ঢাকা ১২:৫৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ২৪ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
শিক্ষাদূত মুকুল মাস্টারের অন্তিম প্রহর ধর্ম-বর্ণ-সম্প্রদায় নির্বিশেষে সবার কল্যাণে কাজ করছে সরকার: প্রধানমন্ত্রী এয়ারবাসের ১০ উড়োজাহাজ কিনতে চুক্তি সই পোশাক শ্রমিকদের মজুরি বোর্ড গঠনের নীতিগত সিদ্ধান্ত সরকারের ১৭ হাজার মুসল্লির ধারণক্ষমতাসম্পন্ন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ ৭৮ দেশের সঙ্গে বৈঠক, হজ ব্যবস্থাপনায় বড় পরিকল্পনা সৌদির বিদ্যুৎ ও জ্বালানিতে ৩.৩ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক ঋণ নিচ্ছে সরকার গুগলের বিরুদ্ধে যুক্তরাজ্যে ১.৩৩ বিলিয়ন ডলারের মামলা এমপি নজরুলের জামিন হলে সমাজে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হতে পারে, বললেন বিচারক মাদকবিরোধী সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে তরুণ প্রজন্মের প্রতি আহ্বান রাষ্ট্রপতির

শিক্ষাদূত মুকুল মাস্টারের অন্তিম প্রহর

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১০:৪৫:৩৪ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর ২০২৬
  • ১০০ বার

Oplus_16908288

রফিকুল ইসলামঃ “মানুষের মনকে জাগিয়ে তোলাই যাঁর ব্রত, / তিনি তো জলেন নিজে মোমের মতো। / বিলিয়ে সুবাস, ছড়িয়ে আলো আঁধার রাতে, / ক্লান্তিহীন হেঁটে চলেন জ্ঞানের মশাল হাতে …”

পৃথিবীতে কিছু মানুষ আসেন যাঁরা সমাজকে কেবল দিতেই জানেন, নিজের জন্য রাখার ফুরসত তাঁদের মেলে না। ভোগবাদী এই যুগে যেখানে প্রতিটি সম্পর্কের সমীকরণ মাপা হয় বৈষয়িক লাভ-ক্ষতির দাঁড়িপাল্লায়, সেখানে নিঃস্বার্থ আলোর ফেরিওয়ালারা ক্রমশ এক বিরল প্রজাতিতে পরিণত হচ্ছেন।

সমাজ বিনির্মাণে তাঁরা কোনো কোলাহল করেন না, রাজকীয় আসনে দাঁড়িয়ে হাততালি খুঁজেন না। অথচ তাঁদের নীরব ও কঠোর শ্রমের ওপর দাঁড়িয়েই গড়ে ওঠে একটি সভ্য জাতি।

হাওরাঞ্চলের জল-হাওয়ায় বেড়ে ওঠা এমনই এক প্রাতঃস্মরণীয় আলোকবর্তিকার নাম মো. মোখলেছুর রহমান ভুঁইয়া মুকুল।

কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলার গোপদিঘী ইউনিয়নের বগাদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাবেক এই সহকারী শিক্ষক কেবল একজন বৃত্তিবদ্ধ চাকুরিজীবী ছিলেন না, তিনি ছিলেন নিজ অঞ্চলের সামাজিক ও নৈতিক শিক্ষার এক জীবন্ত বাতিঘর। আজ যখন অবক্ষয় ও নৈতিক দৈন্যতায় সমাজ জর্জরিত, তখন মিশুক ও সদালাপী এই গুণী মানুষের জীবনগাথা আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যায় এক পলিমাটির মতো উর্বর, মানবিক সময়ে।

তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের অবহেলিত জনপদ হাওরাঞ্চলের বুকে ১৯৬২ সালটি ছিল আর দশটি বছরের মতোই সাধারণ। তবে ধলাই গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের জন্য তা ছিল বিশেষ আনন্দের। এই বছরই ১৬ই মে প্রখ্যাত ‘বড়বাড়ি’ পরিবারে পিতা মরহুম হাজী মো. আবদুল আজিজ ভুঁইয়া এবং মাতা মরহুমা জামেলা খাতুনের ঘর আলো করে জন্ম নেন মো. মোখলেছুর রহমান ভুঁইয়া মুকুল।

সে যুগে হাওরের ‘বড়বাড়ি’ বলতে কেবল অর্থনৈতিক সচ্ছলতা বোঝাত না; তা ছিল শিক্ষা, সংস্কৃতি, আতিথেয়তা ও পরম পরোপকারের এক অনন্য কেন্দ্র। এই সুউচ্চ পারিবারিক ও সামাজিক পরিমণ্ডলের কঠোর নৈতিক অনুশাসনের ভেতরেই বিকশিত হয়েছিল তাঁর শৈশব ও কৈশোর। অহংকারহীন আভিজাত্য ও মানুষের পাশে দাঁড়ানোর যে অমোঘ দীক্ষা তিনি পরিবার থেকে পেয়েছিলেন, তা-ই পরবর্তী জীবনে তাঁর ব্যক্তিত্বের মূল ভিত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

১৯৮২ সালের ১লা জানুয়ারি। মাত্র ২০ বছরের এক প্রাণোচ্ছ্বল তরুণ বুকে একরাশ স্বপ্ন আর সমাজ বদলের প্রত্যয় নিয়ে খাসাপুর বেসরকারি রেজিস্টার্ড প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যোগদানের মাধ্যমে পেশাজীবনের খাতা খুলেন। পরে ১৯৮৬ সালে ১৫ই নভেম্বর বিদ্যালয়টি সরকারীকরণ হলে শুরু হয় এক ঐতিহাসিক যাত্রা। শিক্ষকতাকে জীবিকা নয়, বরং জীবনের পরম ব্রত হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন তিনি।

আজকের দিনে দাঁড়িয়ে সেই আশির দশকের মিঠামইনের হাওরাঞ্চলের প্রতিকূলতা কল্পনা করাও কঠিন। বর্ষার উত্তাল আফাল (ঢেউ) আর শুকনো মৌসুমের কিলোমিটারের পর কিলোমিটার তপ্ত বালুচর পাড়ি দিয়ে প্রতিদিন বিদ্যালয়ে ছুটে যাওয়া কোনো সাধারণ চাকুরিজীবীর কাজ ছিল না; তা ছিল এক ধ্যানীর সাধনা।

বগাদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তিনি তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ সুবর্ণ সময়গুলো বিলিয়ে দিয়েছেন। একজন আদর্শ সহকারী শিক্ষক হিসেবে তিনি শুধু পাঠ্যবইয়ের অক্ষরের সাথে শিক্ষার্থীদের পরিচয় করিয়ে দেননি, বরং শিখিয়েছেন সততা, মানবিক মূল্যবোধ ও দেশপ্রেমের অ আ ক খ। তাঁর কড়া অনুশাসনের আইনে যেমন ছিল ফাঁকি না দেওয়ার তাগিদ, তেমনি তাঁর অমায়িক চওড়া হাসির পরশ ছিল কোমল অবুঝ শিশুদের পরম নির্ভরতার আশ্রয়।

পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি মুকুল মাস্টারের সবচেয়ে বড় পরিচিতি ছিল তাঁর অসাধারণ সামাজিকতায়। অতিমাত্রায় মিশুক ও সদালাপী এই মানুষটি সমাজের কোনো স্তরবিন্যাস মানতেন না। ধনী-দরিদ্র, প্রবীণ-নবীন সবার সাথেই তিনি এক নিমেষে মিশে যেতে পারতেন। গোপদিঘী ইউনিয়নের এমন কোনো গ্রাম বা ঘর নেই, যেখানে তাঁর সুহৃদ বা স্নেহের কেউ নেই। গ্রামের মেঠো পথে হাঁটার সময় মৃদু হেসে কুশল বিনিময় করা কিংবা অন্যের বিপদে নিজের সাধ্যের সবটুকু দিয়ে পাশে দাঁড়ানো ছিল তাঁর সহজাত প্রবৃত্তি।

এছাড়া এলাকার সালিশ-বিচার থেকে শুরু করে ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠান – সবখানেই তাঁর পরিচ্ছন্ন ও সত্যনিষ্ঠ উপস্থিতি ছিল সর্বজনস্বীকৃত। নিজের শ্রম ও মেধা বিলিয়ে দিয়েছেন সমাজের কল্যাণে, অথচ বিনিময়ে কোনো সস্তা প্রচার বা আত্মতৃপ্তির মোহ তাঁকে কখনো গ্রাস করেনি।

কিন্তু মহাকালের নিয়তি বড়ই অদ্ভুত, বড়ই নির্মম। জীবন তো আর সোজা সরলরেখায় চলে না। যে মানুষটি চিরকাল অজস্র মানুষের জীবনকে সচল রেখেছেন, জীবনের শেষলগ্নে এসে নিয়তি তাঁকে এক কঠিন ও বিষাদময় পরীক্ষার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। দীর্ঘদিনের কঠোর দায়িত্ববোধ ও ক্লান্তিহীন পথচলার সফল সমাপ্তির আগেই শারীরিক অক্ষমতা তাঁকে আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে ফেলে।

যার পরিপ্রেক্ষিতে বিধি মোতাবেক অবসরের ৭ বছর আগেই ২০১৬ সালের ১৭ই জুলাই অত্যন্ত ভারাক্রান্ত হৃদয়ে বগাদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে স্বেচ্ছায় অবসরে যান তিনি। যে প্রাঙ্গণে শিশুদের কলকাকলিতে তাঁর জীবন কেটেছে, সেখান থেকে প্রস্থান ছিল তাঁর জন্য এক নীরব বিচ্ছেদবেদনা।

কষ্টের এখানেই শেষ নয়; ২০১৫ সাল থেকে আজ পর্যন্ত, সুদীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি ভীষণ অসুস্থতায় ধুঁকছেন, বিছানা ছাড়তে পারেন না। বর্তমানে তাঁর বয়স ৬৪ হলেও দীর্ঘ অসুস্থতা তাঁকে বিধ্বস্ত, বিপর্যস্ত ও পীড়িত করে তুলেছে।

যে মানুষটি একসময় পুরো মিঠামইনের প্রত্যন্ত অঞ্চলে হেঁটে বেড়াতেন, সবার দুঃখ-কষ্টের ভাগীদার হতেন, আজ দীর্ঘ কয়েকবছর ধরে তিনি নিজ গৃহের শয্যায় বন্দী। তাঁর সেই চিরচেনা দীপ্তিময় ও সদালাপী কণ্ঠস্বর আজ অসুস্থতার তীব্র যন্ত্রণায় ক্লান্ত – জীর্ণশীর্ণ। একসময়ের প্রাণোচ্ছ্বল এই সামাজিক মানুষটার এমন নিভৃত অসুস্থতা কেবল তাঁর পরিবারের জন্যই নয়, পুরো হাওরবাসীর জন্য এক পরম বেদনার দলিল।

এখানেই সমাজ ও রাষ্ট্রের দিকে কিছু তীর্যক প্রশ্ন ছুড়ে দেওয়া আবশ্যক। আমরা কি আসলেই গুণী মানুষের কদর করতে জানি?

একজন শিক্ষক যখন তাঁর জীবনের সোনালী ৩৪টি বছর তিল তিল করে সমাজ বিনির্মাণে, রাষ্ট্র গঠনে বিলিয়ে দেন, তখন জীবনের শেষ অধ্যায়ে এসে কেন তাঁকে এতটা একাকী ও যন্ত্রণার প্রহর গুনতে হবে? আমাদের রাষ্ট্র বা সমাজ কি এই নীরব বিপ্লবীদের খোঁজ রাখার ন্যূনতম তাগিদ অনুভব করে?

আজ যখন চারদিকে চটকদার ও সস্তা স্তাবকদের জয়জয়কার, তথাকথিত সামাজিক মাধ্যমের তারকাদের নিয়ে মাতামাতি, তখন মুকুল মাস্টারের মতো দেশ গড়ার কারিগররা লোকচক্ষুর অন্তরালে বিছানায় শুয়ে কাতরায়। এই উদাসীনতা কোনো সুস্থ ও বিবেকবান সমাজের পরিচয় হতে পারে না।

আজ এই চরম অসুস্থতার প্রহরে দাঁড়িয়ে মুকুল মাস্টার কোনো বৈষয়িক প্রতিপত্তি বা জাগতিক সাহায্য প্রার্থনা করছেন না। তিনি আজ ব্যাকুল হৃদয়ে পরম করুণাময় আল্লাহর দরবারে সুস্থতা ও দীর্ঘ নেক হায়াত কামনা করে তাঁর প্রিয় এলাকাবাসীসহ পুরো দেশবাসীর কাছে অন্তস্তল থেকে দোয়া চেয়েছেন।

এই দীর্ঘ ও কঠিন অসুস্থতার দিনগুলোতে তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে পাশে আছেন তাঁর সহধর্মিণী মোছাম্মদ আসমা আক্তার। একজন আদর্শ স্ত্রীর মতো তিনি ছায়ার মতো আগলে রেখেছেন এই গুণী মানুষটাকে। তাঁদের সন্তানাদিরাও বাবার এই কষ্ট দেখে ভীষণ অসহায়বোধ করছেন এবং সাধ্যমতো সেবাশুশ্রূষা করে যাচ্ছেন।

যে হাতগুলো একসময় হাজারো শিশুকে আলোর পথ দেখিয়ে আশীর্বাদ করেছে, আজ সেই হাত জোড় করে মানুষের কাছে দোয়ার আরজি জানাচ্ছে। আমাদের কি নৈতিক দায়িত্ব নয়, এই মহান শিক্ষকের জন্য কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করা? যিনি আমাদের সন্তানদের মানুষের মতো মানুষ করার দীক্ষা দিয়েছেন, তাঁর জীবনের এই কষ্টের প্রহরগুলো যেন একটু শান্তিময় ও যন্ত্রণাহীন হয়, সেই আর্তি জানানো আমাদের পরম কর্তব্য না?

শারীরিক অসুস্থতার কারণে আজ হয়তো বগাদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বারান্দায় মো. মোখলেছুর রহমান মুকুল স্যারের চিরচেনা পদধ্বনি আর শোনা যায় না, শিক্ষার্থীদের বলতে শোনা যায় না – ‘পড়াশোনা হলো আলো, আর পড়াশোনা না করা হলো অন্ধকার।’

তাঁর রোপণ করা শিক্ষার বীজ আজ বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়ে ডালপালা মেলেছে। তাঁর স্নেহধন্য শিক্ষার্থীরা আজ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সুনামের সাথে সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

কর্মের মধ্য দিয়েই মানুষ অমরত্ব লাভ করে, আর মুকুল মাস্টার বেঁচে থাকবেন তাঁর হাজারো শিক্ষার্থীর মননে এবং গোপদিঘী ইউনিয়নের প্রতিটি মানুষের স্মৃতিকথায়।

“তুমি এসেছিলে আলো হাতে নিয়ে, / তিমির বিনাশী ঘোরে, / উজাড় করেছ বুকের সুধাটি, আগামীকে গড়বে বলে। / আজও পথ চলে তোমারি চেরাগে, কত শত প্রাণ জাগে, /
কীর্তিমানের হয় না তো ক্ষয়, সে যে রয় অনুরাগে।”

লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও কলামিস্ট;
সহযোগী সম্পাদক, আজকের সূর্যোদয়, ঢাকা

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

শিক্ষাদূত মুকুল মাস্টারের অন্তিম প্রহর

শিক্ষাদূত মুকুল মাস্টারের অন্তিম প্রহর

আপডেট টাইম : ১০:৪৫:৩৪ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর ২০২৬

রফিকুল ইসলামঃ “মানুষের মনকে জাগিয়ে তোলাই যাঁর ব্রত, / তিনি তো জলেন নিজে মোমের মতো। / বিলিয়ে সুবাস, ছড়িয়ে আলো আঁধার রাতে, / ক্লান্তিহীন হেঁটে চলেন জ্ঞানের মশাল হাতে …”

পৃথিবীতে কিছু মানুষ আসেন যাঁরা সমাজকে কেবল দিতেই জানেন, নিজের জন্য রাখার ফুরসত তাঁদের মেলে না। ভোগবাদী এই যুগে যেখানে প্রতিটি সম্পর্কের সমীকরণ মাপা হয় বৈষয়িক লাভ-ক্ষতির দাঁড়িপাল্লায়, সেখানে নিঃস্বার্থ আলোর ফেরিওয়ালারা ক্রমশ এক বিরল প্রজাতিতে পরিণত হচ্ছেন।

সমাজ বিনির্মাণে তাঁরা কোনো কোলাহল করেন না, রাজকীয় আসনে দাঁড়িয়ে হাততালি খুঁজেন না। অথচ তাঁদের নীরব ও কঠোর শ্রমের ওপর দাঁড়িয়েই গড়ে ওঠে একটি সভ্য জাতি।

হাওরাঞ্চলের জল-হাওয়ায় বেড়ে ওঠা এমনই এক প্রাতঃস্মরণীয় আলোকবর্তিকার নাম মো. মোখলেছুর রহমান ভুঁইয়া মুকুল।

কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলার গোপদিঘী ইউনিয়নের বগাদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাবেক এই সহকারী শিক্ষক কেবল একজন বৃত্তিবদ্ধ চাকুরিজীবী ছিলেন না, তিনি ছিলেন নিজ অঞ্চলের সামাজিক ও নৈতিক শিক্ষার এক জীবন্ত বাতিঘর। আজ যখন অবক্ষয় ও নৈতিক দৈন্যতায় সমাজ জর্জরিত, তখন মিশুক ও সদালাপী এই গুণী মানুষের জীবনগাথা আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যায় এক পলিমাটির মতো উর্বর, মানবিক সময়ে।

তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের অবহেলিত জনপদ হাওরাঞ্চলের বুকে ১৯৬২ সালটি ছিল আর দশটি বছরের মতোই সাধারণ। তবে ধলাই গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের জন্য তা ছিল বিশেষ আনন্দের। এই বছরই ১৬ই মে প্রখ্যাত ‘বড়বাড়ি’ পরিবারে পিতা মরহুম হাজী মো. আবদুল আজিজ ভুঁইয়া এবং মাতা মরহুমা জামেলা খাতুনের ঘর আলো করে জন্ম নেন মো. মোখলেছুর রহমান ভুঁইয়া মুকুল।

সে যুগে হাওরের ‘বড়বাড়ি’ বলতে কেবল অর্থনৈতিক সচ্ছলতা বোঝাত না; তা ছিল শিক্ষা, সংস্কৃতি, আতিথেয়তা ও পরম পরোপকারের এক অনন্য কেন্দ্র। এই সুউচ্চ পারিবারিক ও সামাজিক পরিমণ্ডলের কঠোর নৈতিক অনুশাসনের ভেতরেই বিকশিত হয়েছিল তাঁর শৈশব ও কৈশোর। অহংকারহীন আভিজাত্য ও মানুষের পাশে দাঁড়ানোর যে অমোঘ দীক্ষা তিনি পরিবার থেকে পেয়েছিলেন, তা-ই পরবর্তী জীবনে তাঁর ব্যক্তিত্বের মূল ভিত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

১৯৮২ সালের ১লা জানুয়ারি। মাত্র ২০ বছরের এক প্রাণোচ্ছ্বল তরুণ বুকে একরাশ স্বপ্ন আর সমাজ বদলের প্রত্যয় নিয়ে খাসাপুর বেসরকারি রেজিস্টার্ড প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যোগদানের মাধ্যমে পেশাজীবনের খাতা খুলেন। পরে ১৯৮৬ সালে ১৫ই নভেম্বর বিদ্যালয়টি সরকারীকরণ হলে শুরু হয় এক ঐতিহাসিক যাত্রা। শিক্ষকতাকে জীবিকা নয়, বরং জীবনের পরম ব্রত হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন তিনি।

আজকের দিনে দাঁড়িয়ে সেই আশির দশকের মিঠামইনের হাওরাঞ্চলের প্রতিকূলতা কল্পনা করাও কঠিন। বর্ষার উত্তাল আফাল (ঢেউ) আর শুকনো মৌসুমের কিলোমিটারের পর কিলোমিটার তপ্ত বালুচর পাড়ি দিয়ে প্রতিদিন বিদ্যালয়ে ছুটে যাওয়া কোনো সাধারণ চাকুরিজীবীর কাজ ছিল না; তা ছিল এক ধ্যানীর সাধনা।

বগাদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তিনি তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ সুবর্ণ সময়গুলো বিলিয়ে দিয়েছেন। একজন আদর্শ সহকারী শিক্ষক হিসেবে তিনি শুধু পাঠ্যবইয়ের অক্ষরের সাথে শিক্ষার্থীদের পরিচয় করিয়ে দেননি, বরং শিখিয়েছেন সততা, মানবিক মূল্যবোধ ও দেশপ্রেমের অ আ ক খ। তাঁর কড়া অনুশাসনের আইনে যেমন ছিল ফাঁকি না দেওয়ার তাগিদ, তেমনি তাঁর অমায়িক চওড়া হাসির পরশ ছিল কোমল অবুঝ শিশুদের পরম নির্ভরতার আশ্রয়।

পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি মুকুল মাস্টারের সবচেয়ে বড় পরিচিতি ছিল তাঁর অসাধারণ সামাজিকতায়। অতিমাত্রায় মিশুক ও সদালাপী এই মানুষটি সমাজের কোনো স্তরবিন্যাস মানতেন না। ধনী-দরিদ্র, প্রবীণ-নবীন সবার সাথেই তিনি এক নিমেষে মিশে যেতে পারতেন। গোপদিঘী ইউনিয়নের এমন কোনো গ্রাম বা ঘর নেই, যেখানে তাঁর সুহৃদ বা স্নেহের কেউ নেই। গ্রামের মেঠো পথে হাঁটার সময় মৃদু হেসে কুশল বিনিময় করা কিংবা অন্যের বিপদে নিজের সাধ্যের সবটুকু দিয়ে পাশে দাঁড়ানো ছিল তাঁর সহজাত প্রবৃত্তি।

এছাড়া এলাকার সালিশ-বিচার থেকে শুরু করে ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠান – সবখানেই তাঁর পরিচ্ছন্ন ও সত্যনিষ্ঠ উপস্থিতি ছিল সর্বজনস্বীকৃত। নিজের শ্রম ও মেধা বিলিয়ে দিয়েছেন সমাজের কল্যাণে, অথচ বিনিময়ে কোনো সস্তা প্রচার বা আত্মতৃপ্তির মোহ তাঁকে কখনো গ্রাস করেনি।

কিন্তু মহাকালের নিয়তি বড়ই অদ্ভুত, বড়ই নির্মম। জীবন তো আর সোজা সরলরেখায় চলে না। যে মানুষটি চিরকাল অজস্র মানুষের জীবনকে সচল রেখেছেন, জীবনের শেষলগ্নে এসে নিয়তি তাঁকে এক কঠিন ও বিষাদময় পরীক্ষার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। দীর্ঘদিনের কঠোর দায়িত্ববোধ ও ক্লান্তিহীন পথচলার সফল সমাপ্তির আগেই শারীরিক অক্ষমতা তাঁকে আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে ফেলে।

যার পরিপ্রেক্ষিতে বিধি মোতাবেক অবসরের ৭ বছর আগেই ২০১৬ সালের ১৭ই জুলাই অত্যন্ত ভারাক্রান্ত হৃদয়ে বগাদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে স্বেচ্ছায় অবসরে যান তিনি। যে প্রাঙ্গণে শিশুদের কলকাকলিতে তাঁর জীবন কেটেছে, সেখান থেকে প্রস্থান ছিল তাঁর জন্য এক নীরব বিচ্ছেদবেদনা।

কষ্টের এখানেই শেষ নয়; ২০১৫ সাল থেকে আজ পর্যন্ত, সুদীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি ভীষণ অসুস্থতায় ধুঁকছেন, বিছানা ছাড়তে পারেন না। বর্তমানে তাঁর বয়স ৬৪ হলেও দীর্ঘ অসুস্থতা তাঁকে বিধ্বস্ত, বিপর্যস্ত ও পীড়িত করে তুলেছে।

যে মানুষটি একসময় পুরো মিঠামইনের প্রত্যন্ত অঞ্চলে হেঁটে বেড়াতেন, সবার দুঃখ-কষ্টের ভাগীদার হতেন, আজ দীর্ঘ কয়েকবছর ধরে তিনি নিজ গৃহের শয্যায় বন্দী। তাঁর সেই চিরচেনা দীপ্তিময় ও সদালাপী কণ্ঠস্বর আজ অসুস্থতার তীব্র যন্ত্রণায় ক্লান্ত – জীর্ণশীর্ণ। একসময়ের প্রাণোচ্ছ্বল এই সামাজিক মানুষটার এমন নিভৃত অসুস্থতা কেবল তাঁর পরিবারের জন্যই নয়, পুরো হাওরবাসীর জন্য এক পরম বেদনার দলিল।

এখানেই সমাজ ও রাষ্ট্রের দিকে কিছু তীর্যক প্রশ্ন ছুড়ে দেওয়া আবশ্যক। আমরা কি আসলেই গুণী মানুষের কদর করতে জানি?

একজন শিক্ষক যখন তাঁর জীবনের সোনালী ৩৪টি বছর তিল তিল করে সমাজ বিনির্মাণে, রাষ্ট্র গঠনে বিলিয়ে দেন, তখন জীবনের শেষ অধ্যায়ে এসে কেন তাঁকে এতটা একাকী ও যন্ত্রণার প্রহর গুনতে হবে? আমাদের রাষ্ট্র বা সমাজ কি এই নীরব বিপ্লবীদের খোঁজ রাখার ন্যূনতম তাগিদ অনুভব করে?

আজ যখন চারদিকে চটকদার ও সস্তা স্তাবকদের জয়জয়কার, তথাকথিত সামাজিক মাধ্যমের তারকাদের নিয়ে মাতামাতি, তখন মুকুল মাস্টারের মতো দেশ গড়ার কারিগররা লোকচক্ষুর অন্তরালে বিছানায় শুয়ে কাতরায়। এই উদাসীনতা কোনো সুস্থ ও বিবেকবান সমাজের পরিচয় হতে পারে না।

আজ এই চরম অসুস্থতার প্রহরে দাঁড়িয়ে মুকুল মাস্টার কোনো বৈষয়িক প্রতিপত্তি বা জাগতিক সাহায্য প্রার্থনা করছেন না। তিনি আজ ব্যাকুল হৃদয়ে পরম করুণাময় আল্লাহর দরবারে সুস্থতা ও দীর্ঘ নেক হায়াত কামনা করে তাঁর প্রিয় এলাকাবাসীসহ পুরো দেশবাসীর কাছে অন্তস্তল থেকে দোয়া চেয়েছেন।

এই দীর্ঘ ও কঠিন অসুস্থতার দিনগুলোতে তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে পাশে আছেন তাঁর সহধর্মিণী মোছাম্মদ আসমা আক্তার। একজন আদর্শ স্ত্রীর মতো তিনি ছায়ার মতো আগলে রেখেছেন এই গুণী মানুষটাকে। তাঁদের সন্তানাদিরাও বাবার এই কষ্ট দেখে ভীষণ অসহায়বোধ করছেন এবং সাধ্যমতো সেবাশুশ্রূষা করে যাচ্ছেন।

যে হাতগুলো একসময় হাজারো শিশুকে আলোর পথ দেখিয়ে আশীর্বাদ করেছে, আজ সেই হাত জোড় করে মানুষের কাছে দোয়ার আরজি জানাচ্ছে। আমাদের কি নৈতিক দায়িত্ব নয়, এই মহান শিক্ষকের জন্য কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করা? যিনি আমাদের সন্তানদের মানুষের মতো মানুষ করার দীক্ষা দিয়েছেন, তাঁর জীবনের এই কষ্টের প্রহরগুলো যেন একটু শান্তিময় ও যন্ত্রণাহীন হয়, সেই আর্তি জানানো আমাদের পরম কর্তব্য না?

শারীরিক অসুস্থতার কারণে আজ হয়তো বগাদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বারান্দায় মো. মোখলেছুর রহমান মুকুল স্যারের চিরচেনা পদধ্বনি আর শোনা যায় না, শিক্ষার্থীদের বলতে শোনা যায় না – ‘পড়াশোনা হলো আলো, আর পড়াশোনা না করা হলো অন্ধকার।’

তাঁর রোপণ করা শিক্ষার বীজ আজ বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়ে ডালপালা মেলেছে। তাঁর স্নেহধন্য শিক্ষার্থীরা আজ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সুনামের সাথে সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

কর্মের মধ্য দিয়েই মানুষ অমরত্ব লাভ করে, আর মুকুল মাস্টার বেঁচে থাকবেন তাঁর হাজারো শিক্ষার্থীর মননে এবং গোপদিঘী ইউনিয়নের প্রতিটি মানুষের স্মৃতিকথায়।

“তুমি এসেছিলে আলো হাতে নিয়ে, / তিমির বিনাশী ঘোরে, / উজাড় করেছ বুকের সুধাটি, আগামীকে গড়বে বলে। / আজও পথ চলে তোমারি চেরাগে, কত শত প্রাণ জাগে, /
কীর্তিমানের হয় না তো ক্ষয়, সে যে রয় অনুরাগে।”

লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও কলামিস্ট;
সহযোগী সম্পাদক, আজকের সূর্যোদয়, ঢাকা