ঢাকা ১০:৩৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৫ অগাস্ট ২০২৬, ১০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম

“একবার না পারিলে দেখ শতবার”- হযরত স্যারের শেখানোর মূলমন্ত্র

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১০:৩৭:১৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৫ অগাস্ট ২০২৬
  • ০ বার

Oplus_16908288

 “পারিব না এ কথাটি বলিও না আর, / একবার না পারিলে দেখ শতবার।”

রফিকুল ইসলামঃ  শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ায় বুদ্ধিমত্তার চেয়ে প্রচেষ্টাকে বেশি মূল্য দিতে কবি কালীপ্রসন্ন ঘোষের বিখ্যাত ‘প্রয়াস’ কবিতার পঙক্তিটি ছিল হযরত আলী স্যারের উপদেশের আপ্তবাক্য এবং শিখন-শেখানোর মূলমন্ত্র।

হযরত আলী স্যার কবিতার এ পঙক্তিটি মুখে মুখে বারবার আওড়ানোর মাধ্যমে শিশু শিক্ষার্থীদের অনুপ্রাণিত ও উৎসাহিত করে তুলতেন।

শিশু শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করতে কবিতাটির মূল শিক্ষা হিসেবে বলতেন— কঠিন পরিশ্রম, দৃঢ় বা অদম্য ইচ্ছা এবং বারবার চেষ্টা করলে যেকোনো কঠিন বা অসম্ভব কাজকেও সফল করা সম্ভব। বারবার ব্যর্থ হয়েও যে দমে যায় না, একসময় তার মধ্যে অপরাজেয় আত্মবিশ্বাস জন্মায়।

হযরত স্যার বলতেন, মানুষের জীবনে যেকোনো সফলতার মূল চাবিকাঠি হলো অধ্যবসায় এবং নিয়মিত চেষ্টা। কোনো কাজ প্রথমবার করতে গিয়ে ব্যর্থ হলে কখনোই আশা হারাতে নেই। প্রথমবারে কোনো কিছু না পারলে হতাশ হতে নেই। আর ব্যর্থতা মানেই শেষ নয়।

এছাড়া “একবার না পারিলে দেখ শতবার”—এই বিখ্যাত নীতিবাক্যটি শিশু শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ও মানসিকতা গঠনে অত্যন্ত ইতিবাচক এবং গভীর সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে উল্লেখ করে হযরত স্যার বলতেন, এটি শিশুদের মধ্যে লেগে থাকার মানসিকতা তৈরি করে। বারবার অনুশীলনের ফলে শিশুরা কাজের মাঝপথে সহজে মনোযোগ হারায় না। শিশুর মনোযোগ ও মেধা বিকাশে ম্যাজিকের মতো কাজ করে উক্তিটি।

হযরত স্যার ধৈর্যকে জয় করতে বলতেন। এবং আমাদেরকে বোঝাতেন, জীবনে প্রথমবারেই সবকিছুতে অনেকক্ষেত্রে সফল হওয়া যায় না। প্রতিটি ব্যর্থতা আসলে একটি নতুন শিক্ষা। ভুলগুলো থেকে শিখে আবার চেষ্টা করাই আসল বীরত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব।

তাছাড়া বারবার চেষ্টা করার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে ধৈর্য ও সহনশীলতা তৈরি হয়। বারবার ব্যর্থ হয়েও যে দমে যায় না, একসময় তার মধ্যে অপরাজেয় আত্মবিশ্বাস জন্মায়।

এক্ষেত্রে হযরত আলী স্যারকে দুটি উদাহরণ বরাবরই টানতে শুনেছি। ১. বিজ্ঞানী থমাস আলভা এডিসন বৈদ্যুতিক বাতি আবিষ্কারের আগে তিনি হাজারেরও বেশি বার ব্যর্থ হয়েছিলেন। তিনি দমে না গিয়ে বারবার চেষ্টা করেছিলেন বলেই পৃথিবী আলো পেয়েছে। এবং ২. রাজা রবার্ট ব্রুস মাকড়সার বারবার দেয়াল বেয়ে ওঠার চেষ্টা দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি সপ্তমবার যুদ্ধ করে নিজের রাজ্য উদ্ধার করেছিলেন।

মো. হযরত আলী স্যার ছিলেন কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলা গোপদিঘী ইউনিয়নে অবস্থিত ১নং বগাদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। সেই আশি দশকের কথা।

শৈশবের দিনগুলো ফিরে দেখলে যে-কজন শিক্ষকের মুখ মনের ক্যানভাসে ভেসে ওঠে, তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন হযরত আলী স্যার। তিনি শুধু একজন শিক্ষক ছিলেন না, ছিলেন এক শান্ত, স্নিগ্ধ ও বটবৃক্ষের মতো অভিভাবক।

আজও চোখ বুজলে বগাদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সেই চেনা মাঠ, টিনের চালের ক্লাসরুম আর বারান্দাটা দেখতে পাই। আর দেখতে পাই ধীরপায়ে বারান্দা পেরিয়ে ক্লাসের দিকে এগিয়ে আসছেন হযরত আলী স্যার। পরিপাটি পোশাক, চোখে চশমা আর মুখে সবসময় লেগে থাকা এক চিলতে অমায়িক হাসি—এই ছিল স্যারের চিরচেনা রূপ।

স্কুলের অন্য স্যারেরা যখন ক্লাসে ঢুকতেন, তখন শিক্ষার্থীদের মনে একটা মৃদু ভয় কাজ করত। কিন্তু হযরত আলী স্যার ক্লাসে ঢোকা মানেই ছিল এক পরম স্বস্তি। তাঁর হাঁটাচলা, কথা বলা, এমনকি বসার মধ্যেও এক ধরণের অদ্ভুত ধীরস্থির ভাব ছিল। চঞ্চল মনের আমরাও স্যারের সেই শান্ত উপস্থিতি দেখে কেমন যেন শান্ত হয়ে যেতাম।

প্রাইমারি স্কুলের ছোট ছোট অবুঝ বাচ্চাদের সামলানো এবং তাদের পড়া বোঝানো কতটা কঠিন কাজ, তা আজ বড়ো হয়ে অনুধাবন করতে পারি। বগাদিয়া স্কুলের শত শত কোলাহলপূর্ণ শিশুর মাঝে হজরত আলী স্যার ছিলেন এক টুকরো শান্তির নীড় ও ভরসাস্থল। আমরা অনেকেই ক্লাসে পড়া পারতাম না, গণিতের সহজ হিসাব বারবার ভুল করতাম। অন্য শিক্ষকেরা যেখানে বিরক্ত হতেন বা ধমক দিতেন, সেখানে হজরত আলী স্যার ছিলেন সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। তিনি ছিলেন রাগহীন এক অসাধারণ ব্যক্তিত্বসম্পন্ন শিক্ষা কারিগর।

হযরত স্যারের সেই উদার কণ্ঠ আর অভয় দেওয়ার মধ্যে এমন এক জাদু ছিল যে, আমাদের সব ভয় কর্পূরের মতো উড়ে যেত। ভয়ের পরিবেশ না রেখে তিনি ক্লাসে এমন এক আনন্দের আবহ তৈরি করতেন, যার ফলে সবচেয়ে পেছনের বেঞ্চের দুর্বল শিক্ষার্থীটিও সাহস করে হাত তুলে স্যারকে প্রশ্ন করতে পারত। অন্য স্যারেরা যেখানে রেগে যেতেন, স্যার সেখানে মায়াবী চোখে তাকাতেন। তাঁর সেই নরম সুরের যেকোনো কঠিন পড়াও সহজ মনে হতো।

মানুষের রাগ বা উত্তেজনা যে কতটা নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়, তা হযরত আলী স্যারকে না দেখলে কখনো বিশ্বাস করা যেত না। বগাদিয়া স্কুলের দিনগুলোতে আমি কখনো স্যারকে চড়া গলায় কথা বলতে বা কারও ওপর রাগ করতে দেখিনি। ক্লাসে আমরা যখন খুব বেশি দুষ্টুমি বা শোরগোল করতাম, স্যার কখনো ধমকি-ধামকি বা চিৎকারজুড়ে দিতেন না, কিংবা ডাস্টার দিয়ে টেবিলে জোরে বাড়িও মারতেন না। তিনি শুধু চুপচাপ চেয়ারে বসে আমাদের দিকে অপলক বা এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতেন।

তাঁর সেই শান্ত, গম্ভীর অথচ পরম স্নেহমাখানো চোখের মায়াবী চাহনি আমাদের মনের ভেতর এক অদ্ভুত অপরাধবোধ তৈরি করত। আমরা নিজেদের মাঝেই লজ্জাবোধ করতাম এবং পুরো ক্লাসরুম মুহূর্তের মধ্যে নিস্তব্ধ হয়ে যেত। ক্লাসের সবচেয়ে পেছনের বেঞ্চের দুর্বল শিক্ষার্থীটি-সহ সবার কাছেই স্যারের আচরণ ছিল সমান। কেউ কখনো তাঁর মুখ থেকে একটি কর্কশ বা উঁচু আওয়াজের কথা শোনেনি।

তিনি আমাদের শিখিয়েছিলেন যে, শাসন করার জন্য লাঠি বা কড়া কথার প্রয়োজন হয় না; ব্যক্তিত্ব এবং নরম স্বভাব, অথচ বিচক্ষণতা দিয়েই মানুষের মন জয় করা যায়। শাসন যে না-বকেও করা যায়, তা হজরত আলী স্যারের কাছ থেকেই শেখা।

হযরত আলী স্যার নরম স্বভাবের হলেও ছিলেন দূরদর্শী। আর বোঝানোর ক্ষমতা ছিল দারুণ। স্যার বলতেন, কোনো কঠিন কাজ দেখে শুরুতেই ভয় পেতে নেই।

“অন্যরা পারলে আমি কেন পারব না?”—এই আত্মবিশ্বাস সকল শিক্ষার্থীর মনের মধ্যে লালন করতে হবে বলে শিক্ষা দিতেন তিনি।

সেইসাথে শুধাইতেন, একবার বা দুবার নয়, প্রয়োজনে শতবার চেষ্টা করতে হবে। অলস ও উদ্যমহীন মানুষরাই একটুতেই হাল ছেড়ে দেয়, কিন্তু পরিশ্রমী মানুষ শেষ পর্যন্ত লড়ে যায়; সফলও হয়।

প্রকৃতপক্ষে যারা জীবনে বড়ো বা সফলকাম হয়েছেন, তাঁরা সবাই বারবার ব্যর্থ হয়েই আজকের অবস্থানে পৌঁছেছেন। তাঁদের জীবন থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে বলে আমার মতো সকল শিক্ষার্থীদেরকে উদ্দীপ্ত করে তুলতেন এবং সুন্দর আগামীর স্বপ্ন দেখাতেন।

আশির দশকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের শিখন-শেখানোর কৌশল বর্তমান যুগের মতো প্রযুক্তিগত বা শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক ছিল না। তখন মূলত শিক্ষক-কেন্দ্রিক ও ঐতিহ্যগত পদ্ধতিতে পাঠদান করা হতো।

শিখন-শেখানোর কৌশল ছিল শিক্ষক-কেন্দ্রিক ও বক্তৃতা পদ্ধতি। ক্লাসে শিক্ষকের ভূমিকাই ছিল প্রধান। তিনি বোর্ডে লিখে দিতেন এবং মুখে বলতেন, শিক্ষার্থীরা তা শুনত এবং কোনো বিষয়ে বুঝালে বোঝার চেষ্টা করত।

এর পাশাপাশি মুখস্থ ও পুনরাবৃত্তি কৌশল অবলম্বনের ক্ষেত্রে সমস্বরে বা সবাই একসাথে জোরে জোরে নামতা, বর্ণমালা বা কবিতা মুখস্থ করানো হতো। আর পুনরাবৃত্তির বেলায় প্রধান শিক্ষক নিজে একটি বাক্য বলতেন এবং শিক্ষার্থীরা সমস্বরে তা পুনরাবৃত্তি করত – এটি ‘ড্রিলিং’ পদ্ধতি নামে পরিচিত ছিল।

হযরত আলী স্যার ‘চেইন ড্রিল’ পদ্ধতিও প্রয়োগ করতেন। প্রাথমিক শিক্ষায় চেইন ড্রিল একটি অত্যন্ত কার্যকর ও জনপ্রিয় শিখন-শেখানো কৌশল। এটি মূলত একটি দলগত অনুশীলন পদ্ধতি, যা শিক্ষার্থীদের মধ্যে অংশগ্রহণ, মনোযোগ ও আত্মবিশ্বাস বাড়াতে সাহায্য করত।

এটি একটি শিখন-শেখানোর কৌশল, যেখানে একটি নির্দিষ্ট বিষয় শিক্ষার্থীরা একটি শৃঙ্খলের মতো একে একে বলতে থাকে। প্রথম শিক্ষার্থী একটি বাক্য বা শব্দ বলে, তার পরের শিক্ষার্থী সেটির পুনরাবৃত্তি বা উত্তর দেয় এবং নিজেও একটি নতুন অংশ যোগ করে এগিয়ে নিয়ে যায়। এভাবে ধারাবাহিকভাবে পুরো ক্লাসজুড়ে এটি চলতে থাকত।

তখন কোনো মাল্টিমিডিয়া বা ডিজিটাল স্ক্রিন ছিল না। ব্ল্যাকবোর্ডে চক দিয়ে হাতের সুন্দর লেখায় মূল বিষয়গুলো লিখে দেওয়া হতো। শিক্ষার্থীরা শিক্ষকের লিখে দেওয়া অংশ হুবহু খাতায় তুলে নিত।

প্রাইমারি স্কুলের প্রধান শিক্ষক হযরত আলী স্যারের ধীরস্থির, শান্ত ও নরম প্রকৃতির স্বভাবটি তাঁর ব্যক্তিত্ব, পেশাগত দক্ষতা এবং শিক্ষার্থীদের ওপর তাঁর ইতিবাচক প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুরা সাধারণত চঞ্চল ও অবুঝ হয়। হযরত আলী স্যার যেকোনো পরিস্থিতিতে উত্তেজিত না হয়ে পরম ধৈর্যের সাথে শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালনা করে পরিবেশ নিয়ন্ত্রণে রাখতেন। রাগ বা চেঁচামেচি না করে কেবল তাঁর শান্ত উপস্থিতি এবং মৃদু কণ্ঠস্বরের মাধ্যমেই ক্লাসের শৃঙ্খলা বজায় রাখতেন তিনি।

শিক্ষাদান পদ্ধতির ক্ষেত্রে হযরত আলী স্যারের উপস্থাপন ছিল সহজবোধ্য। ধীরস্থির স্বভাবের কারণে তিনি তাড়াহুড়ো না করে প্রতিটি বিষয় ভেঙে ভেঙে সহজ ভাষায় বুঝিয়ে বলতেন। এতে দুর্বল শিক্ষার্থীরাও পড়া সহজে বুঝতে পারত।

তাঁর নরম প্রকৃতির কারণে শিক্ষার্থীরা তাঁকে ভয় না পেয়ে বন্ধুর মতো ভাবত। ভীতিহীন এই শিক্ষার ফলে যেকোনো না-বোঝা প্রশ্ন তারা নির্দ্বিধায় করতে পারত।

হযরত আলী স্যার ছিলেন আদর্শ ও নৈতিকতার প্রতীক এবং অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব। একজন শিক্ষক হিসেবে তিনি নিজের আচরণের মাধ্যমেই শিক্ষার্থীদের ভদ্রতা ও নম্রতা শেখাতেন। শিশুরা তাত্ত্বিক কথার চেয়ে শিক্ষকের আচরণ দেখে বেশি অনুপ্রাণিত হতো।

এক্ষেত্রে কোনো শিশু শিক্ষার্থী ভুল করলে বা কোনো সমস্যায় পড়লে তিনি ধমক না দিয়ে স্নেহের সাথে বুঝিয়ে বলতেন। এতে শিক্ষার্থীদের মাঝে এক ধরনের মানসিক আশ্রয় ও নিরাপত্তার সৃষ্টি হতো।

হযরত আলী স্যারের শান্ত ও কোমল আচরণ কেবল শিক্ষার্থীদের নয়, অভিভাবকদের বুকেও এক ধরনের আস্থা তৈরি করত। সবাই জানত, হযরত আলী স্যারের কাছে সন্তানরা নিরাপদে আছে। এইভাবে আস্থা ও বিশ্বাসের জায়গায়টি তৈরি করে নিয়েছিলেন তিনি।

হযরত আলী স্যারের এই ধীরস্থির ও নরম স্বভাবটি কেবল তাঁর ব্যক্তিগত গুণ ছিল না, বরং এটি ছিল একজন সফল প্রাথমিক প্রধান শিক্ষক হিসেবে শিশুদের মন জয় করার এবং তাদের সঠিক উপায়ে গড়ে তোলার একটি মহৎ শিল্প।

শিখন-শেখানোর পুরো বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে নির্ধারিত পাঠ্যবইয়ের ভেতর সীমাবদ্ধ থাকত। ক্লাসের কোনো একজন শিক্ষার্থীকে দাঁড়িয়ে রিডিং পড়তে বলা হতো এবং হজরত আলী স্যার তা বুঝিয়ে দিতেন।

এছাড়া পড়ার পাশাপাশি সততা, ছোটদের স্নেহ করা, বড়দের সম্মান করা এবং ধর্মীয় মূল্যবোধের ওপর ব্যাপক জোর দিতেন তিনি।

আজ বগাদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে জীবনের অনেক পথ পাড়ি দিয়ে এসেছি। উচ্চশিক্ষার আঙিনায় অনেক বড়ো বড়ো ডিগ্রিধারী অধ্যাপক ও শিক্ষকের সান্নিধ্য পেয়েছি। কিন্তু হযরত আলী স্যারের সেই চিরশান্ত ও ধীরস্থির ব্যক্তিত্ব আমার মতো সকল শিক্ষার্থীর মনে যে গভীর প্রভাব ফেলেছে, তা অতুলনীয়।

তিনি আমাদের শুধু বইয়ের পাতায় থাকা অক্ষরজ্ঞানই দেননি, বরং নিজের যাপিত জীবন ও আচরণ দিয়ে শিখিয়েছেন কীভাবে চরম উত্তেজনার মুহূর্তেও নিজেকে শান্ত রাখতে হয়, কীভাবে মানুষের প্রতি বিনয়ী হতে হয়।

হযরত আলী স্যারের নম্রতা ও ভদ্রতা শুধু ক্লাসরুমের চার দেয়ালের মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিল না। অনেক সময় দেখা যেত এলাকার সাধারণ কৃষিজীবী অভিভাবকেরা তাঁদের সন্তানদের খোঁজ নিতে স্কুলে আসতেন। স্যার তাঁদেরকে অত্যন্ত সম্মানের সাথে বসাতেন এবং ধীরস্থিরভাবে তাঁদের কথা শুনতেন।

মো. হযরত আলী স্যার ১৯৪৬ সালের ১লা ডিসেম্বর পাশ্ববর্তী ধলাই গ্রামে পিতা আবদুস সাত্তারের ঔরশে ও মাতা বেগমের গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন। শিক্ষাগ্রহণ শেষে ১৯৬৬ সালের জানুয়ারিতে অষ্টগ্রাম উপজেলা ভাতশালা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগদানের মধ্য দিয়ে গৌরবময় শিক্ষকতা জীবনের সূচনা হয়। পরবর্তীকালে ১৯৭৬ সালে প্রধান শিক্ষক হিসেবে পদোন্নতিতে শ্যামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পদায়ন হয়।

হযরত আলী স্যার ১৯৯৪ সালে ফের শ্যামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যোগদান করে শিক্ষকতা জীবনের একটি দীর্ঘ সময় ছাত্রছাত্রীদের মানুষ করার পেছনে উৎসর্গ করে ২০০০ সালের ৩১শে ডিসেম্বর শ্যামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে আনুষ্ঠানিক অবসর গ্রহণ করেন।

তিনি এরপর থেকে অত্যন্ত নিষ্ঠা, দক্ষতা ও সুনামের সাথে মিঠামইন উপজেলার মুশুরিয়া কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের পেশ ইমাম ও খতিবের দায়িত্ব পালন করে আসছেন। বর্তমানে তাঁর বয়স ৮০ বছর।

হযরত আলী স্যারের মতো শিক্ষকেরা কখনো হারিয়ে যান না। তাঁরা বেঁচে থাকেন তাঁদের হাজারো শিক্ষার্থীর সাফল্যে, সমাজের প্রতিটি ভালো কাজের মাঝে। সরকারি চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন সত্য, কিন্তু মানুষের মন থেকে আদর্শের কখনো অবসর হতে পারে না। আমাদের মনের মণিকোঠায় চিরকাল এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে থাকবেন তিনি।

তাঁর এই মহান ত্যাগকে স্মরণ করছি শ্রদ্ধাভরে – “শান্ত স্বভাব, বিচক্ষণ মন, ছিলে তুমি এক অনন্য প্রাণ, / হযরত স্যার, তোমার সুখ্যাতি গাইবে সদা এই অঙ্গন। / ধীরস্থির পদক্ষেপে তুমি আলো ছড়ালে সবার মনে, / তোমার আদর্শ রবে চিরকাল মোদের স্মরণে।

অবসরের এই দিনগুলো কাটুক সুখে তোমার, / দীর্ঘ নেক হায়াতে সুস্থ থাকো—এই প্রার্থনা মোদের। / ঋণ তো কভু শোধ হবে না, কৃতজ্ঞতায় নমি, / সকলের হৃদয়ের মাঝে অমর থাকবে তুমি।”

লেখক: রফিকুল ইসলাম, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও কলামিস্ট

সহযোগী সম্পাদক, আজকের সূর্যোদয়।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

“একবার না পারিলে দেখ শতবার”- হযরত স্যারের শেখানোর মূলমন্ত্র

“একবার না পারিলে দেখ শতবার”- হযরত স্যারের শেখানোর মূলমন্ত্র

আপডেট টাইম : ১০:৩৭:১৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৫ অগাস্ট ২০২৬

 “পারিব না এ কথাটি বলিও না আর, / একবার না পারিলে দেখ শতবার।”

রফিকুল ইসলামঃ  শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ায় বুদ্ধিমত্তার চেয়ে প্রচেষ্টাকে বেশি মূল্য দিতে কবি কালীপ্রসন্ন ঘোষের বিখ্যাত ‘প্রয়াস’ কবিতার পঙক্তিটি ছিল হযরত আলী স্যারের উপদেশের আপ্তবাক্য এবং শিখন-শেখানোর মূলমন্ত্র।

হযরত আলী স্যার কবিতার এ পঙক্তিটি মুখে মুখে বারবার আওড়ানোর মাধ্যমে শিশু শিক্ষার্থীদের অনুপ্রাণিত ও উৎসাহিত করে তুলতেন।

শিশু শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করতে কবিতাটির মূল শিক্ষা হিসেবে বলতেন— কঠিন পরিশ্রম, দৃঢ় বা অদম্য ইচ্ছা এবং বারবার চেষ্টা করলে যেকোনো কঠিন বা অসম্ভব কাজকেও সফল করা সম্ভব। বারবার ব্যর্থ হয়েও যে দমে যায় না, একসময় তার মধ্যে অপরাজেয় আত্মবিশ্বাস জন্মায়।

হযরত স্যার বলতেন, মানুষের জীবনে যেকোনো সফলতার মূল চাবিকাঠি হলো অধ্যবসায় এবং নিয়মিত চেষ্টা। কোনো কাজ প্রথমবার করতে গিয়ে ব্যর্থ হলে কখনোই আশা হারাতে নেই। প্রথমবারে কোনো কিছু না পারলে হতাশ হতে নেই। আর ব্যর্থতা মানেই শেষ নয়।

এছাড়া “একবার না পারিলে দেখ শতবার”—এই বিখ্যাত নীতিবাক্যটি শিশু শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ও মানসিকতা গঠনে অত্যন্ত ইতিবাচক এবং গভীর সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে উল্লেখ করে হযরত স্যার বলতেন, এটি শিশুদের মধ্যে লেগে থাকার মানসিকতা তৈরি করে। বারবার অনুশীলনের ফলে শিশুরা কাজের মাঝপথে সহজে মনোযোগ হারায় না। শিশুর মনোযোগ ও মেধা বিকাশে ম্যাজিকের মতো কাজ করে উক্তিটি।

হযরত স্যার ধৈর্যকে জয় করতে বলতেন। এবং আমাদেরকে বোঝাতেন, জীবনে প্রথমবারেই সবকিছুতে অনেকক্ষেত্রে সফল হওয়া যায় না। প্রতিটি ব্যর্থতা আসলে একটি নতুন শিক্ষা। ভুলগুলো থেকে শিখে আবার চেষ্টা করাই আসল বীরত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব।

তাছাড়া বারবার চেষ্টা করার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে ধৈর্য ও সহনশীলতা তৈরি হয়। বারবার ব্যর্থ হয়েও যে দমে যায় না, একসময় তার মধ্যে অপরাজেয় আত্মবিশ্বাস জন্মায়।

এক্ষেত্রে হযরত আলী স্যারকে দুটি উদাহরণ বরাবরই টানতে শুনেছি। ১. বিজ্ঞানী থমাস আলভা এডিসন বৈদ্যুতিক বাতি আবিষ্কারের আগে তিনি হাজারেরও বেশি বার ব্যর্থ হয়েছিলেন। তিনি দমে না গিয়ে বারবার চেষ্টা করেছিলেন বলেই পৃথিবী আলো পেয়েছে। এবং ২. রাজা রবার্ট ব্রুস মাকড়সার বারবার দেয়াল বেয়ে ওঠার চেষ্টা দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি সপ্তমবার যুদ্ধ করে নিজের রাজ্য উদ্ধার করেছিলেন।

মো. হযরত আলী স্যার ছিলেন কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলা গোপদিঘী ইউনিয়নে অবস্থিত ১নং বগাদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। সেই আশি দশকের কথা।

শৈশবের দিনগুলো ফিরে দেখলে যে-কজন শিক্ষকের মুখ মনের ক্যানভাসে ভেসে ওঠে, তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন হযরত আলী স্যার। তিনি শুধু একজন শিক্ষক ছিলেন না, ছিলেন এক শান্ত, স্নিগ্ধ ও বটবৃক্ষের মতো অভিভাবক।

আজও চোখ বুজলে বগাদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সেই চেনা মাঠ, টিনের চালের ক্লাসরুম আর বারান্দাটা দেখতে পাই। আর দেখতে পাই ধীরপায়ে বারান্দা পেরিয়ে ক্লাসের দিকে এগিয়ে আসছেন হযরত আলী স্যার। পরিপাটি পোশাক, চোখে চশমা আর মুখে সবসময় লেগে থাকা এক চিলতে অমায়িক হাসি—এই ছিল স্যারের চিরচেনা রূপ।

স্কুলের অন্য স্যারেরা যখন ক্লাসে ঢুকতেন, তখন শিক্ষার্থীদের মনে একটা মৃদু ভয় কাজ করত। কিন্তু হযরত আলী স্যার ক্লাসে ঢোকা মানেই ছিল এক পরম স্বস্তি। তাঁর হাঁটাচলা, কথা বলা, এমনকি বসার মধ্যেও এক ধরণের অদ্ভুত ধীরস্থির ভাব ছিল। চঞ্চল মনের আমরাও স্যারের সেই শান্ত উপস্থিতি দেখে কেমন যেন শান্ত হয়ে যেতাম।

প্রাইমারি স্কুলের ছোট ছোট অবুঝ বাচ্চাদের সামলানো এবং তাদের পড়া বোঝানো কতটা কঠিন কাজ, তা আজ বড়ো হয়ে অনুধাবন করতে পারি। বগাদিয়া স্কুলের শত শত কোলাহলপূর্ণ শিশুর মাঝে হজরত আলী স্যার ছিলেন এক টুকরো শান্তির নীড় ও ভরসাস্থল। আমরা অনেকেই ক্লাসে পড়া পারতাম না, গণিতের সহজ হিসাব বারবার ভুল করতাম। অন্য শিক্ষকেরা যেখানে বিরক্ত হতেন বা ধমক দিতেন, সেখানে হজরত আলী স্যার ছিলেন সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। তিনি ছিলেন রাগহীন এক অসাধারণ ব্যক্তিত্বসম্পন্ন শিক্ষা কারিগর।

হযরত স্যারের সেই উদার কণ্ঠ আর অভয় দেওয়ার মধ্যে এমন এক জাদু ছিল যে, আমাদের সব ভয় কর্পূরের মতো উড়ে যেত। ভয়ের পরিবেশ না রেখে তিনি ক্লাসে এমন এক আনন্দের আবহ তৈরি করতেন, যার ফলে সবচেয়ে পেছনের বেঞ্চের দুর্বল শিক্ষার্থীটিও সাহস করে হাত তুলে স্যারকে প্রশ্ন করতে পারত। অন্য স্যারেরা যেখানে রেগে যেতেন, স্যার সেখানে মায়াবী চোখে তাকাতেন। তাঁর সেই নরম সুরের যেকোনো কঠিন পড়াও সহজ মনে হতো।

মানুষের রাগ বা উত্তেজনা যে কতটা নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়, তা হযরত আলী স্যারকে না দেখলে কখনো বিশ্বাস করা যেত না। বগাদিয়া স্কুলের দিনগুলোতে আমি কখনো স্যারকে চড়া গলায় কথা বলতে বা কারও ওপর রাগ করতে দেখিনি। ক্লাসে আমরা যখন খুব বেশি দুষ্টুমি বা শোরগোল করতাম, স্যার কখনো ধমকি-ধামকি বা চিৎকারজুড়ে দিতেন না, কিংবা ডাস্টার দিয়ে টেবিলে জোরে বাড়িও মারতেন না। তিনি শুধু চুপচাপ চেয়ারে বসে আমাদের দিকে অপলক বা এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতেন।

তাঁর সেই শান্ত, গম্ভীর অথচ পরম স্নেহমাখানো চোখের মায়াবী চাহনি আমাদের মনের ভেতর এক অদ্ভুত অপরাধবোধ তৈরি করত। আমরা নিজেদের মাঝেই লজ্জাবোধ করতাম এবং পুরো ক্লাসরুম মুহূর্তের মধ্যে নিস্তব্ধ হয়ে যেত। ক্লাসের সবচেয়ে পেছনের বেঞ্চের দুর্বল শিক্ষার্থীটি-সহ সবার কাছেই স্যারের আচরণ ছিল সমান। কেউ কখনো তাঁর মুখ থেকে একটি কর্কশ বা উঁচু আওয়াজের কথা শোনেনি।

তিনি আমাদের শিখিয়েছিলেন যে, শাসন করার জন্য লাঠি বা কড়া কথার প্রয়োজন হয় না; ব্যক্তিত্ব এবং নরম স্বভাব, অথচ বিচক্ষণতা দিয়েই মানুষের মন জয় করা যায়। শাসন যে না-বকেও করা যায়, তা হজরত আলী স্যারের কাছ থেকেই শেখা।

হযরত আলী স্যার নরম স্বভাবের হলেও ছিলেন দূরদর্শী। আর বোঝানোর ক্ষমতা ছিল দারুণ। স্যার বলতেন, কোনো কঠিন কাজ দেখে শুরুতেই ভয় পেতে নেই।

“অন্যরা পারলে আমি কেন পারব না?”—এই আত্মবিশ্বাস সকল শিক্ষার্থীর মনের মধ্যে লালন করতে হবে বলে শিক্ষা দিতেন তিনি।

সেইসাথে শুধাইতেন, একবার বা দুবার নয়, প্রয়োজনে শতবার চেষ্টা করতে হবে। অলস ও উদ্যমহীন মানুষরাই একটুতেই হাল ছেড়ে দেয়, কিন্তু পরিশ্রমী মানুষ শেষ পর্যন্ত লড়ে যায়; সফলও হয়।

প্রকৃতপক্ষে যারা জীবনে বড়ো বা সফলকাম হয়েছেন, তাঁরা সবাই বারবার ব্যর্থ হয়েই আজকের অবস্থানে পৌঁছেছেন। তাঁদের জীবন থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে বলে আমার মতো সকল শিক্ষার্থীদেরকে উদ্দীপ্ত করে তুলতেন এবং সুন্দর আগামীর স্বপ্ন দেখাতেন।

আশির দশকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের শিখন-শেখানোর কৌশল বর্তমান যুগের মতো প্রযুক্তিগত বা শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক ছিল না। তখন মূলত শিক্ষক-কেন্দ্রিক ও ঐতিহ্যগত পদ্ধতিতে পাঠদান করা হতো।

শিখন-শেখানোর কৌশল ছিল শিক্ষক-কেন্দ্রিক ও বক্তৃতা পদ্ধতি। ক্লাসে শিক্ষকের ভূমিকাই ছিল প্রধান। তিনি বোর্ডে লিখে দিতেন এবং মুখে বলতেন, শিক্ষার্থীরা তা শুনত এবং কোনো বিষয়ে বুঝালে বোঝার চেষ্টা করত।

এর পাশাপাশি মুখস্থ ও পুনরাবৃত্তি কৌশল অবলম্বনের ক্ষেত্রে সমস্বরে বা সবাই একসাথে জোরে জোরে নামতা, বর্ণমালা বা কবিতা মুখস্থ করানো হতো। আর পুনরাবৃত্তির বেলায় প্রধান শিক্ষক নিজে একটি বাক্য বলতেন এবং শিক্ষার্থীরা সমস্বরে তা পুনরাবৃত্তি করত – এটি ‘ড্রিলিং’ পদ্ধতি নামে পরিচিত ছিল।

হযরত আলী স্যার ‘চেইন ড্রিল’ পদ্ধতিও প্রয়োগ করতেন। প্রাথমিক শিক্ষায় চেইন ড্রিল একটি অত্যন্ত কার্যকর ও জনপ্রিয় শিখন-শেখানো কৌশল। এটি মূলত একটি দলগত অনুশীলন পদ্ধতি, যা শিক্ষার্থীদের মধ্যে অংশগ্রহণ, মনোযোগ ও আত্মবিশ্বাস বাড়াতে সাহায্য করত।

এটি একটি শিখন-শেখানোর কৌশল, যেখানে একটি নির্দিষ্ট বিষয় শিক্ষার্থীরা একটি শৃঙ্খলের মতো একে একে বলতে থাকে। প্রথম শিক্ষার্থী একটি বাক্য বা শব্দ বলে, তার পরের শিক্ষার্থী সেটির পুনরাবৃত্তি বা উত্তর দেয় এবং নিজেও একটি নতুন অংশ যোগ করে এগিয়ে নিয়ে যায়। এভাবে ধারাবাহিকভাবে পুরো ক্লাসজুড়ে এটি চলতে থাকত।

তখন কোনো মাল্টিমিডিয়া বা ডিজিটাল স্ক্রিন ছিল না। ব্ল্যাকবোর্ডে চক দিয়ে হাতের সুন্দর লেখায় মূল বিষয়গুলো লিখে দেওয়া হতো। শিক্ষার্থীরা শিক্ষকের লিখে দেওয়া অংশ হুবহু খাতায় তুলে নিত।

প্রাইমারি স্কুলের প্রধান শিক্ষক হযরত আলী স্যারের ধীরস্থির, শান্ত ও নরম প্রকৃতির স্বভাবটি তাঁর ব্যক্তিত্ব, পেশাগত দক্ষতা এবং শিক্ষার্থীদের ওপর তাঁর ইতিবাচক প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুরা সাধারণত চঞ্চল ও অবুঝ হয়। হযরত আলী স্যার যেকোনো পরিস্থিতিতে উত্তেজিত না হয়ে পরম ধৈর্যের সাথে শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালনা করে পরিবেশ নিয়ন্ত্রণে রাখতেন। রাগ বা চেঁচামেচি না করে কেবল তাঁর শান্ত উপস্থিতি এবং মৃদু কণ্ঠস্বরের মাধ্যমেই ক্লাসের শৃঙ্খলা বজায় রাখতেন তিনি।

শিক্ষাদান পদ্ধতির ক্ষেত্রে হযরত আলী স্যারের উপস্থাপন ছিল সহজবোধ্য। ধীরস্থির স্বভাবের কারণে তিনি তাড়াহুড়ো না করে প্রতিটি বিষয় ভেঙে ভেঙে সহজ ভাষায় বুঝিয়ে বলতেন। এতে দুর্বল শিক্ষার্থীরাও পড়া সহজে বুঝতে পারত।

তাঁর নরম প্রকৃতির কারণে শিক্ষার্থীরা তাঁকে ভয় না পেয়ে বন্ধুর মতো ভাবত। ভীতিহীন এই শিক্ষার ফলে যেকোনো না-বোঝা প্রশ্ন তারা নির্দ্বিধায় করতে পারত।

হযরত আলী স্যার ছিলেন আদর্শ ও নৈতিকতার প্রতীক এবং অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব। একজন শিক্ষক হিসেবে তিনি নিজের আচরণের মাধ্যমেই শিক্ষার্থীদের ভদ্রতা ও নম্রতা শেখাতেন। শিশুরা তাত্ত্বিক কথার চেয়ে শিক্ষকের আচরণ দেখে বেশি অনুপ্রাণিত হতো।

এক্ষেত্রে কোনো শিশু শিক্ষার্থী ভুল করলে বা কোনো সমস্যায় পড়লে তিনি ধমক না দিয়ে স্নেহের সাথে বুঝিয়ে বলতেন। এতে শিক্ষার্থীদের মাঝে এক ধরনের মানসিক আশ্রয় ও নিরাপত্তার সৃষ্টি হতো।

হযরত আলী স্যারের শান্ত ও কোমল আচরণ কেবল শিক্ষার্থীদের নয়, অভিভাবকদের বুকেও এক ধরনের আস্থা তৈরি করত। সবাই জানত, হযরত আলী স্যারের কাছে সন্তানরা নিরাপদে আছে। এইভাবে আস্থা ও বিশ্বাসের জায়গায়টি তৈরি করে নিয়েছিলেন তিনি।

হযরত আলী স্যারের এই ধীরস্থির ও নরম স্বভাবটি কেবল তাঁর ব্যক্তিগত গুণ ছিল না, বরং এটি ছিল একজন সফল প্রাথমিক প্রধান শিক্ষক হিসেবে শিশুদের মন জয় করার এবং তাদের সঠিক উপায়ে গড়ে তোলার একটি মহৎ শিল্প।

শিখন-শেখানোর পুরো বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে নির্ধারিত পাঠ্যবইয়ের ভেতর সীমাবদ্ধ থাকত। ক্লাসের কোনো একজন শিক্ষার্থীকে দাঁড়িয়ে রিডিং পড়তে বলা হতো এবং হজরত আলী স্যার তা বুঝিয়ে দিতেন।

এছাড়া পড়ার পাশাপাশি সততা, ছোটদের স্নেহ করা, বড়দের সম্মান করা এবং ধর্মীয় মূল্যবোধের ওপর ব্যাপক জোর দিতেন তিনি।

আজ বগাদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে জীবনের অনেক পথ পাড়ি দিয়ে এসেছি। উচ্চশিক্ষার আঙিনায় অনেক বড়ো বড়ো ডিগ্রিধারী অধ্যাপক ও শিক্ষকের সান্নিধ্য পেয়েছি। কিন্তু হযরত আলী স্যারের সেই চিরশান্ত ও ধীরস্থির ব্যক্তিত্ব আমার মতো সকল শিক্ষার্থীর মনে যে গভীর প্রভাব ফেলেছে, তা অতুলনীয়।

তিনি আমাদের শুধু বইয়ের পাতায় থাকা অক্ষরজ্ঞানই দেননি, বরং নিজের যাপিত জীবন ও আচরণ দিয়ে শিখিয়েছেন কীভাবে চরম উত্তেজনার মুহূর্তেও নিজেকে শান্ত রাখতে হয়, কীভাবে মানুষের প্রতি বিনয়ী হতে হয়।

হযরত আলী স্যারের নম্রতা ও ভদ্রতা শুধু ক্লাসরুমের চার দেয়ালের মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিল না। অনেক সময় দেখা যেত এলাকার সাধারণ কৃষিজীবী অভিভাবকেরা তাঁদের সন্তানদের খোঁজ নিতে স্কুলে আসতেন। স্যার তাঁদেরকে অত্যন্ত সম্মানের সাথে বসাতেন এবং ধীরস্থিরভাবে তাঁদের কথা শুনতেন।

মো. হযরত আলী স্যার ১৯৪৬ সালের ১লা ডিসেম্বর পাশ্ববর্তী ধলাই গ্রামে পিতা আবদুস সাত্তারের ঔরশে ও মাতা বেগমের গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন। শিক্ষাগ্রহণ শেষে ১৯৬৬ সালের জানুয়ারিতে অষ্টগ্রাম উপজেলা ভাতশালা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগদানের মধ্য দিয়ে গৌরবময় শিক্ষকতা জীবনের সূচনা হয়। পরবর্তীকালে ১৯৭৬ সালে প্রধান শিক্ষক হিসেবে পদোন্নতিতে শ্যামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পদায়ন হয়।

হযরত আলী স্যার ১৯৯৪ সালে ফের শ্যামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যোগদান করে শিক্ষকতা জীবনের একটি দীর্ঘ সময় ছাত্রছাত্রীদের মানুষ করার পেছনে উৎসর্গ করে ২০০০ সালের ৩১শে ডিসেম্বর শ্যামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে আনুষ্ঠানিক অবসর গ্রহণ করেন।

তিনি এরপর থেকে অত্যন্ত নিষ্ঠা, দক্ষতা ও সুনামের সাথে মিঠামইন উপজেলার মুশুরিয়া কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের পেশ ইমাম ও খতিবের দায়িত্ব পালন করে আসছেন। বর্তমানে তাঁর বয়স ৮০ বছর।

হযরত আলী স্যারের মতো শিক্ষকেরা কখনো হারিয়ে যান না। তাঁরা বেঁচে থাকেন তাঁদের হাজারো শিক্ষার্থীর সাফল্যে, সমাজের প্রতিটি ভালো কাজের মাঝে। সরকারি চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন সত্য, কিন্তু মানুষের মন থেকে আদর্শের কখনো অবসর হতে পারে না। আমাদের মনের মণিকোঠায় চিরকাল এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে থাকবেন তিনি।

তাঁর এই মহান ত্যাগকে স্মরণ করছি শ্রদ্ধাভরে – “শান্ত স্বভাব, বিচক্ষণ মন, ছিলে তুমি এক অনন্য প্রাণ, / হযরত স্যার, তোমার সুখ্যাতি গাইবে সদা এই অঙ্গন। / ধীরস্থির পদক্ষেপে তুমি আলো ছড়ালে সবার মনে, / তোমার আদর্শ রবে চিরকাল মোদের স্মরণে।

অবসরের এই দিনগুলো কাটুক সুখে তোমার, / দীর্ঘ নেক হায়াতে সুস্থ থাকো—এই প্রার্থনা মোদের। / ঋণ তো কভু শোধ হবে না, কৃতজ্ঞতায় নমি, / সকলের হৃদয়ের মাঝে অমর থাকবে তুমি।”

লেখক: রফিকুল ইসলাম, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও কলামিস্ট

সহযোগী সম্পাদক, আজকের সূর্যোদয়।