ঢাকা ১১:৫৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
সাইকেলে চড়তেন, ৫ আগস্টের তিন দিন পর প্রাডো গাড়িতে চড়েছেন আওয়ামী আমলের আমলনামা উন্নয়নের আড়ালে ২৮ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি ২৯ অক্টোবর মধ্য রাত থেকে উঠে যাচ্ছে ইলিশ রক্ষার নিষেধাজ্ঞা স্বাস্থ্যসেবা খাতে সহযোগিতা বাড়াতে সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনকে জুবাইদা রহমানের আহ্বান কৃষিতেও বাড়ছে খেলাপির চাপ ৩১ অক্টোবর লংমার্চ সফল করতে ১১ দলীয় ঐক্যের আহ্বান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির বৈঠক ফলপ্রসূ হয়েছ: হুমায়ূন কবির আইজিপি সহজ-সরল মানুষ, ক্রসফায়ার নিয়ে বক্তব্য ঠিক হয়নি: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আইজিপির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন প্রধানমন্ত্রী: তথ্য উপদেষ্টা চাকরির প্রলোভনে রাশিয়ায় সামরিক চুক্তিতে বাধ্য করার প্রমাণ পেয়েছে জাতিসংঘ

জীবিকার তাগিদে বাড়ি ছাড়তে হচ্ছে তাদের

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ০৫:১২:১২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৪ অগাস্ট ২০২৬
  • ৫২ বার
হাওরে পানি আছে, মাছ নেই। সেই পানির নিচে ফসলী জমি।

ফলে এই এলাকার অধিকাংশ মানুষ কাজহীন হয়ে পড়েছেন। সংসার চালানো নিয়ে দিশেহারা তারা। তাই জীবিকার খোঁজে ঘরবাড়ি ছাড়তে হচ্ছে টাঙ্গুয়ার হাওর এলাকার কৃষক ও জেলেদের।দেশের যে প্রান্তে কাজ পাচ্ছেন, সেখানেই ছুটছেন তারা।

কেউ ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন শহরে কাজের সন্ধানে পাড়ি দিচ্ছেন। আবার কেউ নির্মাণশ্রমিক, কেউ রিকশা বা অটোরিকশাচালক এবং কেউ পোশাক কারখানার কাজে যাচ্ছেন।

স্থানীয়রা জানান, টাঙ্গুয়ার হাওরপারের মানুষের প্রধান আয়ের উৎস বোরো ধান চাষ ও মাছ ধরা। শুষ্ক মৌসুমে কৃষিকাজ এবং বর্ষায় মাছ ধরার ওপর নির্ভর করেই চলে অধিকাংশ পরিবারের জীবন।

কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন, আগাম বন্যার ঝুঁকি, ফসলহানি, মাছের প্রজননক্ষেত্র নষ্ট হওয়া এবং অবৈধভাবে  মাছ ধরার কারণে আগের মতো আয় করতে পারছেন না তারা।বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস অনুযায়ী, ২০১৯ সালে সারা দেশে গ্রাম থেকে শহরে স্থানান্তর হওয়া মানুষের সংখ্যা প্রতি হাজারে ছিল ১৫ জন। ২০২৩ সালে তা বেড়ে প্রায় ২০ জনে দাঁড়িয়েছে। ২০২২ সালে এ হার ছিল আরও বেশি—২৬ দশমিক ৪ জন। তবে সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওরপারের মানুষের স্থানান্তরের আলাদা তথ্য পাওয়া যায়নি।

সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওরের পশ্চিম প্রান্তের রংচী গ্রামের বাসিন্দা আব্দুর নুর জানান, কয়েক বছর আগেও মাছ ধরা ও কৃষিকাজ করে পরিবারের খরচ চালাতেন তিনি। এখন সেই আয় দিয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই বছরের বড় একটি সময় তাকে কাজের সন্ধানে অন্য এলাকায় থাকতে হয়।

অনেকে বদলাচ্ছে পেশা

টাঙ্গুয়ার হাওরে মাছের মজুদ রয়েছে ৬ হাজার ৭০১ মেট্রিক টন। এখানে বিলুপ্তপ্রায় মাছের মধ্যে রয়েছে চিতল, মহাশোল, নানিদ, সরপুঁটি, বাগাড় ও রিটা। বেশি পাওয়া যায় রুই, গইন্যা, কাতলা, কালবাউশ, শোল, গজার, টাকি, মেনি, বোয়াল ও ট্যাংরাসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ।

বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয় মৎস্যজীবীদের বরাত দিয়ে প্রকাশিত সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে টাঙ্গুয়ার হাওরে মাছের প্রজাতি কমে যাওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। মাঠপর্যায়ের একটি গবেষণায় গত প্রায় দুই দশকে হাওরটির প্রায় অর্ধেক মাছের প্রজাতি হারিয়ে যাওয়ার আভাস পাওয়া গেছে। এতে শুধু জীববৈচিত্র্য নয়, হাওরনির্ভর জেলে পরিবারগুলোর জীবন-জীবিকাও সংকটে পড়েছে।

টাঙ্গুয়ার হাওরের মাছের ওপর নির্ভরশীল  নিশ্চিন্তপুর  গ্রামের জেলে বিল্লাল মিয়া বলছেন, আগে অল্প সময় মাছ ধরেই ভালো আয় করা যেত। এখন দিনভর জাল ফেলেও আগের মতো মাছ পাওয়া যায় না। ফলে অনেকেই মাছ ধরা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন।

তিনি আরো জানান, মাছ কমে যাওয়ার পাশাপাশি মাছ ধরার খরচও বেড়েছে। নৌকা, জাল, জ্বালানি ও শ্রমিকের পেছনে খরচ করে দিন শেষে যে আয় থাকে, তা দিয়ে পরিবারের প্রয়োজন মেটানো কঠিন। ফলে পরিবারের কর্মক্ষম সদস্যদের কেউ কেউ বাধ্য হয়ে শহরে যাচ্ছেন। হাওরের মাছ কমে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে মৎস্য সংশ্লিষ্টরাও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। মাছের প্রজনন মৌসুমে নির্বিচারে মাছ ধরার ফলে পরবর্তী সময়ে হাওরে মাছের সংকট তৈরি হয় বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

এক ফসলের ওপর নির্ভরতা

হাওরাঞ্চলের কৃষকরাও একই ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন। বছরের একটি মাত্র বোরো ফসলের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় আগাম বন্যা বা অতিবৃষ্টিতে ফসল নষ্ট হলে পুরো বছরের আয়-ব্যয়ের হিসাব এলোমেলো হয়ে যায়।

হাওরাঞ্চলে কৃষি ও মৎস্য দুটিই মানুষের জীবন-জীবিকার প্রধান উৎস। কিন্তু পানি ও মাছের সংকট তৈরি হলে একই সঙ্গে কৃষক ও জেলে উভয় শ্রেণিই ক্ষতিগ্রস্ত হন। বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত হওয়ায় তখন অনেককে এলাকা ছাড়তে হয়।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, হাওরপারের গ্রামগুলোতে সারা বছর কাজের সুযোগ নেই। বর্ষায় যোগাযোগব্যবস্থা কঠিন হয়ে পড়ে। শুষ্ক মৌসুমে কৃষিকাজ ছাড়া অন্য কাজের সুযোগও কম। ফলে তরুণ ও কর্মক্ষম মানুষ ধীরে ধীরে গ্রাম ছেড়ে শহরমুখী হচ্ছেন।

পরিবার ভাঙছে, বদলাচ্ছে গ্রামের চিত্র

কাজের সন্ধানে কেউ একা বাইরে যাচ্ছেন, কেউ আবার স্ত্রী-সন্তানসহ অন্য এলাকায় বসতি গড়ছেন। এতে অনেক গ্রামে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা কমছে। একসময় যেসব গ্রামে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কৃষি, মাছ ধরা ও নৌযানকেন্দ্রিক কর্মচাঞ্চল্য দেখা যেত, সেসব গ্রামের অনেক পরিবার এখন পরনির্ভর হয়ে পড়ছে।

হাওরবাসীর আশঙ্কা, এ প্রবণতা অব্যাহত থাকলে হাওরপারের ঐতিহ্যবাহী জীবনধারা ও স্থানীয় অর্থনীতিতেও বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে।

পরিবেশবিদ কাসমির রেজা বলেন, ‘টাঙ্গুয়ার হাওর শুধু একটি জলাভূমি নয়; এর সঙ্গে হাজারো মানুষের জীবন ও জীবিকা জড়িত। হাওরের মাছ, জলজ উদ্ভিদ, কৃষিজমি ও প্রাকৃতিক পরিবেশের ওপর চাপ বাড়লে সরাসরি প্রভাব পড়ে মানুষের আয়ে। তাই টাঙ্গুয়ার হাওর রক্ষার পাশাপাশি হাওরবাসীর বিকল্প কর্মসংস্থান তৈরির ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।’

তিনি বলেন, মাছের প্রজননক্ষেত্র সংরক্ষণ, অবৈধ জাল বন্ধ, জলজ সম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনা, কৃষকদের ঝুঁকি মোকাবিলায় সহায়তা এবং হাঁস পালন, গবাদিপশু, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও হাওরভিত্তিক অন্যান্য আয়ের সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন।

রংচী গ্রামের কয়েকজন বাসিন্দার দাবি, শুধু দুর্যোগের সময় ত্রাণ বা আর্থিক সহায়তা দিয়ে এ সংকটের সমাধান হবে না। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে হাওরের প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা এবং মানুষের জন্য স্থায়ী কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। কারণ টাঙ্গুয়ার হাওরের পানি, মাছ ও ফসল শুধু প্রকৃতির সম্পদ নয়, এগুলোই হাওরপারের মানুষের বেঁচে থাকার অবলম্বন। সেই অবলম্বন হারিয়ে গেলে জীবিকার তাগিদে আরো অনেক মানুষকে একদিন প্রিয় হাওরপারের গ্রাম ছেড়ে যেতে হতে পারে।

মধ্যনগরে অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত পাশের ধর্মপাশা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জনি রায় বলেন, ‘হাওরপারের মানুষের স্থায়ী কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে এবং অভিবাসন ঠেকাতে জেলা প্রশাসনের সঙ্গে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের চেষ্টা করব।’

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

সাইকেলে চড়তেন, ৫ আগস্টের তিন দিন পর প্রাডো গাড়িতে চড়েছেন

জীবিকার তাগিদে বাড়ি ছাড়তে হচ্ছে তাদের

আপডেট টাইম : ০৫:১২:১২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৪ অগাস্ট ২০২৬
হাওরে পানি আছে, মাছ নেই। সেই পানির নিচে ফসলী জমি।

ফলে এই এলাকার অধিকাংশ মানুষ কাজহীন হয়ে পড়েছেন। সংসার চালানো নিয়ে দিশেহারা তারা। তাই জীবিকার খোঁজে ঘরবাড়ি ছাড়তে হচ্ছে টাঙ্গুয়ার হাওর এলাকার কৃষক ও জেলেদের।দেশের যে প্রান্তে কাজ পাচ্ছেন, সেখানেই ছুটছেন তারা।

কেউ ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন শহরে কাজের সন্ধানে পাড়ি দিচ্ছেন। আবার কেউ নির্মাণশ্রমিক, কেউ রিকশা বা অটোরিকশাচালক এবং কেউ পোশাক কারখানার কাজে যাচ্ছেন।

স্থানীয়রা জানান, টাঙ্গুয়ার হাওরপারের মানুষের প্রধান আয়ের উৎস বোরো ধান চাষ ও মাছ ধরা। শুষ্ক মৌসুমে কৃষিকাজ এবং বর্ষায় মাছ ধরার ওপর নির্ভর করেই চলে অধিকাংশ পরিবারের জীবন।

কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন, আগাম বন্যার ঝুঁকি, ফসলহানি, মাছের প্রজননক্ষেত্র নষ্ট হওয়া এবং অবৈধভাবে  মাছ ধরার কারণে আগের মতো আয় করতে পারছেন না তারা।বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস অনুযায়ী, ২০১৯ সালে সারা দেশে গ্রাম থেকে শহরে স্থানান্তর হওয়া মানুষের সংখ্যা প্রতি হাজারে ছিল ১৫ জন। ২০২৩ সালে তা বেড়ে প্রায় ২০ জনে দাঁড়িয়েছে। ২০২২ সালে এ হার ছিল আরও বেশি—২৬ দশমিক ৪ জন। তবে সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওরপারের মানুষের স্থানান্তরের আলাদা তথ্য পাওয়া যায়নি।

সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওরের পশ্চিম প্রান্তের রংচী গ্রামের বাসিন্দা আব্দুর নুর জানান, কয়েক বছর আগেও মাছ ধরা ও কৃষিকাজ করে পরিবারের খরচ চালাতেন তিনি। এখন সেই আয় দিয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই বছরের বড় একটি সময় তাকে কাজের সন্ধানে অন্য এলাকায় থাকতে হয়।

অনেকে বদলাচ্ছে পেশা

টাঙ্গুয়ার হাওরে মাছের মজুদ রয়েছে ৬ হাজার ৭০১ মেট্রিক টন। এখানে বিলুপ্তপ্রায় মাছের মধ্যে রয়েছে চিতল, মহাশোল, নানিদ, সরপুঁটি, বাগাড় ও রিটা। বেশি পাওয়া যায় রুই, গইন্যা, কাতলা, কালবাউশ, শোল, গজার, টাকি, মেনি, বোয়াল ও ট্যাংরাসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ।

বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয় মৎস্যজীবীদের বরাত দিয়ে প্রকাশিত সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে টাঙ্গুয়ার হাওরে মাছের প্রজাতি কমে যাওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। মাঠপর্যায়ের একটি গবেষণায় গত প্রায় দুই দশকে হাওরটির প্রায় অর্ধেক মাছের প্রজাতি হারিয়ে যাওয়ার আভাস পাওয়া গেছে। এতে শুধু জীববৈচিত্র্য নয়, হাওরনির্ভর জেলে পরিবারগুলোর জীবন-জীবিকাও সংকটে পড়েছে।

টাঙ্গুয়ার হাওরের মাছের ওপর নির্ভরশীল  নিশ্চিন্তপুর  গ্রামের জেলে বিল্লাল মিয়া বলছেন, আগে অল্প সময় মাছ ধরেই ভালো আয় করা যেত। এখন দিনভর জাল ফেলেও আগের মতো মাছ পাওয়া যায় না। ফলে অনেকেই মাছ ধরা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন।

তিনি আরো জানান, মাছ কমে যাওয়ার পাশাপাশি মাছ ধরার খরচও বেড়েছে। নৌকা, জাল, জ্বালানি ও শ্রমিকের পেছনে খরচ করে দিন শেষে যে আয় থাকে, তা দিয়ে পরিবারের প্রয়োজন মেটানো কঠিন। ফলে পরিবারের কর্মক্ষম সদস্যদের কেউ কেউ বাধ্য হয়ে শহরে যাচ্ছেন। হাওরের মাছ কমে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে মৎস্য সংশ্লিষ্টরাও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। মাছের প্রজনন মৌসুমে নির্বিচারে মাছ ধরার ফলে পরবর্তী সময়ে হাওরে মাছের সংকট তৈরি হয় বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

এক ফসলের ওপর নির্ভরতা

হাওরাঞ্চলের কৃষকরাও একই ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন। বছরের একটি মাত্র বোরো ফসলের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় আগাম বন্যা বা অতিবৃষ্টিতে ফসল নষ্ট হলে পুরো বছরের আয়-ব্যয়ের হিসাব এলোমেলো হয়ে যায়।

হাওরাঞ্চলে কৃষি ও মৎস্য দুটিই মানুষের জীবন-জীবিকার প্রধান উৎস। কিন্তু পানি ও মাছের সংকট তৈরি হলে একই সঙ্গে কৃষক ও জেলে উভয় শ্রেণিই ক্ষতিগ্রস্ত হন। বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত হওয়ায় তখন অনেককে এলাকা ছাড়তে হয়।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, হাওরপারের গ্রামগুলোতে সারা বছর কাজের সুযোগ নেই। বর্ষায় যোগাযোগব্যবস্থা কঠিন হয়ে পড়ে। শুষ্ক মৌসুমে কৃষিকাজ ছাড়া অন্য কাজের সুযোগও কম। ফলে তরুণ ও কর্মক্ষম মানুষ ধীরে ধীরে গ্রাম ছেড়ে শহরমুখী হচ্ছেন।

পরিবার ভাঙছে, বদলাচ্ছে গ্রামের চিত্র

কাজের সন্ধানে কেউ একা বাইরে যাচ্ছেন, কেউ আবার স্ত্রী-সন্তানসহ অন্য এলাকায় বসতি গড়ছেন। এতে অনেক গ্রামে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা কমছে। একসময় যেসব গ্রামে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কৃষি, মাছ ধরা ও নৌযানকেন্দ্রিক কর্মচাঞ্চল্য দেখা যেত, সেসব গ্রামের অনেক পরিবার এখন পরনির্ভর হয়ে পড়ছে।

হাওরবাসীর আশঙ্কা, এ প্রবণতা অব্যাহত থাকলে হাওরপারের ঐতিহ্যবাহী জীবনধারা ও স্থানীয় অর্থনীতিতেও বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে।

পরিবেশবিদ কাসমির রেজা বলেন, ‘টাঙ্গুয়ার হাওর শুধু একটি জলাভূমি নয়; এর সঙ্গে হাজারো মানুষের জীবন ও জীবিকা জড়িত। হাওরের মাছ, জলজ উদ্ভিদ, কৃষিজমি ও প্রাকৃতিক পরিবেশের ওপর চাপ বাড়লে সরাসরি প্রভাব পড়ে মানুষের আয়ে। তাই টাঙ্গুয়ার হাওর রক্ষার পাশাপাশি হাওরবাসীর বিকল্প কর্মসংস্থান তৈরির ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।’

তিনি বলেন, মাছের প্রজননক্ষেত্র সংরক্ষণ, অবৈধ জাল বন্ধ, জলজ সম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনা, কৃষকদের ঝুঁকি মোকাবিলায় সহায়তা এবং হাঁস পালন, গবাদিপশু, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও হাওরভিত্তিক অন্যান্য আয়ের সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন।

রংচী গ্রামের কয়েকজন বাসিন্দার দাবি, শুধু দুর্যোগের সময় ত্রাণ বা আর্থিক সহায়তা দিয়ে এ সংকটের সমাধান হবে না। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে হাওরের প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা এবং মানুষের জন্য স্থায়ী কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। কারণ টাঙ্গুয়ার হাওরের পানি, মাছ ও ফসল শুধু প্রকৃতির সম্পদ নয়, এগুলোই হাওরপারের মানুষের বেঁচে থাকার অবলম্বন। সেই অবলম্বন হারিয়ে গেলে জীবিকার তাগিদে আরো অনেক মানুষকে একদিন প্রিয় হাওরপারের গ্রাম ছেড়ে যেতে হতে পারে।

মধ্যনগরে অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত পাশের ধর্মপাশা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জনি রায় বলেন, ‘হাওরপারের মানুষের স্থায়ী কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে এবং অভিবাসন ঠেকাতে জেলা প্রশাসনের সঙ্গে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের চেষ্টা করব।’