ঢাকা ১১:৫৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৮ অগাস্ট ২০২৬, ৩ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সরকারের প্রথম ছয় মাস : পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি ও ক্ষমতার বাস্তবতা

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১১:০৩:৪৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৮ অগাস্ট ২০২৬
  • ২ বার

তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের প্রথম ছয় মাস পূর্ণ হয়েছে। মাত্র ছয় মাসে কোনো সরকারের পূর্ণাঙ্গ বিচার করা স্বাভাবিকভাবেই কঠিন। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই ছয় মাসকে সাধারণ ছয় মাস হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ, এই সরকার এসেছে একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান, অন্তর্বর্তী শাসন এবং একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের পর। ফলে বিএনপি শুধু সরকার গঠন করেনি; একই সঙ্গে তাকে একটি পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতার অর্থও নির্ধারণ করতে হচ্ছে।

১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর নির্বাচনে বিএনপি বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে এবং ১৭ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বিএনপির এই বিজয়কে ‘landslide’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। ফলে সরকার শুরু থেকেই একটি শক্তিশালী  ম্যান্ডেট পেয়েছে। কিন্তু এই ম্যান্ডেটের সঙ্গে প্রত্যাশার মাত্রাটিও ছিল অত্যন্ত উঁচু। মানুষ কেবল সরকার পরিবর্তন চায়নি; চেয়েছে শাসনের ধরন পরিবর্তন। রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান যেন কোনো দলের সম্পত্তি না হয়, প্রশাসন যেন দলীয় আনুগত্যের বদলে যোগ্যতার ভিত্তিতে চলে, বিচার যেন প্রতিশোধের হাতিয়ার না হয়, বাজার যেন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে না যায় এবং রাষ্ট্র যেন নাগরিকের দৈনন্দিন জীবনে কার্যকর হয়ে ওঠে এই প্রত্যাশাগুলোই মূলত নতুন সরকারের রাজনৈতিক পরীক্ষার ভিত্তি।

এই অর্থে প্রথম ছয় মাসের মূল্যায়ন করলে বিএনপি সরকারের সামনে একই সঙ্গে কিছু ইতিবাচক অর্জন এবং কয়েকটি গুরুতর প্রশ্ন স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

১. বৈধতা অর্জনের পর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা : কিন্তু কর্তৃত্ব কি প্রাতিষ্ঠানিক হবে?

দীর্ঘদিনের বিরোধী রাজনীতি থেকে সরাসরি রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে ফিরে আসা বিএনপির জন্য নিঃসন্দেহে একটি বড় রাজনৈতিক অর্জন। তারেক রহমানের নেতৃত্বে দলটি নির্বাচনে শক্তিশালী ম্যান্ডেট পেয়েছে এবং  দ্রুত রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছে। সরকারের ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনাতে আইনশৃঙ্খলা, দ্রব্যমূল্য, বিদ্যুৎ-জ্বালানি, দুর্নীতি ও প্রশাসনিক কার্যকারিতাকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়।
কিন্তু এখানেই প্রথম বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের মানুষের  প্রত্যাশা ছিল ক্ষমতার সংস্কৃতি বদলাবে। অতএব বিএনপির জন্য প্রশ্নটি  হলোÑ ক্ষমতা ব্যবহারের ধরন বদলেছে কি না। প্রথম ছয় মাসে সরকারের রাজনৈতিক ভাষা অন্তত আনুষ্ঠানিকভাবে প্রাতিষ্ঠানিকতার দিকে। প্রধানমন্ত্রী সংসদে বিরোধী দলের সঙ্গে সংলাপ ও সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা একটি সরকারকে খুব সহজেই সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী বা majoritarian রাজনীতির দিকে নিয়ে যেতে পারে। কিন্তু গণতন্ত্র শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন নয়; সংখ্যাগরিষ্ঠতার মধ্যেও সংখ্যালঘু রাজনৈতিক মত, বিরোধী দল এবং স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর জায়গা থাকতে হয়। তাই আগামী দিনের প্রকৃত পরীক্ষা হবে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, বিরোধী দলের রাজনৈতিক পরিসর এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বায়ত্তশাসন। প্রথম ছয় মাসে বিএনপি নির্বাচনী বৈধতা থেকে কার্যকর রাজনৈতিক কর্তৃত্বে সফলভাবে উত্তরণ করেছে; কিন্তু সেই কর্তৃত্ব কতটা জবাবদিহিমূলক প্রাতিষ্ঠানিকতায় রূপ নেয়, সেটিই সরকারের ভবিষ্যৎ চরিত্র নির্ধারণ করবে।

২. সবচেয়ে বড় পরীক্ষা আসলে বিএনপি তারেক রহমানের সরকারের দ্বিতীয় এবং সম্ভবত সবচেয়ে গভীর রাজনৈতিক পরীক্ষাটি হলো- বিএনপি নিজে কতটা বদলেছে। দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থাকার পর বিএনপি যে রাজনৈতিক ভাষা নিয়ে নির্বাচনে এসেছে, তার মধ্যে দুর্নীতিবিরোধিতা, রাষ্ট্রীয় সংস্কার, প্রশাসনিক দক্ষতা, সামাজিক সুরক্ষা এবং রাজনৈতিক সহনশীলতার প্রতিশ্রুতি ছিল। তারেক রহমান নিজেও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা বলেছেন। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে  প্রতিশ্রুতির অভাব কখনো ছিল না। সমস্যা হলো প্রতিশ্রুতি এবং ক্ষমতা ব্যবস্থাপনার মধ্যকার ব্যবধান।

এই জায়গাতেই বিএনপির পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির সঙ্গে নতুন রাষ্ট্রীয় প্রতিশ্রুতির সঙ্ঘাত দেখা দিতে পারে। দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা দলের নেতাকর্মীরা যখন রাষ্ট্রক্ষমতার কাছে চলে আসে, তখন রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা, ব্যবসায়িক স্বার্থ, স্থানীয় আধিপত্য এবং প্রশাসনিক প্রভাবে  পুরোনো সম্পর্ক নতুন করে সক্রিয় হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

এটি কেবল বিএনপির সমস্যা নয়। বাংলাদেশের দলীয় রাজনীতির কাঠামোগত সমস্যা এটি। তবে বিএনপি যেহেতু পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছে, তাই তার দায়ও বেশি। তারেক রহমান নিজেও অতীতে বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও দখলের অভিযোগের কথা স্বীকার করে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলেছেন। এখানে তারেক রহমানের ব্যক্তিগত নেতৃত্বের গুরুত্ব অনেক। তাকে একই সঙ্গে দুটি কাজ করতে হবে- ক. দলের পুরোনো শক্তিকে ধরে রাখা। খ.  নতুন প্রজন্মের কাছে বিএনপিকে একটি নতুন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।

প্রথম কাজটি তুলনামূলক সহজ; দ্বিতীয়টি কঠিন। সুতরাং ছয় মাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখনো অমীমাংসিত : তারেক রহমান কি শুধু বিএনপিকে ক্ষমতায় ফিরিয়েছেন, নাকি বিএনপির রাজনৈতিক সংস্কৃতিও বদলাতে শুরু করেছেন? এখন পর্যন্ত পরিবর্তনের কিছু ইঙ্গিত আছে; কিন্তু তাকে মৌলিক রাজনৈতিক রূপান্তর বলা কঠিন।

৩. জুলাই অভ্যুত্থানের ম্যান্ডেট বনাম ক্ষমতার পুরোনো কাঠামো
তারেক রহমান সরকারের বড় ঐতিহাসিক দায় হলো ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের রাজনৈতিক আকাক্সক্ষাকে সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়া। ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে জুলাই জাতীয় সনদের সাংবিধানিক সংস্কার নিয়ে গণভোটও অনুষ্ঠিত হয়েছে। সনদে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিতকরণ, রাষ্ট্রপতির কিছু ক্ষমতা বৃদ্ধি, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, বিরোধী দলের সংসদীয় ভূমিকা এবং মৌলিক অধিকারের মতো একাধিক সংস্কারের কথা ছিল। এখানে বিএনপির সামনে একটি মৌলিক দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে। একটি পথ হলো- পুরোনো সংসদীয় ক্ষমতার কাঠামোকে সামান্য সংস্কার করে চালিয়ে যাওয়া। অন্য পথ হলো- প্রধানমন্ত্রী ও নির্বাহী ক্ষমতার ওপর বাস্তব নিয়ন্ত্রণ সৃষ্টি করে একটি নতুন সাংবিধানিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা।

রাজনৈতিকভাবে দ্বিতীয় পথটি কঠিন। কারণ, যে দল বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে, সেই দল স্বাভাবিকভাবেই নিজের ক্ষমতা সীমিত করার সংস্কারে দ্বিধাগ্রস্ত হতে পারে। কিন্তু এখানেই জুলাই-পরবর্তী রাজনৈতিক বন্দোবস্তের আসল পরীক্ষা।

আরো গুরুত্বপূর্ণ হলো- এপ্রিল মাসে সংসদ অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, বিচার বিভাগের সচিবালয় এবং বিচারক নিয়োগ-সংক্রান্ত কয়েকটি অধ্যাদেশ বাতিল করে। সরকার তখন এগুলোকে পুনর্বিবেচনা ও সংশোধনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছিল; কিন্তু সমালোচকদের কাছে এটি বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগের কারণ হয়ে ওঠে। অর্থাৎ সমস্যা শুধু সংস্কার হচ্ছে কি না, তা নয়; কোন সংস্কারকে সরকার গ্রহণ করছে এবং কোন জায়গায় ক্ষমতার পুরোনো সুবিধা অক্ষুণ্ন রাখছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

এই জায়গায় বিএনপি যদি জুলাইয়ের রাজনৈতিক ম্যান্ডেটকে কেবল নির্বাচনী বিজয়ের বৈধতা হিসেবে ব্যবহার করে; কিন্তু রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কাঠামোতে পরিবর্তন না আনে, তাহলে পরিবর্তনের সঙ্গে ক্ষমতার ধারাবাহিকতার দূরত্ব কমে আসবে। আর সেটিই হবে সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ঝুঁকি।

৪. বিরোধী রাজনীতির নতুন বিন্যাসবাংলাদেশের রাজনীতির আরেকটি বড় পরিবর্তন ঘটেছে বিরোধী শক্তির বিন্যাসে। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট সংসদে প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে উঠে এসেছে। নির্বাচনের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও জামায়াত-নেতৃত্বাধীন জোট ৭৭টি আসন পায়। ফলে বাংলাদেশের পুরোনো আওয়ামী লীগ-বিএনপি দ্বিদলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতার জায়গায় একটি নতুন রাজনৈতিক বিন্যাস তৈরি হচ্ছে। একদিকে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ বিএনপি; অন্যদিকে জামায়াতকেন্দ্রিক বিরোধী শক্তি, যার মধ্যে নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক শক্তির অংশও রয়েছে।

এই পরিবর্তনের তাৎপর্য অনেক। বিএনপির সামনে একদিকে বিরাট রাজনৈতিক সুযোগ; আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য প্রায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক পরিসর। কিন্তু অন্যদিকে এটিই বিপদ। কারণ প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি যত দুর্বল বা ভিন্নমতাবলম্বী হবে, ক্ষমতাসীন দলের ওপর আত্মসংযমের প্রয়োজন তত বেশি। জুলাই অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব, তার ঐতিহাসিক কৃতিত্ব, ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রকাঠামো, জাতীয়তাবাদী রাজনীতির নেতৃত্ব এবং ইসলামপন্থী রাজনীতির বিস্তার ইত্যাদি বিষয় এখন বিএনপি ও জামায়াতকেন্দ্রিক রাজনীতির সঙ্ঘাতের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে। এখানে তারেক রহমানের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দক্ষতার পরীক্ষা হবে।

তিনি কি বিরোধী দলকে শুধু পরাজিত প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখবেন, নাকি সুস্থ  প্রতিযোগিতার প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে গ্রহণ করবেন?বিএনপি যদি institutional competition বা প্রাতিষ্ঠানিক রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে পারে, তাহলে তার শাসন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎকে  নতুন ভিত্তি দিতে পারে। কিন্তু যদি রাজনীতি আবার winner-takes-all সংস্কৃতিতে ফিরে যায়, তাহলে চব্বিশের পর তৈরি নতুন রাজনৈতিক সম্ভাবনা দ্রুত সঙ্কুচিত হবে।

৫. সরকার বদলেছে, শাসনের সংস্কৃতি কি বদলেছে?বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের অন্যতম বড় দাবি ছিল রাষ্ট্রযন্ত্রের দলীয়করণ বন্ধ করা। প্রশাসন, পুলিশ, বিচারব্যবস্থা এবং স্থানীয় সরকার- এসব প্রতিষ্ঠান যেন ক্ষমতাসীন দলের সাংগঠনিক সম্প্রসারণে পরিণত না হয়, সেটিই ছিল মানুষের প্রত্যাশা।

বিএনপি সরকারও দুর্নীতি দমন, সুশাসন, প্রশাসনিক সংস্কার ও আইনশৃঙ্খলাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। কিন্তু বাস্তব পরীক্ষা হচ্ছে ক্ষমতাসীন দলের নিজস্ব আচরণ। এখানে বিএনপির সামনে একটি পুরোনো ফাঁদ আছে। দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা রাজনৈতিক দল যখন রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরে আসে, তখন দলের নেতাকর্মীরা রাষ্ট্রকে নিজেদের পুনর্বাসনের ক্ষেত্র হিসেবে দেখতে শুরু করতে পারেন। স্থানীয় পর্যায়ে দখল, প্রভাব বিস্তার, চাঁদাবাজি বা প্রশাসনের ওপর দলীয় চাপ ইত্যাদি যদি বাড়ে, তাহলে সরকার যতই ‘নতুন রাষ্ট্র’ নির্মাণের কথা বলুক, সাধারণ মানুষ সেটিকে পুরোনো শাসনব্যবস্থার আরেক সংস্করণ হিসেবেই দেখতে পারে।

তারেক রহমানের জন্য তাই মৌলিক প্রশ্ন হলো- তিনি কি বিএনপির ওপর রাষ্ট্রকে বসাতে পারবেন? এটি সম্ভব হলে পরিবর্তনটি হবে গভীর। কিন্তু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান যদি দলীয় স্বার্থের সঙ্গে ক্রমশ মিশে যায়, তাহলে সরকার বদলালেও শাসনের কাঠামোগত চরিত্র বদলাবে না।

এই জায়গায় সরকারের নিজের কাজের মূল্যায়নও গুরুত্বপূর্ণ। প্রথম পাঁচ মাসে সরকার তার প্রশাসনিক ও শাসন-সংক্রান্ত উদ্যোগগুলোকে বড় সাফল্য হিসেবে তুলে ধরেছে। কিন্তু রাজনৈতিক মূল্যায়নে সরকারের নিজস্ব দাবিকে যথেষ্ট মনে করলে চলবে না; দেখতে হবে মাঠপর্যায়ে নাগরিকের অভিজ্ঞতা কী।

৬. বিচার : ন্যায়বিচার, নাকি প্রতিশোধের  চক্র?
শেখ হাসিনা-পরবর্তী বাংলাদেশের সবচেয়ে স্পর্শকাতর প্রশ্ন হলো- অতীতের অপরাধের বিচার কীভাবে হবে?

জুলাই-আগস্টের হত্যাকাণ্ড, রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন, গুম, দুর্নীতি এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। কিন্তু একই সঙ্গে বিচারকে রাজনৈতিক প্রতিশোধের হাতিয়ার হতে দেয়া যাবে না।

এই ভারসাম্য অত্যন্ত কঠিন। কারণ যে জনগণ দীর্ঘদিন রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের শিকার হয়েছে, তারা ন্যায়বিচার চায়। কিন্তু ন্যায়বিচার এবং প্রতিশোধ এক জিনিস নয়। ন্যায়বিচারের ভিত্তি হলো প্রমাণ, নিরপেক্ষতা, অভিযুক্তের অধিকার এবং একই আইনের সবার ওপর সমান প্রয়োগ।

এখানেই তারেক রহমান সরকারের জন্য ঐতিহাসিক সুযোগ। সরকার যদি জুলাইয়ের অপরাধের বিচার করে; কিন্তু একই সঙ্গে বিএনপির রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ক্ষেত্রেও একই আইনি মানদ- প্রয়োগ করে, তাহলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি মৌলিক পরিবর্তন ঘটতে পারে। অন্যদিকে বিচার যদি দলীয় পরিচয় অনুযায়ী বদলে যায়, তাহলে ক্ষমতার পালাবদল হলেও পুরোনো রাজনৈতিক যুক্তিই টিকে থাকবে। মানে, আজ যে পক্ষ বিচার করছে, কাল সে পক্ষই বিচারের মুখোমুখি হবে। সুতরাং সরকারের সাফল্যের প্রকৃত মাপকাঠি হবে  বিচার কতটা স্বাধীন, স্বচ্ছ, প্রমাণনির্ভর ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হলো।

৭. দ্রব্যমূল্য : পরিসংখ্যানের চেয়ে বাজারের ব্যাগ বেশি গুরুত্বপূর্ণ

সরকারের প্রথম ছয় মাসের মূল্যায়নে সাধারণ মানুষের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্ভবত বাজার। সর্বশেষ নিশ্চিত BBS তথ্য অনুযায়ী, জুন ২০২৬-এ জাতীয় মূল্যস্ফীতি ৯.১৬ শতাংশে নেমেছে, মে মাসের ৯.৪২ শতাংশ। খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.৬০ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯.৬১ শতাংশ।

সরকারের Family Card কর্মসূচি এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। মার্চে সরকার এটি চালু করে এবং প্রাথমিক পর্যায়ে হাজার হাজার নারীকে এর আওতায় আনে। কর্মসূচিটির উদ্দেশ্য পরিবারভিত্তিক সামাজিক সহায়তা, খাদ্য নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় সহায়তা প্রদান।

কিন্তু সামাজিক সহায়তা বাজারব্যবস্থার বিকল্প নয়। বাজারে সরবরাহ, পরিবহন, মধ্যস্বত্বভোগী, আমদানি ও প্রতিযোগিতার কাঠামোগত সমস্যা সমাধান না হলে কেবল প্রশাসনিক অভিযান দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি মূল্যস্থিতি আনা কঠিন। তাই এই ক্ষেত্রে সরকারের ছয় মাস নিয়ে রায় হবে মিশ্র : মূল্যস্ফীতির কিছুটা নি¤œগতি ইতিবাচক; কিন্তু সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার সংকট এখনো কাটেনি।
৮. লোডশেডিং ও জ্বালানি : সরকারের সক্ষমতার সবচেয়ে দৃশ্যমান পরীক্ষা

বিদ্যুৎ সংকটের প্রশ্নে সরকারের জন্য পরিস্থিতি আরো কঠিন। কারণ, এখানে মানুষের অভিজ্ঞতা সরাসরি এবং প্রতিদিনের। ২০২৬ সালের মার্চেই জ্বালানি সংকট এতটা গভীর হয়েছিল যে, সরকার জ্বালানি সাশ্রয়, আংশিক অনলাইন শিক্ষা ও অন্যান্য ব্যবস্থার কথা বিবেচনা করেছিল।

এরপর জুলাইয়ে একটি এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকা-ের ফলে দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। আগস্টের শুরুতে টার্মিনালের একটি অংশ চালু হলেও সরবরাহ পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি।

পরবর্তিতে পরিস্থিতি আবারো গুরুতর পর্যায়ে পৌঁছায়। গ্যাস সংকট ও ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সে কারণে সরকার নতুন করে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের কঠোর ব্যবস্থা নিতে হয়েছে।

এখানে সরকারের জন্য একটি কঠিন রাজনৈতিক সত্য আছে। সরকার আগের আমলের অব্যবস্থাপনা, জ্বালানি আমদানি-নির্ভরতা কিংবা অবকাঠামোগত দুর্বলতার উত্তরাধিকার পেয়েছে এটি সত্য। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর সেই উত্তরাধিকার আর দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক অজুহাত হতে পারে না। ভোটাররা সমস্যার সমাধান দেখতে চায়। লোডশেডিংয়ের প্রভাবও শুধু বিদ্যুৎ বিলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একজন শিক্ষার্থীর পড়াশোনা, একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর দোকান, একজন কৃষকের সেচ, একজন অনলাইন কর্মীর কাজ, একটি পরিবারের ফ্রিজ-ফ্যানÑ সবকিছুর সঙ্গে বিদ্যুৎ জড়িত।

তার ওপর বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থা এখনো এলএনজি-নির্ভরতার বড় ঝুঁকিতে। গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যেও বড় ব্যবধান রয়েছে। তাই লোডশেডিং এখন  সরকারের সক্ষমতার প্রতীকী পরীক্ষা। স্বল্পমেয়াদে সরকারকে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিত করতে হবে; দীর্ঘমেয়াদে আমদানি-নির্ভরতার ঝুঁকি কমিয়ে একটি টেকসই জ্বালানি কাঠামো তৈরি করতে হবে।

৯. কর্মসংস্থান ও তরুণ সমাজ : রাজনৈতিক ম্যান্ডেটকে অর্থনৈতিক সুযোগে রূপান্তরের প্রশ্ন

বাংলাদেশের তরুণ সমাজ জুলাই-পরবর্তী পরিবর্তনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শক্তি। তাদের কাছে নতুন বাংলাদেশ মানে শুধু একটি নতুন সরকার নয়; বরং প্রয়োজন  এমন একটি সমাজ, যেখানে যোগ্যতা রাজনৈতিক পরিচয়ের কাছে পরাজিত হবে না এবং শিক্ষার পর কর্মসংস্থানের বাস্তব সুযোগ থাকবে। এই জায়গায় বিএনপি সরকারের সাফল্য এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে।

বিনিয়োগ ও ব্যবসার পরিবেশ ফিরিয়ে আনা, শিল্প উৎপাদন বাড়ানো এবং অর্থনীতিতে আস্থা ফিরিয়ে আনা সরকারের ঘোষিত অগ্রাধিকারের মধ্যে রয়েছে। কিন্তু দীর্ঘদিনের মূল্যস্ফীতি প্রকৃত আয়কে চাপে রেখেছে। বিশেষ করে শহুরে মধ্যবিত্ত ও অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমজীবী মানুষের ক্ষেত্রে এই চাপ আরো বেশি। ২০২৬ সালের বিশ্লেষণেও মজুরি বৃদ্ধির দীর্ঘস্থায়ী পিছিয়ে থাকার বিষয়টি উঠে এসেছে। রাজনৈতিকভাবে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মধ্যবিত্ত ও তরুণদের প্রত্যাশা পূরণ না হলে সরকারবিরোধী অসন্তোষ  তৈরি হবে। তাই বিএনপির দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সাফল্যের একটি বড় মাপকাঠি হবে- তারা কি clientelism বা পৃষ্ঠপোষকতার বদলে meritocracy, entrepreneurship এবং social mobility-র সুযোগ তৈরি করতে পারে? এই জায়গায় ছয় মাসের রায় এখনো অপেক্ষমান।

১০. শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও নাগরিক সেবা

সবশেষে আসে সবচেয়ে মৌলিক প্রশ্ন : রাষ্ট্র সাধারণ মানুষের জীবনে কতটা দৃশ্যমান হয়েছে? একজন নাগরিক রাষ্ট্রের আচরণকে জ্বলন্তভাবে উপলব্ধি করেন যেসব জায়গায়, সেগুলো কী? সেগুলোর মধ্যে আছে,   হাসপাতালে চিকিৎসা পেলেন কি না, সন্তান ভালো স্কুলে পড়তে পারছে কি না, সরকারি অফিসে হয়রানি কমেছে কি না, ভূমিসেবা দ্রুত হয়েছে কি না, রাস্তায় নিরাপত্তা আছে কি না, পানি-গ্যাস-বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে কি না?

এই জায়গায় বিএনপি সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় সুযোগও আছে, আবার সবচেয়ে বড় ঝুঁকিও আছে।

রাষ্ট্রসংস্কার যদি কেবল সংবিধান, সংসদ ও প্রশাসনের উচ্চস্তরে সীমাবদ্ধ থাকে; কিন্তু সরকারি হাসপাতাল, বিদ্যালয়, স্থানীয় প্রশাসন, পরিবহন, পানি, বিদ্যুৎ ও নাগরিক সেবায় মানুষের অভিজ্ঞতা অপরিবর্তিত থাকে, তাহলে রাষ্ট্রসংস্কারকে একটি এলিট রাজনৈতিক প্রকল্প হিসেবে দেখা দিতে পারে। অন্যদিকে যদি নাগরিক সেবার মান উন্নত হয়, সরকারি প্রতিষ্ঠান জবাবদিহিমূলক হয়, চিকিৎসা ও শিক্ষার সুযোগ বাড়ে এবং প্রশাসনিক হয়রানি কমে, তাহলে মানুষ প্রথমবারের মতো বুঝতে পারবে যে রাজনৈতিক পরিবর্তনের বাস্তব অর্থ আছে।

এখানে Family Card-এর মতো সামাজিক সুরক্ষা উদ্যোগের পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে কার্যকর করা জরুরি। মার্চেই সরকার শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রশাসন ও জননিরাপত্তা নিয়ে একাধিক উদ্যোগের কথা জানিয়েছিল। রাষ্ট্রসংস্কারের চূড়ান্ত সাফল্য তাই সংসদে নয়, নাগরিকের দৈনন্দিন জীবনে মাপা হবে।

ছয় মাসে পরিবর্তনের আভাস; কিন্তু পরিবর্তনের প্রমাণ এখনো নয়! তারেক রহমান সরকারের প্রথম ছয় মাসের সামগ্রিক মূল্যায়ন তাই একরৈখিক হতে পারে না। এই সরকার একটি শক্তিশালী নির্বাচনী ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছে, সামাজিক সুরক্ষায় Family Card চালু করেছে এবং রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে একটি নতুন রাজনৈতিক ভাষা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। এগুলোকে খাটো করে দেখার সুযোগ নেই।

কিন্তু একই সঙ্গে বড় কয়েকটি প্রশ্ন এখনো অমীমাংসিত। জুলাই অভ্যুত্থানের রাজনৈতিক ম্যান্ডেট কতটা গভীর সাংবিধানিক সংস্কারে রূপ নেবে? রাষ্ট্রযন্ত্র কতটা দলীয় প্রভাবমুক্ত থাকবে? বিচার কি প্রতিশোধের বাইরে গিয়ে সত্যিকারের ন্যায়বিচারে পরিণত হবে?

বিএনপি কি তার পুরনো পৃষ্ঠপোষকতাভিত্তিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি ভাঙতে পারবে? বিরোধী দল কি পর্যাপ্ত রাজনৈতিক পরিসর পাবে? আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ- সাধারণ মানুষের বাজার, বিদ্যুৎ, আয়, কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার বাস্তবতায় কি পরিবর্তন আসবে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনো পুরোপুরি ইতিবাচক নয়; বরং প্রথম ছয় মাসের সবচেয়ে সঠিক রাজনৈতিক বর্ণনা হতে পারে- বিএনপি সরকার ক্ষমতা পরিবর্তনের পর্যায় পেরিয়ে রাষ্ট্র পরিবর্তনের দাবির মুখোমুখি হয়েছে; কিন্তু রাষ্ট্র পরিবর্তনের প্রমাণ এখনো অসম্পূর্ণ।
তারেক রহমানের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো নিজের দলের ওপর রাষ্ট্রকে বসানো, সংখ্যাগরিষ্ঠতার ওপর প্রতিষ্ঠানকে বসানো এবং রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির ওপর নাগরিকের বাস্তব অভিজ্ঞতাকে অগ্রাধিকার দেয়া।

লেখক : কবি, গবেষক, ইসলামি চিন্তাবিদ

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

সরকারের প্রথম ছয় মাস : পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি ও ক্ষমতার বাস্তবতা

আপডেট টাইম : ১১:০৩:৪৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৮ অগাস্ট ২০২৬

তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের প্রথম ছয় মাস পূর্ণ হয়েছে। মাত্র ছয় মাসে কোনো সরকারের পূর্ণাঙ্গ বিচার করা স্বাভাবিকভাবেই কঠিন। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই ছয় মাসকে সাধারণ ছয় মাস হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ, এই সরকার এসেছে একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান, অন্তর্বর্তী শাসন এবং একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের পর। ফলে বিএনপি শুধু সরকার গঠন করেনি; একই সঙ্গে তাকে একটি পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতার অর্থও নির্ধারণ করতে হচ্ছে।

১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর নির্বাচনে বিএনপি বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে এবং ১৭ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বিএনপির এই বিজয়কে ‘landslide’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। ফলে সরকার শুরু থেকেই একটি শক্তিশালী  ম্যান্ডেট পেয়েছে। কিন্তু এই ম্যান্ডেটের সঙ্গে প্রত্যাশার মাত্রাটিও ছিল অত্যন্ত উঁচু। মানুষ কেবল সরকার পরিবর্তন চায়নি; চেয়েছে শাসনের ধরন পরিবর্তন। রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান যেন কোনো দলের সম্পত্তি না হয়, প্রশাসন যেন দলীয় আনুগত্যের বদলে যোগ্যতার ভিত্তিতে চলে, বিচার যেন প্রতিশোধের হাতিয়ার না হয়, বাজার যেন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে না যায় এবং রাষ্ট্র যেন নাগরিকের দৈনন্দিন জীবনে কার্যকর হয়ে ওঠে এই প্রত্যাশাগুলোই মূলত নতুন সরকারের রাজনৈতিক পরীক্ষার ভিত্তি।

এই অর্থে প্রথম ছয় মাসের মূল্যায়ন করলে বিএনপি সরকারের সামনে একই সঙ্গে কিছু ইতিবাচক অর্জন এবং কয়েকটি গুরুতর প্রশ্ন স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

১. বৈধতা অর্জনের পর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা : কিন্তু কর্তৃত্ব কি প্রাতিষ্ঠানিক হবে?

দীর্ঘদিনের বিরোধী রাজনীতি থেকে সরাসরি রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে ফিরে আসা বিএনপির জন্য নিঃসন্দেহে একটি বড় রাজনৈতিক অর্জন। তারেক রহমানের নেতৃত্বে দলটি নির্বাচনে শক্তিশালী ম্যান্ডেট পেয়েছে এবং  দ্রুত রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছে। সরকারের ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনাতে আইনশৃঙ্খলা, দ্রব্যমূল্য, বিদ্যুৎ-জ্বালানি, দুর্নীতি ও প্রশাসনিক কার্যকারিতাকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়।
কিন্তু এখানেই প্রথম বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের মানুষের  প্রত্যাশা ছিল ক্ষমতার সংস্কৃতি বদলাবে। অতএব বিএনপির জন্য প্রশ্নটি  হলোÑ ক্ষমতা ব্যবহারের ধরন বদলেছে কি না। প্রথম ছয় মাসে সরকারের রাজনৈতিক ভাষা অন্তত আনুষ্ঠানিকভাবে প্রাতিষ্ঠানিকতার দিকে। প্রধানমন্ত্রী সংসদে বিরোধী দলের সঙ্গে সংলাপ ও সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা একটি সরকারকে খুব সহজেই সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী বা majoritarian রাজনীতির দিকে নিয়ে যেতে পারে। কিন্তু গণতন্ত্র শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন নয়; সংখ্যাগরিষ্ঠতার মধ্যেও সংখ্যালঘু রাজনৈতিক মত, বিরোধী দল এবং স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর জায়গা থাকতে হয়। তাই আগামী দিনের প্রকৃত পরীক্ষা হবে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, বিরোধী দলের রাজনৈতিক পরিসর এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বায়ত্তশাসন। প্রথম ছয় মাসে বিএনপি নির্বাচনী বৈধতা থেকে কার্যকর রাজনৈতিক কর্তৃত্বে সফলভাবে উত্তরণ করেছে; কিন্তু সেই কর্তৃত্ব কতটা জবাবদিহিমূলক প্রাতিষ্ঠানিকতায় রূপ নেয়, সেটিই সরকারের ভবিষ্যৎ চরিত্র নির্ধারণ করবে।

২. সবচেয়ে বড় পরীক্ষা আসলে বিএনপি তারেক রহমানের সরকারের দ্বিতীয় এবং সম্ভবত সবচেয়ে গভীর রাজনৈতিক পরীক্ষাটি হলো- বিএনপি নিজে কতটা বদলেছে। দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থাকার পর বিএনপি যে রাজনৈতিক ভাষা নিয়ে নির্বাচনে এসেছে, তার মধ্যে দুর্নীতিবিরোধিতা, রাষ্ট্রীয় সংস্কার, প্রশাসনিক দক্ষতা, সামাজিক সুরক্ষা এবং রাজনৈতিক সহনশীলতার প্রতিশ্রুতি ছিল। তারেক রহমান নিজেও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা বলেছেন। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে  প্রতিশ্রুতির অভাব কখনো ছিল না। সমস্যা হলো প্রতিশ্রুতি এবং ক্ষমতা ব্যবস্থাপনার মধ্যকার ব্যবধান।

এই জায়গাতেই বিএনপির পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির সঙ্গে নতুন রাষ্ট্রীয় প্রতিশ্রুতির সঙ্ঘাত দেখা দিতে পারে। দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা দলের নেতাকর্মীরা যখন রাষ্ট্রক্ষমতার কাছে চলে আসে, তখন রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা, ব্যবসায়িক স্বার্থ, স্থানীয় আধিপত্য এবং প্রশাসনিক প্রভাবে  পুরোনো সম্পর্ক নতুন করে সক্রিয় হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

এটি কেবল বিএনপির সমস্যা নয়। বাংলাদেশের দলীয় রাজনীতির কাঠামোগত সমস্যা এটি। তবে বিএনপি যেহেতু পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছে, তাই তার দায়ও বেশি। তারেক রহমান নিজেও অতীতে বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও দখলের অভিযোগের কথা স্বীকার করে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলেছেন। এখানে তারেক রহমানের ব্যক্তিগত নেতৃত্বের গুরুত্ব অনেক। তাকে একই সঙ্গে দুটি কাজ করতে হবে- ক. দলের পুরোনো শক্তিকে ধরে রাখা। খ.  নতুন প্রজন্মের কাছে বিএনপিকে একটি নতুন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।

প্রথম কাজটি তুলনামূলক সহজ; দ্বিতীয়টি কঠিন। সুতরাং ছয় মাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখনো অমীমাংসিত : তারেক রহমান কি শুধু বিএনপিকে ক্ষমতায় ফিরিয়েছেন, নাকি বিএনপির রাজনৈতিক সংস্কৃতিও বদলাতে শুরু করেছেন? এখন পর্যন্ত পরিবর্তনের কিছু ইঙ্গিত আছে; কিন্তু তাকে মৌলিক রাজনৈতিক রূপান্তর বলা কঠিন।

৩. জুলাই অভ্যুত্থানের ম্যান্ডেট বনাম ক্ষমতার পুরোনো কাঠামো
তারেক রহমান সরকারের বড় ঐতিহাসিক দায় হলো ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের রাজনৈতিক আকাক্সক্ষাকে সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়া। ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে জুলাই জাতীয় সনদের সাংবিধানিক সংস্কার নিয়ে গণভোটও অনুষ্ঠিত হয়েছে। সনদে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিতকরণ, রাষ্ট্রপতির কিছু ক্ষমতা বৃদ্ধি, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, বিরোধী দলের সংসদীয় ভূমিকা এবং মৌলিক অধিকারের মতো একাধিক সংস্কারের কথা ছিল। এখানে বিএনপির সামনে একটি মৌলিক দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে। একটি পথ হলো- পুরোনো সংসদীয় ক্ষমতার কাঠামোকে সামান্য সংস্কার করে চালিয়ে যাওয়া। অন্য পথ হলো- প্রধানমন্ত্রী ও নির্বাহী ক্ষমতার ওপর বাস্তব নিয়ন্ত্রণ সৃষ্টি করে একটি নতুন সাংবিধানিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা।

রাজনৈতিকভাবে দ্বিতীয় পথটি কঠিন। কারণ, যে দল বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে, সেই দল স্বাভাবিকভাবেই নিজের ক্ষমতা সীমিত করার সংস্কারে দ্বিধাগ্রস্ত হতে পারে। কিন্তু এখানেই জুলাই-পরবর্তী রাজনৈতিক বন্দোবস্তের আসল পরীক্ষা।

আরো গুরুত্বপূর্ণ হলো- এপ্রিল মাসে সংসদ অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, বিচার বিভাগের সচিবালয় এবং বিচারক নিয়োগ-সংক্রান্ত কয়েকটি অধ্যাদেশ বাতিল করে। সরকার তখন এগুলোকে পুনর্বিবেচনা ও সংশোধনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছিল; কিন্তু সমালোচকদের কাছে এটি বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগের কারণ হয়ে ওঠে। অর্থাৎ সমস্যা শুধু সংস্কার হচ্ছে কি না, তা নয়; কোন সংস্কারকে সরকার গ্রহণ করছে এবং কোন জায়গায় ক্ষমতার পুরোনো সুবিধা অক্ষুণ্ন রাখছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

এই জায়গায় বিএনপি যদি জুলাইয়ের রাজনৈতিক ম্যান্ডেটকে কেবল নির্বাচনী বিজয়ের বৈধতা হিসেবে ব্যবহার করে; কিন্তু রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কাঠামোতে পরিবর্তন না আনে, তাহলে পরিবর্তনের সঙ্গে ক্ষমতার ধারাবাহিকতার দূরত্ব কমে আসবে। আর সেটিই হবে সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ঝুঁকি।

৪. বিরোধী রাজনীতির নতুন বিন্যাসবাংলাদেশের রাজনীতির আরেকটি বড় পরিবর্তন ঘটেছে বিরোধী শক্তির বিন্যাসে। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট সংসদে প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে উঠে এসেছে। নির্বাচনের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও জামায়াত-নেতৃত্বাধীন জোট ৭৭টি আসন পায়। ফলে বাংলাদেশের পুরোনো আওয়ামী লীগ-বিএনপি দ্বিদলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতার জায়গায় একটি নতুন রাজনৈতিক বিন্যাস তৈরি হচ্ছে। একদিকে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ বিএনপি; অন্যদিকে জামায়াতকেন্দ্রিক বিরোধী শক্তি, যার মধ্যে নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক শক্তির অংশও রয়েছে।

এই পরিবর্তনের তাৎপর্য অনেক। বিএনপির সামনে একদিকে বিরাট রাজনৈতিক সুযোগ; আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য প্রায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক পরিসর। কিন্তু অন্যদিকে এটিই বিপদ। কারণ প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি যত দুর্বল বা ভিন্নমতাবলম্বী হবে, ক্ষমতাসীন দলের ওপর আত্মসংযমের প্রয়োজন তত বেশি। জুলাই অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব, তার ঐতিহাসিক কৃতিত্ব, ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রকাঠামো, জাতীয়তাবাদী রাজনীতির নেতৃত্ব এবং ইসলামপন্থী রাজনীতির বিস্তার ইত্যাদি বিষয় এখন বিএনপি ও জামায়াতকেন্দ্রিক রাজনীতির সঙ্ঘাতের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে। এখানে তারেক রহমানের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দক্ষতার পরীক্ষা হবে।

তিনি কি বিরোধী দলকে শুধু পরাজিত প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখবেন, নাকি সুস্থ  প্রতিযোগিতার প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে গ্রহণ করবেন?বিএনপি যদি institutional competition বা প্রাতিষ্ঠানিক রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে পারে, তাহলে তার শাসন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎকে  নতুন ভিত্তি দিতে পারে। কিন্তু যদি রাজনীতি আবার winner-takes-all সংস্কৃতিতে ফিরে যায়, তাহলে চব্বিশের পর তৈরি নতুন রাজনৈতিক সম্ভাবনা দ্রুত সঙ্কুচিত হবে।

৫. সরকার বদলেছে, শাসনের সংস্কৃতি কি বদলেছে?বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের অন্যতম বড় দাবি ছিল রাষ্ট্রযন্ত্রের দলীয়করণ বন্ধ করা। প্রশাসন, পুলিশ, বিচারব্যবস্থা এবং স্থানীয় সরকার- এসব প্রতিষ্ঠান যেন ক্ষমতাসীন দলের সাংগঠনিক সম্প্রসারণে পরিণত না হয়, সেটিই ছিল মানুষের প্রত্যাশা।

বিএনপি সরকারও দুর্নীতি দমন, সুশাসন, প্রশাসনিক সংস্কার ও আইনশৃঙ্খলাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। কিন্তু বাস্তব পরীক্ষা হচ্ছে ক্ষমতাসীন দলের নিজস্ব আচরণ। এখানে বিএনপির সামনে একটি পুরোনো ফাঁদ আছে। দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা রাজনৈতিক দল যখন রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরে আসে, তখন দলের নেতাকর্মীরা রাষ্ট্রকে নিজেদের পুনর্বাসনের ক্ষেত্র হিসেবে দেখতে শুরু করতে পারেন। স্থানীয় পর্যায়ে দখল, প্রভাব বিস্তার, চাঁদাবাজি বা প্রশাসনের ওপর দলীয় চাপ ইত্যাদি যদি বাড়ে, তাহলে সরকার যতই ‘নতুন রাষ্ট্র’ নির্মাণের কথা বলুক, সাধারণ মানুষ সেটিকে পুরোনো শাসনব্যবস্থার আরেক সংস্করণ হিসেবেই দেখতে পারে।

তারেক রহমানের জন্য তাই মৌলিক প্রশ্ন হলো- তিনি কি বিএনপির ওপর রাষ্ট্রকে বসাতে পারবেন? এটি সম্ভব হলে পরিবর্তনটি হবে গভীর। কিন্তু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান যদি দলীয় স্বার্থের সঙ্গে ক্রমশ মিশে যায়, তাহলে সরকার বদলালেও শাসনের কাঠামোগত চরিত্র বদলাবে না।

এই জায়গায় সরকারের নিজের কাজের মূল্যায়নও গুরুত্বপূর্ণ। প্রথম পাঁচ মাসে সরকার তার প্রশাসনিক ও শাসন-সংক্রান্ত উদ্যোগগুলোকে বড় সাফল্য হিসেবে তুলে ধরেছে। কিন্তু রাজনৈতিক মূল্যায়নে সরকারের নিজস্ব দাবিকে যথেষ্ট মনে করলে চলবে না; দেখতে হবে মাঠপর্যায়ে নাগরিকের অভিজ্ঞতা কী।

৬. বিচার : ন্যায়বিচার, নাকি প্রতিশোধের  চক্র?
শেখ হাসিনা-পরবর্তী বাংলাদেশের সবচেয়ে স্পর্শকাতর প্রশ্ন হলো- অতীতের অপরাধের বিচার কীভাবে হবে?

জুলাই-আগস্টের হত্যাকাণ্ড, রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন, গুম, দুর্নীতি এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। কিন্তু একই সঙ্গে বিচারকে রাজনৈতিক প্রতিশোধের হাতিয়ার হতে দেয়া যাবে না।

এই ভারসাম্য অত্যন্ত কঠিন। কারণ যে জনগণ দীর্ঘদিন রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের শিকার হয়েছে, তারা ন্যায়বিচার চায়। কিন্তু ন্যায়বিচার এবং প্রতিশোধ এক জিনিস নয়। ন্যায়বিচারের ভিত্তি হলো প্রমাণ, নিরপেক্ষতা, অভিযুক্তের অধিকার এবং একই আইনের সবার ওপর সমান প্রয়োগ।

এখানেই তারেক রহমান সরকারের জন্য ঐতিহাসিক সুযোগ। সরকার যদি জুলাইয়ের অপরাধের বিচার করে; কিন্তু একই সঙ্গে বিএনপির রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ক্ষেত্রেও একই আইনি মানদ- প্রয়োগ করে, তাহলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি মৌলিক পরিবর্তন ঘটতে পারে। অন্যদিকে বিচার যদি দলীয় পরিচয় অনুযায়ী বদলে যায়, তাহলে ক্ষমতার পালাবদল হলেও পুরোনো রাজনৈতিক যুক্তিই টিকে থাকবে। মানে, আজ যে পক্ষ বিচার করছে, কাল সে পক্ষই বিচারের মুখোমুখি হবে। সুতরাং সরকারের সাফল্যের প্রকৃত মাপকাঠি হবে  বিচার কতটা স্বাধীন, স্বচ্ছ, প্রমাণনির্ভর ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হলো।

৭. দ্রব্যমূল্য : পরিসংখ্যানের চেয়ে বাজারের ব্যাগ বেশি গুরুত্বপূর্ণ

সরকারের প্রথম ছয় মাসের মূল্যায়নে সাধারণ মানুষের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্ভবত বাজার। সর্বশেষ নিশ্চিত BBS তথ্য অনুযায়ী, জুন ২০২৬-এ জাতীয় মূল্যস্ফীতি ৯.১৬ শতাংশে নেমেছে, মে মাসের ৯.৪২ শতাংশ। খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.৬০ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯.৬১ শতাংশ।

সরকারের Family Card কর্মসূচি এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। মার্চে সরকার এটি চালু করে এবং প্রাথমিক পর্যায়ে হাজার হাজার নারীকে এর আওতায় আনে। কর্মসূচিটির উদ্দেশ্য পরিবারভিত্তিক সামাজিক সহায়তা, খাদ্য নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় সহায়তা প্রদান।

কিন্তু সামাজিক সহায়তা বাজারব্যবস্থার বিকল্প নয়। বাজারে সরবরাহ, পরিবহন, মধ্যস্বত্বভোগী, আমদানি ও প্রতিযোগিতার কাঠামোগত সমস্যা সমাধান না হলে কেবল প্রশাসনিক অভিযান দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি মূল্যস্থিতি আনা কঠিন। তাই এই ক্ষেত্রে সরকারের ছয় মাস নিয়ে রায় হবে মিশ্র : মূল্যস্ফীতির কিছুটা নি¤œগতি ইতিবাচক; কিন্তু সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার সংকট এখনো কাটেনি।
৮. লোডশেডিং ও জ্বালানি : সরকারের সক্ষমতার সবচেয়ে দৃশ্যমান পরীক্ষা

বিদ্যুৎ সংকটের প্রশ্নে সরকারের জন্য পরিস্থিতি আরো কঠিন। কারণ, এখানে মানুষের অভিজ্ঞতা সরাসরি এবং প্রতিদিনের। ২০২৬ সালের মার্চেই জ্বালানি সংকট এতটা গভীর হয়েছিল যে, সরকার জ্বালানি সাশ্রয়, আংশিক অনলাইন শিক্ষা ও অন্যান্য ব্যবস্থার কথা বিবেচনা করেছিল।

এরপর জুলাইয়ে একটি এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকা-ের ফলে দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। আগস্টের শুরুতে টার্মিনালের একটি অংশ চালু হলেও সরবরাহ পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি।

পরবর্তিতে পরিস্থিতি আবারো গুরুতর পর্যায়ে পৌঁছায়। গ্যাস সংকট ও ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সে কারণে সরকার নতুন করে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের কঠোর ব্যবস্থা নিতে হয়েছে।

এখানে সরকারের জন্য একটি কঠিন রাজনৈতিক সত্য আছে। সরকার আগের আমলের অব্যবস্থাপনা, জ্বালানি আমদানি-নির্ভরতা কিংবা অবকাঠামোগত দুর্বলতার উত্তরাধিকার পেয়েছে এটি সত্য। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর সেই উত্তরাধিকার আর দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক অজুহাত হতে পারে না। ভোটাররা সমস্যার সমাধান দেখতে চায়। লোডশেডিংয়ের প্রভাবও শুধু বিদ্যুৎ বিলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একজন শিক্ষার্থীর পড়াশোনা, একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর দোকান, একজন কৃষকের সেচ, একজন অনলাইন কর্মীর কাজ, একটি পরিবারের ফ্রিজ-ফ্যানÑ সবকিছুর সঙ্গে বিদ্যুৎ জড়িত।

তার ওপর বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থা এখনো এলএনজি-নির্ভরতার বড় ঝুঁকিতে। গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যেও বড় ব্যবধান রয়েছে। তাই লোডশেডিং এখন  সরকারের সক্ষমতার প্রতীকী পরীক্ষা। স্বল্পমেয়াদে সরকারকে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিত করতে হবে; দীর্ঘমেয়াদে আমদানি-নির্ভরতার ঝুঁকি কমিয়ে একটি টেকসই জ্বালানি কাঠামো তৈরি করতে হবে।

৯. কর্মসংস্থান ও তরুণ সমাজ : রাজনৈতিক ম্যান্ডেটকে অর্থনৈতিক সুযোগে রূপান্তরের প্রশ্ন

বাংলাদেশের তরুণ সমাজ জুলাই-পরবর্তী পরিবর্তনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শক্তি। তাদের কাছে নতুন বাংলাদেশ মানে শুধু একটি নতুন সরকার নয়; বরং প্রয়োজন  এমন একটি সমাজ, যেখানে যোগ্যতা রাজনৈতিক পরিচয়ের কাছে পরাজিত হবে না এবং শিক্ষার পর কর্মসংস্থানের বাস্তব সুযোগ থাকবে। এই জায়গায় বিএনপি সরকারের সাফল্য এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে।

বিনিয়োগ ও ব্যবসার পরিবেশ ফিরিয়ে আনা, শিল্প উৎপাদন বাড়ানো এবং অর্থনীতিতে আস্থা ফিরিয়ে আনা সরকারের ঘোষিত অগ্রাধিকারের মধ্যে রয়েছে। কিন্তু দীর্ঘদিনের মূল্যস্ফীতি প্রকৃত আয়কে চাপে রেখেছে। বিশেষ করে শহুরে মধ্যবিত্ত ও অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমজীবী মানুষের ক্ষেত্রে এই চাপ আরো বেশি। ২০২৬ সালের বিশ্লেষণেও মজুরি বৃদ্ধির দীর্ঘস্থায়ী পিছিয়ে থাকার বিষয়টি উঠে এসেছে। রাজনৈতিকভাবে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মধ্যবিত্ত ও তরুণদের প্রত্যাশা পূরণ না হলে সরকারবিরোধী অসন্তোষ  তৈরি হবে। তাই বিএনপির দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সাফল্যের একটি বড় মাপকাঠি হবে- তারা কি clientelism বা পৃষ্ঠপোষকতার বদলে meritocracy, entrepreneurship এবং social mobility-র সুযোগ তৈরি করতে পারে? এই জায়গায় ছয় মাসের রায় এখনো অপেক্ষমান।

১০. শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও নাগরিক সেবা

সবশেষে আসে সবচেয়ে মৌলিক প্রশ্ন : রাষ্ট্র সাধারণ মানুষের জীবনে কতটা দৃশ্যমান হয়েছে? একজন নাগরিক রাষ্ট্রের আচরণকে জ্বলন্তভাবে উপলব্ধি করেন যেসব জায়গায়, সেগুলো কী? সেগুলোর মধ্যে আছে,   হাসপাতালে চিকিৎসা পেলেন কি না, সন্তান ভালো স্কুলে পড়তে পারছে কি না, সরকারি অফিসে হয়রানি কমেছে কি না, ভূমিসেবা দ্রুত হয়েছে কি না, রাস্তায় নিরাপত্তা আছে কি না, পানি-গ্যাস-বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে কি না?

এই জায়গায় বিএনপি সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় সুযোগও আছে, আবার সবচেয়ে বড় ঝুঁকিও আছে।

রাষ্ট্রসংস্কার যদি কেবল সংবিধান, সংসদ ও প্রশাসনের উচ্চস্তরে সীমাবদ্ধ থাকে; কিন্তু সরকারি হাসপাতাল, বিদ্যালয়, স্থানীয় প্রশাসন, পরিবহন, পানি, বিদ্যুৎ ও নাগরিক সেবায় মানুষের অভিজ্ঞতা অপরিবর্তিত থাকে, তাহলে রাষ্ট্রসংস্কারকে একটি এলিট রাজনৈতিক প্রকল্প হিসেবে দেখা দিতে পারে। অন্যদিকে যদি নাগরিক সেবার মান উন্নত হয়, সরকারি প্রতিষ্ঠান জবাবদিহিমূলক হয়, চিকিৎসা ও শিক্ষার সুযোগ বাড়ে এবং প্রশাসনিক হয়রানি কমে, তাহলে মানুষ প্রথমবারের মতো বুঝতে পারবে যে রাজনৈতিক পরিবর্তনের বাস্তব অর্থ আছে।

এখানে Family Card-এর মতো সামাজিক সুরক্ষা উদ্যোগের পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে কার্যকর করা জরুরি। মার্চেই সরকার শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রশাসন ও জননিরাপত্তা নিয়ে একাধিক উদ্যোগের কথা জানিয়েছিল। রাষ্ট্রসংস্কারের চূড়ান্ত সাফল্য তাই সংসদে নয়, নাগরিকের দৈনন্দিন জীবনে মাপা হবে।

ছয় মাসে পরিবর্তনের আভাস; কিন্তু পরিবর্তনের প্রমাণ এখনো নয়! তারেক রহমান সরকারের প্রথম ছয় মাসের সামগ্রিক মূল্যায়ন তাই একরৈখিক হতে পারে না। এই সরকার একটি শক্তিশালী নির্বাচনী ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছে, সামাজিক সুরক্ষায় Family Card চালু করেছে এবং রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে একটি নতুন রাজনৈতিক ভাষা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। এগুলোকে খাটো করে দেখার সুযোগ নেই।

কিন্তু একই সঙ্গে বড় কয়েকটি প্রশ্ন এখনো অমীমাংসিত। জুলাই অভ্যুত্থানের রাজনৈতিক ম্যান্ডেট কতটা গভীর সাংবিধানিক সংস্কারে রূপ নেবে? রাষ্ট্রযন্ত্র কতটা দলীয় প্রভাবমুক্ত থাকবে? বিচার কি প্রতিশোধের বাইরে গিয়ে সত্যিকারের ন্যায়বিচারে পরিণত হবে?

বিএনপি কি তার পুরনো পৃষ্ঠপোষকতাভিত্তিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি ভাঙতে পারবে? বিরোধী দল কি পর্যাপ্ত রাজনৈতিক পরিসর পাবে? আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ- সাধারণ মানুষের বাজার, বিদ্যুৎ, আয়, কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার বাস্তবতায় কি পরিবর্তন আসবে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনো পুরোপুরি ইতিবাচক নয়; বরং প্রথম ছয় মাসের সবচেয়ে সঠিক রাজনৈতিক বর্ণনা হতে পারে- বিএনপি সরকার ক্ষমতা পরিবর্তনের পর্যায় পেরিয়ে রাষ্ট্র পরিবর্তনের দাবির মুখোমুখি হয়েছে; কিন্তু রাষ্ট্র পরিবর্তনের প্রমাণ এখনো অসম্পূর্ণ।
তারেক রহমানের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো নিজের দলের ওপর রাষ্ট্রকে বসানো, সংখ্যাগরিষ্ঠতার ওপর প্রতিষ্ঠানকে বসানো এবং রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির ওপর নাগরিকের বাস্তব অভিজ্ঞতাকে অগ্রাধিকার দেয়া।

লেখক : কবি, গবেষক, ইসলামি চিন্তাবিদ