ঢাকা ০৬:৫১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬, ৩১ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
শিক্ষার্থীদের স্বার্থই সরকারের অগ্রাধিকার: মাহদী আমিন ফের লঘুচাপ সৃষ্টির আভাস, আবহাওয়া নিয়ে নতুন বার্তা অধিদপ্তরের চলতি অর্থবছরেই ৪১ লাখ নতুন ফ্যামিলি কার্ড দেবে সরকার দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা সরকারের প্রধান নীতিগত অগ্রাধিকার : প্রধানমন্ত্রী সংসদে ‘ব্যক্তিগত মন্তব্য’ নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করলেন শিক্ষামন্ত্রী আদমদীঘিতে কাঁচা মরিচের দামে ‘সেঞ্চুরি’, স্বস্তিতে কৃষক ব্রয়লার মুরগি খাওয়া কতটা নিরাপদ ‘ব্রয়লার মুরগি’ মন্তব্য নিয়ে যে ব্যাখ্যা দিলেন ছাত্রদলের নাছির দেশের যেসব অঞ্চলে রাত ১টার মধ্যে ঝড়ের আভাস দিল্লিতে বসে হুঙ্কার দিয়ে লাভ নেই, সীমানায় ঢুকলেই গ্রেপ্তার: আইনমন্ত্রী

ফুটবলের পরাশক্তি ব্রাজিলের বিদায় আর আর্জেন্টিনার কলঙ্ক এক

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১১:০০:৫২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই ২০২৬
  • ১৮ বার

রফিকুল ইসলামঃ ফুটবল কেবল একটি খেলা নয়, দক্ষিণ আমেরিকার দেশ আর্জেন্টিনার মানুষের কাছে এটি অস্তিত্বের অংশ এবং এক অকৃত্রিম উন্মাদনা।

ডিয়েগো ম্যারাডোনার ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপ জয় আজও পুরো আর্জেন্টাইন জাতির মনে জাতীয় বীরত্বের প্রতীক। পরবর্তীকালে লিওনেল মেসি এই আবেগকে এক নতুন চূড়ায় নিয়ে গেছেন, যা বিশ্বজুড়ে তাদের অগণিত ভক্ত তৈরি করেছে – এর মধ্যে আমিও একজন।

ম্যারাডোনার পায়ের জাদুতে মুগ্ধ হয়ে যে ভালোবাসার শুরু হয়েছিল, তা আজ প্রতিটি বিশ্বকাপেই উৎসবের রূপ নেয়। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত নীল-সাদা জার্সির উন্মাদনা দেখা যায়।

ফুটবল বিশ্বে আর্জেন্টাইন দলের সামর্থ্য ও ধারাবাহিকতার প্রমাণ মেলে ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ে। শীর্ষস্থান পুনরুদ্ধার করার মাধ্যমে দলটি সবসময়ই বিশ্ব আসরে শিরোপার অন্যতম দাবিদার হিসেবে অবতীর্ণ হয় – এবারও।

আমি যতটুকু দেখেছি, এই উন্মাদনার শুরুটা হয়েছিল ১৯৮৬ সালে। ফকল্যান্ডস যুদ্ধের পর ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার সেই ঐতিহাসিক জয় এবং এরপর ম্যারাডোনার একক নৈপুণ্যে বিশ্বকাপ জয় সবকিছু বদলে দিয়েছিল। ম্যারাডোনার সেই অবিশ্বাস্য জাদুকরি ফুটবল খেলা দেখেই বাংলাদেশের ফুটবল সমর্থকেরা ধীরে ধীরে আর্জেন্টিনার সমর্থকে পরিণত হন।

বিশ্বকাপ জয় ও আইকনিক সব ফুটবলারের কারণে আগে থেকেই ব্রাজিলের বিশাল সমর্থক গোষ্ঠী ছিল। তবে বাংলাদেশে ব্রাজিলের সেই একচ্ছত্র আধিপত্যের বিপরীতে আর্জেন্টিনা হয়ে উঠেছিল এক বিকল্প শক্তি।

ছোটবেলা থেকেই আমি আর্জেন্টিনা দলের ভক্ত, আর্জেন্টিনা দলের প্রতি গভীর ভালোবাসা ও ফুটবলীয় আবেগ। আর এর একমাত্র কারণ ম্যারাডোনা। কিন্তু এই ভালোবাসায় দেখা মিলে কলঙ্কের এক ছায়া!

দক্ষিণ আমেরিকার দুই ফুটবল পরাশক্তি ব্রাজিল এবং আর্জেন্টিনা। মাঠের চিরবৈরী এই দুই প্রতিবেশীর বিশ্বরাজনীতির মঞ্চে অবস্থানও সম্পূর্ণ বিপরীত।

বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে সবচেয়ে বড় ভূরাজনৈতিক সংকট ফিলিস্তিন ও ইসরায়েল ইস্যুতে লাতিন আমেরিকার এ দুই বৃহৎ অর্থনীতির দেশ সম্পূর্ণ ভিন্ন দুই মেরুতে।

একদিকে ব্রাজিল যখন ফিলিস্তিনিদের অধিকার রক্ষা ও গাজায় চলমান আগ্রাসনের বিরুদ্ধে জোরালো অবস্থান নিয়েছে; তখন আর্জেন্টিনা বিশ্বমঞ্চে ইসরায়েলের অন্যতম কট্টর সমর্থক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

বিশ্বরাজনীতিতে দুই প্রতিবেশীর এই কূটনৈতিক বৈরিতা এখন আন্তর্জাতিক মহলে বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের পক্ষে থাকার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে ব্রাজিলের। ব্রাজিলের ফিলিস্তিনপন্থি অবস্থানের সবচেয়ে বড় প্রাতিষ্ঠানিক ধাপ ছিল ২০১০ সাল। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট লুলা ডি সিলভার সরকার ১৯৬৭ সালের সীমান্ত অনুযায়ী ফিলিস্তিনকে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়।

ব্রাজিলের এই সিদ্ধান্তের পর লাতিন আমেরিকার আরও কয়েকটি দেশ ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেয়, যাদের মধ্যে আর্জেন্টিনাও ছিল। এটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ফিলিস্তিনের পক্ষে একটি বড় কূটনৈতিক বিজয় ছিল।

তবে সম্প্রতি অতি-ডানপন্থি প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই ক্ষমতায় আসার পর আর্জেন্টিনার পররাষ্ট্রনীতিতে এক আমূল পরিবর্তন আসে। মিলেই নিজেকে ‘বিশ্বের সবচেয়ে বড় জায়নবাদী (ইহুদিবাদী) রাষ্ট্রপ্রধান’ হিসেবে দাবি করেছেন।

প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে হাভিয়ের মিলেই তার প্রথম আনুষ্ঠানিক বিদেশ সফরের জন্য ইসরায়েলকে বেছে নেন। জেরুজালেমের পবিত্র ‘ওয়েস্টার্ন ওয়াল’ বা পশ্চিম দেওয়ালে গিয়ে তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি ঘোষণা করেন, আর্জেন্টিনা কেবল রাজনৈতিকভাবে নয়, আধ্যাত্মিকভাবেও ইসরায়েলের পাশে রয়েছে। এমনকি মিলেই নিজে ক্যাথলিক ধর্মাবলম্বী হওয়া সত্ত্বেও ইহুদি ধর্মে দীক্ষিত হওয়ার তীব্র ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন।

এছাড়া ২০২৫ সালের জুনে সাধারণ পরিষদে পাস হওয়া গাজা যুদ্ধবিরতি ও ফিলিস্তিনকে দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধানের পক্ষে আনা প্রস্তাবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পাশাপাশি আর্জেন্টিনা সরাসরি বিপক্ষে ভোট দেয়। সেসাথে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলের অবৈধ দখলদারিত্ব বন্ধের আন্তর্জাতিক প্রস্তাবের বিরুদ্ধেও অবস্থান নেয় আর্জেন্টিনা।

আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই একজন কট্টর ডানপন্থি এবং উগ্র-পুঁজিবাদী নেতা। তিনি যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলকে ‘মুক্ত পৃথিবীর’ বাতিঘর মনে করেন এবং তাদের সঙ্গে কৌশলগত জোট বাঁধাকেই নিজের প্রধান লক্ষ্য বানিয়েছেন।

যার ফলে দুই রাষ্ট্রপ্রধান দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করতে ‘আইজ্যাক অ্যাকর্ডস’ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন। এটি মূলত নিরাপত্তা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়ক একটি কৌশলগত চুক্তি।

মতাদর্শগত মিল থেকেই প্রেসিডেন্ট মিলেই ইহুদি সংস্কৃতির প্রতি গভীর অনুরাগী এবং তিনি ইসরায়েলের নিরাপত্তা ও অস্তিত্বের সুরক্ষায় অত্যন্ত সোচ্চার ইসরায়েলকে সমর্থন দিয়েছে আর্জেন্টিনা।

আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতিতে ইসরায়েল ও ইহুদি সম্প্রদায়ের প্রতি নিজেদের নীতিগত অবস্থান আরও দৃঢ় করে তুলে আর্জেন্টিনা।

ভূরাজনৈতিক অবস্থানে আন্তর্জাতিক নীতিমালায় ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন জানানোর মাধ্যমে মিলেই সরকার ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব মোকাবিলার বৃহত্তর পশ্চিমা ও মার্কিন কৌশলে নিজেকে যুক্ত করেছে আইজ্যাক অ্যাকর্ডস।

আর্জেন্টিনা কেন ইসরায়েলপন্থী হয়ে উঠছে?

আর্জেন্টিনার বর্তমান প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলের উগ্র ডানপন্থী আদর্শ, যুক্তরাষ্ট্র-ঘনিষ্ঠ পররাষ্ট্রনীতি এবং ইরানের সম্ভাব্য আঞ্চলিক প্রভাব মোকাবিলার কৌশলগত কারণে দেশটি ইসরায়েলপন্থী হয়ে উঠছে।

এছাড়া নব্বই দশকের বুয়েন্স আয়ার্সের ইহুদি স্থাপনায় ভয়াবহ বোমা হামলার জন্য ইরানকে দায়ী করে আসছে আর্জেন্টিনা, যা তাদের ইসরায়েলের সাথে আরও ঘনিষ্ঠ করেছে।

আর আর্জেন্টিনা ও ইসরায়েলের মধ্যে গভীর সম্পর্কের পেছনে কারণ তো রয়েছেই।

প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই ইসরায়েলের সাথে লাতিন আমেরিকার সম্পর্ক গভীর করার লক্ষ্যে ‘আইজ্যাক অ্যাকর্ডস’ নামক একটি উদ্যোগের ধারণা সামনে এনেছেন। মিলেই প্রশাসন রাশিয়া ও চীনের বলয় থেকে সরে এসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাথে কৌশলগত জোট গড়েছে।

১৯৯২ ও ১৯৯৪ সালে আর্জেন্টিনার বুয়েন্স আয়ার্সে ইসরায়েলি দূতাবাস এবং ইহুদি কমিউনিটি সেন্টারে ভয়াবহ বোমা হামলার জন্য দেশটি ইরান ও লেবাননের হিজবুল্লাহকে দায়ী করে। সেই থেকে ইরানকে নিজেদের প্রধান নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে আর্জেন্টিনা।

ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার পুরনো অবস্থান থেকে সরে এসে মিলেই সরকার জাতিসংঘে ফিলিস্তিনের বিপক্ষে ভোট দিয়েছে। এছাড়া নিজেদের দূতাবাস জেরুজালেমে স্থানান্তর এবং সরাসরি বিমান চলাচল চালুর পদক্ষেপ নিয়েছে।

ইসরায়েল-আর্জেন্টিনা ঘনিষ্ঠতার নেপথ্যে কী?

ইসরায়েল ও আর্জেন্টিনার বর্তমান ঐতিহাসিক ঘনিষ্ঠতার মূল নেপথ্যে রয়েছে আর্জেন্টাইন প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেইর আদর্শিক ও রাজনৈতিক রূপান্তর। মিলেইর সরকার লাতিন আমেরিকায় ইসরায়েলকে প্রধান কৌশলগত অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে, যার ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে আইজ্যাক অ্যাকর্ডস এবং সাইবার নিরাপত্তা, সন্ত্রাস দমন ও গোয়েন্দা তথ্যের মতো পারস্পরিক বিনিময়।

আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের আদলে আর্জেন্টিনার নেতৃত্বে ‘আইজ্যাক অ্যাকর্ডস’ নামক এক মিলিয়ন ডলারের একটি নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে, যার মূল লক্ষ ইসরায়েলের সঙ্গে লাতিন আমেরিকার কূটনৈতিক, বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করা।

এই ঘনিষ্ঠতার ফলে আর্জেন্টিনা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নিজেদের জন্য নতুন কৌশলগত মিত্র ও প্রযুক্তিগত সহায়তা নিশ্চিত করছে।

ফুটবলের ক্ষেত্রে আর্জেন্টিনার প্রতি বিশ্বজুড়ে অগণিত ভক্তের আবেগ থাকলেও, রাষ্ট্রীয় স্বার্থ ও বর্তমান সরকারের আদর্শিক দৃষ্টিভঙ্গির ওপর ভিত্তি করেই মূলত দেশটির এই ইসরায়েলপন্থী পররাষ্ট্রনীতি পরিচালিত হচ্ছে।

বিশ্ব রাজনীতির মঞ্চে এই দুই নেতার জোটকে অনেকেই একতরফা ও আগ্রাসী নীতির মিলন হিসেবে বিবেচনা করছেন। মানবাধিকার ও ফিলিস্তিন ইস্যুর কারণে বিশ্বজুড়ে অধিকারকর্মীদের কাছে আর্জেন্টিনার এই ঘনিষ্ঠতা চরম আপত্তির বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিশ্বের অনেক মানুষ ও মানবাধিকার সংগঠন ফিলিস্তিনে চলমান আগ্রাসনের কারণে ইসরায়েল এবং তাদের চরমপন্থী মিত্রদের কঠোর সমালোচনা করছে।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে ফিলিস্তিনে নির্বিচার হত্যাযজ্ঞ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনে সরাসরি সমর্থন ও মদদ দেওয়ায় আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেইয়ের নীতির তীব্র ধিক্কার জানাই। বিশ্বজুড়ে এই অন্যায় কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।

মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন ও দখলদারিত্বের দোসর হয়ে উঠার জন্য আর্জেন্টিনা ও ইসরায়েলের রাষ্ট্রপ্রধানদের প্রতি তীব্র নিন্দাও জানাই।

নিরীহ ফিলিস্তিনিদের রক্তে যাদের হাত রঞ্জিত, ইতিহাস কখনও তাদের ক্ষমা করবে না।

লেখকঃ রফিকুল ইসলাম | জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও কলামিস্ট

সহযোগী সম্পাদক, আজকের সূর্যোদয়, ঢাকা।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

শিক্ষার্থীদের স্বার্থই সরকারের অগ্রাধিকার: মাহদী আমিন

ফুটবলের পরাশক্তি ব্রাজিলের বিদায় আর আর্জেন্টিনার কলঙ্ক এক

আপডেট টাইম : ১১:০০:৫২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই ২০২৬

রফিকুল ইসলামঃ ফুটবল কেবল একটি খেলা নয়, দক্ষিণ আমেরিকার দেশ আর্জেন্টিনার মানুষের কাছে এটি অস্তিত্বের অংশ এবং এক অকৃত্রিম উন্মাদনা।

ডিয়েগো ম্যারাডোনার ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপ জয় আজও পুরো আর্জেন্টাইন জাতির মনে জাতীয় বীরত্বের প্রতীক। পরবর্তীকালে লিওনেল মেসি এই আবেগকে এক নতুন চূড়ায় নিয়ে গেছেন, যা বিশ্বজুড়ে তাদের অগণিত ভক্ত তৈরি করেছে – এর মধ্যে আমিও একজন।

ম্যারাডোনার পায়ের জাদুতে মুগ্ধ হয়ে যে ভালোবাসার শুরু হয়েছিল, তা আজ প্রতিটি বিশ্বকাপেই উৎসবের রূপ নেয়। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত নীল-সাদা জার্সির উন্মাদনা দেখা যায়।

ফুটবল বিশ্বে আর্জেন্টাইন দলের সামর্থ্য ও ধারাবাহিকতার প্রমাণ মেলে ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ে। শীর্ষস্থান পুনরুদ্ধার করার মাধ্যমে দলটি সবসময়ই বিশ্ব আসরে শিরোপার অন্যতম দাবিদার হিসেবে অবতীর্ণ হয় – এবারও।

আমি যতটুকু দেখেছি, এই উন্মাদনার শুরুটা হয়েছিল ১৯৮৬ সালে। ফকল্যান্ডস যুদ্ধের পর ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার সেই ঐতিহাসিক জয় এবং এরপর ম্যারাডোনার একক নৈপুণ্যে বিশ্বকাপ জয় সবকিছু বদলে দিয়েছিল। ম্যারাডোনার সেই অবিশ্বাস্য জাদুকরি ফুটবল খেলা দেখেই বাংলাদেশের ফুটবল সমর্থকেরা ধীরে ধীরে আর্জেন্টিনার সমর্থকে পরিণত হন।

বিশ্বকাপ জয় ও আইকনিক সব ফুটবলারের কারণে আগে থেকেই ব্রাজিলের বিশাল সমর্থক গোষ্ঠী ছিল। তবে বাংলাদেশে ব্রাজিলের সেই একচ্ছত্র আধিপত্যের বিপরীতে আর্জেন্টিনা হয়ে উঠেছিল এক বিকল্প শক্তি।

ছোটবেলা থেকেই আমি আর্জেন্টিনা দলের ভক্ত, আর্জেন্টিনা দলের প্রতি গভীর ভালোবাসা ও ফুটবলীয় আবেগ। আর এর একমাত্র কারণ ম্যারাডোনা। কিন্তু এই ভালোবাসায় দেখা মিলে কলঙ্কের এক ছায়া!

দক্ষিণ আমেরিকার দুই ফুটবল পরাশক্তি ব্রাজিল এবং আর্জেন্টিনা। মাঠের চিরবৈরী এই দুই প্রতিবেশীর বিশ্বরাজনীতির মঞ্চে অবস্থানও সম্পূর্ণ বিপরীত।

বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে সবচেয়ে বড় ভূরাজনৈতিক সংকট ফিলিস্তিন ও ইসরায়েল ইস্যুতে লাতিন আমেরিকার এ দুই বৃহৎ অর্থনীতির দেশ সম্পূর্ণ ভিন্ন দুই মেরুতে।

একদিকে ব্রাজিল যখন ফিলিস্তিনিদের অধিকার রক্ষা ও গাজায় চলমান আগ্রাসনের বিরুদ্ধে জোরালো অবস্থান নিয়েছে; তখন আর্জেন্টিনা বিশ্বমঞ্চে ইসরায়েলের অন্যতম কট্টর সমর্থক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

বিশ্বরাজনীতিতে দুই প্রতিবেশীর এই কূটনৈতিক বৈরিতা এখন আন্তর্জাতিক মহলে বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের পক্ষে থাকার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে ব্রাজিলের। ব্রাজিলের ফিলিস্তিনপন্থি অবস্থানের সবচেয়ে বড় প্রাতিষ্ঠানিক ধাপ ছিল ২০১০ সাল। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট লুলা ডি সিলভার সরকার ১৯৬৭ সালের সীমান্ত অনুযায়ী ফিলিস্তিনকে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়।

ব্রাজিলের এই সিদ্ধান্তের পর লাতিন আমেরিকার আরও কয়েকটি দেশ ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেয়, যাদের মধ্যে আর্জেন্টিনাও ছিল। এটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ফিলিস্তিনের পক্ষে একটি বড় কূটনৈতিক বিজয় ছিল।

তবে সম্প্রতি অতি-ডানপন্থি প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই ক্ষমতায় আসার পর আর্জেন্টিনার পররাষ্ট্রনীতিতে এক আমূল পরিবর্তন আসে। মিলেই নিজেকে ‘বিশ্বের সবচেয়ে বড় জায়নবাদী (ইহুদিবাদী) রাষ্ট্রপ্রধান’ হিসেবে দাবি করেছেন।

প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে হাভিয়ের মিলেই তার প্রথম আনুষ্ঠানিক বিদেশ সফরের জন্য ইসরায়েলকে বেছে নেন। জেরুজালেমের পবিত্র ‘ওয়েস্টার্ন ওয়াল’ বা পশ্চিম দেওয়ালে গিয়ে তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি ঘোষণা করেন, আর্জেন্টিনা কেবল রাজনৈতিকভাবে নয়, আধ্যাত্মিকভাবেও ইসরায়েলের পাশে রয়েছে। এমনকি মিলেই নিজে ক্যাথলিক ধর্মাবলম্বী হওয়া সত্ত্বেও ইহুদি ধর্মে দীক্ষিত হওয়ার তীব্র ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন।

এছাড়া ২০২৫ সালের জুনে সাধারণ পরিষদে পাস হওয়া গাজা যুদ্ধবিরতি ও ফিলিস্তিনকে দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধানের পক্ষে আনা প্রস্তাবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পাশাপাশি আর্জেন্টিনা সরাসরি বিপক্ষে ভোট দেয়। সেসাথে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলের অবৈধ দখলদারিত্ব বন্ধের আন্তর্জাতিক প্রস্তাবের বিরুদ্ধেও অবস্থান নেয় আর্জেন্টিনা।

আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই একজন কট্টর ডানপন্থি এবং উগ্র-পুঁজিবাদী নেতা। তিনি যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলকে ‘মুক্ত পৃথিবীর’ বাতিঘর মনে করেন এবং তাদের সঙ্গে কৌশলগত জোট বাঁধাকেই নিজের প্রধান লক্ষ্য বানিয়েছেন।

যার ফলে দুই রাষ্ট্রপ্রধান দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করতে ‘আইজ্যাক অ্যাকর্ডস’ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন। এটি মূলত নিরাপত্তা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়ক একটি কৌশলগত চুক্তি।

মতাদর্শগত মিল থেকেই প্রেসিডেন্ট মিলেই ইহুদি সংস্কৃতির প্রতি গভীর অনুরাগী এবং তিনি ইসরায়েলের নিরাপত্তা ও অস্তিত্বের সুরক্ষায় অত্যন্ত সোচ্চার ইসরায়েলকে সমর্থন দিয়েছে আর্জেন্টিনা।

আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতিতে ইসরায়েল ও ইহুদি সম্প্রদায়ের প্রতি নিজেদের নীতিগত অবস্থান আরও দৃঢ় করে তুলে আর্জেন্টিনা।

ভূরাজনৈতিক অবস্থানে আন্তর্জাতিক নীতিমালায় ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন জানানোর মাধ্যমে মিলেই সরকার ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব মোকাবিলার বৃহত্তর পশ্চিমা ও মার্কিন কৌশলে নিজেকে যুক্ত করেছে আইজ্যাক অ্যাকর্ডস।

আর্জেন্টিনা কেন ইসরায়েলপন্থী হয়ে উঠছে?

আর্জেন্টিনার বর্তমান প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলের উগ্র ডানপন্থী আদর্শ, যুক্তরাষ্ট্র-ঘনিষ্ঠ পররাষ্ট্রনীতি এবং ইরানের সম্ভাব্য আঞ্চলিক প্রভাব মোকাবিলার কৌশলগত কারণে দেশটি ইসরায়েলপন্থী হয়ে উঠছে।

এছাড়া নব্বই দশকের বুয়েন্স আয়ার্সের ইহুদি স্থাপনায় ভয়াবহ বোমা হামলার জন্য ইরানকে দায়ী করে আসছে আর্জেন্টিনা, যা তাদের ইসরায়েলের সাথে আরও ঘনিষ্ঠ করেছে।

আর আর্জেন্টিনা ও ইসরায়েলের মধ্যে গভীর সম্পর্কের পেছনে কারণ তো রয়েছেই।

প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই ইসরায়েলের সাথে লাতিন আমেরিকার সম্পর্ক গভীর করার লক্ষ্যে ‘আইজ্যাক অ্যাকর্ডস’ নামক একটি উদ্যোগের ধারণা সামনে এনেছেন। মিলেই প্রশাসন রাশিয়া ও চীনের বলয় থেকে সরে এসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাথে কৌশলগত জোট গড়েছে।

১৯৯২ ও ১৯৯৪ সালে আর্জেন্টিনার বুয়েন্স আয়ার্সে ইসরায়েলি দূতাবাস এবং ইহুদি কমিউনিটি সেন্টারে ভয়াবহ বোমা হামলার জন্য দেশটি ইরান ও লেবাননের হিজবুল্লাহকে দায়ী করে। সেই থেকে ইরানকে নিজেদের প্রধান নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে আর্জেন্টিনা।

ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার পুরনো অবস্থান থেকে সরে এসে মিলেই সরকার জাতিসংঘে ফিলিস্তিনের বিপক্ষে ভোট দিয়েছে। এছাড়া নিজেদের দূতাবাস জেরুজালেমে স্থানান্তর এবং সরাসরি বিমান চলাচল চালুর পদক্ষেপ নিয়েছে।

ইসরায়েল-আর্জেন্টিনা ঘনিষ্ঠতার নেপথ্যে কী?

ইসরায়েল ও আর্জেন্টিনার বর্তমান ঐতিহাসিক ঘনিষ্ঠতার মূল নেপথ্যে রয়েছে আর্জেন্টাইন প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেইর আদর্শিক ও রাজনৈতিক রূপান্তর। মিলেইর সরকার লাতিন আমেরিকায় ইসরায়েলকে প্রধান কৌশলগত অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে, যার ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে আইজ্যাক অ্যাকর্ডস এবং সাইবার নিরাপত্তা, সন্ত্রাস দমন ও গোয়েন্দা তথ্যের মতো পারস্পরিক বিনিময়।

আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের আদলে আর্জেন্টিনার নেতৃত্বে ‘আইজ্যাক অ্যাকর্ডস’ নামক এক মিলিয়ন ডলারের একটি নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে, যার মূল লক্ষ ইসরায়েলের সঙ্গে লাতিন আমেরিকার কূটনৈতিক, বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করা।

এই ঘনিষ্ঠতার ফলে আর্জেন্টিনা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নিজেদের জন্য নতুন কৌশলগত মিত্র ও প্রযুক্তিগত সহায়তা নিশ্চিত করছে।

ফুটবলের ক্ষেত্রে আর্জেন্টিনার প্রতি বিশ্বজুড়ে অগণিত ভক্তের আবেগ থাকলেও, রাষ্ট্রীয় স্বার্থ ও বর্তমান সরকারের আদর্শিক দৃষ্টিভঙ্গির ওপর ভিত্তি করেই মূলত দেশটির এই ইসরায়েলপন্থী পররাষ্ট্রনীতি পরিচালিত হচ্ছে।

বিশ্ব রাজনীতির মঞ্চে এই দুই নেতার জোটকে অনেকেই একতরফা ও আগ্রাসী নীতির মিলন হিসেবে বিবেচনা করছেন। মানবাধিকার ও ফিলিস্তিন ইস্যুর কারণে বিশ্বজুড়ে অধিকারকর্মীদের কাছে আর্জেন্টিনার এই ঘনিষ্ঠতা চরম আপত্তির বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিশ্বের অনেক মানুষ ও মানবাধিকার সংগঠন ফিলিস্তিনে চলমান আগ্রাসনের কারণে ইসরায়েল এবং তাদের চরমপন্থী মিত্রদের কঠোর সমালোচনা করছে।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে ফিলিস্তিনে নির্বিচার হত্যাযজ্ঞ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনে সরাসরি সমর্থন ও মদদ দেওয়ায় আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেইয়ের নীতির তীব্র ধিক্কার জানাই। বিশ্বজুড়ে এই অন্যায় কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।

মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন ও দখলদারিত্বের দোসর হয়ে উঠার জন্য আর্জেন্টিনা ও ইসরায়েলের রাষ্ট্রপ্রধানদের প্রতি তীব্র নিন্দাও জানাই।

নিরীহ ফিলিস্তিনিদের রক্তে যাদের হাত রঞ্জিত, ইতিহাস কখনও তাদের ক্ষমা করবে না।

লেখকঃ রফিকুল ইসলাম | জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও কলামিস্ট

সহযোগী সম্পাদক, আজকের সূর্যোদয়, ঢাকা।