ঢাকা ১০:৫৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ২১ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
নির্ভীক শিক্ষক নেতা আঙ্গুর ও চামড়া বন্দর ট্রাজেডি দৈনিক আজকের সারাদিনের ২২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে স্মৃতি পদক পেলেন সাংবাদিক মনোয়ার হোসাইন রনি হামলা-দখল-চাঁদাবাজি থামবে কিভাবে: রাজনীতিতে ভিন্নতা থাকলেও অপরাধ মিলেমিশে আইটি ক্যারিয়ারের প্রস্তুতি, শিক্ষার্থীদের নিয়ে ‘লগইন ইনটু ইন্ডাস্ট্রি নেক্সট’ টানা পাঁচদিনের ছুটি পাচ্ছেন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অটোরিকশায় রক্তাক্ত মহাসড়ক গণমাধ্যমের স্বাধীনতার সঙ্গে জনগণের অধিকার সুরক্ষার তাগিদ তথ্য প্রতিমন্ত্রীর কবর দেওয়ার কত দিন পর একই কবরে দাফন করা যাবে আওয়ামী লীগের সঙ্গে রাজনৈতিক পুনর্মিলনের সুযোগ নেই: ডেপুটি স্পিকার ৭ নভেম্বর সাধারণ ছুটি ঘোষণা

রুবেল কবেই আকাশের তারা, বাবা আজও খুঁজেন হাতটি তার

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১০:০০:০০ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ২০৬ বার

Oplus_16908288

রফিকুল ইসলামঃ “ষষ্ঠ শ্রেণির সেই চেনা ক্লাসরুম, শূন্য বেঞ্চের সারি, / আজও যেন ফিসফিসিয়ে শুধায়, “রুবেল গেছে বাড়ি?” / কাঁধের ওপর স্কুলের ব্যাগ, চোখেতে স্বপ্নের ঘোর, / হঠাৎ করেই নেমে এলো এক অমাবস্যার সুর।

বাবা কামালের নয়নের মণি, হালিমা মায়ের প্রাণ, / মেধার আলোয় ছড়িয়েছিল যে নিষ্পাপ এক ঘ্রাণ। / ১২ বছরের সেই হাসিমুখ, নম্র ও অতি ধীর, / ছায়াঘেরা গাঁয়ের আকাশ সেথা আজও নতশির।

মরণব্যাধির কালো মেঘ এলো, কেড়ে নিলো সব হাসি, / পিজির আইসিইউ-এর রুমে বাজলো বিদায় বাঁশি। / ৬৩ টি দিন আর রাত, মৃত্যুর সাথে রণ, / মা-বাবার বুকচেরা কান্না, প্রার্থনায় নিমগ্ন মন।

চিকিৎসকদের ক্লান্তিহীন চেষ্টা, শত চোখের জল, / সবকিছুকে বিদায় জানিয়ে থামলো কোলাহল। / নিভে গেল এক প্রদীপ্ত শিখা, ভাঙলো কত আশ, / বেদনার চাদরে ঢেকে গেল এক স্বপ্নিল আকাশ।

তুমি তো নও হারিয়ে যাওয়া, তুমি যে এক আলো, / ওপারের ওই শান্ত ভুবনে থেকো তুমি খুব ভালো। / কাফনের কাপড়ে ঢাকা দেহ, মাটিতে মিশেছে কায়া, /
হৃদয়পটে রবে চিরকাল রুবেলেরই ছায়া।”

বাবার সাথে রুবেলের একটি যুগলবন্দি ছবি গতকাল ১২ সেপ্টেম্বর’২৬ ফেসবুকে চোখে পড়ে। আজ ১৩ই সেপ্টেম্বর কমেন্টে পেলাম রুবেলের একক ছবি – হয়তো পঞ্চম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষার প্রস্তুতিকালীন ছবি হয়ে থাকবে, যা দেখে স্মৃতি হাতছানি দিয়ে যায়।

রুবেলের পুরো নাম মো. তৌফিকুর রহমান। ১৯৮২ সালে রুবেলের জন্ম এক সম্ভ্রান্ত ও স্নেহময় পরিবারে। পিতা অবসরপ্রাপ্ত বিশিষ্ট ব্যাংকার মো. শফিকুল ইসলাম কামাল। মাতা মোছা. হালিমা খাতুন। সময়ের ব্যবধানে হালিমা খাতুনও স্বামী শফিকুর রহমান কামালকে একা ফেলে রবের ডাকে সাড়া দিয়ে বড় মায়া করে একমাত্র ছেলে রুবেলের কাছে চলে যান।

রুবেলের গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলার মহিষারকান্দি গ্রামে। দাদা শিক্ষানুরাগী মো. আজিজুর রহমান। রুবেলের বেড়ে ওঠা ও প্রাইমারি পড়াশোনা নতুন বগাদিয়া গ্রামের নানার বাড়িতে। তার নানা মো. আবদুল আলী ভুঁইয়া একসময় ছিলেন গোপদিঘী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান। রুবেলের নানার বাড়ি আর রুবেলের বাবার মামার বাড়ি একই।

১৯৯৩ সালের ১৭ই এপ্রিল ব্রেন টিউমারে আক্রান্ত হয়ে পিজির আইসিইউ’তে ৬৩ দিন মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে চিরবিদায় নেয় রুবেল। সে ছিল কিশোরগঞ্জ সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের ৬ষ্ঠ শ্রেণির একজন মেধাবী ছাত্র এবং বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী।

কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলা গোপদিঘী ইউনিয়নে অবস্থিত বগাদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ১৯৯২ সালে অনুষ্ঠেয় প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায় ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পায় রুবেল। প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষার মেধার ভিত্তিতে এই বৃত্তি নির্ধারিত হয়।

তৌফিকুর রহমান রুবেলের আরেকটি পরিচয় রয়েছে। তা হলো, কিশোরগঞ্জ জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট মো. জিল্লুর রহমান তার জেঠা। রুবেল জেলা শহরের নগুয়ায় পৈতৃক বাসায় থেকে পড়াশোনা করতো।

পিতা মো. শফিকুর রহমান কামাল এবং মাতা মোছা. হালিমা খাতুন বুক ভরা আশা আর গভীর মমতা ও ভালোবাসা দিয়ে আগলে রেখেছিলেন তাদের এই নয়নের মণিকে। শফিকুর রহমান কামাল তার সন্তানের মাঝে দেখতে পেয়েছিলেন এক উজ্জ্বল ভবিষ্যতের প্রতিচ্ছবি, আর মা হালিমা খাতুন তার সমস্ত মাতৃত্ব উজার করে দিয়েছিলেন রুবেলের সুন্দর ও অকৃত্রিম লালন-পালনে। রুবেল ছিল তাদের ঘর আলোকিত করা এক পবিত্র সত্তা।

শৈশব থেকেই রুবেলের শান্ত, নম্র ও অতি বিনয়ী স্বভাবের কারণে সে খুব দ্রুতই শিক্ষক, সহপাঠী এবং পাড়া-প্রতিবেশীদের মনের মণিকোঠায় জায়গা করে নেয়। তার মিষ্টি হাসি আর অমায়িক আচরণে মুগ্ধ ছিল সবাই।

রুবেলের এই অকাল প্রস্থান কেবল একটি পরিবারের প্রদীপ নিভিয়ে দেয়নি কিংবা কেবল তার নিজের পরিবারকেই নিঃস্ব করেনি, বরং তৎকালীন সময়ে শিক্ষার আলো ছড়ানো এক সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎকে অঙ্কুরেই ধূলিসাৎ করে দিয়েছিল।

কালের অমোঘ নিয়মে পৃথিবী থেকে প্রতিদিন কত মানুষই না বিদায় নেয়। কিছু মৃত্যু স্বাভাবিক, কিছু মৃত্যু আকস্মিক। কিন্তু কিছু মৃত্যু এমন এক গভীর ক্ষত ও শূন্যতার সৃষ্টি করে, যা দশকের পর দশক পেরিয়ে গেলেও মানুষের মন থেকে মুছে যায় না।

১৯৯৩ সালের এক বিষাদময় দিনে কিশোরগঞ্জের আকাশ থেকে ঝরে পড়েছিল এমনই এক উজ্জ্বল নক্ষত্র—তৌফিকুর রহমান রুবেল। মাত্র ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ুয়া এই মেধাবী কিশোরের জীবনপ্রদীপ কেড়ে নিয়েছিল মরণব্যাধি ব্রেন টিউমার। তৎকালীন পিজি হাসপাতালের (বর্তমানে বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়) নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে (আইসিইউ) দীর্ঘ ৬৩ দিন ধরে মৃত্যুর সাথে তার সেই অসম লড়াই আজও প্রিয়জনদের স্মৃতিতে এক বেদনাবিধুর অধ্যায় হয়ে আছে।

তৌফিকুর রহমান রুবেল ছিল এক প্রাণোচ্ছল এবং চটপটে এক অসাধারণ মেধার অধিকারী কিশোর। কিশোরগঞ্জ সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের ঐতিহ্যবাহী প্রাঙ্গণে ৬ষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র হিসেবে তার উপস্থিতি ছিল অনন্য। সহপাঠী, শিক্ষক কিংবা প্রতিবেশী—সবার কাছেই রুবেল ছিল এক প্রিয় নাম। পড়াশোনায় তার গভীর মনোযোগ এবং ক্লাসের যেকোনো কঠিন পড়া সহজে আয়ত্ত করার ক্ষমতা শিক্ষকদের মুগ্ধ করতো।

শুধু পড়াশোনাতেই নয়, তার নম্র আচরণ, মার্জিত স্বভাব, মিষ্টি হাসি এবং সুন্দর মুখাবয়ব তাকে সবার থেকে আলাদা করে তুলেছিল। অনেকেই আশা করেছিলেন, এই ছেলেটি বড় হয়ে একদিন দেশের মুখ উজ্জ্বল করবে, মা-বাবার গর্ব হয়ে উঠবে। কিন্তু নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাসে সেই সম্ভাবনা অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে গেল।

সবকিছু ঠিকঠাকই চলছিল। প্রতিদিনের মতো রুবেল স্কুলে যাচ্ছিল, বন্ধুদের সাথে খেলছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই তার শরীরে কিছু অস্বাভাবিক লক্ষণ দেখা দিতে শুরু করে। তীব্র মাথাব্যথা, বমি ভাব এবং মাঝেমধ্যে দৃষ্টিশক্তির সাময়িক বিভ্রম পরিবারকে চিন্তিত করে তোলে। স্থানীয় চিকিৎসকদের দেখানোর পর যখন কোনো সুনির্দিষ্ট প্রতিকার মিলছিল না, তখন উন্নত চিকিৎসার জন্য রুবেকে ঢাকায় আনা হয়।

ঢাকার তৎকালীন পিজি হাসপাতালে প্রখ্যাত নিউরো সার্জন অধ্যাপক ডা. রশিদ উদ্দিনের তত্ত্বাবধানে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর যে নির্মম সত্যটি উদ্ঘাটিত হয়, তা ছিল বজ্রপাতের মতো—রুবেলের মস্তিষ্কে বাসা বেঁধেছে এক মারাত্মক ব্রেন টিউমার। একটি ১২-১৩ বছরের কিশোরের শরীরে এই জটিল রোগ ধরা পড়ার খবরটি তার পরিবারকে এক গভীর অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেয়।

রোগ নির্ণয়ের পর রুবেলকে ভর্তি করা হয় পিজি হাসপাতালের আইসিইউতে। শুরু হয় এক দীর্ঘ এবং অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক চিকিৎসা প্রক্রিয়া। আইসিইউ-এর সেই চার দেয়ালের মাঝে, কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাসের যন্ত্র আর অসংখ্য নল-পাটি পরিবেষ্টিত হয়ে রুবেল কাটিয়েছিল দীর্ঘ ৬৩ দিন। একটি ছোট্ট শিশুর জন্য সেই পরিবেশ এবং শারীরিক কষ্ট কতটা যে দুঃসহ ছিল!

হাসপাতালের সেই কক্ষটির বাইরে প্রতিদিন জড়ো হতো তার স্বজনদের চোখের জল। তার বাবা-মা, আত্মীয়-স্বজন এবং শুভাকাঙ্ক্ষীদের বিনিদ্র রজনী যাপন। সবাই আল্লাহর দরবারে হাত তুলে প্রার্থনা করতেন যেন অলৌকিক কিছু ঘটে, যেন রুবেল আবার সুস্থ হয়ে তার চিরচেনা স্কুলের মাঠে ফিরে আসে।

আইসিইউ’র চিকিৎসকেরাও তাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু ব্রেন টিউমারের সেই তীব্র থাবা রুবেলের কোমল শরীরকে দিন দিন নিস্তেজ করে দিচ্ছিল। ৬৩ দিনের প্রতিটি দিন ছিল আশা আর নিরাশার দোলাচলে এক চরম উৎকণ্ঠার নাম।

রুবেল ছিল আমার নিকটাত্মীয়। ১৩ দিন রুবেলের স্বাস্থ্যসেবায় সময় দিতে পেরে আজও আত্মতৃপ্তি বোধ করি। সাথে ছিলেন রুবেলের কাকা মো. জামালুর রহমান জামাল ভাই। তিনি সবেমাত্র বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে চূড়ান্ত সুপারিশপ্রাপ্ত হন (পরে গুরুদয়াল সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ)। এই বিষাদময় পরিবেশেও স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে পত্রিকার লেখা তৈরির কাজ সম্পন্ন করতে হয়েছে।

অবশেষে চিকিৎসকদের সমস্ত চেষ্টা এবং লাখো মানুষের প্রার্থনা ব্যর্থ করে দিয়ে ১৯৯৩ সালের ১৭ জুলাই রুবেল শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে। আইসিইউ’র মনিটরের সরল রেখাটি যখন স্থির হয়ে গেল, তখন অবসান ঘটল একটি দীর্ঘ লড়াইয়ের। মাত্র ৬ষ্ঠ শ্রেণিতেই থেমে গেল একটি অসাধারণ জীবনের গল্প।

রুবেলের মৃত্যুর খবর যখন কিশোরগঞ্জে এবং তার গ্রামের বাড়ি ও মামার বাড়িতে পৌঁছায়, তখন পুরো এলাকায় নেমে আসে এক শোকের ছায়া। কিশোরগঞ্জ সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরাও স্তব্ধ হয়ে যান। স্কুলের সেই চঞ্চল ছেলেটি যে আর কোনোদিন ক্লাসের প্রথম সারির বেঞ্চে এসে বসবে না, এই সত্যটি কেউ মেনে নিতে পারছিল না।

রুবেলের মরদেহ যখন কিশোরগঞ্জে নিয়ে আসা হয়, তখন তাকে শেষবারের মতো দেখতে ঢল নেমেছিল মানুষের। পরে মিঠামইন উপজেলা মহিষারকান্দি গ্রামের ‘মৌলভীবাড়ি নিজামিয়া পারিবারিক কবরস্থানে’ সমাহিত করা হয় তাকে।

আজ বহু বছর পেরিয়ে গেছে। ১৯৯৩ সালের সেই বিয়োগান্তক ঘটনার পর ক্যালেন্ডারের পাতা থেকে অনেকগুলো বছর ঝরে গেছে। রুবেলের সহপাঠীরা আজ হয়তো সমাজের বিভিন্ন স্তরে প্রতিষ্ঠিত, কেউ ডাক্তার, কেউ ইঞ্জিনিয়ার, কেউবা দেশের বাইরে সুপ্রতিষ্ঠিত। কিন্তু কিশোরগঞ্জ সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের তৎকালীন ব্যাচের ছাত্র বা শিক্ষকদের মনে রুবেল আজও এক অম্লান স্মৃতি।

তৌফিকুর রহমান রুবেল আজ পৃথিবীর সব দুঃখ-কষ্ট, রোগ-শোক আর আইসিইউ-এর যান্ত্রিক কোলাহলের ঊর্ধ্বে। রুবেলের স্মৃতিকে ধরে রাখার জন্য হয়তো বড় কোনো স্মারক তৈরি হয়নি; কিন্তু যারা তাকে চিনতেন, তাদের হৃদয়ের মণিকোঠায় সে আজও বেঁচে আছে এক কোমল আবেগের নাম হয়ে।

তার এই অসম যুদ্ধ আমাদের শেখায় জীবন কতটা অনিশ্চিত এবং একটি শিশুর মেধা ও জীবন কতটা মূল্যবান।

তৌফিকুর রহমান রুবেল আজ আমাদের মাঝে নেই তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে, কিন্তু তার রেখে যাওয়া সেই ৬৩ দিনের লড়াইয়ের গল্প এবং তার মেধার স্মৃতি আজও এক উজ্জ্বল অথচ বেদনাবিধুর অধ্যায় হয়ে থাকবে।

সে হয়তো পৃথিবীর বুকে দীর্ঘায়ু পায়নি, কিন্তু তার সংক্ষিপ্ত জীবন আমাদের শিখিয়ে দিয়ে গেছে জীবনের মূল্য কতখানি।

সময় তার নিজের নিয়মে বয়ে গেছে। পিজি হাসপাতালের সেই আইসিইউ’র দেয়াল হয়তো আজ নতুন রঙে সেজেছে, বদলে গেছে চারপাশ। কিন্তু দীর্ঘ তেত্রিশটি বছর ধরে একটুও বদলায়নি শফিকুর রহমান কামালের শূন্য চোখের চাতক দৃষ্টি। জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়েও এই বয়োজ্যেষ্ঠ বাবা আজও প্রতিদিন দরজায় বসে ছেলের পায়ের আওয়াজ খুঁজেন। রুবেল হয়তো আজ দূর আকাশের কোনো এক উজ্জ্বল তারা, কিন্তু এই মাটির বুকে আজও জীবন্ত হয়ে আছে এক বাবার অন্তহীন, করুণ অপেক্ষা।

“দিন ফুরিয়ে রাত নেমে আসে, মুছে যায় কত চেনা ছবি, / বাবার দীর্ঘ প্রতীক্ষার গল্পে আজও মেলেনি কোনো সবি। / তেত্রিশ বছর ধরে ক্ষযে যাওয়া বুকটায় জমছে কেবলই পাথরভার, / রুবেল কবে আকাশের তারা, বাবা আজও খুঁজেন হাতটি তার।”

লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও কলামিস্ট;
সহযোগী সম্পাদক, আজকের সূর্যোদয়, ঢাকা

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

নির্ভীক শিক্ষক নেতা আঙ্গুর ও চামড়া বন্দর ট্রাজেডি

রুবেল কবেই আকাশের তারা, বাবা আজও খুঁজেন হাতটি তার

আপডেট টাইম : ১০:০০:০০ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রফিকুল ইসলামঃ “ষষ্ঠ শ্রেণির সেই চেনা ক্লাসরুম, শূন্য বেঞ্চের সারি, / আজও যেন ফিসফিসিয়ে শুধায়, “রুবেল গেছে বাড়ি?” / কাঁধের ওপর স্কুলের ব্যাগ, চোখেতে স্বপ্নের ঘোর, / হঠাৎ করেই নেমে এলো এক অমাবস্যার সুর।

বাবা কামালের নয়নের মণি, হালিমা মায়ের প্রাণ, / মেধার আলোয় ছড়িয়েছিল যে নিষ্পাপ এক ঘ্রাণ। / ১২ বছরের সেই হাসিমুখ, নম্র ও অতি ধীর, / ছায়াঘেরা গাঁয়ের আকাশ সেথা আজও নতশির।

মরণব্যাধির কালো মেঘ এলো, কেড়ে নিলো সব হাসি, / পিজির আইসিইউ-এর রুমে বাজলো বিদায় বাঁশি। / ৬৩ টি দিন আর রাত, মৃত্যুর সাথে রণ, / মা-বাবার বুকচেরা কান্না, প্রার্থনায় নিমগ্ন মন।

চিকিৎসকদের ক্লান্তিহীন চেষ্টা, শত চোখের জল, / সবকিছুকে বিদায় জানিয়ে থামলো কোলাহল। / নিভে গেল এক প্রদীপ্ত শিখা, ভাঙলো কত আশ, / বেদনার চাদরে ঢেকে গেল এক স্বপ্নিল আকাশ।

তুমি তো নও হারিয়ে যাওয়া, তুমি যে এক আলো, / ওপারের ওই শান্ত ভুবনে থেকো তুমি খুব ভালো। / কাফনের কাপড়ে ঢাকা দেহ, মাটিতে মিশেছে কায়া, /
হৃদয়পটে রবে চিরকাল রুবেলেরই ছায়া।”

বাবার সাথে রুবেলের একটি যুগলবন্দি ছবি গতকাল ১২ সেপ্টেম্বর’২৬ ফেসবুকে চোখে পড়ে। আজ ১৩ই সেপ্টেম্বর কমেন্টে পেলাম রুবেলের একক ছবি – হয়তো পঞ্চম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষার প্রস্তুতিকালীন ছবি হয়ে থাকবে, যা দেখে স্মৃতি হাতছানি দিয়ে যায়।

রুবেলের পুরো নাম মো. তৌফিকুর রহমান। ১৯৮২ সালে রুবেলের জন্ম এক সম্ভ্রান্ত ও স্নেহময় পরিবারে। পিতা অবসরপ্রাপ্ত বিশিষ্ট ব্যাংকার মো. শফিকুল ইসলাম কামাল। মাতা মোছা. হালিমা খাতুন। সময়ের ব্যবধানে হালিমা খাতুনও স্বামী শফিকুর রহমান কামালকে একা ফেলে রবের ডাকে সাড়া দিয়ে বড় মায়া করে একমাত্র ছেলে রুবেলের কাছে চলে যান।

রুবেলের গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলার মহিষারকান্দি গ্রামে। দাদা শিক্ষানুরাগী মো. আজিজুর রহমান। রুবেলের বেড়ে ওঠা ও প্রাইমারি পড়াশোনা নতুন বগাদিয়া গ্রামের নানার বাড়িতে। তার নানা মো. আবদুল আলী ভুঁইয়া একসময় ছিলেন গোপদিঘী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান। রুবেলের নানার বাড়ি আর রুবেলের বাবার মামার বাড়ি একই।

১৯৯৩ সালের ১৭ই এপ্রিল ব্রেন টিউমারে আক্রান্ত হয়ে পিজির আইসিইউ’তে ৬৩ দিন মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে চিরবিদায় নেয় রুবেল। সে ছিল কিশোরগঞ্জ সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের ৬ষ্ঠ শ্রেণির একজন মেধাবী ছাত্র এবং বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী।

কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলা গোপদিঘী ইউনিয়নে অবস্থিত বগাদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ১৯৯২ সালে অনুষ্ঠেয় প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায় ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পায় রুবেল। প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষার মেধার ভিত্তিতে এই বৃত্তি নির্ধারিত হয়।

তৌফিকুর রহমান রুবেলের আরেকটি পরিচয় রয়েছে। তা হলো, কিশোরগঞ্জ জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট মো. জিল্লুর রহমান তার জেঠা। রুবেল জেলা শহরের নগুয়ায় পৈতৃক বাসায় থেকে পড়াশোনা করতো।

পিতা মো. শফিকুর রহমান কামাল এবং মাতা মোছা. হালিমা খাতুন বুক ভরা আশা আর গভীর মমতা ও ভালোবাসা দিয়ে আগলে রেখেছিলেন তাদের এই নয়নের মণিকে। শফিকুর রহমান কামাল তার সন্তানের মাঝে দেখতে পেয়েছিলেন এক উজ্জ্বল ভবিষ্যতের প্রতিচ্ছবি, আর মা হালিমা খাতুন তার সমস্ত মাতৃত্ব উজার করে দিয়েছিলেন রুবেলের সুন্দর ও অকৃত্রিম লালন-পালনে। রুবেল ছিল তাদের ঘর আলোকিত করা এক পবিত্র সত্তা।

শৈশব থেকেই রুবেলের শান্ত, নম্র ও অতি বিনয়ী স্বভাবের কারণে সে খুব দ্রুতই শিক্ষক, সহপাঠী এবং পাড়া-প্রতিবেশীদের মনের মণিকোঠায় জায়গা করে নেয়। তার মিষ্টি হাসি আর অমায়িক আচরণে মুগ্ধ ছিল সবাই।

রুবেলের এই অকাল প্রস্থান কেবল একটি পরিবারের প্রদীপ নিভিয়ে দেয়নি কিংবা কেবল তার নিজের পরিবারকেই নিঃস্ব করেনি, বরং তৎকালীন সময়ে শিক্ষার আলো ছড়ানো এক সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎকে অঙ্কুরেই ধূলিসাৎ করে দিয়েছিল।

কালের অমোঘ নিয়মে পৃথিবী থেকে প্রতিদিন কত মানুষই না বিদায় নেয়। কিছু মৃত্যু স্বাভাবিক, কিছু মৃত্যু আকস্মিক। কিন্তু কিছু মৃত্যু এমন এক গভীর ক্ষত ও শূন্যতার সৃষ্টি করে, যা দশকের পর দশক পেরিয়ে গেলেও মানুষের মন থেকে মুছে যায় না।

১৯৯৩ সালের এক বিষাদময় দিনে কিশোরগঞ্জের আকাশ থেকে ঝরে পড়েছিল এমনই এক উজ্জ্বল নক্ষত্র—তৌফিকুর রহমান রুবেল। মাত্র ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ুয়া এই মেধাবী কিশোরের জীবনপ্রদীপ কেড়ে নিয়েছিল মরণব্যাধি ব্রেন টিউমার। তৎকালীন পিজি হাসপাতালের (বর্তমানে বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়) নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে (আইসিইউ) দীর্ঘ ৬৩ দিন ধরে মৃত্যুর সাথে তার সেই অসম লড়াই আজও প্রিয়জনদের স্মৃতিতে এক বেদনাবিধুর অধ্যায় হয়ে আছে।

তৌফিকুর রহমান রুবেল ছিল এক প্রাণোচ্ছল এবং চটপটে এক অসাধারণ মেধার অধিকারী কিশোর। কিশোরগঞ্জ সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের ঐতিহ্যবাহী প্রাঙ্গণে ৬ষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র হিসেবে তার উপস্থিতি ছিল অনন্য। সহপাঠী, শিক্ষক কিংবা প্রতিবেশী—সবার কাছেই রুবেল ছিল এক প্রিয় নাম। পড়াশোনায় তার গভীর মনোযোগ এবং ক্লাসের যেকোনো কঠিন পড়া সহজে আয়ত্ত করার ক্ষমতা শিক্ষকদের মুগ্ধ করতো।

শুধু পড়াশোনাতেই নয়, তার নম্র আচরণ, মার্জিত স্বভাব, মিষ্টি হাসি এবং সুন্দর মুখাবয়ব তাকে সবার থেকে আলাদা করে তুলেছিল। অনেকেই আশা করেছিলেন, এই ছেলেটি বড় হয়ে একদিন দেশের মুখ উজ্জ্বল করবে, মা-বাবার গর্ব হয়ে উঠবে। কিন্তু নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাসে সেই সম্ভাবনা অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে গেল।

সবকিছু ঠিকঠাকই চলছিল। প্রতিদিনের মতো রুবেল স্কুলে যাচ্ছিল, বন্ধুদের সাথে খেলছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই তার শরীরে কিছু অস্বাভাবিক লক্ষণ দেখা দিতে শুরু করে। তীব্র মাথাব্যথা, বমি ভাব এবং মাঝেমধ্যে দৃষ্টিশক্তির সাময়িক বিভ্রম পরিবারকে চিন্তিত করে তোলে। স্থানীয় চিকিৎসকদের দেখানোর পর যখন কোনো সুনির্দিষ্ট প্রতিকার মিলছিল না, তখন উন্নত চিকিৎসার জন্য রুবেকে ঢাকায় আনা হয়।

ঢাকার তৎকালীন পিজি হাসপাতালে প্রখ্যাত নিউরো সার্জন অধ্যাপক ডা. রশিদ উদ্দিনের তত্ত্বাবধানে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর যে নির্মম সত্যটি উদ্ঘাটিত হয়, তা ছিল বজ্রপাতের মতো—রুবেলের মস্তিষ্কে বাসা বেঁধেছে এক মারাত্মক ব্রেন টিউমার। একটি ১২-১৩ বছরের কিশোরের শরীরে এই জটিল রোগ ধরা পড়ার খবরটি তার পরিবারকে এক গভীর অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেয়।

রোগ নির্ণয়ের পর রুবেলকে ভর্তি করা হয় পিজি হাসপাতালের আইসিইউতে। শুরু হয় এক দীর্ঘ এবং অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক চিকিৎসা প্রক্রিয়া। আইসিইউ-এর সেই চার দেয়ালের মাঝে, কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাসের যন্ত্র আর অসংখ্য নল-পাটি পরিবেষ্টিত হয়ে রুবেল কাটিয়েছিল দীর্ঘ ৬৩ দিন। একটি ছোট্ট শিশুর জন্য সেই পরিবেশ এবং শারীরিক কষ্ট কতটা যে দুঃসহ ছিল!

হাসপাতালের সেই কক্ষটির বাইরে প্রতিদিন জড়ো হতো তার স্বজনদের চোখের জল। তার বাবা-মা, আত্মীয়-স্বজন এবং শুভাকাঙ্ক্ষীদের বিনিদ্র রজনী যাপন। সবাই আল্লাহর দরবারে হাত তুলে প্রার্থনা করতেন যেন অলৌকিক কিছু ঘটে, যেন রুবেল আবার সুস্থ হয়ে তার চিরচেনা স্কুলের মাঠে ফিরে আসে।

আইসিইউ’র চিকিৎসকেরাও তাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু ব্রেন টিউমারের সেই তীব্র থাবা রুবেলের কোমল শরীরকে দিন দিন নিস্তেজ করে দিচ্ছিল। ৬৩ দিনের প্রতিটি দিন ছিল আশা আর নিরাশার দোলাচলে এক চরম উৎকণ্ঠার নাম।

রুবেল ছিল আমার নিকটাত্মীয়। ১৩ দিন রুবেলের স্বাস্থ্যসেবায় সময় দিতে পেরে আজও আত্মতৃপ্তি বোধ করি। সাথে ছিলেন রুবেলের কাকা মো. জামালুর রহমান জামাল ভাই। তিনি সবেমাত্র বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে চূড়ান্ত সুপারিশপ্রাপ্ত হন (পরে গুরুদয়াল সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ)। এই বিষাদময় পরিবেশেও স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে পত্রিকার লেখা তৈরির কাজ সম্পন্ন করতে হয়েছে।

অবশেষে চিকিৎসকদের সমস্ত চেষ্টা এবং লাখো মানুষের প্রার্থনা ব্যর্থ করে দিয়ে ১৯৯৩ সালের ১৭ জুলাই রুবেল শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে। আইসিইউ’র মনিটরের সরল রেখাটি যখন স্থির হয়ে গেল, তখন অবসান ঘটল একটি দীর্ঘ লড়াইয়ের। মাত্র ৬ষ্ঠ শ্রেণিতেই থেমে গেল একটি অসাধারণ জীবনের গল্প।

রুবেলের মৃত্যুর খবর যখন কিশোরগঞ্জে এবং তার গ্রামের বাড়ি ও মামার বাড়িতে পৌঁছায়, তখন পুরো এলাকায় নেমে আসে এক শোকের ছায়া। কিশোরগঞ্জ সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরাও স্তব্ধ হয়ে যান। স্কুলের সেই চঞ্চল ছেলেটি যে আর কোনোদিন ক্লাসের প্রথম সারির বেঞ্চে এসে বসবে না, এই সত্যটি কেউ মেনে নিতে পারছিল না।

রুবেলের মরদেহ যখন কিশোরগঞ্জে নিয়ে আসা হয়, তখন তাকে শেষবারের মতো দেখতে ঢল নেমেছিল মানুষের। পরে মিঠামইন উপজেলা মহিষারকান্দি গ্রামের ‘মৌলভীবাড়ি নিজামিয়া পারিবারিক কবরস্থানে’ সমাহিত করা হয় তাকে।

আজ বহু বছর পেরিয়ে গেছে। ১৯৯৩ সালের সেই বিয়োগান্তক ঘটনার পর ক্যালেন্ডারের পাতা থেকে অনেকগুলো বছর ঝরে গেছে। রুবেলের সহপাঠীরা আজ হয়তো সমাজের বিভিন্ন স্তরে প্রতিষ্ঠিত, কেউ ডাক্তার, কেউ ইঞ্জিনিয়ার, কেউবা দেশের বাইরে সুপ্রতিষ্ঠিত। কিন্তু কিশোরগঞ্জ সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের তৎকালীন ব্যাচের ছাত্র বা শিক্ষকদের মনে রুবেল আজও এক অম্লান স্মৃতি।

তৌফিকুর রহমান রুবেল আজ পৃথিবীর সব দুঃখ-কষ্ট, রোগ-শোক আর আইসিইউ-এর যান্ত্রিক কোলাহলের ঊর্ধ্বে। রুবেলের স্মৃতিকে ধরে রাখার জন্য হয়তো বড় কোনো স্মারক তৈরি হয়নি; কিন্তু যারা তাকে চিনতেন, তাদের হৃদয়ের মণিকোঠায় সে আজও বেঁচে আছে এক কোমল আবেগের নাম হয়ে।

তার এই অসম যুদ্ধ আমাদের শেখায় জীবন কতটা অনিশ্চিত এবং একটি শিশুর মেধা ও জীবন কতটা মূল্যবান।

তৌফিকুর রহমান রুবেল আজ আমাদের মাঝে নেই তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে, কিন্তু তার রেখে যাওয়া সেই ৬৩ দিনের লড়াইয়ের গল্প এবং তার মেধার স্মৃতি আজও এক উজ্জ্বল অথচ বেদনাবিধুর অধ্যায় হয়ে থাকবে।

সে হয়তো পৃথিবীর বুকে দীর্ঘায়ু পায়নি, কিন্তু তার সংক্ষিপ্ত জীবন আমাদের শিখিয়ে দিয়ে গেছে জীবনের মূল্য কতখানি।

সময় তার নিজের নিয়মে বয়ে গেছে। পিজি হাসপাতালের সেই আইসিইউ’র দেয়াল হয়তো আজ নতুন রঙে সেজেছে, বদলে গেছে চারপাশ। কিন্তু দীর্ঘ তেত্রিশটি বছর ধরে একটুও বদলায়নি শফিকুর রহমান কামালের শূন্য চোখের চাতক দৃষ্টি। জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়েও এই বয়োজ্যেষ্ঠ বাবা আজও প্রতিদিন দরজায় বসে ছেলের পায়ের আওয়াজ খুঁজেন। রুবেল হয়তো আজ দূর আকাশের কোনো এক উজ্জ্বল তারা, কিন্তু এই মাটির বুকে আজও জীবন্ত হয়ে আছে এক বাবার অন্তহীন, করুণ অপেক্ষা।

“দিন ফুরিয়ে রাত নেমে আসে, মুছে যায় কত চেনা ছবি, / বাবার দীর্ঘ প্রতীক্ষার গল্পে আজও মেলেনি কোনো সবি। / তেত্রিশ বছর ধরে ক্ষযে যাওয়া বুকটায় জমছে কেবলই পাথরভার, / রুবেল কবে আকাশের তারা, বাবা আজও খুঁজেন হাতটি তার।”

লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও কলামিস্ট;
সহযোগী সম্পাদক, আজকের সূর্যোদয়, ঢাকা