কুড়িগ্রামের তীব্র শীত এখন আর মৌসুমি দুর্ভোগে সীমাবদ্ধ নেই—এটি রূপ নিয়েছে এক ভয়াবহ মানবিক সংকটে। চরাঞ্চলের কয়েক লাখ মানুষ পড়েছে চরম দুর্ভোগে। ঘন কুয়াশা আর হিমেল হাওয়ায় স্থবির হয়ে পড়েছে জনজীবন।
নদীবেষ্টিত চরাঞ্চলের মানুষই সবচেয়ে বেশি বিপর্যস্ত, যাদের জীবন-জীবিকা শীতের তীব্রতার সঙ্গে সঙ্গে প্রায় থমকে গেছে। ঘটেছে মানবিক বিপর্যয়। শ্রমজীবী মানুষের হাতে কাজ নেই। চরম অর্থ কষ্টে ধারকর্জ করে দিনাতিপাত করছে। শীতবস্ত্র বিতরণ কার্যক্রম চললেও চাহিদা বহুগুণ বেশি।
সোমবার রাজারহাট কৃষি আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সুবল চন্দ্র সরকার জানান, জেলায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা নেমে এসেছে ১০ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। বাতাসের আর্দ্রতা ছিল ৯৬ শতাংশ। এ আবহাওয়ার সরাসরি প্রভাবে শ্রমজীবী মানুষের কাজ মারাত্মকভাবে কমে গেছে। দিনমজুর, জেলে ও কৃষি শ্রমিকদের অনেকের আয় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে পড়েছে।
কুড়িগ্রাম চরাঞ্চল উন্নয়ন কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বেবু বলেন, জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত ১৬টি নদী। জেলায় ছড়িয়ে থাকা ৪৬৯টি চরে বসবাস করে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষ। এসব চরবাসীর কাছে শীত মানেই অনাহার, অসুখ আর অনিশ্চিত জীবনের আতঙ্ক। অনেক পরিবার দিনের বেশিরভাগ সময় আগুন জ্বালিয়ে কিংবা পুরনো কাপড় জড়িয়ে শীত নিবারণের চেষ্টা করছে। শ্রমজীবী মানুষের হাতে কাজ না থাকায় অর্থাভাবে অনাহার অর্ধাহারে দিনাতিপাত করছে। ধারকর্জ করে জর্জরিত হয়ে পড়েছে এসব অসহায় মানুষ।
কুড়িগ্রাম পৌর এলাকার ধরলা নদীর পাড়ের হানাগড় এলাকার বাসিন্দা জুলেখা বেগম (৫০) মঙ্গলবার একটি কম্বলের আশায় পায়ে হেঁটে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে এসেছিলেন; কিন্তু কম্বল না পেয়ে হতাশা আর মনকষ্ট নিয়ে ফিরে যান তিনি। কাঁপতে কাঁপতে শুধু বলেন, শীতে ঘুম হয় না, শরীর ব্যথায় ভরে গেছে। ঘরে খাবারও নেই। হাতে কাজ নেই। ধারকর্জ করে মানবেতর জীবনযাপন করছি।
একই চিত্র কুড়িগ্রাম সদরের যাত্রাপুর ইউনিয়নের দুধকুমার নদী তীরবর্তী ফারাজিপাড়ায়। সেখানকার বাসিন্দা মরিয়ম বেগম (৫৬) জানান, ঠান্ডা বাতাসে বাড়ি থেকে বের হওয়াই কঠিন। সন্ধ্যা নামলেই ঘরের ফাঁক দিয়ে হিমেল বাতাস ঢুকে পড়ে। সারারাত কষ্টে কাটে। ঘুম হয় না। একটা কম্বলও ভাগ্যে জোটেনি—বলে চোখ মুছতে থাকেন তিনি।
চিলমারী উপজেলার বজরা দিয়ার খতা চরের মমেনা বেওয়া (৭০) তার মেয়ে সালেহা (৪৬) আর ৫ জন নাতি-নাতনি নিয়ে এই শীতে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। শীতের কষ্টের সঙ্গে সঙ্গে চলছে খাদ্য সংকট।
এ বাস্তবতার কথা উল্লেখ করে মমেনা বলেন, চার শতক জমিতে এই বাড়িভিটা ছাড়া সম্বল বলতে কিছু নেই। কৃষি শ্রমিক হিসেবে মা-মেয়ে কাজ করি সে কাজও নেই গত এক সপ্তাহ থেকে। ধারকর্জ করে চলছি। কোনো বেলা উপোস করি; যা খাই পেট ভরলেও মাছ, মাংস, দুধ, ডিম জোটে না ভাগ্যে।
কুড়িগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. স্বপন কুমার বিশ্বাস জানান, জেলায় ২৯৭টি ক্লিনিক ও নয় উপজেলার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মাধ্যমে চিকিৎসাসেবা চালু রয়েছে।
তবে বাস্তব চিত্র ভিন্ন। স্থানীয়রা বলছেন, কাগজে-কলমে সেবা থাকলেও মাঠপর্যায়ে চিকিৎসক পাওয়া যাচ্ছে না। শীতজনিত রোগে আক্রান্ত অনেকেই প্রয়োজনীয় চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
কুড়িগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, অব্যাহত শীতের কারণে জেলায় ৫৩ হেক্টর বোরো ধানের বীজতলা এবং ১ হেক্টর আলুর বীজতলা কোল্ড ইনজুরিতে আক্রান্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত বীজতলার পরিচর্যার জন্য কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সূর্যের আলো স্বাভাবিক হলে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। তবে শীতকালীন শাকসবজির তেমন ক্ষতি হয়নি এবং বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে।
কুড়িগ্রাম জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আব্দুল মতিন জানান, এ পর্যন্ত জেলার নয় উপজেলায় ২৭ হাজার কম্বল বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়া কম্বল ক্রয়ের জন্য ৪০ লাখ টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) জেলা কমিটির সভাপতি খাইরুল আনম বলেন, চরবাসীর সংখ্যা, দারিদ্র্যের গভীরতা ও চলমান শীতের বাস্তবতা বিবেচনায় সরকারি এ সহায়তা যে অপ্রতুল—তা স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সচেতন মানুষের সঙ্গে কথা হলে বাস্তবতা বোঝা যায়।
তিনি আরও বলেন, জরুরিভিত্তিতে আরও কম্বল, শীতবস্ত্র, চিকিৎসা টিম ও খাদ্য সহায়তা না পৌঁছলে চরাঞ্চলে মানবিক সংকট আরও গভীর আকার ধারণ করতে পারে। শীতের এই নির্মম বাস্তবতায় কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলের মানুষ এখন শুধু উষ্ণ কাপড় নয়—মানবিক সহানুভূতি ও কার্যকর সহায়তার অপেক্ষায়।
Reporter Name 



















