছিলেন তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

সুবীরদার ব্যক্তিত্বের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য ছিল তাঁর সহজ-সরল জীবনবোধ। তিনি ছিলেন মৃদুভাষী, শান্ত ও নিরহংকারী। কথাবার্তায় ছিল সংযম, আচরণে ছিল সৌজন্য, আর মানুষের সঙ্গে মেশার মধ্যে ছিল এক ধরনের সহজাত আন্তরিকতা। নিজেকে বড় করে দেখানোর কোনো প্রবণতা তাঁর মধ্যে দেখিনি। অথচ দীর্ঘ পেশাগত অভিজ্ঞতা, সাহিত্যচর্চা ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে বিচরণের মধ্য দিয়ে তিনি নিজের জন্য তৈরি করেছিলেন সম্মানজনক অবস্থান। তিনি উচ্চকণ্ঠ ছিলেন না, কিন্তু তাঁর কর্ম ও ব্যক্তিত্বই ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয়।

প্রায় পাঁচ দশকের সাংবাদিকতা: একটি জনপদের জীবন্ত ইতিহাস

সুবীর বসাকের সাংবাদিকতা জীবন ছিল প্রায় পাঁচ দশকের দীর্ঘ সাধনা। দৈনিক ইত্তেফাকে প্রথমে মহকুমা প্রতিনিধি এবং পরবর্তী সময়ে কিশোরগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এই পেশার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সংবাদমাধ্যমের পরিবর্তন, প্রযুক্তির বিবর্তন, সংবাদ পরিবেশনের ধরন বদলে যাওয়া – সবকিছুর মধ্যেও তিনি নিজের পেশাগত দায়িত্ব থেকে সরে যাননি।

একজন সাংবাদিকের কর্মজীবনকে শুধু চাকরির মেয়াদ দিয়ে বিচার করা যায় না। তাঁর প্রতিবেদনের মধ্য দিয়ে কত মানুষের কথা ওঠে এসেছে, কত সামাজিক সমস্যা কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিগোচর হয়েছে, কত জনপদের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষিত হয়েছে, কত ঘটনার সাক্ষ্য সংবাদপত্রের পাতায় জায়গা পেয়েছে – সেসবও বিবেচনায় নিতে হয়।
এই বিবেচনায় সুবীর বসাকের দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবন কিশোরগঞ্জের গণমাধ্যমের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

একজন জেলা প্রতিনিধির কাজ কেবল সংবাদ সংগ্রহ ও পাঠিয়ে দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁকে জানতে হয় জনপদের মানুষের জীবন, মাটি, ইতিহাস, ঐতিহ্য, অর্থনীতি, সামাজিক সংকট ও সম্ভাবনার কথা। প্রশাসন থেকে সাধারণ মানুষ, সাংস্কৃতিক কর্মী থেকে সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী – সবার সঙ্গে যোগাযোগ রেখে একটি জেলার বহুমাত্রিক চিত্র তুলে ধরতে হয়।

সুবীরদা দীর্ঘদিন ধরে সেই দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর প্রতিবেদনে কিশোরগঞ্জের সামাজিক-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, ঐতিহ্য, উন্নয়ন, জনজীবনের সমস্যা এবং বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগের কথা ওঠে এসেছে। ঐতিহ্যবাহী শোলাকিয়া ঈদগাহ, হাওরাঞ্চলের নারী উন্নয়ন, ছড়া উৎসব, প্রতিধ্বনি থিয়েটারের সাংস্কৃতিক আয়োজন ও সামাজিক আন্দোলনের মতো বিষয়ও তাঁর সাংবাদিকতার পরিসরে স্থান পেয়েছে।

এখানেই একজন অভিজ্ঞ স্থানীয় সাংবাদিকের প্রকৃত গুরুত্ব। রাজধানীকেন্দ্রিক সংবাদপ্রবাহের বাইরে জেলা ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের জীবনসংগ্রাম, সমস্যা, সম্ভাবনা ও অর্জন জাতীয় পরিসরে তুলে ধরার ক্ষেত্রে তাঁদের ভূমিকা অপরিসীম। সুবীর বসাকের মতো সাংবাদিকেরা স্থানীয় ঘটনাকে জাতীয় সংবাদপ্রবাহের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। তাঁদের সংগৃহীত সংবাদ শুধু তাৎক্ষণিক তথ্য নয়, সময়ের ব্যবধানে হয়ে ওঠে একটি অঞ্চলের সামাজিক ইতিহাসের উপাদান।

ছড়াকার ও সাহিত্য সংগঠক: সাংবাদিকতার বাইরেও এক সৃজনশীল জীবন

সুবীরদার পরিচয় শুধু সাংবাদিকতায় সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি ছিলেন একজন সমকালীন ছড়াকার, লেখক ও সাহিত্য-সংস্কৃতির নিবেদিত কর্মী। দৈনিক আমাদের সময়েও তিনি নিয়মিত ছড়া লিখতেন। তাঁর ছড়াসাহিত্যচর্চা তাঁকে সাহিত্যাঙ্গনে আলাদা পরিচিতি এনে দিয়েছিল। সমকালীন ছড়াকার হিসেবে দেশ-বিদেশে তাঁর পরিচিতি ও বিভিন্ন সম্মাননা অর্জনের তথ্যও সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।

কিশোরগঞ্জের সাহিত্যচর্চার ইতিহাসে তাঁর একটি উল্লেখযোগ্য অবদান ১৯৭৬ সালে। সে বছর কবি সৈয়দ আজিজুল বারীর সঙ্গে যৌথভাবে তিনি ‘উত্তরণ’ নামে একটি সাহিত্যপত্র সম্পাদনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের সাহিত্যচর্চার বিকাশপর্বে জেলা শহরগুলোতে লিটল ম্যাগাজিন বা ছোট কাগজের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সীমিত সামর্থ্য, স্বল্প প্রচার ও নানা প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও এসব সাহিত্যপত্র নতুন লেখক, কবি ও সৃজনশীল মানুষের জন্য তৈরি করেছিল প্রকাশের ক্ষেত্র।

কিশোরগঞ্জের সাহিত্য-সংস্কৃতির বিকাশেও এ ধরনের উদ্যোগের ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। ‘উত্তরণ’ সম্পাদনায় সুবীর বসাকের সম্পৃক্ততা প্রমাণ করে, তাঁর সাহিত্যিক পরিচয় শুধু নিজের কবিতা বা ছড়া প্রকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; নতুন সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্র তৈরিতেও তিনি ভূমিকা রেখেছেন।

২০১৪ সালে কিশোরগঞ্জ ছড়াকার সংসদের দ্বিতীয় আঞ্চলিক ছড়া সম্মেলনে তিনি সভাপতিত্ব করেন। দেশের ৪০টি জেলা থেকে ছড়াকারদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত ওই সম্মেলন ছিল আঞ্চলিক সাহিত্যচর্চাকে বৃহত্তর পরিসরে যুক্ত করার একটি উল্লেখযোগ্য আয়োজন। একজন ছড়াকার হিসেবে তাঁর এমন দায়িত্ব পালন সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে তাঁর গ্রহণযোগ্যতারই পরিচায়ক।

ছড়া সাহিত্যের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, অল্প কথায় গভীর ভাব প্রকাশ করা। কখনো হাস্যরস, কখনো ব্যঙ্গ, কখনো সামাজিক অসংগতি, আবার কখনো জীবনের সরল সত্য – ছড়ার মাধ্যমে সহজেই মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়। একজন ভালো ছড়াকারকে তাই শুধু শব্দের কারিগর হলেই চলে না; তাঁকে হতে হয় সমাজ ও সময়ের সংবেদনশীল পর্যবেক্ষক। সুবীরদার দীর্ঘ সাহিত্যচর্চার মধ্যেও এই সৃজনশীল পরিচয়টি ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

 সাংগঠনিক নেতৃত্ব ও সাংবাদিক সমাজে ভূমিকা

সুবীর বসাক কিশোরগঞ্জ প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮৪ থেকে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্বে ছিলেন। সাংবাদিকদের পেশাগত যোগাযোগ, পারস্পরিক সহযোগিতা, সংগঠন পরিচালনা এবং স্থানীয় গণমাধ্যমের বিকাশে প্রেসক্লাবের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই সাংগঠনিক দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে তিনি সাংবাদিক সমাজের সঙ্গেও নিবিড়ভাবে যুক্ত ছিলেন।

তাঁর কর্মজীবনের এই দিকটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কারণ একজন সাংবাদিক ব্যক্তিগতভাবে যত ভালো প্রতিবেদনই তৈরি করুন না কেন, পেশার বৃহত্তর স্বার্থে সহকর্মীদের সঙ্গে সমন্বয়, সংগঠন পরিচালনা ও পারস্পরিক সহযোগিতার মানসিকতাও জরুরি। সুবীরদা সাংবাদিকতা, সাহিত্য ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড – এই তিনটি ক্ষেত্রেই নিজের সম্পৃক্ততার পরিচয় রেখে গেছেন।

সাহিত্য ও সাংবাদিকতায় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি বিভিন্ন পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন। তবে আমার কাছে তাঁর সবচেয়ে বড় অর্জন কোনো পদ-পদবি কিংবা পুরস্কার নয়; তাঁর সবচেয়ে বড় অর্জন মানুষের ভালোবাসা। কারণ পদ-পদবি সময়ের সঙ্গে বদলে যায়, পুরস্কারের স্মারক একসময় শোকেসে পড়ে থাকে, কিন্তু মানুষের হৃদয়ে তৈরি হওয়া ভালোবাসার জায়গাটি সহজে মুছে যায় না।

 যিনি অন্যের খবর লিখতেন, আজ তাঁকে নিয়েই শোকের সংবাদ

ভাবতে অবাক লাগে, যিনি দীর্ঘদিন অন্যের খবর মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন, যিনি অসংখ্য ঘটনা, দুর্ঘটনা, আনন্দ-বেদনা ও মৃত্যুসংবাদ সংবাদমাধ্যমে তুলে ধরেছেন, আজ তাঁকে নিয়েই আমাদের লিখতে হচ্ছে শোকের কথা। যিনি জীবনের প্রায় পাঁচ দশক সংবাদ সংগ্রহে ব্যয় করেছেন, তাঁর নিজের জীবনের শেষ সংবাদটি আজ আমাদের হৃদয়কে বিদীর্ণ করছে।

সাংবাদিকতার ইতিহাসে অনেকের নাম বড় বড় পদ, পুরস্কার কিংবা জাতীয় পরিচিতির কারণে স্মরণীয় হয়ে থাকে। আবার অনেক সাংবাদিক আছেন, যাঁরা নীরবে একটি অঞ্চলের সংবাদজগতকে সমৃদ্ধ করেন। তাঁরা প্রতিদিন সংবাদ সংগ্রহ করেন, তথ্য যাচাই করেন, মানুষের সঙ্গে কথা বলেন, ঘটনার পেছনের বাস্তবতা খুঁজে বের করেন।

তাঁদের শ্রমের অনেকটাই সাধারণ পাঠকের চোখের আড়ালে থেকে যায়। সুবীর বসাক ছিলেন এমন একজন দীর্ঘদিনের মাঠপর্যায়ের সংবাদকর্মী, যাঁর পেশাগত জীবনকে কেবল পদবি দিয়ে মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়।

কিশোরগঞ্জের সাংবাদিকতা ও সাহিত্য-সংস্কৃতির অঙ্গনে তাঁর মৃত্যু যে শূন্যতা তৈরি করেছে, তা শুধু একজন প্রবীণ সংবাদকর্মীর অভাব দিয়ে পরিমাপ করা যাবে না। তাঁর সঙ্গে হারিয়ে গেল একটি সময়ের অভিজ্ঞতা, পেশাগত শৃঙ্খলা, সাহিত্যিক মনন এবং মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরির এক বিশেষ সংস্কৃতির জীবন্ত প্রতিনিধি।

নতুন প্রজন্মের সাংবাদিকদের কাছে তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবন হতে পারে নিষ্ঠা ও ধারাবাহিকতার শিক্ষা। সাহিত্যচর্চায় তাঁর সম্পৃক্ততা হতে পারে সৃজনশীলতার অনুপ্রেরণা। আর তাঁর ব্যক্তিগত জীবন হতে পারে বিনয়, সৌজন্য ও মানবিকতার এক নীরব পাঠ।

 ব্যক্তিগত শূন্যতা: কিছু স্মৃতি কখনো পুরোনো হয় না

আজ ব্যক্তিগতভাবে আমার সবচেয়ে বেশি কষ্ট হচ্ছে এই ভেবে যে, এত দীর্ঘ পরিচয়ের মানুষটির সঙ্গে আর কোনো দিন দেখা হবে না। হয়তো কোনো একদিন হঠাৎ মনে হবে, সুবীরদাকে ফোন করি। কোনো সংবাদ বা ঘটনার প্রসঙ্গে তাঁর সঙ্গে কথা বলি। হয়তো কিশোরগঞ্জ গেলে তাঁর বাসায় যাওয়ার পুরোনো অভ্যাস মনে পড়ে যাবে।

কিন্তু পরক্ষণেই মনে পড়বে, সেই মানুষটি আর নেই। এই যে অভ্যাসের ভেতরেও একজন মানুষের উপস্থিতি থেকে যায়, তাঁর চলে যাওয়ার পর সেই অভ্যাসগুলোই কখনো কখনো সবচেয়ে বেশি কাঁদায়।

বউদির কথা ভাবলেও মন ভারী হয়ে আসে। দীর্ঘদিনের জীবনসঙ্গীকে হারানোর বেদনা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। যাঁর সঙ্গে প্রতিদিনের জীবন, স্মৃতি, সুখ-দুঃখ ও ভবিষ্যতের স্বপ্ন ভাগ করে নেওয়া হয়েছে, তাঁর অনুপস্থিতি কতটা অসহনীয় হতে পারে, তা কেবল শোকাহত হৃদয়ই জানে।

এই কঠিন সময়ে বউদি ও পরিবারের সদস্যদের প্রতি রইল গভীর সমবেদনা। প্রার্থনা করি, তাঁরা যেন এই অপূরণীয় শোক সহ্য করার শক্তি পান।

জীবন আসলে কত অদ্ভুত! আমরা ভাবি, আগামীকাল আবার দেখা হবে, পরে কথা হবে, আরেকদিন বসে গল্প করা যাবে। অথচ সেই আগামীকালটি যে কারও জীবনে শেষ আগামীকাল হয়ে আসতে পারে, তা আমরা বুঝতেই চাই না।

সুবীরদার সাম্প্রতিক কবিতা, শেষ ছবিটি এবং তাঁর স্বাভাবিক উপস্থিতির স্মৃতি আজ আমাকে সেই নির্মম সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। মানুষ কত পরিকল্পনা করেন, কত স্বপ্ন বোনেন, কত কথা জমিয়ে রাখেন; অথচ কখন যে জীবনের সব আয়োজন থেমে যায়, কেউ জানে না।

তবে মানুষ কি সত্যিই হারিয়ে যান? শারীরিকভাবে চলে গেলেও যাঁরা তাঁদের কর্ম, সৃষ্টি, ভালোবাসা ও মানবিক আচরণ দিয়ে মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেন, তাঁরা অন্যভাবে বেঁচে থাকেন।

সুবীরদা বেঁচে থাকবেন তাঁর সংবাদ ও লেখায়, তাঁর ছড়ায়, ‘উত্তরণ’ সম্পাদনার স্মৃতিতে, কিশোরগঞ্জের সাংবাদিকতা ও সংস্কৃতির ইতিহাসে। বেঁচে থাকবেন সহকর্মীদের স্মৃতিতে, বন্ধুদের আড্ডায়, পরিচিতজনদের হৃদয়ে। আর আমার মতো মানুষের কাছে বেঁচে থাকবেন ১৯৯২ সাল থেকে শুরু হওয়া এক দীর্ঘ সম্পর্কের অসংখ্য স্মৃতির মধ্যে।

সুবীরদা, আপনার চলে যাওয়াটা মেনে নিতে বড় কষ্ট হচ্ছে। এত বছরের পরিচয়, এত আন্তরিকতা, এত স্মৃতি – সবকিছু যেন এক মুহূর্তে অতীত হয়ে গেল। আপনার শান্ত মুখ, মৃদু কণ্ঠ, স্নেহমাখা আচরণ, বউদির আতিথেয়তা – সবকিছুই আজ বড় বেশি মনে পড়ছে।

আপনার ফেসবুকের পাতায় আর নতুন কবিতা আসবে না, কোনো ছবির নিচে আপনার নিজের লেখা নতুন কোনো অনুভূতি পাওয়া যাবে না। অথচ আপনার পুরোনো লেখাগুলো দেখলেই মনে হবে, আপনি বুঝি এখনো কোথাও আছেন, লিখছেন, ভাবছেন, আমাদের সঙ্গে কথা বলছেন।

কিছু বিদায় শুধু চোখের জল ঝরায় না; মানুষের ভেতরে দীর্ঘস্থায়ী এক নীরবতা তৈরি করে। কিছু শূন্যতা কোনো শব্দে পূরণ হয় না, কোনো সান্ত্বনায় মুছে যায় না। কিছু মানুষ চলে যাওয়ার পর উপলব্ধি হয়, তাঁরা আমাদের জীবনের কতখানি জায়গাজুড়ে ছিলেন। সুবীরদার প্রয়াণ আমার কাছে তেমনই এক অপূরণীয় শূন্যতা।

সুবীরদা, আপনি চলে গেলেন। কিন্তু আপনার সঙ্গে যেন হারিয়ে গেল আমার জীবনের একটি দীর্ঘ পরিচিত সময়, অসংখ্য স্মৃতির উষ্ণতা এবং এক আপনজনের সান্নিধ্য।
আজ আপনার মৃত্যুসংবাদ লিখতে গিয়ে মনে পড়ছে, একদিন আপনি অন্যের খবর লিখতেন, অন্যের জীবনের গল্প তুলে ধরতেন।

আজ আপনার গল্পই আমাদের স্মৃতির পাতায় লিখতে হচ্ছে। এ কেমন নিয়তি! আপনার রেখে যাওয়া সৃষ্টি, কর্ম ও ভালোবাসা আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবে। কিন্তু সেই পরিচিত মানুষটির অভাব কোনো দিন পূরণ হবে না।

অমর্ত্যলোকে ভালো থাকবেন, প্রিয় সুবীরদা। আপনার কলম থেমে গেছে, কিন্তু আপনার সৃষ্টি থামবে না; আপনার কণ্ঠ নিঃশব্দ হয়েছে, কিন্তু আপনার স্মৃতি নিঃশেষ হবে না।

লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও কলামিস্ট;

সহযোগী সম্পাদক, আজকের সূর্যোদয়, ঢাকা