যদি মা-বাবার ভেতর প্যারেন্টিং সচেতনতা থাকে, তাহলে সাধারণত একটি শিশু সুন্দরভাবে বেড়ে ওঠার সুযোগ পায়। শিশুরা যেহেতু মায়ের সান্নিধ্যেই বেশি থাকে, সে ক্ষেত্রে মায়েদের আরও বেশি সচেতন থাকতে হয়। সন্তানকে গড়ে তুলতে মা-ই সবচেয়ে বড় কারিগর। এ জন্যই হয়ত নেপোলিয়ন বলেছিলেন, ‘আমাকে একটি শিক্ষিত মা দাও। আমি তোমাদের একটি শিক্ষিত জাতি উপহার দেবো।’
প্যারেন্টিং কী?
প্যারেন্টিং এমন একটি প্রক্রিয়া- যার মাধ্যমে সন্তান জন্মের পর থেকে তার অগ্রগতির প্রতি সচেতন থাকা হয় এবং মানসিক, শারীরিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ইত্যাদি নানা দিক দিয়ে তাকে সহযোগিতা করা হয়। মোটকথা, সন্তান প্রতিপালনে বাবা-মার দায়িত্ব-কর্তব্যই হচ্ছে প্যারেন্টিং।
প্যারেন্টিংয়ের ধরন
প্যারেন্টিং শব্দটি উন্নত বিশ্বে খুবই আলোচিত বিষয় হলেও আমাদের দেশে এর চর্চা খুবই কম। তবুও, প্রযুক্তির উৎকর্ষতার কারণে এখন মানুষ নানাবিধ বিষয় সম্পর্কে জানতে পারছে, সচেতন হচ্ছে। ফলে, প্যারেন্টিং সম্পর্কেও একটু একটু করে সচেতনতা তৈরি হচ্ছে।
আমাদের দেশের মা-বাবারা মনে করেন সন্তানের খাবার, পড়াশোনা, শিক্ষা কিংবা যেকোনো মৌলিক চাহিদা পূরণ করলেই দায়িত্ব পালন করা হয়ে যায়। কিন্তু মৌলিক চাহিদা পূরণের মাধ্যমেই যে একটি শিশু সুষ্ঠুভাবে বেড়ে উঠবে, এ কথা ভাবা অবান্তর। মৌলিক চাহিদা পূরণ করা প্যারেন্টিংয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে, এর বাইরেও আরও অনেক ব্যাপার রয়েছে। সন্তানের সুষ্ঠু গঠন, মানসিক ও শারীরিক বিকাশ এবং প্রতিষ্ঠাকে গুরুত্ব দিতে হবে। তাদের সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি গঠনে যত্নবান হতে হবে। সন্তানকে কতটুকু শাসন করা যাবে, কতটুকু সুযোগ-সুবিধা দেওয়া উচিত হবে, এসব ব্যাপারেও মা-বাবাকে সচেতন হতে হবে।
শারীরিক ও মানসিক বিকাশে
শিশুর সুষ্ঠু শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য প্যারেন্টিং শিক্ষা জরুরি। শিশুকে যেহেতু মা-ই লালন-পালন করেন, সেহেতু গর্ভাবস্থায় কী কী নিয়ম মেনে চলা উচিত, নবজাতক শিশুকে কী খাবার খাওয়ানো উচিত, কীভাবে একটি শিশুকে যথাসম্ভব সুস্থভাবে বড় করে তোলা যায় ইত্যাদি নানাবিধ ব্যাপারে একজন মাকে ভালোভাবে জানতে হবে। তাহলে শিশুটির শারীরিক বিকাশ ভালো হবে। আবার যদি মানসিক বিকাশের কথা বলি, একজন মা যখন প্যারেন্টিং সম্পর্কে সচেতন থাকবেন তখন তিনি চাইল্ড সাইকোলোজি বুঝতে পারবেন সহজেই। শিশুর মনস্তাত্ত্বিক ব্যাপার বুঝতে পারলে এবং সেই অনুযায়ী তাদের সঙ্গে আচরণ করলে শিশুর মানসিক বিকাশ ভালো হবে।
মৌলিক চাহিদা পূরণে
যেকোনো মা-বাবাই সন্তানের মৌলিক চাহিদা পূরণে যথাসাধ্য চেষ্টা করে থাকেন। কিন্তু প্যারেন্টিং সচেতনতা থাকলে আরও ভালো করে বোঝা যায়- শিশুর কোন চাহিদা কী পরিমাণে পূরণ করা উচিত। যদি সুষ্ঠুভাবে তাদের চাহিদা পূরণ না হয়, তাহলে এর ফলাফল নেতিবাচক হতে পারে।
আচরণ উন্নত করতে
শিশুদের সবচেয়ে বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হচ্ছে তার পরিবার। আর পরিবারের ভেতর তারা মায়ের কাছ থেকে সবচেয়ে বেশি শিক্ষালাভ করে থাকে। একটি শিশুর আচরণ কেমন হবে, সে কেমন মানুষ হিসেবে বেড়ে উঠবে এর অনেকটাই নির্ভর করে মায়ের ওপর। সব মা-বাবাই চান সন্তান ভালো মানুষ হোক। তবু, সচেতনতার অভাবে সন্তানরা অনেক সময় বিগড়ে যায়। তাই সন্তানের আচরণ উন্নত করতে, অর্থাৎ সন্তানকে প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে প্যারেন্টিং সচেতনতা জরুরি।
সন্তান কীভাবে জীবন ধারণ করবে কিংবা জীবন, জগৎ ও চারপাশের মানুষ সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গি কেমন হবে, এর ভিত্তি তৈরি করে দেয় একটি পরিবার, বিশেষ করে একজন মা। সন্তানের সুষ্ঠু জীবন ধারণ প্রক্রিয়া এবং সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে মাকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হয়। কী ঠিক, কী ভুল তা প্রতিনিয়ত সন্তানকে বুঝিয়ে দিতে হয়। এর জন্য সচেতনতা জরুরি।
সফল প্যারেন্টিংয়ের উপায়
ইংল্যান্ডের বিখ্যাত পিডিয়াট্রিশন এবং সাইকোলোজিস্ট ডোনাল্ড উইনিকোট বলেছেন, ‘ভালো প্যারেন্টিংয়ের অর্থ হচ্ছে জন্মলগ্ন থেকে শুরু করে শিশুর প্রতিটি মুহূর্তের অগ্রগতি বা উন্নতির প্রতি সজাগ দৃষ্টি রাখা’। অর্থাৎ আপনি যদি সফল প্যারেন্টিং করতে চান, অবশ্যই আপনাকে শিশুর জন্মলগ্ন থেকে শুরু করে প্রতিটি মুহূর্তে তার সবকিছু ভালোভাবে লক্ষ করতে হবে। শিশুর কখন কী দরকার, সে ব্যাপারে খেয়াল রাখতে হবে। শুধু শিশুর শারীরিক ব্যাপারে সচেতন হলেই হবে না, তার মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতিও নজর দিতে হবে।
মা হতে পারে সন্তানের সবচেয়ে ভালো বন্ধু। ছোটবেলা থেকেই সন্তানের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করতে হবে। এতে সন্তান যেমন মানসিকভাবে ভালো থাকবে, তেমনই তাদের ভুল পথে যাওয়ার সম্ভাবনা কম থাকবে।
মা-বাবাকে ইতিবাচক হতে হবে। সামান্য কারণেই সন্তানের ওপর চড়াও হওয়া যাবে না। সন্তান ভুল করলে তাকে বুঝিয়ে বলতে হবে। সন্তানকে শাসন করতে হবে, কিন্তু তা যেন শারীরিক কিংবা মানসিক নির্যাতনের পর্যায়ে না যায়।
অনেক মা-বাবা অভিযোগ করেন, সন্তান তাদের কথা শোনে না। আসলে, মা-বাবাকে সন্তানরা যা যা করতে দেখে, তারা তা-ই করে। তারা শুনে শেখার চেয়ে দেখে শেখে বেশি। কেননা, শিশু মাত্রই অনুকরণপ্রিয়। তাই আগে মা-বাবাকে সুষ্ঠু আচরণ করতে হবে। তাহলে সন্তানও সুষ্ঠুভাবে গড়ে উঠবে।

প্যারেন্টিংয়ের বাধা
আমরা এমন সমাজে বাস করি, যেখানে সঠিক প্যারেন্টিং চর্চা করা এবং সন্তানকে সুষ্ঠুভাবে বড় করে তোলা খুব কঠিন। পরিবারের পরই শিশু সমাজ থেকে শিক্ষা পায়। সমাজের মানুষের আচরণের ভালো-মন্দ দ্বারাও সে প্রভাবিত হয়। তার চারপাশের মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে তারও দৃষ্টিভঙ্গি গঠিত হয়। সুতরাং, সমাজে একটি শিশুর সুষ্ঠুভাবে বেড়ে ওঠার উপাদানগুলো অবশ্যই বিদ্যমান থাকা উচিত। কিন্তু আমাদের সমাজ থেকে তা ক্রমেই বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। তাই মা-বাবা যদি সঠিক শিক্ষা দিয়েও থাকে, সবক্ষেত্রে তা কাজে লাগে না। এটা এ দেশের প্যারেন্টিংয়ের ক্ষেত্রে অনেক বড় বাধা।
এছাড়া পরিবারে যারা মুরুব্বি, যাদের সময়ে প্যারেন্টিং নিয়ে কোনো কথাই হতো না এ সমাজে, তাদের কাছে প্যারেন্টিং সচেতনতার বিষয়গুলো অপ্রয়োজনীয় এবং আদিখ্যেতা মনে হয়। তারা তাদের আগের স্টাইলেই বর্তমানের শিশুদের মানুষ করার পক্ষে। ফলে এখনকার মা-বাবারা সঠিক নিয়মকানুন মেনে শিশুকে বড় করে তুলতে চাইলে, মুরব্বিদের সঙ্গে মতবিরোধ ও মনোমালিন্য তৈরি হয়। এ প্রসঙ্গে নাদিয়া জান্নাত নামে একজন নবজাতক মা বলেন, ‘আমি আমার শিশুকে প্যাম্পার্স পরাতে চাইলে শাশুড়ি রেগে যেতেন। তিনি বলতেন, প্যাম্পার্স পরালে ঘা হবে, কিছুতেই পরানো যাবে না। ফলে আমার শিশুটি যখন বিছানায় প্রস্রাব করত, সবসময় তো সঙ্গেসঙ্গে টের পেতাম না, তখন ওই ভেজা কাঁথার ভেতরই সে শুয়ে থাকত। এতে তার আরও ক্ষতি হতো।’
এটা সাধারণ একটা উদাহরণ মাত্র। শিশু লালনপালনের ক্ষেত্রে এমন আরও অসংখ্য বিষয়ে মুরুব্বিদের সঙ্গে মতবিরোধ দেখা দেয় এবং বাধাটি খুবই প্রকট আমাদের পরিবারগুলোতে।
সঠিক প্যারেন্টিংয়ের অভাবে সন্তানদের যেসব ক্ষতি হতে পারে
সঠিক প্যারেন্টিংয়ের অভাবে সন্তানদের অনেক ধরনের ক্ষতি হতে পারে। তারা পরীক্ষায় খারাপ ফলাফল করতে পারে। মানুষকে সঠিক সম্মান দিতে কার্পণ্য করতে পারে। বিভিন্ন ধরনের নেশায় আসক্ত হতে পারে। এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে মারামারি, খুন এসব অরাজকতার সঙ্গেও জড়িয়ে পড়তে পারে। তাদের ভেতর দেখা দিতে পারে সচেতনতার অভাব। তারা অসৎ ও দুর্নীতিপরায়ণ হয়ে উঠতে পারে। তাদের ভেতর বিভিন্ন মানসিক সমস্যাও দেখা দিতে পারে।
সুখী-সমৃদ্ধ পরিবার, সুষ্ঠু সমাজ এবং রাষ্ট্র গঠনে প্যারেন্টিং শিক্ষার বিকল্প নেই। তাই অভিভাবকদের প্যারেন্টিং শিক্ষা খুব জরুরি।
Reporter Name 


















