ঢাকা ১১:৩৪ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৬, ১২ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

গুপ্ত রাজনীতি ও প্রপাগান্ডা শিক্ষাঙ্গনে অস্থিরতা পায়তারা

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১০:৪৭:১৪ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৬
  • ২ বার

বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর যখন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ ফেরাতে তৎপর ঠিক তখনই হঠাৎ করে শিক্ষাঙ্গনে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা চলছে। কখনো তুচ্ছ, কখনোবা পরিকল্পিতভাবে প্লট সাজিয়ে সরকার এবং সরকার দলীয় ছাত্র সংগঠনকে বিতর্কিত করার চেষ্টা হচ্ছে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়সহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী ক্যাম্পাস ও হলের দখল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে অন্যদের কোনঠাসা করা, সাধারণ শিক্ষার্থী (ছাত্র শিবির) পরিচয়ে ছাত্র রাজনীতি বন্ধ রাখা দাবির পুরনো কৌশল, প্রধানমন্ত্রী, জিয়া পরিবার, জাতীয় ও ছাত্র নেতৃবৃন্দকে নিয়ে অনবরত কুৎসা রটনা, কুরূচিপূর্ণ মন্তব্যের মাধ্যমে শিক্ষার্থী পরিচয়ে এক শ্রেণির রূচিহীন ব্যক্তির বিরুদ্ধে শিক্ষাঙ্গণের পরিবেশ নষ্ট করার অভিযোগ উঠেছে। এর মাধ্যমে তারা শিক্ষাঙ্গণ অস্থিতিশীল করার পায়তারা করছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ- সরকারকে বিপদে ফেলতে এবং ছাত্রলীগকে পুনর্বাসনের সুযোগ করে দিতে অত্যন্ত সুকৌশলে একের পর এক বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘাতের সূচনা করা হচ্ছে। যার সর্বশেষটি ঘটেছে গত বৃহস্পতিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। প্রধানমন্ত্রীর কন্যা ব্যারিস্টার জাইমা রহমানকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়ানো একটি বিকৃত ছবি (এআই জেনারেটেড) নিয়েই মূলত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এই ঘটনায় ছাত্রদল থানায় আইনি প্রতিকার চাইতে গেলে একই সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের (ছাত্র শিবির প্যানেল থেকে নির্বাচিত) নেতারা সেখানে উপস্থিত হলে তারা বাকবিত-ায় জড়িয়ে পড়েন। যা পরবর্তীতে হাতাহাতি-সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে এবং ডাকসু নেতা এবি যুবায়ের, মুসাদ্দিক আলীসহ কয়েকজন মারধরের শিকার হন। এসময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকসহ ১০ জনকে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ ওঠে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। যদিও এই ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করেছে ছাত্রদল, গঠন করেছে তদন্ত কমিটিও। এছাড়া আহত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিকদের খোঁজ নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী। পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় তিনি নিন্দা জানিয়ে বলেন, এ ধরণের ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সরকার সব সময় গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষা এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
সাম্প্রতিক সময়ে ক্যাম্পাসগুলো অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরির জন্য ছাত্র শিবিরকে দায়ি করে ছাত্রদল সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব বলেন, ৫ আগস্টের পর থেকেই ছাত্রদল ক্যাম্পাসগুলোতে সহনশীল ও সুষ্ঠু ধারার রাজনীতি চর্চা করে আসছে। কিন্তু ছাত্র শিবির ৫ আগস্টের পর থেকেই ধারাবাহিকভাবে গুপ্ত রাজনীতি ও উস্কানিমূলক রাজনীতির চর্চা অব্যাহত রেখেছে।

তিনি বলেন, আমরা প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই শিক্ষার শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। আজকেও (গতকাল) বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নেতৃবৃন্দকে নিয়ে আমরা শান্তিপূর্ণ সভা করেছি। আমরা নির্দেশনা দিয়েছি ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা কারো উস্কানিতে যেন পা না দেয়, কোথাও যাতে অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে। পাশাপাশি নেতৃবৃন্দ ক্যাম্পাসগুলোতে গুপ্ত রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি জানিয়েছে।
ছাত্রদল সভাপতি বলেন, ছাত্র শিবির ক্যাম্পাসগুলো একই সাথে কিছু প্রকাশ্য এবং কিছু গুপ্ত রাজনীতির চর্চা করছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রপাগান্ডা ছড়াচ্ছে। যা শিক্ষাঙ্গণের পরিবেশ নষ্ট করছে। তিনি বলেন, তারা মূলত ছাত্রদলকে বিতর্কিত করতে এবং সরকারকে বিপাকে ফেলতে ক্যাম্পাসগুলোকে অস্থিতিশীল করে তুলতে চায়। একইসঙ্গে তাদের পুরনো মিত্র ছাত্রলীগকেও ফেরাতে চায়।

২০১৪ সালের ৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের পতনের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের প্রায় প্রতিটি ক্যাম্পাসেই প্রকাশ্যে আসে ছাত্র শিবিরের নেতারা। যদিও তাদের কেউ কেউ ফ্যাসিস্ট আওয়ামী আমলে শিবিরের পরিচয় গোপন করে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। কেউ কেউ ছাত্রলীগের পদে, কেউবা মিছিল-মিটিং, শ্লোগানে সামনের সারিতেই থাকতেন। গণঅভ্যুত্থানের ছাত্রশিবির তাদেরকে দিয়েই বিশ্ববিদ্যালয় ও হলগুলো নিয়ন্ত্রণে নেয়া শুরু করে। আর সাধারণ শিক্ষার্থী (মূলত শিবির নেতাকর্মীরাই) নামে প্রতিটি ক্যাম্পাসেই ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি তুলে কার্যত ছাত্রদলসহ অন্যান্য ছাত্র সংগঠনগুলোকে রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনায় বাধা প্রদান করে। অন্তর্বর্তী সরকারের পুরো সময়টিতেই তারা সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ছত্রছায়ায় ক্যাম্পাসগুলোতে একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদগুলোর নির্বাচনকালে নিজেদের সাধারণ শিক্ষার্থী পরিচয় এবং প্রতিপক্ষ ছাত্রদলের বিরুদ্ধে ক্রমাগত মিথ্যা-ভুয়া অভিযোগ তুলে চাঁদাবাজ, ছাত্রলীগের একই চরিত্রে চিত্রায়িত করে শিবির। অন্তর্বর্তী সরকারের পুরোটা সময়ই ছাত্রদলকে নানা ফ্রেমিং করে কোনঠাসা করে রাখে এবং সংঘাত উস্কে দেওয়ার চেষ্টা চালায় জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠনটি। কারণ ছাত্র সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সবগুলো ক্যাম্পাসে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নেয় ছাত্রশিবির। ছাত্রদল সে সময় ধৈর্য্যরে সাথে এসব অভিযোগ ও ফ্রেমিং মোকাবেলা করে নিজেদের নেতাকর্মীদের সংযত রাখে।
৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে শিবিরের ক্যাম্পাস দলের সমালোচনা করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সম্মুখসারির নেতা আব্দুল কাদের বলেন, শিবির জুলাইয়ের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করে অপরাপর সবার রাজনীতি করার বন্ধ করার পায়তারা চালাইছিল। উদ্দেশ্য ছিল, কেবল নিজেরাই রাজনীতি করবে। সে লক্ষ্যে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের দাবীতে শিবিরের নেতারা ক্যাম্পাসে রাত-দিন ম’ব চালাইছিল। ৫ আগস্ট বিকেল বেলায়-ই শিবির হলে উঠে গেছে, তাদের সব নেতাকর্মীদের হলে তুলে ফেলছে; বিপরীতে অন্য সংগঠনের কেউ হলে উঠতে গেলে ম’ব সৃষ্টি করে হল থেকে বের করে দিছে। “সাধারণ শিক্ষার্থী” নামে তারা হলগুলা চালাইছে, ব্যাচ প্রতিনিধির নামে তারা হলগুলোতে ছায়া প্রশাসন কায়েম করেছে, হলের সব সিদ্ধান্ত নিত তারা। হলে কে থাকবে কে থাকতে পারবে না, কার নামে মামলা হবে কারা মামলা থেকে রেহাই পাবে, শিবির সব ঠিক করতো ব্যাচ প্রতিনিধির নামে।
তিনি বলেন, শিবির স্বপ্ন দেখেছিল, জুলাইয়ের সুযোগটা কাজে লাগিয়ে তারা বুয়েটের মতো ঢাবিসহ সব ক্যাম্পাসে একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করবে এবং সেটা ধরেও রাখবে। কিন্তু সেটা যে সম্ভব না, অবাস্তব এবং দুঃস্বপ্ন, তারা সেটা বুঝেনি। যত তাড়াতাড়ি বুঝবে ততই লাভ, সেটা নিজেদের জন্য এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য, শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিতের জন্যও।
এদিকে ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ভূমিধ্বস বিজয় অর্জন করে সরকার গঠন করে। ছাত্রদলও ক্যাম্পাসগুলোতে তাদের রাজনীতিতে সক্রিয় হতে শুরু করে। কিন্ত এক্ষেত্রেও ছাত্র শিবির তাদের সেই পুরনো কৌশলে ক্যাম্পাসগুলোতে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি তুলতে থাকে এবং এর সঙ্গে শুরু হয় আগের তুলনায় আরো নগ্ন ফ্রেমিং, চরিত্র হনন, কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য। অন্যদিকে ছাত্রদল শিবিরের ‘গুপ্ত’ রাজনীতি বন্ধের দাবি তোলে। ফলে শিক্ষাঙ্গন অস্থিতিশীল করার যে নীলনকশা সেটি শুরু করতে সফলও হয় ছাত্রশিবির। যার সূচনা হয় গত মঙ্গলবার চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজের মাধ্যমে।
বাংলাদেশের চট্টগ্রামে একটি কলেজে গ্রাফিতিতে ‘গুপ্ত’ শব্দ লেখা নিয়ে মঙ্গলবার ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘর্ষের পর দুই সংগঠনের পরস্পরবিরোধী অবস্থানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোয় উত্তেজনার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। উভয় সংগঠনই একে অপরের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো এবং বিভিন্ন কৌশলে ক্যাম্পাস ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টার অভিযোগ করছে।
জানা গেছে, কলেজের দেয়ালে একটি গ্রাফিতিতে লেখা ছিল ‘ছাত্ররাজনীতি ও ছাত্রলীগমুক্ত ক্যাম্পাস’। সেখানে ছাত্ররাজনীতি থেকে ছাত্র শব্দ মুছে দিয়ে তার উপরে গুপ্ত শব্দ লিখে দেওয়া হয়। এ নিয়েই সংঘর্ষে জড়ায় ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির নেতাকর্মীরা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনা : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং তার কন্যা জাইমা রহমানকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি এআই জেনারেটেড আপত্তিকর ছবিকে কেন্দ্র করে বৃহস্পতিবার ছাত্রদল-ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে। এতে ১০ সাংবাদিকসহ অন্তত ১৪ জন আহত হয়েছেন।
‎প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কন্যা জাইমা রহমানকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মধ্যমে একটি ‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স’ (এআই) ব্যবহার করে তৈরি করা আপত্তিকর ছবি ছাত্র শিবিরের প্যানেল থেকে ডাকসু নির্বাচন করা আব্দুল্লাহ আল মাহমুদের আইডি থেকে ছড়িয়ে পড়ার অভিযোগ ওঠে। ‎এর প্রতিবাদে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল করে শাহবাগে অবস্থান নেন এবং থানায় মামলা করতে যান। অন্যদিকে অভিযুক্ত পক্ষ অভিযোগ অস্বীকার করে জানায়, তাদের বিরুদ্ধে ভুয়া স্ক্রিনশট ছড়িয়ে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। এ বিষয়ে তারা থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে এসেছেন।
‎একপর্যায়ে থানার ভেতরে দুই পক্ষ মুখোমুখি হলে বাক-বিত-া থেকে হাতাহাতি শুরু হয়, যা পরে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ায় রূপ নেয়। এক পর্যায়ে ডাকসু নেতা এবি যুবায়ের,মুসাদ্দিক আলীসহ কয়েকজন মারধরের শিকার হন। এসময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপনসহ সিনিয়র নেতৃবৃন্দ তাদের উদ্ধার করে সেখান থেকে সেইফ এক্সিট দেন।
‎রাত ৯টার দিকে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। থানার সামনে অবস্থান নেওয়া নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে আবারও উত্তেজনা তৈরি হয় এবং সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য সংঘর্ষ ঘটে। পরে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
এসময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০ জন সাংবাদিকের ওপর ছাত্রদলের হামলার অভিযোগ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি। সংগঠনটির অভিযোগ, পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে তাদের অন্তত ১০ জন সদস্যের ওপর ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা হামলা চালায়। এতে সংগঠনের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি আহত হন। ‎সংগঠনটি হামলার নিন্দা জানিয়ে জড়িতদের গ্রেফতার, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতসহ তিন দফা দাবি জানিয়েছে। সমিতির সভাপতি মানজুর হোছাঈন মাহি বলেন, ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের পর স্বাধীন সাংবাদিকতার যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, সাম্প্রতিক ধারাবাহিক ঘটনাগুলো তা প্রশ্নবিদ্ধ করছে। তিনি বলেন, একটি ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে উত্তেজনার খবর পেয়ে সাংবাদিকরা শাহবাগ থানায় গেলে ভিডিও ধারণের সময় ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা বাধা দেয়। প্রতিবাদ জানালে সাংবাদিকদের ধাক্কা দেওয়া হয় এবং অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করা হয়।
উদ্ভুত পরিস্থিতিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছে। এ ঘটনায় তদন্তে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং অভিযুক্ত শিক্ষার্থীকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। কমিটিকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। একইসঙ্গে শাহবাগ থানায় শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনাও তদন্তে পৃথক কমিটি গঠন করা হয়েছে।
‎এদিকে ঘটনায় আহত শিক্ষার্থীদের দেখতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম রাতে মর্তুজা মেডিকেল সেন্টার ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পরিদর্শন করেন। তিনি আহতদের চিকিৎসার খোঁজখবর নেন এবং দ্রুত সুস্থতা কামনা করেন।
ডাকসুর জিএস এস এম ফরহাদ বলেন, একটা ভুয়া ফটোকার্ড ছাত্রলীগ ছড়ায়। লিগ্যাল এপ্রোচে না গিয়ে, সেটাকে কেন্দ্র করে থানায় গিয়ে মব করা হলো। ডাকসু নেতা মুকাদ্দিস ও জুবায়েরসহ সবার ওপর আক্রমণ করা হলো। এই নগ্ন হামলা, জিডি না নেওয়া, অপেক্ষামাণ রাখা, পুলিশ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অবজার্ভ করা এবং এনজয় করা। এগুলো সবই ফ্যাসিবাদি লক্ষণ।
ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম বলেন, থানায় হামলা চালিয়ে ইতিহাসের ন্যাক্কারজনক ঘটনার জন্ম দিয়েছে ছাত্রদল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পেশী শক্তির রাজনীতি মেনে নেওয়া হবে না বলে হুঁশিয়ারি করেন তিনি।
‎ছাত্রদলের তদন্ত কমিটি গঠন : ছাত্রদলের কিছু নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে গণমাধ্যমকর্মীদের সাথে অনাকাক্সিক্ষত ঘটনার অভিযোগের তদন্তের জন্য ৪ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে সংগঠনটি। কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি জহির রায়হান আহমেদ, এবিএম ইজাজুল কবির রুয়েল, ঢাবি শাখার সহ-সভাপতি আনিসুর রহমান খন্দকার অনিক ও সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিন শাওনের সমন্বয়ে গঠিত কমিটিকে ৫ দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন ছাত্রদল সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় হবে জ্ঞানচর্চার জায়গা, এখানে দলীয়করণের কোনো সুযোগ নেই। আইনের ঊর্ধ্বে গিয়ে কাউকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হবে না এবং ক্যাম্পাসে বহিরাগতদের প্রবেশ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে।
দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে মন্ত্রী বলেন, আমরা একটি স্থিতিশীল, সংবেদনশীল ও সহনশীল রাজনীতির পথে এগোচ্ছি। যারা দেশকে অস্থিতিশীল করতে চায়, তারা যে দলেরই হোক না কেন, কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। সমাজে কিছু উচ্ছৃঙ্খল ব্যক্তি বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে, যাদের প্রকৃত অর্থে কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নেই। আইনের বাইরে যাওয়ার সুযোগ কারও নেই।

অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, শাহবাগ থানার ভেতরে ডাকসুর সাহিত্য ও সংস্কৃতিবিষয়ক সম্পাদক মুসাদ্দিক আলী এবং সমাজসেবা সম্পাদক এবি যুবায়ের ও ডাকসুর নারী নেত্রী জুমার ওপর ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের বর্বরোচিত ও কাপুরুষোচিত হামলা অত্যন্ত দুঃখজনক এবং অনভিপ্রেত। হাজার হাজার শিক্ষার্থীদের নির্বাচিত জনপ্রিয় প্রতিনিধিদের ওপর এই ন্যাক্কারজনক হামলা গণতান্ত্রিক সভ্য সমাজে মেনে নেওয়া যায় না। আমরা এই ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি।
তিনি বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আব্দুল্লাহ আল মাহমুদের নামে একটি ভুয়া আইডি থেকে গুজব ছড়ানো হয়। তিনি তা অস্বীকার করে নিজের পেজে পোস্ট দেওয়ার পরও তাকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। নিরাপত্তার জন্য তিনি শাহবাগ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে গেলে জিডি গ্রহণ না করে তাকে আটকে রাখা হয়। খবর পেয়ে বিষয়টি সমাধানের জন্য এবি যুবায়ের ও মুসাদ্দিক আলী থানায় আসলে ছাত্রদলের সন্ত্রাসীরা পুলিশের উপস্থিতিতে তাদের মারাত্মকভাবে আহত করে।’তিনি পুলিশের ভূমিকায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, পুলিশের যেখানে নাগরিকদের নিরাপত্তা দেওয়ার কথা, সেখানে পুলিশ নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে, যা অত্যন্ত নিন্দনীয়। ‎

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

গুপ্ত রাজনীতি ও প্রপাগান্ডা শিক্ষাঙ্গনে অস্থিরতা পায়তারা

আপডেট টাইম : ১০:৪৭:১৪ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৬

বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর যখন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ ফেরাতে তৎপর ঠিক তখনই হঠাৎ করে শিক্ষাঙ্গনে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা চলছে। কখনো তুচ্ছ, কখনোবা পরিকল্পিতভাবে প্লট সাজিয়ে সরকার এবং সরকার দলীয় ছাত্র সংগঠনকে বিতর্কিত করার চেষ্টা হচ্ছে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়সহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী ক্যাম্পাস ও হলের দখল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে অন্যদের কোনঠাসা করা, সাধারণ শিক্ষার্থী (ছাত্র শিবির) পরিচয়ে ছাত্র রাজনীতি বন্ধ রাখা দাবির পুরনো কৌশল, প্রধানমন্ত্রী, জিয়া পরিবার, জাতীয় ও ছাত্র নেতৃবৃন্দকে নিয়ে অনবরত কুৎসা রটনা, কুরূচিপূর্ণ মন্তব্যের মাধ্যমে শিক্ষার্থী পরিচয়ে এক শ্রেণির রূচিহীন ব্যক্তির বিরুদ্ধে শিক্ষাঙ্গণের পরিবেশ নষ্ট করার অভিযোগ উঠেছে। এর মাধ্যমে তারা শিক্ষাঙ্গণ অস্থিতিশীল করার পায়তারা করছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ- সরকারকে বিপদে ফেলতে এবং ছাত্রলীগকে পুনর্বাসনের সুযোগ করে দিতে অত্যন্ত সুকৌশলে একের পর এক বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘাতের সূচনা করা হচ্ছে। যার সর্বশেষটি ঘটেছে গত বৃহস্পতিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। প্রধানমন্ত্রীর কন্যা ব্যারিস্টার জাইমা রহমানকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়ানো একটি বিকৃত ছবি (এআই জেনারেটেড) নিয়েই মূলত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এই ঘটনায় ছাত্রদল থানায় আইনি প্রতিকার চাইতে গেলে একই সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের (ছাত্র শিবির প্যানেল থেকে নির্বাচিত) নেতারা সেখানে উপস্থিত হলে তারা বাকবিত-ায় জড়িয়ে পড়েন। যা পরবর্তীতে হাতাহাতি-সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে এবং ডাকসু নেতা এবি যুবায়ের, মুসাদ্দিক আলীসহ কয়েকজন মারধরের শিকার হন। এসময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকসহ ১০ জনকে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ ওঠে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। যদিও এই ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করেছে ছাত্রদল, গঠন করেছে তদন্ত কমিটিও। এছাড়া আহত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিকদের খোঁজ নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী। পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় তিনি নিন্দা জানিয়ে বলেন, এ ধরণের ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সরকার সব সময় গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষা এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
সাম্প্রতিক সময়ে ক্যাম্পাসগুলো অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরির জন্য ছাত্র শিবিরকে দায়ি করে ছাত্রদল সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব বলেন, ৫ আগস্টের পর থেকেই ছাত্রদল ক্যাম্পাসগুলোতে সহনশীল ও সুষ্ঠু ধারার রাজনীতি চর্চা করে আসছে। কিন্তু ছাত্র শিবির ৫ আগস্টের পর থেকেই ধারাবাহিকভাবে গুপ্ত রাজনীতি ও উস্কানিমূলক রাজনীতির চর্চা অব্যাহত রেখেছে।

তিনি বলেন, আমরা প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই শিক্ষার শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। আজকেও (গতকাল) বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নেতৃবৃন্দকে নিয়ে আমরা শান্তিপূর্ণ সভা করেছি। আমরা নির্দেশনা দিয়েছি ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা কারো উস্কানিতে যেন পা না দেয়, কোথাও যাতে অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে। পাশাপাশি নেতৃবৃন্দ ক্যাম্পাসগুলোতে গুপ্ত রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি জানিয়েছে।
ছাত্রদল সভাপতি বলেন, ছাত্র শিবির ক্যাম্পাসগুলো একই সাথে কিছু প্রকাশ্য এবং কিছু গুপ্ত রাজনীতির চর্চা করছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রপাগান্ডা ছড়াচ্ছে। যা শিক্ষাঙ্গণের পরিবেশ নষ্ট করছে। তিনি বলেন, তারা মূলত ছাত্রদলকে বিতর্কিত করতে এবং সরকারকে বিপাকে ফেলতে ক্যাম্পাসগুলোকে অস্থিতিশীল করে তুলতে চায়। একইসঙ্গে তাদের পুরনো মিত্র ছাত্রলীগকেও ফেরাতে চায়।

২০১৪ সালের ৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের পতনের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের প্রায় প্রতিটি ক্যাম্পাসেই প্রকাশ্যে আসে ছাত্র শিবিরের নেতারা। যদিও তাদের কেউ কেউ ফ্যাসিস্ট আওয়ামী আমলে শিবিরের পরিচয় গোপন করে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। কেউ কেউ ছাত্রলীগের পদে, কেউবা মিছিল-মিটিং, শ্লোগানে সামনের সারিতেই থাকতেন। গণঅভ্যুত্থানের ছাত্রশিবির তাদেরকে দিয়েই বিশ্ববিদ্যালয় ও হলগুলো নিয়ন্ত্রণে নেয়া শুরু করে। আর সাধারণ শিক্ষার্থী (মূলত শিবির নেতাকর্মীরাই) নামে প্রতিটি ক্যাম্পাসেই ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি তুলে কার্যত ছাত্রদলসহ অন্যান্য ছাত্র সংগঠনগুলোকে রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনায় বাধা প্রদান করে। অন্তর্বর্তী সরকারের পুরো সময়টিতেই তারা সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ছত্রছায়ায় ক্যাম্পাসগুলোতে একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদগুলোর নির্বাচনকালে নিজেদের সাধারণ শিক্ষার্থী পরিচয় এবং প্রতিপক্ষ ছাত্রদলের বিরুদ্ধে ক্রমাগত মিথ্যা-ভুয়া অভিযোগ তুলে চাঁদাবাজ, ছাত্রলীগের একই চরিত্রে চিত্রায়িত করে শিবির। অন্তর্বর্তী সরকারের পুরোটা সময়ই ছাত্রদলকে নানা ফ্রেমিং করে কোনঠাসা করে রাখে এবং সংঘাত উস্কে দেওয়ার চেষ্টা চালায় জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠনটি। কারণ ছাত্র সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সবগুলো ক্যাম্পাসে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নেয় ছাত্রশিবির। ছাত্রদল সে সময় ধৈর্য্যরে সাথে এসব অভিযোগ ও ফ্রেমিং মোকাবেলা করে নিজেদের নেতাকর্মীদের সংযত রাখে।
৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে শিবিরের ক্যাম্পাস দলের সমালোচনা করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সম্মুখসারির নেতা আব্দুল কাদের বলেন, শিবির জুলাইয়ের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করে অপরাপর সবার রাজনীতি করার বন্ধ করার পায়তারা চালাইছিল। উদ্দেশ্য ছিল, কেবল নিজেরাই রাজনীতি করবে। সে লক্ষ্যে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের দাবীতে শিবিরের নেতারা ক্যাম্পাসে রাত-দিন ম’ব চালাইছিল। ৫ আগস্ট বিকেল বেলায়-ই শিবির হলে উঠে গেছে, তাদের সব নেতাকর্মীদের হলে তুলে ফেলছে; বিপরীতে অন্য সংগঠনের কেউ হলে উঠতে গেলে ম’ব সৃষ্টি করে হল থেকে বের করে দিছে। “সাধারণ শিক্ষার্থী” নামে তারা হলগুলা চালাইছে, ব্যাচ প্রতিনিধির নামে তারা হলগুলোতে ছায়া প্রশাসন কায়েম করেছে, হলের সব সিদ্ধান্ত নিত তারা। হলে কে থাকবে কে থাকতে পারবে না, কার নামে মামলা হবে কারা মামলা থেকে রেহাই পাবে, শিবির সব ঠিক করতো ব্যাচ প্রতিনিধির নামে।
তিনি বলেন, শিবির স্বপ্ন দেখেছিল, জুলাইয়ের সুযোগটা কাজে লাগিয়ে তারা বুয়েটের মতো ঢাবিসহ সব ক্যাম্পাসে একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করবে এবং সেটা ধরেও রাখবে। কিন্তু সেটা যে সম্ভব না, অবাস্তব এবং দুঃস্বপ্ন, তারা সেটা বুঝেনি। যত তাড়াতাড়ি বুঝবে ততই লাভ, সেটা নিজেদের জন্য এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য, শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিতের জন্যও।
এদিকে ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ভূমিধ্বস বিজয় অর্জন করে সরকার গঠন করে। ছাত্রদলও ক্যাম্পাসগুলোতে তাদের রাজনীতিতে সক্রিয় হতে শুরু করে। কিন্ত এক্ষেত্রেও ছাত্র শিবির তাদের সেই পুরনো কৌশলে ক্যাম্পাসগুলোতে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি তুলতে থাকে এবং এর সঙ্গে শুরু হয় আগের তুলনায় আরো নগ্ন ফ্রেমিং, চরিত্র হনন, কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য। অন্যদিকে ছাত্রদল শিবিরের ‘গুপ্ত’ রাজনীতি বন্ধের দাবি তোলে। ফলে শিক্ষাঙ্গন অস্থিতিশীল করার যে নীলনকশা সেটি শুরু করতে সফলও হয় ছাত্রশিবির। যার সূচনা হয় গত মঙ্গলবার চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজের মাধ্যমে।
বাংলাদেশের চট্টগ্রামে একটি কলেজে গ্রাফিতিতে ‘গুপ্ত’ শব্দ লেখা নিয়ে মঙ্গলবার ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘর্ষের পর দুই সংগঠনের পরস্পরবিরোধী অবস্থানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোয় উত্তেজনার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। উভয় সংগঠনই একে অপরের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো এবং বিভিন্ন কৌশলে ক্যাম্পাস ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টার অভিযোগ করছে।
জানা গেছে, কলেজের দেয়ালে একটি গ্রাফিতিতে লেখা ছিল ‘ছাত্ররাজনীতি ও ছাত্রলীগমুক্ত ক্যাম্পাস’। সেখানে ছাত্ররাজনীতি থেকে ছাত্র শব্দ মুছে দিয়ে তার উপরে গুপ্ত শব্দ লিখে দেওয়া হয়। এ নিয়েই সংঘর্ষে জড়ায় ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির নেতাকর্মীরা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনা : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং তার কন্যা জাইমা রহমানকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি এআই জেনারেটেড আপত্তিকর ছবিকে কেন্দ্র করে বৃহস্পতিবার ছাত্রদল-ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে। এতে ১০ সাংবাদিকসহ অন্তত ১৪ জন আহত হয়েছেন।
‎প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কন্যা জাইমা রহমানকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মধ্যমে একটি ‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স’ (এআই) ব্যবহার করে তৈরি করা আপত্তিকর ছবি ছাত্র শিবিরের প্যানেল থেকে ডাকসু নির্বাচন করা আব্দুল্লাহ আল মাহমুদের আইডি থেকে ছড়িয়ে পড়ার অভিযোগ ওঠে। ‎এর প্রতিবাদে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল করে শাহবাগে অবস্থান নেন এবং থানায় মামলা করতে যান। অন্যদিকে অভিযুক্ত পক্ষ অভিযোগ অস্বীকার করে জানায়, তাদের বিরুদ্ধে ভুয়া স্ক্রিনশট ছড়িয়ে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। এ বিষয়ে তারা থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে এসেছেন।
‎একপর্যায়ে থানার ভেতরে দুই পক্ষ মুখোমুখি হলে বাক-বিত-া থেকে হাতাহাতি শুরু হয়, যা পরে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ায় রূপ নেয়। এক পর্যায়ে ডাকসু নেতা এবি যুবায়ের,মুসাদ্দিক আলীসহ কয়েকজন মারধরের শিকার হন। এসময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপনসহ সিনিয়র নেতৃবৃন্দ তাদের উদ্ধার করে সেখান থেকে সেইফ এক্সিট দেন।
‎রাত ৯টার দিকে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। থানার সামনে অবস্থান নেওয়া নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে আবারও উত্তেজনা তৈরি হয় এবং সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য সংঘর্ষ ঘটে। পরে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
এসময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০ জন সাংবাদিকের ওপর ছাত্রদলের হামলার অভিযোগ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি। সংগঠনটির অভিযোগ, পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে তাদের অন্তত ১০ জন সদস্যের ওপর ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা হামলা চালায়। এতে সংগঠনের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি আহত হন। ‎সংগঠনটি হামলার নিন্দা জানিয়ে জড়িতদের গ্রেফতার, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতসহ তিন দফা দাবি জানিয়েছে। সমিতির সভাপতি মানজুর হোছাঈন মাহি বলেন, ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের পর স্বাধীন সাংবাদিকতার যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, সাম্প্রতিক ধারাবাহিক ঘটনাগুলো তা প্রশ্নবিদ্ধ করছে। তিনি বলেন, একটি ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে উত্তেজনার খবর পেয়ে সাংবাদিকরা শাহবাগ থানায় গেলে ভিডিও ধারণের সময় ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা বাধা দেয়। প্রতিবাদ জানালে সাংবাদিকদের ধাক্কা দেওয়া হয় এবং অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করা হয়।
উদ্ভুত পরিস্থিতিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছে। এ ঘটনায় তদন্তে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং অভিযুক্ত শিক্ষার্থীকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। কমিটিকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। একইসঙ্গে শাহবাগ থানায় শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনাও তদন্তে পৃথক কমিটি গঠন করা হয়েছে।
‎এদিকে ঘটনায় আহত শিক্ষার্থীদের দেখতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম রাতে মর্তুজা মেডিকেল সেন্টার ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পরিদর্শন করেন। তিনি আহতদের চিকিৎসার খোঁজখবর নেন এবং দ্রুত সুস্থতা কামনা করেন।
ডাকসুর জিএস এস এম ফরহাদ বলেন, একটা ভুয়া ফটোকার্ড ছাত্রলীগ ছড়ায়। লিগ্যাল এপ্রোচে না গিয়ে, সেটাকে কেন্দ্র করে থানায় গিয়ে মব করা হলো। ডাকসু নেতা মুকাদ্দিস ও জুবায়েরসহ সবার ওপর আক্রমণ করা হলো। এই নগ্ন হামলা, জিডি না নেওয়া, অপেক্ষামাণ রাখা, পুলিশ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অবজার্ভ করা এবং এনজয় করা। এগুলো সবই ফ্যাসিবাদি লক্ষণ।
ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম বলেন, থানায় হামলা চালিয়ে ইতিহাসের ন্যাক্কারজনক ঘটনার জন্ম দিয়েছে ছাত্রদল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পেশী শক্তির রাজনীতি মেনে নেওয়া হবে না বলে হুঁশিয়ারি করেন তিনি।
‎ছাত্রদলের তদন্ত কমিটি গঠন : ছাত্রদলের কিছু নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে গণমাধ্যমকর্মীদের সাথে অনাকাক্সিক্ষত ঘটনার অভিযোগের তদন্তের জন্য ৪ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে সংগঠনটি। কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি জহির রায়হান আহমেদ, এবিএম ইজাজুল কবির রুয়েল, ঢাবি শাখার সহ-সভাপতি আনিসুর রহমান খন্দকার অনিক ও সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিন শাওনের সমন্বয়ে গঠিত কমিটিকে ৫ দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন ছাত্রদল সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় হবে জ্ঞানচর্চার জায়গা, এখানে দলীয়করণের কোনো সুযোগ নেই। আইনের ঊর্ধ্বে গিয়ে কাউকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হবে না এবং ক্যাম্পাসে বহিরাগতদের প্রবেশ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে।
দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে মন্ত্রী বলেন, আমরা একটি স্থিতিশীল, সংবেদনশীল ও সহনশীল রাজনীতির পথে এগোচ্ছি। যারা দেশকে অস্থিতিশীল করতে চায়, তারা যে দলেরই হোক না কেন, কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। সমাজে কিছু উচ্ছৃঙ্খল ব্যক্তি বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে, যাদের প্রকৃত অর্থে কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নেই। আইনের বাইরে যাওয়ার সুযোগ কারও নেই।

অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, শাহবাগ থানার ভেতরে ডাকসুর সাহিত্য ও সংস্কৃতিবিষয়ক সম্পাদক মুসাদ্দিক আলী এবং সমাজসেবা সম্পাদক এবি যুবায়ের ও ডাকসুর নারী নেত্রী জুমার ওপর ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের বর্বরোচিত ও কাপুরুষোচিত হামলা অত্যন্ত দুঃখজনক এবং অনভিপ্রেত। হাজার হাজার শিক্ষার্থীদের নির্বাচিত জনপ্রিয় প্রতিনিধিদের ওপর এই ন্যাক্কারজনক হামলা গণতান্ত্রিক সভ্য সমাজে মেনে নেওয়া যায় না। আমরা এই ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি।
তিনি বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আব্দুল্লাহ আল মাহমুদের নামে একটি ভুয়া আইডি থেকে গুজব ছড়ানো হয়। তিনি তা অস্বীকার করে নিজের পেজে পোস্ট দেওয়ার পরও তাকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। নিরাপত্তার জন্য তিনি শাহবাগ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে গেলে জিডি গ্রহণ না করে তাকে আটকে রাখা হয়। খবর পেয়ে বিষয়টি সমাধানের জন্য এবি যুবায়ের ও মুসাদ্দিক আলী থানায় আসলে ছাত্রদলের সন্ত্রাসীরা পুলিশের উপস্থিতিতে তাদের মারাত্মকভাবে আহত করে।’তিনি পুলিশের ভূমিকায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, পুলিশের যেখানে নাগরিকদের নিরাপত্তা দেওয়ার কথা, সেখানে পুলিশ নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে, যা অত্যন্ত নিন্দনীয়। ‎