ঢাকা ১২:৫৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০২ অগাস্ট ২০২৬, ১৭ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ক্ষমতার সূর্য: উদয় দীর্ঘ, অস্ত নিমেষে

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১২:৫৭:৪২ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২ অগাস্ট ২০২৬
  • ১ বার

জাতীয় নাগরিক পার্টি – এনসিপির ‘জুলাই পদযাত্রা’ মূলত ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষ্যে দেশব্যাপী একটি রাজনৈতিক জনসংযোগ কর্মসূচি। তবে এই কর্মসূচিকে ঘিরে দেশের বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক বিরোধ ও সহিংসতার ঘটনা ঘটছে।

তারুণ্যের শক্তি এবং উদ্দীপনা ইতিবাচক পরিবর্তনের চালিকাশক্তি হতে পারে, তবে তা কোনোভাবেই ধ্বংসাত্মক রূপ গ্রহণযোগ্য নয়। ‘জুলাই পদযাত্রা’ কর্মসূচি অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে রূপ পাচ্ছে। দলটি তরুণ-প্রজন্মের আবেগ ও আন্দোলনকে ব্যবহার করে নিজেদের স্বার্থে দেশের রাজনীতিকে বিপজ্জনক বা অস্থিতিশীল পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

‘২৪-এর জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মূল চালিকাশক্তি ছিল তরুণ সমাজ ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা। আন্দোলন-পরবর্তী সময়ে গঠিত এনসিপি নিজেকে ‘তরুণদের দল’ বা ‘জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা’ ধারণকারী দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। বিশ্লেষকদের মতে, দলটির শীর্ষ নেতারা তরুণদের সেই ত্যাগের আবেগ ও নৈতিক কর্তৃত্বকে রাজনৈতিক ঢাল বা মূল ‘পুঁজি’ হিসেবে ব্যবহার করছেন।

ক্ষমতার চিরাচরিত রাজনৈতিক দলগুলোর বিশেষ করে ক্ষমতাসীন বিএনপির সঙ্গে এনসিপির মাঠ পর্যায়ের দ্বন্দ্ব এবং দেশের বিভিন্ন জেলায় তাদের পদযাত্রা বা সফরকে কেন্দ্র করে সহিংস সংঘাতের ঘটনা দেশকে অস্থিতিশীল করে তুলছে। অনেকের অভিযোগ, রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা বা দীর্ঘস্থায়ী সাংগঠনিক কাঠামো ছাড়াই দলটি প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর বিরুদ্ধে উগ্র বা মারমুখী অবস্থান নিচ্ছে, যা দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য এক ‘ভয়ঙ্কর খেলা’ বা বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করছে।

এনসিপির বিরুদ্ধে বড় অভিযোগ উঠছে, যে তরুণরা বৈষম্যহীন ও প্রগতিশীল নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিল, তাদের আবেগকে পুঁজি করে বিপথগামী রাজনৈতিক ক্ষমতার অংশীদার হওয়া তরুণদের সাথে এক ধরনের প্রতারণা।

তরুণদের আবেগকে হাতিয়ার বানিয়ে এনসিপি এমন কিছু রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও সংঘাতের পথ বেছে নিচ্ছে, যা দেশের ভবিষ্যৎ ও স্থিতিশীলতাকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে।

এ বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠছে, বর্তমান তরুণ নেতৃত্ব কি শৃঙ্খলা ও দায়িত্বশীলতার বার্তা দিতে পারছেন? নাকি তাঁরা জনগণের আস্থা হারিয়ে ফেলছেন? যদি এই অস্থিরতা চলতে থাকে, মানুষ আবারও কোনো বিকল্প স্থিতিশীল নেতৃত্বের দিকে তাকাবে।

সমাজবিজ্ঞানী পিয়েরে বুর্দিয়ো বলেছিলেন, সমাজের বাস্তবতা না বুঝে যারা কেবল বড় বড় কথা বলে, তারা একধরনের জোর করে চাপিয়ে দেওয়া রাজনীতি করে।

এনসিপির চলমান ‘জুলাই পদযাত্রা’ কর্মসূচিতে দলটির নেতাদের বিভিন্ন বক্তব্য এবং এর পরিপ্রেক্ষিতে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক উত্তেজনাকে মূলত তিনটি ভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিচার-বিশ্লেষণ করা যায়।

এনসিপি তাদের নিজস্ব অবস্থান ও যুক্তি দাঁড় করিয়েছে। দলটির শীর্ষ নেতারা তাদের বক্তব্যকে ‘উস্কানিমূলক’ নয়, বরং সমাজ সংস্কার ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান হিসেবে দেখছেন।

হবিগঞ্জের পদযাত্রায় এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসিরউদ্দিন পাটোয়ারী স্থানীয় অপরাধ ও মাদক চোরাচালানের বিরুদ্ধে কথা বলেন। একে তারা কোনো দলের বিরুদ্ধে উস্কানি নয়, বরং একটি জনকল্যাণমূলক রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে দাবি করেছেন।

দলের নেতারা মনে করেন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় স্বাধীনভাবে নিজের মতামত ও সমালোচনা প্রকাশ করার পূর্ণ অধিকার তাদের রয়েছে এবং রাজনৈতিক বক্তব্যকে সহিংসতা দিয়ে দমন করা ফ্যাসিবাদেরই ধারাবাহিকতা।

এদিকে বিএনপি এবং এর সহযোগী সংগঠন ছাত্রদল ও যুবদলের স্থানীয় নেতারা এনসিপি নেতাদের বক্তব্যকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও উস্কানিমূলক বলে অভিহিত করেছেন।

ছাত্রদলের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে যে, এনসিপির নেতারা রাজনৈতিক শিষ্টাচার লঙ্ঘন করছেন। দেশের বিভিন্ন শান্ত এলাকা বা জনপদে গিয়ে অন্য রাজনৈতিক দলের নেতাদের লক্ষ্য করে আক্রমণাত্মক ও অশালীন মন্তব্য এবং চরিত্রহরণ করছেন। এসব দেশ বিশৃঙ্খলের পায়তারা বৈ কিছু নয়।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষণ বলছে, কিশোরগঞ্জে সুস্থ ধারার রাজনীতির পরিপন্থী যেসব বক্তব্য তা স্থানীয় কর্মী-সমর্থকদের উসকে দেয় এবং এর ফলেই হবিগঞ্জে অনাকাঙ্ক্ষিত গণ-অসন্তোষ বা সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। দলটি যেখানেই যায় বিশৃঙ্খলা বাধায়।

সুশীল সমাজ এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতিটি হবে তারেক রহমান সরকারের জন্য নতুন বাংলাদেশ গঠনে একটি বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা।

তবে একথা শিরোধার্য যে, বক্তব্যের জবাব রাজনৈতিকভাবে হওয়া উচিত। ১১-দলীয় জোটসহ বিভিন্ন নিরপেক্ষ রাজনৈতিক দলগুলো স্পষ্ট করেছে যে, এনসিপির কোনো বক্তব্য যদি উস্কানিমূলক বা বিতর্কিত মনেও হয়, তার জবাব দেওয়া উচিত রাজনৈতিকভাবে, সহিংসতা বা কোনো ধরনের আক্রমণের মাধ্যমে নয়।

কেননা, উস্কানিমূলক বক্তব্য এবং তার জেরে হামলার ঘটনা—উভয়ই দেশে গণতান্ত্রিক সহনশীলতা ও জননিরাপত্তার জন্য ক্ষতিকর। এটি রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহনশীলতার অভাবকে স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তোলে।

সবমিলিয়ে, এই বক্তব্যগুলোকে একদিকে নতুন দলের আত্মপ্রকাশকালীন আগ্রাসী রাজনৈতিক প্রচার হিসেবে দেখা যায়; আবার অন্যদিকে প্রতিষ্ঠিত দলগুলোর একচেটিয়া প্রভাবের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ হিসেবেও মূল্যায়ন করা যায়। তবে যেকোনো বক্তব্যকে ঘিরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি বা সহিংসতা প্রতিরোধে প্রশাসন ও দলগুলোর দায়িত্বশীল আচরণই শ্রেয়।

তবে এটাও অনস্বীকার্য যে, এনসিপি ‘জুলাই পদযাত্রা’ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে উদ্ভূত রাজনৈতিক উত্তেজনা, সম্ভাব্য উস্কানিমূলক বক্তব্য ও ‘অলটারনেটিভ ফ্যাক্টস’ বা ‘বিকল্প তথ্য’ প্রচারের পরিপ্রেক্ষিতে শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখা সরকারেরও গুরু দায়িত্ব। তন্মধ্যে প্রধান দায়িত্ব হলো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ ও সব রাজনৈতিক দলের গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত করা।

এহেন পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় সরকারের করণীয় পদক্ষেপ হতে পারে:

১. রাজনৈতিক উত্তেজনাপ্রবণ এলাকাগুলোতে পুলিশের পাশাপাশি বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন রাখা।

২. উস্কানিমূলক বক্তব্য বা গুজব ছড়িয়ে যেন কেউ কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে না পারে, সেজন্য গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানো।

৩. জরুরি নিষেধাজ্ঞা প্রয়োগ অর্থাৎ পরিস্থিতি বেশি সহিংস রূপ নিলে স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে ১৪৪ ধারা বা প্রয়োজনীয় আইনি নিষেধাজ্ঞা জারি করে জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

৪. যেকোনো পক্ষের ওপর হামলা বা ভাঙচুরের ঘটনার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে অপরাধীদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও আইনের আওতায় আনা।

৫. মাঠ পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে ও পেশাদারিত্বের সাথে দায়িত্ব পালন করতে নির্দেশ দেওয়া।

৬. ‘রাজনৈতিক বক্তব্যের জবাব রাজনৈতিকভাবেই দেওয়া উচিত, কোনো ধরনের সহিংসতার মাধ্যমে নয়’—এই গণতান্ত্রিক নীতি বজায় রেখে শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনের সুযোগ দেওয়া।

৭. উস্কানিমূলক ও মানহানিকর বক্তব্য পরিহার করার জন্য দেশের সকল রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃত্বকে সংযত থাকার এবং কর্মীদের নিয়ন্ত্রণ করার আহ্বান জানানো।

সরকারের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত একটি বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ বজায় রাখা, যেখানে কোনো উস্কানি বা আক্রমণ দেশের সার্বিক স্থিতিশীলতাকে বিনষ্ট করতে না পারে।

ইতিহাস শিক্ষা দেয়, একটি জাতিকে ধ্বংস করতে যুদ্ধের দরকার নেই, শুধু নোংরা রাজনীতি চালিয়ে যাওয়াই যথেষ্ট।

একটি জাতিকে ধ্বংস করার জন্য প্রথাগত যুদ্ধ বা বোমাবর্ষণের প্রয়োজন হয় না, বরং দীর্ঘমেয়াদী নোংরা রাজনীতি বা কলুষিত রাজনৈতিক সংস্কৃতি একটি সমাজকে ভেতর থেকে সম্পূর্ণ পঙ্গু করে দিতে পারে। যুদ্ধ কেবল অবকাঠামো ও মানুষের জীবন কেড়ে নেয়; কিন্তু নোংরা রাজনীতি একটি জাতির নৈতিকতা, বিচারব্যবস্থা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে দেয়, যা এনসিপির মধ্যে প্রতিফলিত।

যুদ্ধ একটি জাতিকে সাময়িকভাবে পঙ্গু করলেও জাতীয় চেতনাকে পুনরুজ্জীবিত করতে পারে। যেমন—দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাপান বা জার্মানি। কিন্তু নোংরা রাজনীতি একটি জাতির আত্মাকে মেরে ফেলে। এটি যখন কোনো সমাজে স্থায়ী রূপ নেয়, তখন সেই জাতি মানচিত্র ও পতাকাসহ টিকে থাকলেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি মৃত, মেরুদণ্ডহীন এবং পরনির্ভরশীল জাতিতে পরিণত হয়।

অতিশয় উদ্বেগের সাথে লক্ষ করা যাচ্ছে, তরুণ নেতৃত্ব বা এনসিপি আদর্শিক রাজনীতির বদলে ক্ষমতার লোভ ও পেশিশক্তির চর্চায় জড়িয়ে পড়ছেন। অথচ জনগণ ভুল করলে ক্ষমা হয়, কিন্তু রাজনীতিক ভুল করলে জাতি তার মূল্য চুকায়।

এনসিপির উচিত জাতীয় সম্পদ রক্ষা এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা বিঘ্নিত না করা। নেতৃত্বের বিকাশে বিশৃঙ্খলা এড়িয়ে সুশৃঙ্খল উপায়ে দায়িত্বশীল ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব গড়ে তোলা।

রাজনীতি একটি রাষ্ট্রের চালিকা শক্তি, যা জনগণের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলে। সঠিক নেতৃত্ব, নীতিনৈতিকতা ও গণতান্ত্রিক মানসিকতা ছাড়া একটি জাতি এগিয়ে যেতে পারে না। তবে দুর্ভাগ্যজনকভাবে এ দেশে অনেক সময় রাজনীতি হয়ে উঠছে স্বেচ্ছাচারিতা, স্বার্থপরতা, দুর্নীতি আর ক্ষমতার খেলা।

একজন রাজনীতিবিদ হলেন তিনি, যিনি পরবর্তী নির্বাচনের কথা ভাবেন; একজন রাষ্ট্রনায়ক হলেন তিনি, যিনি পরবর্তী প্রজন্মের কথা ভাবেন। রাজনীতির আসল পরীক্ষা হয় ক্ষমতা পাওয়ার পর, আদর্শ ধরে রাখতে পারলে তবেই নেতা হওয়া যায়।

একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের প্রাণশক্তি হলো তার রাজনীতি। রাজনীতি কেবল ক্ষমতা অর্জনের হাতিয়ার নয়, বরং তা সমাজ বিনির্মাণ, জনগণের অধিকার নিশ্চিতকরণ এবং সামগ্রিক দেশ গঠনের সুনির্দিষ্ট পথরেখা। যেকোনো দেশের টেকসই উন্নয়ন, শান্তি ও স্থিতিশীলতা নির্ভর করে সেখানে কেমন রাজনৈতিক সংস্কৃতি বিদ্যমান রয়েছে তার ওপর। রাষ্ট্র গঠন ও তার অগ্রযাত্রায় সুস্থ ধারার রাজনীতির কোনো বিকল্প নেই।

সুস্থ রাজনীতি বলতে বোঝায় জনকল্যাণমুখী, নীতি-আদর্শভিত্তিক, পরমতসহিষ্ণুতা এবং আইন ও সংবিধানের প্রতি শ্রদ্ধাশীল রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড – যেখানে ব্যক্তিগত বা দলীয় স্বার্থের চেয়ে দেশের স্বার্থকে সবার আগে স্থান দেওয়া হয়। হিংসা, জনভোগান্তি, দুর্নীতি এবং পেশিশক্তির ব্যবহারমুক্ত হয়ে যখন সুস্থ প্রতিযোগিতা, জবাবদিহিতা এবং স্বচ্ছতার ভিত্তিতে রাজনৈতিক চর্চা পরিচালিত হয়, তবেই সুস্থ রাজনীতি বলা যায়।

টেকসই অর্থনীতি ও উন্নয়নে সুস্থ রাজনৈতিক পরিবেশ দেশের ভেতর দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করে। সঠিক অর্থনৈতিক পলিসি তৈরি এবং তা বাস্তবায়নের জন্য একটি স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ প্রয়োজন।দুর্নীতিমুক্ত এবং জনকল্যাণমূলক রাজনীতি থাকলে রাষ্ট্রীয় সম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত হয়, যা একটি দেশের অর্থনৈতিক ভিত মজবুত করে।

গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের বিকাশের ক্ষেত্রে সুস্থ রাজনীতি গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়। এটি নাগরিকদের বাকস্বাধীনতা, ভোটাধিকার এবং মৌলিক মানবাধিকারের নিশ্চয়তা প্রদান করে। শক্তিশালী বিরোধী দল এবং সুস্থ রাজনৈতিক চর্চার মাধ্যমে ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় থাকে।

রাজনীতি যখন ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে ওঠে, তখন বিচার বিভাগ ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাসমূহ স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে। ফলে সমাজে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা পায়, অপরাধ প্রবণতা কমে এবং সাধারণ নাগরিকরা ন্যায়বিচার ভোগ করতে পারে।

নোংরা ও কলুষিত রাজনীতি তরুণ সমাজকে রাজনীতিবিমুখ করে তোলে। অন্যদিকে, রাজনৈতিক পরিবেশ যদি সুস্থ ও আদর্শভিত্তিক হয়, তবে দেশের সৎ, যোগ্য ও উচ্চশিক্ষিত তরুণরা দেশ গঠনে এগিয়ে আসে। এটি ভবিষ্যতে দেশকে সঠিক নেতৃত্ব দেওয়ার পথ সুগম করে।

একটি দেশের সমাজব্যবস্থায় বিভিন্ন ধর্ম, বর্ণ ও শ্রেণির মানুষ বাস করে। সুস্থ রাজনীতি সমাজে বিভাজন না বাড়িয়ে বৈষম্যহীন সমাজ গঠনে কাজ করে। এটি ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান কমিয়ে একটি সমতাভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনে সাহায্য করে।

কিন্তু রাজনীতিতে যখন সুস্থ ধারা হারিয়ে যায়, তখন সমাজে বিশৃঙ্খলা, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি এবং প্রতিহিংসার রাজনীতি জেঁকে বসে। হরতাল, সহিংসতা এবং পেশিশক্তির প্রদর্শন সাধারণ মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করে তোলে। এতে যুবসমাজ বিপথগামী হয় এবং দেশের মেধাবী সম্পদ পাচার হয়ে যায়। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা মুখ ফিরিয়ে নেয়, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে দেশের অর্থনীতির ওপর।

সুস্থ রাজনৈতিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার উপায় হিসেবে দেশকে সঠিক পথে এগিয়ে নিতে হলে সুস্থ রাজনীতির পুনর্জাগরণ জরুরি। এর জন্য কিছু কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন:

১. রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের চর্চা নিশ্চিত করা।

২. ব্যক্তি বা দলীয় স্বার্থের চেয়ে দেশপ্রেমকে অগ্রাধিকার দেওয়া।

৩. রাজনীতিকে কালো টাকা ও পেশিশক্তির প্রভাব থেকে মুক্ত করা।

৪. নির্বাচনী ব্যবস্থা ও নির্বাচন কমিশনকে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও বিতর্কাতীত করা।

৫. পরমতসহিষ্ণুতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের সংস্কৃতি চালু করা।

ক্ষমতাসীন হওয়ার চেয়ে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখা কঠিন—এটি রাষ্ট্রবিজ্ঞান এবং ইতিহাসের একটি চিরন্তন সত্য। কোনো বিশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতি, গণ-আন্দোলন বা বিপ্লবের তরঙ্গে চড়ে ক্ষমতা অর্জন করা সম্ভব হলেও দীর্ঘমেয়াদে সেই ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য বহুমুখী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়। তা হলো:

১. জনগণের আকাশচুম্বী প্রত্যাশা ক্ষমতা পাওয়ার আগে দলগুলো বড় বড় প্রতিশ্রুতি দেয়। ক্ষমতায় আসার পর জনগণ দ্রুত সেগুলোর বাস্তবায়ন দেখতে চায়। অর্থনৈতিক সংকট বা সীমিত সম্পদের কারণে সব প্রতিশ্রুতি পূরণ করা অসম্ভব হয়ে পড়ে, যা দ্রুত জনঅসন্তোষ তৈরি করে।

২. প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ শুধু শাসনভার নিলেই দেশ চালানো যায় না; আমলাতন্ত্র, পুলিশ ও বিচার বিভাগকে নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং তাদের কর্মক্ষম রাখা অত্যন্ত জটিল। প্রশাসনের অভ্যন্তরে থাকা ভিন্ন মতাদর্শী বা দুর্নীতিগ্রস্ত চক্রকে সামলানো বড় চ্যালেঞ্জ।

৩. অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও শক্তির ভারসাম্যে ক্ষমতা অর্জনের লড়াইয়ে অনেক দল বা গোষ্ঠী এক জোট হতে পারে। ক্ষমতা পাওয়ার পর ভাগাভাগি, পদ-পদবি এবং স্বার্থের দ্বন্দ্বে সেই জোট বা দলের ভেতরেই ভাঙন ও উপদলীয় কোন্দল শুরু হয়।

৪. অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় মুদ্রাস্ফীতি, বেকারত্ব, রাজস্ব ঘাটতি এবং বৈদেশিক ঋণের মতো জটিল অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা করা যেকোনো সরকারের জন্য সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা। অর্থনীতি ব্যর্থ হলে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ সরাসরি সরকারের ওপর গিয়ে পড়ে।

৫. বিরোধী দল ও ভূ-রাজনীতিতে ক্ষমতাচ্যুত বা বিরোধী শক্তি সবসময় সরকারের ভুলত্রুটি খুঁজে তা জনসমক্ষে এনে আন্দোলন গড়ে তোলার চেষ্টা করে। এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক চাপ, বিদেশি শক্তির হস্তক্ষেপ এবং আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতি সরকারের ওপর প্রতিনিয়ত চাপ সৃষ্টি করে।

৬. দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকলে অতি-আত্মবিশ্বাস অনেক সময় শাসকরা সাধারণ জনগণের বাস্তব অবস্থা ও অনুভূতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। চাটুকারদের পরিবেষ্টিত থাকার কারণে তারা মাঠপর্যায়ের সঠিক তথ্য পান না, যা তাদের পতনের কারণ হয়।

মোদ্দাকথা, ক্ষমতা অর্জন হলো একটি সাময়িক যুদ্ধ জয়, আর ক্ষমতা টিকিয়ে রাখা হলো প্রতিদিনের একটি চলমান সংগ্রাম।

একটি আদর্শ, উন্নত ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হলে সুস্থ ধারার রাজনীতি অপরিহার্য। রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছা, জনগণের সচেতনতা এবং দেশপ্রেমের মাধ্যমেই কেবল একটি সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা সম্ভব।

আমাদের মনে রাখতে হবে, দেশের সার্বিক কল্যাণ, স্থিতিশীলতা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য সুস্থ রাজনীতির কোনো বিকল্প নেই।

একটি দেশের শাসনভার, সমাজের নেতৃত্ব বা কোনো প্রতিষ্ঠানের শীর্ষস্থান অর্জন করতে বছরের পর বছর কঠোর পরিশ্রম, নিখুঁত পরিকল্পনা, ত্যাগ এবং কৌশলের প্রয়োজন হয়।

অথচ একটি মাত্র ভুল সিদ্ধান্ত, আকস্মিক গণ-অভ্যুত্থান, বা প্রাকৃতিক নিয়মে মুহূর্তের মধ্যেই সেই ক্ষমতার তাসের ঘর ভেঙে পড়তে পারে।

সাধারণ মানুষের আস্থা ও ভালোবাসা অর্জন করতে দীর্ঘ সময় ধরে জনকল্যাণমূলক কাজ করতে হয়। কিন্তু শাসক বা নেতার অহংকার, দুর্নীতি, অত্যাচার বা চরম উদাসীনতার কারণে জনগণের সেই ক্ষোভ যখন জমাট বাঁধে, তখন একটি স্ফুলিঙ্গই পুরো ক্ষমতার ভিত্তিকে পুড়িয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট হয়।

‘ক্ষমতা অর্জনের চেয়ে ক্ষমতা রক্ষা করা কঠিন’ – এ কথাটি চিরন্তন সত্য; কারণ ক্ষমতা পাওয়ার জন্য শুধু সাময়িক শক্তি বা কৌশল লাগে, কিন্তু তা টিকিয়ে রাখতে নীতি, জনগণের আস্থা ও সঠিক ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন হয়।

ইতিহাস সাক্ষী, বহু বছরের একনায়কতন্ত্র মাত্র কয়েকদিনের গণআন্দোলনে খড়কুটোর মতো ভেসে গেছে।

রাজনীতিতে টিকে থাকতে হলে প্রতিটি ছোট পদক্ষেপ, ক্ষুদ্রতম প্রতিপক্ষ এবং জনগণের সাধারণ দাবিকেও অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখা উচিত। তা না হলে, সামান্য একটি ‘পঁচা শামুক’ই পুরো রাজনৈতিক ক্যারিয়ার বা দলের বড় বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

ক্ষমতা কোনো হঠাৎ পাওয়া বস্তু নয়; এটি দীর্ঘদিনের পরিশ্রম, ধৈর্য, কৌশল এবং ধারাবাহিক চেষ্টার ফসল। তৃণমূল পর্যায় থেকে শুরু করে নীতি নির্ধারণী পর্যায় পর্যন্ত সব স্তরে সতর্ক ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করলেই কেবল এ ধরনের অপ্রত্যাশিত রাজনৈতিক ক্ষতি বা সংকট এড়ানো সম্ভব।

আর বর্তমান তরুণ নেতৃত্ব বা এনসিপি চাইলে ভিন্ন এক বৈপ্লবিক ইতিহাস গড়তে পারে। তবে শুধু রাজনৈতিক ট্যাগিং করে, অন্যকে খাটো করে রাজনৈতিক বাস্তবতা এড়ানো বা বদলানো যায় না। দরকার পরিণত নেতৃত্ব – যাঁরা আবেগ নয়, বাস্তবতা দিয়ে নিজেদের কাজকর্মকে এগিয়ে নিতে পারবেন।

এখানে একটা জিনিস মাথায় রাখা উচিত, এনসিপি জাতীয় পর্যায়ে রাজনীতিতে নেমেছে। এ ক্ষেত্রে বারবার ভুল করার কোনো সুযোগ এখানে নেই। তাই এনসিপি জাসদের মতো সহিংস পথে না গিয়ে শান্তিপূর্ণ সংস্কারের পথে হাঁটুক।

একটি আদর্শ, উন্নত ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হলে সুস্থ ধারার রাজনীতি অপরিহার্য। রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছা, জনগণের সচেতনতা এবং দেশপ্রেমের মাধ্যমেই কেবল একটি সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা সম্ভব।

আমাদের মনে রাখতে হবে, দেশের সার্বিক কল্যাণ, স্থিতিশীলতা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য সুস্থ রাজনীতির কোনো বিকল্প নেই।

কেননা, আকাশের সূর্য যেমন ভোর থেকে আস্তে আস্তে অনেক সময় নিয়ে মধ্যগগনে ওঠে, কিন্তু বিকেল গড়ালেই দ্রুত দিগন্তে হারিয়ে যায়—ক্ষমতার প্রকৃতিও ঠিক তেমন, যা রাজনীতি, সমাজ এবং মানব জীবনের একটি চিরন্তন সত্যকে প্রকাশ করে।

লেখক: সহযোগী সম্পাদক, আজকের সূর্যোদয়, ঢাকা।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

ক্ষমতার সূর্য: উদয় দীর্ঘ, অস্ত নিমেষে

আপডেট টাইম : ১২:৫৭:৪২ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২ অগাস্ট ২০২৬

জাতীয় নাগরিক পার্টি – এনসিপির ‘জুলাই পদযাত্রা’ মূলত ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষ্যে দেশব্যাপী একটি রাজনৈতিক জনসংযোগ কর্মসূচি। তবে এই কর্মসূচিকে ঘিরে দেশের বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক বিরোধ ও সহিংসতার ঘটনা ঘটছে।

তারুণ্যের শক্তি এবং উদ্দীপনা ইতিবাচক পরিবর্তনের চালিকাশক্তি হতে পারে, তবে তা কোনোভাবেই ধ্বংসাত্মক রূপ গ্রহণযোগ্য নয়। ‘জুলাই পদযাত্রা’ কর্মসূচি অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে রূপ পাচ্ছে। দলটি তরুণ-প্রজন্মের আবেগ ও আন্দোলনকে ব্যবহার করে নিজেদের স্বার্থে দেশের রাজনীতিকে বিপজ্জনক বা অস্থিতিশীল পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

‘২৪-এর জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মূল চালিকাশক্তি ছিল তরুণ সমাজ ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা। আন্দোলন-পরবর্তী সময়ে গঠিত এনসিপি নিজেকে ‘তরুণদের দল’ বা ‘জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা’ ধারণকারী দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। বিশ্লেষকদের মতে, দলটির শীর্ষ নেতারা তরুণদের সেই ত্যাগের আবেগ ও নৈতিক কর্তৃত্বকে রাজনৈতিক ঢাল বা মূল ‘পুঁজি’ হিসেবে ব্যবহার করছেন।

ক্ষমতার চিরাচরিত রাজনৈতিক দলগুলোর বিশেষ করে ক্ষমতাসীন বিএনপির সঙ্গে এনসিপির মাঠ পর্যায়ের দ্বন্দ্ব এবং দেশের বিভিন্ন জেলায় তাদের পদযাত্রা বা সফরকে কেন্দ্র করে সহিংস সংঘাতের ঘটনা দেশকে অস্থিতিশীল করে তুলছে। অনেকের অভিযোগ, রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা বা দীর্ঘস্থায়ী সাংগঠনিক কাঠামো ছাড়াই দলটি প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর বিরুদ্ধে উগ্র বা মারমুখী অবস্থান নিচ্ছে, যা দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য এক ‘ভয়ঙ্কর খেলা’ বা বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করছে।

এনসিপির বিরুদ্ধে বড় অভিযোগ উঠছে, যে তরুণরা বৈষম্যহীন ও প্রগতিশীল নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিল, তাদের আবেগকে পুঁজি করে বিপথগামী রাজনৈতিক ক্ষমতার অংশীদার হওয়া তরুণদের সাথে এক ধরনের প্রতারণা।

তরুণদের আবেগকে হাতিয়ার বানিয়ে এনসিপি এমন কিছু রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও সংঘাতের পথ বেছে নিচ্ছে, যা দেশের ভবিষ্যৎ ও স্থিতিশীলতাকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে।

এ বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠছে, বর্তমান তরুণ নেতৃত্ব কি শৃঙ্খলা ও দায়িত্বশীলতার বার্তা দিতে পারছেন? নাকি তাঁরা জনগণের আস্থা হারিয়ে ফেলছেন? যদি এই অস্থিরতা চলতে থাকে, মানুষ আবারও কোনো বিকল্প স্থিতিশীল নেতৃত্বের দিকে তাকাবে।

সমাজবিজ্ঞানী পিয়েরে বুর্দিয়ো বলেছিলেন, সমাজের বাস্তবতা না বুঝে যারা কেবল বড় বড় কথা বলে, তারা একধরনের জোর করে চাপিয়ে দেওয়া রাজনীতি করে।

এনসিপির চলমান ‘জুলাই পদযাত্রা’ কর্মসূচিতে দলটির নেতাদের বিভিন্ন বক্তব্য এবং এর পরিপ্রেক্ষিতে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক উত্তেজনাকে মূলত তিনটি ভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিচার-বিশ্লেষণ করা যায়।

এনসিপি তাদের নিজস্ব অবস্থান ও যুক্তি দাঁড় করিয়েছে। দলটির শীর্ষ নেতারা তাদের বক্তব্যকে ‘উস্কানিমূলক’ নয়, বরং সমাজ সংস্কার ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান হিসেবে দেখছেন।

হবিগঞ্জের পদযাত্রায় এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসিরউদ্দিন পাটোয়ারী স্থানীয় অপরাধ ও মাদক চোরাচালানের বিরুদ্ধে কথা বলেন। একে তারা কোনো দলের বিরুদ্ধে উস্কানি নয়, বরং একটি জনকল্যাণমূলক রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে দাবি করেছেন।

দলের নেতারা মনে করেন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় স্বাধীনভাবে নিজের মতামত ও সমালোচনা প্রকাশ করার পূর্ণ অধিকার তাদের রয়েছে এবং রাজনৈতিক বক্তব্যকে সহিংসতা দিয়ে দমন করা ফ্যাসিবাদেরই ধারাবাহিকতা।

এদিকে বিএনপি এবং এর সহযোগী সংগঠন ছাত্রদল ও যুবদলের স্থানীয় নেতারা এনসিপি নেতাদের বক্তব্যকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও উস্কানিমূলক বলে অভিহিত করেছেন।

ছাত্রদলের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে যে, এনসিপির নেতারা রাজনৈতিক শিষ্টাচার লঙ্ঘন করছেন। দেশের বিভিন্ন শান্ত এলাকা বা জনপদে গিয়ে অন্য রাজনৈতিক দলের নেতাদের লক্ষ্য করে আক্রমণাত্মক ও অশালীন মন্তব্য এবং চরিত্রহরণ করছেন। এসব দেশ বিশৃঙ্খলের পায়তারা বৈ কিছু নয়।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষণ বলছে, কিশোরগঞ্জে সুস্থ ধারার রাজনীতির পরিপন্থী যেসব বক্তব্য তা স্থানীয় কর্মী-সমর্থকদের উসকে দেয় এবং এর ফলেই হবিগঞ্জে অনাকাঙ্ক্ষিত গণ-অসন্তোষ বা সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। দলটি যেখানেই যায় বিশৃঙ্খলা বাধায়।

সুশীল সমাজ এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতিটি হবে তারেক রহমান সরকারের জন্য নতুন বাংলাদেশ গঠনে একটি বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা।

তবে একথা শিরোধার্য যে, বক্তব্যের জবাব রাজনৈতিকভাবে হওয়া উচিত। ১১-দলীয় জোটসহ বিভিন্ন নিরপেক্ষ রাজনৈতিক দলগুলো স্পষ্ট করেছে যে, এনসিপির কোনো বক্তব্য যদি উস্কানিমূলক বা বিতর্কিত মনেও হয়, তার জবাব দেওয়া উচিত রাজনৈতিকভাবে, সহিংসতা বা কোনো ধরনের আক্রমণের মাধ্যমে নয়।

কেননা, উস্কানিমূলক বক্তব্য এবং তার জেরে হামলার ঘটনা—উভয়ই দেশে গণতান্ত্রিক সহনশীলতা ও জননিরাপত্তার জন্য ক্ষতিকর। এটি রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহনশীলতার অভাবকে স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তোলে।

সবমিলিয়ে, এই বক্তব্যগুলোকে একদিকে নতুন দলের আত্মপ্রকাশকালীন আগ্রাসী রাজনৈতিক প্রচার হিসেবে দেখা যায়; আবার অন্যদিকে প্রতিষ্ঠিত দলগুলোর একচেটিয়া প্রভাবের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ হিসেবেও মূল্যায়ন করা যায়। তবে যেকোনো বক্তব্যকে ঘিরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি বা সহিংসতা প্রতিরোধে প্রশাসন ও দলগুলোর দায়িত্বশীল আচরণই শ্রেয়।

তবে এটাও অনস্বীকার্য যে, এনসিপি ‘জুলাই পদযাত্রা’ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে উদ্ভূত রাজনৈতিক উত্তেজনা, সম্ভাব্য উস্কানিমূলক বক্তব্য ও ‘অলটারনেটিভ ফ্যাক্টস’ বা ‘বিকল্প তথ্য’ প্রচারের পরিপ্রেক্ষিতে শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখা সরকারেরও গুরু দায়িত্ব। তন্মধ্যে প্রধান দায়িত্ব হলো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ ও সব রাজনৈতিক দলের গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত করা।

এহেন পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় সরকারের করণীয় পদক্ষেপ হতে পারে:

১. রাজনৈতিক উত্তেজনাপ্রবণ এলাকাগুলোতে পুলিশের পাশাপাশি বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন রাখা।

২. উস্কানিমূলক বক্তব্য বা গুজব ছড়িয়ে যেন কেউ কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে না পারে, সেজন্য গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানো।

৩. জরুরি নিষেধাজ্ঞা প্রয়োগ অর্থাৎ পরিস্থিতি বেশি সহিংস রূপ নিলে স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে ১৪৪ ধারা বা প্রয়োজনীয় আইনি নিষেধাজ্ঞা জারি করে জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

৪. যেকোনো পক্ষের ওপর হামলা বা ভাঙচুরের ঘটনার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে অপরাধীদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও আইনের আওতায় আনা।

৫. মাঠ পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে ও পেশাদারিত্বের সাথে দায়িত্ব পালন করতে নির্দেশ দেওয়া।

৬. ‘রাজনৈতিক বক্তব্যের জবাব রাজনৈতিকভাবেই দেওয়া উচিত, কোনো ধরনের সহিংসতার মাধ্যমে নয়’—এই গণতান্ত্রিক নীতি বজায় রেখে শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনের সুযোগ দেওয়া।

৭. উস্কানিমূলক ও মানহানিকর বক্তব্য পরিহার করার জন্য দেশের সকল রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃত্বকে সংযত থাকার এবং কর্মীদের নিয়ন্ত্রণ করার আহ্বান জানানো।

সরকারের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত একটি বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ বজায় রাখা, যেখানে কোনো উস্কানি বা আক্রমণ দেশের সার্বিক স্থিতিশীলতাকে বিনষ্ট করতে না পারে।

ইতিহাস শিক্ষা দেয়, একটি জাতিকে ধ্বংস করতে যুদ্ধের দরকার নেই, শুধু নোংরা রাজনীতি চালিয়ে যাওয়াই যথেষ্ট।

একটি জাতিকে ধ্বংস করার জন্য প্রথাগত যুদ্ধ বা বোমাবর্ষণের প্রয়োজন হয় না, বরং দীর্ঘমেয়াদী নোংরা রাজনীতি বা কলুষিত রাজনৈতিক সংস্কৃতি একটি সমাজকে ভেতর থেকে সম্পূর্ণ পঙ্গু করে দিতে পারে। যুদ্ধ কেবল অবকাঠামো ও মানুষের জীবন কেড়ে নেয়; কিন্তু নোংরা রাজনীতি একটি জাতির নৈতিকতা, বিচারব্যবস্থা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে দেয়, যা এনসিপির মধ্যে প্রতিফলিত।

যুদ্ধ একটি জাতিকে সাময়িকভাবে পঙ্গু করলেও জাতীয় চেতনাকে পুনরুজ্জীবিত করতে পারে। যেমন—দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাপান বা জার্মানি। কিন্তু নোংরা রাজনীতি একটি জাতির আত্মাকে মেরে ফেলে। এটি যখন কোনো সমাজে স্থায়ী রূপ নেয়, তখন সেই জাতি মানচিত্র ও পতাকাসহ টিকে থাকলেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি মৃত, মেরুদণ্ডহীন এবং পরনির্ভরশীল জাতিতে পরিণত হয়।

অতিশয় উদ্বেগের সাথে লক্ষ করা যাচ্ছে, তরুণ নেতৃত্ব বা এনসিপি আদর্শিক রাজনীতির বদলে ক্ষমতার লোভ ও পেশিশক্তির চর্চায় জড়িয়ে পড়ছেন। অথচ জনগণ ভুল করলে ক্ষমা হয়, কিন্তু রাজনীতিক ভুল করলে জাতি তার মূল্য চুকায়।

এনসিপির উচিত জাতীয় সম্পদ রক্ষা এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা বিঘ্নিত না করা। নেতৃত্বের বিকাশে বিশৃঙ্খলা এড়িয়ে সুশৃঙ্খল উপায়ে দায়িত্বশীল ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব গড়ে তোলা।

রাজনীতি একটি রাষ্ট্রের চালিকা শক্তি, যা জনগণের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলে। সঠিক নেতৃত্ব, নীতিনৈতিকতা ও গণতান্ত্রিক মানসিকতা ছাড়া একটি জাতি এগিয়ে যেতে পারে না। তবে দুর্ভাগ্যজনকভাবে এ দেশে অনেক সময় রাজনীতি হয়ে উঠছে স্বেচ্ছাচারিতা, স্বার্থপরতা, দুর্নীতি আর ক্ষমতার খেলা।

একজন রাজনীতিবিদ হলেন তিনি, যিনি পরবর্তী নির্বাচনের কথা ভাবেন; একজন রাষ্ট্রনায়ক হলেন তিনি, যিনি পরবর্তী প্রজন্মের কথা ভাবেন। রাজনীতির আসল পরীক্ষা হয় ক্ষমতা পাওয়ার পর, আদর্শ ধরে রাখতে পারলে তবেই নেতা হওয়া যায়।

একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের প্রাণশক্তি হলো তার রাজনীতি। রাজনীতি কেবল ক্ষমতা অর্জনের হাতিয়ার নয়, বরং তা সমাজ বিনির্মাণ, জনগণের অধিকার নিশ্চিতকরণ এবং সামগ্রিক দেশ গঠনের সুনির্দিষ্ট পথরেখা। যেকোনো দেশের টেকসই উন্নয়ন, শান্তি ও স্থিতিশীলতা নির্ভর করে সেখানে কেমন রাজনৈতিক সংস্কৃতি বিদ্যমান রয়েছে তার ওপর। রাষ্ট্র গঠন ও তার অগ্রযাত্রায় সুস্থ ধারার রাজনীতির কোনো বিকল্প নেই।

সুস্থ রাজনীতি বলতে বোঝায় জনকল্যাণমুখী, নীতি-আদর্শভিত্তিক, পরমতসহিষ্ণুতা এবং আইন ও সংবিধানের প্রতি শ্রদ্ধাশীল রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড – যেখানে ব্যক্তিগত বা দলীয় স্বার্থের চেয়ে দেশের স্বার্থকে সবার আগে স্থান দেওয়া হয়। হিংসা, জনভোগান্তি, দুর্নীতি এবং পেশিশক্তির ব্যবহারমুক্ত হয়ে যখন সুস্থ প্রতিযোগিতা, জবাবদিহিতা এবং স্বচ্ছতার ভিত্তিতে রাজনৈতিক চর্চা পরিচালিত হয়, তবেই সুস্থ রাজনীতি বলা যায়।

টেকসই অর্থনীতি ও উন্নয়নে সুস্থ রাজনৈতিক পরিবেশ দেশের ভেতর দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করে। সঠিক অর্থনৈতিক পলিসি তৈরি এবং তা বাস্তবায়নের জন্য একটি স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ প্রয়োজন।দুর্নীতিমুক্ত এবং জনকল্যাণমূলক রাজনীতি থাকলে রাষ্ট্রীয় সম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত হয়, যা একটি দেশের অর্থনৈতিক ভিত মজবুত করে।

গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের বিকাশের ক্ষেত্রে সুস্থ রাজনীতি গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়। এটি নাগরিকদের বাকস্বাধীনতা, ভোটাধিকার এবং মৌলিক মানবাধিকারের নিশ্চয়তা প্রদান করে। শক্তিশালী বিরোধী দল এবং সুস্থ রাজনৈতিক চর্চার মাধ্যমে ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় থাকে।

রাজনীতি যখন ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে ওঠে, তখন বিচার বিভাগ ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাসমূহ স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে। ফলে সমাজে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা পায়, অপরাধ প্রবণতা কমে এবং সাধারণ নাগরিকরা ন্যায়বিচার ভোগ করতে পারে।

নোংরা ও কলুষিত রাজনীতি তরুণ সমাজকে রাজনীতিবিমুখ করে তোলে। অন্যদিকে, রাজনৈতিক পরিবেশ যদি সুস্থ ও আদর্শভিত্তিক হয়, তবে দেশের সৎ, যোগ্য ও উচ্চশিক্ষিত তরুণরা দেশ গঠনে এগিয়ে আসে। এটি ভবিষ্যতে দেশকে সঠিক নেতৃত্ব দেওয়ার পথ সুগম করে।

একটি দেশের সমাজব্যবস্থায় বিভিন্ন ধর্ম, বর্ণ ও শ্রেণির মানুষ বাস করে। সুস্থ রাজনীতি সমাজে বিভাজন না বাড়িয়ে বৈষম্যহীন সমাজ গঠনে কাজ করে। এটি ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান কমিয়ে একটি সমতাভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনে সাহায্য করে।

কিন্তু রাজনীতিতে যখন সুস্থ ধারা হারিয়ে যায়, তখন সমাজে বিশৃঙ্খলা, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি এবং প্রতিহিংসার রাজনীতি জেঁকে বসে। হরতাল, সহিংসতা এবং পেশিশক্তির প্রদর্শন সাধারণ মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করে তোলে। এতে যুবসমাজ বিপথগামী হয় এবং দেশের মেধাবী সম্পদ পাচার হয়ে যায়। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা মুখ ফিরিয়ে নেয়, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে দেশের অর্থনীতির ওপর।

সুস্থ রাজনৈতিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার উপায় হিসেবে দেশকে সঠিক পথে এগিয়ে নিতে হলে সুস্থ রাজনীতির পুনর্জাগরণ জরুরি। এর জন্য কিছু কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন:

১. রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের চর্চা নিশ্চিত করা।

২. ব্যক্তি বা দলীয় স্বার্থের চেয়ে দেশপ্রেমকে অগ্রাধিকার দেওয়া।

৩. রাজনীতিকে কালো টাকা ও পেশিশক্তির প্রভাব থেকে মুক্ত করা।

৪. নির্বাচনী ব্যবস্থা ও নির্বাচন কমিশনকে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও বিতর্কাতীত করা।

৫. পরমতসহিষ্ণুতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের সংস্কৃতি চালু করা।

ক্ষমতাসীন হওয়ার চেয়ে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখা কঠিন—এটি রাষ্ট্রবিজ্ঞান এবং ইতিহাসের একটি চিরন্তন সত্য। কোনো বিশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতি, গণ-আন্দোলন বা বিপ্লবের তরঙ্গে চড়ে ক্ষমতা অর্জন করা সম্ভব হলেও দীর্ঘমেয়াদে সেই ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য বহুমুখী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়। তা হলো:

১. জনগণের আকাশচুম্বী প্রত্যাশা ক্ষমতা পাওয়ার আগে দলগুলো বড় বড় প্রতিশ্রুতি দেয়। ক্ষমতায় আসার পর জনগণ দ্রুত সেগুলোর বাস্তবায়ন দেখতে চায়। অর্থনৈতিক সংকট বা সীমিত সম্পদের কারণে সব প্রতিশ্রুতি পূরণ করা অসম্ভব হয়ে পড়ে, যা দ্রুত জনঅসন্তোষ তৈরি করে।

২. প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ শুধু শাসনভার নিলেই দেশ চালানো যায় না; আমলাতন্ত্র, পুলিশ ও বিচার বিভাগকে নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং তাদের কর্মক্ষম রাখা অত্যন্ত জটিল। প্রশাসনের অভ্যন্তরে থাকা ভিন্ন মতাদর্শী বা দুর্নীতিগ্রস্ত চক্রকে সামলানো বড় চ্যালেঞ্জ।

৩. অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও শক্তির ভারসাম্যে ক্ষমতা অর্জনের লড়াইয়ে অনেক দল বা গোষ্ঠী এক জোট হতে পারে। ক্ষমতা পাওয়ার পর ভাগাভাগি, পদ-পদবি এবং স্বার্থের দ্বন্দ্বে সেই জোট বা দলের ভেতরেই ভাঙন ও উপদলীয় কোন্দল শুরু হয়।

৪. অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় মুদ্রাস্ফীতি, বেকারত্ব, রাজস্ব ঘাটতি এবং বৈদেশিক ঋণের মতো জটিল অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা করা যেকোনো সরকারের জন্য সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা। অর্থনীতি ব্যর্থ হলে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ সরাসরি সরকারের ওপর গিয়ে পড়ে।

৫. বিরোধী দল ও ভূ-রাজনীতিতে ক্ষমতাচ্যুত বা বিরোধী শক্তি সবসময় সরকারের ভুলত্রুটি খুঁজে তা জনসমক্ষে এনে আন্দোলন গড়ে তোলার চেষ্টা করে। এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক চাপ, বিদেশি শক্তির হস্তক্ষেপ এবং আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতি সরকারের ওপর প্রতিনিয়ত চাপ সৃষ্টি করে।

৬. দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকলে অতি-আত্মবিশ্বাস অনেক সময় শাসকরা সাধারণ জনগণের বাস্তব অবস্থা ও অনুভূতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। চাটুকারদের পরিবেষ্টিত থাকার কারণে তারা মাঠপর্যায়ের সঠিক তথ্য পান না, যা তাদের পতনের কারণ হয়।

মোদ্দাকথা, ক্ষমতা অর্জন হলো একটি সাময়িক যুদ্ধ জয়, আর ক্ষমতা টিকিয়ে রাখা হলো প্রতিদিনের একটি চলমান সংগ্রাম।

একটি আদর্শ, উন্নত ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হলে সুস্থ ধারার রাজনীতি অপরিহার্য। রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছা, জনগণের সচেতনতা এবং দেশপ্রেমের মাধ্যমেই কেবল একটি সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা সম্ভব।

আমাদের মনে রাখতে হবে, দেশের সার্বিক কল্যাণ, স্থিতিশীলতা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য সুস্থ রাজনীতির কোনো বিকল্প নেই।

একটি দেশের শাসনভার, সমাজের নেতৃত্ব বা কোনো প্রতিষ্ঠানের শীর্ষস্থান অর্জন করতে বছরের পর বছর কঠোর পরিশ্রম, নিখুঁত পরিকল্পনা, ত্যাগ এবং কৌশলের প্রয়োজন হয়।

অথচ একটি মাত্র ভুল সিদ্ধান্ত, আকস্মিক গণ-অভ্যুত্থান, বা প্রাকৃতিক নিয়মে মুহূর্তের মধ্যেই সেই ক্ষমতার তাসের ঘর ভেঙে পড়তে পারে।

সাধারণ মানুষের আস্থা ও ভালোবাসা অর্জন করতে দীর্ঘ সময় ধরে জনকল্যাণমূলক কাজ করতে হয়। কিন্তু শাসক বা নেতার অহংকার, দুর্নীতি, অত্যাচার বা চরম উদাসীনতার কারণে জনগণের সেই ক্ষোভ যখন জমাট বাঁধে, তখন একটি স্ফুলিঙ্গই পুরো ক্ষমতার ভিত্তিকে পুড়িয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট হয়।

‘ক্ষমতা অর্জনের চেয়ে ক্ষমতা রক্ষা করা কঠিন’ – এ কথাটি চিরন্তন সত্য; কারণ ক্ষমতা পাওয়ার জন্য শুধু সাময়িক শক্তি বা কৌশল লাগে, কিন্তু তা টিকিয়ে রাখতে নীতি, জনগণের আস্থা ও সঠিক ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন হয়।

ইতিহাস সাক্ষী, বহু বছরের একনায়কতন্ত্র মাত্র কয়েকদিনের গণআন্দোলনে খড়কুটোর মতো ভেসে গেছে।

রাজনীতিতে টিকে থাকতে হলে প্রতিটি ছোট পদক্ষেপ, ক্ষুদ্রতম প্রতিপক্ষ এবং জনগণের সাধারণ দাবিকেও অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখা উচিত। তা না হলে, সামান্য একটি ‘পঁচা শামুক’ই পুরো রাজনৈতিক ক্যারিয়ার বা দলের বড় বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

ক্ষমতা কোনো হঠাৎ পাওয়া বস্তু নয়; এটি দীর্ঘদিনের পরিশ্রম, ধৈর্য, কৌশল এবং ধারাবাহিক চেষ্টার ফসল। তৃণমূল পর্যায় থেকে শুরু করে নীতি নির্ধারণী পর্যায় পর্যন্ত সব স্তরে সতর্ক ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করলেই কেবল এ ধরনের অপ্রত্যাশিত রাজনৈতিক ক্ষতি বা সংকট এড়ানো সম্ভব।

আর বর্তমান তরুণ নেতৃত্ব বা এনসিপি চাইলে ভিন্ন এক বৈপ্লবিক ইতিহাস গড়তে পারে। তবে শুধু রাজনৈতিক ট্যাগিং করে, অন্যকে খাটো করে রাজনৈতিক বাস্তবতা এড়ানো বা বদলানো যায় না। দরকার পরিণত নেতৃত্ব – যাঁরা আবেগ নয়, বাস্তবতা দিয়ে নিজেদের কাজকর্মকে এগিয়ে নিতে পারবেন।

এখানে একটা জিনিস মাথায় রাখা উচিত, এনসিপি জাতীয় পর্যায়ে রাজনীতিতে নেমেছে। এ ক্ষেত্রে বারবার ভুল করার কোনো সুযোগ এখানে নেই। তাই এনসিপি জাসদের মতো সহিংস পথে না গিয়ে শান্তিপূর্ণ সংস্কারের পথে হাঁটুক।

একটি আদর্শ, উন্নত ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হলে সুস্থ ধারার রাজনীতি অপরিহার্য। রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছা, জনগণের সচেতনতা এবং দেশপ্রেমের মাধ্যমেই কেবল একটি সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা সম্ভব।

আমাদের মনে রাখতে হবে, দেশের সার্বিক কল্যাণ, স্থিতিশীলতা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য সুস্থ রাজনীতির কোনো বিকল্প নেই।

কেননা, আকাশের সূর্য যেমন ভোর থেকে আস্তে আস্তে অনেক সময় নিয়ে মধ্যগগনে ওঠে, কিন্তু বিকেল গড়ালেই দ্রুত দিগন্তে হারিয়ে যায়—ক্ষমতার প্রকৃতিও ঠিক তেমন, যা রাজনীতি, সমাজ এবং মানব জীবনের একটি চিরন্তন সত্যকে প্রকাশ করে।

লেখক: সহযোগী সম্পাদক, আজকের সূর্যোদয়, ঢাকা।