ক্ষমতার চেয়ার বদলালেও রেখে যাওয়া অনিয়মের অভিযোগের রেশ কাটেনি বস্ত্র অধিদপ্তরে। নিয়োগ, পদোন্নতি, প্রকল্প বাস্তবায়ন, সরকারি ক্রয়, পেনশন অনুমোদন ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ঘিরে সাবেক মহাপরিচালক (ডিজি) দিলীপ কুমার সাহার আমলে একের পর এক অনিয়মের অভিযোগ সামনে এসেছে। এসব অভিযোগের অনুসন্ধানে বস্ত্র অধিদপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র তলব করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
দুদক সূত্রে জানা গেছে, অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে বস্ত্র অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ে চিঠি পাঠিয়ে নিয়োগ, পদোন্নতি, প্রকল্প, ক্রয়, ভ্রমণ বিল, অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণ, বিভাগীয় তদন্তসহ বিভিন্ন বিষয়ে ১০ ধরনের নথিপত্র চাওয়া হয়েছে। নথিপত্র যাচাই-বাছাই করে পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
দিলীপ কুমার সাহা ২০১৯ সালের ১ আগস্ট থেকে ২০২১ সালের ১১ মার্চ পর্যন্ত বস্ত্র অধিদপ্তরের মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।অভিযোগ রয়েছে, ওই সময়ে ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিয়োগ ও পদায়ন, চলতি দায়িত্ব প্রদান, পদোন্নতি, পেনশন অনুমোদন এবং বিভিন্ন প্রকল্পের কেনাকাটায় অনিয়ম করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে ঘুষ ও দুর্নীতির মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগও অনুসন্ধানে এসেছে।
দুদকের উপপরিচালক মো. আকতারুল ইসলাম বলেন, কমিশনের সিদ্ধান্তে অনুসন্ধান শুরু হওয়ার পর নিয়ম অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট দপ্তরে নথি তলব করে চিঠি দেওয়া হয়েছে। প্রাপ্ত নথিপত্র যাচাই-বাছাই শেষে অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তার সুপারিশের ভিত্তিতে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অভিযোগের বিষয়ে সাবেক মহাপরিচালক দিলীপ কুমার সাহার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরে খুদে বার্তায় তিনি জানান, এ বিষয়ে তার কোনো বক্তব্য নেই।
এক কর্মকর্তার ‘পাঁচ পদে’ দায়িত্ব
অভিযোগের অন্যতম বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে শাহাদাত হোসেন নামে এক কর্মকর্তাকে একই সময়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টি।
অভিযোগ অনুযায়ী, পরিচালক পদে নিয়োগ ও পদোন্নতির নির্ধারিত বিধান থাকা সত্ত্বেও শাহাদাত হোসেনকে পরিচালক (প্রশাসন), পরিচালক (পোষক ও শিল্প), পরিচালক (শিক্ষা), পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) এবং ‘আমেনা মনসুর’ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
দুদকের অনুসন্ধানে এই পদায়ন ও দায়িত্ব প্রদানের ক্ষেত্রে বিধিমালা অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
অভিযোগ রয়েছে, ওই কর্মকর্তাকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ব্যবহার করে বিভিন্ন কর্মকর্তাকে উপপরিচালক পদে চলতি দায়িত্ব দেওয়ার বিনিময়ে অর্থ লেনদেন করা হতো। অভিযোগে প্রত্যেকের কাছ থেকে পাঁচ লাখ টাকা করে নেওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
বিভাগীয় মামলা চললেও পদোন্নতির অভিযোগ
সহকারী পরিচালক আইয়ুব রানা ওসমানির পদোন্নতিকে ঘিরেও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। এক নারী কর্মচারীকে যৌন হয়রানি এবং কার্যালয়ে আটকে রেখে ধর্ষণের চেষ্টার অভিযোগ ওঠার পর বিষয়টি তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়।
অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পর তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয়েছিল বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে। তবে মামলা নিষ্পত্তির আগেই তাকে উপপরিচালক পদে পদোন্নতি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ।
আরও অভিযোগ রয়েছে, বিভাগীয় নির্বাচন কমিটির কাছে তৎকালীন ডিজি দিলীপ কুমার সাহা আইয়ুব রানা ওসমানির বিরুদ্ধে কোনো বিভাগীয় মামলা নেই মর্মে প্রত্যয়ন দেন। অভিযোগ অনুযায়ী, বিষয়টি ধামাচাপা দিতে অর্থ লেনদেনও হয়েছিল।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করবে দুদকের অনুসন্ধান ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই।
অনিয়মের অভিযোগের মধ্যেই পেনশন অনুমোদন
লায়লা ইয়াফির নামে এক কর্মচারীর নিয়োগ ও পদমর্যাদা পরিবর্তন নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।
দুদক ও বস্ত্র অধিদপ্তরের নথি সূত্রে জানা যায়, তিনি একটি উন্নয়ন প্রকল্পে তৃতীয় শ্রেণির সমন্বয়কারী পদে যোগ দেন। পরবর্তীতে প্রকল্পটি রাজস্ব খাতে স্থানান্তরের সময় দুটি সমন্বয়কারী পদের মধ্যে তার পদটি প্রথম শ্রেণির পদ হিসেবে দেখানো হয়।
চাকরিতে যোগদানের বয়স, পদমর্যাদা পরিবর্তন এবং সরকারি অর্থের সুবিধা নেওয়ার বিষয়ে বস্ত্র অধিদপ্তরের তদন্তে অনিয়মের তথ্য পাওয়া যায় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
মহা হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের (সিএজি) কার্যালয়ের নিরীক্ষাতেও বিষয়টি উঠে আসে। অবৈধভাবে প্রথম শ্রেণির পদের বেতন-ভাতা নেওয়ার কারণে সরকারের ৫ লাখ ৮৪ হাজার ৪৪১ টাকা ক্ষতি হয়েছে উল্লেখ করে ওই অর্থ আদায়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
অভিযোগ রয়েছে, বিভাগীয় মামলা ও সরকারি পাওনা নিষ্পত্তি না হওয়া সত্ত্বেও লায়লা ইয়াফিরের পেনশন অনুমোদন করা হয়। এ ক্ষেত্রেও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ করেছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
লাইসেন্স ও রেজিস্ট্রেশনেও ঘুষের অভিযোগ
গার্মেন্টসের লাইসেন্স, বায়িং হাউজের রেজিস্ট্রেশন এবং যন্ত্রপাতি আমদানির বিভিন্ন ধাপে তৎকালীন ডিজির বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগও দুদকের অনুসন্ধানে এসেছে।
এ ছাড়া কক্সবাজারের রামু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার তদন্তের ভিত্তিতে পুলিশের করা মামলায় শিক্ষক উৎপল দাসের বিরুদ্ধে আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকার পরও তার বক্তব্য গ্রহণ এবং বিভাগীয় মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে সাবেক ডিজির বিরুদ্ধে।
বিশ্বজিৎ সাহা নামে আরেক কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা, ভর্তি ফি বাবদ অতিরিক্ত অর্থ আদায় এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভেতরে বহিরাগতদের ব্যবসার সুযোগ দেওয়ার অভিযোগ থাকলেও ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
প্রকল্পে শত কোটি টাকার যন্ত্রপাতি কেনাকাটায় প্রশ্ন
দিলীপ কুমার সাহার আমলে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের যন্ত্রপাতি ও আসবাবপত্র কেনাকাটায়ও বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে—‘গফরগাঁও টিভিআই’ নামে একটি প্রকল্পে প্রায় ৫০ কোটি টাকার আপগ্রেডেশন বরাদ্দ; নারায়ণগঞ্জের মিজমিজিতে টেক্সটাইল ভোকেশনাল ইনস্টিটিউটের ভবন মেরামত, কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি ক্রয়ে অস্বাভাবিক বরাদ্দ; এবং তিনটি পৃথক প্রকল্পে প্রায় ১০০ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি কেনায় পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়ার অভিযোগ।
এ ছাড়া যন্ত্রপাতি সরবরাহ না করেই কয়েকটি প্রকল্পে বিল পরিশোধ, প্রকল্পের ভবন নির্মাণ শেষ হওয়ার পরও নতুন করে আসবাবপত্র ও পাঠ্যবই কেনা, এবং আকাশপথে ভ্রমণের ভুয়া বিল তৈরির অভিযোগও রয়েছে।
‘সোহেল এন্টারপ্রাইজ’ নিয়েও প্রশ্ন
আউটসোর্সিং কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। আদালতে মামলা বিচারাধীন থাকা অবস্থায় ‘সোহেল এন্টারপ্রাইজ’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে আউটসোর্সিং কর্মী নিয়োগের কার্যাদেশ দেওয়ার অভিযোগের নথিও চেয়েছে দুদক।
একই সঙ্গে উপপরিচালক (কারিগরি) ও চিফ ইনস্ট্রাক্টরদের জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণে বিধিমালা অনুসরণ না করা, শূন্য পদ না থাকা সত্ত্বেও নিয়োগ ও পদোন্নতি দেওয়া এবং শতাধিক শিক্ষক-কর্মচারীকে সুবিধাজনক স্থানে সংযুক্ত রাখার অভিযোগও অনুসন্ধানের আওতায় রয়েছে।
দুদকের তলব করা নথিতে যা আছে
দুদকের অনুসন্ধানের স্বার্থে বস্ত্র অধিদপ্তরের কাছে যেসব নথি চাওয়া হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে—
১. সাবেক ডিজির দায়িত্ব পালনকালে নিয়োগ, পদোন্নতি, গার্মেন্টস ও বায়িং হাউজের রেজিস্ট্রেশন, যন্ত্রপাতি আমদানি, ভ্রমণ বিল, অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণ ও বিভাগীয় তদন্তসংক্রান্ত নথি।
২. গফরগাঁও টিভিআইয়ের প্রায় ৫০ কোটি টাকার আপগ্রেডেশন প্রকল্প এবং রাজস্ব বাজেট থেকে অর্থ ছাড়ের নথি।
৩. নারায়ণগঞ্জের মিজমিজিতে টেক্সটাইল ভোকেশনাল ইনস্টিটিউটের ভবন মেরামত, কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি ক্রয়সংক্রান্ত নথি।
৪. ‘সোহেল এন্টারপ্রাইজ’-কে আউটসোর্সিং কর্মী নিয়োগের কার্যাদেশসংক্রান্ত কাগজপত্র।
৫. তিনটি পৃথক প্রকল্পের প্রায় ১০০ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি কেনার ক্রয়াদেশসংক্রান্ত নথি।
৬. ভবন নির্মাণ শেষ হওয়ার পর ফার্নিচার ও টেক্সটবুক কেনার আদেশসংক্রান্ত নথি।
৭. চারটি টেক্সটাইল প্রকল্পে যন্ত্রপাতি সরবরাহ না করেও বিল পরিশোধসংক্রান্ত নথি।
৮. কারিগরি শিক্ষা বোর্ড আইন, ২০১৮-এর বিধান উপেক্ষা করে ডিপ্লোমা কোর্সে শিক্ষার্থী ভর্তি সংক্রান্ত নথি।
৯. বিদ্যালয়ের শিক্ষককে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে পদোন্নতি এবং প্রয়োজনীয় শিক্ষক ও অবকাঠামো ছাড়া দ্বিতীয় শিফট চালুর নথি।
১০. চলমান ও সমাপ্ত সব প্রকল্পের অনুমোদিত বরাদ্দ, ব্যয়, বাস্তবায়িত কার্যক্রম এবং প্রকল্প পরিচালকদের নাম, পদবি ও ঠিকানাসহ বিস্তারিত তথ্য।
অনুসন্ধানের ফলেই মিলবে পরবর্তী চিত্র
দিলীপ কুমার সাহার দায়িত্বকাল ঘিরে ওঠা এসব অভিযোগের অনেকগুলোই বর্তমানে দুদকের অনুসন্ধানের পর্যায়ে রয়েছে। সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই, অর্থের লেনদেনের তথ্য, সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য পর্যালোচনার পর অভিযোগগুলোর সত্যতা ও দায় নির্ধারণের সুযোগ তৈরি হবে।
দুদকের অনুসন্ধান শেষ না হওয়া পর্যন্ত এসব অভিযোগকে অভিযোগ হিসেবেই দেখা হচ্ছে। নথিপত্র যাচাই শেষে যদি অনিয়ম বা দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি সামনে আসতে পারে।
Reporter Name 





















