রফিকুল ইসলামঃ “যে আলো ছড়ালে তুমি নিভৃত চরের আঙিনায়, / সে আলো নেভেনি আজও, স্মৃতি তঁর অম্লান রয়। / তর্ক ও যুক্তির তূণে তুমি ছিলে নির্ভীক এক তরী, / হৃদয়ে রয়েছো বেঁচে, হে শিক্ষক, তোমায় স্মরণ করি।”
আমাদের সমাজ এখন দ্রুত বদলাচ্ছে। মেগাপ্রজেক্ট হচ্ছে, হাওরের বুক চিরে তৈরি হচ্ছে পিচঢালা অলওয়েদার সড়ক, পর্যটকদের ভিড়ে মুখরিত হচ্ছে একসময়ের বিচ্ছিন্ন জনপদ। কিন্তু এই বাহ্যিক চাকচিক্যের নিচে আমরা কি আমাদের সমাজ গঠনের আসল কারিগরদের ভুলে যাচ্ছি?
আজ থেকে চার দশক আগে, যখন কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলা ছিল মূল ভূখণ্ড থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন, বর্ষায় অথৈ জল আর শুকনা মৌসুমে ধুলো ওড়ানো ধূ ধূ প্রান্তর – তখন সেখানে রাষ্ট্র পৌঁছানোর আগেই পৌঁছেছিলেন কিছু মানুষ। তাঁরা কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার জোরে নয়, বরং স্রেফ শিক্ষার বাতি হাতে অন্ধকারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন।
তেমনি একজন কিংবদন্তিসম মানুষ ছিলেন আশি ও নব্বই দশকের প্রথিতযশা শিক্ষক, সমাজ সংস্কারক ও নির্ভীক শিক্ষক নেতা মো. রেফাযেত উল্লাহ ভুঁইয়া আঙ্গুর।
মিঠামইনের গোপদিঘী ইউনিয়নে অবস্থিত ঐতিহাসিক অলুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে তিনি যে আলোকবর্তিকা জ্বালিয়েছিলেন, তার আলো আজো ফুরিয়ে যায়নি। ২০০৩ সালের ১২ই এপ্রিল কালবৈশাখীর ঝড়ে সেই উত্তাল জলরাশির এক অভিশপ্ত দিনে চামড়া বন্দরের সন্নিকটে এক নির্মম লঞ্চ ডুবিতে নদীগর্ভে তলিয়ে যায় এই মহান শিক্ষকের প্রাণস্পন্দন, পতন ঘটে এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের।
কিন্তু এই ট্র্যাজেডি কেবল একজন শিক্ষকের প্রয়াণ ছিল না, এটি ছিল পুরো উপজেলার শিক্ষক নেতৃত্ব ও সমাজ সংস্কারের ইতিহাসের করুণ অধ্যায়।
সেই একই জলরাশিতে তাঁর সাথে বিলীন হয়ে গিয়েছিলেন গোপদিঘী ইউনিয়নের আরেক দিকপাল, নতুন বগাদিয়া গ্রামের সমাজসেবক, সালিশি ন্যায়বিচারক, রাজনীতিক ও চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করে স্বল্প ভোটে হেরে যাওয়া মো. শামসুল হক ভুঁইয়া – যিনি এক নতুন, দুর্নীতিমুক্ত ও প্রগতিশীল সমাজ গঠনের স্বপ্ন দেখেছিলেন। সেইসাথে একই গ্রামের মো. আবদুল আজিজও প্রাণ হারান।
একই অঞ্চলের, একই ঘরানার তিনজন সমাজ বিনির্মাণের কারিগরকে এক নিমেষে গ্রাস করেছিল চামড়া বন্দরের সেই নির্মম জলরাশি। ২০০৩ সালের ১২ই এপ্রিলের সেই ট্র্যাজেডি পুরো কিশোরগঞ্জ জেলার সামাজিক ও শিক্ষাঙ্গনে এক অপূরণীয় এবং চিরন্তন শূন্যতার সৃষ্টি করে, যা গত দুই দশকেও পূরণ করা সম্ভব হয়নি –
“চামড়া বন্দরের ঢেউয়ে মিশে গেল জীবনের গান, / কেঁদে ওঠে হাওর বাংলা, কেঁদে ওঠে অগণিত প্রাণ। / লঞ্চের সেই জলছায়া কেড়ে নিল আলোর সে রথ, / তবুও তোমার আলো দেখাবে আমাদের আগামীর পথ।”
আজ দুই দশক পর দাঁড়িয়ে যখন সমাজ ও শিক্ষার ক্ষয়িষ্ণু রূপ দেখি, তখন এই মানুষদের শূন্যতা আমাদের বিবেককে তীব্রভাবে তাড়িত করে।
অলুয়ার স্কুল আঙিনা এবং একজন ‘তর্কবাগীশ’ শিক্ষক আশির দশকে হাওরাঞ্চলের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর চিত্র কেমন ছিল, তা আজকের প্রজন্মের পক্ষে কল্পনা করাও কঠিন। সেই বৈরী সময়ে অলুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের হাল ধরেছিলেন মো. রেফাযেত উল্লাহ ভুঁইয়া আঙ্গুর।
তিনি শুধু একটি স্কুলের রুটিনমাফিক প্রধান শিক্ষক ছিলেন না – তিনি ছিলেন হাওরের ঘরে ঘরে শিক্ষার বার্তা পৌঁছে দেওয়ার এক ফেরিওয়ালা। অলুয়া ছাড়াও হাওরের আরও বেশ কিছু বিদ্যালয়ে অত্যন্ত সুনাম ও দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন। যেখানেই গেছেন, প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা আর শিক্ষার মানকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন।
ব্যক্তিজীবনে রেফাযেত উল্লাহ ভুঁইয়া আঙ্গুর স্যার ছিলেন চরম বিনয়ী ও অমায়িক। অথচ, নীতি আর আদর্শের প্রশ্নে তিনি ছিলেন আপসহীন। স্থানীয় সমাজে তিনি বিচক্ষণ ও ‘তর্কবাগীশ শিক্ষক’ হিসেবেও পরিচিত ছিলেন।
তবে তাঁর এই তর্ক কোনো সস্তা আত্মঅহমিকা বা ব্যক্তিগত স্বার্থের জন্য ছিল না। তাঁর তর্ক ছিল কুসংস্কারের বিরুদ্ধে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে এবং সত্য প্রতিষ্ঠার পক্ষে। যুক্তির টেবিলে তিনি অকাট্য যুক্তি দিয়ে প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করতেন।
এই চারিত্রিক দৃঢ়তা ও বাগ্মীতার কারণেই তিনি তৎকালীন শিক্ষক সমাজে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন এবং একজন শক্তিশালী শিক্ষক নেতা হিসেবে শিক্ষকদের অধিকার আদায়ে আজীবন প্রথম সারিতে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
“ধলাইয়ের মাটি ছুঁয়ে যে মানুষ গড়েছিল মানুষের মন, / শ্রেণিকক্ষ ছাড়িয়ে যিনি ছিলেন সমাজের সুহৃদ স্বজন। / বিনয়ে নমিত মাথা, যুক্তিতে অটল যার বাণী, / হারায়নি সে মানুষ, আমরা যে তাঁর পদচিহ্ন জানি।”
মিঠামইনের ঐতিহ্যবাহী ধলাই গ্রামের মুসলিম এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পারিবারিক বাড়ির নাম ছিল ‘বড়বাড়ি’। পিতা মো. আবদুল করিম ভুঁইয়া ছিলেন গোপদিঘী ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান।
গ্রামের কাদামাটির গন্ধ গায়ে মেখেই আঙ্গুর মাস্টার বড় হয়েছেন এবং আমৃত্যু সেই মাটির ঋণ শোধ করার চেষ্টা করেছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, শিক্ষকতা একটি মহান এবং মর্যাদাপূর্ণ পেশা, যা কেবল জীবিকা অর্জনের মাধ্যম নয় – বরং মানবসম্পদ উন্নয়ন ও সমাজ গঠনের প্রধান হাতিয়ার। প্রকৃত শিক্ষার কাজ শুধু সার্টিফিকেট বিতরণ নয়, বরং একটি অবহেলিত সমাজকে বদলে দেওয়া।
তাই আঙ্গুর মাস্টার শুধু স্কুলের চার দেয়ালের ভেতর পাঠদানে সীমাবদ্ধ থাকেননি। ধলাই গ্রামসহ পুরো গোপদিঘী ইউনিয়নে বাল্যবিয়ে রোধ, কুসংস্কার ও অনাচার দূরীকরণ এবং সামাজিক সালিশ-বিচারে তাঁর সত্যনিষ্ঠ ও দূরদর্শী ভূমিকা ছিল প্রশ্নাতীত। যেকোনো সামাজিক সংকটে মানুষ তাঁর দ্বারস্থ হতেন এবং তিনি অত্যন্ত সততা, ন্যায়পরায়ণতা ও দক্ষতার সাথে সেসবের সমাধান করতেন।
আজ সমাজে যখন তথাকথিত ‘শিক্ষিত’ মানুষের ভিড়ে ‘আদর্শবান’ মানুষের আকাল, তখন তাঁর মতো একজন খাঁটি সমাজ বিনির্মাণের কারিগরের অভাব প্রতি মুহূর্তে অনুভূত হয়।
ব্যক্তিগতভাবে আমার সাংবাদিকতার জীবনে রেফাযেত উল্লাহ ভুঁইয়া আঙ্গুর মাস্টারের অবদান আমি কোনোদিন ভুলব না। সাংবাদিকতার মতো একটি চরম ঝুঁকিপূর্ণ ও চ্যালেঞ্জিং পেশায় যখন আমি পথচলা শুরু করি, তখন চারপাশের অনেকেই বিষয়টিকে বাঁকা চোখে দেখেছিলেন। অনেকেই সংশয় প্রকাশ ও নিরুৎসাহিত করেছিলেন। কিন্তু এই মানুষটি ছিলেন সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। তিনি আমার এই সাহসী পদক্ষেপ এবং লেখার গুণগত মানের ভূয়সী প্রশংসা করতেন। বলতেন, “অততা, অত কঠিন বিষয়ে অত সুন্দর ও সহজ করে সাজিয়ে লেহস কেমনে!”
তিনি প্রায়ই বলতেন, “কলমই হচ্ছে সমাজের সবচেয়ে বড় অস্ত্র। সমাজকে বদলাতে হলে নির্ভীক সাংবাদিকতার কোনো বিকল্প নেই।”
একজন শিক্ষাগুরু অগ্রজের এই প্রশংসা ও পিঠ চাপড়ে দেওয়া অনুপ্রেরণা আমার সাংবাদিকতা জীবনের পাথেয় হয়ে আছে। তিনি সবসময় তরুণদের নতুন কিছু করার এবং সমাজকে নেতৃত্ব দেওয়ার স্বপ্ন দেখাতেন। বর্তমান সময়ে যখন চাটুকারিতা আর মেরুদণ্ডহীনতাই অনেক ক্ষেত্রে পার পাওয়ার উপায় হয়ে দাঁড়িয়েছে, তখন আঙ্গুর মাস্টারের সেই নির্ভীক কলম সৈনিক হওয়ার দীক্ষা আমাকে প্রতিনিয়ত সোজা হয়ে দাঁড়ানোর শক্তি যোগাত।
অন্তহীন শ্রদ্ধায় আলোর মশাল মো. রেফাযেত উল্লাহ ভুঁইয়া আঙ্গুর এবং মো. শামসুল হক ভুঁইয়া, সেইসাথে তাঁদের সঙ্গী মো. আবদুল আজিজের মতো মানুষেরা মরেও অমর।
অলুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কিংবা ধলাই ও নতুন বগাদিয়া গ্রামের প্রতিটি ধূলিকণায় তাঁদের স্মৃতি ও অবদান মিশে আছে।
বর্তমান যুগে যখন সমাজ ও শিক্ষকতায় এক চরম আদর্শের সংকট দেখা যায়, তখন তাঁদের মতো বিনয়ী, যুক্তিবাদী ও সমাজসচেতন মানুষের জীবন ও কর্ম আমাদের জন্য বড় বেশি প্রাসঙ্গিক।
চামড়া বন্দরে ঘূর্ণিঝড় তাঁদের শরীরকে কেড়ে নিয়েছে সত্য, কিন্তু তাঁদের আদর্শ ও সমাজ বিনির্মাণের স্বপ্নকে মুছে দিতে পারেনি। আঙ্গুর মাস্টার যে আলোর মশাল জ্বালিয়ে দিয়ে গেছেন, আমাদের দায়িত্ব সেই মশালকে পরবর্তী প্রজন্মের হাতে তুলে দেওয়া।
এই মহান গুণীজনদের স্মৃতির প্রতি জানাই গভীর ও বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি। তাঁদের খোদার দিদার লাভ এবং জান্নাতুল ফেরদাউস নসিব হোক।
লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও কলামিস্ট;
সহযোগী সম্পাদক, আজকের সূর্যোদয়, ঢাকা
Reporter Name 






















