,

হায়রে উড়ন্ত পাখির জীবন

 ড. গোলসান আরা বেগমঃ
ও রবিনের মা —–
তোরে বলছি না — আর কাঁদবি না।
তুই জানিস না? তুই কাঁদলে আমি হাতে পায়ে জোড় পাই না। আমি কোন কাজ করতে পারি না। কাজ না করলে খাবি কি।।
–রবিনের বাবা তুমিই বলো। আমি কি করবো?
আমার তো বুক জ্বলে। মনরে বুঝাইতে পারি না। সারাক্ষণ ছেলে ও নাতির ছবি আমার চোখে ভাসতে থাকে।
—-তোর ছেলে কি তা বুঝে? ছেলে ছেলে করে তো মরে গেলি। আমার বুক জ্বলে না? বলতে বলতে সে ডুকরে  কেঁদে বুক ভাসায়।
—দেখ না, পাশের বাড়ীর রাহাত আলীর অবস্থা। তাদের তো দুই ছেলে মেয়ে ছিলো।বিদেশে কি যে মজা,তারাই জানে।বাবার মস্ত বড় সম্পদ আছে, নিজেরাও ভালো চাকুরী করতো।কিন্তু না, দুই ভাই বোনই চলে গেলো বিদেশে।
বাবা মা কি আর করবে। তাদের চোখের  সামনে সব অর্থ সম্পদ বিক্রি করে  নিয়ে গেলো বিদেশে। বোবা নিথর পাথরের মতো থাকিয়ে থাকলো বাবা মা মাটির দিকে।
রাহাত আলী ও তার স্ত্রী তাদের সিদ্ধান্তে থাকলেন অনড়।  ছেলে বা মেয়ে কারো কাছে বসবাস করতে যান নাই। ড্রাইভার, দারোয়ান,কাজের মানুষকে ঘিরে বেঁচে থাকলেন ।
খুব অস্থত হয়ে মা মারা গেলো। ভাই তার বেনকে পাঠিয়ে দিয়ে বললো — তুমি যাও মাকে বিদায় দিয়ে আস।আমি বাবাকে বিদায় দিতে যাবো।
তোমার তো এক ছেলে, সেও তাই করবে।মরন কালে মুখ দেখতে পারবে না।
মা — ছয়তলা বাড়ি করার সময় ছেলেকে জিঞ্জেস করেছিলাম, কি রে বাবা, তুই কি বিদেশ টিদেশ চলে যাবি না কি।
সে খুব উচু গলায় বলেছিলো — আমি কি ফকির ফাকরা না কি।যে বিদেশ যেতে হবে, শরীরের রক্ত পানি করতে।
তা ছাড়া আমি তো ভালো চাকুরীও করছি।
মনে মনে খুব খুশী হয়েছিলাম।দো- হাত তুলে আল্লাহ্ র কাছে মন খুলে শুকরিয়া আদায় করেছিলাম। যাক, বাঁচা গেলো। সন্তানের খোঁজে আকাশে চোখ রেখে এয়ারপোর্টে ঘুরাঘুরি করতে হবে না।
বাংলাদেশের বহু মানুষ জমি জমা বাড়ি ঘর বিক্রি করে সন্তানকে পাঠিয়েছে দিচ্ছে  বিদেশে । তারা বিদেশী অর্থের যোগান দিচ্ছে পরিবারে ও জাতীয় অর্থনীতিতে। তাদের বউ,বাচ্ছা, মা, বাবা তো সুখে শান্তিতেই আছে। গ্রামের বাড়ীতে পাকা ঘর বানিয়ে শহরের সুবিধা ভোগ করছে।কেউ কেউ আবার বিদেশের  মাটিতেই স্থায়ী ঠিকানা গড়ে ফেলছে।
শোন,  আমাদের মত দরিদ্র দেশ থেকে বিরাট অংকের টাকা তুলে নিয়ে , বিদেশে গড়ছে ঝাড় জঙ্গলে বিলাশ বহুল কুড়ে ঘর।ওখানেই না কি পৃথিবীর সকল সুশীতল শান্তি।
আমার দেশের কি যে ক্ষতি করছে ওরা, তা এক বারও ভেবে দেখছে না।
সরকারও তাদেরকে প্রতিরোধ করতে পারছে না। এরাই গড়ে তুলেছে বিদেশের মাটিতে বেগম পাড়া। অবৈধ পথে লুট হয়ে যাচ্ছে বিপুল পরিমানের অর্থ। কে তামাবে এই পাগল ছাগলদের।
ওদের মুখের যুক্তি তর্ক শোনে নিজেদের মাথাও গরম হয়ে যায়। কিন্তু এই বুড়ু বয়সে কি করবো। এক পা তো দিয়ে রেখেছি কবরে।
আমরা বোকা কানা মানুষ যারা,মাথায় রেখে হাত হায় আফসোস করছি। আগামী প্রজন্মের অবস্থাটা কি হবে। এর জন্যই কি একাত্তরে রক্ত ক্ষয়ী যুদ্ধ করে পৃথিবীর বুকে বাংলাদেশ নামক স্বাধীন সার্বভৌম দেশের জন্ম দিয়েছিলাম।
— ও  রবিনের মা।  তোমার পোলা রবিন কি বলে জান?
—– কি বলে?
—— পঞ্চাশ বছর পর বাংলাদেশ পানির নীচে তলিয়ে যাবে।এ দেশে জান মালের কোন নিরাপত্তা নাই। ভবিষ্যতে আরো
ভয়ঙ্কর দুর্যোগ দেখা দিবে।  শ্রীলংকার মতো ভয়াবহ অর্থনৈতিক মন্দায় পড়ে যাবে দেশ। তখন মানুষ না খেয়ে মরবে।
— রাখো তো এসব ফালতু কথা। আমরা এতো বছর বাঁচুম না। যা হয় হবে।
— এই তো কথা কয়টা শেষ না করতেই আবার ভেদ ভেদ করে কান্না জুড়ে দিলে।কাঁদতে কাঁদতেই মরবি। আমাকে সাগরে ভাসিয়ে দিয়ে যাবি।
— কি করবো বলো মনেরে তো মানাতে পারি না।
— ও রবিনের মা , শোন।পাশের বাসার রাহাত আলী  মারা গেছে তার গ্রামের বাড়ীতে।ওখানেই তারে দাফন করা হয়েছে।
— উনার ছেলে আসলো না?
— ওদের কর্মব্যস্ত জীবন। বাবাকে তেখার সময় কই? তা ছাড়া রাহাত আলী মৃত্যুর পূর্বে বলেছিলো, তার লাশ যেন প্রিজে ঢোকিয়ে ছেলের জন্য অপেক্ষা না করে।
— তার টাকা পয়সা, বাড়ী ঘরের কি হলো।
—  রাহাত আলীর তার বড় ভাইয়ের নামে লিখে দিয়ে গিয়েছে।
হায়রে উড়ন্ত পাখীর জীবন। এই জীবনের জন্য মানুষ কেন  এতো হন্যে হয়ে পেরেশানী হয়।
লেখক ঃ সহ সভাপতি,বাংলাদেশ লেখিকা সংঘ।
Print Friendly, PDF & Email

     এ ক্যাটাগরীর আরো খবর