ঢাকা ০৭:০৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ২২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
শিশুর হাতে বই তুলে দেওয়ার দায়িত্ব রাষ্ট্রেরও প্রতিযোগিতা আমি নিজের সঙ্গেই করি : অপু বিশ্বাস ফ্যাসিবাদী আ. লীগের এ দেশে আর রাজনীতির সুযোগ হবে না : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশকে এআই প্রয়োগ ও উদ্ভাবনে সক্ষম দেশে পরিণত করতে হবে: রাষ্ট্রপতি আমির হামজার ‘নারীসংক্রান্ত অডিও ও ভিডিও’ পাওয়ার দাবি রাশেদ খানের শান্তি ফিরেছে শিল্পাঞ্চলে, ছুটির দিনেও কর্মচাঞ্চল্য জলবায়ু ঝুঁকিতে বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৯ কোটি বাস্তুচ্যুত মানুষ আইজেনকোটকে ৬৭ এমপির সমর্থন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী কে হবেন নির্ধারণ রোববার মানবিক মূল্যবোধ, পেশাগত দক্ষতা ও সততাই আইনজীবীর প্রধান শক্তি: আইনমন্ত্রী দুই ধাপে মিলবে ড্রাইভিং লাইসেন্স, আবেদনের নিয়ম ও ফি জানাল বিআরটিএ

শিশুর হাতে বই তুলে দেওয়ার দায়িত্ব রাষ্ট্রেরও

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ০৫:৫৭:৫৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬
  • ৩০ বার

Oplus_16908288

রফিকুল ইসলামঃ একটি শিশুর হাতে থাকার কথা রঙিন বই, খাতা-পেনসিল; চোখে থাকার কথা স্বপ্নের আলো, মনে থাকার কথা দুরন্ত শৈশবের উচ্ছ্বাস। যে বয়সে বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে সহপাঠীদের সঙ্গে পড়াশোনা, খেলার মাঠে ছুটে চলা কিংবা মায়ের আঁচল ঘেঁষে গল্প শোনার কথা, সেই বয়সে কোনো শিশুকে যদি জীবিকার তাগিদে পথে পথে পণ্য বিক্রি করতে হয়, তবে তা কেবল একটি পরিবারের দারিদ্র্যের নির্মম চিত্র নয়; এটি আমাদের সমাজ, রাষ্ট্র ও সামষ্টিক বিবেকের প্রতিও এক গভীর প্রশ্ন।

যে শিশুর হাতে থাকার কথা ভবিষ্যৎ নির্মাণের হাতিয়ার বই, তার হাতে যদি তুলে দিতে হয় পরিবারের অন্ন জোগানোর দায়িত্ব, যে বয়সে স্বপ্ন দেখার কথা, সেই বয়সে যদি তাকে ক্ষুধা নিবারণের সংগ্রামে নামতে হয়, তবে সেই দায় কি শুধু অসহায় পরিবারটির? নাকি এর দায় রাষ্ট্রেরও?

একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের প্রকৃত পরিচয় শুধু বড় বড় স্থাপনা, সড়ক, সেতু কিংবা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে নয়; বরং তার সবচেয়ে দুর্বল নাগরিক—একটি শিশুর—হাত থেকে জীবিকার বোঝা সরিয়ে সেখানে বই তুলে দিতে পারার সক্ষমতার মধ্যেই নিহিত রয়েছে উন্নয়নের মানবিক সার্থকতা।

শৈশব মানুষের জীবনের এমন এক অমূল্য অধ্যায়, যা একবার হারিয়ে গেলে আর কখনো ফিরে পাওয়া যায় না। অথচ দারিদ্র্য, পারিবারিক বিপর্যয় ও অসহায়ত্বের চাপে অসংখ্য শিশুর সেই অমূল্য সময় হারিয়ে যাচ্ছে জীবিকার কঠিন বাস্তবতায়। তাদের হাতে বইয়ের পরিবর্তে উঠছে উপার্জনের বোঝা, চোখের স্বপ্ন ঢেকে যাচ্ছে অনিশ্চয়তার অন্ধকারে। এমন বাস্তবতায় আট বছর বয়সী শিশু হাসানের জীবন আমাদের বিবেককে গভীরভাবে নাড়া দেয়।

যে বয়সে তার কাঁধে থাকার কথা স্কুলব্যাগ, সে বয়সে পরিবারের অভাব ঘোচাতে হাতে তুলে নিতে হয়েছিল বাদামের প্যাকেট। দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর বাবার মৃত্যু, সংসারে উপার্জনক্ষম মানুষের অভাব এবং মা ও ভাইবোনদের নিয়ে আর্থিক অনটন—সব মিলিয়ে ছোট্ট হাসানের শৈশব যেন অকালেই জীবিকার ভারে নুয়ে পড়েছিল। রাজধানীর বারিধারা এলাকায় ভাড়া বাসায় বসবাসকারী পরিবারটির দুঃসহ বাস্তবতা শিশুটিকে ঠেলে দিয়েছিল উপার্জনের কঠিন পথে।

কিন্তু একটি শিশুর জীবন কি দারিদ্র্যের কাছে এভাবেই পরাজিত হবে? তার স্বপ্ন কি অভাবের অন্ধকারে হারিয়ে যাবে? তার ছোট্ট হাত কি সারাজীবন জীবিকার বোঝাই বহন করবে? এই প্রশ্নগুলোর মানবিক উত্তর খুঁজতেই এগিয়ে এসেছেন ঢাকা জেলা প্রশাসক ফরিদা খানম।

গত ১লা নভেম্বর বিকেল ৩টায় তিনি হাসান ও তার পরিবারের সদস্যদের নিজের কার্যালয়ে ডেকে তাদের দুঃখ-দুর্দশার কথা শোনেন। পরিবারের আর্থিক ও সামাজিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে হাসানের বিদ্যালয়ে ভর্তির ব্যবস্থা করেন এবং পরিবারটির তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবিলায় নগদ আর্থিক সহায়তা প্রদান করেন। ২রা নভেম্বর প্রকাশিত সংবাদেও এ উদ্যোগের বিস্তারিত উঠে আসে।

ঘটনাটি আপাতদৃষ্টিতে ছোট মনে হতে পারে। কিন্তু এর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য অনেক গভীর। কারণ, এখানে শুধু একটি অসহায় পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়নি; বরং একটি শিশুর হারিয়ে যেতে বসা শৈশব, শিক্ষার অধিকার এবং ভবিষ্যতের স্বপ্নকে নতুন করে বাঁচিয়ে রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একজন দায়িত্বশীল প্রশাসকের কাছে ক্ষমতা যে কেবল দাপ্তরিক দায়িত্ব পালনের বিষয় নয়, মানুষের দুঃখ-কষ্ট উপলব্ধি করে তাদের পাশে দাঁড়ানোরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ—হাসানের পাশে দাঁড়িয়ে ফরিদা খানম সেই মানবিক বার্তাই দিয়েছেন।

হাসান একা নয়, পরিসংখ্যানেও স্পষ্ট শিশুশ্রমের নির্মম বাস্তবতা

হাসানের ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন পারিবারিক দুর্ভাগ্যের গল্প নয়; এটি দেশের একটি বড় সামাজিক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। বাংলাদেশের বিভিন্ন শহর, বন্দর, গ্রাম ও জনপদে অসংখ্য শিশু দারিদ্র্য, পারিবারিক অসচ্ছলতা, পিতামাতার মৃত্যু, বিচ্ছেদ কিংবা অসহায়ত্বের কারণে শৈশবেই শ্রমে যুক্ত হচ্ছে। কেউ রাস্তায় পণ্য বিক্রি করছে, কেউ হোটেল-রেস্তোরাঁয় কাজ করছে, কেউ কারখানায়, কেউ আবার গৃহস্থালির কাজে নিয়োজিত। তাদের অনেকেই বিদ্যালয়ে যাওয়ার সুযোগ পায় না; কেউ কেউ ভর্তি হলেও অভাবের কারণে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারে না।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত বাংলাদেশ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে—মিআইসিএস ২০২৫-এর চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেশের শিশুশ্রম পরিস্থিতির একটি উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছে। ২০২৬ সালের জুনে প্রকাশিত এ প্রতিবেদনে দেখা যায়, ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদের ৯.১ শতাংশ শিশুশ্রমে নিয়োজিত। ইউনিসেফের হালনাগাদ তথ্যপাতায় এ হার ৯.২ শতাংশ হিসেবে প্রদর্শিত হয়েছে।

উল্লেখ্য, জরিপের প্রাথমিক ফলাফলে ২০১৯ সালের ৬.৮ শতাংশের তুলনায় শিশুশ্রম বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছিল। তবে মিআইসিএস ২০২৫-এ শিশুশ্রম পরিমাপের সংজ্ঞা ও বয়সভিত্তিক কাজের সময়ের সীমায় পরিবর্তন আনা হয়েছে।

তাই দুটি জরিপের হার তুলনার ক্ষেত্রে পদ্ধতিগত পার্থক্য বিবেচনায় রাখা জরুরি। প্রাথমিক ফলাফলে আগের জরিপের তুলনায় প্রায় ১২ লাখ বেশি শিশু শিশুশ্রমের ঝুঁকিতে পড়ার তথ্যও প্রকাশ করা হয়েছিল।

শুধু শিশুশ্রম নয়, শিক্ষাক্ষেত্রেও রয়েছে উদ্বেগজনক চিত্র। মিআইসিএস ২০২৫-এর তথ্য অনুযায়ী, প্রাথমিক বিদ্যালয় বয়সী শিশুদের ৬.৫ শতাংশ বিদ্যালয়ের বাইরে। নিম্নমাধ্যমিক বয়সীদের ক্ষেত্রে এই হার ১৩.১ শতাংশ এবং উচ্চমাধ্যমিক বয়সীদের ক্ষেত্রে ৩৩.৯ শতাংশ। প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করার হার ৮৩.৭ শতাংশ হলেও নিম্নমাধ্যমিকে তা ৬৯.৩ শতাংশ এবং উচ্চমাধ্যমিকে নেমে এসেছে মাত্র ৪৩.৯ শতাংশে। প্রাথমিক পর্যায়ে সমন্বিত নিট উপস্থিতির হার ৮৫ শতাংশ হলেও উচ্চমাধ্যমিকে তা ৫০.৮ শতাংশ।

অর্থাৎ শুধু বিদ্যালয়ে ভর্তি করানোই যথেষ্ট নয়; শিক্ষার ধারাবাহিকতা, ঝরে পড়া প্রতিরোধ এবং মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের ধরে রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

আরও উদ্বেগের বিষয়, বিদ্যালয়ের বাইরে থাকা শিশুদের মধ্যে শিশুশ্রমে যুক্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি। মিআইসিএসের প্রাথমিক বিশ্লেষণে বিদ্যালয়ে না যাওয়া শিশুদের শিশুশ্রমে যুক্ত হওয়ার প্রবণতা বিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত শিশুদের তুলনায় প্রায় চার গুণ বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। দারিদ্র্য ও শিক্ষাবঞ্চনা এভাবেই একে অন্যকে আরও গভীর করে তোলে। একটি শিশু বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়লে তার শ্রমে যুক্ত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ে; আবার শ্রমে যুক্ত হলে তার বিদ্যালয়ে ফিরে আসার পথও কঠিন হয়ে যায়।

এসব পরিসংখ্যানের প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি শিশুর অপূর্ণ শৈশব, একটি পরিবারের অসহায়ত্ব এবং একটি সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা। আমরা রাস্তায় শিশুদের শ্রম করতে দেখি, তাদের কাছ থেকে পণ্য কিনি, দরদাম করি; কিন্তু সেই শিশুটির হাতে বই তুলে দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা কতবার উপলব্ধি করি?

একবার ভাবুন, যে শিশুটি রাস্তায় বাদাম বিক্রি করছে, তারও হয়তো ইচ্ছা করে বিদ্যালয়ের মাঠে বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে, নতুন বইয়ের পাতা উল্টাতে কিংবা বড় হয়ে চিকিৎসক, শিক্ষক, প্রকৌশলী বা সরকারি কর্মকর্তা হতে। কিন্তু তার স্বপ্নের পথে দাঁড়িয়ে আছে ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও পারিবারিক অসহায়ত্ব। এই বাস্তবতায় শিশুটিকে শুধু শ্রম থেকে সরিয়ে দিলেই চলবে না; তার পরিবারের জীবনযাপনের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে হবে।

আইন আছে, ২০২৬ সালের সংশোধনও হয়েছে; প্রয়োজন কার্যকর বাস্তবায়ন

শিশুর শিক্ষা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার সাংবিধানিক অঙ্গীকার আমাদের রয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫ অনুচ্ছেদে খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ মৌলিক প্রয়োজন পূরণকে রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে ১৭ অনুচ্ছেদে সব শিশুর জন্য আইন দ্বারা নির্ধারিত পর্যায় পর্যন্ত অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণে রাষ্ট্রকে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর ২ ধারার সংজ্ঞা অনুযায়ী, ১৪ বছর পূর্ণ করেনি এমন ব্যক্তি শিশু। আইনের ৩৪(১) ধারায় কোনো পেশা বা প্রতিষ্ঠানে শিশুকে নিয়োগ কিংবা কাজ করানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ১৪ বছর পূর্ণ কিন্তু ১৮ বছর পূর্ণ হয়নি—এমন ব্যক্তিকে কিশোর হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাদের কাজে নিয়োগের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের সক্ষমতা সনদসহ নির্দিষ্ট শর্ত রয়েছে।

আইনের ২৮৪ ধারায় শিশু বা কিশোরকে আইন লঙ্ঘন করে কাজে নিয়োজিত করার জন্য ২০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।

এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ হালনাগাদ তথ্য উল্লেখ করা প্রয়োজন। ২০২৬ সালের ১০ই এপ্রিল বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধন) আইন, ২০২৬ জাতীয় সংসদে প্রণীত হয় এবং ১০ই এপ্রিলের সরকারি গেজেটে প্রকাশিত হয়। ফলে শিশুশ্রমসংক্রান্ত আইনি আলোচনা করতে গিয়ে শুধু ২০০৬ সালের মূল আইন নয়, ২০২৬ সালের সংশোধনীসহ কার্যকর আইন বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।

তবে আইন সংশোধন কিংবা শাস্তির বিধান বাড়ালেই শিশুশ্রম নির্মূল হবে না। আইনের প্রকৃত সার্থকতা তখনই প্রতিষ্ঠিত হবে, যখন কোনো শিশু অভাবের কারণে বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়বে না কিংবা জীবিকার দায়ে শৈশব বিসর্জন দিতে বাধ্য হবে না। বিশেষ করে অনানুষ্ঠানিক খাত, পথের ব্যবসা, ক্ষুদ্র দোকান, পরিবহন ও গৃহস্থালির কাজে নিয়োজিত শিশুদের শনাক্ত ও সুরক্ষার ক্ষেত্রে আরও কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন।

শিশুশ্রম নিরসনে ২০২১–২০২৫ মেয়াদের জাতীয় কর্মপরিকল্পনার পরবর্তী ধাপও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৬ সালের ১২ই জানুয়ারি বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) প্রকাশিত প্রতিবেদনে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সরকারি নথির বরাতে জানানো হয়, ২০২৬–২০৩০ মেয়াদের নতুন জাতীয় কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পরবর্তী সময়ে ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় নতুন কর্মপরিকল্পনার খসড়া প্রণীত হওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

নতুন পরিকল্পনায় আইন সংস্কার, পরিদর্শনব্যবস্থা জোরদার, সামাজিক সুরক্ষা, দরিদ্র পরিবারের জীবিকার সহায়তা, ঝুঁকিপূর্ণ কাজ থেকে শিশুদের প্রত্যাহার, পুনর্বাসন ও শিক্ষায় ফিরিয়ে আনার বিষয়গুলো গুরুত্ব পাওয়ার কথা।

বাসসের প্রকাশিত সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট এক বছরের হিসাবে শিশুশ্রম থেকে ৩ হাজার ৪৫৩ শিশুকে প্রত্যাহার করা হয়েছে, ১১ হাজার ৬৯১টি বিশেষ পরিদর্শন পরিচালিত হয়েছে এবং এ-সংক্রান্ত ১৬টি মামলা করা হয়েছে।

এ পরিসংখ্যান অবশ্যই উদ্যোগের পরিচায়ক; কিন্তু দেশের সামগ্রিক শিশুশ্রম পরিস্থিতির তুলনায় এর ব্যাপ্তি ও কার্যকারিতা মূল্যায়ন করা জরুরি। এখন প্রয়োজন পরিকল্পনাটিকে সময়সীমাবদ্ধ, বাস্তবসম্মত ও জবাবদিহিমূলক কর্মসূচিতে রূপ দেওয়া। শুধু ঝুঁকিপূর্ণ শ্রম থেকে শিশুদের উদ্ধার নয়, তাদের পুনর্বাসন, পরিবারকে আর্থিকভাবে সক্ষম করা এবং শিক্ষায় ফিরিয়ে আনার বিষয়গুলোকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

শিশুর হাতে বই তুলে দিতে রাষ্ট্রের যে উদ্যোগগুলো জরুরি

এখানেই রাষ্ট্রের দায়িত্বের প্রশ্নটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। একজন জেলা প্রশাসক কিংবা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মানবিক উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। কিন্তু দেশের প্রতিটি অসহায় শিশুর জীবন পরিবর্তনের দায়িত্ব শুধু বিচ্ছিন্ন কিছু মানবিক উদ্যোগের ওপর ছেড়ে দেওয়া যায় না।

এর জন্য প্রয়োজন সরকারের সুস্পষ্ট নীতি, পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ, কার্যকর কর্মপরিকল্পনা এবং জবাবদিহিমূলক বাস্তবায়নব্যবস্থা।

প্রথমত, প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া, শিশুশ্রমে নিয়োজিত, পিতৃহীন, মাতৃহীন, এতিম, প্রতিবন্ধী এবং চরম দারিদ্র্যে থাকা শিশুদের একটি নির্ভরযোগ্য তথ্যভান্ডার তৈরি করতে হবে। স্থানীয় প্রশাসন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, জনপ্রতিনিধি ও সমাজসেবা অধিদপ্তরের সমন্বয়ে এসব শিশুকে শনাক্ত করে তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি।

দ্বিতীয়ত, ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের জন্য বিশেষ শিক্ষা সহায়তা, উপবৃত্তি, বিনামূল্যে বই-খাতা, পোশাক, পুষ্টিকর খাবার, চিকিৎসা ও যাতায়াত সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে যেসব পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি মারা গেছেন বা দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতায় ভুগছেন, তাদের সন্তানদের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি চালু করা প্রয়োজন।

তৃতীয়ত, শিশুশ্রম প্রতিরোধে শুধু আইন প্রণয়ন কিংবা মাঝেমধ্যে অভিযান পরিচালনা যথেষ্ট নয়। নিয়মিত তদারকি, ঝুঁকিপূর্ণ কর্মক্ষেত্র চিহ্নিতকরণ, শিশুদের উদ্ধার ও নিরাপদ পুনর্বাসন এবং সংশ্লিষ্ট আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। তবে কোনো শিশুকে শ্রম থেকে সরিয়ে আনার পর তার শিক্ষা ও পরিবারের জীবিকার বিকল্প ব্যবস্থা না করলে সে আবারও শ্রমে ফিরে যেতে পারে। তাই শিশুর পাশাপাশি পরিবারকেও সহায়তার আওতায় আনতে হবে।

চতুর্থত, অসহায় পরিবারের উপার্জনক্ষম সদস্যদের কর্মসংস্থান, কারিগরি প্রশিক্ষণ, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সহায়তা ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী বিধবা, স্বামীহারা, অসুস্থ বা কর্মক্ষমতাহীন অভিভাবকদের জন্য বিশেষ সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। কারণ, পরিবারের ক্ষুধা ও অনিশ্চয়তা দূর না করে শিশুশ্রম বন্ধের উদ্যোগ দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না।

পঞ্চমত, শিক্ষা, সমাজকল্যাণ, শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তুলতে হবে। প্রতিটি জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের জন্য বার্ষিক ‘শিশুশ্রমমুক্ত ও বিদ্যালয়ে প্রত্যাবর্তন কর্মপরিকল্পনা’ গ্রহণ করা যেতে পারে। কতজন শিশুকে শ্রম থেকে ফিরিয়ে আনা হলো, কতজনকে বিদ্যালয়ে ভর্তি করা হলো, কতজন নিয়মিত পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে এবং কতটি পরিবার পুনর্বাসিত হলো—এসব সূচকের ভিত্তিতে অগ্রগতি মূল্যায়ন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

ষষ্ঠত, শিশুশ্রম নিরসনে শুধু সরকারি উদ্যোগের ওপর নির্ভর না করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, শিল্পমালিক, ব্যবসায়ী সংগঠন ও উন্নয়ন সহযোগীদের সম্পৃক্ত করতে হবে। শিশু শ্রমিক নিয়োগের বিরুদ্ধে সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি শিশুশ্রমমুক্ত পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থা নিশ্চিত করার উদ্যোগও প্রয়োজন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, এসব কর্মসূচির জন্য জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ করতে হবে। শুধু পরিকল্পনা কিংবা প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়মিত মূল্যায়ন করতে হবে।

মানবিক প্রশাসনের উদ্যোগ ছড়িয়ে পড়ুক প্রতিটি জনপদে

ঢাকা জেলা প্রশাসক ফরিদা খানমের উদ্যোগটি এ ক্ষেত্রে একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। তিনি শুধু সহানুভূতি প্রকাশ করে দায়িত্ব শেষ করেননি; বরং শিশুটির শিক্ষার ব্যবস্থা এবং পরিবারের তাৎক্ষণিক প্রয়োজন বিবেচনায় বাস্তব সহায়তা দিয়েছেন। তাঁর এই উদ্যোগে মানবিকতা, দায়িত্ববোধ ও প্রশাসনিক সক্রিয়তার সুন্দর সমন্বয় ঘটেছে।

তবে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা জরুরি—শিশুকে বিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়ে দেওয়াই দায়িত্বের শেষ নয়; বরং তার শিক্ষাজীবন যেন আর্থিক সংকটের কারণে আবারও থমকে না যায়, সেটি নিশ্চিত করাই প্রকৃত সাফল্য।

৬ই নভেম্বর পর্যন্ত প্রকাশিত সংবাদে হাসানের বিদ্যালয়ে ভর্তির ব্যবস্থা ও পরিবারের জন্য নগদ সহায়তার তথ্য পাওয়া গেলেও তার নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিতি, শ্রেণিকক্ষে পড়াশোনা এবং পরবর্তী শিক্ষাজীবনের অগ্রগতি সম্পর্কে বিস্তারিত অনুসরণমূলক তথ্য এখনো স্পষ্টভাবে সামনে আসেনি। এ বিষয়টি সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের নজরে রাখা প্রয়োজন।

শুধু প্রাথমিকভাবে ভর্তির ব্যবস্থা ও আর্থিক সহায়তার তথ্য নয়, পরবর্তী সময়ে শিশুটির শিক্ষাজীবনে কী ধরনের অগ্রগতি হলো, সেটিও অনুসরণ করা জরুরি। এতে একদিকে যেমন উদ্যোগটির স্থায়িত্ব ও বাস্তব সাফল্য যাচাই করা সম্ভব হবে, অন্যদিকে ঘটনাটির মানবিক তাৎপর্য ও নিবন্ধে উপস্থাপিত তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতাও আরও দৃঢ় হবে।

কারণ, একটি শিশুকে একদিনের জন্য শ্রম থেকে সরিয়ে আনা আর তার ভবিষ্যৎকে শ্রমমুক্ত ও শিক্ষামুখী করে তোলা এক বিষয় নয়। পরিবারের আর্থিক সংকট অব্যাহত থাকলে শিশুটি আবারও উপার্জনের পথে ফিরে যেতে বাধ্য হতে পারে। তাই হাসানের পড়াশোনার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে পরিবারটির আর্থিক অবস্থারও নিয়মিত খোঁজ নেওয়া প্রয়োজন।

এই উদ্যোগের প্রকৃত সার্থকতা হবে তখনই, যখন তা দেশের অন্যান্য জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের জন্যও অনুসরণীয় হয়ে উঠবে। প্রতিটি জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা আন্তরিকভাবে উদ্যোগী হলে নিজ নিজ এলাকায় এমন অসংখ্য শিশুকে শনাক্ত করে তাদের জীবন বদলে দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

এ জন্য স্থানীয় পর্যায়ে জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, সমাজকর্মী, সাংবাদিক, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও সামর্থ্যবান ব্যক্তিদের সম্পৃক্ত করতে হবে। স্থানীয়ভাবে শিক্ষা সহায়তা তহবিল গঠন, মেধাবী ও অসচ্ছল শিশুদের বৃত্তি প্রদান এবং পরিবারভিত্তিক পুনর্বাসন কর্মসূচি গ্রহণ করা যেতে পারে। তবে এসব উদ্যোগ কোনো ব্যক্তির সদিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল না রেখে প্রাতিষ্ঠানিক ও ধারাবাহিক কর্মসূচিতে পরিণত করতে হবে।

শুধু এককালীন আর্থিক সহায়তা কিংবা বিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়েই দায়িত্ব শেষ করা যাবে না। শিশুটি নিয়মিত বিদ্যালয়ে যাচ্ছে কি না, পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারছে কি না, পরিবার আবার তাকে শ্রমে পাঠাচ্ছে কি না—এসব বিষয় নিয়মিত তদারক করতে হবে। বিশেষ করে পিতৃহীন বা মাতৃহীন শিশুদের ক্ষেত্রে অভিভাবকত্ব, মানসিক সহায়তা ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করাও জরুরি।

শিক্ষা অনুগ্রহ নয়, প্রতিটি শিশুর অধিকার

মনে রাখতে হবে, দরিদ্র পরিবারের শিশুরা করুণা পাওয়ার জন্য জন্মায়নি। তাদেরও রয়েছে সমান মর্যাদা, সমান অধিকার এবং স্বপ্ন দেখার অধিকার। শিক্ষা কোনো দয়া বা অনুগ্রহ নয়; এটি প্রতিটি শিশুর অধিকার। একটি শিশুকে বিদ্যালয়ে ফিরিয়ে দেওয়া মানে শুধু তাকে অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন করা নয়; বরং তাকে আত্মমর্যাদা, আত্মনির্ভরতা ও সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া।

শিশুর শিক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি তার মানসিক নিরাপত্তা, ভালোবাসা, পুষ্টি ও সুরক্ষার বিষয়টিও সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। কারণ, অর্থের অভাব যেমন শিশুকে শ্রমে ঠেলে দেয়, তেমনি ভালোবাসা ও নিরাপত্তার অভাব তার স্বাভাবিক মানসিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে।

একটি শিশুর পাশে দাঁড়ানো তাই কেবল তাৎক্ষণিক মানবিক সহায়তা নয়; এটি একটি শিশুবান্ধব, দায়িত্বশীল ও বৈষম্যহীন সমাজ গঠনের অঙ্গীকার।

এ ক্ষেত্রে সমাজেরও দায়িত্ব রয়েছে। আশপাশে কোনো শিশুকে শ্রমে নিয়োজিত দেখলে শুধু সহানুভূতি প্রকাশ নয়, তার সমস্যার কারণ অনুসন্ধান এবং সম্ভব হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা প্রয়োজন। বিত্তবান ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষা সহায়তা, বৃত্তি, পুনর্বাসন এবং পরিবারভিত্তিক সহযোগিতার মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

গণমাধ্যমেরও দায়িত্ব শুধু শিশুর দুর্দশার চিত্র তুলে ধরা নয়; বরং সমস্যার কারণ, প্রশাসনের করণীয় এবং কার্যকর সমাধানের পথও সামনে আনা। একই সঙ্গে শিশুশ্রমের পেছনে থাকা দারিদ্র্য, বৈষম্য, সামাজিক নিরাপত্তার ঘাটতি ও শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতাগুলোও জনপরিসরে আলোচনায় আনতে হবে।

মানুষের মুখে হাসি ফোটানোই উন্নয়নের প্রকৃত সার্থকতা

মোদ্দা কথা, হাসানের হাতে বাদামের প্যাকেটের পরিবর্তে বই তুলে দেওয়ার এই উদ্যোগ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—একটি শিশুর জীবন বদলে দিতে সব সময় বিশাল আয়োজনের প্রয়োজন হয় না; প্রয়োজন সংবেদনশীল দৃষ্টি, আন্তরিক সদিচ্ছা এবং সময়োপযোগী পদক্ষেপ। একজন দায়িত্বশীল মানুষ এগিয়ে এলে একটি পরিবার আশার আলো দেখতে পারে, একটি শিশু ফিরে পেতে পারে তার হারিয়ে যাওয়া শৈশব।

রাষ্ট্রের উন্নয়ন শুধু বড় বড় অবকাঠামো, দৃষ্টিনন্দন সড়ক, সেতু কিংবা সুউচ্চ স্থাপনা নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। উন্নয়নের প্রকৃত সৌন্দর্য ও সার্থকতা নিহিত রয়েছে মানুষের জীবনমানের ইতিবাচক পরিবর্তন, মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা এবং সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর মধ্যেও।

একটি রাষ্ট্র কতটা উন্নত, তা কেবল তার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কিংবা দৃশ্যমান স্থাপনার উচ্চতা দিয়ে পরিমাপ করা যায় না; বরং কতজন অসহায় শিশুকে অন্ধকার ও অনিশ্চয়তার জীবন থেকে তুলে এনে শিক্ষার আলোয় আলোকিত করা গেল, কতটি শিশুর হাতে বই তুলে দিয়ে স্বপ্ন দেখার সাহস জোগানো গেল, কতটি পরিবারের দুঃখ-দুর্দশা লাঘব করে তাদের জীবনে আশার প্রদীপ জ্বালানো গেল—সেই মানবিক অর্জনের হিসাবেও উন্নয়নের প্রকৃত মানদণ্ড নির্ধারিত হয়।

কারণ, একটি শিশুর শিক্ষিত হয়ে ওঠা মানে শুধু একটি জীবনের পরিবর্তন নয়; এর মধ্য দিয়ে আলোকিত হয় একটি পরিবার, সমৃদ্ধ হয় একটি সমাজ এবং শক্তিশালী হয় ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রের ভিত। ইট-পাথরের স্থাপনা রাষ্ট্রের বাহ্যিক অবয়ব নির্মাণ করে, আর মানুষের মুখে হাসি ফোটানো, শিশুর স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখা এবং অসহায় জীবনে আশার আলো জ্বালানো নির্মাণ করে রাষ্ট্রের প্রকৃত মর্যাদা ও মানবিক পরিচয়।

আমরা চাই, হাসানের জন্য নেওয়া এই উদ্যোগ যেন কেবল প্রশংসার বিষয় হয়ে না থাকে; বরং রাষ্ট্রীয় দায়িত্ববোধ জাগ্রত করার একটি কার্যকর দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠে। সরকারের নীতিনির্ধারক থেকে শুরু করে মাঠপর্যায়ের প্রশাসন পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে শিশুর অধিকার ও নিরাপদ শৈশব নিশ্চিত করার অঙ্গীকার বাস্তবায়িত হোক।

এছাড়া দেশের প্রতিটি জেলা ও উপজেলা প্রশাসন নিজ নিজ এলাকায় এমন শিশুদের খুঁজে বের করুক। তাদের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করতে এগিয়ে আসুক সরকার ও প্রশাসন; সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিক জনপ্রতিনিধি, সমাজের সামর্থ্যবান মানুষ ও সচেতন নাগরিকেরা।

একটি শিশুর চোখের জল মুছে দেওয়া শুধু মানবিকতার পরিচয় নয়, এটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব পালনেরও অনন্য দৃষ্টান্ত।
যে রাষ্ট্র তার সবচেয়ে অসহায় শিশুটির হাত থেকে জীবিকার বোঝা সরিয়ে সেখানে বই তুলে দিতে পারে, সেই রাষ্ট্রই প্রকৃত অর্থে কল্যাণমুখী ও মানবিক রাষ্ট্র হয়ে ওঠে।

কোনো শিশুর শৈশব যেন আর দারিদ্র্যের কাছে পরাজিত না হয়। কোনো শিশুর স্বপ্ন যেন অভাবের অন্ধকারে নিভে না যায়। কোনো মায়ের সন্তান যেন ক্ষুধার তাড়নায় বিদ্যালয়ের পরিবর্তে রাস্তায় নামতে বাধ্য না হয়। রাষ্ট্রের প্রতিটি শিশুর জন্য নিশ্চিত হোক শিক্ষা, নিরাপত্তা, মর্যাদা ও স্বপ্ন দেখার অধিকার।

হাসানের হাতে বই তুলে দেওয়ার এই মানবিক উদ্যোগ ছড়িয়ে পড়ুক প্রতিটি জনপদে। প্রতিটি শিশুর হাতে উঠুক বই, চোখে জ্বলুক স্বপ্নের আলো। আর রাষ্ট্রের প্রতিটি উন্নয়ন পরিকল্পনার কেন্দ্রে স্থান পাক মানুষের জীবন, শিশুর ভবিষ্যৎ ও মানবিক মর্যাদা।

লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও কলামিস্ট
সহযোগী সম্পাদক, আজকের সূর্যোদয়

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

শিশুর হাতে বই তুলে দেওয়ার দায়িত্ব রাষ্ট্রেরও

শিশুর হাতে বই তুলে দেওয়ার দায়িত্ব রাষ্ট্রেরও

আপডেট টাইম : ০৫:৫৭:৫৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬

রফিকুল ইসলামঃ একটি শিশুর হাতে থাকার কথা রঙিন বই, খাতা-পেনসিল; চোখে থাকার কথা স্বপ্নের আলো, মনে থাকার কথা দুরন্ত শৈশবের উচ্ছ্বাস। যে বয়সে বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে সহপাঠীদের সঙ্গে পড়াশোনা, খেলার মাঠে ছুটে চলা কিংবা মায়ের আঁচল ঘেঁষে গল্প শোনার কথা, সেই বয়সে কোনো শিশুকে যদি জীবিকার তাগিদে পথে পথে পণ্য বিক্রি করতে হয়, তবে তা কেবল একটি পরিবারের দারিদ্র্যের নির্মম চিত্র নয়; এটি আমাদের সমাজ, রাষ্ট্র ও সামষ্টিক বিবেকের প্রতিও এক গভীর প্রশ্ন।

যে শিশুর হাতে থাকার কথা ভবিষ্যৎ নির্মাণের হাতিয়ার বই, তার হাতে যদি তুলে দিতে হয় পরিবারের অন্ন জোগানোর দায়িত্ব, যে বয়সে স্বপ্ন দেখার কথা, সেই বয়সে যদি তাকে ক্ষুধা নিবারণের সংগ্রামে নামতে হয়, তবে সেই দায় কি শুধু অসহায় পরিবারটির? নাকি এর দায় রাষ্ট্রেরও?

একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের প্রকৃত পরিচয় শুধু বড় বড় স্থাপনা, সড়ক, সেতু কিংবা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে নয়; বরং তার সবচেয়ে দুর্বল নাগরিক—একটি শিশুর—হাত থেকে জীবিকার বোঝা সরিয়ে সেখানে বই তুলে দিতে পারার সক্ষমতার মধ্যেই নিহিত রয়েছে উন্নয়নের মানবিক সার্থকতা।

শৈশব মানুষের জীবনের এমন এক অমূল্য অধ্যায়, যা একবার হারিয়ে গেলে আর কখনো ফিরে পাওয়া যায় না। অথচ দারিদ্র্য, পারিবারিক বিপর্যয় ও অসহায়ত্বের চাপে অসংখ্য শিশুর সেই অমূল্য সময় হারিয়ে যাচ্ছে জীবিকার কঠিন বাস্তবতায়। তাদের হাতে বইয়ের পরিবর্তে উঠছে উপার্জনের বোঝা, চোখের স্বপ্ন ঢেকে যাচ্ছে অনিশ্চয়তার অন্ধকারে। এমন বাস্তবতায় আট বছর বয়সী শিশু হাসানের জীবন আমাদের বিবেককে গভীরভাবে নাড়া দেয়।

যে বয়সে তার কাঁধে থাকার কথা স্কুলব্যাগ, সে বয়সে পরিবারের অভাব ঘোচাতে হাতে তুলে নিতে হয়েছিল বাদামের প্যাকেট। দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর বাবার মৃত্যু, সংসারে উপার্জনক্ষম মানুষের অভাব এবং মা ও ভাইবোনদের নিয়ে আর্থিক অনটন—সব মিলিয়ে ছোট্ট হাসানের শৈশব যেন অকালেই জীবিকার ভারে নুয়ে পড়েছিল। রাজধানীর বারিধারা এলাকায় ভাড়া বাসায় বসবাসকারী পরিবারটির দুঃসহ বাস্তবতা শিশুটিকে ঠেলে দিয়েছিল উপার্জনের কঠিন পথে।

কিন্তু একটি শিশুর জীবন কি দারিদ্র্যের কাছে এভাবেই পরাজিত হবে? তার স্বপ্ন কি অভাবের অন্ধকারে হারিয়ে যাবে? তার ছোট্ট হাত কি সারাজীবন জীবিকার বোঝাই বহন করবে? এই প্রশ্নগুলোর মানবিক উত্তর খুঁজতেই এগিয়ে এসেছেন ঢাকা জেলা প্রশাসক ফরিদা খানম।

গত ১লা নভেম্বর বিকেল ৩টায় তিনি হাসান ও তার পরিবারের সদস্যদের নিজের কার্যালয়ে ডেকে তাদের দুঃখ-দুর্দশার কথা শোনেন। পরিবারের আর্থিক ও সামাজিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে হাসানের বিদ্যালয়ে ভর্তির ব্যবস্থা করেন এবং পরিবারটির তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবিলায় নগদ আর্থিক সহায়তা প্রদান করেন। ২রা নভেম্বর প্রকাশিত সংবাদেও এ উদ্যোগের বিস্তারিত উঠে আসে।

ঘটনাটি আপাতদৃষ্টিতে ছোট মনে হতে পারে। কিন্তু এর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য অনেক গভীর। কারণ, এখানে শুধু একটি অসহায় পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়নি; বরং একটি শিশুর হারিয়ে যেতে বসা শৈশব, শিক্ষার অধিকার এবং ভবিষ্যতের স্বপ্নকে নতুন করে বাঁচিয়ে রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একজন দায়িত্বশীল প্রশাসকের কাছে ক্ষমতা যে কেবল দাপ্তরিক দায়িত্ব পালনের বিষয় নয়, মানুষের দুঃখ-কষ্ট উপলব্ধি করে তাদের পাশে দাঁড়ানোরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ—হাসানের পাশে দাঁড়িয়ে ফরিদা খানম সেই মানবিক বার্তাই দিয়েছেন।

হাসান একা নয়, পরিসংখ্যানেও স্পষ্ট শিশুশ্রমের নির্মম বাস্তবতা

হাসানের ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন পারিবারিক দুর্ভাগ্যের গল্প নয়; এটি দেশের একটি বড় সামাজিক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। বাংলাদেশের বিভিন্ন শহর, বন্দর, গ্রাম ও জনপদে অসংখ্য শিশু দারিদ্র্য, পারিবারিক অসচ্ছলতা, পিতামাতার মৃত্যু, বিচ্ছেদ কিংবা অসহায়ত্বের কারণে শৈশবেই শ্রমে যুক্ত হচ্ছে। কেউ রাস্তায় পণ্য বিক্রি করছে, কেউ হোটেল-রেস্তোরাঁয় কাজ করছে, কেউ কারখানায়, কেউ আবার গৃহস্থালির কাজে নিয়োজিত। তাদের অনেকেই বিদ্যালয়ে যাওয়ার সুযোগ পায় না; কেউ কেউ ভর্তি হলেও অভাবের কারণে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারে না।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত বাংলাদেশ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে—মিআইসিএস ২০২৫-এর চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেশের শিশুশ্রম পরিস্থিতির একটি উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছে। ২০২৬ সালের জুনে প্রকাশিত এ প্রতিবেদনে দেখা যায়, ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদের ৯.১ শতাংশ শিশুশ্রমে নিয়োজিত। ইউনিসেফের হালনাগাদ তথ্যপাতায় এ হার ৯.২ শতাংশ হিসেবে প্রদর্শিত হয়েছে।

উল্লেখ্য, জরিপের প্রাথমিক ফলাফলে ২০১৯ সালের ৬.৮ শতাংশের তুলনায় শিশুশ্রম বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছিল। তবে মিআইসিএস ২০২৫-এ শিশুশ্রম পরিমাপের সংজ্ঞা ও বয়সভিত্তিক কাজের সময়ের সীমায় পরিবর্তন আনা হয়েছে।

তাই দুটি জরিপের হার তুলনার ক্ষেত্রে পদ্ধতিগত পার্থক্য বিবেচনায় রাখা জরুরি। প্রাথমিক ফলাফলে আগের জরিপের তুলনায় প্রায় ১২ লাখ বেশি শিশু শিশুশ্রমের ঝুঁকিতে পড়ার তথ্যও প্রকাশ করা হয়েছিল।

শুধু শিশুশ্রম নয়, শিক্ষাক্ষেত্রেও রয়েছে উদ্বেগজনক চিত্র। মিআইসিএস ২০২৫-এর তথ্য অনুযায়ী, প্রাথমিক বিদ্যালয় বয়সী শিশুদের ৬.৫ শতাংশ বিদ্যালয়ের বাইরে। নিম্নমাধ্যমিক বয়সীদের ক্ষেত্রে এই হার ১৩.১ শতাংশ এবং উচ্চমাধ্যমিক বয়সীদের ক্ষেত্রে ৩৩.৯ শতাংশ। প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করার হার ৮৩.৭ শতাংশ হলেও নিম্নমাধ্যমিকে তা ৬৯.৩ শতাংশ এবং উচ্চমাধ্যমিকে নেমে এসেছে মাত্র ৪৩.৯ শতাংশে। প্রাথমিক পর্যায়ে সমন্বিত নিট উপস্থিতির হার ৮৫ শতাংশ হলেও উচ্চমাধ্যমিকে তা ৫০.৮ শতাংশ।

অর্থাৎ শুধু বিদ্যালয়ে ভর্তি করানোই যথেষ্ট নয়; শিক্ষার ধারাবাহিকতা, ঝরে পড়া প্রতিরোধ এবং মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের ধরে রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

আরও উদ্বেগের বিষয়, বিদ্যালয়ের বাইরে থাকা শিশুদের মধ্যে শিশুশ্রমে যুক্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি। মিআইসিএসের প্রাথমিক বিশ্লেষণে বিদ্যালয়ে না যাওয়া শিশুদের শিশুশ্রমে যুক্ত হওয়ার প্রবণতা বিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত শিশুদের তুলনায় প্রায় চার গুণ বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। দারিদ্র্য ও শিক্ষাবঞ্চনা এভাবেই একে অন্যকে আরও গভীর করে তোলে। একটি শিশু বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়লে তার শ্রমে যুক্ত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ে; আবার শ্রমে যুক্ত হলে তার বিদ্যালয়ে ফিরে আসার পথও কঠিন হয়ে যায়।

এসব পরিসংখ্যানের প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি শিশুর অপূর্ণ শৈশব, একটি পরিবারের অসহায়ত্ব এবং একটি সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা। আমরা রাস্তায় শিশুদের শ্রম করতে দেখি, তাদের কাছ থেকে পণ্য কিনি, দরদাম করি; কিন্তু সেই শিশুটির হাতে বই তুলে দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা কতবার উপলব্ধি করি?

একবার ভাবুন, যে শিশুটি রাস্তায় বাদাম বিক্রি করছে, তারও হয়তো ইচ্ছা করে বিদ্যালয়ের মাঠে বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে, নতুন বইয়ের পাতা উল্টাতে কিংবা বড় হয়ে চিকিৎসক, শিক্ষক, প্রকৌশলী বা সরকারি কর্মকর্তা হতে। কিন্তু তার স্বপ্নের পথে দাঁড়িয়ে আছে ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও পারিবারিক অসহায়ত্ব। এই বাস্তবতায় শিশুটিকে শুধু শ্রম থেকে সরিয়ে দিলেই চলবে না; তার পরিবারের জীবনযাপনের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে হবে।

আইন আছে, ২০২৬ সালের সংশোধনও হয়েছে; প্রয়োজন কার্যকর বাস্তবায়ন

শিশুর শিক্ষা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার সাংবিধানিক অঙ্গীকার আমাদের রয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫ অনুচ্ছেদে খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ মৌলিক প্রয়োজন পূরণকে রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে ১৭ অনুচ্ছেদে সব শিশুর জন্য আইন দ্বারা নির্ধারিত পর্যায় পর্যন্ত অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণে রাষ্ট্রকে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর ২ ধারার সংজ্ঞা অনুযায়ী, ১৪ বছর পূর্ণ করেনি এমন ব্যক্তি শিশু। আইনের ৩৪(১) ধারায় কোনো পেশা বা প্রতিষ্ঠানে শিশুকে নিয়োগ কিংবা কাজ করানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ১৪ বছর পূর্ণ কিন্তু ১৮ বছর পূর্ণ হয়নি—এমন ব্যক্তিকে কিশোর হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাদের কাজে নিয়োগের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের সক্ষমতা সনদসহ নির্দিষ্ট শর্ত রয়েছে।

আইনের ২৮৪ ধারায় শিশু বা কিশোরকে আইন লঙ্ঘন করে কাজে নিয়োজিত করার জন্য ২০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।

এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ হালনাগাদ তথ্য উল্লেখ করা প্রয়োজন। ২০২৬ সালের ১০ই এপ্রিল বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধন) আইন, ২০২৬ জাতীয় সংসদে প্রণীত হয় এবং ১০ই এপ্রিলের সরকারি গেজেটে প্রকাশিত হয়। ফলে শিশুশ্রমসংক্রান্ত আইনি আলোচনা করতে গিয়ে শুধু ২০০৬ সালের মূল আইন নয়, ২০২৬ সালের সংশোধনীসহ কার্যকর আইন বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।

তবে আইন সংশোধন কিংবা শাস্তির বিধান বাড়ালেই শিশুশ্রম নির্মূল হবে না। আইনের প্রকৃত সার্থকতা তখনই প্রতিষ্ঠিত হবে, যখন কোনো শিশু অভাবের কারণে বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়বে না কিংবা জীবিকার দায়ে শৈশব বিসর্জন দিতে বাধ্য হবে না। বিশেষ করে অনানুষ্ঠানিক খাত, পথের ব্যবসা, ক্ষুদ্র দোকান, পরিবহন ও গৃহস্থালির কাজে নিয়োজিত শিশুদের শনাক্ত ও সুরক্ষার ক্ষেত্রে আরও কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন।

শিশুশ্রম নিরসনে ২০২১–২০২৫ মেয়াদের জাতীয় কর্মপরিকল্পনার পরবর্তী ধাপও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৬ সালের ১২ই জানুয়ারি বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) প্রকাশিত প্রতিবেদনে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সরকারি নথির বরাতে জানানো হয়, ২০২৬–২০৩০ মেয়াদের নতুন জাতীয় কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পরবর্তী সময়ে ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় নতুন কর্মপরিকল্পনার খসড়া প্রণীত হওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

নতুন পরিকল্পনায় আইন সংস্কার, পরিদর্শনব্যবস্থা জোরদার, সামাজিক সুরক্ষা, দরিদ্র পরিবারের জীবিকার সহায়তা, ঝুঁকিপূর্ণ কাজ থেকে শিশুদের প্রত্যাহার, পুনর্বাসন ও শিক্ষায় ফিরিয়ে আনার বিষয়গুলো গুরুত্ব পাওয়ার কথা।

বাসসের প্রকাশিত সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট এক বছরের হিসাবে শিশুশ্রম থেকে ৩ হাজার ৪৫৩ শিশুকে প্রত্যাহার করা হয়েছে, ১১ হাজার ৬৯১টি বিশেষ পরিদর্শন পরিচালিত হয়েছে এবং এ-সংক্রান্ত ১৬টি মামলা করা হয়েছে।

এ পরিসংখ্যান অবশ্যই উদ্যোগের পরিচায়ক; কিন্তু দেশের সামগ্রিক শিশুশ্রম পরিস্থিতির তুলনায় এর ব্যাপ্তি ও কার্যকারিতা মূল্যায়ন করা জরুরি। এখন প্রয়োজন পরিকল্পনাটিকে সময়সীমাবদ্ধ, বাস্তবসম্মত ও জবাবদিহিমূলক কর্মসূচিতে রূপ দেওয়া। শুধু ঝুঁকিপূর্ণ শ্রম থেকে শিশুদের উদ্ধার নয়, তাদের পুনর্বাসন, পরিবারকে আর্থিকভাবে সক্ষম করা এবং শিক্ষায় ফিরিয়ে আনার বিষয়গুলোকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

শিশুর হাতে বই তুলে দিতে রাষ্ট্রের যে উদ্যোগগুলো জরুরি

এখানেই রাষ্ট্রের দায়িত্বের প্রশ্নটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। একজন জেলা প্রশাসক কিংবা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মানবিক উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। কিন্তু দেশের প্রতিটি অসহায় শিশুর জীবন পরিবর্তনের দায়িত্ব শুধু বিচ্ছিন্ন কিছু মানবিক উদ্যোগের ওপর ছেড়ে দেওয়া যায় না।

এর জন্য প্রয়োজন সরকারের সুস্পষ্ট নীতি, পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ, কার্যকর কর্মপরিকল্পনা এবং জবাবদিহিমূলক বাস্তবায়নব্যবস্থা।

প্রথমত, প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া, শিশুশ্রমে নিয়োজিত, পিতৃহীন, মাতৃহীন, এতিম, প্রতিবন্ধী এবং চরম দারিদ্র্যে থাকা শিশুদের একটি নির্ভরযোগ্য তথ্যভান্ডার তৈরি করতে হবে। স্থানীয় প্রশাসন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, জনপ্রতিনিধি ও সমাজসেবা অধিদপ্তরের সমন্বয়ে এসব শিশুকে শনাক্ত করে তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি।

দ্বিতীয়ত, ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের জন্য বিশেষ শিক্ষা সহায়তা, উপবৃত্তি, বিনামূল্যে বই-খাতা, পোশাক, পুষ্টিকর খাবার, চিকিৎসা ও যাতায়াত সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে যেসব পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি মারা গেছেন বা দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতায় ভুগছেন, তাদের সন্তানদের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি চালু করা প্রয়োজন।

তৃতীয়ত, শিশুশ্রম প্রতিরোধে শুধু আইন প্রণয়ন কিংবা মাঝেমধ্যে অভিযান পরিচালনা যথেষ্ট নয়। নিয়মিত তদারকি, ঝুঁকিপূর্ণ কর্মক্ষেত্র চিহ্নিতকরণ, শিশুদের উদ্ধার ও নিরাপদ পুনর্বাসন এবং সংশ্লিষ্ট আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। তবে কোনো শিশুকে শ্রম থেকে সরিয়ে আনার পর তার শিক্ষা ও পরিবারের জীবিকার বিকল্প ব্যবস্থা না করলে সে আবারও শ্রমে ফিরে যেতে পারে। তাই শিশুর পাশাপাশি পরিবারকেও সহায়তার আওতায় আনতে হবে।

চতুর্থত, অসহায় পরিবারের উপার্জনক্ষম সদস্যদের কর্মসংস্থান, কারিগরি প্রশিক্ষণ, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সহায়তা ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী বিধবা, স্বামীহারা, অসুস্থ বা কর্মক্ষমতাহীন অভিভাবকদের জন্য বিশেষ সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। কারণ, পরিবারের ক্ষুধা ও অনিশ্চয়তা দূর না করে শিশুশ্রম বন্ধের উদ্যোগ দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না।

পঞ্চমত, শিক্ষা, সমাজকল্যাণ, শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তুলতে হবে। প্রতিটি জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের জন্য বার্ষিক ‘শিশুশ্রমমুক্ত ও বিদ্যালয়ে প্রত্যাবর্তন কর্মপরিকল্পনা’ গ্রহণ করা যেতে পারে। কতজন শিশুকে শ্রম থেকে ফিরিয়ে আনা হলো, কতজনকে বিদ্যালয়ে ভর্তি করা হলো, কতজন নিয়মিত পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে এবং কতটি পরিবার পুনর্বাসিত হলো—এসব সূচকের ভিত্তিতে অগ্রগতি মূল্যায়ন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

ষষ্ঠত, শিশুশ্রম নিরসনে শুধু সরকারি উদ্যোগের ওপর নির্ভর না করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, শিল্পমালিক, ব্যবসায়ী সংগঠন ও উন্নয়ন সহযোগীদের সম্পৃক্ত করতে হবে। শিশু শ্রমিক নিয়োগের বিরুদ্ধে সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি শিশুশ্রমমুক্ত পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থা নিশ্চিত করার উদ্যোগও প্রয়োজন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, এসব কর্মসূচির জন্য জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ করতে হবে। শুধু পরিকল্পনা কিংবা প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়মিত মূল্যায়ন করতে হবে।

মানবিক প্রশাসনের উদ্যোগ ছড়িয়ে পড়ুক প্রতিটি জনপদে

ঢাকা জেলা প্রশাসক ফরিদা খানমের উদ্যোগটি এ ক্ষেত্রে একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। তিনি শুধু সহানুভূতি প্রকাশ করে দায়িত্ব শেষ করেননি; বরং শিশুটির শিক্ষার ব্যবস্থা এবং পরিবারের তাৎক্ষণিক প্রয়োজন বিবেচনায় বাস্তব সহায়তা দিয়েছেন। তাঁর এই উদ্যোগে মানবিকতা, দায়িত্ববোধ ও প্রশাসনিক সক্রিয়তার সুন্দর সমন্বয় ঘটেছে।

তবে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা জরুরি—শিশুকে বিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়ে দেওয়াই দায়িত্বের শেষ নয়; বরং তার শিক্ষাজীবন যেন আর্থিক সংকটের কারণে আবারও থমকে না যায়, সেটি নিশ্চিত করাই প্রকৃত সাফল্য।

৬ই নভেম্বর পর্যন্ত প্রকাশিত সংবাদে হাসানের বিদ্যালয়ে ভর্তির ব্যবস্থা ও পরিবারের জন্য নগদ সহায়তার তথ্য পাওয়া গেলেও তার নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিতি, শ্রেণিকক্ষে পড়াশোনা এবং পরবর্তী শিক্ষাজীবনের অগ্রগতি সম্পর্কে বিস্তারিত অনুসরণমূলক তথ্য এখনো স্পষ্টভাবে সামনে আসেনি। এ বিষয়টি সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের নজরে রাখা প্রয়োজন।

শুধু প্রাথমিকভাবে ভর্তির ব্যবস্থা ও আর্থিক সহায়তার তথ্য নয়, পরবর্তী সময়ে শিশুটির শিক্ষাজীবনে কী ধরনের অগ্রগতি হলো, সেটিও অনুসরণ করা জরুরি। এতে একদিকে যেমন উদ্যোগটির স্থায়িত্ব ও বাস্তব সাফল্য যাচাই করা সম্ভব হবে, অন্যদিকে ঘটনাটির মানবিক তাৎপর্য ও নিবন্ধে উপস্থাপিত তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতাও আরও দৃঢ় হবে।

কারণ, একটি শিশুকে একদিনের জন্য শ্রম থেকে সরিয়ে আনা আর তার ভবিষ্যৎকে শ্রমমুক্ত ও শিক্ষামুখী করে তোলা এক বিষয় নয়। পরিবারের আর্থিক সংকট অব্যাহত থাকলে শিশুটি আবারও উপার্জনের পথে ফিরে যেতে বাধ্য হতে পারে। তাই হাসানের পড়াশোনার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে পরিবারটির আর্থিক অবস্থারও নিয়মিত খোঁজ নেওয়া প্রয়োজন।

এই উদ্যোগের প্রকৃত সার্থকতা হবে তখনই, যখন তা দেশের অন্যান্য জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের জন্যও অনুসরণীয় হয়ে উঠবে। প্রতিটি জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা আন্তরিকভাবে উদ্যোগী হলে নিজ নিজ এলাকায় এমন অসংখ্য শিশুকে শনাক্ত করে তাদের জীবন বদলে দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

এ জন্য স্থানীয় পর্যায়ে জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, সমাজকর্মী, সাংবাদিক, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও সামর্থ্যবান ব্যক্তিদের সম্পৃক্ত করতে হবে। স্থানীয়ভাবে শিক্ষা সহায়তা তহবিল গঠন, মেধাবী ও অসচ্ছল শিশুদের বৃত্তি প্রদান এবং পরিবারভিত্তিক পুনর্বাসন কর্মসূচি গ্রহণ করা যেতে পারে। তবে এসব উদ্যোগ কোনো ব্যক্তির সদিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল না রেখে প্রাতিষ্ঠানিক ও ধারাবাহিক কর্মসূচিতে পরিণত করতে হবে।

শুধু এককালীন আর্থিক সহায়তা কিংবা বিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়েই দায়িত্ব শেষ করা যাবে না। শিশুটি নিয়মিত বিদ্যালয়ে যাচ্ছে কি না, পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারছে কি না, পরিবার আবার তাকে শ্রমে পাঠাচ্ছে কি না—এসব বিষয় নিয়মিত তদারক করতে হবে। বিশেষ করে পিতৃহীন বা মাতৃহীন শিশুদের ক্ষেত্রে অভিভাবকত্ব, মানসিক সহায়তা ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করাও জরুরি।

শিক্ষা অনুগ্রহ নয়, প্রতিটি শিশুর অধিকার

মনে রাখতে হবে, দরিদ্র পরিবারের শিশুরা করুণা পাওয়ার জন্য জন্মায়নি। তাদেরও রয়েছে সমান মর্যাদা, সমান অধিকার এবং স্বপ্ন দেখার অধিকার। শিক্ষা কোনো দয়া বা অনুগ্রহ নয়; এটি প্রতিটি শিশুর অধিকার। একটি শিশুকে বিদ্যালয়ে ফিরিয়ে দেওয়া মানে শুধু তাকে অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন করা নয়; বরং তাকে আত্মমর্যাদা, আত্মনির্ভরতা ও সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া।

শিশুর শিক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি তার মানসিক নিরাপত্তা, ভালোবাসা, পুষ্টি ও সুরক্ষার বিষয়টিও সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। কারণ, অর্থের অভাব যেমন শিশুকে শ্রমে ঠেলে দেয়, তেমনি ভালোবাসা ও নিরাপত্তার অভাব তার স্বাভাবিক মানসিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে।

একটি শিশুর পাশে দাঁড়ানো তাই কেবল তাৎক্ষণিক মানবিক সহায়তা নয়; এটি একটি শিশুবান্ধব, দায়িত্বশীল ও বৈষম্যহীন সমাজ গঠনের অঙ্গীকার।

এ ক্ষেত্রে সমাজেরও দায়িত্ব রয়েছে। আশপাশে কোনো শিশুকে শ্রমে নিয়োজিত দেখলে শুধু সহানুভূতি প্রকাশ নয়, তার সমস্যার কারণ অনুসন্ধান এবং সম্ভব হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা প্রয়োজন। বিত্তবান ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষা সহায়তা, বৃত্তি, পুনর্বাসন এবং পরিবারভিত্তিক সহযোগিতার মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

গণমাধ্যমেরও দায়িত্ব শুধু শিশুর দুর্দশার চিত্র তুলে ধরা নয়; বরং সমস্যার কারণ, প্রশাসনের করণীয় এবং কার্যকর সমাধানের পথও সামনে আনা। একই সঙ্গে শিশুশ্রমের পেছনে থাকা দারিদ্র্য, বৈষম্য, সামাজিক নিরাপত্তার ঘাটতি ও শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতাগুলোও জনপরিসরে আলোচনায় আনতে হবে।

মানুষের মুখে হাসি ফোটানোই উন্নয়নের প্রকৃত সার্থকতা

মোদ্দা কথা, হাসানের হাতে বাদামের প্যাকেটের পরিবর্তে বই তুলে দেওয়ার এই উদ্যোগ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—একটি শিশুর জীবন বদলে দিতে সব সময় বিশাল আয়োজনের প্রয়োজন হয় না; প্রয়োজন সংবেদনশীল দৃষ্টি, আন্তরিক সদিচ্ছা এবং সময়োপযোগী পদক্ষেপ। একজন দায়িত্বশীল মানুষ এগিয়ে এলে একটি পরিবার আশার আলো দেখতে পারে, একটি শিশু ফিরে পেতে পারে তার হারিয়ে যাওয়া শৈশব।

রাষ্ট্রের উন্নয়ন শুধু বড় বড় অবকাঠামো, দৃষ্টিনন্দন সড়ক, সেতু কিংবা সুউচ্চ স্থাপনা নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। উন্নয়নের প্রকৃত সৌন্দর্য ও সার্থকতা নিহিত রয়েছে মানুষের জীবনমানের ইতিবাচক পরিবর্তন, মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা এবং সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর মধ্যেও।

একটি রাষ্ট্র কতটা উন্নত, তা কেবল তার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কিংবা দৃশ্যমান স্থাপনার উচ্চতা দিয়ে পরিমাপ করা যায় না; বরং কতজন অসহায় শিশুকে অন্ধকার ও অনিশ্চয়তার জীবন থেকে তুলে এনে শিক্ষার আলোয় আলোকিত করা গেল, কতটি শিশুর হাতে বই তুলে দিয়ে স্বপ্ন দেখার সাহস জোগানো গেল, কতটি পরিবারের দুঃখ-দুর্দশা লাঘব করে তাদের জীবনে আশার প্রদীপ জ্বালানো গেল—সেই মানবিক অর্জনের হিসাবেও উন্নয়নের প্রকৃত মানদণ্ড নির্ধারিত হয়।

কারণ, একটি শিশুর শিক্ষিত হয়ে ওঠা মানে শুধু একটি জীবনের পরিবর্তন নয়; এর মধ্য দিয়ে আলোকিত হয় একটি পরিবার, সমৃদ্ধ হয় একটি সমাজ এবং শক্তিশালী হয় ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রের ভিত। ইট-পাথরের স্থাপনা রাষ্ট্রের বাহ্যিক অবয়ব নির্মাণ করে, আর মানুষের মুখে হাসি ফোটানো, শিশুর স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখা এবং অসহায় জীবনে আশার আলো জ্বালানো নির্মাণ করে রাষ্ট্রের প্রকৃত মর্যাদা ও মানবিক পরিচয়।

আমরা চাই, হাসানের জন্য নেওয়া এই উদ্যোগ যেন কেবল প্রশংসার বিষয় হয়ে না থাকে; বরং রাষ্ট্রীয় দায়িত্ববোধ জাগ্রত করার একটি কার্যকর দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠে। সরকারের নীতিনির্ধারক থেকে শুরু করে মাঠপর্যায়ের প্রশাসন পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে শিশুর অধিকার ও নিরাপদ শৈশব নিশ্চিত করার অঙ্গীকার বাস্তবায়িত হোক।

এছাড়া দেশের প্রতিটি জেলা ও উপজেলা প্রশাসন নিজ নিজ এলাকায় এমন শিশুদের খুঁজে বের করুক। তাদের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করতে এগিয়ে আসুক সরকার ও প্রশাসন; সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিক জনপ্রতিনিধি, সমাজের সামর্থ্যবান মানুষ ও সচেতন নাগরিকেরা।

একটি শিশুর চোখের জল মুছে দেওয়া শুধু মানবিকতার পরিচয় নয়, এটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব পালনেরও অনন্য দৃষ্টান্ত।
যে রাষ্ট্র তার সবচেয়ে অসহায় শিশুটির হাত থেকে জীবিকার বোঝা সরিয়ে সেখানে বই তুলে দিতে পারে, সেই রাষ্ট্রই প্রকৃত অর্থে কল্যাণমুখী ও মানবিক রাষ্ট্র হয়ে ওঠে।

কোনো শিশুর শৈশব যেন আর দারিদ্র্যের কাছে পরাজিত না হয়। কোনো শিশুর স্বপ্ন যেন অভাবের অন্ধকারে নিভে না যায়। কোনো মায়ের সন্তান যেন ক্ষুধার তাড়নায় বিদ্যালয়ের পরিবর্তে রাস্তায় নামতে বাধ্য না হয়। রাষ্ট্রের প্রতিটি শিশুর জন্য নিশ্চিত হোক শিক্ষা, নিরাপত্তা, মর্যাদা ও স্বপ্ন দেখার অধিকার।

হাসানের হাতে বই তুলে দেওয়ার এই মানবিক উদ্যোগ ছড়িয়ে পড়ুক প্রতিটি জনপদে। প্রতিটি শিশুর হাতে উঠুক বই, চোখে জ্বলুক স্বপ্নের আলো। আর রাষ্ট্রের প্রতিটি উন্নয়ন পরিকল্পনার কেন্দ্রে স্থান পাক মানুষের জীবন, শিশুর ভবিষ্যৎ ও মানবিক মর্যাদা।

লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও কলামিস্ট
সহযোগী সম্পাদক, আজকের সূর্যোদয়