কুতুবদিয়ার এক চর। এক প্রবীণ কারিগর আঙুল বোলাচ্ছেন কাঠের ছোট্ট একখানা ফ্রেমে। দেখতে মডেল নৌকা, কিন্তু তার প্রতিটি বাঁক, প্রতিটি গাঁথুনি যেন পূর্ণ আকারের এক জীবন্ত জলযানের প্রতিচ্ছবি। একসময় যেসব হাত সাগর পাড়ি দেওয়া সাম্পান বানাত, আজ সেসব হাতেই তৈরি হচ্ছে মিউজিয়াম-গ্রেড ছোট নৌকা। এভাবেই টিকে আছে বাংলাদেশি নৌকা নির্মাণের শেষ আলো।
নদী আর খালের এ দেশে শতাব্দীর পর শতাব্দী নৌকাই ছিল মানুষের জীবনরেখা। পণ্যবাহী, যাত্রীবাহী, মাছ ধরা, বিলাসবহুল, দৌড় প্রতিযোগিতার প্রতিটি কাজের জন্য ছিল ভিন্ন ভিন্ন আকৃতি, নাম আর নকশার কাঠের নৌকা। নদীর ধারে দাঁড়িয়ে দূরে কোনো পাল দেখা গেলে অভিজ্ঞ মাঝিরা বুঝে যেতেন, ওটা লবণবাহী সাম্পান, নাকি ধানবাহী নাকি, মালবাহী নৌকা।
কিন্তু আজ এ জলজ নান্দনিকতার জায়গা দখল করেছে লোহার ইঞ্জিনচালিত নৌকা। কাঠের বদলে ধাতু, পালের বদলে ডিজেল ইঞ্জিন, বাতাসের বদলে কালো ধোঁয়া। অল্প কয়েক দশকের ব্যবধানে বদলে গেছে নদীর ভাষা। কাঠের দাম, উপকরণের সংকট, অন্য পেশার টানে তরুণদের পিছটান সব মিলিয়ে একের পর এক কারিগর পেশা বদলাচ্ছেন, হারিয়ে যাচ্ছে শত বছরের সঞ্চিত জ্ঞান।
এই সংকটময় সময়ে নৌকা নির্মাণের শেষ আশ্রয়গুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে সামাজিক উন্নয়ন সংস্থা ফ্রেন্ডশিপ। উন্নয়ন কাজের পাশাপাশি তারা ধরে রাখছে নদীমাতৃক এ দেশের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ ঐতিহ্যবাহী নৌকা। ফ্রেন্ডশিপের সাংস্কৃতিক সংরক্ষণ উদ্যোগের সবচেয়ে বড় প্রতীকগুলোর একটি হলো বি৬১৩, দক্ষিণ এশিয়ায় এখনো টিকে থাকা সবচেয়ে বড় মালার-ক্লাস পালতোলা নৌকা। শতবর্ষের পুরনো কৌশল মেনে ১৯৯৭ সালে নৌকাটি পুনর্নির্মাণ করা হয়; কাঠের দেহ আর আত্মা থাকে আগের মতোই, যোগ হয় কেবল ন্যূনতম আধুনিক সুযোগ-সুবিধা। আজও যখন এই নৌকার বিশাল হাতবোনা পাল হাওয়ায় ফুলে ওঠে তখন অনেকেরই মনে হয়, সময় যেন একটু পেছনে হাঁটল।
আরেকটি অধ্যায় সাম্পানকে ঘিরে। একসময় চট্টগ্রাম, কুতুবদিয়া আর মহেশখালীর উপকূলে বড় সাম্পানই ছিল নিত্যদিনের বাণিজ্যযান। লবণ, মাছ, বিভিন্ন মালামাল বহন করত; ছোট সাম্পান যেত সরু খাল আর উপকূলীয় গলিপথে। ইঞ্জিনচালিত নৌকার দাপটে বড় সাম্পান এখন প্রায় বিলুপ্ত। ২০০৬ সালে ফ্রেন্ডশিপ কুতুবদিয়ার শেষ দিককার কিছু সাম্পান-কারিগরকে নিয়ে সাম্প্রতিককালের অন্যতম বৃহৎ সাম্পান তৈরি করে এ যেন শুধু একটি নৌকা নয়, একখানা সামষ্টিক স্মৃতি।
এই উদ্যোগের কেন্দ্রবিন্দুতে আছেন কারিগররা। কাঠমিস্ত্রি, দড়ি-নির্মাতা, পাল-তৈরিকারক, মাঝি আরও অনেক শৈল্পিক কারিগর। বহুদিন ধরে তারা ভাবছিলেন, তাদের কাজের আর মূল্য নেই; এখন শুধু লোহা আর মেশিনের যুগ। ফ্রেন্ডশিপের প্রকল্পগুলো তাদের দিয়েছে আয় রোজগার, সঙ্গে আত্মমর্যাদা। যখন তাদের বানানো মডেল নৌকা বাংলাদেশ ও বিদেশের মিউজিয়াম, প্রদর্শনী বা ব্যক্তিগত সংগ্রহে জায়গা পায় তখন তারা বুঝতে পারেন, তারা শুধু নৌকা বানাচ্ছেন না, গড়ে তুলছেন বাংলাদেশের দৃশ্যমান ইতিহাস।
ফ্রেন্ডশিপ কালারস অব দ্য চরের মাধ্যমে এ মডেল নৌকাগুলো পৌঁছে যাচ্ছে শহরের ক্রেতা এবং ইউরোপের বাজারেও। হাতে তৈরি তাঁতের পোশাক, গয়না ও অন্যান্য ক্রাফটের সঙ্গে পাশাপাশি বিক্রি হয় এগুলো। এক মিটার থেকে সাড়ে সাত মিটার পর্যন্ত বিভিন্ন আকারের এই রিপ্লিকাগুলো বানানো হয় আসল নৌকার একই নকশা-নীতি মেনে। কঙ্কাল, গাঁথুনি, পাল, রিগিং সবকিছুতে থাকে পূর্ণ আকারের নৌকার প্রতিচ্ছবি। ফলে এগুলো যেমন শোভাবর্ধনকারী, তেমনি ত্রিমাত্রিক নকশা ও শিক্ষণ-উপাত্ত হিসেবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে অমূল্য।
ফ্রেন্ডশিপ শুধু বাস্তব নৌকায় থেমে নেই; তারা ডিজিটাল আর্কাইভ তৈরি করেছে সাম্পানসহ বেশ কয়েকটি ঐতিহ্যবাহী নৌকার কাঠামো নিয়ে। থ্রিডি মডেল আর বিস্তারিত ডকুমেন্টেশনের মাধ্যমে ধরে রাখা হচ্ছে নৌকার পরিমাপ, বাঁক, কাঠ জোড়া দেওয়ার কৌশল। এতে করে ভবিষ্যতে পরিবেশগত বা অর্থনৈতিক কারণে যদি বড় কাঠের নৌকা বানানোও কঠিন হয়ে যায়, তবু নকশা আর জ্ঞান রয়ে যাবে গবেষক ও কারিগরদের নাগালে। এতে ভুল ধারণাও দূর হয় সাম্পানকে আর সহজে চাঁদ নৌকা ধরে ফেলা যায় না, প্রত্যেক নৌকাই নিজের পরিচয়ে ফিরে পায় সম্মান।
জলবায়ু পরিবর্তনে যখন উপকূল বদলে যাচ্ছে, চর গড়ে উঠছে, আবার ডুবে যাচ্ছে; তখন শুধু বাঁধ, আশ্রয়কেন্দ্র আর অবকাঠামো নয়, সংস্কৃতির টিকে থাকাও প্রশ্নের মুখে পড়ছে। যে দেশে নদী ছিল প্রধান রাস্তা, সেখানে নৌকা-সংস্কৃতি হারিয়ে যাওয়া মানে নিজেদের একটি বড় অংশ ভুলে যাওয়ার শামিল। ফ্রেন্ডশিপের নৌকা-প্রকল্প তাই নস্টালজিয়া নয়, বরং টেকসই ভবিষ্যতের কৌশলের অংশ যেখানে ঐতিহ্যও জীবিকা, আর নৌকা-নির্মাণও হয়ে ওঠে জলবায়ু সহনশীল নকশা জ্ঞানের উৎস।
আজ যখন বি৬১৩-এর ডেকে দাঁড়িয়ে কেউ নদীর বুক চিরে এগিয়ে যেতে থাকে, তার সঙ্গে ভেসে চলে বহু প্রজন্মের গল্প কারিগরের হাতের ঘাম, নদীর স্রোতের স্মৃতি, পালের শব্দ। প্রতিটি মডেল নৌকা, প্রতিটি পুনর্নির্মিত সাম্পান আমাদের মনে করিয়ে দেয়, এ দেশের ইতিহাস শুধু কাগজের বইয়ে লেখা নয়; অনেকটা লেখা আছে নদীর জলে ভাসা কাঠের গায়ে।
ফ্রেন্ডশিপের এ লড়াই তাই শেষ পর্যন্ত একটাই কথা বলে যতদিন একটি পালতোলা নৌকা হাওয়ায় মুখ তুলে দাঁড়াতে পারে, যতদিন কোনো কারিগর নতুন প্রজন্মকে দেখিয়ে বলতে পারেন, ‘এইভাবে নৌকা বানাতে হয়’, ততদিন পর্যন্ত বাংলাদেশি নৌকা-নির্মাণের গল্প শেষ হয়ে যায় না। বরং প্রতিদিনই নতুন করে একটু একটু করে লেখা হয় তক্তা জোড়া দিয়ে, পালের সেলাইয়ে, আর ঢেউয়ের তালে তালে এগিয়ে চলা প্রতিটি যাত্রায়।
Reporter Name 
























