ব্যয়বহুল ও আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে বড় ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আগামী এক বছরের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে নতুন করে ৫ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ যুক্ত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গত ১৩ আগস্ট বিদ্যুৎ খাত-সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে তিনি এ নির্দেশনা দেন। তবে এক বছরের মধ্যে ৫ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন আদৌ সম্ভব কিনা, সেটা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন রয়েছে। অনেকের অভিমত, লক্ষ্য নিয়ে কাজ করলে পুরোটা উৎপাদন সক্ষম না হলেও কিছুটা হলেও দেশের জন্য উপকার।
বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, বৈঠকে দ্রুত সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন, সরকারি-বেসরকারি জমি ও অব্যবহৃত জায়গা কাজে লাগানো, গ্রিডে দ্রুত সংযোগ দেওয়ার ব্যবস্থা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রশাসনিক জটিলতা কমানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজাউল করিম আমাদের সময়কে বলেন, আমরা এক বছরের মধ্যে পাঁচ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ যুক্ত করার চেষ্টা করব। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা রয়েছে। সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের নানা পরিকল্পনা ও কর্মসূচি গ্রহণ করে কাজ করা হচ্ছে।
বিদ্যুৎ খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনে এখনও গ্যাস, কয়লা ও জ্বালানি তেলের ওপর বড় ধরনের নির্ভরতা রয়েছে। এর মধ্যে গ্যাসের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন কমে যাওয়ায় আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ও এলএনজির মূল্য অস্থির থাকায় বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয়ও বাড়ছে। একই সঙ্গে ডলার সংকট ও বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ তৈরি করছে জ্বালানি আমদানি। এই বাস্তবতায় দেশীয় ও তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল উৎস হিসেবে সৌরবিদ্যুতের দিকে জোরালোভাবে এগোতে চাইছে সরকার।
নবায়নযোগ্য বিদ্যুতে বড় ঘাটতি : বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির মধ্যে সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা সৌরবিদ্যুতের। সরকারি নবায়নযোগ্য জ্বালানি তথ্যভাণ্ডারের প্রকাশিত হিসাবগুলোতে দেশে মোট নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ সক্ষমতা প্রায় দেড় হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি, যার বড় অংশই সৌরবিদ্যুৎ। এর সঙ্গে সৌর হোম সিস্টেম, সোলার সেচ, ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ এবং অন্যান্য অফ-গ্রিড ব্যবস্থার সক্ষমতাও রয়েছে। তবে জাতীয় গ্রিডে বাণিজ্যিকভাবে যুক্ত সৌরবিদ্যুতের পরিমাণ মোট সৌর সক্ষমতার চেয়ে কম।
ফলে এক বছরের মধ্যে আরও ৫ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ গ্রিডে যুক্ত করার লক্ষ্য বর্তমান সক্ষমতার তুলনায় অত্যন্ত বড় একটি পরিকল্পনা। এ কারণে শুধু নতুন প্রকল্প অনুমোদন নয়, জমি নির্বাচন, বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি, অর্থায়ন, সঞ্চালন লাইন ও সাবস্টেশন প্রস্তুত করা এবং দ্রুত নির্মাণ— সব ক্ষেত্রেই সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন হবে।
২০৩০ ও ২০৪০ সালের লক্ষ্য : নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে সরকার ইতোমধ্যে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতি ২০২৫-এ ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে সরবরাহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে সৌরবিদ্যুৎকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। কারণ বাংলাদেশের অন্যান্য নবায়নযোগ্য উৎসের তুলনায় সৌরশক্তির সম্ভাবনা বেশি এবং দেশের বিভিন্ন এলাকায় বড় আকারের সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের সুযোগ রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০৩০ সালের লক্ষ্য পূরণ করতে হলে আগামী কয়েক বছরেই বিপুল পরিমাণ নতুন সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতা তৈরি করতে হবে। ফলে আগামী এক বছরে ৫ হাজার মেগাওয়াট যুক্ত করার উদ্যোগকে শুধু একটি স্বল্পমেয়াদি বিদ্যুৎ উৎপাদন পরিকল্পনা হিসেবে দেখলে হবে না; এটি দীর্ঘমেয়াদি নবায়নযোগ্য জ্বালানি লক্ষ্যে যাওয়ার একটি বড় ধাপ।
কেন হঠাৎ সৌরবিদ্যুতে এত তোড়জোড় : জ্বালানি খাতে সাম্প্রতিক সংকটই সৌরবিদ্যুতে সরকারের আগ্রহের অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। দেশের নিজস্ব গ্যাসের উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমছে। ফলে বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাসের ঘাটতি পূরণে এলএনজি আমদানি করতে হচ্ছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম, জাহাজভাড়া ও ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করতে হয়। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতসহ আন্তর্জাতিক অস্থিরতায় জ্বালানি সরবরাহের ঝুঁকিও বেড়েছে।
অন্যদিকে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন তুলনামূলকভাবে ব্যয়বহুল। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়ও দ্রুত বাড়ে। কয়লা তুলনামূলক সাশ্রয়ী হলেও এর বড় অংশই আমদানিনির্ভর।
সৌরবিদ্যুতের ক্ষেত্রে শুরুতে বড় ধরনের বিনিয়োগ প্রয়োজন হলেও একবার কেন্দ্র স্থাপনের পর বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানি কেনার প্রয়োজন হয় না। ফলে দীর্ঘমেয়াদে আমদানি ব্যয় কমানো, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমানো এবং জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়ানোর ক্ষেত্রে সৌরবিদ্যুৎ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বিপিডিবির উদ্যোগ : ৫ হাজার মেগাওয়াটের লক্ষ্য বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব পড়ছে বিপিডিবির ওপর। সংস্থাটি ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য জমি ও সম্ভাব্য প্রকল্প এলাকা চিহ্নিত করা, বেসরকারি উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে বিদ্যুৎ কেনার উদ্যোগ এবং গ্রিডের সক্ষমতা বিবেচনায় প্রকল্প গ্রহণের কাজ করছে।
বিপিডিবির নিজস্ব জমি ও অব্যবহৃত জমিকে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে ব্যবহারের সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি সরকারি বিভিন্ন সংস্থার পতিত বা অব্যবহৃত জমি, জলাশয় ও উপযুক্ত এলাকায় বড় আকারের সৌর প্রকল্প স্থাপনের বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, শুধু বড় সৌর পার্ক নয়— ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ, সরকারি ভবন, শিল্পকারখানা, কৃষি সেচ এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে নেট মিটারিংয়ের আওতা বাড়ানো গেলে গ্রাহক পর্যায়ে উৎপাদিত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে দেওয়া সম্ভব হবে।
জমি ও গ্রিডই বড় চ্যালেঞ্জ : তবে এক বছরে ৫ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ গ্রিডে যুক্ত করা সহজ হবে না বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। বড় সৌর প্রকল্পের জন্য প্রয়োজন বিপুল পরিমাণ জমি। একই সঙ্গে প্রকল্পের কাছে পর্যাপ্ত সঞ্চালন ও বিতরণ অবকাঠামো না থাকলে উৎপাদিত বিদ্যুৎ গ্রিডে নেওয়া সম্ভব হবে না।
সৌরবিদ্যুতের আরেকটি বড় সমস্যা হলো এটি সূর্যালোকনির্ভর। দিনে উৎপাদন বেশি হলেও রাতে উৎপাদন থাকে না। ফলে সৌরবিদ্যুতের অংশ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গ্রিডে ব্যালান্সিং, এনার্জি স্টোরেজ, দ্রুত চালু-বন্ধ করা যায় এমন বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং উন্নত গ্রিড ব্যবস্থাপনার প্রয়োজন হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ৫ হাজার মেগাওয়াটের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে প্রকল্প অনুমোদন ও নির্মাণের পাশাপাশি একই সময়ে সঞ্চালন অবকাঠামো সম্প্রসারণ করতে হবে। অন্যথায় নতুন কেন্দ্র স্থাপিত হলেও উৎপাদিত বিদ্যুতের একটি অংশ গ্রিডে নেওয়া কঠিন হতে পারে। তবে বিপিডিবির একজন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা আমাদের সময়কে বলেন, ৫ হাজার মেগাওয়াটের লক্ষ্যমাত্রা পূরণের বড় টার্গেট হলো ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন।
বিনিয়োগে নতুন সুযোগ : সরকারের এই উদ্যোগে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগও বাড়তে পারে। সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি, সরকারি জমির ব্যবহার এবং সহজ শর্তে অর্থায়নের সুযোগ তৈরি করা গেলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এ খাতে আরও বেশি আগ্রহী হতে পারেন। বিদ্যুৎ খাতের কর্মকর্তারা বলছেন, ৫ হাজার মেগাওয়াটের লক্ষ্য পূরণে সরকারি বিনিয়োগের পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগকে কাজে লাগানো হবে। প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি বাড়াতে অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করা এবং একাধিক সংস্থার মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো জরুরি।
Reporter Name 






















