ঢাকা ০৯:৫৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ২০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
বিশ্ব শিক্ষক দিবসে হাসিম, হযরত ও হাবিল স্যারের স্মরণে নিবেদিত ছাদে সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা সুদ-ঘুসের টাকায় বাড়ি-গাড়ি, তওবায় ক্ষমা হবে কি শাহজালালে জমজমের পানি নিয়ে তুলকালাম, নেপথ্যে কী বিশ্ব শিক্ষক দিবস : ১০০ গুণী শিক্ষককে সম্মাননা দিচ্ছে সরকার বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে বাণিজ্য সম্পর্ক বাড়ানোর উদ্যোগ আখতারুজ্জামানের জামিন শুনানিতে এজলাসে হট্টগোল, বাইরে আইনজীবীদের হাতাহাতি ভারতে মুসলিম যুবক হত্যা ও বাংলাদেশ মিশন ঘেরাওয়ের নিন্দা নেজামে ইসলাম পার্টির এক বছরের মধ্যে দেশের পুঁজিবাজারের চেহারা বদলে যাবে : অর্থমন্ত্রী প্রতিটি সিটি করপোরেশন ও জেলায় মাস্টারপ্ল্যান করছে সরকার : প্রধানমন্ত্রী

বিশ্ব শিক্ষক দিবসে হাসিম, হযরত ও হাবিল স্যারের স্মরণে নিবেদিত

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ০৯:১৩:৫৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬
  • ১০ বার

রফিকুল ইসলামঃ “মানুষের মতো মানুষ গড়ার কারিগর যাঁরা, / ভবের মাঝে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক মোরা বলি তাঁরা। / অন্ধকার বিনাশী আলোর মশাল জ্বেলে বুকে, / পথ দেখান যিনি, তিনিই তো অমর এ মরণলোকে।”

আজ ৫ অক্টোবর, বিশ্ব শিক্ষক দিবস। সারা বিশ্বের কোটি কোটি শিক্ষার্থীর মতো আমার হৃদয়ের ক্যানভাসেও আজ স্মৃতির আয়নায় ভেসে উঠছে কিছু চিরচেনা মুখ। প্রযুক্তির এই কৃত্রিম যুগে দাঁড়িয়ে যখন পেছনের দিনগুলোর দিকে তাকাই, তখন ধুলোবালি মাখা শৈশবের সেই সোনালী দিনগুলো আমার চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে ওঠে।

বিশেষ করে আমার জীবনের ভিত্তিমূল গড়ে দেওয়া সেই বিদ্যাপীঠ – কিশোরগঞ্জ জেলার মিঠামইন উপজেলার বগাদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং সেই স্কুলের পরম শ্রদ্ধেয় তিন নক্ষত্রতুল্য শিক্ষক মো. আবুল হাসিম, মো. হযরত আলী ও মো. আনোয়ারুল হক হাবিল স্যার।

আজ তাঁদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা নিবেদনের দিন।

আমার শিক্ষার আঁতুড়ঘর হাওরপাড়ের বগাদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলা মানেই এক বিশাল জলরাশি, থৈ থৈ জল, ঢেউ আর বর্ষায় দিগন্তজোড়া মুক্ত আকাশ। এই হাওরাঞ্চলের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা বগাদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি শুধু একটি বিদ্যাপীঠই ছিল না; এটি ছিল আমাদের মতো শত শত গ্রামীণ শিশুর স্বপ্ন দেখার এবং সেই স্বপ্নকে ডানা মেলার আঁতুড়ঘর।

তখনকার দিনে গ্রামীণ ও হাওর এলাকায় শিক্ষা বিস্তারের পথটা আজকের মতো মসৃণ ছিল না। ভাঙা রাস্তা, বর্ষার কাদা-জল আর নানাবিধ প্রতিকূলতার মাঝেও যে শিক্ষকরা আমাদের হাত ধরে অক্ষরের আলো চিনিয়েছিলেন, তাঁরা কোনো সাধারণ মানুষ ছিলেন না; তাঁরা ছিলেন একেকজন আলোকবর্তিকা।

১. মো. আবুল হাসিম স্যার: নিয়মানুবর্তিতা ও “কষ্ট করলে কেষ্ট মেলে”

আমার স্মৃতির পাতায় যে নামটি সবচেয়ে প্রগাঢ়ভাবে খোদাই করা আছে, তিনি হলেন আমাদের শ্রদ্ধেয় মো. আবুল হাসিম স্যার। স্যার যখন ক্লাসে আসতেন, তখন এক অদ্ভুত গম্ভীর কিন্তু শান্ত পরিবেশ তৈরি হতো। আবুল হাসিম স্যারের পড়ানোর ধরণ ছিল চমৎকার। কঠিন কোনো ব্যাকরণ বা গণিতের জটিল সূত্রকে তিনি গল্পে গল্পে এত সহজ করে বুঝিয়ে দিতেন যে, তা সরাসরি আমাদের কচি মনে গেঁথে যেত।

তিনি কেবল বইয়ের পাতার পড়া মুখস্থ করাতেন না। তিনি আমাদের শিখিয়েছিলেন কীভাবে সোজা হয়ে দাঁড়াতে হয়, কীভাবে বড়দের সম্মান করতে হয়।

যখনই আমরা কোনো কঠিন অঙ্ক মেলাতে না পেরে হাল ছেড়ে দিতাম, কিংবা পড়া মনে রাখতে না পেরে হতাশ হতাম, স্যার তখন পরম স্নেহমাখা কণ্ঠে বলতেন – “কষ্ট করলে কেষ্ট মেলে।”

তাঁর মুখের এই একটি বাণী আমাদের অলসতা দূর করে কঠোর পরিশ্রমী হতে শিখিয়েছিল। আজ জীবনের প্রতিটি কঠিন পরীক্ষায় যখনই হোঁচট খাই, স্যারের সেই “কেষ্ট মেলার” অমোঘ বাণী আমাকে নতুন করে লড়াই করার শক্তি জোগায়।

২. মো. হযরত আলী স্যার: পরম ধৈর্য এবং “একবার না পারিলে দেখ শতবার”

বিশ্ব শিক্ষক দিবসের এই শুভক্ষণে যার অবয়বটি হৃদয়ে আলোড়ন তুলছে, তিনি হলেন আমাদের প্রিয় মো. হযরত আলী স্যার। তিনি ছিলেন এমন একজন শিক্ষক, যাঁর কাছে শিক্ষার্থীরা নির্দ্বিধায় নিজেদের সব সমস্যার কথা বলতে পারত।

সহজাত সরলতা ছাড়া হযরত আলী স্যারের মধ্যে কোনো কৃত্রিমতা ছিল না। তাঁর অমায়িক হাসি এবং মিষ্টি কথা যেকোনো ভয় শিশুর মনকে নিমিষেই শান্ত করে দিত।

ধৈর্যের প্রতিমূর্তি তিনি। ক্লাসের সবচেয়ে পেছনের বেঞ্চে বসা অমনোযোগী শিক্ষার্থীটিকেও তিনি পরম মমতায় টেনে নিতেন। একবার না বুঝলে দশবার বুঝিয়ে দেওয়ার মতো যে অসীম ধৈর্য তাঁর ছিল, তা আজকের দিনে বিরল।

পড়া বলতে গিয়ে কোনো সহপাঠী যখন তোতলাত বা ভুলে যেত, স্যার তখন রাগ না করে মিষ্টি হেসে বলতেন – “একবার না পারিলে দেখ শতবার।”

কবির এই পঙক্তিটি স্যারের মুখে যেন এক জাদুমন্ত্রের মতো শোনাত। তিনি আমাদের মনে গেঁথে দিয়েছিলেন যে, চেষ্টা কখনো বৃথা যায় না। বারবার চেষ্টা করার এই মানসিকতাই আজ আমাদের জীবনের নানা প্রতিকূলতা জয় করতে শেখাচ্ছে।

৩. মো. আনোয়ারুল হক স্যার: দূরদর্শিতা ও “লেখাপড়া করে যেই গাড়িঘোড়া চড়ে সেই”

আমাদের প্রাইমারি জীবনের আরেকজন দিকপাল ছিলেন শ্রদ্ধেয় মো. আনোয়ারুল হক স্যার। তিনি ছিলেন জ্ঞানের এক জীবন্ত এনসাইক্লোপিডিয়া।

কৌতূহল জাগানিয় শিক্ষক। আনোয়ারুল হক স্যার যখন আমাদের ভূগোল বা বিজ্ঞান পড়াতেন, তখন মনে হতো আমরা যেন সত্যিই মহাকাশে বা কোনো অচেনা দ্বীপে ঘুরে বেড়াচ্ছি। তিনি আমাদের ভেতরে জানার এক তীব্র কৌতূহল ও ক্ষুধা তৈরি করে দিতেন।

তাঁর সাংস্কৃতিক চেতনা থেকে পড়াশোনার পাশাপাশি বিদ্যালয়ের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, খেলাধুলা ও বিতর্ক প্রতিযোগিতায় তিনি আমাদের উৎসাহিত করতেন। তাঁর হাত ধরেই আমরা প্রথম আবৃত্তি ও বক্তৃতার মঞ্চে উঠতে শিখেছিলাম।

হাওরের অতি সাধারণ পরিবার থেকে আসা আমাদের মতো শিশুদের স্যার বড় স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছিলেন। তিনি ক্লাসে প্রায়ই চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে দৃপ্ত কণ্ঠে বলতেন—”লেখাপড়া করে যেই গাড়িঘোড়া চড়ে সেই।”

এই চিরন্তন সত্য বাণীটি দিয়ে তিনি আমাদের বুঝিয়েছিলেন, ভাগ্য বদলানোর একমাত্র হাতিয়ার হলো শিক্ষা। তাঁর এই বাণী আমাদের মনে সচ্ছল ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনের স্বপ্ন বুনে দিয়েছিল, যা আজ বাস্তবে রূপ নিচ্ছে।

আজকের এই যান্ত্রিক নগরে বসে যখন বগাদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দিনগুলোর কথা ভাবি, বুকটা এক অজানা শূন্যতায় ভরে ওঠে।

টিনের চালে ঝুমঝুম বৃষ্টির শব্দ আর স্যারের গলার আওয়াজ মিশে একাকার হয়ে যাওয়া সেই ক্লাসগুলো;
দোয়াত-কালি আর স্লেট-পেন্সিলের সেই চেনা সুবাস; টিফিনের ঘণ্টা পড়তেই সহপাঠীদের সাথে হুল্লোড়, আর দূর থেকে স্যারদের কড়া কিন্তু স্নেহমাখা নজরদারি সত্যিই সেই সোনালী দিনের কোলাজ যেন।

আবুল হাসিম স্যার, হযরত আলী স্যার এবং আনোয়ারুল হক হাবিল স্যার – এই তিন রথী মিলে যেন বগাদিয়া স্কুলটিকে একটি পরিবার বানিয়ে তুলেছিলেন। তাঁদের মুখ নিঃসৃত বাণীগুলো—”কষ্ট করলে কেষ্ট মেলে”, “একবার না পারিলে দেখ শতবার” এবং “লেখাপড়া করে যেই গাড়িঘোড়া চড়ে সেই” – ছিল আমাদের শৈশবের তিনটি মূল স্তম্ভ, যা আমাদের আজকের এই অবস্থানে নিয়ে এসেছে।

বিশ্ব শিক্ষক দিবসে আমাদের ঋণ ও দায়বদ্ধতা হাওরের প্রতিকূল পরিবেশে যেখানে অনেক শিশুই মাঝপথে ঝরে পড়ার ঝুঁকিতে থাকত, সেখানে এই তিন শিক্ষক নিরলসভাবে বাড়ি বাড়ি গিয়ে অভিভাবকদের বুঝিয়েছেন, সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে উদ্বুদ্ধ করেছেন। তাঁরা নিজেদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের কথা চিন্তা না করে নিভৃতে মোমবাতির মতো নিজেকে জ্বালিয়ে আমাদের পথ দেখিয়েছেন।

আজকের এই বিশ্ব শিক্ষক দিবসে পৃথিবীর সব জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন একদিকে, আর আমার এই তিন গুরুর প্রতি আমার হৃদয়ের অন্তঃস্তলের শ্রদ্ধাঞ্জলি আরেকদিকে। কোনো পুরস্কার বা উপাধি দিয়ে তাঁদের এই ঋণ শোধ করা সম্ভব নয়। কবি কাদের নেওয়াজের ‘শিক্ষকের মর্যাদা’ কবিতার সেই বিখ্যাত লাইনটি এখানে প্রণিধানযোগ্য – “বাদশাহ্ তুমি, নিভেছে তোমার সেদিনের সেই শান-শওকত, / শিক্ষকের এই মর্যাদা আজো অমর, অক্ষয়, শাশ্বত।”

আমার পরম শ্রদ্ধেয় শিক্ষক—মো. আবুল হাসিম স্যার, মো. হযরত আলী স্যার এবং মো. আনোয়ারুল হক হাবিল স্যার – তাঁদের মধ্যে হাসিম স্যারকে হারিয়েছি। হযরত ও হাবিল স্যার বয়সের ভারে ন্যুব্জ।

হাসিম স্যারের খোদার দিদার লাভ এবং জান্নাতুল ফেরদাউস নসিব হোক। আর হযরত এবং হাবিল স্যার সুস্থ ও দীর্ঘ নেক হায়াত লাভ করুন।

আপনাদের রোপণ করা সেই ছোট্ট চারাগাছটি আজ হয়তো একটি বড় বৃক্ষে পরিণত হয়েছে, কিন্তু তার শিকড়টি আজও বগাদিয়া স্কুলের সেই ক্লাসরুমেই পোঁতা রয়েছে। আপনাদের দেওয়া প্রতিটি উক্তি, শিক্ষা, নীতি ও পাঠকে বুকে ধারণ করেই আছি। এই ঋণ কোনোদিন শোধ হবার নয়।

বিশ্ব শিক্ষক দিবসে হাসিম স্যার, হযরত স্যার ও হাবিল স্যারসহ সকল শিক্ষকের চরণে আমার ভক্তি।

লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও কলামিস্ট;
সহযোগী সম্পাদক, আজকের সূর্যোদয়, ঢাকা

 

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

বিশ্ব শিক্ষক দিবসে হাসিম, হযরত ও হাবিল স্যারের স্মরণে নিবেদিত

বিশ্ব শিক্ষক দিবসে হাসিম, হযরত ও হাবিল স্যারের স্মরণে নিবেদিত

আপডেট টাইম : ০৯:১৩:৫৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬

রফিকুল ইসলামঃ “মানুষের মতো মানুষ গড়ার কারিগর যাঁরা, / ভবের মাঝে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক মোরা বলি তাঁরা। / অন্ধকার বিনাশী আলোর মশাল জ্বেলে বুকে, / পথ দেখান যিনি, তিনিই তো অমর এ মরণলোকে।”

আজ ৫ অক্টোবর, বিশ্ব শিক্ষক দিবস। সারা বিশ্বের কোটি কোটি শিক্ষার্থীর মতো আমার হৃদয়ের ক্যানভাসেও আজ স্মৃতির আয়নায় ভেসে উঠছে কিছু চিরচেনা মুখ। প্রযুক্তির এই কৃত্রিম যুগে দাঁড়িয়ে যখন পেছনের দিনগুলোর দিকে তাকাই, তখন ধুলোবালি মাখা শৈশবের সেই সোনালী দিনগুলো আমার চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে ওঠে।

বিশেষ করে আমার জীবনের ভিত্তিমূল গড়ে দেওয়া সেই বিদ্যাপীঠ – কিশোরগঞ্জ জেলার মিঠামইন উপজেলার বগাদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং সেই স্কুলের পরম শ্রদ্ধেয় তিন নক্ষত্রতুল্য শিক্ষক মো. আবুল হাসিম, মো. হযরত আলী ও মো. আনোয়ারুল হক হাবিল স্যার।

আজ তাঁদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা নিবেদনের দিন।

আমার শিক্ষার আঁতুড়ঘর হাওরপাড়ের বগাদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলা মানেই এক বিশাল জলরাশি, থৈ থৈ জল, ঢেউ আর বর্ষায় দিগন্তজোড়া মুক্ত আকাশ। এই হাওরাঞ্চলের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা বগাদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি শুধু একটি বিদ্যাপীঠই ছিল না; এটি ছিল আমাদের মতো শত শত গ্রামীণ শিশুর স্বপ্ন দেখার এবং সেই স্বপ্নকে ডানা মেলার আঁতুড়ঘর।

তখনকার দিনে গ্রামীণ ও হাওর এলাকায় শিক্ষা বিস্তারের পথটা আজকের মতো মসৃণ ছিল না। ভাঙা রাস্তা, বর্ষার কাদা-জল আর নানাবিধ প্রতিকূলতার মাঝেও যে শিক্ষকরা আমাদের হাত ধরে অক্ষরের আলো চিনিয়েছিলেন, তাঁরা কোনো সাধারণ মানুষ ছিলেন না; তাঁরা ছিলেন একেকজন আলোকবর্তিকা।

১. মো. আবুল হাসিম স্যার: নিয়মানুবর্তিতা ও “কষ্ট করলে কেষ্ট মেলে”

আমার স্মৃতির পাতায় যে নামটি সবচেয়ে প্রগাঢ়ভাবে খোদাই করা আছে, তিনি হলেন আমাদের শ্রদ্ধেয় মো. আবুল হাসিম স্যার। স্যার যখন ক্লাসে আসতেন, তখন এক অদ্ভুত গম্ভীর কিন্তু শান্ত পরিবেশ তৈরি হতো। আবুল হাসিম স্যারের পড়ানোর ধরণ ছিল চমৎকার। কঠিন কোনো ব্যাকরণ বা গণিতের জটিল সূত্রকে তিনি গল্পে গল্পে এত সহজ করে বুঝিয়ে দিতেন যে, তা সরাসরি আমাদের কচি মনে গেঁথে যেত।

তিনি কেবল বইয়ের পাতার পড়া মুখস্থ করাতেন না। তিনি আমাদের শিখিয়েছিলেন কীভাবে সোজা হয়ে দাঁড়াতে হয়, কীভাবে বড়দের সম্মান করতে হয়।

যখনই আমরা কোনো কঠিন অঙ্ক মেলাতে না পেরে হাল ছেড়ে দিতাম, কিংবা পড়া মনে রাখতে না পেরে হতাশ হতাম, স্যার তখন পরম স্নেহমাখা কণ্ঠে বলতেন – “কষ্ট করলে কেষ্ট মেলে।”

তাঁর মুখের এই একটি বাণী আমাদের অলসতা দূর করে কঠোর পরিশ্রমী হতে শিখিয়েছিল। আজ জীবনের প্রতিটি কঠিন পরীক্ষায় যখনই হোঁচট খাই, স্যারের সেই “কেষ্ট মেলার” অমোঘ বাণী আমাকে নতুন করে লড়াই করার শক্তি জোগায়।

২. মো. হযরত আলী স্যার: পরম ধৈর্য এবং “একবার না পারিলে দেখ শতবার”

বিশ্ব শিক্ষক দিবসের এই শুভক্ষণে যার অবয়বটি হৃদয়ে আলোড়ন তুলছে, তিনি হলেন আমাদের প্রিয় মো. হযরত আলী স্যার। তিনি ছিলেন এমন একজন শিক্ষক, যাঁর কাছে শিক্ষার্থীরা নির্দ্বিধায় নিজেদের সব সমস্যার কথা বলতে পারত।

সহজাত সরলতা ছাড়া হযরত আলী স্যারের মধ্যে কোনো কৃত্রিমতা ছিল না। তাঁর অমায়িক হাসি এবং মিষ্টি কথা যেকোনো ভয় শিশুর মনকে নিমিষেই শান্ত করে দিত।

ধৈর্যের প্রতিমূর্তি তিনি। ক্লাসের সবচেয়ে পেছনের বেঞ্চে বসা অমনোযোগী শিক্ষার্থীটিকেও তিনি পরম মমতায় টেনে নিতেন। একবার না বুঝলে দশবার বুঝিয়ে দেওয়ার মতো যে অসীম ধৈর্য তাঁর ছিল, তা আজকের দিনে বিরল।

পড়া বলতে গিয়ে কোনো সহপাঠী যখন তোতলাত বা ভুলে যেত, স্যার তখন রাগ না করে মিষ্টি হেসে বলতেন – “একবার না পারিলে দেখ শতবার।”

কবির এই পঙক্তিটি স্যারের মুখে যেন এক জাদুমন্ত্রের মতো শোনাত। তিনি আমাদের মনে গেঁথে দিয়েছিলেন যে, চেষ্টা কখনো বৃথা যায় না। বারবার চেষ্টা করার এই মানসিকতাই আজ আমাদের জীবনের নানা প্রতিকূলতা জয় করতে শেখাচ্ছে।

৩. মো. আনোয়ারুল হক স্যার: দূরদর্শিতা ও “লেখাপড়া করে যেই গাড়িঘোড়া চড়ে সেই”

আমাদের প্রাইমারি জীবনের আরেকজন দিকপাল ছিলেন শ্রদ্ধেয় মো. আনোয়ারুল হক স্যার। তিনি ছিলেন জ্ঞানের এক জীবন্ত এনসাইক্লোপিডিয়া।

কৌতূহল জাগানিয় শিক্ষক। আনোয়ারুল হক স্যার যখন আমাদের ভূগোল বা বিজ্ঞান পড়াতেন, তখন মনে হতো আমরা যেন সত্যিই মহাকাশে বা কোনো অচেনা দ্বীপে ঘুরে বেড়াচ্ছি। তিনি আমাদের ভেতরে জানার এক তীব্র কৌতূহল ও ক্ষুধা তৈরি করে দিতেন।

তাঁর সাংস্কৃতিক চেতনা থেকে পড়াশোনার পাশাপাশি বিদ্যালয়ের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, খেলাধুলা ও বিতর্ক প্রতিযোগিতায় তিনি আমাদের উৎসাহিত করতেন। তাঁর হাত ধরেই আমরা প্রথম আবৃত্তি ও বক্তৃতার মঞ্চে উঠতে শিখেছিলাম।

হাওরের অতি সাধারণ পরিবার থেকে আসা আমাদের মতো শিশুদের স্যার বড় স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছিলেন। তিনি ক্লাসে প্রায়ই চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে দৃপ্ত কণ্ঠে বলতেন—”লেখাপড়া করে যেই গাড়িঘোড়া চড়ে সেই।”

এই চিরন্তন সত্য বাণীটি দিয়ে তিনি আমাদের বুঝিয়েছিলেন, ভাগ্য বদলানোর একমাত্র হাতিয়ার হলো শিক্ষা। তাঁর এই বাণী আমাদের মনে সচ্ছল ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনের স্বপ্ন বুনে দিয়েছিল, যা আজ বাস্তবে রূপ নিচ্ছে।

আজকের এই যান্ত্রিক নগরে বসে যখন বগাদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দিনগুলোর কথা ভাবি, বুকটা এক অজানা শূন্যতায় ভরে ওঠে।

টিনের চালে ঝুমঝুম বৃষ্টির শব্দ আর স্যারের গলার আওয়াজ মিশে একাকার হয়ে যাওয়া সেই ক্লাসগুলো;
দোয়াত-কালি আর স্লেট-পেন্সিলের সেই চেনা সুবাস; টিফিনের ঘণ্টা পড়তেই সহপাঠীদের সাথে হুল্লোড়, আর দূর থেকে স্যারদের কড়া কিন্তু স্নেহমাখা নজরদারি সত্যিই সেই সোনালী দিনের কোলাজ যেন।

আবুল হাসিম স্যার, হযরত আলী স্যার এবং আনোয়ারুল হক হাবিল স্যার – এই তিন রথী মিলে যেন বগাদিয়া স্কুলটিকে একটি পরিবার বানিয়ে তুলেছিলেন। তাঁদের মুখ নিঃসৃত বাণীগুলো—”কষ্ট করলে কেষ্ট মেলে”, “একবার না পারিলে দেখ শতবার” এবং “লেখাপড়া করে যেই গাড়িঘোড়া চড়ে সেই” – ছিল আমাদের শৈশবের তিনটি মূল স্তম্ভ, যা আমাদের আজকের এই অবস্থানে নিয়ে এসেছে।

বিশ্ব শিক্ষক দিবসে আমাদের ঋণ ও দায়বদ্ধতা হাওরের প্রতিকূল পরিবেশে যেখানে অনেক শিশুই মাঝপথে ঝরে পড়ার ঝুঁকিতে থাকত, সেখানে এই তিন শিক্ষক নিরলসভাবে বাড়ি বাড়ি গিয়ে অভিভাবকদের বুঝিয়েছেন, সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে উদ্বুদ্ধ করেছেন। তাঁরা নিজেদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের কথা চিন্তা না করে নিভৃতে মোমবাতির মতো নিজেকে জ্বালিয়ে আমাদের পথ দেখিয়েছেন।

আজকের এই বিশ্ব শিক্ষক দিবসে পৃথিবীর সব জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন একদিকে, আর আমার এই তিন গুরুর প্রতি আমার হৃদয়ের অন্তঃস্তলের শ্রদ্ধাঞ্জলি আরেকদিকে। কোনো পুরস্কার বা উপাধি দিয়ে তাঁদের এই ঋণ শোধ করা সম্ভব নয়। কবি কাদের নেওয়াজের ‘শিক্ষকের মর্যাদা’ কবিতার সেই বিখ্যাত লাইনটি এখানে প্রণিধানযোগ্য – “বাদশাহ্ তুমি, নিভেছে তোমার সেদিনের সেই শান-শওকত, / শিক্ষকের এই মর্যাদা আজো অমর, অক্ষয়, শাশ্বত।”

আমার পরম শ্রদ্ধেয় শিক্ষক—মো. আবুল হাসিম স্যার, মো. হযরত আলী স্যার এবং মো. আনোয়ারুল হক হাবিল স্যার – তাঁদের মধ্যে হাসিম স্যারকে হারিয়েছি। হযরত ও হাবিল স্যার বয়সের ভারে ন্যুব্জ।

হাসিম স্যারের খোদার দিদার লাভ এবং জান্নাতুল ফেরদাউস নসিব হোক। আর হযরত এবং হাবিল স্যার সুস্থ ও দীর্ঘ নেক হায়াত লাভ করুন।

আপনাদের রোপণ করা সেই ছোট্ট চারাগাছটি আজ হয়তো একটি বড় বৃক্ষে পরিণত হয়েছে, কিন্তু তার শিকড়টি আজও বগাদিয়া স্কুলের সেই ক্লাসরুমেই পোঁতা রয়েছে। আপনাদের দেওয়া প্রতিটি উক্তি, শিক্ষা, নীতি ও পাঠকে বুকে ধারণ করেই আছি। এই ঋণ কোনোদিন শোধ হবার নয়।

বিশ্ব শিক্ষক দিবসে হাসিম স্যার, হযরত স্যার ও হাবিল স্যারসহ সকল শিক্ষকের চরণে আমার ভক্তি।

লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও কলামিস্ট;
সহযোগী সম্পাদক, আজকের সূর্যোদয়, ঢাকা