,

3

মুফতি হান্নানের বাড্ডার অফিসে পরিকল্পনা

হাওর বার্তা ডেস্কঃ রাজধানীর বাড্ডায় মুফতি হান্নানের অফিসে ২০০৪ সালের ২০ আগস্ট রাতে গ্রেনেড হামলার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়।

সেখানে হান্নান হামলার চূড়ান্ত দিকনির্দেশনা দেয়। র‌্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে এ ঘটনায় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত ইকবাল হোসেন জাহাঙ্গীর ওরফে সেলিম এ তথ্য জানায়।

ভয়াবহ ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ১৬ বছর পর ২৩ ফেব্রুয়ারি গ্রেফতার হয়েছে ইকবাল। সে এখন কারাগারে আছে। আর সিলেটে ২০০৪ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর ওপর গ্রেনেড হামলার ঘটনায় ২০১৭ সালের এপ্রিলে মুফতি হান্নান ও তার দুই সহযোগীর ফাঁসির রায় কার্যকর করা হয়।

কারাগারে পাঠানোর আগে ইকবাল র‌্যাবকে আরও জানায়, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট দুটি গ্রেনেড নিক্ষেপের দায়িত্ব ছিল ইকবাল হোসেন জাহাঙ্গীর ওরফে সেলিমের ওপর। কিন্তু একটি গ্রেনেড নিক্ষেপের পর ভয় পেয়ে যায় ইকবাল। এ কারণে দ্বিতীয় গ্রেনেডটি নিক্ষেপ না করেই সে বাসায় চলে আসে। পরে তার বাসা থেকে লোক পাঠিয়ে তৎকালীন হরকাতুল জিহাদ নেতা মুফতি হান্নান ওই গ্রেনেডটি সংগ্রহ করে নেয়।

জিজ্ঞাসাবাদে ইকবাল জানিয়েছে, ১৯৯৫ সালে সে ব্যাংকক যায়। সেখান থেকে যায় মালয়েশিয়ায়। ১৯৯৮ সালে মালয়েশিয়া থেকে দেশে ফিরে একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার (এনজিও) সঙ্গে যুক্ত হয়। পাশাপাশি গ্রামের বাড়ি ঝিনাইদহে আইএসডি ফোনের ব্যবসা শুরু করে। তার ফোনের দোকান থেকে সর্বহারা পার্টির লোকজন ফোন করত। অনেক সময় ফোন করার পর টাকা না দিয়েই তারা চলে যেত। এ নিয়ে সর্বহারা পার্টির লোকদের সঙ্গে তার ঝামেলা তৈরি হয়। একই সঙ্গে বিএনপি নেতাকর্মীদের সঙ্গে তার দূরত্ব তৈরি হয়। এরপর সে জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদে (হুজি) যোগ দেয়।

ইকবালের দেয়া তথ্যের বরাত দিয়ে র‌্যাবের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০০৩ সালে মুফতি হান্নানের সঙ্গে ইকবালের দেখা হয় ঝিনাইদহে। সেখানে তারা একটি বৈঠক করে। বৈঠকে বুলবুল, মাসুদসহ অনেকেই উপস্থিত ছিল। এ বৈঠকে উপস্থিত ইকবালসহ অন্যদের বড় অপারেশনের (হামলা) জন্য প্রস্তুতি নিতে বলে। প্রস্তুতির অংশ হিসাবে ইকবালসহ অন্যরা ১০ দিন মেয়াদি একটি প্রশিক্ষণে অংশ নেয়। ২০০৩ সালের শেষের দিকে মালয়েশিয়ায় লোক পাঠানোর নামে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে ১৮ লাখ টাকা নেয় ইকবাল। ওই সময় মালয়েশিয়া সরকার জনশক্তি আমদানি বন্ধ করে দিলে ওই প্রক্রিয়ার সে এগোতে পারেনি। তাই যারা টাকা দিয়েছেন তারা টাকার জন্য ইকবালের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে থাকেন। এ চাপের কারণে সে ২০০৪ সালে ঢাকায় পালিয়ে আসে। ঢাকায় এসে মনিপুরীপাড়া এলাকায় মুফতি হান্নানের ভাই আনিসের সঙ্গে একটি মেসে উঠে। এখানে অবস্থান করেই জঙ্গি তৎপরতা চালাতে থাকে।

র‌্যাব জানায়, বাড্ডায় মুফতি হান্নানের অফিসটি ছিল ভাড়া করা। এ বাড়িটির মালিকের নাম আহসানউল্লাহ কাজল। সে হরকাতুল জিহাদের ঢাকা মহানগরের তৎকালীন সাংগঠনিক সম্পাদক ছিল। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার আগের দিন সেখানে অনুষ্ঠিত বৈঠকে উপস্থিত সদস্যদের উদ্দেশে মুফতি হান্নান বলেছিল, ‘শেখ হাসিনা একজন তাগুদ (ইসলাম বিদ্বেষী)।

তাকে হত্যা করতে হবে। আগামীকাল বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগের সভা আছে। ওই সভায় গ্রেনেড হামলা করে শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের শেষ করে দিতে হবে।’ সভায় উপস্থিত অনেকের তখন গ্রেনেড সম্পর্কে কোনো ধারণা ছিল না। এ বিষয়ে ধারণা চাইলে মুফতি হান্নান তার ব্যাগ থেকে গ্রেনেড বের করে দেখায়। পিন খুলে কিভাবে গ্রেনেড ছুড়তে হবে তাও শিখিয়ে দেয়। সভা শেষে ইকবালের কাছে দুটি গ্রেনেড দেয়। সভার মঞ্চ লক্ষ্য করে গ্রেনেড হামলার দায়িত্ব দেয়া হয় তাকে।

র‌্যাব গোয়েন্দা শাখার প্রধান লে. কর্নেল খাইরুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, একটি ব্যাগে গ্রেনেড নিয়ে ২১ আগস্ট দুপুর ২টায় বায়তুল মোকাররম এলাকায় যায়। পরে আস্তে আস্তে বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে অবস্থিত আওয়ামী লীগ দলীয় কার্যালয়ের সামনের সমাবেশস্থলে যায়। নির্ধারিত সময়ে মাসুদ নামের এক জঙ্গি গ্রেনেডের পিন খুলে তা নিক্ষেপের জন্য ইশারা দেয়।

সে অনুযায়ী সে একটি গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। গ্রেনেডটি বিস্ফোরণের পর তাৎক্ষণিক পরিস্থিতি দেখে সে মারাত্মক ভয় পেয়ে যায়। এ কারণে তার কাছে থাকা অন্য গ্রেনেডটি নিক্ষেপ না করেই ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। পরে বাসায় এসে মুফতি হান্নানকে বিষয়টি জানায় ইকবাল। এরপর মুফতি হান্নান লোক পাঠিয়ে তার বাসা থেকে গ্রেনেডটি সংগ্রহ করে নেয়। মুফতি হান্নানের পরামর্শে আত্মগোপনে চলে যায় ইকবাল।

র‌্যাব সূত্র জানায়, ইকবাল আত্মগোপনে থাকাকালীন নিরাপত্তাকর্মী, শ্রমিক, রিকশা মেকানিকের ছদ্মবেশ ধারণ করে। তাকে ধরতে র‌্যাব বিভিন্ন সময় অভিযানও চালায়। ২০০৮ সালে ইকবালকে গ্রেফতারের জন্য ঝিনাইদহে তার নিজ বাড়িতে, গাজীপুর, সাভারসহ বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালানো হয়। অব্যাহত অভিযান ও গোয়েন্দা সংস্থার তৎপরতার মধ্যে ২০০৮ সালে দেশ ত্যাগ করে সে অবৈধভাবে মালয়েশিয়ায় চলে যায়। ২০০৮ সালে ম্যানুয়াল পাসপোর্ট ছিল। সে সময় ইকবাল নিজের নাম-ঠিকানা পরিবর্তন করে দেশ ত্যাগ করে। পলাতক থাকা অবস্থাতেই তার যাবজ্জীবন দণ্ড হয়। মালয়েশিয়ায় গিয়ে ইকবাল প্রথমে নিজের নাম পরিবর্তন করে ‘সেলিম’ রাখে। পরে জাহাঙ্গীর নাম ধারণ করে সে। একজন রাজনৈতিক নেতার সহযোগিতায় কুমিল্লার ঠিকানায় সেলিম নামে পাসপোর্ট করে সে। অবৈধ অভিবাসী হিসাবে চিহ্নিত হওয়ায় ২০২০ সালের শেষের দিকে তাকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়। দেশে ফিরে সে সমমনাদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করার কাজ করছিল।

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের জনসভায় গ্রেনেড হামলার ঘটনা ঘটে। এতে ২৪ জন নিহত হন। তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ প্রায় ৩০০ লোক আহত হন। নিহতদের মধ্যে আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নারী নেত্রী ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের স্ত্রী আইভি রহমান অন্যতম। এ হামলার ঘটনাটিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার অনেক চেষ্টা হয়।

ওয়ান-ইলেভেন সরকারের সময় (২০০৭-০৯ সাল) এর জট খোলে। ২০১৮ সালের ১০ অক্টোবর এ হামলা মামলার রায় হয়। ওই রায়ে সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুসহ ১৯ জনের মৃত্যুদণ্ড হয়।

তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ছেলে এবং বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ ১৯ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। যাজ্জীবন সাজাপ্রাপ্তদের মধ্যে ইকবালও রয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড হয় আরও ১১ আসামির। দণ্ডিত ৩৩ আসামি কারাগারে থাকলেও পলাতক ছিল ১৬ জন। ইকবাল গ্রেফতার হওয়ায় পর এখনও ১৫ জন পলাতক আছে।

Print Friendly, PDF & Email

     এ ক্যাটাগরীর আরো খবর