ঢাকা ১০:৪২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ২৪ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
শূন্য থেকে শিখরে ওঠার গল্প, ‘স্মার্ট উদ্যোক্তা’ ও স্বনির্ভর বাংলাদেশের স্বপ্ন মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রতি সহমর্মিতার আহ্বান রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার জন্য নয়, রাজনীতি হতে হবে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য : এলজিআরডি মন্ত্রী ৭ নভেম্বর গ্রাম পুলিশ সমাবেশ, প্রধান অতিথি প্রধানমন্ত্রী মানসিক অসুস্থতাকে ঘিরে ভয়, লজ্জা, কুসংস্কার ও বৈষম্য দূর করার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ১১ কর্মকর্তার পদোন্নতি ধর্ম যার যার এই বাংলাদেশ সবার: পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা এখন রিকশাচালক হিসেবে হাজির হয়েছে : চিফ হুইপ নিষেধাজ্ঞার মাঝেও চলছে ইলিশ শিকার নতুন বাজেটে প্রবাসী শ্রমিকদের সুখবর দিল মালয়েশিয়া

শূন্য থেকে শিখরে ওঠার গল্প, ‘স্মার্ট উদ্যোক্তা’ ও স্বনির্ভর বাংলাদেশের স্বপ্ন

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ০৯:৩৯:২৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৯ অক্টোবর ২০২৬
  • ১১ বার

হাওর বার্তা সম্পাদকীয় ডেস্কঃ জীবন সব সময় মানুষের জন্য মসৃণ পথ তৈরি করে দেয় না। কখনো শোক, কখনো দারিদ্র্য, কখনো শারীরিক যন্ত্রণা, আবার কখনো ব্যবসায়িক বিপর্যয়—নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে মানুষকে নিজের অস্তিত্বের প্রমাণ দিতে হয়। কেউ প্রতিকূলতার কাছে হার মানেন, কেউ আবার সেই প্রতিকূলতাকেই শক্তিতে রূপান্তর করে এগিয়ে যাওয়ার পথ তৈরি করেন। লেখক মোহাম্মদ সফিকুল ইসলাম বিক্রমপুরীর ‘স্মার্ট উদ্যোক্তা—গ্লোবাল বিজয় ও স্বনির্ভর বাংলাদেশ বিনির্মাণের মহাপরিকল্পনা’ গ্রন্থটি এমনই এক জীবনসংগ্রাম, আত্মবিশ্বাস ও উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার প্রত্যয়ের কথা তুলে ধরেছে।

বইটি কেবল একজন মানুষের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বর্ণনা নয়; এর বিষয়বস্তুর মধ্যে রয়েছে প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই, ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা, আত্মনির্ভরতার দর্শন এবং দেশের তরুণ সমাজকে কর্মমুখী করে তোলার ভাবনা। একজন মানুষের জীবনসংগ্রাম কীভাবে অন্যের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে উঠতে পারে, সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার একটি প্রয়াস এই গ্রন্থ।

শোক ও দারিদ্র্য পেরিয়ে এগিয়ে চলার প্রত্যয়

লেখকের জীবনপথের সূচনাতেই রয়েছে গভীর শোকের স্মৃতি। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, ১৯৭৫ সালে পিতা ও বীর মুক্তিযোদ্ধা বড় ভাইকে হারানোর বেদনাবিধুর অভিজ্ঞতা তাঁকে অল্প বয়সেই কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায়। গুলিস্তানের ফুটপাতে মাত্র ১০ টাকা বেতনে হকারের কাজ দিয়ে শুরু হয় তাঁর জীবনসংগ্রাম। পরবর্তী সময়ে মাত্র ১৯ টাকা সম্বল করে সিলেটে নতুনভাবে পথচলার যে অভিজ্ঞতার কথা তিনি তুলে ধরেছেন, তা তাঁর অধ্যবসায় ও ঘুরে দাঁড়ানোর আকাঙ্ক্ষার পরিচায়ক।

জীবনের শুরুতে সীমিত সামর্থ্য নিয়ে পথচলা মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো নিজের ওপর বিশ্বাস ধরে রাখা। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, সামাজিক সীমাবদ্ধতা ও প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যেও সামনে এগিয়ে যাওয়ার মানসিকতা একজন মানুষকে নতুন সম্ভাবনার সন্ধান দিতে পারে। লেখকের জীবনকথায় সেই মানসিক দৃঢ়তার প্রতিফলন রয়েছে।

দুর্ঘটনা ও বিপর্যয়েও থেমে না যাওয়ার শিক্ষা

গ্রন্থটির সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায়গুলোর একটি লেখকের ২০২০ সালের ১০ সেপ্টেম্বরের সড়ক দুর্ঘটনা। লেখকের বর্ণনা অনুসারে, ভয়াবহ ওই দুর্ঘটনায় তিনি গুরুতর আহত হন। মাথায় গভীর ক্ষত ও পায়ের মারাত্মক আঘাতের কারণে তাঁকে দীর্ঘ শারীরিক কষ্টের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। হুইলচেয়ার ও লাঠির সহায়তায় চলাফেরার বাস্তবতা তাঁর স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তোলে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয় করোনা মহামারির অভিঘাত এবং ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তা। জাফলংয়ের ‘ক্ষুধা রেস্টুরেন্ট’ হারানো থেকে শুরু করে পূর্বাচল নীলামার্কেটের ‘হাঙ্গার রেস্টুরেন্ট’ বন্ধ করতে বাধ্য হওয়ার অভিজ্ঞতা তাঁর উদ্যোক্তা জীবনের কঠিন অধ্যায়গুলোর অংশ। এসব ঘটনা একজন মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থার পাশাপাশি তাঁর মানসিক শক্তিরও পরীক্ষা নেয়।

তবে ব্যর্থতা মানেই জীবনের সমাপ্তি নয়। বরং ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়া, পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া এবং নতুনভাবে পরিকল্পনা করার মধ্য দিয়েই ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়। ‘স্মার্ট উদ্যোক্তা’ গ্রন্থের জীবনঘনিষ্ঠ অভিজ্ঞতাগুলো থেকে এই শিক্ষাই গ্রহণ করতে পারেন পাঠকেরা।

চাকরির প্রত্যাশা থেকে উদ্যোক্তা হওয়ার মানসিকতা

বাংলাদেশের বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসংস্থান একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় চ্যালেঞ্জ। প্রতি বছর শিক্ষাজীবন শেষ করে অসংখ্য তরুণ চাকরির বাজারে প্রবেশ করেন। কিন্তু সবার জন্য উপযুক্ত চাকরির সুযোগ তৈরি করা সম্ভব হয় না। এ বাস্তবতায় আত্মকর্মসংস্থান, ক্ষুদ্র উদ্যোগ এবং দক্ষতাভিত্তিক ব্যবসা গড়ে তোলার গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে।

এই প্রেক্ষাপটে মোহাম্মদ সফিকুল ইসলাম বিক্রমপুরীর বইটি উদ্যোক্তা হওয়ার মানসিকতা তৈরির ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। গ্রন্থে ‘স্মার্ট বিল্ডার’, ‘নিউ এন্টারপ্রাইজ’ ও ‘পাওয়ারনেস্ট’-এর মতো উদ্যোগের অভিজ্ঞতার পাশাপাশি ক্ষুদ্র পুঁজি থেকে বড় শিল্পপ্রকল্পের দিকে এগিয়ে যাওয়ার ধারণা তুলে ধরা হয়েছে।

মাত্র ১০ হাজার টাকা থেকে উদ্যোগের সূচনা করে বড় শিল্পপ্রকল্পের স্বপ্ন দেখার বিষয়টি তরুণদের কল্পনাশক্তিকে প্রসারিত করতে পারে। তবে বাস্তবে এ ধরনের উদ্যোগ সফল করতে প্রয়োজন সঠিক ব্যবসায়িক পরিকল্পনা, বাজার বিশ্লেষণ, দক্ষ জনবল, পর্যাপ্ত অর্থায়ন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিশ্রম। স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে অনুপ্রেরণার পাশাপাশি এসব বাস্তব শর্ত পূরণ করাও অপরিহার্য।

চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে দক্ষতাই বড় সম্পদ

বর্তমান বিশ্ব দ্রুত প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন, ডিজিটাল প্রযুক্তি ও আধুনিক উৎপাদনব্যবস্থা কর্মক্ষেত্রের ধরন বদলে দিচ্ছে। ফলে শুধু প্রাতিষ্ঠানিক সনদ নয়, বাস্তব দক্ষতা, প্রযুক্তিগত জ্ঞান, সৃজনশীলতা ও সমস্যা সমাধানের সক্ষমতাও কর্মজীবনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

গ্রন্থে ‘ডিজিটাল স্কিল পাসপোর্ট’ এবং ‘যৌথ মেশিনারি কেন্দ্র’ বা সিএমসি (CMC)-এর মতো ধারণার মাধ্যমে দক্ষতা উন্নয়ন, যন্ত্রপাতির যৌথ ব্যবহার এবং উদ্যোক্তাদের জন্য সুযোগ সৃষ্টির কথা বলা হয়েছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যয়বহুল যন্ত্রপাতি যৌথভাবে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করা গেলে উৎপাদন ব্যয় কমানো এবং নতুন উদ্যোগের পথ সুগম করার সম্ভাবনা রয়েছে।

তবে এসব ধারণাকে কার্যকর করতে হলে প্রয়োজন সুস্পষ্ট নীতিমালা, প্রশিক্ষণ অবকাঠামো, আর্থিক সহায়তা, প্রযুক্তিগত তদারকি এবং সরকারি-বেসরকারি সমন্বয়। পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মধ্যে কার্যকর সংযোগ তৈরি করা গেলে এ ধরনের উদ্যোগ কর্মসংস্থান সম্প্রসারণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়তে প্রয়োজন বাস্তবভিত্তিক উদ্যোগ

স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে উৎপাদন বৃদ্ধি, দক্ষ জনশক্তি তৈরি, উদ্যোক্তাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার প্রশ্ন। একটি কার্যকর উদ্যোক্তা সংস্কৃতি গড়ে উঠলে স্থানীয় সম্পদ ও সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সম্ভব।

বিশেষ করে গ্রাম, হাওর ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের তরুণদের জন্য প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে ঋণ, বাজারসংযোগ, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং ক্ষুদ্র শিল্প স্থাপনের সুযোগ বাড়ানো জরুরি। রাজধানীকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বাইরে জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও উদ্যোক্তা তৈরির পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে।

‘স্মার্ট উদ্যোক্তা’ গ্রন্থে স্বনির্ভরতার যে প্রত্যয় তুলে ধরা হয়েছে, তা এই বৃহত্তর জাতীয় ভাবনার সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে বইয়ের ধারণাগুলো বাস্তব অর্থনীতিতে কতটা কার্যকর হতে পারে, তা নির্ভর করবে সেগুলোর প্রয়োগযোগ্যতা, বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং ফলাফলের ওপর।

বইটির গুরুত্ব ও সম্পাদকীয় মূল্যায়ন

গ্রন্থটিতে লেখকের জীবনদর্শন, ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা এবং আত্মবিশ্বাস জাগানিয়া ২৫০টি বাণী স্থান পেয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি বাংলা সাহিত্য বিষয়ে অভিজ্ঞ শিক্ষক পি সি দীপের ভাষাশৈলী এবং গুগলের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তির সহায়তায় তথ্য সংগ্রহ ও বিন্যাসের প্রসঙ্গও তুলে ধরা হয়েছে। এসব উপাদানের যথাযথ সমন্বয় বইটিকে পাঠকের কাছে আরও সহজবোধ্য করে তুলতে পারে।

তবে কোনো গ্রন্থের প্রকৃত মূল্যায়ন শুধু এর বিষয়বস্তু, ভাষার সৌন্দর্য কিংবা লেখকের ব্যক্তিগত সংগ্রামের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এর ধারণাগুলো পাঠককে কতটা নতুনভাবে ভাবতে শেখায়, বাস্তব সমস্যার সমাধানে কতটা সহায়তা করে এবং সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তনের অনুপ্রেরণা জোগায়—সেই বিবেচনাও গুরুত্বপূর্ণ।

‘স্মার্ট উদ্যোক্তা’ গ্রন্থের মূল শক্তি হলো প্রতিকূলতার মধ্যেও নতুন করে শুরু করার প্রত্যয় এবং তরুণদের কর্মমুখী হওয়ার আহ্বান। বিশেষ করে যারা সীমিত পুঁজি, অনিশ্চয়তা ও অভিজ্ঞতার অভাবে ব্যবসা শুরু করতে ভয় পান, তাঁদের জন্য এ ধরনের জীবনঘনিষ্ঠ লেখা চিন্তার নতুন দরজা খুলে দিতে পারে।

শেষ কথা

মানুষের জীবনে সাফল্য কখনো একদিনে আসে না। এর পেছনে থাকে অসংখ্য ব্যর্থতা, কঠিন সিদ্ধান্ত, ত্যাগ, পরিশ্রম এবং বারবার উঠে দাঁড়ানোর সাহস। একজন উদ্যোক্তার জীবনসংগ্রাম তখনই বৃহত্তর তাৎপর্য লাভ করে, যখন তাঁর অভিজ্ঞতা অন্যদের পথ চলতে সাহায্য করে।

মোহাম্মদ সফিকুল ইসলাম বিক্রমপুরীর ‘স্মার্ট উদ্যোক্তা—গ্লোবাল বিজয় ও স্বনির্ভর বাংলাদেশ বিনির্মাণের মহাপরিকল্পনা’ গ্রন্থটি সেই সম্ভাবনার কথাই সামনে আনে। বইটি পাঠকের মধ্যে উদ্যোক্তা হওয়ার আগ্রহ, আত্মবিশ্বাস এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির মানসিকতা জাগিয়ে তুলতে পারলে এর প্রকাশনা সার্থকতা পাবে।

আমাদের প্রত্যাশা, ব্যক্তিগত জীবনসংগ্রামের অভিজ্ঞতা ও উদ্যোক্তা হওয়ার ভাবনা থেকে তরুণ প্রজন্ম বাস্তবসম্মত শিক্ষা গ্রহণ করবে। কারণ স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ার জন্য শুধু বড় স্বপ্ন দেখাই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন দক্ষতা, সততা, উদ্ভাবনী চিন্তা, পরিকল্পিত উদ্যোগ এবং নিরলস পরিশ্রম।

প্রতিকূলতাকে অতিক্রম করে নিজের পথ তৈরি করার এই আহ্বানই ‘স্মার্ট উদ্যোক্তা’ গ্রন্থের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা—আর সেই বার্তা ছড়িয়ে পড়ুক নতুন প্রজন্মের কর্মপ্রেরণা ও স্বনির্ভর বাংলাদেশের প্রত্যয়ে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

শূন্য থেকে শিখরে ওঠার গল্প, ‘স্মার্ট উদ্যোক্তা’ ও স্বনির্ভর বাংলাদেশের স্বপ্ন

শূন্য থেকে শিখরে ওঠার গল্প, ‘স্মার্ট উদ্যোক্তা’ ও স্বনির্ভর বাংলাদেশের স্বপ্ন

আপডেট টাইম : ০৯:৩৯:২৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৯ অক্টোবর ২০২৬

হাওর বার্তা সম্পাদকীয় ডেস্কঃ জীবন সব সময় মানুষের জন্য মসৃণ পথ তৈরি করে দেয় না। কখনো শোক, কখনো দারিদ্র্য, কখনো শারীরিক যন্ত্রণা, আবার কখনো ব্যবসায়িক বিপর্যয়—নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে মানুষকে নিজের অস্তিত্বের প্রমাণ দিতে হয়। কেউ প্রতিকূলতার কাছে হার মানেন, কেউ আবার সেই প্রতিকূলতাকেই শক্তিতে রূপান্তর করে এগিয়ে যাওয়ার পথ তৈরি করেন। লেখক মোহাম্মদ সফিকুল ইসলাম বিক্রমপুরীর ‘স্মার্ট উদ্যোক্তা—গ্লোবাল বিজয় ও স্বনির্ভর বাংলাদেশ বিনির্মাণের মহাপরিকল্পনা’ গ্রন্থটি এমনই এক জীবনসংগ্রাম, আত্মবিশ্বাস ও উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার প্রত্যয়ের কথা তুলে ধরেছে।

বইটি কেবল একজন মানুষের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বর্ণনা নয়; এর বিষয়বস্তুর মধ্যে রয়েছে প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই, ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা, আত্মনির্ভরতার দর্শন এবং দেশের তরুণ সমাজকে কর্মমুখী করে তোলার ভাবনা। একজন মানুষের জীবনসংগ্রাম কীভাবে অন্যের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে উঠতে পারে, সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার একটি প্রয়াস এই গ্রন্থ।

শোক ও দারিদ্র্য পেরিয়ে এগিয়ে চলার প্রত্যয়

লেখকের জীবনপথের সূচনাতেই রয়েছে গভীর শোকের স্মৃতি। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, ১৯৭৫ সালে পিতা ও বীর মুক্তিযোদ্ধা বড় ভাইকে হারানোর বেদনাবিধুর অভিজ্ঞতা তাঁকে অল্প বয়সেই কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায়। গুলিস্তানের ফুটপাতে মাত্র ১০ টাকা বেতনে হকারের কাজ দিয়ে শুরু হয় তাঁর জীবনসংগ্রাম। পরবর্তী সময়ে মাত্র ১৯ টাকা সম্বল করে সিলেটে নতুনভাবে পথচলার যে অভিজ্ঞতার কথা তিনি তুলে ধরেছেন, তা তাঁর অধ্যবসায় ও ঘুরে দাঁড়ানোর আকাঙ্ক্ষার পরিচায়ক।

জীবনের শুরুতে সীমিত সামর্থ্য নিয়ে পথচলা মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো নিজের ওপর বিশ্বাস ধরে রাখা। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, সামাজিক সীমাবদ্ধতা ও প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যেও সামনে এগিয়ে যাওয়ার মানসিকতা একজন মানুষকে নতুন সম্ভাবনার সন্ধান দিতে পারে। লেখকের জীবনকথায় সেই মানসিক দৃঢ়তার প্রতিফলন রয়েছে।

দুর্ঘটনা ও বিপর্যয়েও থেমে না যাওয়ার শিক্ষা

গ্রন্থটির সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায়গুলোর একটি লেখকের ২০২০ সালের ১০ সেপ্টেম্বরের সড়ক দুর্ঘটনা। লেখকের বর্ণনা অনুসারে, ভয়াবহ ওই দুর্ঘটনায় তিনি গুরুতর আহত হন। মাথায় গভীর ক্ষত ও পায়ের মারাত্মক আঘাতের কারণে তাঁকে দীর্ঘ শারীরিক কষ্টের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। হুইলচেয়ার ও লাঠির সহায়তায় চলাফেরার বাস্তবতা তাঁর স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তোলে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয় করোনা মহামারির অভিঘাত এবং ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তা। জাফলংয়ের ‘ক্ষুধা রেস্টুরেন্ট’ হারানো থেকে শুরু করে পূর্বাচল নীলামার্কেটের ‘হাঙ্গার রেস্টুরেন্ট’ বন্ধ করতে বাধ্য হওয়ার অভিজ্ঞতা তাঁর উদ্যোক্তা জীবনের কঠিন অধ্যায়গুলোর অংশ। এসব ঘটনা একজন মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থার পাশাপাশি তাঁর মানসিক শক্তিরও পরীক্ষা নেয়।

তবে ব্যর্থতা মানেই জীবনের সমাপ্তি নয়। বরং ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়া, পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া এবং নতুনভাবে পরিকল্পনা করার মধ্য দিয়েই ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়। ‘স্মার্ট উদ্যোক্তা’ গ্রন্থের জীবনঘনিষ্ঠ অভিজ্ঞতাগুলো থেকে এই শিক্ষাই গ্রহণ করতে পারেন পাঠকেরা।

চাকরির প্রত্যাশা থেকে উদ্যোক্তা হওয়ার মানসিকতা

বাংলাদেশের বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসংস্থান একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় চ্যালেঞ্জ। প্রতি বছর শিক্ষাজীবন শেষ করে অসংখ্য তরুণ চাকরির বাজারে প্রবেশ করেন। কিন্তু সবার জন্য উপযুক্ত চাকরির সুযোগ তৈরি করা সম্ভব হয় না। এ বাস্তবতায় আত্মকর্মসংস্থান, ক্ষুদ্র উদ্যোগ এবং দক্ষতাভিত্তিক ব্যবসা গড়ে তোলার গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে।

এই প্রেক্ষাপটে মোহাম্মদ সফিকুল ইসলাম বিক্রমপুরীর বইটি উদ্যোক্তা হওয়ার মানসিকতা তৈরির ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। গ্রন্থে ‘স্মার্ট বিল্ডার’, ‘নিউ এন্টারপ্রাইজ’ ও ‘পাওয়ারনেস্ট’-এর মতো উদ্যোগের অভিজ্ঞতার পাশাপাশি ক্ষুদ্র পুঁজি থেকে বড় শিল্পপ্রকল্পের দিকে এগিয়ে যাওয়ার ধারণা তুলে ধরা হয়েছে।

মাত্র ১০ হাজার টাকা থেকে উদ্যোগের সূচনা করে বড় শিল্পপ্রকল্পের স্বপ্ন দেখার বিষয়টি তরুণদের কল্পনাশক্তিকে প্রসারিত করতে পারে। তবে বাস্তবে এ ধরনের উদ্যোগ সফল করতে প্রয়োজন সঠিক ব্যবসায়িক পরিকল্পনা, বাজার বিশ্লেষণ, দক্ষ জনবল, পর্যাপ্ত অর্থায়ন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিশ্রম। স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে অনুপ্রেরণার পাশাপাশি এসব বাস্তব শর্ত পূরণ করাও অপরিহার্য।

চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে দক্ষতাই বড় সম্পদ

বর্তমান বিশ্ব দ্রুত প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন, ডিজিটাল প্রযুক্তি ও আধুনিক উৎপাদনব্যবস্থা কর্মক্ষেত্রের ধরন বদলে দিচ্ছে। ফলে শুধু প্রাতিষ্ঠানিক সনদ নয়, বাস্তব দক্ষতা, প্রযুক্তিগত জ্ঞান, সৃজনশীলতা ও সমস্যা সমাধানের সক্ষমতাও কর্মজীবনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

গ্রন্থে ‘ডিজিটাল স্কিল পাসপোর্ট’ এবং ‘যৌথ মেশিনারি কেন্দ্র’ বা সিএমসি (CMC)-এর মতো ধারণার মাধ্যমে দক্ষতা উন্নয়ন, যন্ত্রপাতির যৌথ ব্যবহার এবং উদ্যোক্তাদের জন্য সুযোগ সৃষ্টির কথা বলা হয়েছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যয়বহুল যন্ত্রপাতি যৌথভাবে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করা গেলে উৎপাদন ব্যয় কমানো এবং নতুন উদ্যোগের পথ সুগম করার সম্ভাবনা রয়েছে।

তবে এসব ধারণাকে কার্যকর করতে হলে প্রয়োজন সুস্পষ্ট নীতিমালা, প্রশিক্ষণ অবকাঠামো, আর্থিক সহায়তা, প্রযুক্তিগত তদারকি এবং সরকারি-বেসরকারি সমন্বয়। পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মধ্যে কার্যকর সংযোগ তৈরি করা গেলে এ ধরনের উদ্যোগ কর্মসংস্থান সম্প্রসারণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়তে প্রয়োজন বাস্তবভিত্তিক উদ্যোগ

স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে উৎপাদন বৃদ্ধি, দক্ষ জনশক্তি তৈরি, উদ্যোক্তাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার প্রশ্ন। একটি কার্যকর উদ্যোক্তা সংস্কৃতি গড়ে উঠলে স্থানীয় সম্পদ ও সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সম্ভব।

বিশেষ করে গ্রাম, হাওর ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের তরুণদের জন্য প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে ঋণ, বাজারসংযোগ, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং ক্ষুদ্র শিল্প স্থাপনের সুযোগ বাড়ানো জরুরি। রাজধানীকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বাইরে জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও উদ্যোক্তা তৈরির পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে।

‘স্মার্ট উদ্যোক্তা’ গ্রন্থে স্বনির্ভরতার যে প্রত্যয় তুলে ধরা হয়েছে, তা এই বৃহত্তর জাতীয় ভাবনার সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে বইয়ের ধারণাগুলো বাস্তব অর্থনীতিতে কতটা কার্যকর হতে পারে, তা নির্ভর করবে সেগুলোর প্রয়োগযোগ্যতা, বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং ফলাফলের ওপর।

বইটির গুরুত্ব ও সম্পাদকীয় মূল্যায়ন

গ্রন্থটিতে লেখকের জীবনদর্শন, ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা এবং আত্মবিশ্বাস জাগানিয়া ২৫০টি বাণী স্থান পেয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি বাংলা সাহিত্য বিষয়ে অভিজ্ঞ শিক্ষক পি সি দীপের ভাষাশৈলী এবং গুগলের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তির সহায়তায় তথ্য সংগ্রহ ও বিন্যাসের প্রসঙ্গও তুলে ধরা হয়েছে। এসব উপাদানের যথাযথ সমন্বয় বইটিকে পাঠকের কাছে আরও সহজবোধ্য করে তুলতে পারে।

তবে কোনো গ্রন্থের প্রকৃত মূল্যায়ন শুধু এর বিষয়বস্তু, ভাষার সৌন্দর্য কিংবা লেখকের ব্যক্তিগত সংগ্রামের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এর ধারণাগুলো পাঠককে কতটা নতুনভাবে ভাবতে শেখায়, বাস্তব সমস্যার সমাধানে কতটা সহায়তা করে এবং সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তনের অনুপ্রেরণা জোগায়—সেই বিবেচনাও গুরুত্বপূর্ণ।

‘স্মার্ট উদ্যোক্তা’ গ্রন্থের মূল শক্তি হলো প্রতিকূলতার মধ্যেও নতুন করে শুরু করার প্রত্যয় এবং তরুণদের কর্মমুখী হওয়ার আহ্বান। বিশেষ করে যারা সীমিত পুঁজি, অনিশ্চয়তা ও অভিজ্ঞতার অভাবে ব্যবসা শুরু করতে ভয় পান, তাঁদের জন্য এ ধরনের জীবনঘনিষ্ঠ লেখা চিন্তার নতুন দরজা খুলে দিতে পারে।

শেষ কথা

মানুষের জীবনে সাফল্য কখনো একদিনে আসে না। এর পেছনে থাকে অসংখ্য ব্যর্থতা, কঠিন সিদ্ধান্ত, ত্যাগ, পরিশ্রম এবং বারবার উঠে দাঁড়ানোর সাহস। একজন উদ্যোক্তার জীবনসংগ্রাম তখনই বৃহত্তর তাৎপর্য লাভ করে, যখন তাঁর অভিজ্ঞতা অন্যদের পথ চলতে সাহায্য করে।

মোহাম্মদ সফিকুল ইসলাম বিক্রমপুরীর ‘স্মার্ট উদ্যোক্তা—গ্লোবাল বিজয় ও স্বনির্ভর বাংলাদেশ বিনির্মাণের মহাপরিকল্পনা’ গ্রন্থটি সেই সম্ভাবনার কথাই সামনে আনে। বইটি পাঠকের মধ্যে উদ্যোক্তা হওয়ার আগ্রহ, আত্মবিশ্বাস এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির মানসিকতা জাগিয়ে তুলতে পারলে এর প্রকাশনা সার্থকতা পাবে।

আমাদের প্রত্যাশা, ব্যক্তিগত জীবনসংগ্রামের অভিজ্ঞতা ও উদ্যোক্তা হওয়ার ভাবনা থেকে তরুণ প্রজন্ম বাস্তবসম্মত শিক্ষা গ্রহণ করবে। কারণ স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ার জন্য শুধু বড় স্বপ্ন দেখাই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন দক্ষতা, সততা, উদ্ভাবনী চিন্তা, পরিকল্পিত উদ্যোগ এবং নিরলস পরিশ্রম।

প্রতিকূলতাকে অতিক্রম করে নিজের পথ তৈরি করার এই আহ্বানই ‘স্মার্ট উদ্যোক্তা’ গ্রন্থের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা—আর সেই বার্তা ছড়িয়ে পড়ুক নতুন প্রজন্মের কর্মপ্রেরণা ও স্বনির্ভর বাংলাদেশের প্রত্যয়ে।