এক কঠিন কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড়িয়ে পাকিস্তান। বিশ্ব অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে এবং একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি বজায় রাখতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে মধ্যস্থতা করার এক “অসম্ভব” মিশনে নেমেছে দেশটি।
পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল অসীম মুনির এবং প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ গত কয়েক সপ্তাহ ধরে নিবিড় কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন। তাদের লক্ষ্য এমন একটি যুদ্ধ বন্ধ করা যা পাকিস্তানের পশ্চিম সীমান্ত তথা ইরান ও আফগানিস্তান অঞ্চলে চরম অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। উল্লেখ্য, সম্প্রতি এই সীমান্ত অঞ্চলগুলোতে গোলাগুলির ঘটনাও ঘটেছে।
মাত্র এক বছর আগেও কূটনৈতিকভাবে প্রায় একঘরে হয়ে পড়া পাকিস্তানের জন্য এই ভূমিকা একটি অভাবনীয় প্রত্যাবর্তন। শনিবারের সংলাপে সাফল্য আসলে দেশটির এই নতুন মর্যাদা আরও সুসংহত হবে, অন্যথায় ব্যর্থতার গ্লানি এই সাফল্যের আবরণ ছিঁড়ে ফেলতে পারে।
ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি সিডনির নিরাপত্তা বিশ্লেষক মুহাম্মদ ফয়সাল বলেন, “পাকিস্তান এই মধ্যস্থতায় বিশাল রাজনৈতিক পুঁজি বিনিয়োগ করেছে। আলোচনা ভেস্তে গেলে তাদের বিরুদ্ধে ‘সাধ্যের অতিরিক্ত প্রতিশ্রুতি দিয়ে তা পূরণে ব্যর্থ’ হওয়ার তকমা লেগে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।”
বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তানের জন্য চ্যালেঞ্জ কেবল অনুষ্ঠানস্থলের নিরাপত্তা রক্ষা করা নয়, বরং আলোচনার বাইরে থাকা অন্য শক্তিগুলো যাতে এই শান্তি প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে না পারে তা নিশ্চিত করা। নিরাপত্তা বিশ্লেষক জাহিদ হোসেনের মতে, ইসরায়েল অত্যন্ত শর্তসাপেক্ষে যুদ্ধবিরতি মেনে নিয়েছে। যেকোনো নতুন সংঘাত আলোচনার পথ সংকুচিত করে দিতে পারে।
শনিবারের বৈঠকে ইসলামাবাদ সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র উপসাগরীয় দেশগুলোর অভিযোগগুলো তুলে ধরবে, যারা যুদ্ধের সময় ইরানি হামলার শিকার হয়েছিল। এছাড়া, পাকিস্তান লেবানন পর্যন্ত যুদ্ধবিরতি সম্প্রসারণের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে।
চীনের ভূমিকা: নেপথ্যের কারিগর
একটি স্থায়ী শান্তি চুক্তির ক্ষেত্রে বেইজিংয়ের ভূমিকা হবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের মতে, মঙ্গলবার রাতে যখন একটি প্রাথমিক যুদ্ধবিরতি চুক্তি প্রায় ভেস্তে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল, তখন চীনের নিরব কূটনীতিই ইরানকে রাজি করাতে সক্ষম হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন উচ্চপদস্থ পাকিস্তানি কর্মকর্তা বলেন, “যুদ্ধবিরতির রাতে আশা প্রায় শেষ হয়ে যাচ্ছিল। আমাদের প্রচেষ্টা কেন্দ্রীয় হলেও বেইজিং শেষ মুহূর্তে ইরানকে রাজি করিয়ে এক বড় ধরনের অচলাবস্থা নিরসন করে।”
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় স্বীকার করেছেন যে, ইরানকে আলোচনার টেবিলে আনতে চীন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
আলোচনার মূল বিষয় ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ
শান্তি আলোচনা সফল করতে পাকিস্তানকে হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়া এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির মতো জটিল বিষয়গুলো সামলাতে হবে। পাকিস্তান ইতিমধ্যে নেভিগেশন, পারমাণবিক এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আলোচনার সুবিধার্থে বিশেষজ্ঞদের একটি দল গঠন করেছে।
ইরান এই চুক্তির জন্য একজন ‘গ্যারান্টর’ বা জামিনদার চায়। সাবেক সিনেটর মুশাহিদ হোসেন সায়েদ বলেন, “ইরান যেহেতু ট্রাম্প বা নেতানিয়াহু জুটিকে বিশ্বাস করে না, তাই চূড়ান্ত শান্তি চুক্তিতে চীনের ভূমিকা অপরিহার্য হবে।”
অন্যদিকে, লেবানন ইস্যু নিয়ে বড় ধরনের মতভেদ রয়ে গেছে। পাকিস্তান ও ইরান লেবাননকে এই যুদ্ধবিরতির অন্তর্ভুক্ত করতে চাইলেও ইসরায়েল তা অস্বীকার করে হিজবুল্লাহর ওপর হামলা অব্যাহত রেখেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই আলোচনা অত্যন্ত জটিল এবং স্পর্শকাতর। একটি ঐক্যমতে পৌঁছাতে হলে সব পক্ষকেই কঠিন কিছু আপস বা ছাড় দিতে হবে। পাকিস্তান বর্তমানে সেই মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় বিশ্বমঞ্চে নিজের সক্ষমতার পরীক্ষা দিচ্ছে।
Reporter Name 
























