ঢাকা ০২:৩৫ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৩ মার্চ ২০২৬, ২৮ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষায় সবাইকে দায়িত্বশীল হতে হবে: মির্জা ফখরুল কিশোরগঞ্জের স্বাস্থ্যখাতসহ সার্বিক উন্নয়নে কাজ চলছে: বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী শরীফুল আলম সংসদ থেকে ভালো রাজনৈতিক সংস্কৃতির চর্চা সংসদ থেকে শুরু করতে চাই : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বাড়ল দেশের রিজার্ভ দায়িত্বের বাইরে কেউ যেন মন্তব্য না করে : প্রধানমন্ত্রী সংসদে দায়িত্বশীল বিরোধী দল হিসেবে ভূমিকা পালন করতে চাই যুদ্ধের মধ্যেই সেনাদের জানাজায় লাখো ইরানির ঢল বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান ও অধিকার সবার আগে : ডিএসসিসি প্রশাসক প্রথম অধিবেশন ঘিরে অতিথিদের প্রবেশ ও গাড়ি পার্কিং নির্দেশনা ইরাকের মাটির নীচে ইরানের ‘মিসাইল সিটি’

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও গণভোট নিয়ে সরকারি প্রচারণার পরেও মানুষ কতটা বুঝতে পারছে

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১০:১৬:৪৩ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারী ২০২৬
  • ৪১ বার
‘সগলির কাছে শুনি এবার ভোট বলে দুড্যা হবি। একডা হবি মার্কাত আর একডা যেন কিব্যার ভোট। সেড্যা তো হামরা ভাল করে জানিউ ন্যা। আগে ভোটের দিন আসুক, তকন ভাব্যে দেকমো নি কি দেওয়া লাগবি। একন ওল্লা কিছু জানি ন্যা বা’। গণভোট নিয়ে এভাবেই নিজের অভিব্যক্তি জানাচ্ছিলেন বগুড়ার রাজারহাট ইউনিয়নের কৃষক রেজাউল করিম।
করিমের সাথে বিবিসি বাংলার যখন কথা হয়, তখন জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে তিনি তার উচ্ছ্বাসের কথা বললেও গণভোট কী নিয়ে, এই ভোট দিলে হবে, কেন এই ভোট দেওয়া জরুরি সেসব সম্পর্কে একেবারেই অবগত নন।
তিনি জানান টিভিতে গণভোট নিয়ে প্রচার দেখে তিনি জেনেছেন, এবার নির্বাচনের দিন আরও একটা বেশি ভোট দিতে হবে। এর বাইরে আর তেমন কিছুই জানেন না।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনেই জুলাই সনদ বাস্তবায়নে অনুষ্ঠিত হবে গণভোট। এই গণভোটে সাধারণ মানুষের কাছে প্রচার করতে সরকারের পক্ষ থেকে নানা উদ্যোগও লক্ষ্য করা গেছে।
রেডিও-টেলিভিশন তো আছেই, সেইসঙ্গে সারাদেশের স্কুল কলেজ, সরকারি প্রতিষ্ঠান, স্থাপনা, ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠানসহ সড়ক মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন স্থানে বিশাল বিলবোর্ড স্থাপন করা হয়েছে। অন্যদিকে, দেশের বিভিন্ন জায়গায় মসজিদে জুমার নামাজের খুতবার আগে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিতে ইমামদেরও প্রচারণা করতে দেখা গেছে।
ঐকমত্য কমিশন দফায় দফায় আলোচনার পর যে জুলাই সনদ তৈরি করেছে, সেখানে ৪৭টি সাংবিধানিক সংস্কার ও ৩৭টি আইন ও বিধি সংস্কার প্রস্তাব রয়েছে। এই প্রস্তাব বাস্তবায়ন হবে যদি গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয় পায়। যে কারণে সরকারের পক্ষ থেকে ব্যাপকভাবে প্রচারণাও চালানো হচ্ছে। কিন্তু এই প্রচারণায়, মাত্র ১০ থেকে ১২টি বিষয়কেই যুক্ত করা হয়েছে। যে কারণে দেশের সাধারণ মানুষদের অনেকের কাছেই বিষয়গুলো স্পষ্ট নয়।
প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী আলী রীয়াজ বলেছেন, একেবারে খুব প্রয়োজনীয় এবং যেগুলো নাগরিক জীবনকে প্রভাবিত করে এবং নাগরিকরাও সহজে যেগুলো বুঝতে পারেন সেগুলোই যুক্ত করা হয়েছে সরকারি প্রচারণায়। তবে তিনি এটিও বলেছেন যে, লিফলেট বা প্রচার সামগ্রীতে যেগুলো দেওয়া হয়েছে এর বাইরেও অনেক বিষয় সরাসরি প্রচারণায় ও আলোচনায় তুলে ধরা হয়েছে। বিস্তারিত ওয়েবসাইটেও রয়েছে।
সাধারণ মানুষ কতটা জানে?
পাবনা সদরে একটি চায়ের দোকানদার আল আমিন। বয়স ২৬ বছরের মতো হবে। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি প্রথমবারের মতো ভোট দিবেন বলেই জানাচ্ছিলেন। তার কাছে গণভোট নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলছিলেন, ‘আমি জানি না কি আছে গণভোটে। কি পরিবর্তন হবে। অনেক বলতেছে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিতে, অনেকে বলতেছে ‘না’ ভোট দিতে। এজন্য একটু বেকায়দায় পড়ে গেছি। জানি না শেষ পর্যন্ত কোনটা দেব।’
কোনো কোনো রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে হ্যাঁ ভোটের প্রচারণা চলছে এটিও ভোটারদের অনেকের চোখে পড়েছে।যেমন বগুড়া সদরের ষাটোর্ধ আব্দুস সামাদের সাথে যখন কথা বলছিলাম। তিনি বলছিলেন যে তিনি আদৌ কিছুই জানেন না গণভোটে কী কী আছে। তবে, তাদের এলাকায় আড্ডায় আলোচনা হয়েছে যে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিলে অনেক কিছু পরিবর্তন হবে।
রাজশাহী, পাবনা, বরিশাল, খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় যে সব ভোটারদের সঙ্গে কথা বলেছে বিবিসি বাংলা, তাদের কেউ কেউ বলেছেন যে তারা এ নিয়ে খুব বেশি কিছু জানেন না। আবার তরুণ বয়সে যাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা তুলনামূলক বেশি এবং রাজনীতি ও সমসাময়িক বিষয় নিয়ে জানাশোনা ভালো, তাদের কেউ কেউ একবাক্যেই বলেছেন যে, তারা জানেন গণভোট কি কি বিষয়ের ওপর হচ্ছে।
আরিফুল ইসলাম নামের বরিশালের একটি ব্যাংকের কর্মরত একজন তরুণ বলছিলেন, ‘জুলাই সনদ থেকেই বিষয়গুলো নিয়ে পত্রিকায় পড়েছি। গণভোট কিসের ওপর হবে সেটাও ভালভাবে জানি। সুতারং আমি জেনেশুনেই ভোট দেব।’
আবার এমন অনেকের সাথে কথা বলে জানা গেছে, তাদের কাছে গণভোট ও জুলাই সনদ নিয়ে যে ধারণা আছে, তা পুরোপুরি স্পষ্ট না। আবার এমন কোন কোন ভোটারের সাথেও কথা হয়েছে, যাদের কাছে এ নিয়ে আছে ভুল ব্যাখ্যা।
সরকারিভাবে চলছে ব্যাপক প্রচারণা
ঢাকার বাইরে গেলেই সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে গণভোটের প্রচারণা সংক্রান্ত প্রচারপত্র। বিশেষ করে স্থানীয় সরকারের যতগুলো প্রতিষ্ঠান আছে সবখানেই বিভিন্ন সাইজের বিলবোর্ড, ব্যানার, ফেস্টুন লক্ষ্য করা গেছে।
সম্প্রতি বগুড়ার সরকারি আজিজুল হক কলেজে গিয়ে দেখা গেছে, সেখানে অন্তত তিন ধরনের ব্যানার ফেস্টুন চালিয়ে গণভোটের প্রচারণা চালানো হচ্ছে। বাজার, বাস স্ট্যান্ড, উপজেলা পরিষদসহ পৌরসভার গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় গণভোটের গুরুত্ব তুলে ধরে ব্যানার ঝোলানো হয়েছে। এর বাইরেও সরকারিভাবে লিফলেট ছাপানো হয়েছে যেখানে গণভোটের মূল বিষয়গুলো জানানো হচ্ছে।
এই যেমন বরিশাল মডেল স্কুলের সঙ্গেই এমন একটি বিলবোর্ড স্থাপন করেছে বরিশাল সিটি কর্পোরেশন। যেখানে গণভোট নিয়ে ১২টি পয়েন্ট উল্লেখ করা হয়েছে। যেটি দেশের বেশিরভাগ জায়গার ব্যানারেই দেখা গেছে। সরকারের পক্ষ থেকে এসব প্রচারণার পর মানুষদের মধ্যেও কথা বলে দেখা গেছে শিক্ষিত মানুষদের কেউ কেউ এ নিয়ে খুব বেশি কিছু জানেন না। অন্তর্বর্তী সরকার বলছে, যদিও এই প্রচারণা খুব বেশি আগে শুরু করা যায় নি। যে কারণে সাধারণ মানুষদের কেউ কেউ এ নিয়ে জানেন না। বাপক প্রচার শুরুর পর এ নিয়ে জানা যাবে বলেও মনে করেন তারা।
অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, ‘এটি নিয়ে আগে মানুষের একদমই ধারণা ছিল না। প্রচারণা শুরুর পর মূল বিষয়গুলো ওনারা বুঝতে পারছেন। লোকজন এখন এ বিষয়ে অবহিত। আগে একদম ছিলেন না। মূল বিষয়গুলো ওনারা বুঝতে পারছেন।
সরকারের বার্তা কতটা স্পষ্ট?
বগুড়ার সারিয়াকান্দিতে একটি ব্রিজের সঙ্গেই এমন একটি প্রচারণার বিলবোর্ড চোখে পড়ে। যেখানে গণভোটের প্রচারণার পাশাপাশি বিলবোর্ডে ১১টি পয়েন্ট যুক্ত করা হয়েছে।
এসব প্রশ্ন বলা হয়েছে : আপনি কি এমন বাংলাদেশ চান, যেখানে-
তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন ও সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) গঠনে সরকারি দল ও বিরোধী দল একত্রে কাজ করবে।
সরকারি দল ইচ্ছেমতো সংবিধান সংশোধন করতে পারবে না।
সংবিধানের গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ক্ষেত্রে গণভোটের বিধান চালু হবে।
বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার এবং গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হবেন।
যত মেয়াদই হোক, কেউ সর্বোচ্চ ১০ বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না।
সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব পর্যায়ক্রমে বাড়বে।
ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার জন্য পার্লামেন্টে একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হবে।
দেশের বিচারব্যবস্থা স্বাধীনভাবে কাজ করবে।
আপনার মৌলিক অধিকারের সংখ্যা (যেমন : ইন্টারনেট সেবা কখনও বন্ধ করা যাবে না) বাড়বে।
দণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধীকে রাষ্ট্রপতি ইচ্ছেমতো ক্ষমা করতে পারবেন না।
রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য থাকবে।
রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ধারাবাহিক আলোচনার মধ্যে দিয়ে সরকার যে জুলাই সনদ তৈরি করেছে সেখানে ৪৭টি সাংবিধানিক সংস্কার ও ৩৭টি আইন ও বিধি সংস্কারের তালিকা করা হয়েছে। অথচ সরকারের প্রচারণায় মাত্র ১১টি পয়েন্ট আর গণভোটের ব্যালটে মাত্র চারটি পয়েন্ট যুক্ত করলে ভোটারদের কাছে এটি কতটা স্পষ্ট হবে সেই প্রশ্নও সামনে আসছে।
জবাবে ঐকমত্য কমিশনের তৎকালীন সহসভাপতি ও বর্তমানে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী আলী রীয়াজ জানান, এখানে শুধু কি পয়েন্টস বা মূল বিষয় যুক্ত করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘নাগরিকরা সহজে যেগুলো বুঝতে পারবেন সেগুলোকেই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। যেগুলো তাদের জন্য সবচেয়ে জরুরি সেই পয়েন্টসগুলো অমরা বিবেচনায় নিয়েছি। এটা আমরা বলার চেষ্টা করছি এইগুলো কীভাবে তাদের অধিকারকে রক্ষা করতে পারে।’
তিনি জানান, শুধু লিফলেট বা প্রচারণা না। এর বাইরেও সরকারের পক্ষ আলোচনায় বিষয়গুলোর বিস্তারিত তুলে ধরা হচ্ছে। এছাড়াও সরকারের ওয়েব সাইটেও জুলাই সনদের বিস্তারিত পাওয়া যাচ্ছে।
সূত্র : বিবিসি বাংলা
Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষায় সবাইকে দায়িত্বশীল হতে হবে: মির্জা ফখরুল

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও গণভোট নিয়ে সরকারি প্রচারণার পরেও মানুষ কতটা বুঝতে পারছে

আপডেট টাইম : ১০:১৬:৪৩ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারী ২০২৬
‘সগলির কাছে শুনি এবার ভোট বলে দুড্যা হবি। একডা হবি মার্কাত আর একডা যেন কিব্যার ভোট। সেড্যা তো হামরা ভাল করে জানিউ ন্যা। আগে ভোটের দিন আসুক, তকন ভাব্যে দেকমো নি কি দেওয়া লাগবি। একন ওল্লা কিছু জানি ন্যা বা’। গণভোট নিয়ে এভাবেই নিজের অভিব্যক্তি জানাচ্ছিলেন বগুড়ার রাজারহাট ইউনিয়নের কৃষক রেজাউল করিম।
করিমের সাথে বিবিসি বাংলার যখন কথা হয়, তখন জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে তিনি তার উচ্ছ্বাসের কথা বললেও গণভোট কী নিয়ে, এই ভোট দিলে হবে, কেন এই ভোট দেওয়া জরুরি সেসব সম্পর্কে একেবারেই অবগত নন।
তিনি জানান টিভিতে গণভোট নিয়ে প্রচার দেখে তিনি জেনেছেন, এবার নির্বাচনের দিন আরও একটা বেশি ভোট দিতে হবে। এর বাইরে আর তেমন কিছুই জানেন না।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনেই জুলাই সনদ বাস্তবায়নে অনুষ্ঠিত হবে গণভোট। এই গণভোটে সাধারণ মানুষের কাছে প্রচার করতে সরকারের পক্ষ থেকে নানা উদ্যোগও লক্ষ্য করা গেছে।
রেডিও-টেলিভিশন তো আছেই, সেইসঙ্গে সারাদেশের স্কুল কলেজ, সরকারি প্রতিষ্ঠান, স্থাপনা, ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠানসহ সড়ক মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন স্থানে বিশাল বিলবোর্ড স্থাপন করা হয়েছে। অন্যদিকে, দেশের বিভিন্ন জায়গায় মসজিদে জুমার নামাজের খুতবার আগে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিতে ইমামদেরও প্রচারণা করতে দেখা গেছে।
ঐকমত্য কমিশন দফায় দফায় আলোচনার পর যে জুলাই সনদ তৈরি করেছে, সেখানে ৪৭টি সাংবিধানিক সংস্কার ও ৩৭টি আইন ও বিধি সংস্কার প্রস্তাব রয়েছে। এই প্রস্তাব বাস্তবায়ন হবে যদি গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয় পায়। যে কারণে সরকারের পক্ষ থেকে ব্যাপকভাবে প্রচারণাও চালানো হচ্ছে। কিন্তু এই প্রচারণায়, মাত্র ১০ থেকে ১২টি বিষয়কেই যুক্ত করা হয়েছে। যে কারণে দেশের সাধারণ মানুষদের অনেকের কাছেই বিষয়গুলো স্পষ্ট নয়।
প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী আলী রীয়াজ বলেছেন, একেবারে খুব প্রয়োজনীয় এবং যেগুলো নাগরিক জীবনকে প্রভাবিত করে এবং নাগরিকরাও সহজে যেগুলো বুঝতে পারেন সেগুলোই যুক্ত করা হয়েছে সরকারি প্রচারণায়। তবে তিনি এটিও বলেছেন যে, লিফলেট বা প্রচার সামগ্রীতে যেগুলো দেওয়া হয়েছে এর বাইরেও অনেক বিষয় সরাসরি প্রচারণায় ও আলোচনায় তুলে ধরা হয়েছে। বিস্তারিত ওয়েবসাইটেও রয়েছে।
সাধারণ মানুষ কতটা জানে?
পাবনা সদরে একটি চায়ের দোকানদার আল আমিন। বয়স ২৬ বছরের মতো হবে। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি প্রথমবারের মতো ভোট দিবেন বলেই জানাচ্ছিলেন। তার কাছে গণভোট নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলছিলেন, ‘আমি জানি না কি আছে গণভোটে। কি পরিবর্তন হবে। অনেক বলতেছে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিতে, অনেকে বলতেছে ‘না’ ভোট দিতে। এজন্য একটু বেকায়দায় পড়ে গেছি। জানি না শেষ পর্যন্ত কোনটা দেব।’
কোনো কোনো রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে হ্যাঁ ভোটের প্রচারণা চলছে এটিও ভোটারদের অনেকের চোখে পড়েছে।যেমন বগুড়া সদরের ষাটোর্ধ আব্দুস সামাদের সাথে যখন কথা বলছিলাম। তিনি বলছিলেন যে তিনি আদৌ কিছুই জানেন না গণভোটে কী কী আছে। তবে, তাদের এলাকায় আড্ডায় আলোচনা হয়েছে যে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিলে অনেক কিছু পরিবর্তন হবে।
রাজশাহী, পাবনা, বরিশাল, খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় যে সব ভোটারদের সঙ্গে কথা বলেছে বিবিসি বাংলা, তাদের কেউ কেউ বলেছেন যে তারা এ নিয়ে খুব বেশি কিছু জানেন না। আবার তরুণ বয়সে যাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা তুলনামূলক বেশি এবং রাজনীতি ও সমসাময়িক বিষয় নিয়ে জানাশোনা ভালো, তাদের কেউ কেউ একবাক্যেই বলেছেন যে, তারা জানেন গণভোট কি কি বিষয়ের ওপর হচ্ছে।
আরিফুল ইসলাম নামের বরিশালের একটি ব্যাংকের কর্মরত একজন তরুণ বলছিলেন, ‘জুলাই সনদ থেকেই বিষয়গুলো নিয়ে পত্রিকায় পড়েছি। গণভোট কিসের ওপর হবে সেটাও ভালভাবে জানি। সুতারং আমি জেনেশুনেই ভোট দেব।’
আবার এমন অনেকের সাথে কথা বলে জানা গেছে, তাদের কাছে গণভোট ও জুলাই সনদ নিয়ে যে ধারণা আছে, তা পুরোপুরি স্পষ্ট না। আবার এমন কোন কোন ভোটারের সাথেও কথা হয়েছে, যাদের কাছে এ নিয়ে আছে ভুল ব্যাখ্যা।
সরকারিভাবে চলছে ব্যাপক প্রচারণা
ঢাকার বাইরে গেলেই সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে গণভোটের প্রচারণা সংক্রান্ত প্রচারপত্র। বিশেষ করে স্থানীয় সরকারের যতগুলো প্রতিষ্ঠান আছে সবখানেই বিভিন্ন সাইজের বিলবোর্ড, ব্যানার, ফেস্টুন লক্ষ্য করা গেছে।
সম্প্রতি বগুড়ার সরকারি আজিজুল হক কলেজে গিয়ে দেখা গেছে, সেখানে অন্তত তিন ধরনের ব্যানার ফেস্টুন চালিয়ে গণভোটের প্রচারণা চালানো হচ্ছে। বাজার, বাস স্ট্যান্ড, উপজেলা পরিষদসহ পৌরসভার গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় গণভোটের গুরুত্ব তুলে ধরে ব্যানার ঝোলানো হয়েছে। এর বাইরেও সরকারিভাবে লিফলেট ছাপানো হয়েছে যেখানে গণভোটের মূল বিষয়গুলো জানানো হচ্ছে।
এই যেমন বরিশাল মডেল স্কুলের সঙ্গেই এমন একটি বিলবোর্ড স্থাপন করেছে বরিশাল সিটি কর্পোরেশন। যেখানে গণভোট নিয়ে ১২টি পয়েন্ট উল্লেখ করা হয়েছে। যেটি দেশের বেশিরভাগ জায়গার ব্যানারেই দেখা গেছে। সরকারের পক্ষ থেকে এসব প্রচারণার পর মানুষদের মধ্যেও কথা বলে দেখা গেছে শিক্ষিত মানুষদের কেউ কেউ এ নিয়ে খুব বেশি কিছু জানেন না। অন্তর্বর্তী সরকার বলছে, যদিও এই প্রচারণা খুব বেশি আগে শুরু করা যায় নি। যে কারণে সাধারণ মানুষদের কেউ কেউ এ নিয়ে জানেন না। বাপক প্রচার শুরুর পর এ নিয়ে জানা যাবে বলেও মনে করেন তারা।
অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, ‘এটি নিয়ে আগে মানুষের একদমই ধারণা ছিল না। প্রচারণা শুরুর পর মূল বিষয়গুলো ওনারা বুঝতে পারছেন। লোকজন এখন এ বিষয়ে অবহিত। আগে একদম ছিলেন না। মূল বিষয়গুলো ওনারা বুঝতে পারছেন।
সরকারের বার্তা কতটা স্পষ্ট?
বগুড়ার সারিয়াকান্দিতে একটি ব্রিজের সঙ্গেই এমন একটি প্রচারণার বিলবোর্ড চোখে পড়ে। যেখানে গণভোটের প্রচারণার পাশাপাশি বিলবোর্ডে ১১টি পয়েন্ট যুক্ত করা হয়েছে।
এসব প্রশ্ন বলা হয়েছে : আপনি কি এমন বাংলাদেশ চান, যেখানে-
তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন ও সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) গঠনে সরকারি দল ও বিরোধী দল একত্রে কাজ করবে।
সরকারি দল ইচ্ছেমতো সংবিধান সংশোধন করতে পারবে না।
সংবিধানের গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ক্ষেত্রে গণভোটের বিধান চালু হবে।
বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার এবং গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হবেন।
যত মেয়াদই হোক, কেউ সর্বোচ্চ ১০ বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না।
সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব পর্যায়ক্রমে বাড়বে।
ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার জন্য পার্লামেন্টে একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হবে।
দেশের বিচারব্যবস্থা স্বাধীনভাবে কাজ করবে।
আপনার মৌলিক অধিকারের সংখ্যা (যেমন : ইন্টারনেট সেবা কখনও বন্ধ করা যাবে না) বাড়বে।
দণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধীকে রাষ্ট্রপতি ইচ্ছেমতো ক্ষমা করতে পারবেন না।
রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য থাকবে।
রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ধারাবাহিক আলোচনার মধ্যে দিয়ে সরকার যে জুলাই সনদ তৈরি করেছে সেখানে ৪৭টি সাংবিধানিক সংস্কার ও ৩৭টি আইন ও বিধি সংস্কারের তালিকা করা হয়েছে। অথচ সরকারের প্রচারণায় মাত্র ১১টি পয়েন্ট আর গণভোটের ব্যালটে মাত্র চারটি পয়েন্ট যুক্ত করলে ভোটারদের কাছে এটি কতটা স্পষ্ট হবে সেই প্রশ্নও সামনে আসছে।
জবাবে ঐকমত্য কমিশনের তৎকালীন সহসভাপতি ও বর্তমানে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী আলী রীয়াজ জানান, এখানে শুধু কি পয়েন্টস বা মূল বিষয় যুক্ত করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘নাগরিকরা সহজে যেগুলো বুঝতে পারবেন সেগুলোকেই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। যেগুলো তাদের জন্য সবচেয়ে জরুরি সেই পয়েন্টসগুলো অমরা বিবেচনায় নিয়েছি। এটা আমরা বলার চেষ্টা করছি এইগুলো কীভাবে তাদের অধিকারকে রক্ষা করতে পারে।’
তিনি জানান, শুধু লিফলেট বা প্রচারণা না। এর বাইরেও সরকারের পক্ষ আলোচনায় বিষয়গুলোর বিস্তারিত তুলে ধরা হচ্ছে। এছাড়াও সরকারের ওয়েব সাইটেও জুলাই সনদের বিস্তারিত পাওয়া যাচ্ছে।
সূত্র : বিবিসি বাংলা