ঢাকা ০৩:৫৪ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৭ মার্চ ২০২৬, ২ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

নতুন ব্যাংকনোট এবং উপেক্ষিত জাতীয় কবি

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ০৬:৪৯:৪৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ জুন ২০২৫
  • ১৮০ বার

ব্যাংকনোট আসলে কি? ব্যাংকনোট একটি জাতির পরিচয় এবং সংস্কৃতির দৃশ্যমান প্রতীকগুলির মধ্যে অন্যতম। ব্যাংকনোট একটি জাতির ইতিহাস, মূল্যবোধ এবং আকাঙ্ক্ষার বাস্তব প্রতিনিধিত্বকারী স্মারক। তাই, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে জাতীয় পরিচয়, শিকড় এবং সংস্কৃতি প্রচারের জন্য ব্যবহৃত হয়ে আসছে ব্যাংকনোট।

ইতিহাস বলে, ব্যাংকনোট একটি জাতির গর্ব, দেশপ্রেম এবং আনুগত্যের বার্তা বহন করার জন্য ব্যবহৃত হয়ে আসছে। উদাহরণস্বরূপ, ১৬৯৪ সালে ব্যাংক অফ ইংল্যান্ড কর্তৃক জারি করা প্রথম ব্যাংক নোটের সামনের দিকে গ্রেট ব্রিটেনের নারী রূপ ব্রিটানিয়ার একটি খোদাই করা প্রতিকৃতি শোভিত ছিলো। ব্রিটানিয়াকে ত্রিশূল এবং ঢাল ধারণ করে চিত্রিত করা হয়েছিল, যা ব্রিটিশ নৌশক্তি এবং প্রতিরক্ষার প্রতীক।

বাংলাদেশে নতুন মুদ্রা বাজারে ছেড়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক দিনকয়েক আগেই। জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে অর্জিত দ্বিতীয় স্বাধীনতার প্রায় ১০ মাস পর এই নোট বাজারে এলো। নোটে বিভিন্ন গ্রাফিতি এবং ইমেজ থাকলেও অনুপস্থিত আমাদের প্রাণের কবি নজরুল। [যাঁকে অন্তর্বর্তী সরকার জাতীয় কবি হিসেবে গ্যাজেট ভূক্ত করেছে।

জাতীয় কবিকে কীভাবে সম্মাননা জানাতে হয় সেটি কিউবার জাতীয় কবি হোসে মার্তির সমাধি কমপ্লেক্সের দিকে তাকালে অনুভব করা যায়। 

ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি ডঃ এপিজে আবদুল কালাম ২০০৯ সালে ঢাকায় এসেছিলেন এরাবিয়ান হর্স ঢেউ টিনের মালিক সুফী মীজানুর রহমান প্রতিষ্ঠিত একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কনভোকেশনে। তিনি তাঁর বক্তৃতায় নজরুলের ‘ঊষার দুয়ারে হানি আঘাত’ অংশটুকু বাংলায় পাঠ করেছিলেন। কয়েক বছর আগে বলিউড ভাইজান সালমান খান ঢাকায় ‘কবি কাজী নজরুল ইসলামের’ নাম উচ্চারণ করে গভীর শ্রদ্ধা জানিয়েছিলেন পিতা লেখক সেলিম খানের নির্দেশে। [সেলিম খানের বন্ধু জাভেদ আখতারের মামা কবি সাইবা আখতার রাঁচীতে নজরুলের সাথে একই এসাইলামে ছিলেন।] তাঁরা কবিকে চিনলেও আমাদের ট্রেজারি বিভাগ কবিকে চিনতে পারলেন না!

ফিরে তাকাই জুলাই বিপ্লবের বিভিন্ন গ্রাফিতিতে : বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-আন্দোলনে একদম সম্মুখ সারিতে ছিলেন নজরুল। তাঁর অসংখ্য পঙক্তি ও গান এই আন্দোলনে প্রাণ সঞ্চার করেছে – এ নিয়ে কারোরই দ্বিমত নেই। বিক্ষোভে, বিপ্লবে এবং দ্রোহকালে নজরুল এক হোমশিখা। ২০২৪ এ কবি সেটি আবার প্রমাণিত হয়েছে। তিনি উপস্থিত থাকলেন অবিনাশী সব চরণ নিয়ে। দেশ জুড়ে বিবিধ গ্রাফিতিতে নজরুলের যেসব চরণ আজো শোভা পাচ্ছে :

১। ভয়ে কাঁপে কাপুরুষ লড়ে যায় বীর

২। গাহি সাম্যের গান

৩। ঐ নূতনের কেতন ওড়ে কালবোশেখীর ঝড়

৪। চির উন্নত মম শির

৫। কারার ঐ লৌহ কপাট

৬। মোরা একই বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু মুসলমান

৭। মোরা ঝঞ্ঝার মতো উদ্দাম

৮। নমঃ নমঃ নমঃ বাংলাদেশ মম

৯। বল বীর, বল উন্নত মম শির

১০।গাজনের বাজনা বাজা! কে মালিক? কে সে রাজা?

কে দেয় সাজা/ মুক্ত স্বাধীন সত্যকে রে?’

১১। গাহি সাম্যের গান – ইত্যাদি।

দুঃশাসনের বিরুদ্ধে বজ্রকঠিন উচ্চারণের নাম নজরুল। নিপীড়িত জনগোষ্ঠীকে মুক্তি এনে দেয়ার নাম নজরুল। অজাচারের বিরুদ্ধে নজরুল নিজেই এক প্রতিরোধ। কবি উচ্চারণ করেছেন : ‘আসিতেছে শুভদিন / দিনে দিনে বহু বাড়িয়াছে দেনা শুধিতে হইবে ঋণ।’ তাইতো নজরুলের রচনা সকল যুগের, সকল কালের, সব মানুষের।

শুরুর আলাপে ফিরে যাই। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মূদ্রায় জাতীয় কবি-লেখকদের প্রতিকৃতি এবং রচনার অংশ শোভা পায়। ইজরায়েল, অস্ট্রেলিয়া, আইসল্যান্ড, ইউক্রেন, স্কটল্যান্ড, চিলি, আমেরিকা এবং ইংল্যান্ডের মূদ্রায় যথাক্রমে লিয়া গোল্ডবার্গ, ব্যাঞ্জো প্যাটারসন, জোনাস হ্যালগ্রিমসন, লেসিয়া ইউক্রেইঙ্কা, ন্যান শেফার্ড, পাবলো নেরুদা-গ্যাব্রিয়েলা মিস্ত্রাল, মায়া এঞ্জেলো এবং জেন অস্টিন-উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের প্রতিকৃতি ও উদ্ধৃতি শোভা পাচ্ছে। এছাড়া জাপান, তুরস্ক, মালাবি, আলবেনিয়া [ইতিহাসবিদ-কবি নায়ীম ফ্রাশেরি], কিরঘিজস্থান [কবি সায়কাবিয়া কারলায়িভা], কানাডা প্রভৃতি দেশেও কবি-সাহিত্যিকদের সম্মানে নিয়মিত ও স্মারক মুদ্রা চালু আছে।

যখন থেকে নতুন নোট বাজারে আসবে বলে আমরা শুনছিলাম তখন থেকে আশায় বুক বেঁধে ছিলাম যে জুলাই অভ্যুত্থানের সম্মুখ সারির মহানায়ক কবি নজরুলকে বাংলাদেশ ব্যাংক অথবা অর্থ মন্ত্রণালয় মূল্যায়ন করবে। কিন্তু দিন শেষে যেই লাউ সেই কদু!

[রফিক সুলায়মান

শিল্প-সমালোচক এবং কিউরেটর ]

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

নতুন ব্যাংকনোট এবং উপেক্ষিত জাতীয় কবি

আপডেট টাইম : ০৬:৪৯:৪৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ জুন ২০২৫

ব্যাংকনোট আসলে কি? ব্যাংকনোট একটি জাতির পরিচয় এবং সংস্কৃতির দৃশ্যমান প্রতীকগুলির মধ্যে অন্যতম। ব্যাংকনোট একটি জাতির ইতিহাস, মূল্যবোধ এবং আকাঙ্ক্ষার বাস্তব প্রতিনিধিত্বকারী স্মারক। তাই, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে জাতীয় পরিচয়, শিকড় এবং সংস্কৃতি প্রচারের জন্য ব্যবহৃত হয়ে আসছে ব্যাংকনোট।

ইতিহাস বলে, ব্যাংকনোট একটি জাতির গর্ব, দেশপ্রেম এবং আনুগত্যের বার্তা বহন করার জন্য ব্যবহৃত হয়ে আসছে। উদাহরণস্বরূপ, ১৬৯৪ সালে ব্যাংক অফ ইংল্যান্ড কর্তৃক জারি করা প্রথম ব্যাংক নোটের সামনের দিকে গ্রেট ব্রিটেনের নারী রূপ ব্রিটানিয়ার একটি খোদাই করা প্রতিকৃতি শোভিত ছিলো। ব্রিটানিয়াকে ত্রিশূল এবং ঢাল ধারণ করে চিত্রিত করা হয়েছিল, যা ব্রিটিশ নৌশক্তি এবং প্রতিরক্ষার প্রতীক।

বাংলাদেশে নতুন মুদ্রা বাজারে ছেড়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক দিনকয়েক আগেই। জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে অর্জিত দ্বিতীয় স্বাধীনতার প্রায় ১০ মাস পর এই নোট বাজারে এলো। নোটে বিভিন্ন গ্রাফিতি এবং ইমেজ থাকলেও অনুপস্থিত আমাদের প্রাণের কবি নজরুল। [যাঁকে অন্তর্বর্তী সরকার জাতীয় কবি হিসেবে গ্যাজেট ভূক্ত করেছে।

জাতীয় কবিকে কীভাবে সম্মাননা জানাতে হয় সেটি কিউবার জাতীয় কবি হোসে মার্তির সমাধি কমপ্লেক্সের দিকে তাকালে অনুভব করা যায়। 

ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি ডঃ এপিজে আবদুল কালাম ২০০৯ সালে ঢাকায় এসেছিলেন এরাবিয়ান হর্স ঢেউ টিনের মালিক সুফী মীজানুর রহমান প্রতিষ্ঠিত একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কনভোকেশনে। তিনি তাঁর বক্তৃতায় নজরুলের ‘ঊষার দুয়ারে হানি আঘাত’ অংশটুকু বাংলায় পাঠ করেছিলেন। কয়েক বছর আগে বলিউড ভাইজান সালমান খান ঢাকায় ‘কবি কাজী নজরুল ইসলামের’ নাম উচ্চারণ করে গভীর শ্রদ্ধা জানিয়েছিলেন পিতা লেখক সেলিম খানের নির্দেশে। [সেলিম খানের বন্ধু জাভেদ আখতারের মামা কবি সাইবা আখতার রাঁচীতে নজরুলের সাথে একই এসাইলামে ছিলেন।] তাঁরা কবিকে চিনলেও আমাদের ট্রেজারি বিভাগ কবিকে চিনতে পারলেন না!

ফিরে তাকাই জুলাই বিপ্লবের বিভিন্ন গ্রাফিতিতে : বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-আন্দোলনে একদম সম্মুখ সারিতে ছিলেন নজরুল। তাঁর অসংখ্য পঙক্তি ও গান এই আন্দোলনে প্রাণ সঞ্চার করেছে – এ নিয়ে কারোরই দ্বিমত নেই। বিক্ষোভে, বিপ্লবে এবং দ্রোহকালে নজরুল এক হোমশিখা। ২০২৪ এ কবি সেটি আবার প্রমাণিত হয়েছে। তিনি উপস্থিত থাকলেন অবিনাশী সব চরণ নিয়ে। দেশ জুড়ে বিবিধ গ্রাফিতিতে নজরুলের যেসব চরণ আজো শোভা পাচ্ছে :

১। ভয়ে কাঁপে কাপুরুষ লড়ে যায় বীর

২। গাহি সাম্যের গান

৩। ঐ নূতনের কেতন ওড়ে কালবোশেখীর ঝড়

৪। চির উন্নত মম শির

৫। কারার ঐ লৌহ কপাট

৬। মোরা একই বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু মুসলমান

৭। মোরা ঝঞ্ঝার মতো উদ্দাম

৮। নমঃ নমঃ নমঃ বাংলাদেশ মম

৯। বল বীর, বল উন্নত মম শির

১০।গাজনের বাজনা বাজা! কে মালিক? কে সে রাজা?

কে দেয় সাজা/ মুক্ত স্বাধীন সত্যকে রে?’

১১। গাহি সাম্যের গান – ইত্যাদি।

দুঃশাসনের বিরুদ্ধে বজ্রকঠিন উচ্চারণের নাম নজরুল। নিপীড়িত জনগোষ্ঠীকে মুক্তি এনে দেয়ার নাম নজরুল। অজাচারের বিরুদ্ধে নজরুল নিজেই এক প্রতিরোধ। কবি উচ্চারণ করেছেন : ‘আসিতেছে শুভদিন / দিনে দিনে বহু বাড়িয়াছে দেনা শুধিতে হইবে ঋণ।’ তাইতো নজরুলের রচনা সকল যুগের, সকল কালের, সব মানুষের।

শুরুর আলাপে ফিরে যাই। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মূদ্রায় জাতীয় কবি-লেখকদের প্রতিকৃতি এবং রচনার অংশ শোভা পায়। ইজরায়েল, অস্ট্রেলিয়া, আইসল্যান্ড, ইউক্রেন, স্কটল্যান্ড, চিলি, আমেরিকা এবং ইংল্যান্ডের মূদ্রায় যথাক্রমে লিয়া গোল্ডবার্গ, ব্যাঞ্জো প্যাটারসন, জোনাস হ্যালগ্রিমসন, লেসিয়া ইউক্রেইঙ্কা, ন্যান শেফার্ড, পাবলো নেরুদা-গ্যাব্রিয়েলা মিস্ত্রাল, মায়া এঞ্জেলো এবং জেন অস্টিন-উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের প্রতিকৃতি ও উদ্ধৃতি শোভা পাচ্ছে। এছাড়া জাপান, তুরস্ক, মালাবি, আলবেনিয়া [ইতিহাসবিদ-কবি নায়ীম ফ্রাশেরি], কিরঘিজস্থান [কবি সায়কাবিয়া কারলায়িভা], কানাডা প্রভৃতি দেশেও কবি-সাহিত্যিকদের সম্মানে নিয়মিত ও স্মারক মুদ্রা চালু আছে।

যখন থেকে নতুন নোট বাজারে আসবে বলে আমরা শুনছিলাম তখন থেকে আশায় বুক বেঁধে ছিলাম যে জুলাই অভ্যুত্থানের সম্মুখ সারির মহানায়ক কবি নজরুলকে বাংলাদেশ ব্যাংক অথবা অর্থ মন্ত্রণালয় মূল্যায়ন করবে। কিন্তু দিন শেষে যেই লাউ সেই কদু!

[রফিক সুলায়মান

শিল্প-সমালোচক এবং কিউরেটর ]