ঢাকা ০৩:৪৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ৬ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ট্রাম্পের শান্তি পরিষদের অর্ধেক সদস্যই যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞার তালিকায়

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১১:২০:৩৮ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২৬
  • ২৪ বার

জাতিসংঘকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত বিকল্প সংস্থা ‘বোর্ড অব পিস’ শুরুতেই ব্যাপক বিদ্রূপ, উপহাস এবং কূটনৈতিক বিতর্কের মুখে পড়েছে। গত বৃহস্পতিবার সুইজারল্যান্ডের দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই বোর্ডের যাত্রা শুরু হলেও, এতে অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর তালিকা এবং ট্রাম্পের নিজস্ব অভিবাসন নীতির মধ্যে ব্যাপক অসংগতি ধরা পড়েছে।

ট্রাম্প এই শান্তি বোর্ডের উদ্বোধনী মঞ্চে যে ১৮টি দেশের প্রতিনিধিদের স্বাগত জানিয়েছেন এবং যাদের ‘বন্ধু’ বলে সম্বোধন করেছেন, তাদের প্রায় অর্ধেকই খোদ আমেরিকার কঠোর ‘ট্রাভেল ব্যান’ বা ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার তালিকায় রয়েছে।

নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা সদস্য দেশ: আর্মেনিয়া, আজারবাইজান, জর্ডান, কসোভো, মঙ্গোলিয়া, মরক্কো, পাকিস্তান এবং উজবেকিস্তান।

মজার বিষয় হলো, এই দেশগুলোর নাগরিকদের জন্য ট্রাম্প প্রশাসন ইতিমধ্যেই অভিবাসী ভিসা প্রক্রিয়া অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত রেখেছে। কূটনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে—যে দেশগুলোর নাগরিকদের আমেরিকায় প্রবেশ নিষিদ্ধ, সেই দেশগুলো কীভাবে আমেরিকার নেতৃত্বে একটি বৈশ্বিক শান্তি সংস্থার মূল কারিগর হতে পারে? ট্রাম্প একে ‘ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা’ বললেও বাস্তবতায় এটি শুরুতেই হোঁচট খেয়েছে।

ট্রাম্প নিজেই এই বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। মঞ্চে উপস্থিত প্রতিনিধিদের মধ্যে ছিলেন: আর্জেন্টিনা, আর্মেনিয়া, আজারবাইজান, বাহরাইন, বুলগেরিয়া, হাঙ্গেরি, ইন্দোনেশিয়া, জর্ডান, কসোভো, মঙ্গোলিয়া, মরক্কো, পাকিস্তান, প্যারাগুয়ে, কাতার, সৌদি আরব, তুরস্ক, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং উজবেকিস্তান।

এই বোর্ডে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত কোনো শক্তিশালী দেশের প্রতিনিধিকে দেখা যায়নি। এমনকি গুজব রয়েছে যে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকেও এতে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।

এই উচ্চাভিলাষী বোর্ডের সদস্য হতে প্রতিটি দেশকে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার অবদান রাখার শর্ত দেওয়া হয়েছে।

ব্রিটিশ সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারকে এই বোর্ডের সদস্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে, যা নিয়ে আন্তর্জাতিক স্তরে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে। ট্রাম্প বলেন, ‘যখন আমেরিকা সমৃদ্ধ হয়, তখন পুরো বিশ্ব সমৃদ্ধ হয়।’

এদিকে ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার এই সম্মেলনে ‘নিউ গাজা’র একটি চোখধাঁধানো ও বিতর্কিত নকশা উন্মোচন করেছেন। সিজিআই প্রযুক্তিতে তৈরি এই ছবিতে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া গাজাকে একটি আধুনিক ‘রিভিয়েরা’ বা পর্যটন স্বর্গে রূপান্তরিত করার পরিকল্পনা দেখানো হয়েছে।

এই পরিকল্পনার মূল আকর্ষণগুলো হলো: অত্যাধুনিক ডেটা সেন্টার, হাই-রাইজ লাক্সারি অ্যাপার্টমেন্ট এবং উপকূলীয় পর্যটন কেন্দ্রের মতো বিলাসবহুল অবকাঠামো; ১ লাখেরও বেশি নতুন আবাসন ইউনিট এবং ৭৫টি অত্যাধুনিক চিকিৎসা কেন্দ্র নির্মাণের প্রতিশ্রুতি।

এ ছাড়া ট্রাম্প দাবি করেছেন, এই বোর্ড গাজার সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ নিশ্চিত করবে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও একে একটি “বোর্ড অফ অ্যাকশন” বা কর্মতৎপর সংস্থা হিসেবে অভিহিত করেছেন।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, কুশনারের এই নতুন নকশাটি গত বছর প্রকাশিত একটি এআই-জেনারেটেড ভিডিওর হুবহু অনুকরণ, যেখানে ট্রাম্প এবং ইলন মাস্ককে গাজা উপকূলে ঘুরে বেড়াতে দেখা গিয়েছিল। ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে আমেরিকার মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তির রেশ ধরেই এই ‘বোর্ড অব পিস’-এর জন্ম। ট্রাম্প দাবি করেন, তাঁর এই ভিশন জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়েছে।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ‘বোর্ড অফ পিস’ আসলে জাতিসংঘের প্রভাব কমিয়ে আমেরিকার একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার একটি রাজনৈতিক কৌশল। তবে নিজের নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা দেশগুলোকে নিয়ে গঠিত এই সংস্থার কার্যকারিতা নিয়ে যেমন সন্দেহ রয়েছে, তেমনি ১ বিলিয়ন ডলারের ‘এন্ট্রি ফি’ এই সংস্থাকে একটি ‘ধনকুবেরদের ক্লাব’ হিসেবে চিহ্নিত করছে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

ট্রাম্পের শান্তি পরিষদের অর্ধেক সদস্যই যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞার তালিকায়

আপডেট টাইম : ১১:২০:৩৮ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২৬

জাতিসংঘকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত বিকল্প সংস্থা ‘বোর্ড অব পিস’ শুরুতেই ব্যাপক বিদ্রূপ, উপহাস এবং কূটনৈতিক বিতর্কের মুখে পড়েছে। গত বৃহস্পতিবার সুইজারল্যান্ডের দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই বোর্ডের যাত্রা শুরু হলেও, এতে অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর তালিকা এবং ট্রাম্পের নিজস্ব অভিবাসন নীতির মধ্যে ব্যাপক অসংগতি ধরা পড়েছে।

ট্রাম্প এই শান্তি বোর্ডের উদ্বোধনী মঞ্চে যে ১৮টি দেশের প্রতিনিধিদের স্বাগত জানিয়েছেন এবং যাদের ‘বন্ধু’ বলে সম্বোধন করেছেন, তাদের প্রায় অর্ধেকই খোদ আমেরিকার কঠোর ‘ট্রাভেল ব্যান’ বা ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার তালিকায় রয়েছে।

নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা সদস্য দেশ: আর্মেনিয়া, আজারবাইজান, জর্ডান, কসোভো, মঙ্গোলিয়া, মরক্কো, পাকিস্তান এবং উজবেকিস্তান।

মজার বিষয় হলো, এই দেশগুলোর নাগরিকদের জন্য ট্রাম্প প্রশাসন ইতিমধ্যেই অভিবাসী ভিসা প্রক্রিয়া অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত রেখেছে। কূটনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে—যে দেশগুলোর নাগরিকদের আমেরিকায় প্রবেশ নিষিদ্ধ, সেই দেশগুলো কীভাবে আমেরিকার নেতৃত্বে একটি বৈশ্বিক শান্তি সংস্থার মূল কারিগর হতে পারে? ট্রাম্প একে ‘ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা’ বললেও বাস্তবতায় এটি শুরুতেই হোঁচট খেয়েছে।

ট্রাম্প নিজেই এই বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। মঞ্চে উপস্থিত প্রতিনিধিদের মধ্যে ছিলেন: আর্জেন্টিনা, আর্মেনিয়া, আজারবাইজান, বাহরাইন, বুলগেরিয়া, হাঙ্গেরি, ইন্দোনেশিয়া, জর্ডান, কসোভো, মঙ্গোলিয়া, মরক্কো, পাকিস্তান, প্যারাগুয়ে, কাতার, সৌদি আরব, তুরস্ক, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং উজবেকিস্তান।

এই বোর্ডে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত কোনো শক্তিশালী দেশের প্রতিনিধিকে দেখা যায়নি। এমনকি গুজব রয়েছে যে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকেও এতে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।

এই উচ্চাভিলাষী বোর্ডের সদস্য হতে প্রতিটি দেশকে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার অবদান রাখার শর্ত দেওয়া হয়েছে।

ব্রিটিশ সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারকে এই বোর্ডের সদস্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে, যা নিয়ে আন্তর্জাতিক স্তরে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে। ট্রাম্প বলেন, ‘যখন আমেরিকা সমৃদ্ধ হয়, তখন পুরো বিশ্ব সমৃদ্ধ হয়।’

এদিকে ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার এই সম্মেলনে ‘নিউ গাজা’র একটি চোখধাঁধানো ও বিতর্কিত নকশা উন্মোচন করেছেন। সিজিআই প্রযুক্তিতে তৈরি এই ছবিতে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া গাজাকে একটি আধুনিক ‘রিভিয়েরা’ বা পর্যটন স্বর্গে রূপান্তরিত করার পরিকল্পনা দেখানো হয়েছে।

এই পরিকল্পনার মূল আকর্ষণগুলো হলো: অত্যাধুনিক ডেটা সেন্টার, হাই-রাইজ লাক্সারি অ্যাপার্টমেন্ট এবং উপকূলীয় পর্যটন কেন্দ্রের মতো বিলাসবহুল অবকাঠামো; ১ লাখেরও বেশি নতুন আবাসন ইউনিট এবং ৭৫টি অত্যাধুনিক চিকিৎসা কেন্দ্র নির্মাণের প্রতিশ্রুতি।

এ ছাড়া ট্রাম্প দাবি করেছেন, এই বোর্ড গাজার সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ নিশ্চিত করবে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও একে একটি “বোর্ড অফ অ্যাকশন” বা কর্মতৎপর সংস্থা হিসেবে অভিহিত করেছেন।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, কুশনারের এই নতুন নকশাটি গত বছর প্রকাশিত একটি এআই-জেনারেটেড ভিডিওর হুবহু অনুকরণ, যেখানে ট্রাম্প এবং ইলন মাস্ককে গাজা উপকূলে ঘুরে বেড়াতে দেখা গিয়েছিল। ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে আমেরিকার মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তির রেশ ধরেই এই ‘বোর্ড অব পিস’-এর জন্ম। ট্রাম্প দাবি করেন, তাঁর এই ভিশন জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়েছে।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ‘বোর্ড অফ পিস’ আসলে জাতিসংঘের প্রভাব কমিয়ে আমেরিকার একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার একটি রাজনৈতিক কৌশল। তবে নিজের নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা দেশগুলোকে নিয়ে গঠিত এই সংস্থার কার্যকারিতা নিয়ে যেমন সন্দেহ রয়েছে, তেমনি ১ বিলিয়ন ডলারের ‘এন্ট্রি ফি’ এই সংস্থাকে একটি ‘ধনকুবেরদের ক্লাব’ হিসেবে চিহ্নিত করছে।