ঢাকা ০৪:৪৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১৫ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
রাতুলের জাদুকরী গোলে ফিফা বিশ্বকাপের ফাইনালে বাংলাদেশ নাজনীন হাসান খান নির্মাণ করলেন ‘ভালোবাসার মায়া’ ৪ দিনের জাপান সফর শেষে ঢাকায় পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণকে স্বাগত জানালেন ব্রিটিশ সংসদ সদস্যরা রেলওয়ের মহাপরিচালক রেলবহরে যুক্ত হচ্ছে ২০০ নতুন কোচ, চালু হবে নতুন ট্রেন ইভি ‘পিংক’ বাসের জন্য নারী চালকদের ভারী যানবাহন চালনার প্রশিক্ষণ দেবে বিআরটিসি জয়ের পর ফুল নিয়ে জামায়াত প্রার্থীর বাসায় মির্জা ফয়সল, খাওয়ালেন মিষ্টি নাবলুসে হজরত ইউসুফের (আ.) সমাধিতে ইসরায়েলি সেনাদের অভিযান দীপের বক্তব্যে ‘গরমিল’, তাহসিফের মৃত্যু ঘিরে বাড়ছে রহস্য ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে শিকারে জেলেরা বাড়বে ১৫ হাজার কোটি টাকার ইলিশ

২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে শিকারে জেলেরা বাড়বে ১৫ হাজার কোটি টাকার ইলিশ

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ০৩:৩২:২৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬
  • ১১ বার

ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষে প্রজনন মৌসুমে সারাদেশে ৮ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর এই ২২ দিনের মা ইলিশ ধরার নিষেধাজ্ঞা গত রাত ১২টায় শেষ হয়েছে। আজ থেকে জেলেরা আবার জাল ও নৌকা নিয়ে সাগর-নদীতে মাছ ধরতে ছুটবে। মা ইলিশ ধরা নিষেধাজ্ঞার ফলে ইলিশের ডিম ছাড়ার হার ও জাটকা (ছোট ইলিশ) বৃদ্ধি পেয়ে প্রতি বছর দেশে ইলিশের উৎপাদন উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়েছে। মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী দেশে গত কয়েক বছরে ইলিশের উৎপাদক ব্যাপক বেড়েছে। এর মধ্যে গত ২০২০-২১ অর্থবছরে ইলিশের উৎপাদন ছিল ৫ লাখ ৬৫ হাজার মেট্রিক টন। এরপর ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৫ দশমিক ৭১ লাখ মেট্রিক টন, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে কিছুটা কমে ৫ লাখ ২৯ হাজার মেট্রিক টন। এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৫ লাখ মেট্রিক টন। গবেষকরা বলছেন নদী দূষণ, পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা কমে যাওয়া, জলবায়ু পরিবর্তন, জাটকা ও মা ইলিশ নিধনের ফলে গত দুই বছর ইলিশের উৎপাদন কিছুটা কমেছে। তবে চলতি অর্থবছরে প্রজনন মৌসুমে ব্যাপক তদারকির ফলে মা ইলিশ নিরাপদে ডিম ছাড়তে পেরেছে। এখন জাটকা নিধন বন্ধ করতে পারলে এবছর প্রায় ৬ লাখ টন ইলিশ উৎপাদন হতে পারে বলে তাদের ধারণা।

ইলিশ গবেষক ও মৎস্যবিজ্ঞানী ড. মো. আনিছুর রহমান বলেন, এ বছর ইলিশের উৎপাদন পৌনে ছয় লাখ মেট্রিক টনে পৌঁছাবে বলে আমরা আশা করছি। কারণ এ বছর যে পরিমাণ প্রোটেকশন তারা পেয়েছে সে কারণে কাক্সিক্ষত উৎপাদন ভালো হবে। ইলিশ মাছ আহরণের সময় বেশ কয়েকটি বিষয় অনুসরণের জন্য ইতোমধ্যেই মৎস্য বিভাগ থেকে নির্দেশনা দিয়েছে। আগামী ১ নভেম্বর থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত টানা ৭ মাস সারা দেশেই ইলিশ পোনা, জটকা আহরণ, পরিবহন ও বিপনন নিষিদ্ধ থাকবে। এগুলো মেনে চললে ইলিশের উৎপাদন এ বছর ছয় লাখ টনের কাছাকাছি পৌঁছে যাবে।

মৎস্য অধিদপ্তরের অভ্যন্তরীন মৎস্য বিভাগের পরিচালক ড. মো. মোতালেব হোসেন বলেন, মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযানের মাধ্যমে নির্দিষ্ট কি পরিমাণ উৎপাদন বাড়বে তা তাৎক্ষণিকভাবে বলা সম্ভব নয়। তবে সফলভাবে প্রজনন নিশ্চিত করা গেলে প্রতি বছর ইলিশের সামগ্রিক উৎপাদন বাড়ে। যদিও গত ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে প্রাকৃতিক ও পরিবেশগত নানা কারণে ইলিশের উৎপাদন কিছুটা কমে ৫ লাখ টনে দাঁড়িছে। তবে এবার সেটা বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ৬ লাখ টনে দঁড়াতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের ধারণামতে গত বছরের চেয়ে এবছর ইলিশের উৎপাদন প্রায় ১ লাখ টন বৃদ্ধি পেতে পারে। বর্তমানে দেশের বাজারে আকার ও মানভেদে পাইকারী ও খুচরা বাজারে ইলিশের সর্বনি¤œ গড় দাম প্রতি কেজি ১ হাজার ২০০ টাকা থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা। সে হিসাবে ১ লাখ টন (১০ কোটি কেজি) ইলিশের বাজার মূল্য ১২ হাজার কোটি টাকা থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা হবে।

বর্তমানে বিশ্বব্যাপী উৎপাদিত মোট ইলিশের প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই বাংলাদেশে উৎপাদিত হয়। একটি মা ইলিশ নির্বিঘেœ ডিম ছাড়ার সুযোগ পেলে প্রায় ২০ থেকে ২৫ লাখ পর্যন্ত পোনা বা ডিম ছাড়তে পারে। নিষেধাজ্ঞার সফল বাস্তবায়নে প্রতি বছর প্রায় ৫০ শতাংশের বেশি মা ইলিশ ডিম ছাড়ার সুযোগ পায়। ডিম থেকে ফুটে বের হওয়া হাজার কোটি জাটকা ইলিশের মোট সংখ্যায় যুক্ত হয়, যা ভবিষ্যতে বড় ইলিশ হয়ে নদী ও সাগরে ধরা পড়ে। নিষেধাজ্ঞার ইতিবাচক প্রভাবে বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বে ইলিশ উৎপাদনে প্রথম স্থান অধিকার করেছে এবং অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ে মাছ উৎপাদনে শীর্ষস্থানীয় অবস্থানে রয়েছে। প্রতি বছর নিয়ম মেনে ইলিশ শিকার বন্ধ রাখায় জেলেরাও পরবর্তীতে নদীতে পর্যাপ্ত ও বড় আকৃতির ইলিশ পাচ্ছে।

চলতি বছর প্রজনন মৌসুমে ইলিশ ধরা নিষেধাজ্ঞা বেশ কঠোর ভাবে প্রশাসন তদারকি করেছে। এবার মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযানে সারাদেশে প্রায় ৯ কোটি ৯২ লাখ মিটার অবৈধ কারেন্ট জাল জব্দ করা হয়েছে। জালের পাশাপাশি এই ২২ দিনের অভিযানে বিপুল পরিমাণ মা ইলিশ ও মাছ ধরার নৌকাও জব্দ করা হয় এবং আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে সারাদেশে শত শত মামলা ও জরিমানা করা হয়েছে। এর মধ্যে লক্ষ্মীপুরে ২২৯টি অভিযানে ১৫০ জন জেলেকে আটক করা হয়। ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ৭৩ জনকে কারাদ- এবং ৭৭ জনকে মোট ১ লাখ ৯৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। ভোলা জেলায় আইন অমান্য করায় ৮০ জনকে কারাদ- এবং প্রায় সাড়ে চার লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। শরীয়তপুরে ২২ দিনের অভিযানে ১৬৯ জন জেলেকে কারাদ- দেওয়া হয় এবং মৎস্য আইনে ১ লাখ ৭৯ হাজার ৬০০ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়। রাজবাড়ীতে ১৫ দিনের অভিযানে ৩২ জনসহ মোট ৬ জেলেসহ বিভিন্ন মেয়াদে কারাদ- ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জরিমানা আদায় করা হয়। এ ছাড়া চাঁদপুর, জোহালকাঠি, ফরিদপুর ও পটুয়াখালীসহ বিভিন্ন নদী অঞ্চলে যৌথ অভিযানে শতাধিক জেলে আটক, বিভিন্ন মেয়াদে কারাদ- এবং অর্থদ- প্রদান করা হয়। বিভিন্ন জেলা থেকে আমাদের সংবাদদাতাদের পাঠানো রিপোর্ট নিচে তুলে ধরা হলো।

বরিশাল থেকে নাছিম উল আলম জানান, ইলিশের নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করতে টানা ২২ দিনের আহরণ, পরিবহন ও বিপনন নিষেধাজ্ঞা গত মধ্যরাতে উঠে যাবার পরে বরিশালসহ সন্নিহিত অঞ্চলের জেলেরা মেঘনা, তেতুলিয়া, সন্ধ্যা, সুগন্ধা, বিষখালী এবং বলেশ^রসহ উপকূলীয় নদী ও সাগর মোহনায় জাল ফেলতে শুরু করেছেন। তবে আগামী ১ নভেম্বর থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত টানা ৭ মাস সারা দেশেই ইলিশ পোনা, জটকা আহরণ, পরিবহন ও বিপনন নিষিদ্ধ থাকবে। ১০ ইঞ্চি পর্যন্ত ইলিশকে জাটকা হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে সরকারি ঘোষণায়।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তায় গত ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞাকালীন সময়ে বরিশাল উপকূলীয় এলাকায় মৎস্য অধিদফতর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের মাধ্যমে প্রায় দেড় হাজার মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে ইলিশ আহরণে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করায় প্রায় ১৪শ’ জেলে ও মৎস্যজীবীকে বিভিন্ন মেয়াদে করাদ- দিয়েছে। এ সময়ে প্রায় ৫৫ লাখ টাকা জরিমানা আদায় ছাড়াও ১ হাজার ৬৫০টি মামলাও দায়ের করা হয়েছে। এসব অভিযানে প্রায় ৬ কোটি মিটার জাল বাজেয়াপ্ত করে পুড়িয়ে ফেলেছে মৎস্য অধিদফতরসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এ সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তায় প্রায় ৭ হাজার অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি বিপুল সংখ্যক মাছঘাট, বাজার ও আড়ৎ পরিদর্শন করে মৎস্য অধিদফতর। এ সময়ে প্রায় ৫৪ টন ইলিশ জব্দ করে বিভিন্ন এতিমখানা ও লিল্লাহ বোর্ডিংয়ে নিবাসীদের মাঝে বিলিয়ে দেয়া হয়েছে বলেও জানিয়েছে মৎস্য অধিদফতর।

ভোলা থেকে মোঃ জহিরুল হক জানান, মা ইলিশ রক্ষায় টানা ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞার সময় মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীতে আইন অমান্য করায় জেলেদের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদ- দেয়া হয়েছে। ৭২টি মোবাইল কোর্ট, পরিচালনাকালীন সময়ে৩৩৯ টব অভিযানে ১৫২টি মামলায় ২১৫ জনকে আটক করা হয় বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়েছে। এ সময় ৬ লাখ ৪৬ হাজার ৮ শত হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে।১৬ টি ট্রলার,৩৮ টি নৌকা জব্দ করা হয়েছে। জব্দকৃত ট্রলার নিলামে বিক্রি করে ১ লাখ ৪৫ হাজার টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়েছে। অভিযানগুলোতে মোট ৩.১৭৫ মেট্রিক টন মা ইলিশ এবং ৪০ লক্ষ মিটার কারেন্ট জাল জব্দ করে তা পুরিয়ে দেয়া হয়েছে যার মূলঢ ১১ টাকার মত। নিষেধাজ্ঞা চলাকালীন নিবন্ধিত ১ লক্ষ্য ৪৩ হাজার ৬ শত ৫৬ জন জেলের জন্য সরকারিভাবে ২৫ কেজি করে ভিজিএফ (ঠএঋ) ৩৫৯১ মেঃ টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

লক্ষ্মীপুর থেকে এস এম বাবুল(বাবর) জানান, দীর্ঘ ২২ দিনের বিরতি শেষে আবারও মেঘনায় মাছ ধরতে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছেন লক্ষ্মীপুরের মেঘনা উপকূলের জেলেরা। মাছ ঘাট গুলোতেও ফিরেছে কর্মচাঞ্চল্য। জেলেদের পাশাপাশি আড়তদার, বরফকলের শ্রমিক, দোকানি ও ঘাটকেন্দ্রিক অন্য পেশার মানুষও অপেক্ষায় রয়েছেন মাছের সরবরাহ বাড়ার। এবার লক্ষ্মীপুরের ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞায় জেলায় ২৫৬টি ভ্রাম্যমাণ আদালত চালানো হয়েছে। এতে ১৫৩জন জেলে আটক হয়েছে। মাছ জব্দ হয়েছে ৪ হাজার ১৮০ কেজি। জাল জব্দ হয়েছে ৪২ লাখ ৪১ হাজার ১০০ মিটার। ১০৬টি মামলায় ৮৩জন জেলেকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদ- দেওয়া হয়েছে। বাকীদের কাছ থেকে জরিমানা আদায় করা হয়েছে এক লাখ ৯৫ হাজার টাকা। জব্দ করা হয়েছে ২৩টি নৌকা ও একটি স্পিডবোট।

বরগুনা থেকে জাহাঙ্গীর কবীর মৃধা জানান, দীর্ঘ ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে ইলিশসহ সামুদ্রিক মাছ ধরতে সাগরে নামছেন বরগুনার জেলেরা। এ উপলক্ষে পাথরঘাটা, তালতলী, আমতলী ও বরগুনা সদরের বিভিন্ন মৎস্যঘাটে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে এবার ৩২৫টি অভিযান ও ৮৪টি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়েছে। এসব অভিযানে ৩০ জনকে কারাদ-, ১০টি মামলা, ৮১ হাজার টাকা জরিমানা এবং প্রায় ৬ লাখ মিটার জাল জব্দ করা হয়। এ সময়ে ৩৯ হাজার ৪৬৯ জন জেলেকে মোট ৯৮৬ দশমিক ৭২৫ মেট্রিক টন চাল সহায়তা দেওয়া হয়েছে।

ফরিদপুর থেকে আনোয়ার জাহিদ, পদ্মাবেষ্টিত ফরিদপুরে মা-ইলিশের নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিতকরণ ও জাতীয় সম্পদ রক্ষা কর্মসূচির আওতায় নির্ধারিত ২২ দিনের কঠোর নিষেধাজ্ঞা আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়েছে। জেলা প্রশাসন, জেলা মৎস্য অধিদপ্তর, নৌপুলিশ ও কোস্ট গার্ডের সমন্বিত টাস্কফোর্স ফরিদপুরের পদ্মাপাড় জুড়ে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা কঠোর টহল কার্যক্রম ও সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করেছে। নিষেধাজ্ঞাকালীন ২২ দিনে ফরিদপুরের পদ্মা নদীবেষ্টিত চার প্রধান উপজেলাÑফরিদপুর সদর, সদরপুর, চরভদ্রাসন ও ভাঙ্গাসহ জেলাজুড়ে যৌথ টাস্কফোর্স একযোগে কাজ করেছ। মৎস্য সুরক্ষা ও সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী ১৫/২০ জনের কারাদ- ও জরিমানা করা হয়। ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক শাস্তি প্রদানের পাশাপাশি নৌপুলিশ ও থানা প্রশাসন একাধিক নিয়মিত কমপক্ষে ২৫/২৭ মামলা ও মামলা নথিভুক্ত করেন বলে জানাযায়।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

রাতুলের জাদুকরী গোলে ফিফা বিশ্বকাপের ফাইনালে বাংলাদেশ

২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে শিকারে জেলেরা বাড়বে ১৫ হাজার কোটি টাকার ইলিশ

আপডেট টাইম : ০৩:৩২:২৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬

ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষে প্রজনন মৌসুমে সারাদেশে ৮ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর এই ২২ দিনের মা ইলিশ ধরার নিষেধাজ্ঞা গত রাত ১২টায় শেষ হয়েছে। আজ থেকে জেলেরা আবার জাল ও নৌকা নিয়ে সাগর-নদীতে মাছ ধরতে ছুটবে। মা ইলিশ ধরা নিষেধাজ্ঞার ফলে ইলিশের ডিম ছাড়ার হার ও জাটকা (ছোট ইলিশ) বৃদ্ধি পেয়ে প্রতি বছর দেশে ইলিশের উৎপাদন উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়েছে। মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী দেশে গত কয়েক বছরে ইলিশের উৎপাদক ব্যাপক বেড়েছে। এর মধ্যে গত ২০২০-২১ অর্থবছরে ইলিশের উৎপাদন ছিল ৫ লাখ ৬৫ হাজার মেট্রিক টন। এরপর ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৫ দশমিক ৭১ লাখ মেট্রিক টন, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে কিছুটা কমে ৫ লাখ ২৯ হাজার মেট্রিক টন। এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৫ লাখ মেট্রিক টন। গবেষকরা বলছেন নদী দূষণ, পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা কমে যাওয়া, জলবায়ু পরিবর্তন, জাটকা ও মা ইলিশ নিধনের ফলে গত দুই বছর ইলিশের উৎপাদন কিছুটা কমেছে। তবে চলতি অর্থবছরে প্রজনন মৌসুমে ব্যাপক তদারকির ফলে মা ইলিশ নিরাপদে ডিম ছাড়তে পেরেছে। এখন জাটকা নিধন বন্ধ করতে পারলে এবছর প্রায় ৬ লাখ টন ইলিশ উৎপাদন হতে পারে বলে তাদের ধারণা।

ইলিশ গবেষক ও মৎস্যবিজ্ঞানী ড. মো. আনিছুর রহমান বলেন, এ বছর ইলিশের উৎপাদন পৌনে ছয় লাখ মেট্রিক টনে পৌঁছাবে বলে আমরা আশা করছি। কারণ এ বছর যে পরিমাণ প্রোটেকশন তারা পেয়েছে সে কারণে কাক্সিক্ষত উৎপাদন ভালো হবে। ইলিশ মাছ আহরণের সময় বেশ কয়েকটি বিষয় অনুসরণের জন্য ইতোমধ্যেই মৎস্য বিভাগ থেকে নির্দেশনা দিয়েছে। আগামী ১ নভেম্বর থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত টানা ৭ মাস সারা দেশেই ইলিশ পোনা, জটকা আহরণ, পরিবহন ও বিপনন নিষিদ্ধ থাকবে। এগুলো মেনে চললে ইলিশের উৎপাদন এ বছর ছয় লাখ টনের কাছাকাছি পৌঁছে যাবে।

মৎস্য অধিদপ্তরের অভ্যন্তরীন মৎস্য বিভাগের পরিচালক ড. মো. মোতালেব হোসেন বলেন, মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযানের মাধ্যমে নির্দিষ্ট কি পরিমাণ উৎপাদন বাড়বে তা তাৎক্ষণিকভাবে বলা সম্ভব নয়। তবে সফলভাবে প্রজনন নিশ্চিত করা গেলে প্রতি বছর ইলিশের সামগ্রিক উৎপাদন বাড়ে। যদিও গত ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে প্রাকৃতিক ও পরিবেশগত নানা কারণে ইলিশের উৎপাদন কিছুটা কমে ৫ লাখ টনে দাঁড়িছে। তবে এবার সেটা বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ৬ লাখ টনে দঁড়াতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের ধারণামতে গত বছরের চেয়ে এবছর ইলিশের উৎপাদন প্রায় ১ লাখ টন বৃদ্ধি পেতে পারে। বর্তমানে দেশের বাজারে আকার ও মানভেদে পাইকারী ও খুচরা বাজারে ইলিশের সর্বনি¤œ গড় দাম প্রতি কেজি ১ হাজার ২০০ টাকা থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা। সে হিসাবে ১ লাখ টন (১০ কোটি কেজি) ইলিশের বাজার মূল্য ১২ হাজার কোটি টাকা থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা হবে।

বর্তমানে বিশ্বব্যাপী উৎপাদিত মোট ইলিশের প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই বাংলাদেশে উৎপাদিত হয়। একটি মা ইলিশ নির্বিঘেœ ডিম ছাড়ার সুযোগ পেলে প্রায় ২০ থেকে ২৫ লাখ পর্যন্ত পোনা বা ডিম ছাড়তে পারে। নিষেধাজ্ঞার সফল বাস্তবায়নে প্রতি বছর প্রায় ৫০ শতাংশের বেশি মা ইলিশ ডিম ছাড়ার সুযোগ পায়। ডিম থেকে ফুটে বের হওয়া হাজার কোটি জাটকা ইলিশের মোট সংখ্যায় যুক্ত হয়, যা ভবিষ্যতে বড় ইলিশ হয়ে নদী ও সাগরে ধরা পড়ে। নিষেধাজ্ঞার ইতিবাচক প্রভাবে বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বে ইলিশ উৎপাদনে প্রথম স্থান অধিকার করেছে এবং অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ে মাছ উৎপাদনে শীর্ষস্থানীয় অবস্থানে রয়েছে। প্রতি বছর নিয়ম মেনে ইলিশ শিকার বন্ধ রাখায় জেলেরাও পরবর্তীতে নদীতে পর্যাপ্ত ও বড় আকৃতির ইলিশ পাচ্ছে।

চলতি বছর প্রজনন মৌসুমে ইলিশ ধরা নিষেধাজ্ঞা বেশ কঠোর ভাবে প্রশাসন তদারকি করেছে। এবার মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযানে সারাদেশে প্রায় ৯ কোটি ৯২ লাখ মিটার অবৈধ কারেন্ট জাল জব্দ করা হয়েছে। জালের পাশাপাশি এই ২২ দিনের অভিযানে বিপুল পরিমাণ মা ইলিশ ও মাছ ধরার নৌকাও জব্দ করা হয় এবং আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে সারাদেশে শত শত মামলা ও জরিমানা করা হয়েছে। এর মধ্যে লক্ষ্মীপুরে ২২৯টি অভিযানে ১৫০ জন জেলেকে আটক করা হয়। ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ৭৩ জনকে কারাদ- এবং ৭৭ জনকে মোট ১ লাখ ৯৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। ভোলা জেলায় আইন অমান্য করায় ৮০ জনকে কারাদ- এবং প্রায় সাড়ে চার লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। শরীয়তপুরে ২২ দিনের অভিযানে ১৬৯ জন জেলেকে কারাদ- দেওয়া হয় এবং মৎস্য আইনে ১ লাখ ৭৯ হাজার ৬০০ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়। রাজবাড়ীতে ১৫ দিনের অভিযানে ৩২ জনসহ মোট ৬ জেলেসহ বিভিন্ন মেয়াদে কারাদ- ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জরিমানা আদায় করা হয়। এ ছাড়া চাঁদপুর, জোহালকাঠি, ফরিদপুর ও পটুয়াখালীসহ বিভিন্ন নদী অঞ্চলে যৌথ অভিযানে শতাধিক জেলে আটক, বিভিন্ন মেয়াদে কারাদ- এবং অর্থদ- প্রদান করা হয়। বিভিন্ন জেলা থেকে আমাদের সংবাদদাতাদের পাঠানো রিপোর্ট নিচে তুলে ধরা হলো।

বরিশাল থেকে নাছিম উল আলম জানান, ইলিশের নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করতে টানা ২২ দিনের আহরণ, পরিবহন ও বিপনন নিষেধাজ্ঞা গত মধ্যরাতে উঠে যাবার পরে বরিশালসহ সন্নিহিত অঞ্চলের জেলেরা মেঘনা, তেতুলিয়া, সন্ধ্যা, সুগন্ধা, বিষখালী এবং বলেশ^রসহ উপকূলীয় নদী ও সাগর মোহনায় জাল ফেলতে শুরু করেছেন। তবে আগামী ১ নভেম্বর থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত টানা ৭ মাস সারা দেশেই ইলিশ পোনা, জটকা আহরণ, পরিবহন ও বিপনন নিষিদ্ধ থাকবে। ১০ ইঞ্চি পর্যন্ত ইলিশকে জাটকা হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে সরকারি ঘোষণায়।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তায় গত ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞাকালীন সময়ে বরিশাল উপকূলীয় এলাকায় মৎস্য অধিদফতর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের মাধ্যমে প্রায় দেড় হাজার মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে ইলিশ আহরণে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করায় প্রায় ১৪শ’ জেলে ও মৎস্যজীবীকে বিভিন্ন মেয়াদে করাদ- দিয়েছে। এ সময়ে প্রায় ৫৫ লাখ টাকা জরিমানা আদায় ছাড়াও ১ হাজার ৬৫০টি মামলাও দায়ের করা হয়েছে। এসব অভিযানে প্রায় ৬ কোটি মিটার জাল বাজেয়াপ্ত করে পুড়িয়ে ফেলেছে মৎস্য অধিদফতরসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এ সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তায় প্রায় ৭ হাজার অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি বিপুল সংখ্যক মাছঘাট, বাজার ও আড়ৎ পরিদর্শন করে মৎস্য অধিদফতর। এ সময়ে প্রায় ৫৪ টন ইলিশ জব্দ করে বিভিন্ন এতিমখানা ও লিল্লাহ বোর্ডিংয়ে নিবাসীদের মাঝে বিলিয়ে দেয়া হয়েছে বলেও জানিয়েছে মৎস্য অধিদফতর।

ভোলা থেকে মোঃ জহিরুল হক জানান, মা ইলিশ রক্ষায় টানা ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞার সময় মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীতে আইন অমান্য করায় জেলেদের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদ- দেয়া হয়েছে। ৭২টি মোবাইল কোর্ট, পরিচালনাকালীন সময়ে৩৩৯ টব অভিযানে ১৫২টি মামলায় ২১৫ জনকে আটক করা হয় বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়েছে। এ সময় ৬ লাখ ৪৬ হাজার ৮ শত হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে।১৬ টি ট্রলার,৩৮ টি নৌকা জব্দ করা হয়েছে। জব্দকৃত ট্রলার নিলামে বিক্রি করে ১ লাখ ৪৫ হাজার টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়েছে। অভিযানগুলোতে মোট ৩.১৭৫ মেট্রিক টন মা ইলিশ এবং ৪০ লক্ষ মিটার কারেন্ট জাল জব্দ করে তা পুরিয়ে দেয়া হয়েছে যার মূলঢ ১১ টাকার মত। নিষেধাজ্ঞা চলাকালীন নিবন্ধিত ১ লক্ষ্য ৪৩ হাজার ৬ শত ৫৬ জন জেলের জন্য সরকারিভাবে ২৫ কেজি করে ভিজিএফ (ঠএঋ) ৩৫৯১ মেঃ টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

লক্ষ্মীপুর থেকে এস এম বাবুল(বাবর) জানান, দীর্ঘ ২২ দিনের বিরতি শেষে আবারও মেঘনায় মাছ ধরতে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছেন লক্ষ্মীপুরের মেঘনা উপকূলের জেলেরা। মাছ ঘাট গুলোতেও ফিরেছে কর্মচাঞ্চল্য। জেলেদের পাশাপাশি আড়তদার, বরফকলের শ্রমিক, দোকানি ও ঘাটকেন্দ্রিক অন্য পেশার মানুষও অপেক্ষায় রয়েছেন মাছের সরবরাহ বাড়ার। এবার লক্ষ্মীপুরের ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞায় জেলায় ২৫৬টি ভ্রাম্যমাণ আদালত চালানো হয়েছে। এতে ১৫৩জন জেলে আটক হয়েছে। মাছ জব্দ হয়েছে ৪ হাজার ১৮০ কেজি। জাল জব্দ হয়েছে ৪২ লাখ ৪১ হাজার ১০০ মিটার। ১০৬টি মামলায় ৮৩জন জেলেকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদ- দেওয়া হয়েছে। বাকীদের কাছ থেকে জরিমানা আদায় করা হয়েছে এক লাখ ৯৫ হাজার টাকা। জব্দ করা হয়েছে ২৩টি নৌকা ও একটি স্পিডবোট।

বরগুনা থেকে জাহাঙ্গীর কবীর মৃধা জানান, দীর্ঘ ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে ইলিশসহ সামুদ্রিক মাছ ধরতে সাগরে নামছেন বরগুনার জেলেরা। এ উপলক্ষে পাথরঘাটা, তালতলী, আমতলী ও বরগুনা সদরের বিভিন্ন মৎস্যঘাটে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে এবার ৩২৫টি অভিযান ও ৮৪টি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়েছে। এসব অভিযানে ৩০ জনকে কারাদ-, ১০টি মামলা, ৮১ হাজার টাকা জরিমানা এবং প্রায় ৬ লাখ মিটার জাল জব্দ করা হয়। এ সময়ে ৩৯ হাজার ৪৬৯ জন জেলেকে মোট ৯৮৬ দশমিক ৭২৫ মেট্রিক টন চাল সহায়তা দেওয়া হয়েছে।

ফরিদপুর থেকে আনোয়ার জাহিদ, পদ্মাবেষ্টিত ফরিদপুরে মা-ইলিশের নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিতকরণ ও জাতীয় সম্পদ রক্ষা কর্মসূচির আওতায় নির্ধারিত ২২ দিনের কঠোর নিষেধাজ্ঞা আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়েছে। জেলা প্রশাসন, জেলা মৎস্য অধিদপ্তর, নৌপুলিশ ও কোস্ট গার্ডের সমন্বিত টাস্কফোর্স ফরিদপুরের পদ্মাপাড় জুড়ে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা কঠোর টহল কার্যক্রম ও সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করেছে। নিষেধাজ্ঞাকালীন ২২ দিনে ফরিদপুরের পদ্মা নদীবেষ্টিত চার প্রধান উপজেলাÑফরিদপুর সদর, সদরপুর, চরভদ্রাসন ও ভাঙ্গাসহ জেলাজুড়ে যৌথ টাস্কফোর্স একযোগে কাজ করেছ। মৎস্য সুরক্ষা ও সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী ১৫/২০ জনের কারাদ- ও জরিমানা করা হয়। ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক শাস্তি প্রদানের পাশাপাশি নৌপুলিশ ও থানা প্রশাসন একাধিক নিয়মিত কমপক্ষে ২৫/২৭ মামলা ও মামলা নথিভুক্ত করেন বলে জানাযায়।