ঢাকা ০৪:২০ অপরাহ্ন, সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৬ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
সেবার হাত বাড়িয়ে প্রশংসার শীর্ষে মিঠামইনের ওসি মনোয়ার সরকার আ.লীগের অপতৎপরতায় শঙ্কিত নয়: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী উপহার কেনার আগে যে ৭টি বিষয় মনে রাখা জরুরি চীনে ৩০ দেশের রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের গণমাধ্যম সহযোগিতা সেমিনার আগামী বছরের জানুয়ারিতে হতে পারে ইউপি নির্বাচন: ইসি মাছউদ জাতিসংঘে বাংলাদেশের নতুন গণতান্ত্রিক যাত্রা ও রোহিঙ্গা সংকট তুলে ধরবেন প্রধানমন্ত্রী সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারে বাড়ল ২০ টাকা ইমরান খানের বোনকে গ্রেপ্তার, ২৭ সেপ্টেম্বরের বিক্ষোভ ঘিরে উত্তেজনা চীনা নাগরিকের ২.৫ কেজি সোনা উদ্ধার, আনসারের বিচক্ষণতায় পাচারচেষ্টা নস্যাৎ জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় এমপি নজরুল ও তার প্রথম স্ত্রী

সেবার হাত বাড়িয়ে প্রশংসার শীর্ষে মিঠামইনের ওসি মনোয়ার

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ০৩:৪৫:৩০ অপরাহ্ন, সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ১২ বার

রফিকুল ইসলামঃ কিশোরগঞ্জের মিঠামইনে মাদক ব্যবসায়ী আর ইভটিজারদের ‘স্বর্গরাজ্যে’ হঠাৎ করেই যেন জলবায়ু পরিবর্তন শুরু হয়েছে। হাওয়া বদলের এই ঝোড়ো হাওয়া বইয়ে দিয়েছেন মিঠামইন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনোয়ার মোহাম্মদ। তিনি জানান, কাজ করা তার নেশা।

তিনি প্রচলিত ঢিলেঢালা টেবিল-ডিউটির খোলস ভেঙে তিনি ব্যতিক্রমী অ্যাকশনে মাঠে নামলেন, তখন চেনা অপরাধীদের চেনা সমীকরণগুলো এক নিমেষেই ওলটপালট হয়ে গেল।

হাওরের শান্ত জলরাশিতে মিশে থাকা মাদক ও ইভটিজিংয়ের মতো বিষাক্ত ক্ষতগুলোকে উপড়ে ফেলতে তার এই সময়োপযোগী ও প্রশংসনীয় উদ্যোগ যেমন জনমনে স্বস্তি এনেছে, ঠিক তেমনি কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছে অপরাধচক্রের মেরুদণ্ডে।

“পথে ঘাটে দিনে রাতে, চলতে চাই নিরাপদে”—এই দৃঢ় প্রত্যয়কে ধারণ করে কিশোরগঞ্জের মিঠামইন থানা এলাকার আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় এক অভূতপূর্ব ও ব্যতিক্রমী জাগরণ সৃষ্টি করেছেন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনোয়ার মোহাম্মদ।

প্রত্যন্ত হাওরাঞ্চলের সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তার এই নির্ভীক প্রচারণা ও দূরদর্শী পদক্ষেপ সর্বস্তরের মানুষের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।

নদী ও হাওরবেষ্টিত মিঠামইন উপজেলার প্রতিটি প্রান্তে অপরাধের গ্রাফ শূন্যে নামিয়ে আনতে দিন-রাত নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন ওসি মনোয়ার মোহাম্মদ। মাদক, জুয়া, কিশোর গ্যাং এবং যেকোনো ধরনের সামাজিক বিশৃঙ্খলার বিরুদ্ধে তিনি গড়ে তুলেছেন এক দুর্ভেদ্য প্রাচীর। সাধারণ পথচারী থেকে শুরু করে গভীর রাতে চলাচলকারী শ্রমজীবী মানুষ যেন বুক ফুলিয়ে নির্ভয়ে চলাচল করতে পারেন, সেজন্য তার নির্দেশে পুলিশি টহল ও নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।

চোর-ডাকাত বা অপরাধীদের মনে যেমন তার এই উদ্যোগ তীব্র ভীতি সঞ্চার করেছে, তেমনি সাধারণ নাগরিকদের মনে ফিরিয়ে এনেছে স্বস্তি ও গভীর আস্থা।

মনোয়ার মোহাম্মদের এই প্রচারণার সবচেয়ে সুন্দর দিক হলো—তিনি পুলিশকে কেবল কঠোর শাসক হিসেবে নয়, বরং জনগণের প্রকৃত বন্ধু ও সেবক হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। হাওরের বুক চিরে বয়ে যাওয়া প্রতিটি পথে এখন বিরাজ করছে শান্তির সুবাতাস।

তার এই আপসহীন, সাহসী এবং জনবান্ধব নেতৃত্ব মিঠামইন থানাকে একটি আদর্শ ও নিরাপদ জনপদে রূপান্তরিত করেছে।

বর্তমান সময়ে আমাদের সমাজ, সংস্কৃতি ও সভ্যতার বুকে সবচেয়ে বড় ক্ষতটির নাম ‘মাদক’। এটি কেবল একটি ক্ষতিকারক নেশাদ্রব্য বা চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় বিষাক্ত উপাদান নয়, বরং এটি একটি আস্ত সমাজ ও প্রজন্ম ধ্বংসকারী মারণাস্ত্র।

পত্রিকার পাতা খুললেই প্রতিদিন যে খুন, সহিংসতা, ছিনতাই, কিশোর গ্যাংয়ের তাণ্ডব, ধর্ষণ এবং পারিবারিক নির্যাতনের লোমহর্ষক খবর আমাদের চোখে পড়ে, তার সিংহভাগের পেছনেই অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে এই সর্বনাশা মাদকের কালো হাত। আপাতদৃষ্টিতে যা ক্ষণিকের রঙিন বিভ্রম বা একাকীত্ব কাটানোর উসিলা, দিনশেষে তা-ই হয়ে উঠছে সব ধরনের অপরাধের প্রধান চালিকাশক্তি।

মাদক মানুষের মস্তিষ্কের স্বাভাবিক চিন্তাভাবনা, যুক্তিবোধ এবং মানবিক বিবেককে পুরোপুরি অবশ করে দেয়। চিকিৎসাবিজ্ঞান ও অপরাধবিজ্ঞানের যৌথ গবেষণা বলে, মাদকাসক্ত ব্যক্তির অপরাধ করার প্রবণতা সাধারণ মানুষের চেয়ে বহুগুণ বেশি।

নেশার চড়া টাকা জোগাড় করতে গিয়ে একজন তরুণ সবার আগে নিজের ঘরের শান্তি চুরি করে, পারিবারিক সঞ্চয় ধ্বংস করে। এরপর যখন সেই উৎস ফুরিয়ে যায়, তখন জন্মদাতার বুকে ছুরি চালাতে বা গর্ভধারিণী মাকে নির্মমভাবে হত্যা করতেও তাদের হাত কাঁপে না।

এছাড়া ঘরের গণ্ডি পেরিয়ে এই বিষাক্ত হাত যখন বাইরের সমাজে প্রসারিত হয়, তখন সমাজ হয়ে ওঠে অনিরাপদ। মাদকাসক্ত ব্যক্তির কাছে ন্যায়-অন্যায়, আইন বা পবিত্র মানবিক সম্পর্কের কোনো দেয়াল থাকে না। ফলে, সমাজ আজ এক গভীর নৈতিক অবক্ষয় এবং চরম নিরাপত্তাহীনতার মুখোমুখি।

মাদক চোরাচালান ও ব্যবসার সাথে জড়িয়ে আছে এক বিশাল আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেট দেশের যুবসমাজকে টার্গেট করে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন নামের বিষাক্ত উপাদান বাজারে ছাড়ছে। ফলে, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে সমাজের উচ্চবিত্ত ও নিম্নবিত্ত—সব স্তরেই এর বিষাক্ত ছোবল পৌঁছাচ্ছে।

মাদকাসক্তির এই ভয়াবহ বিস্তার দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য এবং জাতীয় নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। যুবসমাজকে এই অন্ধকার গহ্বর থেকে ফেরাতে না পারলে দেশের সব দৃশ্যমান উন্নয়ন ও অগ্রগতি একসময় অর্থহীন ও পঙ্গু হয়ে পড়বে।
তাই, মাদককে ‘না’ বলা কোনো সাধারণ বা সস্তা স্লোগান নয়; এটি আমাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার ও বেঁচে থাকার প্রধান শর্ত।

একটি অপরাধমুক্ত, নিরাপদ ও সুস্থ আগামী প্রজন্ম গড়ে তুলতে হলে আমাদের কেবল আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কঠোর অভিযানের ওপর ভরসা করে বসে থাকলে চলবে না। আইনের কঠোর প্রয়োগের পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর অভিনব ও প্রগতিশীল উদ্যোগগুলো আশার আলো দেখাচ্ছে।

সম্প্রতি কিশোরগঞ্জের মিঠামইন থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মনোয়ার মোহাম্মদ হাওর অঞ্চলকে মাদকমুক্ত করতে ব্যতিক্রমী প্রচারণামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন। তিনি বিভিন্ন জনবহুল মোড়ে ও দেয়ালে আকর্ষণীয় ফেস্টুন ও সচেতনতামূলক বাণীর মাধ্যমে জনসাধারণের মাঝে মাদকের কুফল ছড়িয়ে দিচ্ছেন। পুলিশ প্রশাসনের এমন ‘জনবান্ধব ও সচেতনতামূলক’ উদ্যোগ দেশের প্রতিটি প্রান্তে ছড়িয়ে দেওয়া প্রয়োজন, যা অপরাধ দমনে সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

পরিবার থেকে শুরু করে সামাজিক, সাংস্কৃতিক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় পর্যায় পর্যন্ত মাদকের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ ও ‘জিরো টলারেন্স’ (শূন্য সহনশীলতা) নীতি গড়ে তুলতে হবে। সন্তানদের সময় দেওয়া, তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের খোঁজ রাখা এবং মাদকের কুফল সম্পর্কে সচেতন করা প্রতিটি পরিবারের নৈতিক দায়িত্ব।

ওসি মনোয়ার মোহাম্মদের আহ্বান – আসুন, অন্ধকারের চোরাবালিকে বিদায় জানিয়ে সুস্থ-সুন্দর আলোর পথকে বেছে নিই। নিজে মাদক থেকে দূরে থাকি, অন্যকেও সচেতন করি এবং একটি মাদক মুক্ত সুস্থ সমাজ বিনির্মাণে শামিল হই।

বখাটে আর ইভটিজার তোদের আর রক্ষা নাই”—কিশোরগঞ্জের মিঠামইন থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মনোয়ার মোহাম্মদের উদ্যোগে ঝুলানো ব্যানার আর ফেস্টুনের এই একটি বাক্য ইদানীং বেশ নজর কাড়ছে।

আপাতদৃষ্টিতে এটি একটি সাধারণ প্রশাসনিক স্লোগান মনে হলেও, এর ভেতরে লুকিয়ে আছে এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক চাবুক। এটি কোনো মারমুখী চিৎকার নয়, বরং রাস্তার মোড়ের তথাকথিত ‘হিরো’দের সস্তা মুখোশটি টেনে খুলে দেওয়ার এক দারুণ বুদ্ধিবৃত্তিক প্রয়াস।

আমাদের সমাজ ব্যবস্থার এক অদ্ভুত ব্যাধি হলো ‘ইভটিজিং’। স্কুল-কলেজের গেটে কিংবা রাস্তার মোড়ে ওত পেতে থেকে নারীদের উত্ত্যক্ত করাকে একশ্রেণির কিশোর-তরুণ রীতিমতো ‘পুরুষত্ব’ বা ‘বাহাদুরি’ মনে করে।

মিঠামইনের এই প্রচারণাটি মূলত সেই বিকৃত মস্তিস্কের ধারকদের মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, তাদের এই সস্তা বিনোদনের দিন ফুরিয়ে এসেছে। আইন তো তার নিজস্ব গতিতে তাদের পেছনে লেগেছেই, কিন্তু তার চেয়েও বড় ফাঁদ পেতেছে সচেতন সমাজ।

এ ধরণের অপরাধীদের শুধু জেলের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে আটকে রাখাই যথেষ্ট নয়; এদের জন্য প্রয়োজন কঠোর সামাজিক ও পারিবারিক বয়কট। যে পরিবার তার সন্তানকে ন্যূনতম নৈতিকতা ও নারীর প্রতি সম্মান দেখাতে শেখাতে ব্যর্থ হয়েছে, সেই পরিবারকেও আজ এই সামাজিক লজ্জার দায়ভার নিতে হবে। যখন একটি পরিবার সমাজজুড়ে তাদের বখাটে সন্তানের জন্য ধিকৃত হবে, তখনই কেবল ঘরে ঘরে এই ব্যাধির আসল দাওয়াই তৈরি হবে।

মিঠামইন থানার ওসি মনোয়ার মোহাম্মদের এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগটি আসলে এক চিলতে হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকা ধারালো ছুরি। এটি স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে—ইভটিজারদের এই সস্তা নাটক দেখার মতো দর্শক আর সমাজে নেই।

বখাটেদের উদ্দেশ্যে বার্তাটি অত্যন্ত সোজা ও সাপ্টা – হয় ঘরের সুবোধ সন্তান হয়ে যাও, না হয় সমাজ ও প্রশাসনের যৌথ উদ্যোগে ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হতে প্রস্তুত হও। কারণ, এবার পালাবার সব রাস্তাই বন্ধ, সত্যিই আর কোনো ‘রক্ষা নাই’!

লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও কলামিস্ট;
সহযোগী সম্পাদক, আজকের সূর্যোদয়, ঢাকা

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

সেবার হাত বাড়িয়ে প্রশংসার শীর্ষে মিঠামইনের ওসি মনোয়ার

সেবার হাত বাড়িয়ে প্রশংসার শীর্ষে মিঠামইনের ওসি মনোয়ার

আপডেট টাইম : ০৩:৪৫:৩০ অপরাহ্ন, সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রফিকুল ইসলামঃ কিশোরগঞ্জের মিঠামইনে মাদক ব্যবসায়ী আর ইভটিজারদের ‘স্বর্গরাজ্যে’ হঠাৎ করেই যেন জলবায়ু পরিবর্তন শুরু হয়েছে। হাওয়া বদলের এই ঝোড়ো হাওয়া বইয়ে দিয়েছেন মিঠামইন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনোয়ার মোহাম্মদ। তিনি জানান, কাজ করা তার নেশা।

তিনি প্রচলিত ঢিলেঢালা টেবিল-ডিউটির খোলস ভেঙে তিনি ব্যতিক্রমী অ্যাকশনে মাঠে নামলেন, তখন চেনা অপরাধীদের চেনা সমীকরণগুলো এক নিমেষেই ওলটপালট হয়ে গেল।

হাওরের শান্ত জলরাশিতে মিশে থাকা মাদক ও ইভটিজিংয়ের মতো বিষাক্ত ক্ষতগুলোকে উপড়ে ফেলতে তার এই সময়োপযোগী ও প্রশংসনীয় উদ্যোগ যেমন জনমনে স্বস্তি এনেছে, ঠিক তেমনি কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছে অপরাধচক্রের মেরুদণ্ডে।

“পথে ঘাটে দিনে রাতে, চলতে চাই নিরাপদে”—এই দৃঢ় প্রত্যয়কে ধারণ করে কিশোরগঞ্জের মিঠামইন থানা এলাকার আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় এক অভূতপূর্ব ও ব্যতিক্রমী জাগরণ সৃষ্টি করেছেন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনোয়ার মোহাম্মদ।

প্রত্যন্ত হাওরাঞ্চলের সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তার এই নির্ভীক প্রচারণা ও দূরদর্শী পদক্ষেপ সর্বস্তরের মানুষের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।

নদী ও হাওরবেষ্টিত মিঠামইন উপজেলার প্রতিটি প্রান্তে অপরাধের গ্রাফ শূন্যে নামিয়ে আনতে দিন-রাত নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন ওসি মনোয়ার মোহাম্মদ। মাদক, জুয়া, কিশোর গ্যাং এবং যেকোনো ধরনের সামাজিক বিশৃঙ্খলার বিরুদ্ধে তিনি গড়ে তুলেছেন এক দুর্ভেদ্য প্রাচীর। সাধারণ পথচারী থেকে শুরু করে গভীর রাতে চলাচলকারী শ্রমজীবী মানুষ যেন বুক ফুলিয়ে নির্ভয়ে চলাচল করতে পারেন, সেজন্য তার নির্দেশে পুলিশি টহল ও নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।

চোর-ডাকাত বা অপরাধীদের মনে যেমন তার এই উদ্যোগ তীব্র ভীতি সঞ্চার করেছে, তেমনি সাধারণ নাগরিকদের মনে ফিরিয়ে এনেছে স্বস্তি ও গভীর আস্থা।

মনোয়ার মোহাম্মদের এই প্রচারণার সবচেয়ে সুন্দর দিক হলো—তিনি পুলিশকে কেবল কঠোর শাসক হিসেবে নয়, বরং জনগণের প্রকৃত বন্ধু ও সেবক হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। হাওরের বুক চিরে বয়ে যাওয়া প্রতিটি পথে এখন বিরাজ করছে শান্তির সুবাতাস।

তার এই আপসহীন, সাহসী এবং জনবান্ধব নেতৃত্ব মিঠামইন থানাকে একটি আদর্শ ও নিরাপদ জনপদে রূপান্তরিত করেছে।

বর্তমান সময়ে আমাদের সমাজ, সংস্কৃতি ও সভ্যতার বুকে সবচেয়ে বড় ক্ষতটির নাম ‘মাদক’। এটি কেবল একটি ক্ষতিকারক নেশাদ্রব্য বা চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় বিষাক্ত উপাদান নয়, বরং এটি একটি আস্ত সমাজ ও প্রজন্ম ধ্বংসকারী মারণাস্ত্র।

পত্রিকার পাতা খুললেই প্রতিদিন যে খুন, সহিংসতা, ছিনতাই, কিশোর গ্যাংয়ের তাণ্ডব, ধর্ষণ এবং পারিবারিক নির্যাতনের লোমহর্ষক খবর আমাদের চোখে পড়ে, তার সিংহভাগের পেছনেই অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে এই সর্বনাশা মাদকের কালো হাত। আপাতদৃষ্টিতে যা ক্ষণিকের রঙিন বিভ্রম বা একাকীত্ব কাটানোর উসিলা, দিনশেষে তা-ই হয়ে উঠছে সব ধরনের অপরাধের প্রধান চালিকাশক্তি।

মাদক মানুষের মস্তিষ্কের স্বাভাবিক চিন্তাভাবনা, যুক্তিবোধ এবং মানবিক বিবেককে পুরোপুরি অবশ করে দেয়। চিকিৎসাবিজ্ঞান ও অপরাধবিজ্ঞানের যৌথ গবেষণা বলে, মাদকাসক্ত ব্যক্তির অপরাধ করার প্রবণতা সাধারণ মানুষের চেয়ে বহুগুণ বেশি।

নেশার চড়া টাকা জোগাড় করতে গিয়ে একজন তরুণ সবার আগে নিজের ঘরের শান্তি চুরি করে, পারিবারিক সঞ্চয় ধ্বংস করে। এরপর যখন সেই উৎস ফুরিয়ে যায়, তখন জন্মদাতার বুকে ছুরি চালাতে বা গর্ভধারিণী মাকে নির্মমভাবে হত্যা করতেও তাদের হাত কাঁপে না।

এছাড়া ঘরের গণ্ডি পেরিয়ে এই বিষাক্ত হাত যখন বাইরের সমাজে প্রসারিত হয়, তখন সমাজ হয়ে ওঠে অনিরাপদ। মাদকাসক্ত ব্যক্তির কাছে ন্যায়-অন্যায়, আইন বা পবিত্র মানবিক সম্পর্কের কোনো দেয়াল থাকে না। ফলে, সমাজ আজ এক গভীর নৈতিক অবক্ষয় এবং চরম নিরাপত্তাহীনতার মুখোমুখি।

মাদক চোরাচালান ও ব্যবসার সাথে জড়িয়ে আছে এক বিশাল আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেট দেশের যুবসমাজকে টার্গেট করে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন নামের বিষাক্ত উপাদান বাজারে ছাড়ছে। ফলে, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে সমাজের উচ্চবিত্ত ও নিম্নবিত্ত—সব স্তরেই এর বিষাক্ত ছোবল পৌঁছাচ্ছে।

মাদকাসক্তির এই ভয়াবহ বিস্তার দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য এবং জাতীয় নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। যুবসমাজকে এই অন্ধকার গহ্বর থেকে ফেরাতে না পারলে দেশের সব দৃশ্যমান উন্নয়ন ও অগ্রগতি একসময় অর্থহীন ও পঙ্গু হয়ে পড়বে।
তাই, মাদককে ‘না’ বলা কোনো সাধারণ বা সস্তা স্লোগান নয়; এটি আমাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার ও বেঁচে থাকার প্রধান শর্ত।

একটি অপরাধমুক্ত, নিরাপদ ও সুস্থ আগামী প্রজন্ম গড়ে তুলতে হলে আমাদের কেবল আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কঠোর অভিযানের ওপর ভরসা করে বসে থাকলে চলবে না। আইনের কঠোর প্রয়োগের পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর অভিনব ও প্রগতিশীল উদ্যোগগুলো আশার আলো দেখাচ্ছে।

সম্প্রতি কিশোরগঞ্জের মিঠামইন থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মনোয়ার মোহাম্মদ হাওর অঞ্চলকে মাদকমুক্ত করতে ব্যতিক্রমী প্রচারণামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন। তিনি বিভিন্ন জনবহুল মোড়ে ও দেয়ালে আকর্ষণীয় ফেস্টুন ও সচেতনতামূলক বাণীর মাধ্যমে জনসাধারণের মাঝে মাদকের কুফল ছড়িয়ে দিচ্ছেন। পুলিশ প্রশাসনের এমন ‘জনবান্ধব ও সচেতনতামূলক’ উদ্যোগ দেশের প্রতিটি প্রান্তে ছড়িয়ে দেওয়া প্রয়োজন, যা অপরাধ দমনে সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

পরিবার থেকে শুরু করে সামাজিক, সাংস্কৃতিক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় পর্যায় পর্যন্ত মাদকের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ ও ‘জিরো টলারেন্স’ (শূন্য সহনশীলতা) নীতি গড়ে তুলতে হবে। সন্তানদের সময় দেওয়া, তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের খোঁজ রাখা এবং মাদকের কুফল সম্পর্কে সচেতন করা প্রতিটি পরিবারের নৈতিক দায়িত্ব।

ওসি মনোয়ার মোহাম্মদের আহ্বান – আসুন, অন্ধকারের চোরাবালিকে বিদায় জানিয়ে সুস্থ-সুন্দর আলোর পথকে বেছে নিই। নিজে মাদক থেকে দূরে থাকি, অন্যকেও সচেতন করি এবং একটি মাদক মুক্ত সুস্থ সমাজ বিনির্মাণে শামিল হই।

বখাটে আর ইভটিজার তোদের আর রক্ষা নাই”—কিশোরগঞ্জের মিঠামইন থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মনোয়ার মোহাম্মদের উদ্যোগে ঝুলানো ব্যানার আর ফেস্টুনের এই একটি বাক্য ইদানীং বেশ নজর কাড়ছে।

আপাতদৃষ্টিতে এটি একটি সাধারণ প্রশাসনিক স্লোগান মনে হলেও, এর ভেতরে লুকিয়ে আছে এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক চাবুক। এটি কোনো মারমুখী চিৎকার নয়, বরং রাস্তার মোড়ের তথাকথিত ‘হিরো’দের সস্তা মুখোশটি টেনে খুলে দেওয়ার এক দারুণ বুদ্ধিবৃত্তিক প্রয়াস।

আমাদের সমাজ ব্যবস্থার এক অদ্ভুত ব্যাধি হলো ‘ইভটিজিং’। স্কুল-কলেজের গেটে কিংবা রাস্তার মোড়ে ওত পেতে থেকে নারীদের উত্ত্যক্ত করাকে একশ্রেণির কিশোর-তরুণ রীতিমতো ‘পুরুষত্ব’ বা ‘বাহাদুরি’ মনে করে।

মিঠামইনের এই প্রচারণাটি মূলত সেই বিকৃত মস্তিস্কের ধারকদের মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, তাদের এই সস্তা বিনোদনের দিন ফুরিয়ে এসেছে। আইন তো তার নিজস্ব গতিতে তাদের পেছনে লেগেছেই, কিন্তু তার চেয়েও বড় ফাঁদ পেতেছে সচেতন সমাজ।

এ ধরণের অপরাধীদের শুধু জেলের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে আটকে রাখাই যথেষ্ট নয়; এদের জন্য প্রয়োজন কঠোর সামাজিক ও পারিবারিক বয়কট। যে পরিবার তার সন্তানকে ন্যূনতম নৈতিকতা ও নারীর প্রতি সম্মান দেখাতে শেখাতে ব্যর্থ হয়েছে, সেই পরিবারকেও আজ এই সামাজিক লজ্জার দায়ভার নিতে হবে। যখন একটি পরিবার সমাজজুড়ে তাদের বখাটে সন্তানের জন্য ধিকৃত হবে, তখনই কেবল ঘরে ঘরে এই ব্যাধির আসল দাওয়াই তৈরি হবে।

মিঠামইন থানার ওসি মনোয়ার মোহাম্মদের এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগটি আসলে এক চিলতে হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকা ধারালো ছুরি। এটি স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে—ইভটিজারদের এই সস্তা নাটক দেখার মতো দর্শক আর সমাজে নেই।

বখাটেদের উদ্দেশ্যে বার্তাটি অত্যন্ত সোজা ও সাপ্টা – হয় ঘরের সুবোধ সন্তান হয়ে যাও, না হয় সমাজ ও প্রশাসনের যৌথ উদ্যোগে ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হতে প্রস্তুত হও। কারণ, এবার পালাবার সব রাস্তাই বন্ধ, সত্যিই আর কোনো ‘রক্ষা নাই’!

লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও কলামিস্ট;
সহযোগী সম্পাদক, আজকের সূর্যোদয়, ঢাকা