নিখোঁজ থেকে নির্বাসন, তারপর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব—আলোচনায় বিএনপির প্রভাবশালী এই নেতা
বাংলাদেশের রাজনীতিতে সালাহউদ্দিন আহমদের পথচলা উত্থান-পতন, সংগ্রাম ও নানা নাটকীয় ঘটনার মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে। সরকারি প্রশাসনের ম্যাজিস্ট্রেসি থেকে রাজনীতি, বিএনপির আন্দোলনের মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব পালন, নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা, ভারতের শিলংয়ে দীর্ঘ নির্বাসিত জীবন— সবশেষে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর আসনে অধিষ্ঠিত হওয়া। তার রাজনৈতিক জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ই নানা কারণে আলোচিত।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ দলটির প্রভাবশালী নীতিনির্ধারকদের একজন। রাজনৈতিক অঙ্গনে তার অবস্থান যেমন শক্তিশালী হয়েছে, তেমনি তাকে ঘিরে তৈরি হয়েছে বিতর্ক, সমালোচনা ও রাজনৈতিক বিরোধ। বিশেষ করে রাষ্ট্র সংস্কার, সংবিধান, সংসদীয় কার্যক্রম এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বিতর্কে তিনি রয়েছেন আলোচনার কেন্দ্রে।
২০১৫ সালে নিখোঁজ হওয়ার পর প্রায় দুই মাসের মাথায় ভারতের মেঘালয়ের শিলংয়ে তার সন্ধান পাওয়া যায়। এরপর দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার কারণে তাকে সেখানে অবস্থান করতে হয়। প্রায় সাড়ে নয় বছর পর দেশে ফিরে বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় হন তিনি। পরবর্তী সময়ে দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তার ভূমিকা আরও বিস্তৃত হয়। ২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ তার রাজনৈতিক জীবনে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে।
প্রশাসন থেকে রাজনীতির মাঠে
১৯৬২ সালের ৩০ জুন কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার সিকদারপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন সালাহউদ্দিন আহমদ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ থেকে এলএলবি ও এলএলএম ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। ছাত্রজীবনেই জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের রাজনীতিতে যুক্ত হন। সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সহসভাপতি ও ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন। আশির দশকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে তার পরিচিতি বাড়তে থাকে।
রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার আগে তিনি সপ্তম বিসিএসের মাধ্যমে প্রশাসন ক্যাডারে যোগ দেন। ম্যাজিস্ট্রেট ও সহকারী কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার পাশাপাশি আইন বিষয়ে পড়াশোনা তার পরবর্তী রাজনৈতিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সহকারী একান্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন সালাহউদ্দিন আহমদ। পরে সরকারি চাকরি ছেড়ে সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হন। কক্সবাজারের চকরিয়া-পেকুয়া অঞ্চলে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান সুসংহত করেন। ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কক্সবাজার-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি।
২০০১ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার গঠিত হলে যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান সালাহউদ্দিন আহমদ। প্রশাসন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও মন্ত্রিসভায় কাজের অভিজ্ঞতা তার রাজনৈতিক পরিচয়কে আরও সমৃদ্ধ করে।
বিএনপির মুখপাত্র থেকে নিখোঁজ
২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপি বিরোধী দলে থাকাকালে দলীয় রাজনীতিতে আরও সক্রিয় হয়ে ওঠেন সালাহউদ্দিন আহমদ। ২০১০ সালে বিএনপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব হন। পরবর্তী সময়ে দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের অনেকে কারাবন্দি থাকাকালে সরকারবিরোধী আন্দোলনে বিএনপির মুখপাত্র হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
২০১৫ সালের ১০ মার্চ ঢাকার একটি বাসা থেকে তাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ করে বিএনপি ও তার পরিবার। ওই ঘটনার পর দীর্ঘ সময় তার অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। প্রায় দুই মাস পর ভারতের মেঘালয় রাজ্যের শিলংয়ে তার সন্ধান মেলে।
শিলংয়ে অবস্থানকালে তাকে আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। দেশে ফেরার অপেক্ষায় কাটে দীর্ঘ সময়। এ ঘটনা শুধু তার ব্যক্তিগত জীবনেই নয়, বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। তাকে নিখোঁজ করার অভিযোগ, তার অবস্থান এবং দেশে ফিরতে দীর্ঘ বিলম্ব— সবকিছুই রাজনৈতিক বিতর্কের অংশ হয়ে ওঠে।
সাড়ে নয় বছরের শিলং-অধ্যায়, তারপর প্রত্যাবর্তন
দীর্ঘ নির্বাসিত জীবন শেষে ২০২৪ সালের আগস্টে দেশে ফেরেন সালাহউদ্দিন আহমদ। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তার দেশে ফেরার পথ সুগম হয়। দেশে ফিরে আবারও বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি।
পরবর্তী সময়ে বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে দলটির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। রাষ্ট্র সংস্কার, নির্বাচনকালীন রূপরেখা, সাংবিধানিক প্রশ্ন ও রাজনৈতিক সমঝোতা নিয়ে আলোচনায় বিএনপির অবস্থান তুলে ধরেন তিনি।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে সংলাপে বিএনপির প্রতিনিধি দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে অংশ নেন সালাহউদ্দিন আহমদ। সংস্কার প্রস্তাবের বিভিন্ন দিক নিয়ে তার যুক্তিনির্ভর বক্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দেয়।
২০২৫ সালের ২ জুন প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সংস্কারবিষয়ক বৈঠক শেষে তিনি জানিয়েছিলেন, জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে বিএনপি সংস্কার প্রক্রিয়ায় মতামত দিয়েছে। একই সঙ্গে সংস্কার আলোচনা দ্রুত শেষ করে নির্বাচনের পথে এগিয়ে যাওয়ার পক্ষে দলের অবস্থান তুলে ধরেন তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্বে নতুন অধ্যায়
২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কক্সবাজার-১ আসন থেকে নির্বাচিত হওয়ার পর ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন সালাহউদ্দিন আহমদ। একসময় সরকারবিরোধী আন্দোলনের মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এই রাজনীতিক এখন দেশের আইনশৃঙ্খলা, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও পুলিশ প্রশাসনসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রয়েছেন।
তার রাজনৈতিক জীবনের এই পরিবর্তন বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। যে ব্যক্তি নিজেই নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা এবং দীর্ঘ প্রবাসজীবনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছেন, এখন তাকেই রাষ্ট্রের নিরাপত্তাব্যবস্থার নেতৃত্ব দিতে হচ্ছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে তার সামনে রয়েছে অপরাধ দমন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, পুলিশের পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করা, মানবাধিকার রক্ষা, অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা জোরদারের মতো গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। এসব ক্ষেত্রে তার সাফল্য-ব্যর্থতা ভবিষ্যতে রাজনৈতিক মূল্যায়নের অন্যতম প্রধান মাপকাঠি হয়ে উঠবে।
সাত ধরনের অপরাধে মামলা কমার দাবি
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যানের বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর সময়ের তুলনায় ২০২৬ সালের একই সময়ে ডাকাতি, দস্যুতা, খুন, দাঙ্গা, নারী ও শিশু নির্যাতন এবং অপহরণসহ সাত ধরনের অপরাধে মামলা কমেছে ১ হাজার ৩২৬টি, যা ৭ দশমিক ১ শতাংশ।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম নয় মাসে এসব অপরাধে মামলা হয়েছিল ১৮ হাজার ৬৬১টি। ২০২৬ সালের একই সময়ে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১৭ হাজার ৩৩৫টিতে। আর জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর— এই তিন মাসে মামলা কমেছে ৯ দশমিক ২ শতাংশ।
দাঙ্গার মামলা ৬২টি থেকে কমে ১৭টিতে নেমেছে। ডাকাতির মামলা ৫৩৮টি থেকে কমে হয়েছে ৩৮৭টি। খুনের মামলা ২ হাজার ৯১৩টি থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৬৫৯টিতে।
এ ছাড়া অপহরণের মামলা ৮১২টি থেকে কমে ৭৬৯টি, শিশু নির্যাতনের মামলা ৩ হাজার ৫৯১টি থেকে কমে ৩ হাজার ১৫১টি এবং নারী নির্যাতনের মামলা ৯ হাজার ২৬২টি থেকে কমে ৮ হাজার ১৭৮টিতে দাঁড়িয়েছে। দস্যুতার মামলাও ১ হাজার ৪৮৩টি থেকে কমে হয়েছে ১ হাজার ৩৭৪টি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, কয়েকটি প্রধান অপরাধের সংখ্যা কমেছে এবং এতে সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধারাবাহিক প্রচেষ্টাকে এ অগ্রগতির কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন তিনি।
তবে মামলার সংখ্যা কমাকে অপরাধের প্রকৃত হার কমে যাওয়ার একমাত্র প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। অভিযোগ দায়েরের প্রবণতা, মামলা নথিভুক্ত করার প্রক্রিয়া এবং অপরাধের প্রকৃত পরিস্থিতিও এ ক্ষেত্রে বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
সমালোচনা ও রাজনৈতিক বিতর্ক
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের পর সালাহউদ্দিন আহমদকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্কও বেড়েছে। বিরোধী রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব তার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং সাম্প্রতিক কিছু রাজনৈতিক ঘটনা নিয়ে তাকে সমালোচনার মুখে পড়তে হচ্ছে।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা ও কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে সালাহউদ্দিন আহমদের তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি দাবি করেন, ঘের দখল, দুর্নীতি ও ঘুষসংক্রান্ত মামলায় সাজাপ্রাপ্ত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ব্যর্থতার কারণে ইশরাক হোসেনের মতো তরুণদের পরিস্থিতির শিকার হতে হচ্ছে। এসব অভিযোগের সত্যতা ও প্রাসঙ্গিকতা যাচাইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট মামলার নথি এবং মন্ত্রীর বক্তব্য বিবেচনা করা প্রয়োজন।
হাসনাত আবদুল্লাহ তার বক্তব্যে আরও বলেন, কোনো ব্যক্তিকে সরিয়ে দিয়ে সাময়িকভাবে সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব হলেও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার সমাধান হয় না। রাষ্ট্রকে কার্যকর করতে হলে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়াতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
অন্যদিকে, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ও ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ইশরাক হোসেনের অস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযান এবং পরবর্তী সময়ে তার পদত্যাগকে কেন্দ্র করেও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা তৈরি হয়েছে। এসব ঘটনাকে ঘিরে সালাহউদ্দিন আহমদের প্রতিপক্ষরা নতুন করে সমালোচনায় সরব হয়েছেন বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে।
তবে রাজনৈতিক অভিযোগ ও পাল্টা বক্তব্যের বাইরে এসব ঘটনার প্রকৃত চিত্র নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট নথি, সরকারি বক্তব্য এবং নিরপেক্ষ অনুসন্ধান গুরুত্বপূর্ণ।
ঐকমত্য কমিশনের সংলাপ থেকে বিরোধের সূত্রপাত?
বিএনপির নেতাদের ভাষ্য, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্যে গঠিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সংলাপ থেকেই সালাহউদ্দিন আহমদকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মতবিরোধের তীব্রতা বাড়তে থাকে।
তাদের দাবি, প্রায় নয় মাসের সংস্কার আলোচনায় সালাহউদ্দিন আহমদ বিভিন্ন বিষয়ে বিএনপির অবস্থান তুলে ধরেন এবং সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক যুক্তি উপস্থাপন করেন। পরে সংসদে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বিতর্ক এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা— সব মিলিয়ে তিনি বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরের আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসেন।
বিএনপি নেতাদের একাংশের মতে, আওয়ামী লীগ, জামায়াত ও এনসিপির বিভিন্ন নেতা তাকে রাজনৈতিকভাবে চাপে রাখার চেষ্টা করছেন। তাদের ধারণা, সালাহউদ্দিন আহমদকে দুর্বল করা গেলে বিএনপির নীতিনির্ধারণী অবস্থানও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। তবে এটি বিএনপি নেতাদের রাজনৈতিক মূল্যায়ন; সংশ্লিষ্ট দলগুলোর অবস্থান ও বক্তব্যের ভিত্তিতে বিষয়টি বিচার করা প্রয়োজন।
শিক্ষাজীবন ও মেধা নিয়ে শিক্ষকের মূল্যায়ন
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. বোরহান উদ্দিন খান সালাহউদ্দিন আহমদের শিক্ষাজীবন সম্পর্কে ইতিবাচক মূল্যায়ন করেছেন।
তিনি দৈনিক সময়ের আলোকে বলেন, সালাহউদ্দিন আহমদ মেধাবী ছাত্র ছিলেন। রাজনীতিতে যুক্ত থাকায় তিনি নিয়মিত ক্লাস করতে পারতেন না। তবে পরীক্ষার আগে পড়াশোনার বিষয়ে তার পরামর্শ নিতেন। মাস্টার্সে ১২০ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে সালাহউদ্দিন ১৫তম হয়েছিলেন। ছাত্রজীবনে তিনি মিষ্টভাষী ও সদালাপী ছিলেন।
অধ্যাপক বোরহান উদ্দিন খান আরও বলেন, পড়াশোনা শেষে সালাহউদ্দিন আহমদ সিভিল সার্ভিসে যোগ দেন। পরে খালেদা জিয়ার সহকারী একান্ত সচিবের দায়িত্ব পালন করে সরকারি চাকরি ছেড়ে রাজনীতিতে আসেন।
শিলংয়ে অবস্থান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সেখানে সালাহউদ্দিন আহমদকে আইনি লড়াই করতে হয়েছে এবং দেশে ফেরার জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে। তাকে ভারতপন্থি বা ‘র’-এর এজেন্ট হিসেবে আখ্যায়িত করার প্রসঙ্গে অধ্যাপক বোরহান উদ্দিন খান বলেন, সালাহউদ্দিন আহমদের সঙ্গে কথা বলে তার মনে হয়েছে, তিনি বাংলাদেশের স্বার্থকে প্রাধান্য দেন। তার ভাষায়, তিনি সালাহউদ্দিনকে দেশপ্রেমিক ও বাংলাদেশপন্থি রাজনীতিবিদ হিসেবেই জানেন।
বিএনপির নেতাদের আস্থা
বিএনপির গণশিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক ও দলটির মিডিয়া সেলের সদস্য অধ্যাপক ড. মোর্শেদ হাসান খান দৈনিক সময়ের আলোকে বলেন, সালাহউদ্দিন আহমদ বাংলাদেশের রাজনীতিতে সততা, নিষ্ঠা ও ত্যাগের প্রতীক। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দেশ ও জনগণের পক্ষে তার ভূমিকা ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
তিনি আরও বলেন, দায়িত্বশীল পদে থেকে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা এবং প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সালাহউদ্দিন আহমদ কাজ করছেন। এ অবস্থায় তাকে নানা বিষয়ে জড়িয়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে চরিত্রহননের চেষ্টা চালানো হচ্ছে বলে তিনি মনে করেন।
তবে রাজনৈতিক নেতাদের এসব মূল্যায়নের পাশাপাশি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে সালাহউদ্দিন আহমদের কর্মকাণ্ডের নিরপেক্ষ পর্যালোচনাও গুরুত্বপূর্ণ। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং নাগরিক অধিকার সুরক্ষার ক্ষেত্রে বাস্তব অগ্রগতিই তার দায়িত্ব পালনের সাফল্য নির্ধারণ করবে।
সংবিধান ও সংসদীয় রাজনীতিতে দক্ষতার মূল্যায়ন
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান দৈনিক সময়ের আলোকে বলেন, সালাহউদ্দিন আহমদ বিএনপির একজন মেধাবী রাজনীতিবিদ। সংবিধান, সংসদ ও সংসদীয় কার্যপ্রণালি সম্পর্কে তার যথেষ্ট জ্ঞান রয়েছে। তিনি সংবিধানের বিভিন্ন বিষয়ে শক্তিশালী যুক্তি উপস্থাপন করতে পারেন।
অধ্যাপক মাহবুবুর রহমানের মতে, সালাহউদ্দিন আহমদ তার মেধা ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা দিয়ে বিএনপি এবং দেশের জন্য ভূমিকা রাখছেন। এ ধরনের ব্যক্তিদের যথাযথ মর্যাদা দেওয়া উচিত।
এক জীবনে বহু অধ্যায়
সালাহউদ্দিন আহমদের রাজনৈতিক জীবনকে শুধু ক্ষমতায় আরোহণ কিংবা রাজনৈতিক বিরোধের মধ্য দিয়ে বিচার করা কঠিন। প্রশাসনের কর্মকর্তা হিসেবে কর্মজীবন শুরু, প্রধানমন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিবের দায়িত্ব পালন, সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রী হওয়া, বিএনপির আন্দোলনের মুখপাত্র হিসেবে ভূমিকা, নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা, শিলংয়ে দীর্ঘ অবস্থান এবং দেশে ফিরে আবারও দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে উঠে আসা— প্রতিটি অধ্যায়ই তার রাজনৈতিক যাত্রার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে তার বর্তমান ভূমিকার মূল্যায়ন নির্ভর করবে আরও বড় কিছু প্রশ্নের ওপর। দেশের মানুষ কতটা নিরাপদ বোধ করছেন, অপরাধ দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কতটা কার্যকর হচ্ছে, পুলিশ কতটা পেশাদার ও জবাবদিহিমূলক ভূমিকা পালন করছে এবং নাগরিকদের অধিকার কতটা সুরক্ষিত থাকছে— এসব প্রশ্নের উত্তরই শেষ পর্যন্ত তার সাফল্য বা ব্যর্থতার মাপকাঠি হবে।
দীর্ঘ সংগ্রাম ও রাজনৈতিক উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্বে পৌঁছানো সালাহউদ্দিন আহমদের সামনে এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা রাষ্ট্র পরিচালনার এই গুরুত্বপূর্ণ খাতে জনআস্থা প্রতিষ্ঠা করা। রাজনৈতিক বিতর্কের ঊর্ধ্বে উঠে আইন, ন্যায়বিচার ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারলেই তার দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রা নতুন তাৎপর্য পাবে।
Reporter Name 





















