দেশে পর্যাপ্ত সার মজুত ও সরবরাহ থাকার পরও মাঠপর্যায়ে কৃষকরা চাহিদামতো সার পাচ্ছেন না। কোথাও বেশি দামে সার বিক্রি, কোথাও বরাদ্দের সার অন্য জেলায় পাচার এবং কোথাও ডিলারদের অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এমন পরিস্থিতিতে সার বিতরণ ব্যবস্থাপনায় নজরদারি জোরদার, ডিলার নিয়োগে স্বচ্ছতা নিশ্চিত এবং কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের কৃষি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি।
গত ১৬ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদ ভবনের কেবিনেট কক্ষে কৃষি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। কমিটির সভাপতি ও লক্ষ্মীপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. শাহাদাত হোসেনের সভাপতিত্বে বৈঠকে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ, কমিটির সদস্য এবং কৃষি মন্ত্রণালয় ও অধীনস্থ বিভিন্ন দপ্তর-সংস্থার কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে কৃষি মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম, সার ও বীজ ব্যবস্থাপনা, কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য, কৃষিজমির সুরক্ষা, কীটনাশকের ব্যবহার, দেশীয় তুলা উৎপাদন এবং কৃষিপণ্যের সংরক্ষণ ও রপ্তানি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বৈঠকের রিপোর্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
কমিটির প্রথম বৈঠকে কৃষি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দেশে বর্তমানে সারের কোনো সংকট নেই। পর্যাপ্ত মজুত ও সরবরাহ রয়েছে। আগামী মৌসুমেও সার সংকট হবে না বলে নিশ্চয়তা দিয়েছে মন্ত্রণালয়। তবে সংসদ সদস্যরা মাঠপর্যায়ের বাস্তব পরিস্থিতি তুলে ধরে বলেছেন, পর্যাপ্ত মজুত থাকার পরও বিতরণ ব্যবস্থার দুর্বলতা, কালোবাজারি ও পাচারের কারণে কৃষকদের ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।
বৈঠকে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সেলিম খান জানান, উত্তরবঙ্গের ১৬টি জেলাসহ দেশের কোথাও বর্তমানে সারের সংকট নেই। পর্যাপ্ত মজুত ও সরবরাহ রয়েছে। গত পাঁচ বছরের তুলনায় চলতি বছর অধিক পরিমাণ সার সরবরাহ করা হয়েছে। মাঠপর্যায়ে সার সংকটের অভিযোগের কারণ হিসেবে নতুন সার বিতরণ নীতিমালার পরিবর্তন, ডিলারদের ব্যবসায়িক বিরোধ, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির চেষ্টা, খুচরা পর্যায়ে বেশি দামে বিক্রি, কালোবাজারে সার পাচারের চেষ্টা এবং রবি মৌসুমের জন্য আগাম মজুদকে কেন্দ্র করে আতঙ্ক সৃষ্টির বিষয়গুলো উল্লেখ করেন তিনি।

সচিব জানান, সার ব্যবস্থাপনা ও অনিয়ম প্রতিরোধে মনিটরিং কমিটি গঠন করা হয়েছে। সকাল ৯টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত মনিটরিং সেল কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ৬৪ জেলায় ৬৪ জন ট্যাগ অফিসার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে জরিমানার পাশাপাশি দায়িত্বে অবহেলার কারণে পাঁচজন কৃষি কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার এবং পাঁচজন ডিলারের ডিলারশিপ বাতিল করা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, নতুন নীতিমালা অনুযায়ী সার ডিলারকে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের স্থায়ী বাসিন্দা ও স্থানীয় ভোটার হতে হবে। এ শর্ত পূরণ না করা বহিরাগত ডিলারদের পর্যায়ক্রমে ডিলারশিপ বাতিল করে নতুন ডিলার নিয়োগ করা হবে।
তবে সংসদ সদস্যরা মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে সার বিতরণ ব্যবস্থাপনায় আরও কার্যকর নজরদারির প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। সদস্য মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, চলতি আমন মৌসুমে মাঠপর্যায়ে কৃষকের চাহিদামতো সার না পাওয়ার বিষয়টি দেখা গেছে। পর্যাপ্ত মজুত ও বরাদ্দ থাকার পরও কৃষকরা কেন সার পাচ্ছেন না, তা মাঠপর্যায়ে যাচাই করা প্রয়োজন। এমনকি প্রতি বস্তা সার ১ হাজার ৭০০ টাকা পর্যন্ত দামে কেনার অভিযোগও রয়েছে।

তিনি উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে সার ব্যবস্থাপনার মনিটরিং জোরদার, কালোবাজারি ও এক স্থান থেকে অন্যত্র সার পাচার বন্ধ এবং চাহিদা অনুযায়ী বরাদ্দ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। সার বিক্রির সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের তদারকি নিশ্চিত করার পাশাপাশি মনিটরিং সেলের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের নাম, পদবি ও মোবাইল নম্বর সংসদ সদস্যদের সরবরাহের প্রস্তাব দেন।
সদস্য গোলাম রছুল বলেন, তার নির্বাচনি এলাকার বাগারপাড়া উপজেলায় সারের পর্যাপ্ততা থাকলেও বিক্রয় ও বিতরণ ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা রয়েছে। বরাদ্দ করা সার অন্য জেলায় বেশি দামে বিক্রির উদ্দেশ্যে পাচারের অভিযোগে স্থানীয়দের সহায়তায় দুই থেকে তিনটি সারবোঝাই ট্রাক আটক করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বাগারপাড়ার ৩৭ জন ডিলারের মধ্যে প্রায় ২০ জন স্থানীয় বাসিন্দা নন। তাদের কেউ কেউ সরাসরি ব্যবসা না করে অন্যদের মাধ্যমে ডিলারশিপ পরিচালনা করছেন কিংবা সাব-ডিলার নিয়োগ দিচ্ছেন। এ ধরনের অনিয়ম বন্ধে স্থানীয় বাসিন্দাদের ডিলার নিয়োগ এবং সার বিতরণে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।
সদস্য মো. রোকন উদ্দীন বাবুল বলেন, নীলফামারী এলাকায় পূর্বের তুলনায় কোনো কোনো মাসে ডিলারদের কম বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। পর্যাপ্ত সার মজুত থাকার পরও সংকট সৃষ্টি হওয়া বিতরণ ও মনিটরিং ব্যবস্থার দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়। তিনি মাঠপর্যায়ে নিয়মিত তদারকি এবং প্রকৃত ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট এলাকার স্থানীয় নাগরিকদের অগ্রাধিকার দিয়ে ডিলার নিয়োগের দাবি জানান।
কৃষক কার্ড, খাল খনন ও কৃষি খাতে বরাদ্দ
বৈঠকে কৃষি মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মো. নুরুজ্জামান মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরেন। তিনি জানান, মন্ত্রণালয়ের রূপকল্প হচ্ছে ‘টেকসই, নিরাপদ ও লাভজনক কৃষি’। কৃষি উৎপাদন ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, শস্য বহুমুখীকরণ, নিরাপদ ও পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্য উৎপাদন, কৃষির বাণিজ্যিকীকরণ এবং খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এর অন্যতম লক্ষ্য। সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকারের আওতায় কৃষক কার্ড, খাল খনন, বিএমডিএ পুনঃসচলকরণ, কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য, কৃষিজমি সুরক্ষা, কৃষি উদ্যোক্তা সৃষ্টি, সমবায় পুনরুজ্জীবন ও বৃক্ষরোপণ কার্যক্রম গ্রহণের বিষয়টি বৈঠকে জানানো হয়।
তিনি জানান, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কৃষি খাতে বরাদ্দ ছিল ২৪ হাজার ৬৯৬ কোটি টাকা। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সম্ভাব্য বরাদ্দ ২৮ হাজার ৮৮১ কোটি টাকা। প্রকল্প ক্লাস্টারিং ও রিস্কোপিংয়ের মাধ্যমে ৬১৬ কোটি ২৯ লাখ টাকা সাশ্রয়ের সম্ভাবনা রয়েছে।
সার ব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে জানানো হয়, ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি মিলিয়ে মোট ৫৮ দশমিক ০৫ লাখ টন সার মজুত রয়েছে। সার ব্যবস্থাপনায় নতুন নীতিমালা, ডিলার নিয়োগ এবং ডিজিটাল ট্র্যাকিং ও মনিটরিং চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
গদখালীতে ফুল গবেষণা কেন্দ্র স্থাপনের দাবি
বৈঠকে যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার গদখালীতে ফুল ও মৃত্তিকা গবেষণা কেন্দ্র স্থাপনের দাবি জানান সদস্য সাবিরা সুলতানা। তিনি বলেন, গদখালী ফুল চাষের জন্য প্রসিদ্ধ হলেও সেখানে ফুল ও মৃত্তিকা গবেষণা কেন্দ্র নেই। ফলে কৃষকদের মাটি পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় পরামর্শের জন্য যশোর শহরে যেতে হয়। এতে দরিদ্র কৃষকদের অতিরিক্ত ব্যয় হয়। এ কারণে গদখালীতে গবেষণা ও পরীক্ষাগার সুবিধা স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, যশোরে তুলা চাষের সম্ভাবনা বিবেচনায় সরকার ২০ হাজার ৫০০ জনকে ২০ কোটি টাকা সরকারি প্রণোদনা দেয়। পরবর্তী সময়ে সরকার ১২৬ কোটি টাকা লাভবান হয়। ফুল ও তুলা পর্যায়ক্রমে চাষের মাধ্যমে কৃষকের আয় বৃদ্ধির সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
কৃষিজমির মাটি কেটে নেওয়ার ফলে উর্বরতা হ্রাস, কীটনাশক ও খাদ্যে ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহারের কারণ অনুসন্ধান এবং নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান সাবিরা সুলতানা। তার বক্তব্যে কৃষি উৎপাদনে ব্যবহৃত রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের সঙ্গে ক্যানসারের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার বিষয়টিও উঠে আসে।
এ বিষয়ে মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক মোহাম্মদ আফসার আলী জানান, যশোরে তাদের আঞ্চলিক গবেষণাগার ও কার্যালয়ের মাধ্যমে মোবাইল সয়েল টেস্টিং ল্যাব ব্যবহার করে কৃষকদের মাটি পরীক্ষা ও ফসলভিত্তিক সার ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। গদখালী-ঝিকরগাছা এলাকায় ফুলচাষিদের দ্রুত মাটি পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় সার ব্যবহারের সুপারিশ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
কৃষি সচিব জানান, গদখালীতে ফুল গবেষণা কেন্দ্র স্থাপনের প্রস্তাব নোট করা হয়েছে। ফুলচাষিদের মাটি, সার ও কীটনাশক ব্যবহারে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দ্রুত একটি অস্থায়ী মৃত্তিকা পরীক্ষা ক্যাম্প বা কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগও নেওয়া হবে।

কীটনাশকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে কারিগরি কমিটি
কৃষিপণ্য উৎপাদন ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় কীটনাশকের ব্যবহার নিয়ে বৈঠকে উদ্বেগ প্রকাশ করেন সংসদ সদস্যরা। কীটনাশকের অতিরিক্ত ব্যবহার এবং এর কারণে মানবস্বাস্থ্য ও পরিবেশের সম্ভাব্য ক্ষতি বিবেচনায় গবেষণা ও নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের প্রস্তাব দেওয়া হয়।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের নির্বাহী চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আব্দুস সালাম জানান, কীটনাশক খাতের বর্তমান অবস্থা পর্যালোচনা এবং নীতিমালা ও গাইডলাইন প্রণয়নের জন্য একটি কারিগরি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি ইতোমধ্যে পাঁচটি সভা করেছে। কয়েক দিনের মধ্যে খসড়া প্রতিবেদন দাখিলের সম্ভাবনা রয়েছে। পরবর্তী সময়ে প্রতিবেদনটি কৃষিমন্ত্রী ও সংশ্লিষ্ট জাতীয় কারিগরি কমিটির কাছে উপস্থাপন করে প্রয়োজনীয় সুপারিশ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, কীটনাশক ব্যবস্থাপনায় যুগোপযোগী নীতিমালা ও মানসম্মত স্পেসিফিকেশন প্রণয়ন করা হবে। আমদানি ও বিক্রয়ের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ এবং আন্তর্জাতিকভাবে নিষিদ্ধ ক্ষতিকর কীটনাশকের আমদানি ও বিক্রি বন্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, কৃষকদের নিরাপদ কীটনাশক ব্যবহারে প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং সবজি উৎপাদনে কীটনাশকের ক্ষতিকর অবশিষ্টাংশ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
পেঁয়াজ, আদা, মরিচ ও টমেটো উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতার লক্ষ্য
কৃষিমন্ত্রী বলেন, কৃষি খাতের অগ্রগতির সঙ্গে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন জড়িত। কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা এবং আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে প্রয়োজনীয় কৃষিপণ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে হবে। পেঁয়াজ, আদা, কাঁচা মরিচ ও টমেটোর উৎপাদন বাড়িয়ে পর্যায়ক্রমে রপ্তানিমুখী কৃষি গড়ে তোলা হবে। পেঁয়াজ সংরক্ষণে ২৭ হাজার ৭০০টি এয়ার ফ্লো মেশিন সরবরাহের মাধ্যমে প্রায় তিন লাখ টন সংরক্ষণ সক্ষমতা সৃষ্টি হয়েছে। পেঁয়াজ রপ্তানির উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, আদার উৎপাদনশীলতা বাড়িয়ে আগামী দুই বছরের মধ্যে চাহিদা ও উৎপাদনের ঘাটতি পূরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি কাঁচা মরিচ ও টমেটোর বর্ষাকালীন উৎপাদন সম্প্রসারণের মাধ্যমে এক থেকে দুই বছরের মধ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের লক্ষ্য রয়েছে। আদা, কাঁচা মরিচ ও টমেটোর বছরব্যাপী উৎপাদনেও পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
মাটির স্বাস্থ্য ও উর্বরতা উন্নয়নে বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ এবং মাটির পিএইচ উন্নয়নের মাধ্যমে রাসায়নিক সারের ব্যবহার ও আমদানি কমানোর পরিকল্পনার কথা জানান কৃষিমন্ত্রী। দুর্বল মাটির এলাকাগুলোকে বিশেষ কর্মসূচির আওতায় আনা হচ্ছে।
চরাঞ্চলে সয়াবিন, বাদাম, ভুট্টা, মিষ্টি আলু ও মিষ্টি কুমড়াসহ উপযোগী অন্যান্য ফসল উৎপাদনে বিশেষ প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। রাসায়নিক সারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে প্রাকৃতিক সার ও প্রাকৃতিক কীটনাশকের ব্যবহার সম্প্রসারণের উদ্যোগও রয়েছে।
তুলা আমদানিতে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়
বৈঠকে দেশে তুলা উৎপাদন বাড়ানোর বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পায়। তুলা উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী পরিচালক মো. রেজাউল আমিন জানান, প্রতি বছর প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকার তুলা আমদানি করা হয়। আমদানিনির্ভরতা কমাতে পাহাড়ি, পরিত্যক্ত ও অনাবাদি জমিতে এবং তামাকের পরিবর্তে তুলা চাষ সম্প্রসারণের কার্যক্রম নেওয়া হয়েছে।
মরিচ, হলুদ ও বিভিন্ন শাকসবজির সঙ্গে তুলার আন্তঃফসল চাষ সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। রাজশাহী ও নাটোরের কয়েকটি এলাকায় হলুদের সঙ্গে তুলা চাষে ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে। তুলা চাষ মাটির স্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য ইতিবাচক হওয়ায় ভবিষ্যতে কার্বন ট্রেডিংয়ের মাধ্যমেও কৃষকেরা সুফল পেতে পারেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার ৪ হাজার ১০০ পদ শূন্য
বৈঠকে মাঠপর্যায়ে কৃষকদের সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে জনবল সংকটের বিষয়টিও উঠে আসে। কৃষি সচিব জানান, উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার অনুমোদিত ১৪ হাজার ৯২টি পদের মধ্যে ৪ হাজার ১০০টি পদ শূন্য রয়েছে। ২ হাজার ৩৬০টি পদে নিয়োগ কার্যক্রম চলমান। অবশিষ্ট শূন্যপদ পূরণের জন্য সরকারি কর্ম কমিশনে (পিএসসি) চাহিদা পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সংসদ সদস্যরা মাঠপর্যায়ে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের কৃষকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ এবং দায়িত্ব পালনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। একই সঙ্গে ইউনিয়ন পর্যায়ে জনবল ঘাটতি পূরণের দাবি জানান।
বৈঠকে বিএডিসির গোডাউনের ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপন এবং বিএডিসি ও বিএমডিএর বৈদ্যুতিক গভীর নলকূপ সৌরশক্তিতে রূপান্তরের পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়। এ বিষয়ে দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে সমীক্ষা সম্পন্ন করে কার্যক্রম শুরুর পরিকল্পনা রয়েছে।
কমিটির ১০ দফা সুপারিশ
বৈঠকে বিস্তারিত আলোচনার পর কৃষি খাতের কার্যক্রম আরও গতিশীল করতে ১০টি সুপারিশ গ্রহণ করা হয়। এগুলোর মধ্যে রয়েছে , সার ডিলার নিয়োগে সংশ্লিষ্ট এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা হওয়ার শর্ত কঠোরভাবে অনুসরণ এবং নীতিমালাবহির্ভূত ডিলারদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। সারের কৃত্রিম সংকট, মজুত ও অনিয়ম প্রতিরোধে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ইউএনও ও ডিসির নেতৃত্বে মনিটরিং জোরদারের কথাও বলা হয়েছে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিকভাবে নিষিদ্ধ ও মানবস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর কীটনাশকের আমদানি ও ব্যবহার বন্ধে যুগোপযোগী নীতিমালা ও মানদণ্ড প্রণয়ন, রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমিয়ে জৈব ও প্রাকৃতিক সার উৎপাদন এবং ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
বিএডিসির গোডাউনের ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপন করে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং বিএডিসি ও বিএমডিএর গভীর নলকূপ সৌরশক্তিতে রূপান্তরের প্রস্তাবও রয়েছে সুপারিশে। পাশাপাশি তুলা আমদানিতে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের লক্ষ্যে দেশীয় তুলা উৎপাদন বৃদ্ধি, যশোরের গদখালীতে মৃত্তিকা পরীক্ষা ক্যাম্প ও ফুল গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা এবং শূন্য উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার পদগুলোতে যথাযথ প্রক্রিয়ায় দ্রুত নিয়োগের ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে।
কৃষি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মো. শাহাদাত হোসেন বলেন, কৃষি মন্ত্রণালয়ের গুরুত্ব বিবেচনায় সার ব্যবস্থাপনা ও সরবরাহ পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত হওয়ার লক্ষ্যে দ্রুততার সঙ্গে কমিটির প্রথম পরিচিতি ও পর্যালোচনা সভা আহ্বান করা হয়েছে। ভবিষ্যতে প্রতিটি দপ্তর ও সংস্থার কার্যক্রম পৃথকভাবে পর্যালোচনা করা হবে।
সভায় যশোরের ফুল ও সবজি চাষ, মিঠাপানির মাছ চাষের সম্ভাবনা, কীটনাশকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার এবং দেশে তুলা উৎপাদন বৃদ্ধির বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়েছে। প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ তুলা আমদানিতে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে দেশীয় তুলা উৎপাদন বাড়াতে কার্যকর ও দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য কৃষি মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ জানানো হয়।
Reporter Name 























