,

যানজটে স্থবির ঢাকা ৫ মিনিটের পথ যেতে সময় লাগে দেড় ঘণ্টা

হাওর বার্তা ডেস্কঃ প্রকল্পের কাজ দ্রুত শেষ করার দাবি সাধারণ যাত্রীদের : অতিরিক্ত সময় নিয়ে চলাচলের অনুরোধ
ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের : নাগরিক সেবা বাড়ানোর লক্ষ্যে ঢাকাকে দুই ভাগ করা হলেও যানজট যন্ত্রণা বেড়েছে, দায়িত্বশীলরা জেগে জেগে ঘুমাচ্ছেন

প্রাইভেটকার বা গণপরিবহণে এক কিলোমিটার পথ যেতে কত সময় লাগে? এক থেকে ৩ মিনিট? অথবা ৫ মিনিট? রাজধানী ঢাকায় এক কিলোমিটর পথ অতিক্রম করতে যানবাহনের এক থেকে দেড় ঘণ্টা সময় লেগে যাচ্ছে। প্রতিদিনই একই চিত্র রাজধানী ঢাকায়। যানজটে যেন স্থবির হয়ে পড়েছে রাজধানী ঢাকা। প্রতিদিন সকালে যানজট শুরু হয় চলে দিনভর। ধনী গরীব সব ধরণের কর্মব্যস্ত মানুষ যানজটের কাছে জিম্মিদশায় পড়ে গেছে। দায়িত্বশীলদের এ বিষয়ে ভ্রæক্ষেপ নেই। নাগরিক সেবা বৃদ্ধির জন্য রাজধানী ঢাকা সিটি করপোরেশন দুই ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। কিন্তু সেবার বদলে যানজট নামের যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে কর্মজীবী মানুষ। পরিবেশবিদদের কেউ কেউ বলতে শুরু করেছেন যতই উন্নয়নের দাবি করা হোক না কেন ৪শ’ বছরের পুরোনা ঢাকা পরিত্যক্ত শহরে পরিণত হতে চলেছে।

 এক সময়ের মসজিদের শহর ঢাকা যেন যানজটের শহরে রূপলাভ করেছে। কর্মজীবীদের নির্দিষ্ট গন্তব্যে যেতে সড়কের একই যায়গায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতে হয়। সকালে অফিস সময়ে বের হওয়া নগরবাসীর উদ্দেশ্য অফিসে সঠিক সময়ে যাওয়া কিন্তু সেই নির্দিষ্ট অফিস সময় যেন তাদের কাছে ১ থেকে দেড় ঘণ্টা পর।

এছাড়াও বিআরটি প্রকল্পের কাজ চলমান থাকায় ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগামী সড়কে গত কয়েকদিন ধরে চলছে তীব্র যানজট। এজন্য বিমানবন্দরগামী যাত্রীদের অতিরিক্ত সময় নিয়ে যাত্রা শুরু করার অনুরোধ করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক উত্তরা বিভাগ। বাস র‌্যাপিট ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্পের কাজ চলমান থাকায় ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগামী সড়কে গত কয়েকদিন ধরে চলছে তীব্র যানজট। ওই সড়কে চলাচলরত গাড়ি আটকে থাকছে দীর্ঘ সময় ধরে। এতে সময় মতো গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছেন না যাত্রীরা। ইতোমধ্যে বিমানবন্দরগামী যাত্রীদের অতিরিক্ত সময় হাতে নিয়ে চলাচলের অনুরোধ জানায় ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ। লা মেরিডিয়ান হোটেল ও কাওলা অতিক্রম করার পর বিমানবন্দরগামী যাত্রীদের অবশ্যই বাম লেন ব্যবহার করার জন্য অনুরোধ জানান ট্রাফিক বিভাগের কর্মকর্তারা।
ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার (ট্রাফিক উত্তর) আবু সালেহ মো. রায়হান জানিয়েছেন, বিমানবন্দর এলাকায় চলমান বিআরটি প্রকল্পের কাজের জন্য ওই রুটের তিন লেনে গাড়ি চলাচল বন্ধ রয়েছে। এতে খিলক্ষেত হয়ে উত্তরা ও গাজীপুরগামী সড়কে প্রায়ই তীব্র যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। উত্তরা, টঙ্গী ও গাজীপুরগামী যাত্রীদের রাস্তায় আটকে থাকতে হচ্ছে। বিশেষ করে বিদেশগামী যাত্রীরা নির্দিষ্ট সময়ে বিমানবন্দরে পৌঁছাতে না পারলে ফ্লাইট মিস করার আশঙ্কা তৈরি হয়।

গতকাল বৃহস্পতিবার সরেজমিন দেখা গেছে, রাজধানীর আবদুল্লাহপুর থেকে বিমানবন্দর খিলক্ষেত সড়কের উত্তরা এলাকায় রাস্তার দুই পাশেই ছিলো তীব্র যানজট। এই সড়কের আজমপুর বাসস্ট্যন্ডের সামনে দুই পাশের রাস্তাতেই যাত্রীবাহী বাসের সারি দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। এসব গাড়ি রাস্তার মাঝে দাঁড়িয়ে যাত্রী উঠানোর কারণে পেছনে লম্বা লাইন সৃষ্টি হয়। এতে করে এই সড়কের গাড়িগুলোকে থেমে থেমে চলতে হয়। সকালে অফিস সময়ের দিকে উত্তরার ব্যাটালিয়ন পুলিশের অফিসের সামনের সড়কে ব্যক্তিগত প্রাইভেটকারের সংখ্যা ছিলো বেশি। দূরপাল্লার বাস এসে এই সড়কের সামনে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। তবে এখানকার রাস্তার মাঝে ইউটার্ন থাকার কারণে বিভিন্ন গাড়ির জটলা থাকতে দেখা গেছে। সকালে অফিস সময়ে যানজট তীব্র হয়ে দুপুরের দিকে কিছুটা কমে আসে। কিন্তু বিকেলে অফিস ছুটির সময় আবার শুরু হয় তীব্র যানজট। তবে গতকাল এই সড়কের মোড়ে মোড়ে ট্রাফিক পুলিশের অতিরিক্ত সদস্যদের দায়িত্ব পালন করতে দেখা গেছে। এছাড়াও ট্রাফিক পুলিশের সাথে সাহায্যকারী একাধিক লোকজনকে কাজ করতে দেখা যায়। তারা প্রত্যেক বাসস্ট্যান্ড ও গাড়ি থামার স্থানে লাঠি নিয়ে দাঁড়িয়ে গাড়িগুলোকে দ্রæত চলে যাওয়ার নির্দেশনা দেন। কিন্তু বেশিরভাগ স্থানেই আস্তে আস্তে যাত্রীবাহী ও প্রাইভেটকারগুলোকে চলতে হয়।

এছাড়াও রাজধানীর শনিরআখড়া, যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ, বাড্ডা, রামপুরা, কমলাপুর, টিকাটুলী, মতিঝিল, শান্তিনগর, পল্টন, গুলিস্তান, মৎস্য ভবন, প্রেসক্লাব, বাংলামটর, শাহবাগ, সায়েন্সল্যাব, ধানমন্ডি, আজিমপুর, মহাখালী, জাহাঙ্গীর গেট, ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার, এলাকায় যানজট সৃষ্টি হয়। বড় সড়কগুলোর যানজটের প্রভাব পড়ে পাড়া-মহল্লার সড়কগুলোতেও। এ কারণে বিভিন্ন এলাকায় রিকশার জটলাও লেগে যায়। মিরপুর এলাকার গাড়ির যাত্রীদের পড়তে হয় ভোগান্তিতে। কারওয়ানবাজার মোড় সিগন্যালও আটকে ছিল দীর্ঘক্ষণ। চালকদের আগে যাওয়ার প্রতিযোগিতায় গাড়ির সামনের দিকটা ঢুকিয়ে পেছনের গাড়িকে আটকে দেয়। এতে পেছনের গাড়িগুলো দীর্ঘ লাইন হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। বেলা বাড়ার সাথে সাথে রাজধানীর অন্য সড়কগুলোতে বাড়তে থাকে যানবাহনের চাপ। রাজধানীর সব সড়কেই যাত্রীবাহী ও ব্যক্তিগত গাড়ির চাপ থাকার কারণে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যেতে বেশি সময় ব্যয় করতে হচ্ছে নগরবাসীকে।

এছাড়া জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, লোডশেডিং, গণপরিবহনের ভাড়া বৃদ্ধি, বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধিসহ ভোলায় পুলিশের সঙ্গে বিএনপি নেতাকর্মীদের সংঘর্ষে দু’জনের মৃত্যুর ঘটনায় এ প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করে ঢাকা মহানগর উত্তর-দক্ষিণ বিএনপি। নয়াপল্টনে বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে সমাবেশ থাকায় আশে পাশের সড়কের দুই পাশে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। সকাল থেকে বিএনপির নেতাকর্মীরা মিছিল নিয়ে নয়াপল্টনে আসতে শুরু করে। সমাবেশ শুরু হওয়ার আগে নয়াপল্টনের ভিআইপি সড়কের একপাশ বিএনপি নেতাকর্মীদের দখলে চলে যায়। ফলে মতিঝিল, ফকিরাপুল থেকে কাকরাইলগামী সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে করে আশপাশের সড়কেও তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়।

যাত্রীদের অভিযোগ, রাস্তাগুলোতে একদিকে গাড়ির যানজট, অন্যদিকে এ স্থবির পরিস্থিতিতে যানবাহন চালকরাও ট্রাফিক পুলিশের নির্দেশনা না মানায় অবস্থা আরও প্রকট হয়ে ওঠে। আর নিয়ম মেনে না চলার কারণে সৃষ্ট যানজট মোকাবেলায় হিমশিম খেতে হয় ট্রাফিক পুলিশকে। শৃঙ্খলা না মেনে চালকদের বেপরোয়া মনোভাব নিয়ে গাড়ি চালানোর কারণে যানজট দিন দিন তীব্র হচ্ছে। বাস-মিনিবাসগুলো যেখানে-সেখানে দাঁড় করিয়ে যাত্রী ওঠা-নামা করায়। রাস্তা দখল করেও বসানো হয় অস্থায়ী দোকান। এ ছাড়া প্রাইভেট কার, ট্রাক, ভ্যান ইত্যাদি রাস্তার ওপরই পার্কিং করে রাখা হয়।

ডিএমপি উপ-পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক-উত্তরা) মো. সাইফুল হক বলেন, মূল সড়কে বিআরটি প্রকল্পের কাজ চলছে। এছাড়া থার্ড টার্মিনালের কাজও চলছে। এসব কারণে মূল সড়ক থেকে বিমানবন্দরে প্রবেশের রাস্তাগুলো কমে গেছে। আবার বিআরটি প্রকল্পের কাজের জন্য মূল সড়কও সঙ্কুচিত হয়েছে। যে কারণে রাজধানী থেকে আউটগোয়িংয়ে গতি কমে এসেছে।

সম্রাট পরিবহনের যাত্রী আরিফ সরকার ইনকিলাবকে বলেন, আমি নিয়মিত গাজীপুর থেকে এসে মহাখালীতে অফিস করি। কিন্তু এই সড়কে প্রকল্পের কাজ চলার কারণে পুরো রাস্তা দিয়ে গাড়ি চলতে পারে না। রাস্তার অধিকাংশ জায়গাতেই উন্নয়ন প্রকল্পের জিনিসপত্র রাখা আর রাস্তাও বন্ধ থাকে। তাই এই সড়কের আমার মতো নিয়মিত যাত্রীর দুর্ভোগের শেষ নেই। প্রকল্পের কাজ দ্রæত করে শেষ হলে হয়ত দুর্ভোগ থেকে মুক্তি পাওয়া যেত।
উত্তরা এলাকার বাসিন্দা আরিফ মিয়া সোহেল ইনকিলাবকে বলেন, প্রকল্পের কাজ চলমান থাকার কারণে গাজীপুর-বিমানবন্দর সড়কে প্রতিদিনই যানজট থাকে। দীর্ঘ সময় ধরে উন্নয়ন কাজ চলমান থাকায় এই এলাকার মানুষের ভোগান্তিও বেশি। বাসা থেকে বেড়িয়ে কোথাও যেতে হলে প্রথমেই যানজটে পড়তে হয়। এছাড়াও নির্মাণ কাজ চলার কারণে ধুলাবালিতে একাকার হয়ে যেতে হয়। তবে সড়কের উন্নয়ন কাজ শেষ হলে যোগাযোগ সহজ হবে বলে আশা করেন তিনি।

Print Friendly, PDF & Email

     এ ক্যাটাগরীর আরো খবর