‘আমগো পুরান ঢাকার ফুটবল প্রেম রক্তের লগে মিশ্যা আছে। দাদায় দেখছে, বাপেরে দেখছি, অহন পোলাপাইনগো দেখতাছি। বিশ্বকাপ আইলে আমগো এইহানে রান্ধাবাড়ার চেয়ে বড় আলোচনা হয় কার দল জিতব!’Ñ হাতে ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ আর চোখে একরাশ স্মৃতি নিয়ে কথাগুলো বলছিলেন পুরান ঢাকার সূত্রাপুরের প্রবীণ বাসিন্দা হাজী মো. সালাহউদ্দিন। তার এই খাঁটি ঢাকাইয়া সংলাপই বলে দেয়, আগামী ১১ জুন আমেরিকার লস অ্যাঞ্জেলেসে যখন ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের উদ্বোধনী বাঁশি বাজবে, তার ঢের আগেই কেন এই জরাজীর্ণ অথচ ঐতিহ্যে ঠাসা জনপদে ফুটবল যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। পুরান ঢাকায় ফুটবল বিশ্বকাপ কোনো সাধারণ খেলা নয়। এটা প্রজন্ম ধরে বয়ে চলা এক পারিবারিক ও সামাজিক উৎসব। এবার সেই উৎসবের রঙে নতুন মাত্রা যোগ করেছে জেন-জি তরুণদের স্পন্দনÑ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। ঐতিহ্য আর তারুণ্যের এই যুগলবন্দি পুরো ঢাকাইয়া জনপদকে রূপ দিয়েছে এক খণ্ড ফুটবল উপাখ্যানে।
শাঁখারীবাজারের সরু গলি কিংবা সূত্রাপুর-কলতাবাজারের চওড়া ছাদÑ সবখানেই এখন রাজত্ব করছে প্রিয় দলের রঙ। ইট-পাথরের দেয়াল বেয়ে নেমে এসেছে আকাশি-সাদা কিংবা হলুদ-সবুজ কাপড়ের স্রোত, আর আকাশের দখল নিয়েছে বাঁশের ডগায় বাঁধা বিশালাকৃতির সব পতাকা। কে কার চেয়ে বড় পতাকা টানাবে, তা নিয়ে প্রতিবেশীদের মধ্যে চলছে এক অদৃশ্য মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। তবে এই প্রতিযোগিতার আড়ালে লুকিয়ে আছে এক পরম সৌহার্দ। হাজী সালাউদ্দিনের কথায়ও ফুটে উঠল সেই মিলনের সুর, ‘এবার ৪৮ দল খেলব হুনতাছি, আনন্দও তাই ডাবল। হেই আমেজেই মহল্লার পোলাপাইন এক হইয়া অলরেডি বড় পর্দায় খেলা দেখার প্রজেক্টর আর বিরিয়ানির চাঁদা তোলা শেষ করছে।
মহল্লার এই সামগ্রিক উন্মাদনাকে প্রতিবারই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয় স্থানীয় ক্লাবগুলো। বিশ্বকাপের এই আমেজ ও প্রস্তুতি নিয়ে কলতাবাজারের ঐতিহ্যবাহী ‘কলতাবাজার স্পোর্টিং ক্লাব’-এর সাধারণ সম্পাদক আলহাজ মো. জহিরুল ইসলাম জহির বলেন, ‘আমাদের ক্লাব থেকে প্রতি বিশ্বকাপেই বিশেষ আয়োজন থাকে। এবারও ক্লাবের সামনে প্রজেক্টরে বড় পর্দায় প্রতিটা ম্যাচ লাইভ দেখানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে। শুধু তাই না, কোয়ার্টার ফাইনাল আর সেমিফাইনালের রাতে মহল্লার সবাইকে নিয়ে ঢাকাইয়া স্টাইলে তেহারি বা বিরিয়ানি ভোজের আয়োজন থাকবে। খেলা নিয়ে তর্ক-বিতর্ক আমাদের এখানে হবেই, কিন্তু দিনশেষে খেলাধুলার মাধ্যমে পাড়ার তরুণদের ঐক্যবদ্ধ রাখাই আমাদের ক্লাবের মূল লক্ষ্য।’
পাড়ার এই উৎসবমুখর আবহাওয়ার সমান্তরালে দেশের অন্যতম প্রধান বিদ্যাপীঠ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসও মেতে উঠেছে ফুটবল জ্বরে। শান্ত চত্বর, কাঁঠাল তলা কিংবা বিজ্ঞান অনুষদের করিডোরে এখন ক্লাসের ফাঁকে কিংবা আড্ডার মূল অনুষঙ্গ ফুটবল বিশ্বকাপ। বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ পছন্দের দলের জার্সি পরে ক্যাম্পাসে বর্ণিল শোভাযাত্রা বের করছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের শিক্ষার্থী ফাহিম ইসলাম নিজের ক্যাম্পাসের এই চিরচেনা অথচ প্রতিবারই নতুন মনে হওয়া উন্মাদনা নিয়ে বলেন, ‘ল্যাব আর পরীক্ষার ব্যস্ততা আমাদের লেগে থাকলেও ফুটবল বিশ্বকাপ তো চার বছর পর পর আসে। এটা আমাদের কাছে এক অন্যরকম আবেগ। আমরা বন্ধুরা মিলে ইতোমধ্যে পরিকল্পনা সাজিয়েছি কীভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাফেটেরিয়া বা শান্ত চত্বরের সামনে প্রজেক্টরে একসঙ্গে খেলা দেখব। প্রিয় দলের প্রতিটা গোল আর জয় যেন পুরো ক্যাম্পাসকে এক সুতোয় বেঁধে দেবে, এটাই আমাদের আসল আনন্দ।’
ক্যাম্পাসের এই উৎসবমুখর পরিবেশের কথা বলতে গিয়ে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী আনিকা তাসনিম বলেন, গতবার মেসি ট্রফি উঁচিয়ে ধরার পর আমাদের যে আনন্দ হয়েছিল, তা এবারও ধরে রাখতে চাই। তবে এবার দল সংখ্যা বেড়েছে, তাই লড়াই আরও কঠিন ও রোমাঞ্চকর হবে। ক্যাম্পাসে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা সমর্থকদের যে চিরাচরিত ট্রোল আর আনন্দঘন পরিবেশ তৈরি হয়, তা পড়াশোনার সমস্ত একঘেয়েমি দূর করে দেয়। আমরা সবাই এখন ১১ জুনের মহাউৎসবের অপেক্ষা করছি।
বিশ্বকাপের এই জোয়ার শুধু আড্ডা আর পতাকাবাজিতেই সীমাবদ্ধ নেই, এর ইতিবাচক হাওয়া লেগেছে পুরান ঢাকার অর্থনৈতিক চাকাতেও। গুলিস্তান, ইসলামপুর, নবাবপুর ও স্থানীয় বাজারগুলোয় এখন ধুম পড়েছে জার্সি ও পতাকা বিক্রির। দর্জি পাড়াতেও কারিগরদের দম ফেলার ফুরসত নেই; দিনরাত চলছে বিশাল আকৃতির সব পতাকা তৈরির কাজ। কালের বিবর্তনে বিনোদনের অনেক মাধ্যম পাল্টালেও পুরান ঢাকার মানুষ আর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছে ফুটবল বিশ্বকাপের আবেদন এখনও কতটা অমলিন, তা এই জাঁকজমকপূর্ণ প্রস্তুতিই প্রমাণ করে। মাঠের লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত কার ঘরে ট্রফি যাবে তা সময়ই বলে দেবে, তবে ঢাকার এই অঞ্চলের ফুটবল প্রেম বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের ফুটবল আবেগকে আবারও নতুন করে চিনিয়েছে।
Reporter Name 























