ঢাকা ১২:০২ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৯ অগাস্ট ২০২৬, ৩ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
“লেখাপড়া করে যেই গাড়িঘোড়া চড়ে সেই”-এর মধ্যে লুকিয়ে আছে শিক্ষার্থীদের প্রেরণা ড. ইউনূসকে নিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য মনিরুলের, হাসিনাকে করেছিলেন সতর্ক ১৬ ডিসেম্বর থার্ড টার্মিনাল চালুর লক্ষ্য যে ১০ গাছ লাগালে বাড়ি ঠাণ্ডা থাকবে, পাখিও আসবে জামাতে ফজর নামাজ আদায়ের বিশেষ গুরুত্ব নারীদের জন্য আবার বাসসেবা বিআরটিসির সোশ্যাল মিডিয়ার অপব্যবহার ঠেকাতে সচেতনতার বিকল্প নেই: তথ্যমন্ত্রী সরকারের প্রথম ছয় মাস : পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি ও ক্ষমতার বাস্তবতা অপ্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় কমানোর চেষ্টা করছে সরকার: প্রধানমন্ত্রী কারাগার থেকে ইমরান খানকে হাসপাতালে স্থানান্তরের নির্দেশ পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্টের

“লেখাপড়া করে যেই গাড়িঘোড়া চড়ে সেই”-এর মধ্যে লুকিয়ে আছে শিক্ষার্থীদের প্রেরণা

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১২:০১:৫৭ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৯ অগাস্ট ২০২৬
  • ০ বার

রফিকুল ইসলামঃ: “লেখাপড়া করে যেই, গাড়িঘোড়া চড়ে সেই”- কবি মদনমোহন তর্কালঙ্কারের কবিতার এই পঙক্তিটি আওড়ে শিশু শিক্ষার্থীদের কোমল মনে কাজের স্পৃহা, উদ্দীপনা বা লক্ষ্য অর্জনের তীব্র ইচ্ছা জাগিয়ে তুলতেন হাবিল স্যার।

তিনি বোঝাতেন, পঙক্তিটির মূলভাব হলো মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করলে জ্ঞান অর্জন, জীবনে উন্নতি, ধন-সম্পদ এবং উচ্চ সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদা লাভ করা যায়।

শৈশবের প্রথম স্কুলের স্মৃতি মানুষের মনে আজীবন অম্লান রয়ে যায়। আর সেই স্মৃতির ক্যানভাসে সবচেয়ে উজ্জ্বল রঙে যিনি এঁকে গেছেন, তিনি হলেন প্রাইমারি স্কুলশিক্ষক মো. আনোয়ারুল হক ওরফে হাবিল স্যার।

আশির দশকে তিনি ছিলেন কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলা গোপদিঘী ইউনিয়নে অবস্থিত ১নং বগাদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক। তাঁর বাড়ি পার্শ্ববর্তী ধলাই গ্রামে।

তিনি আমার মতো অনেকেরই আদর্শ ও অনুকরণীয় শিক্ষক ছিলেন। তাঁর জীবনবোধ ছিল সাদাসিধে, কিন্তু শাসন ও আদর্শ ছিল অত্যন্ত দূরদর্শী। হাবিল স্যার বলতেন, “সাদামাটা জীবন আর উচ্চ চিন্তা—এটাই মানুষের আসল পরিচয়।”

শিশু শিক্ষার্থীরা যাতে লক্ষ্যভ্রষ্ট ও ইঁচড়েপাকা না হয় সেজন্য সারাদিন সৎ পথে চলা, ভালো কাজ করা এবং গুরুজনদের আদেশ ও উপদেশ মনে প্রাণে মেনে চলার প্রতিজ্ঞা বা দৃঢ় সংকল্প নিতে শুধাতেন, “সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি, / সারাদিন আমি যেন ভালো হয়ে চলি। / আদেশ করেন যাহা মোর গুরুজনে, / আমি যেন সেই কাজ করি ভালো মনে।”

প্রাথমিক বিদ্যালয় হলো মানুষের জীবনের ভিত্তি গড়ার স্থান, আর হাবিল স্যার হলেন সেই ভিত্তির এক দক্ষ রূপকার। তাঁর উপদেশ আজও হৃদয়ে ঝড় তুলে – “এখন যদি ফাঁকি দাও, তবে সারাজীবনটাই যাবে ফাও।”

হাবিল স্যার পেশাগত জীবনের শুরু থেকেই শুধু পাঠ্যবইয়ের পাতায় নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। তিনি শিক্ষার্থীদের মাঝে বুনে দিয়েছেন সততা, দেশপ্রেম ও নৈতিকতার বীজ। তিনি বোঝাতেন, “বড়দের সম্মান করা এবং ছোটদের স্নেহ করা হলো শিক্ষার প্রথম ধাপ।”

অত্যন্ত সাধারণ জীবনযাপন করা এই শিক্ষাগুরুর চিন্তাভাবনা ছিল সুউচ্চ। পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের প্রতি ছিল তাঁর বিশেষ নজর। বিনাপয়সায় দুর্বল ছাত্রদের বাড়তি সময় দেওয়া এবং ঝরে পড়া রোধে বাড়ি বাড়ি গিয়ে অভিভাবকদের সচেতন করা ছিল তাঁর প্রায় প্রতিদিনের রুটিন।

বিশেষ করে পঞ্চম শ্রেণির সেন্টার পরীক্ষা ও বৃত্তি পরীক্ষার্থীদের পেছনে ছিল তাঁর বাড়তি তদারকি ও শ্রম। পরীক্ষার আগের দিনগুলো প্রতিটি শিক্ষার্থীর জীবনেই এক একটি অগ্নিপরীক্ষা। বিশেষ করে ভোরের শান্ত সময়ে পড়ালেখা করাকে সবচেয়ে কার্যকর মনে করা হয়। কিন্তু গভীর রাত পর্যন্ত জেগে পড়ার পর ভোরবেলা চোখ মেলা যেন এক অসম্ভব যুদ্ধ। শিক্ষকেরা বরাবরই শিক্ষার্থীদের ভোরে ওঠার তাগিদ দেন। কেউ বকাঝকা করেন, কেউ বা বেতের ভয় দেখান।

এক্ষেত্রে হাবিল স্যার ছিলেন পুরোপুরি আলাদা। তিনি ওই সময়ের প্রথাগত শাসনের পথে না হেঁটে বেছে নিয়েছিলেন এমন এক অভিনব দাওয়াই, যা শুনলে আজ হয়তো অনেকেই অবাক হবেন কিংবা হাসবেন, তবে এর কার্যকারিতা ছিল সুদূরপ্রসারী।

আমাদের বাড়ির বাংলো ঘরে আমাদের পড়ানোর জন্য রাত কাটাতেন তিনি। তাঁর উপস্থিতিতে রাত ১১.০০ টা পর্যন্ত উচ্চস্বরে পড়তে হতো সবারই। তারপর ঘুম।

শেষ রাতে বা ভোরে শরীরে পিঁপড়ার দৌড়াদৌড়ি ও কামড়ে সবাই জেগে উঠতাম। তখন হাবিল স্যার বলতেন, উঠেই যখন পরেছিস, আর শোয়ার দরকার নাই। সকাল হয়ে গেছে, পড়া শুরু করে দে। হাবিল স্যার পরম মমতায় বলতেন, “শোন সোনারা, পরিশ্রম কখনো বৃথা যায় না।”

পরে অবশ্য আবিষ্কার করলাম আসলে হাবিল স্যার প্রতি রাতে করতেন কি, আমরা যখন ঘুমিয়ে পরতাম; তখন আমাদের বিছানার চারপাশে লাল চিনি বা গুড় ছিটিয়ে রাখতেন, যাতে পিঁপড়ার উপদ্রবে সবাই ভোরে ঘুম থেকে জেগে ওঠে!

বিছানায় গুড় ছিটিয়ে দিলে মিষ্টির লোভে পিঁপড়া আসত। পিঁপড়ার হালকা কামড়ে শিক্ষার্থীরা কোনো ধরনের মানসিক ভীতি বা ক্ষোভ ছাড়াই নিজে থেকে জেগে উঠত।

শিক্ষার্থীদের ভোরে ঘুম থেকে জাগানোর জন্য বিছানায় গুড় ছিটিয়ে রাখার এই অদ্ভুত ও মিষ্টি আখ্যানটি মূলত হাবিল স্যারের এক অনন্য ও বাস্তব শিক্ষণ কৌশলের অংশ ছিল। অলসতা কাটিয়ে শিক্ষার্থীদের ভোরে জাগাতে এক অভিনব ও চিরস্মরণীয় পদ্ধতি বেছে নিয়েছিলেন তিনি।

পিঁপড়ের কামড়ে ঘুম ভাঙার এই অদ্ভুত ও শাসনমিশ্রিত পরম মমতা আজও আমাদের শিক্ষা দেয়—একজন প্রকৃত শিক্ষক শুধু শ্রেণিকক্ষেই পাঠদান করেন না, শিক্ষার্থীর জীবন গড়তে কতটা নিবেদিতপ্রাণ হতে পারেন।

বাইরে থেকে এই পদ্ধতিকে কঠোর বা অদ্ভুত মনে হলেও, এর ভেতরে লুকিয়ে ছিল এক বাবার মতো গভীর ভালোবাসা। হাবিল স্যার জানতেন, মুখে ডেকে তুললে ছাত্ররা হয়তো কিছুক্ষণ পর আবার ঘুমিয়ে পড়বে। কিন্তু এই উপায়ে তাদের ঘুম ভাঙলে অলসতা কেটে যাবে পুরোপুরি। শিক্ষার্থীরাও স্যারের এই শাসনকে সাদরে বরণ করে নিয়েছিল।

আজকের যান্ত্রিক শিক্ষা ব্যবস্থায় যেখানে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সম্পর্ক শুধু ক্লাসরুম আর জিপিএ-র ফ্রেমে বন্দি, সেখানে হাবিল স্যারদের এই আত্মিক টান এক অনন্য দৃষ্টান্ত যেন।

আশি দশকের প্রাইমারি স্কুলের সেই দিনগুলো ছিল সত্যিই এক দারুণ নস্টালজিয়া! গবেষকদের মতে, মাঝেমধ্যে নস্টালজিয়ায় আক্রান্ত হলে বা পুরনো স্মৃতি মনে করলে মনের জোর ও আত্মবিশ্বাস বাড়ে।

সেই সময় ডিজিটাল স্ক্রিন বা আধুনিক গ্যাজেট ছিল না, কিন্তু পড়াশোনার মধ্যে এক অদ্ভুত সুর, ছন্দ আী

তাগিদ ছিল। সুর করে নামতা পড়তে হতো। ক্লাসের সবাই মিলে একসঙ্গে চিৎকার করে ছন্দ মিলিয়ে “দুই একে দুই, দুই দুগুনে চার” কিংবা “দশে এক এগারো” ও “দশ দশে একশ” পড়ার সেই আওয়াজ পুরো স্কুল কাঁপিয়ে দিত। দলবেঁধে পড়ার সেই আনন্দ আজকের যুগের চেয়ে অনেক আলাদা এবং খাঁটি ছিল।

শ্রুতি লিখনে স্যার বই দেখে রিডিং পড়তেন। শিক্ষার্থীরা মন দিয়ে শোনে খাতায় বা স্লেটে তা নির্ভুলভাবে লিখত।উপরের ক্লাসের শিক্ষার্থীরা দোয়াত-কালি ও ফাউন্টেন পেন দিয়ে লেখত। এতে বানান ও শোনার দক্ষতা বাড়ত। অন্যদিকে হাতের লেখার আলাদা খাতা আনতে হতো। এতে হাবিল স্যার বলতেন, “আজকে যে কষ্ট করে খাতার পাতা ভরবে, আগামী দিনে সে সুন্দর জীবন গড়বে।”

প্রতিদিন অন্তত এক পৃষ্ঠা সুন্দর করে হাতের লেখা ক্লাসে জমা দিতে হতো। হাতের লেখা সুন্দর করার জন্য হাবিল স্যারের কড়া তাগিদ ছিল। উদ্দীপ্ত করতেন এই বলে যে, “হাতের লেখা সুন্দর হওয়া মানে অর্ধেক শিক্ষিত হওয়া।”

তবে, নিচের ক্লাসে কাগজের খাতার চেয়ে পাথরের স্লেট ও চক-পেন্সিলের ব্যবহার ছিল বেশি। ভুল হলে থুতু দিয়ে বা কাপড়ের টুকরো দিয়ে মুছে আবার লেখা হতো। এর হেরফের হলে, চপলতা বা বাঁদরামি করলে কিংবা দুষ্টুমিভরা কাজ থেকে নিবৃত্ত করতে হাবিল স্যার কাব্যিকতা করে লোকছড়াটি বলতেন, “দুষ্টের শিরোমণি লঙ্কার রাজা, / চুপেচুপে খাও তুমি চানাচুর ভাঁজা।”

এর ফলে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা একদিকে যেমন আনন্দিত হতো, অন্যদিকে তাদের চঞ্চলতা কমে আসত আর শ্রেণিকক্ষের পরিবেশও শান্ত হয়ে আসত।

ক্লাসের সেরা ছাত্র বা ‘মনিটর’ সামনে দাঁড়িয়ে নামতা, স্বরবর্ণ বা ইংরেজি কবিতা সুর করে বলত। বাকি পুরো ক্লাস একসুরে তার পেছনে চিৎকার করে তা আবৃত্তি করত।
এই ছন্দবদ্ধ সুরের কারণে পড়া খুব দ্রুত মাথায় গেঁথে যেত। ওই সময় প্রাইমারি স্কুলের পড়াশোনার পদ্ধতি ছিল ভীষণ জীবন্ত এবং মাটির কাছাকাছি।

তখনকার শিক্ষক বা ‘স্যার’দের কড়া শাসন যেমন ছিল, তেমনি শিক্ষকদের প্রতি শিক্ষার্থীদের গভীর শ্রদ্ধা, ভক্তি আর ভালোবাসাও ছিল নিখাদ ও মধুর। তাঁদের ডাকের মধ্যেই এক আলাদা দায়িত্ববোধ লুকিয়ে থাকত।

হাবিল স্যারের সবচেয়ে বড় আদর্শ ছিল তাঁর সময়ানুবর্তিতা, নিরপেক্ষতা, নিঃস্বার্থ নৈতিকতা এবং আদর্শ মানুষ গড়ার গভীর দায়বদ্ধতা। আর নিজের ভোগ-বিলাসের চেয়ে সমাজ ও জাতিকে নৈতিকভাবে সমৃদ্ধ করার স্বপ্ন। তিনি শিশু শিক্ষার্থীদের মূল্যবোধ, শৃঙ্খলা, কঠোর পরিশ্রম এবং নম্রতা শেখাতেন।

এছাড়া শিক্ষার্থীদের মোটিভেশনে তাঁর জুরি ছিল না। জোর করে বা ভয়ের মাধ্যমে না শিখিয়ে, শিশুরা যাতে নিজেই স্বেচ্ছায় এবং আনন্দের সাথে পড়ালেখা ও ক্লাসের কার্যকলাপে অংশ নেয়, সেই মানসিকতা তৈরি করাই তাঁকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছে।

আজ তাঁর হাত ধরে গড়ে ওঠা শিশু শিক্ষার্থীরা সমাজে ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে অধিষ্ঠিত। পদের চেয়েও বড় কথা, তারা অনেকেই হাবিল স্যারের শেখানো ‘ভালো মানুষ’ হওয়ার মন্ত্রটি বুকে ধারণ করে আছেন। সমাজ থেকে অন্যায়, দুর্নীতি ও কুসংস্কার দূর করে একটি আলোকিত সমাজ গঠনে হাবিল স্যারের এই নিঃস্বার্থ সুউচ্চ আদর্শ আজ এক অনন্য ও চিরন্তন উপমান।

হাবিব স্যারের জীবনের এ আদর্শ এবং সমাজ বিনির্মাণে তাঁর অনন্য অবদান সত্যিই অনুপ্রেরণাদায়ক। তিনি তাঁর সততা, কর্মনিষ্ঠা এবং নিঃস্বার্থ সেবার মাধ্যমে সমাজে যে ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছেন, তা বর্তমান ও আগামী প্রজন্মের জন্য একটি উজ্জ্বল নজির।

বিজ্ঞাপন আর বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতার এই যুগে শিক্ষা আজ অনেকটাই পণ্যে রূপান্তরিত। কিন্তু আমাদের হাবিল স্যারদের কাছে শিক্ষা ছিল একটি ব্রত, পবিত্র সাধনা। ভাঙা টিনের চালের নিচে বসে চকের গুঁড়ো মেখে তিনি শুধু আমাদের অঙ্ক বা ব্যাকরণ শেখাতেন না, শিখাতেন কীভাবে একজন সৎ ও মানবিক মানুষ হতে হয়।

বর্তমানের জিপিএ-৫ পাওয়ার অন্ধ দৌড়ে আমরা যখন ক্লান্ত, তখন বারবার মনে পড়ে আশি দশকের সেই নিভৃতচারী শিক্ষাগুরু হাবিল স্যারের কথা, যিনি কোনো বৈষয়িক লোভ ছাড়াই আমাদের ভেতরে বুনে দিয়েছিলেন জীবনের আসল ভিত্তিপ্রস্তর।

হাবিব স্যারের ক্লাসে যাওয়ার জন্য শিশুরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করত। পড়া না পারলে যেখানে শাস্তির ভয় ছিল নিত্যদিনের সঙ্গী, সেখানে হাবিল স্যার নিয়ে এসেছিলেন ভালোবাসার এক নতুন পাঠদান পদ্ধতি।

তিনি খেলার ছলে, গল্পের সুতোয় জটিল সব বিষয়কে সহজ করে তুলতেন। এই নিবন্ধে অনুসন্ধান করব একজন নিভৃতচারী শিক্ষকের সেই জাদুকরী পাঠদান কৌশল এবং তাঁর জীবনের সুউচ্চ আদর্শকে, যা আজ সমাজ বিনির্মাণে এক অনন্য নিদর্শন।

হাবিব স্যারের পাঠদান কৌশল ছিল সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম ও জাদুকরী। তিনি গতানুগতিক ধারা বাদ দিয়ে অভিনব ও টেকসই পদ্ধতিতে ইংরেজি পড়াতেন। ইংরেজি শেখানোর আগে তিনি মাতৃভাষা বা বাংলা ব্যাকরণের ওপর বিশেষ জোর দিতেন।

তিনি বিশ্বাস করতেন, যেকোনো বিদেশি ভাষা ভালোভাবে শিখতে হলে নিজের মাতৃভাষার ব্যাকরণ আগে ভালো করে জানতে হবে। ইংরেজি গ্রামারের জটিল নিয়মগুলোকে তিনি মাতৃভাষার নিয়মের সাথে মিলিয়ে সহজ করে তুলতেন।

তাঁর ক্লাসে পড়াশোনা শুধু মুখস্থ করার বিষয় ছিল না। তিনি যুক্তির মাধ্যমে বিষয়টি বুঝিয়ে দিতেন। তাঁর গম্ভীর ও জাদুকরী কণ্ঠস্বর শিশু শিক্ষার্থীদের সহজে আকৃষ্ট করত। কঠিন বিষয়গুলোকে বাস্তব উদাহরণ ও গল্পের মাধ্যমে সহজ করে তুলতেন। ভয়হীন ও আনন্দঘন পরিবেশে ক্লাস নিয়ে শিক্ষার্থীদের পড়ার প্রতি আগ্রহ বাড়াতেন। এছাড়া লেকচার পদ্ধতির বাইরে গিয়ে প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে প্রতিটি শিক্ষার্থীকে ক্লাসে সক্রিয় রাখা ছিল ক্যারিশমাটিক।

তবে, ভিন্নতাও ছিল। বজ্রের মতো গর্জে ওঠে কয়েক ঘা যে লাগাতেন না তেমন নয়। শিক্ষার্থীদের অমনোযোগীতা বরদাস্ত করতেন না কখনো। হাবিল স্যার বলতেন, “মনোযোগ দিয়ে পাঠদান শুনলে পরীক্ষায় কোনো ভয় নেই।”

প্রাইমারি শিক্ষক হাবিল স্যারের মতো নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষকেরা অনন্য শিক্ষণশৈলীর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের কাছে ছিল রোল মডেল। তিনি শুধু শ্রেণিকক্ষের গণ্ডিতে পাঠদানকে সীমাবদ্ধ রাখেননি, বরং শিক্ষার্থীদের সামগ্রিক বিকাশের জন্য একটি ভারসাম্যপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করেছিলেন।

হাবিল স্যার সহপাঠ্যক্রমিক কার্যকলাপের প্রতিও বিশেষ দৃষ্টি রাখতেন। প্রতিভা অন্বেষণে খেলাধুলা, গান, নাচ, বিতর্ক, গজল, কবিতা আবৃত্তি, কৌতুক ও গল্প বলা বা চিত্রাঙ্কনের মতো বিষয়ে শিক্ষার্থীদের সুপ্ত প্রতিভা খুঁজে বের করতেন।

তাছাড়া খেলাধুলা, বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও প্রতিযোগিতার আয়োজন করে শিক্ষার্থীদের মাঝে আত্মবিশ্বাস ও দলগতভাবে কাজ করার মানসিকতা তৈরি করতেন। মানসিক বিকাশে শুধু মুখস্থ বিদ্যায় সীমাবদ্ধ না রেখে সহপাঠ্যক্রমিক কাজের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল ও সামাজিক গুণাবলির বিকাশ ঘটাতেন। বিশ্বাস ও ইচ্ছা জোগাতেন – “আমিও পারব।”

হাবিল স্যারের সতর্ক বাণী আজও কানে বাজে – “যে জন দিবসে মনের হরষে জ্বালায় মোমের বাতি, / আশু গৃহে তার দেখিবে না আর নিশীথে প্রদীপ বাতি।”

কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদারের ‘সদ্ভাব শতক’ গ্রন্থের ‘অপব্যয়ের ফল’ শীর্ষক বিখ্যাত শ্লোকটি দুই চরণের একটি স্বাধীন নীতিবাক্য। দিনের আলোতে অযথা মোমবাতি জ্বালিয়ে অপচয় করলে, পরে অন্ধকারে বাতির অভাবে কষ্ট পেতে হয়—এই অমোঘ সত্যটিই বুঝিয়েছেন তিনি।

১৯৭৩ সালের ১লা জুলাই অলুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যোগদানের মাধ্যমে হাবিল স্যারের এই মহান শিক্ষকতা পেশা শুরু করেন। পরে ১৯৭৮ সালে ১নং বগাদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যোগদানের মধ্য দিয়ে সুদীর্ঘ সময় ধরে হৃদয়-ছোঁয়া আদর্শ নিয়ে জ্ঞানের আলোয় আলোকিত সমাজ বিনির্মাণে ছেদ টেনে ১৯৯৬ সালে স্বেচ্ছায় অবসরে নেন।

১৯৫২ সালের ১৭ই এপ্রিল মো. আনোয়ারুল হক ওরফে হাবিল স্যারের জন্ম নিভৃত এক পল্লী ধলাই গ্রামে। তিনি ছোটবেলা থেকেই ধর্মপরায়ণ। বর্তমানে দ্বীনের খেদমতে সময় দিচ্ছেন। কিন্তু বার্ধক্যজনিত কারণে বিভিন্ন রোগে শারীরিকভাবে অসুস্থ এবং মানসিকভাবে বিপর্যস্ত সময় পার করছেন।

হাবিল স্যারের মতো গুণী শিক্ষকেরা সমাজের আসল স্তম্ভ। কর্মজীবন শেষে বা জীবনের উত্তরসূরি হিসেবে তাঁর মতো শিক্ষকের প্রতি সমাজের শ্রদ্ধা ও দায়িত্বশীল থাকা অত্যন্ত জরুরি।

তাঁর মতো একজন আদর্শ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক, যিনি হাজারো শিক্ষার্থীর জীবনের ভিত্তি গড়ে দিয়েছেন, তাঁর অন্তিম সায়াহ্নে সমাজ ও তাঁর প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের অনেক বড় দায়িত্ব ও করণীয় রয়েছে।

আজ বড় বড় ডিগ্রিধারী, জিপিএ-৫ পাওয়া সফল মানুষের ভিড়ে আসল ‘মানুষ’ খোঁজা বড় দায় হয়ে পড়েছে। এখানেই অনুভব করা যায় হাবিল স্যারের মতো শিক্ষকদের অপরিহার্যতা। তাঁরা কোনো নাম-যশ বা অর্থবিত্তের পেছনে ছুটেননি, তাঁদের জীবনের একমাত্র সার্থকতা ছিল এক একটি কাঁচা মাটিকে খাঁটি সোনায় রূপ দেওয়া।

তাঁর খড়িমাটির হাত ধরে আমাদের হৃদয়ে যে নৈতিকতার বীজ বুনে দেওয়া হয়েছিল, তা আজও মহীরুহ হয়ে টিকে আছে।

বর্তমানের বাণিজ্যিক শিক্ষার যুগে হাবিল স্যারদের সেই আদর্শকে ফিরিয়ে আনা হয়তো সম্ভব নয়, কিন্তু তাঁদের দেওয়া শিক্ষা বুকে ধারণ করে আমরা অন্তত একজন সৎ নাগরিক হতে পারি।

সময় বদলেছে, বদলেছে পড়ার ধরণও। ডিজিটাল যুগের শিক্ষার্থীরা এখন অ্যালার্ম কিংবা স্মার্টফোনের রিমাইন্ডারে ঘুম থেকে ওঠে। কিন্তু সেই যান্ত্রিক আওয়াজে হাবিল স্যারের মতো দরদ মাখানো ছোঁয়া থাকে না। সমাজ ও শিক্ষা ব্যবস্থার রূপান্তর ঘটলেও, হাবিল স্যারদের মতো নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষকদের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে যায়নি, যিনি নিজের জ্ঞান, আদর্শ ও কর্মের মাধ্যমে সমাজে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

“লেখাপড়া করে যেই, গাড়িঘোড়া চড়ে সেই”- এই আপ্তবাক্য বর্তমান যুগে ‘গাড়িঘোড়া চড়া’ বলতে কেবল দামি গাড়িতে চড়া বোঝায় না, এটি মূলত একজন মানুষের আত্মনির্ভরশীলতা, উচ্চ সামাজিক অবস্থান এবং মেধার জোরে এগিয়ে যাওয়ার প্রতীক। শিশুতোষ ছড়া থেকে শুরু করে বাস্তব জীবনের সাফল্যের চাবিকাঠি হিসেবে এই দর্শনটি আজীবন প্রাসঙ্গিক ও সবচেয়ে বড় প্রেরণার উৎস।

সেল্যুট হে আলোর সারথি, যুগে যুগে আপনার মতো হাবিল স্যারেরাই বেঁচে থাকুন আমাদের চেনা সমাজটার শেষ ভরসা হয়ে – “একটি শিশুর নরম মনে জ্বালিয়ে আলোর বাতি, / গড়ছো তুমি সযতনে আগামী দিনের জাতি।”

লেখক: সহযোগী সম্পাদক, আজকের সূর্যোদয়, ঢাকা

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

“লেখাপড়া করে যেই গাড়িঘোড়া চড়ে সেই”-এর মধ্যে লুকিয়ে আছে শিক্ষার্থীদের প্রেরণা

“লেখাপড়া করে যেই গাড়িঘোড়া চড়ে সেই”-এর মধ্যে লুকিয়ে আছে শিক্ষার্থীদের প্রেরণা

আপডেট টাইম : ১২:০১:৫৭ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৯ অগাস্ট ২০২৬

রফিকুল ইসলামঃ: “লেখাপড়া করে যেই, গাড়িঘোড়া চড়ে সেই”- কবি মদনমোহন তর্কালঙ্কারের কবিতার এই পঙক্তিটি আওড়ে শিশু শিক্ষার্থীদের কোমল মনে কাজের স্পৃহা, উদ্দীপনা বা লক্ষ্য অর্জনের তীব্র ইচ্ছা জাগিয়ে তুলতেন হাবিল স্যার।

তিনি বোঝাতেন, পঙক্তিটির মূলভাব হলো মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করলে জ্ঞান অর্জন, জীবনে উন্নতি, ধন-সম্পদ এবং উচ্চ সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদা লাভ করা যায়।

শৈশবের প্রথম স্কুলের স্মৃতি মানুষের মনে আজীবন অম্লান রয়ে যায়। আর সেই স্মৃতির ক্যানভাসে সবচেয়ে উজ্জ্বল রঙে যিনি এঁকে গেছেন, তিনি হলেন প্রাইমারি স্কুলশিক্ষক মো. আনোয়ারুল হক ওরফে হাবিল স্যার।

আশির দশকে তিনি ছিলেন কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলা গোপদিঘী ইউনিয়নে অবস্থিত ১নং বগাদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক। তাঁর বাড়ি পার্শ্ববর্তী ধলাই গ্রামে।

তিনি আমার মতো অনেকেরই আদর্শ ও অনুকরণীয় শিক্ষক ছিলেন। তাঁর জীবনবোধ ছিল সাদাসিধে, কিন্তু শাসন ও আদর্শ ছিল অত্যন্ত দূরদর্শী। হাবিল স্যার বলতেন, “সাদামাটা জীবন আর উচ্চ চিন্তা—এটাই মানুষের আসল পরিচয়।”

শিশু শিক্ষার্থীরা যাতে লক্ষ্যভ্রষ্ট ও ইঁচড়েপাকা না হয় সেজন্য সারাদিন সৎ পথে চলা, ভালো কাজ করা এবং গুরুজনদের আদেশ ও উপদেশ মনে প্রাণে মেনে চলার প্রতিজ্ঞা বা দৃঢ় সংকল্প নিতে শুধাতেন, “সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি, / সারাদিন আমি যেন ভালো হয়ে চলি। / আদেশ করেন যাহা মোর গুরুজনে, / আমি যেন সেই কাজ করি ভালো মনে।”

প্রাথমিক বিদ্যালয় হলো মানুষের জীবনের ভিত্তি গড়ার স্থান, আর হাবিল স্যার হলেন সেই ভিত্তির এক দক্ষ রূপকার। তাঁর উপদেশ আজও হৃদয়ে ঝড় তুলে – “এখন যদি ফাঁকি দাও, তবে সারাজীবনটাই যাবে ফাও।”

হাবিল স্যার পেশাগত জীবনের শুরু থেকেই শুধু পাঠ্যবইয়ের পাতায় নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। তিনি শিক্ষার্থীদের মাঝে বুনে দিয়েছেন সততা, দেশপ্রেম ও নৈতিকতার বীজ। তিনি বোঝাতেন, “বড়দের সম্মান করা এবং ছোটদের স্নেহ করা হলো শিক্ষার প্রথম ধাপ।”

অত্যন্ত সাধারণ জীবনযাপন করা এই শিক্ষাগুরুর চিন্তাভাবনা ছিল সুউচ্চ। পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের প্রতি ছিল তাঁর বিশেষ নজর। বিনাপয়সায় দুর্বল ছাত্রদের বাড়তি সময় দেওয়া এবং ঝরে পড়া রোধে বাড়ি বাড়ি গিয়ে অভিভাবকদের সচেতন করা ছিল তাঁর প্রায় প্রতিদিনের রুটিন।

বিশেষ করে পঞ্চম শ্রেণির সেন্টার পরীক্ষা ও বৃত্তি পরীক্ষার্থীদের পেছনে ছিল তাঁর বাড়তি তদারকি ও শ্রম। পরীক্ষার আগের দিনগুলো প্রতিটি শিক্ষার্থীর জীবনেই এক একটি অগ্নিপরীক্ষা। বিশেষ করে ভোরের শান্ত সময়ে পড়ালেখা করাকে সবচেয়ে কার্যকর মনে করা হয়। কিন্তু গভীর রাত পর্যন্ত জেগে পড়ার পর ভোরবেলা চোখ মেলা যেন এক অসম্ভব যুদ্ধ। শিক্ষকেরা বরাবরই শিক্ষার্থীদের ভোরে ওঠার তাগিদ দেন। কেউ বকাঝকা করেন, কেউ বা বেতের ভয় দেখান।

এক্ষেত্রে হাবিল স্যার ছিলেন পুরোপুরি আলাদা। তিনি ওই সময়ের প্রথাগত শাসনের পথে না হেঁটে বেছে নিয়েছিলেন এমন এক অভিনব দাওয়াই, যা শুনলে আজ হয়তো অনেকেই অবাক হবেন কিংবা হাসবেন, তবে এর কার্যকারিতা ছিল সুদূরপ্রসারী।

আমাদের বাড়ির বাংলো ঘরে আমাদের পড়ানোর জন্য রাত কাটাতেন তিনি। তাঁর উপস্থিতিতে রাত ১১.০০ টা পর্যন্ত উচ্চস্বরে পড়তে হতো সবারই। তারপর ঘুম।

শেষ রাতে বা ভোরে শরীরে পিঁপড়ার দৌড়াদৌড়ি ও কামড়ে সবাই জেগে উঠতাম। তখন হাবিল স্যার বলতেন, উঠেই যখন পরেছিস, আর শোয়ার দরকার নাই। সকাল হয়ে গেছে, পড়া শুরু করে দে। হাবিল স্যার পরম মমতায় বলতেন, “শোন সোনারা, পরিশ্রম কখনো বৃথা যায় না।”

পরে অবশ্য আবিষ্কার করলাম আসলে হাবিল স্যার প্রতি রাতে করতেন কি, আমরা যখন ঘুমিয়ে পরতাম; তখন আমাদের বিছানার চারপাশে লাল চিনি বা গুড় ছিটিয়ে রাখতেন, যাতে পিঁপড়ার উপদ্রবে সবাই ভোরে ঘুম থেকে জেগে ওঠে!

বিছানায় গুড় ছিটিয়ে দিলে মিষ্টির লোভে পিঁপড়া আসত। পিঁপড়ার হালকা কামড়ে শিক্ষার্থীরা কোনো ধরনের মানসিক ভীতি বা ক্ষোভ ছাড়াই নিজে থেকে জেগে উঠত।

শিক্ষার্থীদের ভোরে ঘুম থেকে জাগানোর জন্য বিছানায় গুড় ছিটিয়ে রাখার এই অদ্ভুত ও মিষ্টি আখ্যানটি মূলত হাবিল স্যারের এক অনন্য ও বাস্তব শিক্ষণ কৌশলের অংশ ছিল। অলসতা কাটিয়ে শিক্ষার্থীদের ভোরে জাগাতে এক অভিনব ও চিরস্মরণীয় পদ্ধতি বেছে নিয়েছিলেন তিনি।

পিঁপড়ের কামড়ে ঘুম ভাঙার এই অদ্ভুত ও শাসনমিশ্রিত পরম মমতা আজও আমাদের শিক্ষা দেয়—একজন প্রকৃত শিক্ষক শুধু শ্রেণিকক্ষেই পাঠদান করেন না, শিক্ষার্থীর জীবন গড়তে কতটা নিবেদিতপ্রাণ হতে পারেন।

বাইরে থেকে এই পদ্ধতিকে কঠোর বা অদ্ভুত মনে হলেও, এর ভেতরে লুকিয়ে ছিল এক বাবার মতো গভীর ভালোবাসা। হাবিল স্যার জানতেন, মুখে ডেকে তুললে ছাত্ররা হয়তো কিছুক্ষণ পর আবার ঘুমিয়ে পড়বে। কিন্তু এই উপায়ে তাদের ঘুম ভাঙলে অলসতা কেটে যাবে পুরোপুরি। শিক্ষার্থীরাও স্যারের এই শাসনকে সাদরে বরণ করে নিয়েছিল।

আজকের যান্ত্রিক শিক্ষা ব্যবস্থায় যেখানে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সম্পর্ক শুধু ক্লাসরুম আর জিপিএ-র ফ্রেমে বন্দি, সেখানে হাবিল স্যারদের এই আত্মিক টান এক অনন্য দৃষ্টান্ত যেন।

আশি দশকের প্রাইমারি স্কুলের সেই দিনগুলো ছিল সত্যিই এক দারুণ নস্টালজিয়া! গবেষকদের মতে, মাঝেমধ্যে নস্টালজিয়ায় আক্রান্ত হলে বা পুরনো স্মৃতি মনে করলে মনের জোর ও আত্মবিশ্বাস বাড়ে।

সেই সময় ডিজিটাল স্ক্রিন বা আধুনিক গ্যাজেট ছিল না, কিন্তু পড়াশোনার মধ্যে এক অদ্ভুত সুর, ছন্দ আী

তাগিদ ছিল। সুর করে নামতা পড়তে হতো। ক্লাসের সবাই মিলে একসঙ্গে চিৎকার করে ছন্দ মিলিয়ে “দুই একে দুই, দুই দুগুনে চার” কিংবা “দশে এক এগারো” ও “দশ দশে একশ” পড়ার সেই আওয়াজ পুরো স্কুল কাঁপিয়ে দিত। দলবেঁধে পড়ার সেই আনন্দ আজকের যুগের চেয়ে অনেক আলাদা এবং খাঁটি ছিল।

শ্রুতি লিখনে স্যার বই দেখে রিডিং পড়তেন। শিক্ষার্থীরা মন দিয়ে শোনে খাতায় বা স্লেটে তা নির্ভুলভাবে লিখত।উপরের ক্লাসের শিক্ষার্থীরা দোয়াত-কালি ও ফাউন্টেন পেন দিয়ে লেখত। এতে বানান ও শোনার দক্ষতা বাড়ত। অন্যদিকে হাতের লেখার আলাদা খাতা আনতে হতো। এতে হাবিল স্যার বলতেন, “আজকে যে কষ্ট করে খাতার পাতা ভরবে, আগামী দিনে সে সুন্দর জীবন গড়বে।”

প্রতিদিন অন্তত এক পৃষ্ঠা সুন্দর করে হাতের লেখা ক্লাসে জমা দিতে হতো। হাতের লেখা সুন্দর করার জন্য হাবিল স্যারের কড়া তাগিদ ছিল। উদ্দীপ্ত করতেন এই বলে যে, “হাতের লেখা সুন্দর হওয়া মানে অর্ধেক শিক্ষিত হওয়া।”

তবে, নিচের ক্লাসে কাগজের খাতার চেয়ে পাথরের স্লেট ও চক-পেন্সিলের ব্যবহার ছিল বেশি। ভুল হলে থুতু দিয়ে বা কাপড়ের টুকরো দিয়ে মুছে আবার লেখা হতো। এর হেরফের হলে, চপলতা বা বাঁদরামি করলে কিংবা দুষ্টুমিভরা কাজ থেকে নিবৃত্ত করতে হাবিল স্যার কাব্যিকতা করে লোকছড়াটি বলতেন, “দুষ্টের শিরোমণি লঙ্কার রাজা, / চুপেচুপে খাও তুমি চানাচুর ভাঁজা।”

এর ফলে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা একদিকে যেমন আনন্দিত হতো, অন্যদিকে তাদের চঞ্চলতা কমে আসত আর শ্রেণিকক্ষের পরিবেশও শান্ত হয়ে আসত।

ক্লাসের সেরা ছাত্র বা ‘মনিটর’ সামনে দাঁড়িয়ে নামতা, স্বরবর্ণ বা ইংরেজি কবিতা সুর করে বলত। বাকি পুরো ক্লাস একসুরে তার পেছনে চিৎকার করে তা আবৃত্তি করত।
এই ছন্দবদ্ধ সুরের কারণে পড়া খুব দ্রুত মাথায় গেঁথে যেত। ওই সময় প্রাইমারি স্কুলের পড়াশোনার পদ্ধতি ছিল ভীষণ জীবন্ত এবং মাটির কাছাকাছি।

তখনকার শিক্ষক বা ‘স্যার’দের কড়া শাসন যেমন ছিল, তেমনি শিক্ষকদের প্রতি শিক্ষার্থীদের গভীর শ্রদ্ধা, ভক্তি আর ভালোবাসাও ছিল নিখাদ ও মধুর। তাঁদের ডাকের মধ্যেই এক আলাদা দায়িত্ববোধ লুকিয়ে থাকত।

হাবিল স্যারের সবচেয়ে বড় আদর্শ ছিল তাঁর সময়ানুবর্তিতা, নিরপেক্ষতা, নিঃস্বার্থ নৈতিকতা এবং আদর্শ মানুষ গড়ার গভীর দায়বদ্ধতা। আর নিজের ভোগ-বিলাসের চেয়ে সমাজ ও জাতিকে নৈতিকভাবে সমৃদ্ধ করার স্বপ্ন। তিনি শিশু শিক্ষার্থীদের মূল্যবোধ, শৃঙ্খলা, কঠোর পরিশ্রম এবং নম্রতা শেখাতেন।

এছাড়া শিক্ষার্থীদের মোটিভেশনে তাঁর জুরি ছিল না। জোর করে বা ভয়ের মাধ্যমে না শিখিয়ে, শিশুরা যাতে নিজেই স্বেচ্ছায় এবং আনন্দের সাথে পড়ালেখা ও ক্লাসের কার্যকলাপে অংশ নেয়, সেই মানসিকতা তৈরি করাই তাঁকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছে।

আজ তাঁর হাত ধরে গড়ে ওঠা শিশু শিক্ষার্থীরা সমাজে ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে অধিষ্ঠিত। পদের চেয়েও বড় কথা, তারা অনেকেই হাবিল স্যারের শেখানো ‘ভালো মানুষ’ হওয়ার মন্ত্রটি বুকে ধারণ করে আছেন। সমাজ থেকে অন্যায়, দুর্নীতি ও কুসংস্কার দূর করে একটি আলোকিত সমাজ গঠনে হাবিল স্যারের এই নিঃস্বার্থ সুউচ্চ আদর্শ আজ এক অনন্য ও চিরন্তন উপমান।

হাবিব স্যারের জীবনের এ আদর্শ এবং সমাজ বিনির্মাণে তাঁর অনন্য অবদান সত্যিই অনুপ্রেরণাদায়ক। তিনি তাঁর সততা, কর্মনিষ্ঠা এবং নিঃস্বার্থ সেবার মাধ্যমে সমাজে যে ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছেন, তা বর্তমান ও আগামী প্রজন্মের জন্য একটি উজ্জ্বল নজির।

বিজ্ঞাপন আর বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতার এই যুগে শিক্ষা আজ অনেকটাই পণ্যে রূপান্তরিত। কিন্তু আমাদের হাবিল স্যারদের কাছে শিক্ষা ছিল একটি ব্রত, পবিত্র সাধনা। ভাঙা টিনের চালের নিচে বসে চকের গুঁড়ো মেখে তিনি শুধু আমাদের অঙ্ক বা ব্যাকরণ শেখাতেন না, শিখাতেন কীভাবে একজন সৎ ও মানবিক মানুষ হতে হয়।

বর্তমানের জিপিএ-৫ পাওয়ার অন্ধ দৌড়ে আমরা যখন ক্লান্ত, তখন বারবার মনে পড়ে আশি দশকের সেই নিভৃতচারী শিক্ষাগুরু হাবিল স্যারের কথা, যিনি কোনো বৈষয়িক লোভ ছাড়াই আমাদের ভেতরে বুনে দিয়েছিলেন জীবনের আসল ভিত্তিপ্রস্তর।

হাবিব স্যারের ক্লাসে যাওয়ার জন্য শিশুরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করত। পড়া না পারলে যেখানে শাস্তির ভয় ছিল নিত্যদিনের সঙ্গী, সেখানে হাবিল স্যার নিয়ে এসেছিলেন ভালোবাসার এক নতুন পাঠদান পদ্ধতি।

তিনি খেলার ছলে, গল্পের সুতোয় জটিল সব বিষয়কে সহজ করে তুলতেন। এই নিবন্ধে অনুসন্ধান করব একজন নিভৃতচারী শিক্ষকের সেই জাদুকরী পাঠদান কৌশল এবং তাঁর জীবনের সুউচ্চ আদর্শকে, যা আজ সমাজ বিনির্মাণে এক অনন্য নিদর্শন।

হাবিব স্যারের পাঠদান কৌশল ছিল সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম ও জাদুকরী। তিনি গতানুগতিক ধারা বাদ দিয়ে অভিনব ও টেকসই পদ্ধতিতে ইংরেজি পড়াতেন। ইংরেজি শেখানোর আগে তিনি মাতৃভাষা বা বাংলা ব্যাকরণের ওপর বিশেষ জোর দিতেন।

তিনি বিশ্বাস করতেন, যেকোনো বিদেশি ভাষা ভালোভাবে শিখতে হলে নিজের মাতৃভাষার ব্যাকরণ আগে ভালো করে জানতে হবে। ইংরেজি গ্রামারের জটিল নিয়মগুলোকে তিনি মাতৃভাষার নিয়মের সাথে মিলিয়ে সহজ করে তুলতেন।

তাঁর ক্লাসে পড়াশোনা শুধু মুখস্থ করার বিষয় ছিল না। তিনি যুক্তির মাধ্যমে বিষয়টি বুঝিয়ে দিতেন। তাঁর গম্ভীর ও জাদুকরী কণ্ঠস্বর শিশু শিক্ষার্থীদের সহজে আকৃষ্ট করত। কঠিন বিষয়গুলোকে বাস্তব উদাহরণ ও গল্পের মাধ্যমে সহজ করে তুলতেন। ভয়হীন ও আনন্দঘন পরিবেশে ক্লাস নিয়ে শিক্ষার্থীদের পড়ার প্রতি আগ্রহ বাড়াতেন। এছাড়া লেকচার পদ্ধতির বাইরে গিয়ে প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে প্রতিটি শিক্ষার্থীকে ক্লাসে সক্রিয় রাখা ছিল ক্যারিশমাটিক।

তবে, ভিন্নতাও ছিল। বজ্রের মতো গর্জে ওঠে কয়েক ঘা যে লাগাতেন না তেমন নয়। শিক্ষার্থীদের অমনোযোগীতা বরদাস্ত করতেন না কখনো। হাবিল স্যার বলতেন, “মনোযোগ দিয়ে পাঠদান শুনলে পরীক্ষায় কোনো ভয় নেই।”

প্রাইমারি শিক্ষক হাবিল স্যারের মতো নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষকেরা অনন্য শিক্ষণশৈলীর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের কাছে ছিল রোল মডেল। তিনি শুধু শ্রেণিকক্ষের গণ্ডিতে পাঠদানকে সীমাবদ্ধ রাখেননি, বরং শিক্ষার্থীদের সামগ্রিক বিকাশের জন্য একটি ভারসাম্যপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করেছিলেন।

হাবিল স্যার সহপাঠ্যক্রমিক কার্যকলাপের প্রতিও বিশেষ দৃষ্টি রাখতেন। প্রতিভা অন্বেষণে খেলাধুলা, গান, নাচ, বিতর্ক, গজল, কবিতা আবৃত্তি, কৌতুক ও গল্প বলা বা চিত্রাঙ্কনের মতো বিষয়ে শিক্ষার্থীদের সুপ্ত প্রতিভা খুঁজে বের করতেন।

তাছাড়া খেলাধুলা, বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও প্রতিযোগিতার আয়োজন করে শিক্ষার্থীদের মাঝে আত্মবিশ্বাস ও দলগতভাবে কাজ করার মানসিকতা তৈরি করতেন। মানসিক বিকাশে শুধু মুখস্থ বিদ্যায় সীমাবদ্ধ না রেখে সহপাঠ্যক্রমিক কাজের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল ও সামাজিক গুণাবলির বিকাশ ঘটাতেন। বিশ্বাস ও ইচ্ছা জোগাতেন – “আমিও পারব।”

হাবিল স্যারের সতর্ক বাণী আজও কানে বাজে – “যে জন দিবসে মনের হরষে জ্বালায় মোমের বাতি, / আশু গৃহে তার দেখিবে না আর নিশীথে প্রদীপ বাতি।”

কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদারের ‘সদ্ভাব শতক’ গ্রন্থের ‘অপব্যয়ের ফল’ শীর্ষক বিখ্যাত শ্লোকটি দুই চরণের একটি স্বাধীন নীতিবাক্য। দিনের আলোতে অযথা মোমবাতি জ্বালিয়ে অপচয় করলে, পরে অন্ধকারে বাতির অভাবে কষ্ট পেতে হয়—এই অমোঘ সত্যটিই বুঝিয়েছেন তিনি।

১৯৭৩ সালের ১লা জুলাই অলুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যোগদানের মাধ্যমে হাবিল স্যারের এই মহান শিক্ষকতা পেশা শুরু করেন। পরে ১৯৭৮ সালে ১নং বগাদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যোগদানের মধ্য দিয়ে সুদীর্ঘ সময় ধরে হৃদয়-ছোঁয়া আদর্শ নিয়ে জ্ঞানের আলোয় আলোকিত সমাজ বিনির্মাণে ছেদ টেনে ১৯৯৬ সালে স্বেচ্ছায় অবসরে নেন।

১৯৫২ সালের ১৭ই এপ্রিল মো. আনোয়ারুল হক ওরফে হাবিল স্যারের জন্ম নিভৃত এক পল্লী ধলাই গ্রামে। তিনি ছোটবেলা থেকেই ধর্মপরায়ণ। বর্তমানে দ্বীনের খেদমতে সময় দিচ্ছেন। কিন্তু বার্ধক্যজনিত কারণে বিভিন্ন রোগে শারীরিকভাবে অসুস্থ এবং মানসিকভাবে বিপর্যস্ত সময় পার করছেন।

হাবিল স্যারের মতো গুণী শিক্ষকেরা সমাজের আসল স্তম্ভ। কর্মজীবন শেষে বা জীবনের উত্তরসূরি হিসেবে তাঁর মতো শিক্ষকের প্রতি সমাজের শ্রদ্ধা ও দায়িত্বশীল থাকা অত্যন্ত জরুরি।

তাঁর মতো একজন আদর্শ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক, যিনি হাজারো শিক্ষার্থীর জীবনের ভিত্তি গড়ে দিয়েছেন, তাঁর অন্তিম সায়াহ্নে সমাজ ও তাঁর প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের অনেক বড় দায়িত্ব ও করণীয় রয়েছে।

আজ বড় বড় ডিগ্রিধারী, জিপিএ-৫ পাওয়া সফল মানুষের ভিড়ে আসল ‘মানুষ’ খোঁজা বড় দায় হয়ে পড়েছে। এখানেই অনুভব করা যায় হাবিল স্যারের মতো শিক্ষকদের অপরিহার্যতা। তাঁরা কোনো নাম-যশ বা অর্থবিত্তের পেছনে ছুটেননি, তাঁদের জীবনের একমাত্র সার্থকতা ছিল এক একটি কাঁচা মাটিকে খাঁটি সোনায় রূপ দেওয়া।

তাঁর খড়িমাটির হাত ধরে আমাদের হৃদয়ে যে নৈতিকতার বীজ বুনে দেওয়া হয়েছিল, তা আজও মহীরুহ হয়ে টিকে আছে।

বর্তমানের বাণিজ্যিক শিক্ষার যুগে হাবিল স্যারদের সেই আদর্শকে ফিরিয়ে আনা হয়তো সম্ভব নয়, কিন্তু তাঁদের দেওয়া শিক্ষা বুকে ধারণ করে আমরা অন্তত একজন সৎ নাগরিক হতে পারি।

সময় বদলেছে, বদলেছে পড়ার ধরণও। ডিজিটাল যুগের শিক্ষার্থীরা এখন অ্যালার্ম কিংবা স্মার্টফোনের রিমাইন্ডারে ঘুম থেকে ওঠে। কিন্তু সেই যান্ত্রিক আওয়াজে হাবিল স্যারের মতো দরদ মাখানো ছোঁয়া থাকে না। সমাজ ও শিক্ষা ব্যবস্থার রূপান্তর ঘটলেও, হাবিল স্যারদের মতো নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষকদের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে যায়নি, যিনি নিজের জ্ঞান, আদর্শ ও কর্মের মাধ্যমে সমাজে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

“লেখাপড়া করে যেই, গাড়িঘোড়া চড়ে সেই”- এই আপ্তবাক্য বর্তমান যুগে ‘গাড়িঘোড়া চড়া’ বলতে কেবল দামি গাড়িতে চড়া বোঝায় না, এটি মূলত একজন মানুষের আত্মনির্ভরশীলতা, উচ্চ সামাজিক অবস্থান এবং মেধার জোরে এগিয়ে যাওয়ার প্রতীক। শিশুতোষ ছড়া থেকে শুরু করে বাস্তব জীবনের সাফল্যের চাবিকাঠি হিসেবে এই দর্শনটি আজীবন প্রাসঙ্গিক ও সবচেয়ে বড় প্রেরণার উৎস।

সেল্যুট হে আলোর সারথি, যুগে যুগে আপনার মতো হাবিল স্যারেরাই বেঁচে থাকুন আমাদের চেনা সমাজটার শেষ ভরসা হয়ে – “একটি শিশুর নরম মনে জ্বালিয়ে আলোর বাতি, / গড়ছো তুমি সযতনে আগামী দিনের জাতি।”

লেখক: সহযোগী সম্পাদক, আজকের সূর্যোদয়, ঢাকা