ঢাকা ১০:৫১ অপরাহ্ন, সোমবার, ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ২০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
৫২ বছর ১ টাকায় পড়ানো গাইবান্ধার লুৎফুর রহমান পেলেন রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ১ লাখ ৬৫ হাজার কর্মী নেবে ইতালি, বাংলাদেশিদের জন্যও থাকছে সুযোগ ১৯ ব্যাংকের অনলাইন লেনদেন, কার্ড ও এটিএম সেবা বন্ধ থাকবে ৬ দিন স্পেনে আগাম নির্বাচনের ঘোষণা দিলেন প্রধানমন্ত্রী এমদাদুল হক চৌধুরীকে ভূমি মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব হিসেবে নিয়োগ শিক্ষকদের যে ১০ সিনেমা অবশ্যই দেখা উচিত ভোটার হিসেবে নারীর অংশগ্রহণ বেশি, প্রার্থী হিসেবে খুবই কম: সিইসি দুর্গাপূজার কেনাকাটার জন্য দোকানপাট ও বিপণিবিতান রাত ১০টা পর্যন্ত খোলা মেসির পর আর্জেন্টিনার ১০ নম্বর জার্সি কার দারগ আলী মাস্টার: যে নামে থমকে যেত হাওরের কান্না

দারগ আলী মাস্টার: যে নামে থমকে যেত হাওরের কান্না

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১০:১৫:৩২ অপরাহ্ন, সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬
  • ২৮ বার

Oplus_16908288

রফিকুল ইসলামঃ আমাদের শৈশবগুলো কেটেছে অদ্ভুত সব জুজুবুড়ির ভয় দেখিয়ে কান্না থামানোর গল্প শুনে। কোথাও ‘রাক্ষস-খোক্কস’, কোথাওবা ‘বাঘে ছুঁলে আঠারো ঘা’ – এমন কাল্পনিক সব জুজুর আড়ালে গ্রামীণ মায়েরা তাদের অবাধ্য সন্তানদের শান্ত রাখতেন।

কিন্তু কিশোরগঞ্জের হাওরবেষ্টিত মিঠামইন উপজেলা গোপদিঘী ইউনিয়নের সাবেক ৩ নম্বর ওয়ার্ডে কোনো কাল্পনিক ভূতের প্রয়োজন হতো না। সেখানে জ্যান্ত এক কিংবদন্তি হেঁটে বেড়াতেন বগাদিয়ার মেঠোপথ ধরে। মায়েরা শুধু বলতেন, “কান্দিস না বাজান, ওই দেখ দারগ আলী মাস্টার আইতাছে!”

ব্যস, অবাধ্য শিশুর চোখের জল নিমেষেই গায়েব। অথচ, এই মানুষটি কোনো অত্যাচারী জমিদার ছিলেন না, ছিলেন না কোনো নিষ্ঠুর লাঠিয়াল। তিনি ছিলেন একজন আদর্শ শিক্ষক এবং আরও বড় পরিচয় – তিনি ছিলেন একজন সশস্ত্র বীর মুক্তিযোদ্ধা।

যিনি একাত্তরের রণাঙ্গনে পাকিস্তানি হানাদারদের বুকে কাঁপন ধরিয়েছিলেন, স্বাধীন বঙ্গে এসে তিনি সমাজ সংস্কারের লাঠি আর হাতে চক তুলে নিয়েছিলেন। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে যখন আমরা ‘বীর’ আর ‘শিক্ষক’ শব্দ দুটির জৌলুস ক্ষমতার চোরাবালিতে হারিয়ে যেতে দেখি, তখন মো. শামসুল হক দারগ আলীর এই শৃঙ্খলার গল্পটি আমাদের কপট সমাজকে এক বড় ধরনের ধাক্কা দেয়।

একাত্তরের মার্চে যে মানুষটি হাওরের কাদা-জল মাড়িয়ে ঘর ছেড়েছিলেন, তাঁর বুকে ছিল স্বদেশের মুক্তির তীব্র ক্ষুধা। মো. শামসুল হক দারগ আলী কেবল কাগুজে মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন না; তিনি ছিলেন সম্মুখ সমরের যোদ্ধা, যার রাইফেলের গর্জন অন্যায় আর শোষণের বিরুদ্ধে এক জীবন্ত ইশতেহার লিখেছিল।

একাত্তরের সেই উত্তাল দিনগুলোতে পাকিস্তানি সৈন্যদের কাছে তাঁর নাম কী বার্তা বয়ে নিয়ে যেত, তা ইতিহাসের পাতায় হয়তো অন্যভাবে লেখা আছে। কিন্তু বিজয়ের পর এই সশস্ত্র বীর যখন নিজ গ্রামে ফিরলেন, তখন তিনি কাঁধে ক্ষমতার জোয়াল না তুলে সোজা চলে এলেন শ্রেণীকক্ষে।

বন্দুকের নল উঁচিয়ে যে দেশকে মুক্ত করেছিলেন, চকের গুঁড়োয় বগাদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ব্ল্যাকবোর্ডে সেই দেশের ভবিষ্যৎ আঁকতে বসা এক অভাবনীয় বৈপরীত্য। বন্দুকের ট্রিগার টেপা আঙুলগুলো যখন পরম মমতায় এবং একই সাথে কঠোর শাসনে অবাধ্য হাওরের শিশুদের সোজা করতে শুরু করল, তখনই জন্ম নিল সেই কিংবদন্তি—’দারগ আলী মাস্টার’।

ছোটবেলায় আমরা যখনই অবাধ্য হতাম, ঘর থরথর করে কাঁপত আমাদের কান্নায়, তখনই মোক্ষম অস্ত্র হিসেবে ধেয়ে আসত তাঁর নাম। কেন তাঁর নামে শিশুরা কান্না থামাত? এর পেছনে ছিল তাঁর ব্যক্তিত্বের এক দুর্ভেদ্য চাদর। খটখট জুতো জোড়ার আওয়াজ দূর থেকে পেলেই বগাদিয়া স্কুলের বারান্দা থমকে যেত – বোঝা যেত মাস্টারজি আসছেন। তাঁর টানটান মেরুদণ্ড, চোখে এক আপসহীন চশমা আর হাতে হয়তো একটা বেত কিংবা ছাতা।

এই ভয়টা কিন্তু স্রেফ মার খাওয়ার ভয় ছিল না; এটি ছিল শৃঙ্খলার প্রতি এক পরম আত্মসমর্পণ। যে শিশুরা ঘরে বাবা-মায়ের শাসনকে বুড়ো আঙুল দেখাত, তারা দারগ আলী মাস্টারের নাম শুনলেই সোজা হয়ে বসে যেত। কারণ সবাই জানত, এই মানুষটির ডিকশনারিতে ‘ছাড়’ বলে কোনো শব্দ নেই। অন্যায়ের সাথে তিনি একাত্তরেও আপস করেননি, বগাদিয়া স্কুলের ক্লাসরুমেও করেননি। তাঁর ক্লাসে অবাধ্যতা মানেই ছিল অবধারিত শাস্তি, আর তাঁর ডাস্টারের বাড়ি কিংবা বেতের ঘা ছিল ফাঁকিবাজদের জন্য এক একটি অগ্নিপরীক্ষা।

আজকের যুগে এসে যখন প্রাইভেট টিউশনির বাণিজ্যিকীকরণে শিক্ষকেরা ছাত্রদের কাছে ‘স্যার’ থেকে ‘সেবাদাস’-এ পরিণত হয়েছেন, তখন দারগ আলী মাস্টারের সেই রুদ্রমূর্তি মনে পড়লে গায়ে কাঁটা দেয়। আজ শিক্ষককে দেখলে ছাত্ররা সিগারেট লুকিয়ে হাসে না, বরং শিক্ষকেরাই ছাত্রদের রাজনৈতিক ক্ষমতার ভয়ে তটস্থ থাকেন। সেই নিরিখে দারগ আলী মাস্টারের নামে শিশুদের কান্না থামার গল্পটি আজ স্রেফ এক অবিশ্বাস্য রূপকথা বলে ভ্রম হয়!

দারগ আলী মাস্টার ছিলেন বর্তমান যুগের তথাকথিত ‘স্মার্ট’ ও ‘সুবিধাবাদী’ মানুষদের চোখে চরম বেমানান এক চরিত্র। একাত্তরে জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করা একজন মানুষ স্বাধীন দেশে চাইলে কী না পেতে পারতেন? একটা লাইসেন্স, কিছু জমি, কিংবা রাজনৈতিক বড় পদ – সবই তাঁর নখের ডগায় থাকতে পারত। কিন্তু তিনি বেছে নিলেন বগাদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চক-ডাস্টারের এক নিস্তরঙ্গ, অথচ তীব্র মর্যাদাপূর্ণ জীবন।

আমাদের সমাজ সৎ মানুষকে ‘বোকা’ বলে গালমন্দ করতে ভালোবাসে। শামসুল হক দারগ আলীও হয়তো তাঁর সমসাময়িক অনেকের চোখে তেমনই এক ‘বোকা’ মানুষ ছিলেন। যখন অন্য শিক্ষকেরা ছাত্রদের নোটবই কিনতে বাধ্য করছেন বা কোচিং সেন্টারের পসরা সাজিয়ে বসছেন, দারগ আলী মাস্টার তখন স্কুলের বারান্দায় দাঁড়িয়ে বজ্রকণ্ঠে পড়াচ্ছেন স্বদেশের ইতিহাস, ব্যাকরণের জটিল সূত্র কিংবা নীতিবিদ্যার অমোঘ বাণী।

তাঁর সেই সততা ও কড়া শাসন অনেক সময় ছাত্রদের কিংবা অভিভাবকদের মনে সাময়িক বিরক্তির উদ্রেক করলেও, দিনশেষে সবাই তাঁর পায়ে মাথা নত করতে বাধ্য হতো। কারণ তাঁর সততার গায়ে কোনো কলঙ্কের দাগ সমাজ কোনোদিন লাগাতে পারেনি।

আমার সৌভাগ্য হয়েছিল বগাদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তাঁর ছাত্র হওয়ার। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে যখন আমি পেছনে ফিরে তাকাই, আমার স্পষ্ট মনে পড়ে তাঁর সেই তীক্ষ্ণ চাউনি। ক্লাসে ঢোকার সাথে সাথে চারপাশের গুঞ্জন কেমন এক অলৌকিক নিস্তব্ধতায় রূপ নিত। তিনি যখন পড়াতেন, মনে হতো এক রণাঙ্গনের সেনাপতি তাঁর সৈন্যদের দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন। প্রতিটি শব্দের উচ্চারণ, প্রতিটা বাক্যের গঠন তিনি যেভাবে আমাদের মগজে ঢুকিয়ে দিতেন, তা কোনো আধুনিক মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুমও পারবে না।

একবার এক সহপাঠী পড়া না পেরে যখন আমতা আমতা করছিল, মাস্টারজি তাঁর চশমার ওপর দিয়ে তাকিয়ে শুধু বলেছিলেন, “যে ছেলে পড়া পারে না, সে দেশের বোঝা।”

সেই একটি মাত্র বাক্য আমাদের বুঝিয়ে দিয়েছিল, পড়ালেখা ফাঁকি দেওয়াটা স্রেফ পরীক্ষার খাতায় কম নম্বর পাওয়া নয়, এটা দেশের সাথে এক প্রকার বেঈমানি। একজন মুক্তিযোদ্ধার মুখ থেকে যখন এই কথা বের হয়, তখন তার ওজন সাধারণ শিক্ষকের চেয়ে হাজার গুণ বেশি হতে বাধ্য।

আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে যখন আমরা চারপাশের সমাজটার দিকে তাকাই, তখন দারগ আলী মাস্টারের মতো মানুষদের বড় বেশি প্রয়োজন মনে হয়। আজ বাজারে মুক্তিযোদ্ধার ভুয়া সনদের ছড়াছড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দুর্নীতির মহোৎসব। আজ শিক্ষকেরা যখন উপাচার্য পদের জন্য রাজনৈতিক দলের চাটুকারিতা করেন, তখন গোপদিঘী ইউনিয়নের বগাদিয়া স্কুলের সেই মেরুদণ্ডী শিক্ষকের কথা মনে পড়ে – দারগ আলী মাস্টার।

আজকের সন্তানদের কান্না থামাতে মায়েরা হয়তো ইউটিউবের স্ক্রিন কিংবা দামি খেলনা এগিয়ে দেন। প্রযুক্তির এই আসক্তির যুগে ‘দারগ আলী মাস্টার আইতাছে’ বলার মতো কোনো জ্যান্ত অনুশাসন আমাদের সমাজে আর অবশিষ্ট নেই। আমরা এমন এক সমাজ তৈরি করেছি যেখানে শাসন নেই, শৃঙ্খলা নেই, আছে কেবল এক মেকি স্বাধীনতার আস্ফালন।

আমরা আজ এমন এক প্রজন্ম তৈরি করছি যারা জিপিএ-৫ পায় ঠিকই, কিন্তু মানুষের মতো মানুষ হতে শেখে না। কারণ আমাদের ঘরে বা বাইরে আর কোনো দারগ আলী মাস্টার নেই, যিনি বেত উঁচিয়ে কিংবা শুধু তাঁর নামের ওজন দিয়ে সমাজটাকে সোজা করে রাখবেন।

বীর মুক্তিযোদ্ধা ও আদর্শ শিক্ষক মো. শামসুল হক দারগ আলী আজ হয়তো আমাদের মাঝে প্রাত্যহিক চাটুকারিতার ভিড়ে একলা দাঁড়িয়ে থাকা এক মহীরুহ। তাঁর জীবনের পুরো ক্যানভাসটা যদি আমরা আঁকি, তবে দেখব তিনি এক জীবন দিয়ে দুটি দেশ গড়েছেন—একবার বন্দুক হাতে ভৌগোলিক মানচিত্র, আর পরবর্তী সময়ে কলম ও চক হাতে একটি শিক্ষিত ও সুশৃঙ্খল প্রজন্ম।

“দারগ আলী মাস্টার আইতাছে!”— এই বাক্যটি স্রেফ শিশুদের কান্না থামানোর কোনো বুলি নয়। এটি আসলে আমাদের সমাজের ভেতরের সুপ্ত বিবেককে জাগিয়ে তোলার এক অবিনাশী হুঙ্কার।

যেদিন এই সমাজে অন্যায় দেখে আমাদের সম্মিলিত বিবেক আর কাঁদবে না, বা অন্যায়ের বিরুদ্ধে কেউ বুক চিতিয়ে দাঁড়াবে না, সেদিন আমাদের খুব করে বলতে হবে – আমাদের শৃঙ্খলার পাঠ দিতে, আমাদের মেরুদণ্ড সোজা করতে আবার যেন ফিরে আসেন আমাদের পরম শ্রদ্ধেয় দারগ আলী মাস্টার।

তিনি আমার শিক্ষক, তিনি এই দেশের শিক্ষক; আর তাঁর এই অনন্য কড়া ও কোমল ঐতিহ্য চিরকাল আমাদের স্মৃতিতে ও মস্তিস্কে বেঁচে থাকবে দীপ্ত নক্ষত্রের মতো।

আজ তিনি নেই; ১৯৯০ সালে ছোট তিন সন্তান রেখে নিজ পরিবার, সমাজ ও দেশের মায়া ত্যাগ করে রবের ডাকে সাড়া দিয়ে আকাশের তারা হয়ে গেছেন।

তাঁর খোদার দিদার লাভ এবং জান্নাতুল ফেরদাউস নসিব হোক।

পরম সুখের সংবাদ বলা যায়, তাঁর ছোট ছেলে মো. মাহবুব আলম একই স্কুলে সুনামের সাথে শিক্ষকতা করছেন।

আজ ৫ই অক্টোবর, বিশ্ব শিক্ষক দিবস। তিনি-সহ সকল শিক্ষকদের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভক্তি।

লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও কলামিস্ট;
সহযোগী সম্পাদক, আজকের সূর্যোদয়, ঢাকা

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

৫২ বছর ১ টাকায় পড়ানো গাইবান্ধার লুৎফুর রহমান পেলেন রাষ্ট্রীয় সম্মাননা

দারগ আলী মাস্টার: যে নামে থমকে যেত হাওরের কান্না

আপডেট টাইম : ১০:১৫:৩২ অপরাহ্ন, সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬

রফিকুল ইসলামঃ আমাদের শৈশবগুলো কেটেছে অদ্ভুত সব জুজুবুড়ির ভয় দেখিয়ে কান্না থামানোর গল্প শুনে। কোথাও ‘রাক্ষস-খোক্কস’, কোথাওবা ‘বাঘে ছুঁলে আঠারো ঘা’ – এমন কাল্পনিক সব জুজুর আড়ালে গ্রামীণ মায়েরা তাদের অবাধ্য সন্তানদের শান্ত রাখতেন।

কিন্তু কিশোরগঞ্জের হাওরবেষ্টিত মিঠামইন উপজেলা গোপদিঘী ইউনিয়নের সাবেক ৩ নম্বর ওয়ার্ডে কোনো কাল্পনিক ভূতের প্রয়োজন হতো না। সেখানে জ্যান্ত এক কিংবদন্তি হেঁটে বেড়াতেন বগাদিয়ার মেঠোপথ ধরে। মায়েরা শুধু বলতেন, “কান্দিস না বাজান, ওই দেখ দারগ আলী মাস্টার আইতাছে!”

ব্যস, অবাধ্য শিশুর চোখের জল নিমেষেই গায়েব। অথচ, এই মানুষটি কোনো অত্যাচারী জমিদার ছিলেন না, ছিলেন না কোনো নিষ্ঠুর লাঠিয়াল। তিনি ছিলেন একজন আদর্শ শিক্ষক এবং আরও বড় পরিচয় – তিনি ছিলেন একজন সশস্ত্র বীর মুক্তিযোদ্ধা।

যিনি একাত্তরের রণাঙ্গনে পাকিস্তানি হানাদারদের বুকে কাঁপন ধরিয়েছিলেন, স্বাধীন বঙ্গে এসে তিনি সমাজ সংস্কারের লাঠি আর হাতে চক তুলে নিয়েছিলেন। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে যখন আমরা ‘বীর’ আর ‘শিক্ষক’ শব্দ দুটির জৌলুস ক্ষমতার চোরাবালিতে হারিয়ে যেতে দেখি, তখন মো. শামসুল হক দারগ আলীর এই শৃঙ্খলার গল্পটি আমাদের কপট সমাজকে এক বড় ধরনের ধাক্কা দেয়।

একাত্তরের মার্চে যে মানুষটি হাওরের কাদা-জল মাড়িয়ে ঘর ছেড়েছিলেন, তাঁর বুকে ছিল স্বদেশের মুক্তির তীব্র ক্ষুধা। মো. শামসুল হক দারগ আলী কেবল কাগুজে মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন না; তিনি ছিলেন সম্মুখ সমরের যোদ্ধা, যার রাইফেলের গর্জন অন্যায় আর শোষণের বিরুদ্ধে এক জীবন্ত ইশতেহার লিখেছিল।

একাত্তরের সেই উত্তাল দিনগুলোতে পাকিস্তানি সৈন্যদের কাছে তাঁর নাম কী বার্তা বয়ে নিয়ে যেত, তা ইতিহাসের পাতায় হয়তো অন্যভাবে লেখা আছে। কিন্তু বিজয়ের পর এই সশস্ত্র বীর যখন নিজ গ্রামে ফিরলেন, তখন তিনি কাঁধে ক্ষমতার জোয়াল না তুলে সোজা চলে এলেন শ্রেণীকক্ষে।

বন্দুকের নল উঁচিয়ে যে দেশকে মুক্ত করেছিলেন, চকের গুঁড়োয় বগাদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ব্ল্যাকবোর্ডে সেই দেশের ভবিষ্যৎ আঁকতে বসা এক অভাবনীয় বৈপরীত্য। বন্দুকের ট্রিগার টেপা আঙুলগুলো যখন পরম মমতায় এবং একই সাথে কঠোর শাসনে অবাধ্য হাওরের শিশুদের সোজা করতে শুরু করল, তখনই জন্ম নিল সেই কিংবদন্তি—’দারগ আলী মাস্টার’।

ছোটবেলায় আমরা যখনই অবাধ্য হতাম, ঘর থরথর করে কাঁপত আমাদের কান্নায়, তখনই মোক্ষম অস্ত্র হিসেবে ধেয়ে আসত তাঁর নাম। কেন তাঁর নামে শিশুরা কান্না থামাত? এর পেছনে ছিল তাঁর ব্যক্তিত্বের এক দুর্ভেদ্য চাদর। খটখট জুতো জোড়ার আওয়াজ দূর থেকে পেলেই বগাদিয়া স্কুলের বারান্দা থমকে যেত – বোঝা যেত মাস্টারজি আসছেন। তাঁর টানটান মেরুদণ্ড, চোখে এক আপসহীন চশমা আর হাতে হয়তো একটা বেত কিংবা ছাতা।

এই ভয়টা কিন্তু স্রেফ মার খাওয়ার ভয় ছিল না; এটি ছিল শৃঙ্খলার প্রতি এক পরম আত্মসমর্পণ। যে শিশুরা ঘরে বাবা-মায়ের শাসনকে বুড়ো আঙুল দেখাত, তারা দারগ আলী মাস্টারের নাম শুনলেই সোজা হয়ে বসে যেত। কারণ সবাই জানত, এই মানুষটির ডিকশনারিতে ‘ছাড়’ বলে কোনো শব্দ নেই। অন্যায়ের সাথে তিনি একাত্তরেও আপস করেননি, বগাদিয়া স্কুলের ক্লাসরুমেও করেননি। তাঁর ক্লাসে অবাধ্যতা মানেই ছিল অবধারিত শাস্তি, আর তাঁর ডাস্টারের বাড়ি কিংবা বেতের ঘা ছিল ফাঁকিবাজদের জন্য এক একটি অগ্নিপরীক্ষা।

আজকের যুগে এসে যখন প্রাইভেট টিউশনির বাণিজ্যিকীকরণে শিক্ষকেরা ছাত্রদের কাছে ‘স্যার’ থেকে ‘সেবাদাস’-এ পরিণত হয়েছেন, তখন দারগ আলী মাস্টারের সেই রুদ্রমূর্তি মনে পড়লে গায়ে কাঁটা দেয়। আজ শিক্ষককে দেখলে ছাত্ররা সিগারেট লুকিয়ে হাসে না, বরং শিক্ষকেরাই ছাত্রদের রাজনৈতিক ক্ষমতার ভয়ে তটস্থ থাকেন। সেই নিরিখে দারগ আলী মাস্টারের নামে শিশুদের কান্না থামার গল্পটি আজ স্রেফ এক অবিশ্বাস্য রূপকথা বলে ভ্রম হয়!

দারগ আলী মাস্টার ছিলেন বর্তমান যুগের তথাকথিত ‘স্মার্ট’ ও ‘সুবিধাবাদী’ মানুষদের চোখে চরম বেমানান এক চরিত্র। একাত্তরে জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করা একজন মানুষ স্বাধীন দেশে চাইলে কী না পেতে পারতেন? একটা লাইসেন্স, কিছু জমি, কিংবা রাজনৈতিক বড় পদ – সবই তাঁর নখের ডগায় থাকতে পারত। কিন্তু তিনি বেছে নিলেন বগাদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চক-ডাস্টারের এক নিস্তরঙ্গ, অথচ তীব্র মর্যাদাপূর্ণ জীবন।

আমাদের সমাজ সৎ মানুষকে ‘বোকা’ বলে গালমন্দ করতে ভালোবাসে। শামসুল হক দারগ আলীও হয়তো তাঁর সমসাময়িক অনেকের চোখে তেমনই এক ‘বোকা’ মানুষ ছিলেন। যখন অন্য শিক্ষকেরা ছাত্রদের নোটবই কিনতে বাধ্য করছেন বা কোচিং সেন্টারের পসরা সাজিয়ে বসছেন, দারগ আলী মাস্টার তখন স্কুলের বারান্দায় দাঁড়িয়ে বজ্রকণ্ঠে পড়াচ্ছেন স্বদেশের ইতিহাস, ব্যাকরণের জটিল সূত্র কিংবা নীতিবিদ্যার অমোঘ বাণী।

তাঁর সেই সততা ও কড়া শাসন অনেক সময় ছাত্রদের কিংবা অভিভাবকদের মনে সাময়িক বিরক্তির উদ্রেক করলেও, দিনশেষে সবাই তাঁর পায়ে মাথা নত করতে বাধ্য হতো। কারণ তাঁর সততার গায়ে কোনো কলঙ্কের দাগ সমাজ কোনোদিন লাগাতে পারেনি।

আমার সৌভাগ্য হয়েছিল বগাদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তাঁর ছাত্র হওয়ার। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে যখন আমি পেছনে ফিরে তাকাই, আমার স্পষ্ট মনে পড়ে তাঁর সেই তীক্ষ্ণ চাউনি। ক্লাসে ঢোকার সাথে সাথে চারপাশের গুঞ্জন কেমন এক অলৌকিক নিস্তব্ধতায় রূপ নিত। তিনি যখন পড়াতেন, মনে হতো এক রণাঙ্গনের সেনাপতি তাঁর সৈন্যদের দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন। প্রতিটি শব্দের উচ্চারণ, প্রতিটা বাক্যের গঠন তিনি যেভাবে আমাদের মগজে ঢুকিয়ে দিতেন, তা কোনো আধুনিক মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুমও পারবে না।

একবার এক সহপাঠী পড়া না পেরে যখন আমতা আমতা করছিল, মাস্টারজি তাঁর চশমার ওপর দিয়ে তাকিয়ে শুধু বলেছিলেন, “যে ছেলে পড়া পারে না, সে দেশের বোঝা।”

সেই একটি মাত্র বাক্য আমাদের বুঝিয়ে দিয়েছিল, পড়ালেখা ফাঁকি দেওয়াটা স্রেফ পরীক্ষার খাতায় কম নম্বর পাওয়া নয়, এটা দেশের সাথে এক প্রকার বেঈমানি। একজন মুক্তিযোদ্ধার মুখ থেকে যখন এই কথা বের হয়, তখন তার ওজন সাধারণ শিক্ষকের চেয়ে হাজার গুণ বেশি হতে বাধ্য।

আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে যখন আমরা চারপাশের সমাজটার দিকে তাকাই, তখন দারগ আলী মাস্টারের মতো মানুষদের বড় বেশি প্রয়োজন মনে হয়। আজ বাজারে মুক্তিযোদ্ধার ভুয়া সনদের ছড়াছড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দুর্নীতির মহোৎসব। আজ শিক্ষকেরা যখন উপাচার্য পদের জন্য রাজনৈতিক দলের চাটুকারিতা করেন, তখন গোপদিঘী ইউনিয়নের বগাদিয়া স্কুলের সেই মেরুদণ্ডী শিক্ষকের কথা মনে পড়ে – দারগ আলী মাস্টার।

আজকের সন্তানদের কান্না থামাতে মায়েরা হয়তো ইউটিউবের স্ক্রিন কিংবা দামি খেলনা এগিয়ে দেন। প্রযুক্তির এই আসক্তির যুগে ‘দারগ আলী মাস্টার আইতাছে’ বলার মতো কোনো জ্যান্ত অনুশাসন আমাদের সমাজে আর অবশিষ্ট নেই। আমরা এমন এক সমাজ তৈরি করেছি যেখানে শাসন নেই, শৃঙ্খলা নেই, আছে কেবল এক মেকি স্বাধীনতার আস্ফালন।

আমরা আজ এমন এক প্রজন্ম তৈরি করছি যারা জিপিএ-৫ পায় ঠিকই, কিন্তু মানুষের মতো মানুষ হতে শেখে না। কারণ আমাদের ঘরে বা বাইরে আর কোনো দারগ আলী মাস্টার নেই, যিনি বেত উঁচিয়ে কিংবা শুধু তাঁর নামের ওজন দিয়ে সমাজটাকে সোজা করে রাখবেন।

বীর মুক্তিযোদ্ধা ও আদর্শ শিক্ষক মো. শামসুল হক দারগ আলী আজ হয়তো আমাদের মাঝে প্রাত্যহিক চাটুকারিতার ভিড়ে একলা দাঁড়িয়ে থাকা এক মহীরুহ। তাঁর জীবনের পুরো ক্যানভাসটা যদি আমরা আঁকি, তবে দেখব তিনি এক জীবন দিয়ে দুটি দেশ গড়েছেন—একবার বন্দুক হাতে ভৌগোলিক মানচিত্র, আর পরবর্তী সময়ে কলম ও চক হাতে একটি শিক্ষিত ও সুশৃঙ্খল প্রজন্ম।

“দারগ আলী মাস্টার আইতাছে!”— এই বাক্যটি স্রেফ শিশুদের কান্না থামানোর কোনো বুলি নয়। এটি আসলে আমাদের সমাজের ভেতরের সুপ্ত বিবেককে জাগিয়ে তোলার এক অবিনাশী হুঙ্কার।

যেদিন এই সমাজে অন্যায় দেখে আমাদের সম্মিলিত বিবেক আর কাঁদবে না, বা অন্যায়ের বিরুদ্ধে কেউ বুক চিতিয়ে দাঁড়াবে না, সেদিন আমাদের খুব করে বলতে হবে – আমাদের শৃঙ্খলার পাঠ দিতে, আমাদের মেরুদণ্ড সোজা করতে আবার যেন ফিরে আসেন আমাদের পরম শ্রদ্ধেয় দারগ আলী মাস্টার।

তিনি আমার শিক্ষক, তিনি এই দেশের শিক্ষক; আর তাঁর এই অনন্য কড়া ও কোমল ঐতিহ্য চিরকাল আমাদের স্মৃতিতে ও মস্তিস্কে বেঁচে থাকবে দীপ্ত নক্ষত্রের মতো।

আজ তিনি নেই; ১৯৯০ সালে ছোট তিন সন্তান রেখে নিজ পরিবার, সমাজ ও দেশের মায়া ত্যাগ করে রবের ডাকে সাড়া দিয়ে আকাশের তারা হয়ে গেছেন।

তাঁর খোদার দিদার লাভ এবং জান্নাতুল ফেরদাউস নসিব হোক।

পরম সুখের সংবাদ বলা যায়, তাঁর ছোট ছেলে মো. মাহবুব আলম একই স্কুলে সুনামের সাথে শিক্ষকতা করছেন।

আজ ৫ই অক্টোবর, বিশ্ব শিক্ষক দিবস। তিনি-সহ সকল শিক্ষকদের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভক্তি।

লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও কলামিস্ট;
সহযোগী সম্পাদক, আজকের সূর্যোদয়, ঢাকা