বাংলাদেশের সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয় ক্রমেই রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের জন্য বড় ধরনের হুমকিতে রূপ নিচ্ছে—এমন উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছেন শিক্ষাবিদ ড. দিপু সিদ্দিকী। তাঁর বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, প্রাত্যহিক জীবনের অনিয়ম, নৈতিকতাহীন শিক্ষা ও সামাজিক বৈষম্য মিলেই রাষ্ট্রকে ভেতর থেকে দুর্বল করে তুলছে এবং ‘ডিপ স্টেট’ বা ছায়া-রাষ্ট্রের উত্থানের পথ প্রশস্ত করছে।
ড. সিদ্দিকী বলেন, আজকের সমাজে ফুটপাত থেকে রাজপথ—সবখানেই দেখা যাচ্ছে বিশৃঙ্খলা ও অপরের অধিকার লঙ্ঘনের প্রবণতা। সাধারণ মানুষের আচরণে ক্রমেই বাড়ছে স্বার্থপরতা, যেখানে অন্যকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখার মানসিকতা প্রাধান্য পাচ্ছে। এর ফলে সমাজের মৌলিক ‘সামাজিক চুক্তি’ ভেঙে পড়ছে এবং নাগরিকদের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা হ্রাস পাচ্ছে।
তিনি উল্লেখ করেন, শিক্ষা ব্যবস্থা এখন মূলত প্রতিযোগিতা ও আর্থিক সাফল্যকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে। নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধের চর্চা কমে যাওয়ায় শিক্ষার্থীরা বাস্তব জীবনে প্রবেশের পর সাফল্য অর্জনে অনৈতিক পথ বেছে নিতে দ্বিধা করছে না। এতে সমাজে বৈষম্য ও অবিচার আরও গভীর হচ্ছে।
অর্থনৈতিক অসমতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান বৃদ্ধি পাওয়ায় সমাজে ক্ষোভ ও প্রতিশোধমূলক মানসিকতা তৈরি হচ্ছে। এই প্রবণতা একসময় প্রশাসন ও রাষ্ট্রক্ষমতায় প্রবেশ করলে দুর্নীতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয়, যা রাষ্ট্রের ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয়।
ড. সিদ্দিকীর মতে, এই পরিস্থিতি ‘ডিপ স্টেট’-এর উত্থানের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে। প্রশাসনিক দুর্বলতা ও নৈতিক অবক্ষয়ের সুযোগ নিয়ে দেশি-বিদেশি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রভাব বিস্তার করতে পারে, যা সার্বভৌমত্বের জন্য বড় হুমকি।
তিনি আরও বলেন, জাতীয় ঐক্য ও নৈতিকতা দুর্বল হয়ে পড়লে ভৌগোলিক সার্বভৌমত্বও ঝুঁকির মুখে পড়ে। পাশাপাশি দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের কারণে অর্থনৈতিক পরাধীনতা সৃষ্টি হয়, যা রাজনৈতিক স্বাধীনতাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে।
এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য ড. সিদ্দিকী পরিবারভিত্তিক নৈতিক শিক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। পাশাপাশি শিক্ষাব্যবস্থায় মানবিক মূল্যবোধের চর্চা, সম্পদের সুষম বণ্টন এবং প্রশাসনে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
তিনি সতর্ক করে বলেন, “নৈতিক অবক্ষয় অব্যাহত থাকলে কোনো বহিঃশত্রুর প্রয়োজন হবে না—রাষ্ট্র নিজেই ভেতর থেকে দুর্বল হয়ে পড়বে।”
ড. দিপু সিদ্দিকী রয়েল ইউনিভার্সিটি অব ঢাকার কলা ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন ও শিক্ষা বিভাগের অধ্যাপক। তাঁর এই বিশ্লেষণ দেশের বর্তমান সামাজিক বাস্তবতা নিয়ে নতুন করে ভাবনার খোরাক।
Reporter Name 
























