ঢাকা ০৩:০২ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬, ১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর ও বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের গতিপ্রকৃতি

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১১:৪১:১৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬
  • ৪ বার
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফরের তাৎপর্য এবং বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের দীর্ঘ প্রায় একান্ন বছরের সাফল্য ও সীমাবদ্ধতা আলোচনার জন্য এ লেখার অবতারণা। নির্বাচনে জয়লাভ করে ক্ষমতা গ্রহণের পর প্রথম বিদেশ সফরে বাংলাদেশের সরকারপ্রধান মালয়েশিয়া ও চীনকে বেছে নেন।

২১ জুন ২০২৬ তিনি মালয়েশিয়া সফর করেন এবং দেশটির প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহীমসহ বেশ কয়েকজন মালয়েশীয় মন্ত্রীর সঙ্গে স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়াদি নিয়ে সফল আলোচনার পর ২২ জুন তিনি চীনের দালিয়ানে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ‘নিউ চ্যাম্পিয়নস’-এর ১৭তম বার্ষিক সভায় যোগদানের উদ্দেশ্যে রওনা হন।

২৩ জুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ফোরামের কয়েকটি সেশনে অংশগ্রহণ করে ভাষণ প্রদান করেন। দালিয়ান থেকে ট্রেনযোগে ২৪ জুন বেইজিং পৌঁছান। চীনের রাজধানীতে তিনি প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং এবং প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং এর সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন।

সফর শেষে ২৬ জুন বিকেলে তিনি দেশে প্রত্যাবর্তন করেন।চীনের প্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্ট ছাড়াও দেশটির পানি সম্পদমন্ত্রী লি গোয়োইংসহ বিভিন্ন শিল্পগোষ্ঠীর শীর্ষ নির্বাহীদের সঙ্গে বাংলাদেশের সরকারপ্রধান ও তার প্রতিনিধিদলের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

উভয় দেশের রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে আলোচনা শেষে প্রকাশিত ইশতেহারে বাংলাদেশ ও চীন ‘অভিন্ন ভবিষ্যৎ’ ও ‘অংশীদারত্ব’ প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেন। চীন সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দিয়েছে যে, ‘চীন বাংলাদেশকে জাতীয় স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা সমুন্নত রাখতে এবং বিদেশি হস্তক্ষেপ প্রত্যাখ্যান করতে সমর্থন করে’।

এশীয় অঞ্চল এবং বৈশ্বিক ভূরাজনীতির বর্তমান প্রেক্ষাপটে চীনের সমর্থন বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।বাংলাদেশের সরকারপ্রধানের সঙ্গে সাক্ষাৎকালে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বলেন, বিশ্বে যেকোনো পরিবর্তন আসুক, চীন বাংলাদেশের ‘বিশ্বস্ত ভালো বন্ধু, সুপ্রতিবেশী এবং নির্ভরযোগ্য অংশীদার’ হিসেবে পাশে থাকবে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও আশা প্রকাশ করেন যে, চীন বাংলাদেশের মূল্যবান ও বিশ্বস্ত উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে ভবিষ্যতেও সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে। চীন তাদের উচ্চমানের অঞ্চল ও পথের উদ্যোগ (বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ) এগিয়ে নেওয়া, অর্থনীতি, বাণিজ্য, যোগাযোগ ব্যবস্থা, কৃষি, প্রযুক্তি, সবুজ জ্বালানি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সহযোগিতা করবে।

সরকারপ্রধান ও মন্ত্রীপর্যায়ের বৈঠকে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বিনিয়োগ, বাণিজ্য সম্প্রসারণ, অবকাঠামো উন্নয়ন, পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং প্রতিরক্ষা সহযোগীতার বিষয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়।

এ ছাড়া রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে চীন বাংলাদেশের পাশে থাকার আশ্বাস দেয়।প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং চীন–মিয়ানমার–বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ও যোগাযোগ করিডর স্থাপন ও বাস্তবায়নের প্রস্তাবও দিয়েছে। উক্ত করিডর বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের সড়ক ও রেলওয়ে, বন্দর এবং বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে চীনা বিনিয়োগ আসার সুযোগ সৃষ্টি হবে। এর ফলে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও চীনের বাজারে বাংলাদেশী পণ্যের প্রবেশ সহজ হবে।

চীন বাংলাদেশের মোংলা সমুদ্র বন্দরের উন্নয়ন ও আধুনিকায়নের জন্য ৪০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ সচল করবে। চীন তিস্তা নদী প্রকল্পে সহযোগিতার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এ ছাড়া ব্রিকস-এ বাংলাদেশের অংশগ্রহণের আবেদনেও চীন সমর্থন করবে।

এ সফরে বাংলাদেশ সাথে চীনের মোট ১৭টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর মধ্যে ১৩টি দু’দেশের মন্ত্রণালয় পর্যায়ে, ৩টি বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) সঙ্গে চীনের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের এবং ১টি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও চীনের কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে স্বাক্ষরিত হয়।

বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে আভাষ পাওয়া যায় যে, এ সফর শেষে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে ঋণ সহায়তা ও সরাসরি অনুদান বাবদ ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার পাওয়া যেতে পারে। প্রধানমন্ত্রীর এ সফর থেকে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়ে যে, বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক আগামীতে নতুন উচ্চতায় উন্নীত হবে।

গণচীন ১৯৭৫ সালের আগস্টে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান করে। একই বছরের অক্টোবরে দুই দেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়। চীনের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে যোগাযোগ স্থাপিত হয় ১৯৭৭ সালে। তৎকালীন সেনাপ্রধান ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সালে চীন সফরে গেলে তাকে চীনা প্রধানমন্ত্রী চৌ এনলাই বিমানবন্দরে স্বাগত জানান। পরবর্তীতে ১৯৮০ সালে প্রেসিডেন্ট হিসেবেও জেনারেল জিয়াউর রহমান পুনরায় চীন সফর করেন।

বিদেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের সম্পর্কের মৌলিক নীতি হচ্ছে সব ধরণের সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা এবং বাণিজ্য  ও অর্থনৈতিক স্বার্থকে সবার ওপরে জায়গা দেওয়া। ১৯৭৫ সালের অক্টোবরে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের মৌলিক চরিত্র বদলায়নি।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াও বেশ কয়েকবার চীনে রাষ্ট্রীয় সফরে গমন করেন। শেখ হাসিনার সরকারের সময় চীনের সহায়তায় অনেক বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। ২০১৬ সালে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এর ঢাকা সফরে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছে। এ সফরে বাংলাদেশের অবকাঠামো, জ্বালানি ও শিল্পখাতে চীনের অর্থায়নে বেশ ক’টি প্রকল্প বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

সামরিক, স্বৈরাচার বা গণতান্ত্রিক যেকোনো সরকার থাকুক না কেন বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক কখনো খারাপ হয়নি।

চীন বর্তমানে বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ চীন থেকে ২২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি মূল্যের পণ্য আমদানি করেছে। একই সময়ে বাংলাদেশ চীনে প্রায় ৮৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। আমদানির বেশিরভাগই শিল্পায়ন ও রপ্তানিমুখী উৎপাদনের প্রয়োজনীয় কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি এবং মধ্যবর্তী শিল্পপণ্য।

২০১৫ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশে চীনের প্রতিশ্রুত বিনিয়োগের পরিমাণ ৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি। বেশির ভাগ ঋণ ছিল অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য। পদ্মা সেতুর রেল সংযোগ, পায়রা তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং কর্ণফুলী টানেল ছিল চীনের ঋণসহায়তায় বাস্তবায়িত উল্লেখযোগ্য প্রকল্পগুলোর মধ্যে অন্যতম।

অনেকের মতে চীন সাপ্লাইয়ার্স ক্রেডিটে নির্মিত বেশ কয়েকটি প্রকল্প ছিল অতিমূল্যায়িত। ইতিমধ্যে পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে রেল সংযোগ এবং কর্ণফুলী টানেল প্রকল্পের ঋণ পরিশোধ শুরু হয়েছে। কিন্তু এসব প্রকল্পের আয় থেকে ঋণ পরিশোধের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান হচ্ছে না। চীনের জি টু জি ঋনের আওতায় প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় রাষ্ট্রীয় স্বার্থ বিবেচনায় প্রশাসনিক দক্ষতার সঙ্গে দরকষাকষি না করলে ভবিষ্যতেও অতিমূল্যায়িত প্রকল্প গ্রহণের ঝুঁকি থাকতে পারে।
চীনের ঋণসহায়তায় বেশ কয়েকটি উন্নয়ন প্রকল্প এখনো চলমান। এগুলো যেন বাধাগ্রস্থ না হয়, সেদিকে বাংলাদেশ ও চীন সরকারকে লক্ষ্য রাখতে হবে। যেহেতু সরকার পরিবর্তন ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে অনেক প্রকল্পের কাজ স্থগিত রয়েছে, এসব প্রকল্প চালু করে ঋণের সুদ হার কমানো এবং পরিশোধের সময়সীমা বাড়ানোর বিষয়ে বাংলাদেশ সরকার  চীনের সঙ্গে আলোচনা করতে পারে।

বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ বছরে প্রায় ২২ থেকে ২৪ বিলিয়ন ডলার। তবে আমদানির তুলনায় বাংলাদেশের রপ্তানি খুবই সামান্য। আমাদের বাণিজ্য ঘাটতি প্রায় ২২ বিলিয়ন ডলার। যদিও বাংলাদেশের ৯৭ শতাংশ পণ্যে চীন শুল্কমুক্ত রপ্তানিসুবিধা প্রদান করেছে, অপ্রতুল চাহিদার কারণে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকগণ চীনের বাজারে তেমন সুবিধা করতে পারছে না।

বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর লক্ষ্যে উচ্চমানের তৈরী পোশাক, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, সামুদ্রিক মাছ, পাট ও পাটজাত দ্রব্য ইত্যাদি রপ্তানি বাড়ানোর জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা এবং ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত। তা ছাড়া নতুন সমঝোতা অনুযায়ী কৃষিপণ্য ও ওষুধ রপ্তানি শুরু হলে বাণিজ্য ঘাটতি ২ থেকে ৩ শতাংশ কমতে পারে।

ঋণ সহায়তা ছাড়াও চীন সরকার কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা অনুদান সহায়তায় নির্মাণ করে দিয়েছে। উল্লেখযোগ্য স্থাপনাগুলোর মধ্যে রয়েছে ৯টি বড় ও মাঝারি আকারের বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতু, ঢাকার বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র ও পূর্বাচলে আন্তর্জাতিক ট্রেড ফেয়ার সেন্টার।

বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় এক হাজার চীনা প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন খাতে ব্যবসা ও বিনিয়োগ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তৈরী পোশাক, বিদ্যুৎ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, নির্মাণ ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে চীনা বিনিয়োগে প্রতিষ্ঠিত শিল্পপ্রতিষ্ঠানে বহু লোকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

ডিজিটাল রূপান্তরেও চীনের অবদান দৃশ্যমান। টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক, ফাইবার অপটিক অবকাঠামো, ডাটা সেন্টার, ক্লাউড কম্পিউটিং এবং স্মার্ট প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চীনা প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার হচ্ছে। দেশের ইলেকট্রনিক পণ্য, ল্যাপটপ কম্পিউটার, মোবাইল ফোনসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিপণ্য উৎপাদনে চীনা প্রযুক্তি, যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল একচেটিয়া ব্যবহৃত হচ্ছে।

কৃষিক্ষেত্রে চীনের সরবরাহকৃত উন্নতমানের প্রযুক্তি, উচ্চফলনশীল বীজ এবং আধুনিক কৃষিযন্ত্র বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের উল্লেখযোগ্য অর্জন হচ্ছে—বেশকিছু প্রকল্পে নতুন বিনিয়োগের চুক্তি এবং চলমান স্থগিত উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর অর্থায়ন নিশ্চিত করা। চীন বাংলাদেশের নতুন সরকারকে আশ্বস্ত করেছে যে, বাংলাদেশ চীনের দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত অগ্রাধিকারের অংশ হিসেবে থাকবে। উপরন্তু বিএনপি সরকার নতুনভাবে ক্ষমতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের মাধ্যমে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে একটি বৃহৎ রাষ্ট্রের আস্থা অর্জন করতে পেরেছে। তবে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে এগুতে হবে।

মোংলা সমুদ্রবন্দরের আধুনিকায়ন এবং তিস্তা প্রকল্প চীনের সহায়তায় করার আগ্রহকে ভারত ইতিবাচকভাবে নিচ্ছে না। তা ছাড়া বাংলাদেশ–মিয়ানমার–চীন অর্থনৈতিক করিডর বাস্তবায়নের উদ্যোগও ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত উদ্বেগের কারণ হতে পারে বলে অভিজ্ঞ মহলের ধারণা।

বাংলাদেশে চীনের বৃহৎ বিনিয়োগ গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রতিটি প্রকল্পের অনুকূল অর্থনৈতিক রিটার্ণ (ইআরআর) প্রাপ্তির বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। চীনের কাছ থেকে বিপুল ঋণ গ্রহণ করে শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান এবং আফ্রিকার কয়েকটি দেশ ঋনের ফাঁদে পড়ে গেছে। এসব দেশের অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশের শিক্ষা নেওয়া প্রয়োজন।

বিনিয়োগ আকর্ষণই বড় কথা নয়; সেই বিনিয়োগ যথাযথভাবে কাজে লাগানোর জন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, প্রশাসনিক সক্ষমতা, নীতির ধারাবাহিকতা এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করা অপরিহার্য।

চীনের সঙ্গে সম্পর্ক আরো জোরদার করার পাশাপাশি বাংলাদেশের নিকটতম প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে বিবাদমান সমস্যা নিরসন করে পারস্পরিক সম্পর্ক উন্নয়নের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। তা ছাড়া ইতিমধ্যে বাংলাদেশ আমেরিকার সঙ্গে যে বাণিজ্য চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে, তার প্রেক্ষিতে ভবিষ্যতে চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ক স্থাপনে জটিলতা হতে পারে। তাই বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ও কূটনীতির ক্ষেত্রে আস্থার সংকট কাটিয়ে বাংলাদেশের স্বার্থ অক্ষুন্ন রেখে সকলের সাথে ভারসাম্যপূর্ণ ও বন্ধুত্বমূলক সম্পর্ক স্থাপনের জন্য প্রশাসনিক ও কূটনৈতিক সামর্থ ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা জরুরি।

কোনো নির্দিষ্ট শক্তি বা রাষ্ট্রজোটের সঙ্গে জোটবদ্ধ না হয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি—‘সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গে বৈরিতা নয়’—অনুসরণ করে সব দেশের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও স্বার্থভিত্তিক সম্পর্ক বজায় রাখাই হবে দেশের জন্য সর্বোত্তম পথ।

লেখক

মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া
সাবেক সিনিয়র সচিব ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান, সাবেক রাষ্ট্রদূত।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর ও বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের গতিপ্রকৃতি

আপডেট টাইম : ১১:৪১:১৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফরের তাৎপর্য এবং বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের দীর্ঘ প্রায় একান্ন বছরের সাফল্য ও সীমাবদ্ধতা আলোচনার জন্য এ লেখার অবতারণা। নির্বাচনে জয়লাভ করে ক্ষমতা গ্রহণের পর প্রথম বিদেশ সফরে বাংলাদেশের সরকারপ্রধান মালয়েশিয়া ও চীনকে বেছে নেন।

২১ জুন ২০২৬ তিনি মালয়েশিয়া সফর করেন এবং দেশটির প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহীমসহ বেশ কয়েকজন মালয়েশীয় মন্ত্রীর সঙ্গে স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়াদি নিয়ে সফল আলোচনার পর ২২ জুন তিনি চীনের দালিয়ানে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ‘নিউ চ্যাম্পিয়নস’-এর ১৭তম বার্ষিক সভায় যোগদানের উদ্দেশ্যে রওনা হন।

২৩ জুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ফোরামের কয়েকটি সেশনে অংশগ্রহণ করে ভাষণ প্রদান করেন। দালিয়ান থেকে ট্রেনযোগে ২৪ জুন বেইজিং পৌঁছান। চীনের রাজধানীতে তিনি প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং এবং প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং এর সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন।

সফর শেষে ২৬ জুন বিকেলে তিনি দেশে প্রত্যাবর্তন করেন।চীনের প্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্ট ছাড়াও দেশটির পানি সম্পদমন্ত্রী লি গোয়োইংসহ বিভিন্ন শিল্পগোষ্ঠীর শীর্ষ নির্বাহীদের সঙ্গে বাংলাদেশের সরকারপ্রধান ও তার প্রতিনিধিদলের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

উভয় দেশের রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে আলোচনা শেষে প্রকাশিত ইশতেহারে বাংলাদেশ ও চীন ‘অভিন্ন ভবিষ্যৎ’ ও ‘অংশীদারত্ব’ প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেন। চীন সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দিয়েছে যে, ‘চীন বাংলাদেশকে জাতীয় স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা সমুন্নত রাখতে এবং বিদেশি হস্তক্ষেপ প্রত্যাখ্যান করতে সমর্থন করে’।

এশীয় অঞ্চল এবং বৈশ্বিক ভূরাজনীতির বর্তমান প্রেক্ষাপটে চীনের সমর্থন বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।বাংলাদেশের সরকারপ্রধানের সঙ্গে সাক্ষাৎকালে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বলেন, বিশ্বে যেকোনো পরিবর্তন আসুক, চীন বাংলাদেশের ‘বিশ্বস্ত ভালো বন্ধু, সুপ্রতিবেশী এবং নির্ভরযোগ্য অংশীদার’ হিসেবে পাশে থাকবে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও আশা প্রকাশ করেন যে, চীন বাংলাদেশের মূল্যবান ও বিশ্বস্ত উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে ভবিষ্যতেও সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে। চীন তাদের উচ্চমানের অঞ্চল ও পথের উদ্যোগ (বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ) এগিয়ে নেওয়া, অর্থনীতি, বাণিজ্য, যোগাযোগ ব্যবস্থা, কৃষি, প্রযুক্তি, সবুজ জ্বালানি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সহযোগিতা করবে।

সরকারপ্রধান ও মন্ত্রীপর্যায়ের বৈঠকে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বিনিয়োগ, বাণিজ্য সম্প্রসারণ, অবকাঠামো উন্নয়ন, পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং প্রতিরক্ষা সহযোগীতার বিষয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়।

এ ছাড়া রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে চীন বাংলাদেশের পাশে থাকার আশ্বাস দেয়।প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং চীন–মিয়ানমার–বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ও যোগাযোগ করিডর স্থাপন ও বাস্তবায়নের প্রস্তাবও দিয়েছে। উক্ত করিডর বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের সড়ক ও রেলওয়ে, বন্দর এবং বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে চীনা বিনিয়োগ আসার সুযোগ সৃষ্টি হবে। এর ফলে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও চীনের বাজারে বাংলাদেশী পণ্যের প্রবেশ সহজ হবে।

চীন বাংলাদেশের মোংলা সমুদ্র বন্দরের উন্নয়ন ও আধুনিকায়নের জন্য ৪০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ সচল করবে। চীন তিস্তা নদী প্রকল্পে সহযোগিতার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এ ছাড়া ব্রিকস-এ বাংলাদেশের অংশগ্রহণের আবেদনেও চীন সমর্থন করবে।

এ সফরে বাংলাদেশ সাথে চীনের মোট ১৭টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর মধ্যে ১৩টি দু’দেশের মন্ত্রণালয় পর্যায়ে, ৩টি বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) সঙ্গে চীনের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের এবং ১টি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও চীনের কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে স্বাক্ষরিত হয়।

বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে আভাষ পাওয়া যায় যে, এ সফর শেষে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে ঋণ সহায়তা ও সরাসরি অনুদান বাবদ ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার পাওয়া যেতে পারে। প্রধানমন্ত্রীর এ সফর থেকে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়ে যে, বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক আগামীতে নতুন উচ্চতায় উন্নীত হবে।

গণচীন ১৯৭৫ সালের আগস্টে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান করে। একই বছরের অক্টোবরে দুই দেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়। চীনের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে যোগাযোগ স্থাপিত হয় ১৯৭৭ সালে। তৎকালীন সেনাপ্রধান ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সালে চীন সফরে গেলে তাকে চীনা প্রধানমন্ত্রী চৌ এনলাই বিমানবন্দরে স্বাগত জানান। পরবর্তীতে ১৯৮০ সালে প্রেসিডেন্ট হিসেবেও জেনারেল জিয়াউর রহমান পুনরায় চীন সফর করেন।

বিদেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের সম্পর্কের মৌলিক নীতি হচ্ছে সব ধরণের সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা এবং বাণিজ্য  ও অর্থনৈতিক স্বার্থকে সবার ওপরে জায়গা দেওয়া। ১৯৭৫ সালের অক্টোবরে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের মৌলিক চরিত্র বদলায়নি।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াও বেশ কয়েকবার চীনে রাষ্ট্রীয় সফরে গমন করেন। শেখ হাসিনার সরকারের সময় চীনের সহায়তায় অনেক বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। ২০১৬ সালে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এর ঢাকা সফরে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছে। এ সফরে বাংলাদেশের অবকাঠামো, জ্বালানি ও শিল্পখাতে চীনের অর্থায়নে বেশ ক’টি প্রকল্প বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

সামরিক, স্বৈরাচার বা গণতান্ত্রিক যেকোনো সরকার থাকুক না কেন বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক কখনো খারাপ হয়নি।

চীন বর্তমানে বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ চীন থেকে ২২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি মূল্যের পণ্য আমদানি করেছে। একই সময়ে বাংলাদেশ চীনে প্রায় ৮৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। আমদানির বেশিরভাগই শিল্পায়ন ও রপ্তানিমুখী উৎপাদনের প্রয়োজনীয় কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি এবং মধ্যবর্তী শিল্পপণ্য।

২০১৫ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশে চীনের প্রতিশ্রুত বিনিয়োগের পরিমাণ ৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি। বেশির ভাগ ঋণ ছিল অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য। পদ্মা সেতুর রেল সংযোগ, পায়রা তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং কর্ণফুলী টানেল ছিল চীনের ঋণসহায়তায় বাস্তবায়িত উল্লেখযোগ্য প্রকল্পগুলোর মধ্যে অন্যতম।

অনেকের মতে চীন সাপ্লাইয়ার্স ক্রেডিটে নির্মিত বেশ কয়েকটি প্রকল্প ছিল অতিমূল্যায়িত। ইতিমধ্যে পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে রেল সংযোগ এবং কর্ণফুলী টানেল প্রকল্পের ঋণ পরিশোধ শুরু হয়েছে। কিন্তু এসব প্রকল্পের আয় থেকে ঋণ পরিশোধের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান হচ্ছে না। চীনের জি টু জি ঋনের আওতায় প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় রাষ্ট্রীয় স্বার্থ বিবেচনায় প্রশাসনিক দক্ষতার সঙ্গে দরকষাকষি না করলে ভবিষ্যতেও অতিমূল্যায়িত প্রকল্প গ্রহণের ঝুঁকি থাকতে পারে।
চীনের ঋণসহায়তায় বেশ কয়েকটি উন্নয়ন প্রকল্প এখনো চলমান। এগুলো যেন বাধাগ্রস্থ না হয়, সেদিকে বাংলাদেশ ও চীন সরকারকে লক্ষ্য রাখতে হবে। যেহেতু সরকার পরিবর্তন ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে অনেক প্রকল্পের কাজ স্থগিত রয়েছে, এসব প্রকল্প চালু করে ঋণের সুদ হার কমানো এবং পরিশোধের সময়সীমা বাড়ানোর বিষয়ে বাংলাদেশ সরকার  চীনের সঙ্গে আলোচনা করতে পারে।

বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ বছরে প্রায় ২২ থেকে ২৪ বিলিয়ন ডলার। তবে আমদানির তুলনায় বাংলাদেশের রপ্তানি খুবই সামান্য। আমাদের বাণিজ্য ঘাটতি প্রায় ২২ বিলিয়ন ডলার। যদিও বাংলাদেশের ৯৭ শতাংশ পণ্যে চীন শুল্কমুক্ত রপ্তানিসুবিধা প্রদান করেছে, অপ্রতুল চাহিদার কারণে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকগণ চীনের বাজারে তেমন সুবিধা করতে পারছে না।

বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর লক্ষ্যে উচ্চমানের তৈরী পোশাক, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, সামুদ্রিক মাছ, পাট ও পাটজাত দ্রব্য ইত্যাদি রপ্তানি বাড়ানোর জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা এবং ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত। তা ছাড়া নতুন সমঝোতা অনুযায়ী কৃষিপণ্য ও ওষুধ রপ্তানি শুরু হলে বাণিজ্য ঘাটতি ২ থেকে ৩ শতাংশ কমতে পারে।

ঋণ সহায়তা ছাড়াও চীন সরকার কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা অনুদান সহায়তায় নির্মাণ করে দিয়েছে। উল্লেখযোগ্য স্থাপনাগুলোর মধ্যে রয়েছে ৯টি বড় ও মাঝারি আকারের বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতু, ঢাকার বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র ও পূর্বাচলে আন্তর্জাতিক ট্রেড ফেয়ার সেন্টার।

বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় এক হাজার চীনা প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন খাতে ব্যবসা ও বিনিয়োগ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তৈরী পোশাক, বিদ্যুৎ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, নির্মাণ ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে চীনা বিনিয়োগে প্রতিষ্ঠিত শিল্পপ্রতিষ্ঠানে বহু লোকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

ডিজিটাল রূপান্তরেও চীনের অবদান দৃশ্যমান। টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক, ফাইবার অপটিক অবকাঠামো, ডাটা সেন্টার, ক্লাউড কম্পিউটিং এবং স্মার্ট প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চীনা প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার হচ্ছে। দেশের ইলেকট্রনিক পণ্য, ল্যাপটপ কম্পিউটার, মোবাইল ফোনসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিপণ্য উৎপাদনে চীনা প্রযুক্তি, যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল একচেটিয়া ব্যবহৃত হচ্ছে।

কৃষিক্ষেত্রে চীনের সরবরাহকৃত উন্নতমানের প্রযুক্তি, উচ্চফলনশীল বীজ এবং আধুনিক কৃষিযন্ত্র বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের উল্লেখযোগ্য অর্জন হচ্ছে—বেশকিছু প্রকল্পে নতুন বিনিয়োগের চুক্তি এবং চলমান স্থগিত উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর অর্থায়ন নিশ্চিত করা। চীন বাংলাদেশের নতুন সরকারকে আশ্বস্ত করেছে যে, বাংলাদেশ চীনের দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত অগ্রাধিকারের অংশ হিসেবে থাকবে। উপরন্তু বিএনপি সরকার নতুনভাবে ক্ষমতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের মাধ্যমে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে একটি বৃহৎ রাষ্ট্রের আস্থা অর্জন করতে পেরেছে। তবে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে এগুতে হবে।

মোংলা সমুদ্রবন্দরের আধুনিকায়ন এবং তিস্তা প্রকল্প চীনের সহায়তায় করার আগ্রহকে ভারত ইতিবাচকভাবে নিচ্ছে না। তা ছাড়া বাংলাদেশ–মিয়ানমার–চীন অর্থনৈতিক করিডর বাস্তবায়নের উদ্যোগও ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত উদ্বেগের কারণ হতে পারে বলে অভিজ্ঞ মহলের ধারণা।

বাংলাদেশে চীনের বৃহৎ বিনিয়োগ গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রতিটি প্রকল্পের অনুকূল অর্থনৈতিক রিটার্ণ (ইআরআর) প্রাপ্তির বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। চীনের কাছ থেকে বিপুল ঋণ গ্রহণ করে শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান এবং আফ্রিকার কয়েকটি দেশ ঋনের ফাঁদে পড়ে গেছে। এসব দেশের অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশের শিক্ষা নেওয়া প্রয়োজন।

বিনিয়োগ আকর্ষণই বড় কথা নয়; সেই বিনিয়োগ যথাযথভাবে কাজে লাগানোর জন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, প্রশাসনিক সক্ষমতা, নীতির ধারাবাহিকতা এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করা অপরিহার্য।

চীনের সঙ্গে সম্পর্ক আরো জোরদার করার পাশাপাশি বাংলাদেশের নিকটতম প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে বিবাদমান সমস্যা নিরসন করে পারস্পরিক সম্পর্ক উন্নয়নের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। তা ছাড়া ইতিমধ্যে বাংলাদেশ আমেরিকার সঙ্গে যে বাণিজ্য চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে, তার প্রেক্ষিতে ভবিষ্যতে চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ক স্থাপনে জটিলতা হতে পারে। তাই বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ও কূটনীতির ক্ষেত্রে আস্থার সংকট কাটিয়ে বাংলাদেশের স্বার্থ অক্ষুন্ন রেখে সকলের সাথে ভারসাম্যপূর্ণ ও বন্ধুত্বমূলক সম্পর্ক স্থাপনের জন্য প্রশাসনিক ও কূটনৈতিক সামর্থ ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা জরুরি।

কোনো নির্দিষ্ট শক্তি বা রাষ্ট্রজোটের সঙ্গে জোটবদ্ধ না হয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি—‘সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গে বৈরিতা নয়’—অনুসরণ করে সব দেশের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও স্বার্থভিত্তিক সম্পর্ক বজায় রাখাই হবে দেশের জন্য সর্বোত্তম পথ।

লেখক

মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া
সাবেক সিনিয়র সচিব ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান, সাবেক রাষ্ট্রদূত।