মাহফুজা মুন্না
ব্রেস্ট ক্যানসার এক মরণব্যাধীর নাম। বর্তমানে এক আতঙ্কের নাম। পরিবারের কারো এ রোগ থেকে থাকলে তা জেনেটিক্যালি ছড়াতে পারে। ক্যারিয়ার হিসেবে BRCA1, BRCA2 ও ATM জিনকে দায়ী করা হয়। ক্যানসারজনিত রোগে মৃত্যুর কারণ হিসেবে বর্তমান বিশ্বে ব্রেস্ট ক্যানসারের অবস্থান দ্বিতীয়। বছরে প্রতি এক লাখে ৮০ জন মহিলা আক্রান্ত হন। আমাদের দেশে পঁয়তাল্লিশোর্ধ মহিলাদের আক্রান্ত হবার চান্স বেশি। তবে উন্নত দেশগুলোতে ৩৫-৫৫ বয়সী মহিলাদের বেশি আক্রান্ত হতে দেখা যায়। তাই এই রোগকে ডিজিস অব সিভিলাইজেশনও বলা হয়। সাধারণত নারীদেরই এই রোগ বেশি হয়। ইদানিং পুরুষদেরও আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে, তবে তা সংখ্যায় নগণ্য।
পুরো অক্টোবর মাসকে ব্রেস্ট ক্যানসার সচেতনতামূলক মাস হিসেবে ধরা হয়েছে। আজ শেষ দিন। সিম্বল হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে পিংক রিবন।
যেসব কারণগুলোকে ব্রেস্ট ক্যানসারের ঝুঁকি হিসেবে ধরা হয় তা হলো- ১২ বছরের পূর্বেই মেন্সট্রুয়াল পিরিয়ড শুরু, প্রথম বাচ্চা ত্রিশের পর হওয়া, বাচ্চা না হওয়া, বাচ্চাকে মাতৃদুগ্ধ পান না করানো, ৫৫ বছরের পর মেনোপজ, মেনোপজের পর হরমোন রিপ্লেসমেন্ট ট্রিটমেন্ট নেওয়া, ব্রেস্ট ইমপ্ল্যান্ট ইত্যাদি এবং কিছু ক্ষেত্রে কন্ট্রাসেপ্টিভ বা বার্থ কন্ট্রোল পিল দীর্ঘদিন সেবন এই রোগের কারণ হিসেবে ধরা হয়। এছাড়া নারীদের ওবেসিটি বা মুটিয়ে যাওয়া, ধূমপান ও এলকোহলে আসক্ত নারীরা রিস্ক ফ্যাক্টরের আওতায়।
বর্তমানে এই রোগের লক্ষণ, কারণ ও প্রতিকার সবই ইন্টারনেট সার্চ দিলেই পাওয়া যাবে। তাই আমি ডিটেইলসে যাচ্ছি না। আমি নারীদের সচেতন করার জন্য কিছু বলতে চাই। এটা যে শুধু ব্রেস্ট ক্যানসার সচেতনতা তা নয়, এর সাথে আরো কিছু সচেতনতা জরুরি, কান টানলে মাথা আসে অবস্থা। তার আগে নারীদের বর্তমান অবস্থার কিছু দৃশ্য তুলে ধরতে চাই।
আমি আত্মীয় ও বন্ধুমহলে একটা কথা বলি যে, স্বামীর জন্য স্ত্রী আছে কিন্তু স্ত্রীর জন্য কেউ নাই। এর অর্থ হলো- একজন মহিলাকে এই যুগে একা একাই সব সামাল দিতে হয় অনেকটা একতরফা ভাবেই। এখন তো আগের দিনের মতো অল্প বয়সে বিয়ে, অল্প বয়সে বাচ্চা, বুড়ি হওয়ার আগেই ছেলের বউকে চাবির গোছা হস্তান্তর, নাতিপুতি নিয়ে সুখে-দুঃখে জীবনযাপন, নটেগাছটি মুরলো গল্প ফুরলো এই টাইপ জীবনযাপন না।
এখন একজন মহিলার আরো কয়েক হাত যুক্ত হয়ে দশভূজা দূর্গাকেও ছাড়িয়ে যায় সামাজিক অবস্থা পরিবর্তনের কারণে। ফলে মাঝে মাঝেই মহিলারা ডিপ্রেশনে ভোগে। বিয়ের পর হুট করে সব দায়িত্ব কাঁধে এসে পরে। বাচ্চা হওয়া, তাদের লালন করা, স্কুল-কলেজ কোচিং বাজার স্বামী সংসার এসব করতে করতে নাভিশ্বাস দশা হয়ে যায়। নিজের দিকে তাকানোর সময় হয়ে উঠে না। খুব বেশি হলে রূপ সচেতনতা থাকে তাও বাচ্চা স্কুল বা কোচিংয়ে ঢুকিয়ে পার্লারে নয়তো এসি মার্কেটে ঢুকে পরা এবং এসির বাতাস খাওয়া ও সেইসাথে দল ধরে ফাস্টফুড খাওয়া, স্বাস্থ্যের ব্যাপারে উদাসিন।
এখনকার বেশির ভাগ মহিলাদের পরিশ্রম হয় বেশি কিন্তু সেটা স্ট্রেস, কায়িক পরিশ্রম নয়। ইদানিং অনেকেই মর্নিং বা ইভিনিং ওয়াক করেন কিন্তু সেটাই সব নয়, এর সাথে কিছু ইয়োগা অথবা জগিং বা স্কিপিং করা জরুরি যাতে পুরো শরীর সঞ্চালিত হয়। ধনী ও কর্মজীবী নারীরা এরোবিকস ক্লাস, জিম নয়তো সুইমিং করতে পারেন কিন্তু এটা তো সবার সাধ্যের মধ্যে নাই।
আমার ছোটবেলায় গ্রামে ডায়াবেটিস, ব্লাড প্রেশার ও মহিলাদের ব্রেস্ট ক্যানসার রোগের প্রকোপ দেখা যেত না। তখন কায়িক পরিশ্রম বেশি হতো, এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় হেঁটে যেতে হতো, দুই হাত চালিয়ে কাজ করতে হতো বেশি। এখন গ্রামেও যন্ত্র প্রবেশ করায় চাপকল চাপিয়ে বা পুকুর নদী থেকে কলসি ভরে বা কুয়া থেকে পানি তোলা লাগে না, লাঙ্গল দিয়ে চাষ করা লাগে না, হাটা লাগে না ফলে গ্রামেও হাইপার ডিজিস, ডায়াবেটিস ও মহিলাদের ব্রেস্ট ক্যানসার হতে দেখা যায়।
শহরের মহিলাদের মন অভিমানে ঠাসা থাকে। এ অভিমান যেন স্বামী সন্তানের সাথে। দায়িত্ব ঠিকই পালন করে যথারীতি কিন্তু মন ভরা অভিমান। স্বামী সন্তান সবাই বাসায় এসেও ব্যস্ত। সন্তানদের পড়াশোনা ও নেট সার্ফিং আর স্বামীর খেলা দেখা ও নেট সার্ফিং, তার প্রতি কারো নজর নাই, শুধু বিছানায় পরলে সবাই বুঝতে পারে সে অসুস্থ কিন্তু তাতে বাকিদের জীবন থেমে থাকে না। এই অভিমান বা মনঃকষ্টই নারীদের হাতে ধরে নিয়ে যায় রোগের দুনিয়ায়।
আমাদের দেশে বিয়ের আগে আর বিয়ের পরের বাস্তবতায় ব্যাপক তফাৎ। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বিয়ের পর বয়ফ্রেন্ডটি হঠাৎ করেই বর থেকে টিপিকাল স্বামী হয়ে যায়। সংসারের হাজার ঝুঁক্কির মধ্যে সেরের উপর সোয়া সেরের মতো নানান সামাজিক আপ্যায়নের ফলে নারী বনে যাওয়া মেয়েটির নিজের দিকে নজর দেওয়ার ফুরসৎ মিলে না। প্রথম প্রথম হয়তো গাইগুই করে কিন্তু একসময় যেন কাজ করার, রান্না করার জিদ পেয়ে বসে। বিয়ের পর বা বাচ্চা হওয়ার পর সংসার সামলাতে সামলাতে নারীরা যে কখন মুটিয়ে যায় তা খেয়াল আসে যখন বেড়াতে যাওয়ার সময় ব্লাউজটা গায়ে না লাগে। অভিমান উপচে উঠে। আবার মুষ্টিমেয় কিছু নারী অনেক গৃহকর্মী নিয়ে সুখের পশরা সাজিয়ে বসে, খানাদানা আপ্যায়ন হৈ-হুল্লোড়, ফলাফল সেই মুটিয়ে যাওয়া অতঃপর অসুখ। শুরু হয় উচ্চ রক্তচাপ দিয়ে এরপর ডায়াবেটিকস এবং অন্যান্য অসুখ।
নারী তোমাকেই বলছি:
শোন মেয়ে নিজের জন্য বাঁচতে শিখো। নিজেকে ধরিত্রী ভাবতে শিখো। নিজেকে ভালোবাসতে শিখো। আয়নার সামনে গিয়ে বলো- আমি আমার। প্রতিদিন গোসলের আগে পাঁচ মিনিট অন্তত এক্সারসাইজ করো। ইন্সট্রুমেন্ট নেই? তাতে কি? ফ্রি হ্যান্ড জগিং করো, জানালার গ্রিল ধরেই শুরু কর। সময় নাই? কিচেনে তো ঢের সময় দাও, তো সেই সময়ই রান্না চুলায় দিয়ে এক্সারসাইজ কর। কেন করবে? কারণ তুমি শুধুই তোমার।
তুমি সুস্থ থাকলে সবার প্রতি নজর দিতে পারবে, সবার ভুল-ত্রুটি চোখে পরবে, অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে পারবে, স্বামীর সাথে মধুর ঝগড়া করতে পারবে এবং সবাইকে ভালোবাসতে পারবে। কারণ সেই আপ্ত বাক্য, স্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল। নিজে সুস্থ ও সুন্দর থাকলে আয়নার সামনে দাঁড়ালে মনটাও ভালো হয়ে যাবে। মানুষ সুন্দরের পূজারী, তুমিও নও কি! গোলাপ বেলী রেখে কী রাস্তার পারে অযত্নে ফুটে থাকা ফুলের প্রতি আগ্রহ বেশি? আর হ্যা, তুমি সুন্দর থাকলে স্বামীকেও বলতে পারবে, ‘তুমি মুটিয়ে যাচ্ছো, বুড়ো বুড়ো ভাব’। দেখবে স্বামীও মর্নিংওয়াক শুরু করেছে।
স্বামী সন্তানের বন্ধু হতে শিখো। স্বামীর অফিসের গল্প শুনো প্রতিদিন চা-নাস্তা খেতে খেতে সেইসাথে নিজের সারাদিনের কথাগুলোও শেয়ার করতে থাকো। সাবধান অতি অনুসন্ধিৎসু হতে যেও না, স্বামীর প্রতি অকারণ সন্দেহ পোষণ করো না, প্রতিদিন এভাবে চলতে চলতে একসময় দুজনে খুব ভালো বন্ধু হয়ে যাবে। দেখবে এরপর স্বামী অফিস থেকে বাসায় ঢুকেই তোমাকে খুঁজবে, খানাপিনার চেয়ে বেশি খুঁজবে গল্প করতে আর তুমি যদি পরিপাটি হয়ে থাকো তাহলে হয়তো বলেই ফেলবে- চল কাছাকাছি বাইরে কোথাও যাই। দেখবে নিজের মনটাই ভালো হয়ে যাবে আর মন ভালো থাকলে অসুখ দৌড়ে পালায়।
বাচ্চাদের বন্ধু হও। বাচ্চাদের সব গল্প শুনো, স্কুলের গল্প বন্ধুদের গল্প সব শুনো, যে কথা আমতা আমতা করবে বলতে চাইবে না নির্ভয় দিয়ে সেই কথাও শুনো কিন্তু বিশ্বাস ভঙ্গ করো না, দেখবে সন্তানরাও বাইরে থেকে এসে তোমাকেই খুঁজবে। এভাবেই তুমি নিজে সবার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে যাবে। নিজেকে রানী মনে হবে।
স্বামীদের বলছি- স্ত্রী অসুস্থ হলে পুরো সংসারটাই অথর্ব হয়ে যায়। কাজেই স্ত্রীর প্রতি নজর দিন, তার কাজের প্রশংসা করুন, একটু সাজগোজ করতে বলুন, তার জন্য নিজে কিছু কিনুন, তাকে ভালোবাসুন। যেমন- বাসতেন বিয়ের পর বা প্রেম করাকালীন। দুজনে মিলেই হাঁটুন, স্বাস্থ্যসম্মত খাবার খান, স্বাস্থ্য সচেতন হউন, ঘরের কাজে সাহায্য করুন যেমন আমাদের নবী (সাঃ) করতেন এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ‘দাম্পত্য সম্পর্ক’ সচল রাখুন। স্বামী-স্ত্রী উভয়ের অসুখকে দূরে হিমালয়ে পাঠান।
স্বামী-স্ত্রীর সুস্থ সম্পর্ক ইকুয়াল টু সন্তানদের সুস্থ মানসিক বিকাশ। তা না হলে জিনগত কারণে সন্তান হয়তো ব্রিলিয়ান্ট হবে, ভালো চাকরি করবে, নয়তো ব্যবসা করবে কিন্তু মানসিক স্বাস্থ্য অসুস্থ থাকবে, মানসিক অসুস্থতা সর্ব রোগের কারণ ও সম্পর্ক নষ্টের কারণ।
সপ্তাহে একদিন কাজের বুয়া ছুটি দিয়ে বাড়ির সবাই মিলে সব কাজ করুন। ধর্ম পালন করুন, নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন করুন, মাংস ফাস্টফুড সফট ও হার্ড ড্রিংকস ধূমপান এরিয়ে চলুন, হালাল খাবার খান, মুসলিম ভাইবোন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ুন, প্রতিদিন কুরআন অর্থসহ পড়ুন, দেখবেন কঠিন রোগবালাই নিজেই গুডবাই জানাচ্ছে।
জেগে উঠো নারী, নিজেকে রোগবালাইয়ের ভাগাড়ে নিক্ষেপ করো না। খুব ভালোবাসো নিজেকে।
Reporter Name 
























