,

জ্বালানি তেলের উত্তাপ বাজারে

হাওর বার্তা ডেস্কঃ গ্যাসের দাম বেড়েছে, বিদ্যুতের দাম বেড়েছে। কয়েক দফায় সয়াবিনের দাম বৃদ্ধির পর ফের লিটারে ২০ টাকা করে বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় সঙ্গে সঙ্গে বেড়ে গেছে গণপরিবহণ ভাড়া, ট্রাকভাড়া। রিক্সা, সিএনজি ভাড়াও বেড়ে গেছে অস্বাভাবিক ভাবে। আর নিত্যপণ্যের বাজারে আগুন সেই রমজান মাস থেকেই; সে আগুন এখনো নিভেনি। নিত্যপণ্যমূল্যর বৃদ্ধির আগুনে কেরোসিন, ডিজেল ঢেলে যেন আরো উত্তপ্ত করা হচ্ছে বাজার। এতে নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্তরাই শুধু নয়, সীমিত আয়ের মানুষ ‘সংসার চালানো’ নিয়ে চরম বিপাকে পড়ে গেছে। জীবনযাত্রায় সর্বোত্র মূল্য বৃদ্ধির এই প্রতিযোগিতায় মানুষের টিকে থাকাই দায় হয়ে পড়েছে। কেউ গচ্ছিত পুঁজি ভেঙ্গে খাচ্ছেন; কেউ ধারদেনা করে চলছেন। প্রয়োজনীয় পণ্য ক্রয়ে অপারগতায় কেউ এখন খাবার কমিয়ে দিয়েছে। রাজধানী ঢাকা থেকে গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত একই চিত্র। লাখ লাখ পরিবারের খেয়ে পড়ে বেঁচে থাকা দায় হয়ে গেছে।

জানতে চাইলে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সাবেক চেয়ারম্যান ও কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধির কারণে বাজারে মূল্যবৃদ্ধির যে প্রভাব তা পড়তে শুরু করেছে। অক্টোবরের দিকে ভোক্তারা আরও খারাপ অবস্থার দিকে যাবেন। সরকার ভোক্তাদের সহনশীলতার সুযোগ নিচ্ছে। বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমলো কিন্তু সরকার দাম কমালো না। ইতিপূর্বে সরকারের যত ভর্তুকি দিতে হয়েছে, সমস্ত পরিশোধের পরেও ৪৮ হাজার কোটি টাকা লাভ করেছে। এদেশের ভোক্তারা খুবই সহনশীল। সরকার মনে করছে আমার মুরগি আমি সামনে কাটি, পিছনে কাটি-যেভাবেই কাটি কাটবো।

নিত্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের সাধ্যের বাইরে চলে গেছে আরও অনেক আগেই। এরপর থেকে ব্যয় সংকোচন নীতিতে হাঁটছেন তারা। অনেকে খাওয়া কমিয়ে দিয়েছেন, অনেকে খাদ্য তালিকা থেকে আমিষ জাতীয় খাবার বাদ দিয়েছেন, ঋণ নিয়েও চলতে হচ্ছে অনেককে। এছাড়া জরুরি পণ্যগুলোরই দাম বেড়েছে দফায় দফায়। যারা একেবারেই চলতে পারছেন না, তারা ছেড়েছেন রাজধানী। এই সঙ্কটের মধ্যেই হঠাৎ জ্বালানি তেল ও গ্যাসের দাম বৃদ্ধির সিদ্ধান্তে বাজারে যেন আগুন লেগেছে। গতকাল সোমবার রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা যায়, প্রতিটি পণ্যের দাম বেড়েছে ১০ টাকা থেকে ১৫ টাকা পর্যন্ত। চাল, ডাল, তেল, মুরগি, ডিম, মাছ, সবজিসহ কোন পণ্যই দামবৃদ্ধির তালিকা থেকে বাদ যায়নি।

ব্যবসায়ীদের দাবি, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় প্রভাব ফেলছে দ্রব্যমূল্যে। এতেই পণ্যের দাম বেড়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে ক্রেতারা বলছেন, হঠাৎ করে দেশে বাজে অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এমন কোনো জিনিস নেই যে দাম বাড়েনি। আমরা চলব কীভাবে? বাজারের যে অব্যবস্থাপনা তার দিকে নজর দেয়ার আহ্বান জানান তারা। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষ বড় ধরনের ভোগান্তির মুখে পড়বে বলে মত বিশেষজ্ঞদের। তারা বলেন, পরিস্থিতি এমন হলে মানুষের জীবনযাত্রার মানে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে এবং জনগনের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হবে। তাই সরকারকে দ্রুত বাজার ব্যবস্থাপনা ও মনিটরিং জোরদার করার পরামর্শ তাদের।

কারওয়ান বাজারের পাইকারি ব্যবসায়ীরা বলছেন, সবজি বেশি আসে নরসিংদী, বগুড়া, খুলনা, সাতক্ষীরাসহ অন্যান্য অঞ্চল থেকে। আগে যে ট্রাকের ভাড়া ছিল ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা, এখন সে ট্রাকের ভাড়া সাড়ে ১৩ হাজার থেকে ১৮ হাজার টাকা। সেই বাড়তি ভাড়া পণ্যের সঙ্গে যোগ করেই পাইকারি বাজারে দাম নির্ধারণ করা হচ্ছে। তাই দাম কিছুটা বেড়েছে। অনেক ব্যাপারী লোকসানের ভয়ে সবজি আনছেন না।

ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসাবে, গত বছর করোনার শুরুতে যে দাম বাজারে ছিল তার চেয়ে এখন সব ধরনের পণ্যে ২০ থেকে ৪৫ শতাংশ বেশি। গেল দুই সপ্তাহে বাজারে বেড়েছে পেঁয়াজ, মসুর ডাল, ব্রয়লার মুরগি, ডিম ও সবজির দাম। পেঁয়াজের দাম মোটামুটি দ্বিগুণ হয়ে গেছে। বেড়েছে নিত্যব্যবহার্য বিভিন্ন পণ্যের দামও। ডিটারজেন্ট, টুথপেস্ট, নারকেল তেল, শৌচাগারে ব্যবহার করা টিস্যুসহ সব পণ্যের দামই আগের তুলনায় ঊর্ধ্বমুখী।

রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, বাজারে প্রায় সব ধরনের সবজির দামই বেড়ে গেছে। তেলের দাম বাড়ানোর ঘোষণা দেয়ার আগে যে বেগুন ৫০-৬০ টাকা কেজিতে বিক্রি হয়েছে, সেই বেগুন এখন ৭০-৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া যে সাইজের ফুলকপি দুইদিন আগে ৩০ থেকে ৪০ টাকায় বিক্রি হয়েছে, সেগুলো এখন ৪০ থেকে ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কোথাও কোথাও আবার ৫৫-৬০ টাকাও চাওয়া হচ্ছে। দুইদিন আগে বাজারগুলোতে শিম বিক্রি হয়েছে ১২০-১৩০ টাকায়, একই মানের শিম গতকাল বিক্রি হয়েছে ১৩০ থেকে ১৪০ টাকায়। কাঁচামরিচ বিক্রি হচ্ছে বাড়তি দামে। বেড়েছে পেঁয়াজের দামও। দুইদিন আগে খুচরা বাজারে দেশি পিয়াজ কেজিতে ৫০-৫৫ টাকায় পাওয়া গেছে। তবে গতকাল একই মানের পেঁয়াজ বিক্রেতাদের ৬০-৬৫ টাকা দাম চাইতে দেখা যায়। এ ছাড়া গতকাল খুচরা বাজারগুলোতে ঢেঁড়স কেজিতে ৫০ থেকে ৬০ টাকা, টমেটো ১২০ থেকে ১৩০ টাকা, গাজর ১২০ থেকে ১৬০ টাকা, বরবটি ৫০ থেকে ৬০ টাকা, পটল ৪০ থেকে ৫০ টাকা, মূলা, চিচিঙ্গা ও ঝিঙে ৪০ থেকে ৫০ টাকা, করলা ৬০ থেকে ৭০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে। এসব সবজির মধ্যে বেশির ভাগ সবজিই একদিন আগে মান ও প্রকারভেদে কেজিতে প্রায় ৫ থেকে ১০, ১৫ টাকা কমে পাওয়া গেছে।

কচুক্ষেত এলাকার বাসিন্দা হারুনুর রশিদ বলেন, সবজি কিনতেই পারিনি। হঠাৎ এতো দাম যে বাড়বে সেটা কল্পনাও করতে পারিনি। শুধু সবজি নয়, বাজারে তো এখন কোনো কিছুই আর সস্তা নাই। দিন দিন শুধু দাম বাড়ছে তো বাড়ছেই। এসব দেখার কেউ নাই।

বিভিন্ন এলাকার ব্যবসায়ীরা জানান, পাইকারিতে দাম বাড়ালে তাদের করার কিছু থাকে না। আমরা তো আর লস দিয়ে বিক্রি করতে পারবো না। পাইকারি বাজার নিয়ন্ত্রণ করার কথাও বলেন তারা।
মরিচের কেজি ১৬০ টাকা থেকে ২০০ টাকা হয়েছে। ৪৫ থেকে ৫০ টাকা বিক্রি হওয়া পেঁয়াজের কেজি এখন ৫০-৫৫ টাকা। রসুনও আগের মতো ৭০ থেকে ১১০ ও আদা ১০০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে।

কম সরবরাহের অজুহাতে মাছের দামও চড়া ছিল। বর্তমানে তেলের তাপ যোগ হওয়ায় কেজিতে ২০ থেকে ৫০ টাকা বেড়েছে। কয়েকদিনের ব্যবধানে সব মাছের দাম বেড়েছে। ইলিশ মাছের কেজিতে ২০০ টাকা বেড়েছে। এজন্য ৯০০ টাকার মাছ ১ হাজার ১০০ টাকা, ১ হাজার ৫০০ টাকার মাছ ১ হাজার ৭০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করা হচ্ছে। অন্যান্য মাছের দামও কেজিতে ২০ থেকে ৫০ টাকার বেশি বেড়েছে।

মাছের ক্রেতা আবুল হোসেন বলেন, এত দাম বাড়বে ভাবতে অবাক লাগছে। ৪০০ টাকার কাচকি মাছ ৫০০ টাকার কম দিচ্ছে না। অন্যান্য মাছের দামও বেশি। অন্যান্য বাজারে দাম বেড়েছে বলে বিক্রেতারা জানান। দাম বেড়ে রুই ও কাতল ২৩০ থেকে ৪৫০ টাকা কেজি, নদীর চিংড়ি ১ হাজার ৪০০ টাকা, বেলে ১ হাজার টাকা, আইড় ১ হাজার টাকা, পুঁটি ৮০০ কেজি, বোয়াল ৫০০, পাবদা ৬৫০, কাচকি ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা কেজি বিক্রি করা হচ্ছে। কমছে না দাম।

সরকার দাম কমানোর জন্য চালে শুল্ক কমালেও জ্বালানির তাপে বাজারে কেজিতে এক থেকে দেড় টাকা বেড়ে গেছে। মিনিকেট চাল ৬৮ থেকে ৭০ টাকা কেজি, বাসমতি ৮০ থেকে ৮২ টাকা, আটাশ চাল ৫২ থেকে ৫৪, চিনিগুড়া ১০০ থেকে ১১০ টাকা কেজি বিক্রি করা হচ্ছে। তবে প্রায় দোকানেই মোটা চাল পাওয়া যায় না। কোনো কোনো দোকানে পাওয়া গেলেও ৪৫ থেকে ৪৮ টাকা কেজি বিক্রি করা হচ্ছে।

সম্প্রতি সয়াবিন তেলের দাম কমিয়ে ১৮৫ টাকা লিটার করা হলেও জ্বালানির দাম বৃদ্ধির অজুহাতে বাড়ানোর পাঁয়তারা চলছে। এজন্য মিল থেকে বাজারে সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে। তাই রুপচাঁদা, তীর ও খোলা তেল বাজারে সরবরাহ নেই।

ঈদের পর কিছুটা কমলেও জ্বালানির প্রভাবে মুরগির দাম কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা বেড়ে গেছে। পাকিস্তানি মুরগির কেজি ২৭০ থেকে ২৮০ টাকা কেজি, দেশি মুরগি ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকা ও ব্রয়লার ১৬৫ টাকা কেজি বিক্রি করা হচ্ছে। ডিম আগে ১২০ টাকা ডজন বিক্রি করা হলে বর্তমানে ১৩০ টাকা বিক্রি করা হচ্ছে।
খাসির গোশতের কেজি ১ হাজার টাকায় উঠার পর আর নামেনি। আগের মতোই হাজার টাকা ও গরুর গোশত ৬৫০ টাকা কেজি বিক্রি করছেন বিক্রেতারা।

অভিযান চলমান আছে উল্লেখ করে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষন অধিদফতরের মহাপরিচালক এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে সবকিছুর দাম নির্ভর করে। তবে কেউ অতিরিক্ত দামে পণ্য বিক্রি করলে আমরা ব্যবস্থা নেবো।

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার আগে ও পরে নিত্যপণ্যের মূল্য
পণ্যের নাম পরিমান বর্তমান মূল্য আগের মূল্য
চাল (মিনিকেট) কেজি ৬৮-৭০ ৬৬-৬৮
চাল (আটাশ) কেজি ৫২-৫৪ ৫০-৫২
এ্যাংকর ডাল কেজি ৭০-৭৫ ৬৫-৭০
ব্রয়লার মুরগি কেজি ১৭৫-১৮০ ১৬৫-১৭০
শুকনা মরিচ কেজি ৪৫০-৫০০ ৪০০-৪৪০
বেগুন কেজি ৭০-৮০ ৫০-৬০
শিম কেজি ১৩০-১৪০ ১২০-১৩০
ফুলকপি কেজি ৪৫-৫০ ৩০-৪০
ইলিশ মাছ কেজি ১১০০ ৯০০
পেঁয়াজ কেজি ৫০-৫৫ ৪৫-৫০

Print Friendly, PDF & Email

     এ ক্যাটাগরীর আরো খবর