রফিকুল ইসলামঃ জলদস্যু ও নৌ-ডাকাতের দৌরাত্ম্য এতই বেড়েছে যে, হাওরাঞ্চলের গ্রামগুলোও নিরাপদ নয় – অরক্ষিত। বর্তমানে বিভিন্ন গ্রামে ও পাড়ায় পাহারাদার বসানো হলেও চোখের সামনে দিয়ে ডাকাত ঘুরাঘুরি করে, অথচ ভয়ে কিছুই করতে পারছে না কেউ।
পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে জানা যায়, মসজিদের মাইকে ডাকাতদের উপস্থিতির ঘোষণা দেওয়ায় ডাকাতরা ডাকাতি করতে না পেরে মসজিদের মুয়াজ্জিন আবদুল মতিনকে প্রাণনাশের হুমকি দিয়েছে।
আবদুল মতিন বলেন, ‘আমি এই গ্রামেরই মানুষ। মানুষের প্রয়োজনে মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিই। এখন যদি সেই দায়িত্ব পালন করায় ডাকাতদের হুমকি খেতে হয়, তাহলে আমরা কোথায় যাব?’
এটি একদিকে যেমন পেশাগত দায়িত্ব পালনকারী একজন নাগরিকের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা চরমভাবে বিঘ্নিত করে, অন্যদিকে অপরাধীদের দুঃসাহস ও সামাজিক সুরক্ষার জন্য বড়ো ধরনের হুমকি হিসেবে কাজ করে।
মাইকে ঘোষণা দেওয়ার কারণে ডাকাত দল ক্ষিপ্ত হয়ে মুয়াজ্জিনের ওপর সরাসরি হামলা চালাতে পারে, যা তার জীবনের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। এছাড়া অপরাধ প্রতিরোধে সাধারণ মানুষ বা জনপ্রতিনিধিরা যখন দেখেন যে, মসজিদের মতো পবিত্র স্থান থেকে ডাকাত তাড়াতে ঘোষণা দিতে গিয়ে উল্টো হুমকির মুখে পড়তে হয়, তখন তারা পরবর্তীকালে ডাকাত বা অপরাধীদের বিরুদ্ধে এগিয়ে আসতে ভয় পাবেন।
ডাকাতরা যদি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বা স্থানীয় প্রতিরোধকারীদেরও হুমকি দিয়ে পার পেয়ে যায়, তবে তাদের অপরাধ করার প্রবণতা ও মনোবল বহুগুণ বেড়ে যায়।
এমন উদ্বেগজনক ও ভীতিকর ঘটনাটি ঘটেছে হাওর অধ্যুষিত জেলা কিশোরগঞ্জের ইটনা উপজেলার ছিলনী গ্রামে।
সমগ্র হাওরাঞ্চজুড়ে ডাকাতির লোমহর্ষক খবর অহরহ গৌণমাধ্যম ও গণমাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে। গত ১৪ই জুলাই পত্রিকায় প্রকাশিত শিরোনাম – হাওরে একের পর এক ডাকাতি, জনমনে আতঙ্ক।
দৃশ্যত, দেশের এক-পঞ্চমাংশ ভূখণ্ডের জনবিচ্ছিন্ন এই দুর্গম বিস্তীর্ণ এলাকাটি জলদস্যু ও চোর-ডাকাত এবং মাদকব্যবসায়ী-সহ বিভিন্ন অপরাধীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে।
হাওরাঞ্চলে বর্ষাকালে নৌ-ডাকাতি একটি বড় ধরনের নিরাপত্তা সমস্যা। ঘন জলপথ, যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা এবং নিরাপত্তা টহলের অভাবের কারণে জলদস্যুরা হরহামেশাই যাত্রীবাহী নৌকা ও ব্যবসায়ীদের গবাদিপশু এবং মালামাল লুট করে থাকে।
বিশাল জলরাশি আর দিগন্তজোড়া সবুজের চাদরে ঘেরা বৃহত্তর হাওরাঞ্চল যেন এক প্রাকৃতিক মায়াজাল। তবে প্রকৃতির এই শান্ত ও নির্জন ক্যানভাসে ছন্দপতন ঘটিয়েছে জলদস্যু ও চোর-ডাকাতসহ বিভিন্ন অপরাধীদের দৌরাত্ম্য। রাতের নিস্তব্ধতায় তাদের আনাগোনা আর আতঙ্কিত মানুষের আর্তনাদ যেন হাওরের চিরায়ত শান্ত রূপকে এক বিষণ্ণ ও রূঢ় বাস্তবতায় পরিণত করেছে। নৈসর্গিক হাওরের সৌন্দর্য ও বিশালতার আড়ালে যেন তাদের এক স্বস্তি ও নিরাপদ ঠিকানা!
হাওরের অথৈ জল আর মুক্ত বাতাস এক অনন্য অনুভূতির সৃষ্টি করে। কিন্তু দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থা ও জনবিচ্ছিন্নতার সুযোগ নিয়ে এই জনপদে সক্রিয় হয়ে উঠেছে বৃহৎ অপরাধী চক্র। দিনভর কোলাহলের পর সন্ধ্যা নামতেই যখন হাওর নীরব হয়ে পড়ে, তখন সশস্ত্র সংঘবদ্ধ বহুদলে বিভক্ত জলদস্যু ও ডাকাতের হানা সেখানকার সুরম্য পরিবেশকে এক ভীতিকর রণক্ষেত্রে পরিণত করে তুলেছে।
হাওর এলাকার বিস্তীর্ণ ভৌগোলিক অবস্থান দুর্ধর্ষ ও ভয়ঙ্কর এসব অপরাধীদের জন্য এক নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করছে। যার ফলে সম্প্রতি জলদস্যুপনা, চুরি-ডাকাতি, ছিনতাই ও রাহাজানির মতো জঘন্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে গেছে। এখন তো অন্ধকারও লাগে না, দিনের আলোতেই ডাকাতরা হামলা দিচ্ছে। এতে ভেঙে পড়েছে আইনশৃঙ্খলার সার্বিক পরিস্থিতি।
দেশের এক-পঞ্চমাংশ ভূখণ্ডের ২৭ হাজারেরও অধিক গ্রামের প্রায় দুই কোটি মানুষের অধ্যুষিত বিশাল এ জনপদটি জলদস্যু ও চোর-ডাকাত, মাদকব্যবসায়ী-সহ বিভিন্ন ভয়ঙ্কর অপরাধীদের জন্য যেন এক নিরাপদ স্বর্গরাজ্য।
হাওরের জনজীবন সবসময়ই প্রকৃতির সাথে এক আক্ষরিক সংগ্রাম। এর ওপর তাদের দৌরাত্ম্য এই অঞ্চলের মানুষের জীবনকে আরও দুর্বিষহ করে তুলেছে। রাতের অন্ধকারে নৌকায় চলাচলকারী যাত্রী সাধারণ, ব্যবসায়ী, পর্যটক ও প্রান্তিক জেলেরা আজ চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন; যা সামগ্রিক অর্থনীতি ও স্বাভাবিক জনজীবনে গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। আগে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে পর্যটকরা হাওরে এসে রাত কাটাতেন। এখন সন্ধ্যার আগেই সবাই ফিরে যান।
জলদস্যুপনা, চুরি, ছিনতাই, রাহাজানি ও নৌ-ডাকাতি এবং কিশোর গ্যাং বা স্থানীয় সংঘবদ্ধ অপরাধের নির্দিষ্ট কিছু হটস্পট রয়েছে। এসব এলাকার ভৌগোলিক দুর্গমতা ও জলাভূমি হওয়ার কারণে অপরাধীরা নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে ব্যবহার করছে।
ওইসব অপরাধীদের রাজত্বে হাওরের বিশাল জলরাশিতে নৌপথে যাতায়াত করা এখন জীবনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নৌপথে সশস্ত্র জলদস্যু ও ডাকাতদের বেশুমার উপদ্রব ও চাঁদাবাজি বাড়ার কারণে নিরাপত্তা পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক হয়ে পড়েছে। দিনের আলোতেও সাধারণ মানুষ, জেলে, ব্যবসায়ী ও পর্যটকরা চলাচলে চরম আতঙ্ক বোধ করছেন। আর মামলা করবে কি, জলদস্যু ও চোর-ডাকাতদের বিরুদ্ধে মুখ খুলতেও ভয় পাচ্ছেন।
সাম্প্রতিককালে নৌ-ডাকাতির ঘটনা আশঙ্কাজনকহারে বেড়ে যাওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দা, জেলে ও দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা পর্যটকরা জলদস্যু ও ডাকাতদের কবলে পড়ে সর্বস্ব হারাচ্ছেন। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দৈন্দিন চলাফেরা করতেও বাধ্য হচ্ছেন।
পুলিশের পর্যাপ্ত নৌ-টহলের অভাবে জীবন হয়ে উঠেছে নিরাপত্তাহীন। ঘর থেকে বের হয়ে শঙ্কায় থাকতে হয় ভালোই ভালোই বা নিরাপদে বাড়ি ফেরা যাবে তো! এছাড়া হাওরাঞ্চলের গ্রামগুলোও এখন আর নিরাপদ নয়।
বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ৭টি জেলার ৪৮টি উপজেলা নিয়ে মূল হাওরাঞ্চল গঠিত। জেলাগুলো হলো—সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া।
হাওরাঞ্চলে এখন বর্ষা মৌসুম চলছে। বর্ষা এলেই হাওর অধ্যুষিত ৪৮টি উপজেলার বিস্তীর্ণ এক বিশাল জলাশয়ে পরিণত হয়। শুকনো মৌসুমের মেঠো পথ ও দিগন্তজোড়া ফসলের মাঠ তলিয়ে যায় অথৈ জলে। চারিদিকে সাগরসম উত্তাল জলরাশি। এ সময় বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো ভেসে থাকা ২৭ হাজারেরও অধিক গ্রামের প্রায় দুই কোটি মানুষের যাতায়াত ও যোগাযোগের একমাত্র বাহন হয়ে ওঠে নৌকা।
এতে বর্ষা মৌসুমে পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাওরাঞ্চলে জলদস্যু ও নৌ-ডাকাতদের দৌরাত্ম্যে ভয়াবহ এক আতঙ্কজনক রূপ ধারণ করে, যা শুষ্ক মৌসুমের তুলনায় বর্ষা মৌসুমেই বেশি বাড়ে। চলন্ত ইঞ্জিনচালিত নৌকা, ট্রলার, পর্যটকবাহী নৌকা; এমনকি লাশবাহী নৌকায়ও দেশীয় অস্ত্র ও আগ্নেয়াস্ত্রের মুখে যাত্রীদের জিম্মি করে নগদ টাকা, স্বর্ণালঙ্কার, মোবাইল ও মূল্যবান সামগ্রী-সহ সর্বস্ব লুটে নিয়ে যাচ্ছে।
এহেন পরিস্থিতিতে পর্যটক, জেলে এবং নৌযাত্রীরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। হাওরে চলাচলকারী নৌযানগুলোতে প্রায় প্রতিদিন একের পর এক ডাকাতির ঘটনা ঘটছে। গত কয়েকদিনে বিশেষ করে কিশোরগঞ্জের ইটনা, মিঠামইন, অষ্টগ্রাম ও করিমগঞ্জ-সহ সমগ্র হাওরাঞ্চলে ধারাবাহিক নৌ-ডাকাতি ও আইনশৃঙ্খলার অবনতিতে জনমনে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
পুলিশের সাফল্যেও ঘাটতি নেই। গত ৭ জুন কিশোরগঞ্জের মিঠামইনের হাওরে আরেকটি যাত্রীবাহী নৌকায় ডাকাতির ঘটনা ঘটে। এতে পুলিশ দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে আন্তজেলা ডাকাত দলের তিন সদস্যকে দেশীয় অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠায়।
বিগত কয়েক বছর আগে হাওরাঞ্চলে ডাকাতির উৎপাত থাকলেও মাঝখানে বেশ কিছুদিন ডাকাতির কথা শোনা যায়নি। এবার এই বর্ষার শুরুতে আবারও ডাকাতদের আক্রমণে হাওরাঞ্চলের মানুষ অসহায় হয় পড়েছেন। সন্ধ্যা নামলেই জলদস্যু ও ডাকাতরা হামলে পড়ছে। এহেন পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বাহিনীও নানা কারণে নিদারুণ অসহায় – যেন ঢাল নেই তলোয়ার নেই নিধিরাম সর্দার।
গণমাধ্যমের খবরে প্রকাশ, বর্ষা মৌসুম এলেই হাওরে জলদস্যুপনা ও নৌ-ডাকাতদের তৎপরতা বেড়ে যায়। অন্যদিকে বোরো ধান কাটার মৌসুমে কৃষকদের কাছ থেকে এবং হাট-বাজারের ব্যবসায়ীদের নগদ অর্থ পরিবহনের সময় ডাকাতির ঝুঁকি বেড়ে যায়।
বৃহত্তর হাওরাঞ্চলে সক্রিয় রয়েছে অনেকগুলো জলদস্যু ও নৌ-ডাকাত দল। তারা সংঘবদ্ধ এবং পিস্তল, বন্দুক, চাপাতি, ছুরি, চাকু ও বোমার মতো আগ্নেয়াস্ত্র ডাকাতিতে ব্যবহার করে।
এদিকে হাওরাঞ্চলে জলদস্যুপনা ও নৌ-ডাকাতি বাড়ার কারণে নিরাপত্তাহীনতায় দিন দিন পর্যটকেরও শূন্যতা দেখা দিয়েছে। যার নেতিবাচক প্রভাব অর্থাৎ নিরাপত্তার অভাবে থমকে আছে হাওরের অর্থনীতিও।
এহেন পরিস্থিতিতে জলদস্যুপনা ও নৌ-ডাকাতিরোধে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যথাযথ পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
তারা বলছেন, মূলত ডাকাতি মামলা গ্রহণে পুলিশের অনাগ্রহ ও ডাকাতির ঘটনাস্থল তথা জলসীমানা নিয়ে টানাটানি বা সিদ্ধান্তহীনতার কারণে নৌ-ডাকাতি থামছে না। হাওরাঞ্চলে নৌপুলিশের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট জেলাগুলোতে পুলিশের নিয়মিত অভিযান ছাড়া জলদস্যু ও নৌ-ডাকাতদের দমন করা সম্ভব নয়। এছাড়া এসব অপরাধ রোধে লঞ্চগুলোতে বা দূরপাল্লার বড়ো যাত্রীবাহী ট্রলারে আনসার নিয়োগ করা যেতে পারে।
ধারাবাহিক এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিরা অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। হাওরাঞ্চলে নৌপুলিশের টহল জোরদার করতে এবং জলদস্যুপনা ও ডাকাতি দমনে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য প্রশাসনকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
হাওরাঞ্চলে একের পর এক জলদস্যুপনা ও ডাকাতির ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এবং কিশোরগঞ্জ-৬ (ভৈরব-কুলিয়ারচর) আসনের সংসদ সদস্য মো. শরীফুল আলম।
তিনি বলেছেন, হাওরে জলদস্যু ও চোর-ডাকাতসহ বিভিন্ন ভয়ঙ্কর অপরাধীদের দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও কঠোর হতে হবে এবং পূর্বের রেকর্ডের ভিত্তিতে তাদের বিরুদ্ধে টানা অভিযান চালাতে হবে।
গত ১২ জুলাই কিশোরগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি।
প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম বলেন, প্রশাসনের কাছে ডাকাতদের তালিকা অবশ্যই থাকার কথা। পূর্বের রেকর্ডের ভিত্তিতেও তাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো যায়। এতে তারা এলাকা ছেড়ে পালাতে বাধ্য হবে। অন্যায় ও অপরাধের সঙ্গে কখনও কোনোভাবেই ‘আপস নয়’ বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন তিনি।
এর পরিপ্রেক্ষিতে হাওরে জলদস্যুপনা ও নৌ-ডাকাতিসহ বিভিন্ন অপরাধ প্রতিরোধে বিশেষ করে কিশোরগঞ্জ জেলা পুলিশ প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা কমিটির পক্ষ থেকে নেওয়া প্রধান নির্দেশনা ও পদক্ষেপগুলো হলো:
১. জনসাধারণের জানমালের নিরাপত্তার স্বার্থে বিকেল সাড়ে ৫টার পর হাওরে নৌ-চলাচল নিয়ন্ত্রণে অনিরাপদ ও ছোট নৌযান চলাচল না করা।
২. ডাকাতপ্রবণ ও ঝুঁকিপূর্ণ জলপথগুলোতে জেলা পুলিশ ও থানা পুলিশের নিয়মিত সাঁড়াশি টহল ও নজরদারি জোরদার করা।
৩. তালিকাভিত্তিক অভিযান পরিচালনায় পূর্ববর্তী অপরাধের রেকর্ডের ভিত্তিতে চিহ্নিত ডাকাত ও অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা ও টানা অভিযান পরিচালনা।
৪. সতর্কতা ও জনসচেতনতায় সাধারণ জেলে, ব্যবসায়ী, নৌযাত্রী ও পর্যটকদের একা বা অরক্ষিত অবস্থায় চলাচল না করে সতর্কতা অবলম্বন করার পরামর্শ।
এক্ষেত্রে কিশোরগঞ্জ-৪ (ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম) আসনের সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান সম্প্রতি ঢাকা থেকে দেওয়া এক ভিডিও বার্তায় কিশোরগঞ্জের ইটনা, মিঠামইন, অষ্টগ্রাম ও করিমগঞ্জের হাওর এলাকায় কয়েকটি দুর্ধর্ষ ডাকাতির ঘটনা তাকে বিক্ষুব্ধ ও বিস্মিত করেছে বলে উল্লেখ করেন।
তিনি সর্বসাধারণের উদ্দেশ্যে বলেন, পুলিশ প্রশাসন বা প্রশাসনের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর না করে আপনারা নিজেরা সংগঠিত হোন। কেননা, হাওর আজ পর্যটন এলাকা হিসেবে পরিচিত। এখানে মানুষের যাতায়াত যাতে কোনোভাবে বিঘ্নিত না হয়, সে বিষয়ে সবাইকে সচেষ্ট থাকতে হবে।
সন্ধ্যার পর হাওরে নৌযান চলাচল বন্ধ রাখা প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তের কঠোর সমালোচনা করে এমপি ফজলুর রহমান বলেন, প্রশাসন ৫টার পর থেকে হাওর এলাকায় নৌকা চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে, যা মাথাব্যথাতে মাথা কেটে ফেলার মতো সিদ্ধান্ত। আমার কাছে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণযোগ্য নয়।
তিনি প্রশাসনের এই সিদ্ধান্ত দ্রুত প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে বলেন, হাওরাঞ্চলে সারাজীবন গভীর রাত পর্যন্ত মানুষের প্রয়োজনেই নৌকা চলেছে এবং এখনও চলার পথ সুগম ও নিরাপদ রাখা জরুরি।
ডাকাত-সহ বিভিন্ন অপরাধীদের ‘লাস্ট ওয়ার্নিং’ দিয়ে তিনি বলেন, যারা ডাকাতি-সহ বিভিন্ন অপরাধ করছে তাদের তালিকা আমাদের কাছে আছে। তোমরা যদি ডাকাতি ও বিভিন্ন অপরাধ থেকে বিরত না হও, তাহলে হাওরাঞ্চলে বসবাসের জন্য তোমাদের কোনো জায়গা হবে না – জায়গা হবে জেলখানায়।
তিনি আরও বলেন, সংসদ অধিবেশন শেষে তিনি নিজে এলাকায় এসে অবস্থান করবেন এবং জনসাধারণেরকে সংগঠিত করবেন। এরপর মাদক ব্যবসায়ী ও মাদকসেবিদের এবং জলদস্যু ও ডাকাত-সহ বিভিন্ন অপরাধীদের তালিকা ধরে তাদের আস্তানায় গিয়ে তাদের উৎখাতের উদ্যোগ নেবেন বলে জানান তিনি।
এমপি ফজলুর রহমান জলদস্যু ও চোর-ডাকাত, ছিনতাইকারী ও দুর্বৃত্তদের এবং মাদকব্যবসায়ী ও মাদকসেবিদের অভয় দিয়ে বলেন, তোমরা যদি ভালো হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করো, প্রশাসনের মাধ্যমে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে আত্মসমর্পণ করো এবং তওবা করো; তাহলে তোমাদের ব্যাপারে বিশেষ বিবেচনা করা হবে।
তিনি দাবি করেন, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাতে দেশবিরোধী শক্তিও এ ধরনের ঘটনার পেছনে ভূমিকা রাখার চেষ্টা করতে পারে। তাই সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।
হাওরাঞ্চলের নিরাপত্তা জোরদারে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতি হাওরের নিরাপত্তা জোরদারে ইটনা, মিঠামইন, অষ্টগ্রাম, করিমগঞ্জ ও নিকলী থানা-সহ হাওর অধ্যুষিত থানাগুলোর জন্য দ্রুতগতির স্পিডবোট বরাদ্দের দাবি জানান এই সংসদ সদস্য।
তিনি বলেন, ডাকাতরা দ্রুতগতির নৌযান ব্যবহার করায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা বাহিনী তাদের টুটিও ছুঁতে পারে না। এজন্য পুলিশের আধুনিক সরঞ্জাম প্রয়োজন। শুধু দায়িত্ব দিলেই হবে না, পুলিশকে প্রয়োজনীয় আধুনিক সরঞ্জামেরও জোগান দিতে হবে।
পর্যটকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, রূপের হাওরে নিশ্চিন্তে আসুন, নৈসর্গিক দৃশ্য আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করুন। আপনাদের নিরাপত্তার দায়িত্ব আমাদের।
বৃহত্তর হাওরাঞ্চলের বিশাল জলসীমায় অপরাধ দমন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিয়মিত নৌ-টহলের প্রয়োজন হয়, তবে দ্রুতগতিসম্পন্ন নৌ-যান ও জ্বালানি খরচের অপ্রতুলতায় পুলিশ সদস্যদের জন্য একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
হাওরাঞ্চলের সুরক্ষায় নিয়োজিত পুলিশ, নৌ-পুলিশ এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের জন্য জ্বালানির বাজেট বছরের শুরুতেই নির্দিষ্ট থাকে। বর্ষাকালে বিস্তীর্ণ হাওর এলাকায় এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যেতে দীর্ঘ নৌপথ পাড়ি দিতে হয়। অতিরিক্ত তেল খরচ হলেও সেই অনুপাতে জ্বালানি বরাদ্দ বাড়ানো হয় না।
যার ফলে এই সীমিত বাজেট ও জ্বালানি বরাদ্দ সংকটের কারণে স্পিডবোট বা দ্রুতগামী নৌ-যানের মাধ্যমে নিরবচ্ছিন্ন টহল পরিচালনা করা সম্ভব হয় না। এতে বর্ষাকালে হাওরে অপরাধ দমন ও নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে।
হাওরে জলদস্যুপনা ও ডাকাতি-সহ বিভিন্ন অপরাধ রোধে সরকারের করণীয় রয়েছে। সমগ্র হাওরাঞ্চলে পুলিশ ও র্যাবের নিয়মিত টহল জোরদার করা, দাগী ও চিহ্নিত অপরাধীদের তালিকা তৈরি করে গ্রেপ্তার অভিযান পরিচালনা করা এবং নৌকা, ট্রলার বা লঞ্চ যাত্রীদের ও স্থানীয় পর্যায়ে নৌকার মাঝিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
শুধু তা-ই নয়, হাওরাঞ্চলে জলদস্যুপনা ও চুরি-ডাকাতিসহ বিভিন্ন অপরাধ রোধে এবং সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের অবিলম্বে স্পিডবোট ও আধুনিক জলযানের সংখ্যা বৃদ্ধি, থানা ও নৌ-পুলিশ ফাঁড়িতে পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগ এবং জ্বালানি বরাদ্দের পরিমাণ বাড়ানো জরুরি প্রয়োজন। এছাড়া স্থায়ী সমাধানের জন্য গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার এবং বিচ্ছিন্ন এলাকাগুলোতে নিয়মিত টহল পরিচালনার কোনো বিকল্প নেই।
হাওরে শুষ্ক ও বর্ষা মৌসুমে জলদস্যুপনা, চুরি-ডাকাতি, রাহাজানি, ছিনতাই, নৈরাজ্য ও মাদকব্যবসায়ী-সহ বিভিন্ন অপরাধ প্রতিরোধে সরকার গ্রহণ করতে পারে এমন সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপগুলো হলো:
১. ঝুঁকিপূর্ণ রুটগুলোতে নৌ-পুলিশের স্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন এবং কোস্টগার্ডের মাধ্যমে নিয়মিত টহল জোরদার করা। এজন্য নিয়মিত ও দীর্ঘমেয়াদী পুলিশি টহলের জন্য হাওর অধ্যুষিত প্রতিটি থানায় জ্বালানি তেলের মাসিক বাজেট বহুগুণ বাড়ানো।
২. হাওরের প্রবেশমুখ ও গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে সিসিটিভি ক্যামেরা, সার্চলাইটযুক্ত নিরাপত্তা চৌকি বসানো ও নৌযানে ট্র্যাকিং ডিভাইস ব্যবহার করা।
৩. জলদস্যু ও ডাকাত দমনে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন বা সোয়াট -এর মতো বিশেষায়িত ইউনিটের নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা।
৪. হাওরের গভীর, দুর্গম ও বিস্তৃত এলাকায় দ্রুত পৌঁছাতে সক্ষম এমন শক্তিশালী পর্যাপ্ত স্পিডবোট ও আধুনিক জলযানের মাধ্যমে জলদস্যুপনা ও চুরি-ডাকাতিসহ বিভিন্ন অপরাধীদের গতিবিধির ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারি রাখা।
৫. গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে জলদস্যু ও চোর-ডাকাতসহ বিভিন্ন অপরাধী এবং মাদকব্যবসায়ী চক্রের সদস্যদের তালিকা তৈরি করা এবং সেই তালিকা ধরে বিশেষ অভিযান চালিয়ে তাদের আইনের আওতায় আনা।
৬. হাওরাঞ্চলের স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, মৎস্যজীবী ও সাধারণ মানুষের সমন্বয়ে ‘গ্রাম পাহারা’ বা কমিউনিটি পুলিশিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা; যাতে যে-কোনো সন্দেহজনক চলাচলের খবর দ্রুত প্রশাসনকে জানানো যায়।
৭. হাওরের প্রতিটি লঞ্চে, নৌকায় বা ট্রলারে জরুরি যোগাযোগের জন্য ওয়াকিটকি, ভিপিএফ রেডিও বা স্থানীয় হটলাইন নম্বর চালু করা।
৮. হাওরে আগত পর্যটক ও হাউসবোটগুলোর জন্য নির্দিষ্ট রুট বা পথ নির্ধারণ করা এবং ভ্রাম্যমাণ নিরাপত্তা চৌকি স্থাপন করা।
৯. সব নৌযান ও মাঝিদের স্থানীয় প্রশাসনের আওতায় নিবন্ধন করা ও মাঝিদের কাছে ওয়াকিটকি বা স্যাটেলাইট ফোন সরবরাহ করা, যাত্রীদের জন্য ডিজিটাল টিকেটিং সিস্টেম চালু করা এবং জরুরি সেবার ৯৯৯ নম্বরটি সহজলভ্য করা।
১০. প্রতিটি থানায় ভিলেজ ক্রাইম নোট বুক (ভিসিএনবি) সচল করা।
১১. স্থানীয় জেলেরা যাতে গভীর রাতে মাছ ধরতে গিয়ে কোনোভাবে জলদস্যু ও ডাকাত-সহ বিভিন্ন অপরাধীদের কবলে না পড়েন, সে বিষয়ে তাদের নিয়মিত সতর্কতা প্রদান ও প্রশিক্ষণ দেওয়া।
এছাড়াও হাওরে পুলিশ ও নৌপুলিশের টহল ব্যবস্থা জোরদার ও জ্বালানি সংকটের সমাধানে সাধারণত এই পদক্ষেপগুলো কার্যকর করা যেতে পারে:
১. দুর্গম ও বিস্তীর্ণ বৃহত্তর হাওরাঞ্চরের থানাগুলোর জন্য পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ তথা সরকারের কাছে অতিরিক্ত স্পেশাল অপারেশন ও বিশেষ জ্বালানি বাজেট বরাদ্দ করা।
২. স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, মৎস্যজীবী সমিতি ও কমিউনিটি পুলিশের সহায়তায় জ্বালানি খরচ ভাগাভাগি করে যৌথ বা সমন্বিত নিরাপত্তা টহল পরিচালনা করা।
৩. জরুরি তহবিল গঠন করে হাওরাঞ্চলের চাঁদাবাজি, ডাকাতি ও জলদস্যুপনা প্রতিরোধে স্থানীয় জেলা প্রশাসনের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বা বিশেষ নিরাপত্তা তহবিল থেকে জরুরি জ্বালানি সহায়তা দেওয়া।
৪. আলাদা আলাদা টহলের পরিবর্তে পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসন যৌথভাবে টহল পরিচালনা করলে তেলের অপচয় ও খরচ কমে আসতে পারে।
৫. দীর্ঘমেয়াদে টহলের খরচ কমাতে সৌরচালিত বা সোলার নৌযান বা হাইব্রিড ইঞ্জিন ব্যবহারের প্রকল্প গ্রহণ করা যেতে পারে।
৬. হাওরে জলদস্যুপনা ও নৌ-ডাকাতি রোধে কেবল তাৎক্ষণিক প্রশাসনিক নিষেধাজ্ঞা বা পুলিশি টহলের ওপর নির্ভর না করে স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও এলাকাবাসীর সমন্বয়ে একটি স্থায়ী প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলাও জরুরি।
৭. জলদস্যু ও চোর-ডাকাত এবং মাদকব্যবসায়ী ও বিভিন্ন অপরাধীদের আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতাদের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং যুবসমাজকে অপরাধ ও মাদক থেকে দূরে রাখতে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা।
মোদ্দাকথা, হাওরবাসীর জানমাল রক্ষা এবং এই অঞ্চলের পর্যটন ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা টিকিয়ে রাখতে প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।
বর্ষা ও শুষ্ক মৌসুমে হাওরবাসীর জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সমন্বিত পুলিশি টহল জোরদার, প্রযুক্তির ব্যবহার, স্থানীয়দের সম্পৃক্ততা, সার্বক্ষণিক নজরদারি, কঠোর আইনি পদক্ষেপ ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির সম্মিলিত উদ্যোগই টেকসই সমাধান আনতে পারে।
লেখক: সহযোগী সম্পাদক, আজকের সূর্যোদয়, ঢাকা।
Reporter Name 
























