ঢাকা ১০:৫৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ২১ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
নির্ভীক শিক্ষক নেতা আঙ্গুর ও চামড়া বন্দর ট্রাজেডি দৈনিক আজকের সারাদিনের ২২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে স্মৃতি পদক পেলেন সাংবাদিক মনোয়ার হোসাইন রনি হামলা-দখল-চাঁদাবাজি থামবে কিভাবে: রাজনীতিতে ভিন্নতা থাকলেও অপরাধ মিলেমিশে আইটি ক্যারিয়ারের প্রস্তুতি, শিক্ষার্থীদের নিয়ে ‘লগইন ইনটু ইন্ডাস্ট্রি নেক্সট’ টানা পাঁচদিনের ছুটি পাচ্ছেন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অটোরিকশায় রক্তাক্ত মহাসড়ক গণমাধ্যমের স্বাধীনতার সঙ্গে জনগণের অধিকার সুরক্ষার তাগিদ তথ্য প্রতিমন্ত্রীর কবর দেওয়ার কত দিন পর একই কবরে দাফন করা যাবে আওয়ামী লীগের সঙ্গে রাজনৈতিক পুনর্মিলনের সুযোগ নেই: ডেপুটি স্পিকার ৭ নভেম্বর সাধারণ ছুটি ঘোষণা

কিশোরগঞ্জ কলেজ থেকে গুরুদয়াল কলেজ প্রতিষ্ঠার নেপথ্যের কারিগর খান বাহাদুর আব্দুল করিমের ১৫৩তম জন্মদিন

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১১:৫৫:৪৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ১১২ বার

Oplus_16908288

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ কিশোরগঞ্জের শিক্ষা বিস্তারের ইতিহাসে যে কয়েকজন মানুষের অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে আছে, তাদের অন্যতম প্রখ্যাত আইনজীবী, রাজনীতিক ও শিক্ষানুরাগী খান বাহাদুর আব্দুল করিম। তাঁর হাত ধরেই যাত্রা শুরু হয়েছিল আজকের ঐতিহ্যবাহী গুরুদয়াল সরকারি কলেজের। আজ ১২ সেপ্টেম্বর তাঁর ১৫৩তম জন্মদিন।

গুরুদয়াল সরকারি কলেজের পূর্বনাম ছিল ‘কিশোরগঞ্জ কলেজ’। ১৯৪৩ সালে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী খান বাহাদুর আব্দুল করিম ও শিক্ষানুরাগী আইনজীবী জিল্লুর রহমানের পৃষ্ঠপোষকতায় ‘কিশোরগঞ্জ কলেজ’ নামে প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে রাখুয়াইল পাট গবেষণা কেন্দ্রের পাশে সিএন্ডবি’র ডাকবাংলোয় কলেজটির শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হতো। প্রতিষ্ঠাকালীন অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ড. ডি. এল. দাস।

কলেজ প্রতিষ্ঠার দুই বছর পর ১৯৪৫ সালে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক সংকট দূর করা এবং শিক্ষা কার্যক্রম সম্প্রসারণে এগিয়ে আসেন কৈবর্তরাজ গুরুদয়াল সরকার। তিনি বিনাশর্তে তৎকালীন ৫০ হাজার টাকা দান করেন। তাঁর দেওয়া অর্থে কলেজের নিজস্ব জমি অধিগ্রহণ ও ভবন নির্মাণের কাজ সম্পন্ন হয়। তাঁর এই অসামান্য অবদানের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে পরবর্তীতে ‘কিশোরগঞ্জ কলেজ’-এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘গুরুদয়াল কলেজ’।

একই বছর কলেজে স্নাতক শ্রেণির কার্যক্রম চালু হয়। পরবর্তীতে ১৯৪৮ সালে বিশিষ্ট বিজ্ঞানী সত্যেন বসুর পরামর্শে কলেজে বিজ্ঞান শাখা চালু করা হয়। ড. ডি. এল. দাসের পর অধ্যক্ষ ওয়াসীমুদ্দিন কলেজটির শিক্ষা ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। দীর্ঘ পথপরিক্রমায় ১৯৮০ সালে প্রতিষ্ঠানটি সরকারি কলেজ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

শিক্ষাবিদ ও রাজনীতিক খান বাহাদুর আব্দুল করিম
খান বাহাদুর আব্দুল করিম ১৮৭৩ সালের ১২ সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈতৃক নিবাস কিশোরগঞ্জ জেলার বাজিতপুর উপজেলার দিলালপুর ইউনিয়নের বাহেরনগর গ্রামে। তাঁর পূর্বপুরুষ হযরত শাহ তাজ মোহাম্মদ ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে বঙ্গদেশে এসেছিলেন। তাঁর পিতা মৌলভী আহমদ ছিলেন একজন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট এবং মা ছিলেন সৈয়দা সৈয়দুন্নেসা।

পিতার কর্মস্থল বরিশাল, সুধারাম ও ফরিদপুরে তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা জীবন কাটে। ১৮৯০ সালে ঢাকা মাদ্রাসা থেকে এন্ট্রান্স এবং ১৮৯২ সালে ঢাকা কলেজ থেকে এফ.এ পাস করেন। পরে কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে ১৮৯৫ সালে ইংরেজি সাহিত্যে বি.এ (সম্মান) পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জন করেন। ১৮৯৮ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.এল ডিগ্রি লাভ করেন তিনি।
১৮৯৯ সালে ঢাকা জজকোর্টে আইন ব্যবসা শুরু করেন খান বাহাদুর আব্দুল করিম। ১৯০৩ সালে কুমিল্লা জজকোর্টে পাবলিক প্রসিকিউটর হিসেবে যোগ দেন। ১৯২২ থেকে ১৯২৭ সাল পর্যন্ত তিনি ত্রিপুরা জেলা বোর্ডের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯২৬ থেকে ১৯৩০ সাল পর্যন্ত ছিলেন ভারতীয় আইনসভার কাউন্সিল অব স্টেটের সদস্য।
কাউন্সিল অব স্টেটের সদস্য থাকাকালে ১৯২৭ সালে দুইবার এবং ১৯২৮ সালে দুইবার দিল্লি ও সিমলা অধিবেশনে চেয়ারম্যানের অনুপস্থিতিতে চেয়ারম্যানের প্যানেলে অন্তর্ভুক্ত হন তিনি।

১৯৩০ সালে ভারতীয় আইনসভার সদস্য থাকাকালে ফরিদপুরে অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন। ১৯৩৭ সালে বেঙ্গল লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর ১৯৪১ সালে শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হকের নেতৃত্বাধীন অবিভক্ত বাংলার মন্ত্রিসভায় শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পান।

শিক্ষা বিস্তারে তাঁর অবদান ছিল বহুমাত্রিক। কিশোরগঞ্জে একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার উদ্যোগ তাঁর দূরদর্শিতা ও শিক্ষানুরাগের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। সেই উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় প্রতিষ্ঠিত ‘কিশোরগঞ্জ কলেজ’ পরবর্তীতে গুরুদয়াল কলেজ এবং আজকের গুরুদয়াল সরকারি কলেজ হিসেবে কিশোরগঞ্জের শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চার অন্যতম প্রধান বিদ্যাপীঠে পরিণত হয়েছে।

১৯৪৫ সালের ৩ মার্চ নিজ পৈতৃক নিবাস বাহেরনগরে মৃত্যুবরণ করেন খান বাহাদুর আব্দুল করিম। তবে তাঁর কর্ম ও শিক্ষা বিস্তারের অবদান আজও কিশোরগঞ্জের মানুষের কাছে স্মরণীয় হয়ে আছে। বিশেষ করে গুরুদয়াল সরকারি কলেজের ইতিহাসের সঙ্গে তাঁর নাম চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

নির্ভীক শিক্ষক নেতা আঙ্গুর ও চামড়া বন্দর ট্রাজেডি

কিশোরগঞ্জ কলেজ থেকে গুরুদয়াল কলেজ প্রতিষ্ঠার নেপথ্যের কারিগর খান বাহাদুর আব্দুল করিমের ১৫৩তম জন্মদিন

আপডেট টাইম : ১১:৫৫:৪৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ কিশোরগঞ্জের শিক্ষা বিস্তারের ইতিহাসে যে কয়েকজন মানুষের অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে আছে, তাদের অন্যতম প্রখ্যাত আইনজীবী, রাজনীতিক ও শিক্ষানুরাগী খান বাহাদুর আব্দুল করিম। তাঁর হাত ধরেই যাত্রা শুরু হয়েছিল আজকের ঐতিহ্যবাহী গুরুদয়াল সরকারি কলেজের। আজ ১২ সেপ্টেম্বর তাঁর ১৫৩তম জন্মদিন।

গুরুদয়াল সরকারি কলেজের পূর্বনাম ছিল ‘কিশোরগঞ্জ কলেজ’। ১৯৪৩ সালে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী খান বাহাদুর আব্দুল করিম ও শিক্ষানুরাগী আইনজীবী জিল্লুর রহমানের পৃষ্ঠপোষকতায় ‘কিশোরগঞ্জ কলেজ’ নামে প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে রাখুয়াইল পাট গবেষণা কেন্দ্রের পাশে সিএন্ডবি’র ডাকবাংলোয় কলেজটির শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হতো। প্রতিষ্ঠাকালীন অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ড. ডি. এল. দাস।

কলেজ প্রতিষ্ঠার দুই বছর পর ১৯৪৫ সালে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক সংকট দূর করা এবং শিক্ষা কার্যক্রম সম্প্রসারণে এগিয়ে আসেন কৈবর্তরাজ গুরুদয়াল সরকার। তিনি বিনাশর্তে তৎকালীন ৫০ হাজার টাকা দান করেন। তাঁর দেওয়া অর্থে কলেজের নিজস্ব জমি অধিগ্রহণ ও ভবন নির্মাণের কাজ সম্পন্ন হয়। তাঁর এই অসামান্য অবদানের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে পরবর্তীতে ‘কিশোরগঞ্জ কলেজ’-এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘গুরুদয়াল কলেজ’।

একই বছর কলেজে স্নাতক শ্রেণির কার্যক্রম চালু হয়। পরবর্তীতে ১৯৪৮ সালে বিশিষ্ট বিজ্ঞানী সত্যেন বসুর পরামর্শে কলেজে বিজ্ঞান শাখা চালু করা হয়। ড. ডি. এল. দাসের পর অধ্যক্ষ ওয়াসীমুদ্দিন কলেজটির শিক্ষা ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। দীর্ঘ পথপরিক্রমায় ১৯৮০ সালে প্রতিষ্ঠানটি সরকারি কলেজ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

শিক্ষাবিদ ও রাজনীতিক খান বাহাদুর আব্দুল করিম
খান বাহাদুর আব্দুল করিম ১৮৭৩ সালের ১২ সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈতৃক নিবাস কিশোরগঞ্জ জেলার বাজিতপুর উপজেলার দিলালপুর ইউনিয়নের বাহেরনগর গ্রামে। তাঁর পূর্বপুরুষ হযরত শাহ তাজ মোহাম্মদ ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে বঙ্গদেশে এসেছিলেন। তাঁর পিতা মৌলভী আহমদ ছিলেন একজন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট এবং মা ছিলেন সৈয়দা সৈয়দুন্নেসা।

পিতার কর্মস্থল বরিশাল, সুধারাম ও ফরিদপুরে তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা জীবন কাটে। ১৮৯০ সালে ঢাকা মাদ্রাসা থেকে এন্ট্রান্স এবং ১৮৯২ সালে ঢাকা কলেজ থেকে এফ.এ পাস করেন। পরে কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে ১৮৯৫ সালে ইংরেজি সাহিত্যে বি.এ (সম্মান) পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জন করেন। ১৮৯৮ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.এল ডিগ্রি লাভ করেন তিনি।
১৮৯৯ সালে ঢাকা জজকোর্টে আইন ব্যবসা শুরু করেন খান বাহাদুর আব্দুল করিম। ১৯০৩ সালে কুমিল্লা জজকোর্টে পাবলিক প্রসিকিউটর হিসেবে যোগ দেন। ১৯২২ থেকে ১৯২৭ সাল পর্যন্ত তিনি ত্রিপুরা জেলা বোর্ডের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯২৬ থেকে ১৯৩০ সাল পর্যন্ত ছিলেন ভারতীয় আইনসভার কাউন্সিল অব স্টেটের সদস্য।
কাউন্সিল অব স্টেটের সদস্য থাকাকালে ১৯২৭ সালে দুইবার এবং ১৯২৮ সালে দুইবার দিল্লি ও সিমলা অধিবেশনে চেয়ারম্যানের অনুপস্থিতিতে চেয়ারম্যানের প্যানেলে অন্তর্ভুক্ত হন তিনি।

১৯৩০ সালে ভারতীয় আইনসভার সদস্য থাকাকালে ফরিদপুরে অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন। ১৯৩৭ সালে বেঙ্গল লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর ১৯৪১ সালে শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হকের নেতৃত্বাধীন অবিভক্ত বাংলার মন্ত্রিসভায় শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পান।

শিক্ষা বিস্তারে তাঁর অবদান ছিল বহুমাত্রিক। কিশোরগঞ্জে একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার উদ্যোগ তাঁর দূরদর্শিতা ও শিক্ষানুরাগের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। সেই উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় প্রতিষ্ঠিত ‘কিশোরগঞ্জ কলেজ’ পরবর্তীতে গুরুদয়াল কলেজ এবং আজকের গুরুদয়াল সরকারি কলেজ হিসেবে কিশোরগঞ্জের শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চার অন্যতম প্রধান বিদ্যাপীঠে পরিণত হয়েছে।

১৯৪৫ সালের ৩ মার্চ নিজ পৈতৃক নিবাস বাহেরনগরে মৃত্যুবরণ করেন খান বাহাদুর আব্দুল করিম। তবে তাঁর কর্ম ও শিক্ষা বিস্তারের অবদান আজও কিশোরগঞ্জের মানুষের কাছে স্মরণীয় হয়ে আছে। বিশেষ করে গুরুদয়াল সরকারি কলেজের ইতিহাসের সঙ্গে তাঁর নাম চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবে।