ঢাকা ১০:১০ অপরাহ্ন, শনিবার, ২০ জুন ২০২৬, ৬ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
বাংলাদেশ কোথায় যাবে, তা অন্য রাষ্ট্র নির্ধারণ করবে না: পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বিশ্ববিদ্যালয় ফটোগ্রাফি প্রতিযোগিতায় শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতায় ভিভো হরমুজ প্রণালি বন্ধে ইরানের ঘোষণার পর সতর্ক মার্কিন বাহিনী হাওরের কৃষকদের সাড়ে ৭ হাজার টাকা সহায়তা দেবে সরকার হাওরে দুর্যোগ : কী হবে বিচার চাহিয়া বন্ধু আর আব্বুকে নিয়ে ব্রাজিলের খেলা দেখতেই বাংলাদেশ থেকে আমেরিকায় এসেছি ৪৫ দিন কলা খেলে কী ঘটে শরীরে হেলথ কার্ড, বিশেষায়িত হাসপাতালসহ স্বাস্থ্যখাতে একগুচ্ছ পরিকল্পনা বিনিয়োগ পরিবেশের অভাবে অর্থপাচার রোহিঙ্গা সংকটের একমাত্র সমাধান দ্রুত প্রত্যাবাসন: জাতিসংঘে বাংলাদেশ

ইসলামে রাজনীতি ও রাষ্ট্র ব্যবস্থা

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ০৫:৩৬:২৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ৫ ফেব্রুয়ারী ২০১৮
  • ৪৩০ বার

হাওর বার্তা ডেস্কঃ রাজনীতি, রাষ্ট্র পরিচালনা এবং দেশ শাসন নবুয়তি ধারাবাহিকতারই অংশ। হজরত দাউদ (আ.) ও সোলায়মান (আ.) এর রাজত্বের কথা তো কোরআন মজিদে সবিস্তারে উল্লেখ আছে। নবীজির আগমনের মাধ্যমে নবুয়তের ধারা শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত এ ধারাবাহিকতা অব্যাহত ছিল। শেষ নবীর পর আর কোনো নবী আসবে না। তবে এই রাজনীতির ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে তার খলিফাদের মাধ্যমে।
হাদিসে সে বিষয়টিও নিশ্চিত করা হয়েছে

আধুনিক ইসলামি রাষ্ট্রের আদি উৎস হচ্ছে খেলাফত, যা নবুয়তি ধারাপ্রস্রবণ থেকে উদ্ভূত হয়েছে। বর্তমানে ধর্মকে বিরাষ্ট্রীকরণ বা ধর্মের রাজনীতির সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার করা হচ্ছে। এটা অন্যান্য ধর্মের ক্ষেত্রে সঠিক হলেও হতে পারে; কিন্তু ইসলামের নিজস্ব নীতি-আদর্শ ও দর্শন অনুযায়ী ধর্মের এ বিরাষ্ট্রীকরণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ নবুয়ত ও সিয়াসত বা রাজনীতি দুটোর মধ্যে অঙ্গাঙ্গি সম্বন্ধ, পরস্পরে ওতপ্রোতভাবে জড়িত, দুটোর মাঝে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। মহানবী মুহাম্মদুর রাসুলুল্লাহ (সা.) এর পূর্ববর্তী সব নবী রাজনীতি করেছেন। খেলাফত তার ধারাপ্রস্রবণ থেকে উদ্ভূত হয়েছে। সে খেলাফতই হচ্ছে আধুনিক ইসলামি রাষ্ট্রের আদি উৎস। হাদিস শরিফে পরিষ্কার এসেছে।

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) এরশাদ করেন, ‘বনি ইসরাইলের নবীরা তাদের উম্মতকে শাসন করতেন। যখন কোনো একজন নবী ইন্তেকাল করতেন, তখন অন্য একজন নবী তার স্থলাভিষিক্ত হতেন। আর আমার পরে কোনো নবী হবেন না। তবে অনেক খলিফা হবেন।’ সাহাবারা আরজ করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! আপনি আমাদের কী নির্দেশ করছেন? তিনি বললেন, ‘তোমরা একের পর এক করে তাদের বায়াতের হক আদায় করবে। তোমাদের ওপর তাদের যে হক রয়েছে তা তোমরা আদায় করবে। অবশ্য তারা তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্বের বিষয়ে আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করবেন।’
(বোখারি : ৩৪৫৫)।

এখানে ‘তাসুসুহুমুল আম্বিয়া, কুল্লামা হালাকা নাবিয়্যুন খালাফাহু নাবিয়্যুন’ (নবীরা তাদের উম্মতকে শাসন করতেন। যখন কোনো একজন নবী ইন্তেকাল করতেন, তখন অন্য একজন নবী তার স্থলাভিষিক্ত হতেন) বয়ানটুকু গুরুত্বপূর্ণ। নবীরা উম্মতকে শাসন করতেন, একাদিক্রমে প্রত্যেক নবীই তাদের উম্মতকে শাসন করেছেন। অর্থাৎ রাজনীতি, রাষ্ট্র পরিচালনা এবং দেশ শাসন নবুয়তি ধারাবাহিকতারই অংশ। হজরত দাউদ (আ.) ও সোলায়মান (আ.) এর রাজত্বের কথা তো কোরআন মজিদে সবিস্তারে উল্লেখ আছে। নবীজির আগমনের মাধ্যমে নবুয়তের ধারা শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত এ ধারাবাহিকতা অব্যাহত ছিল। শেষ নবীর পর আর কোনো নবী আসবে না।

তবে এই রাজনীতির ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে তার খলিফাদের মাধ্যমে। হাদিসে সে বিষয়টিও নিশ্চিত করা হয়েছে। বলা হয়েছে, ‘ওয়া ইন্নাহু লা নাবিয়্যা বা’দি, ওয়া সায়াকুনা খুলাফা ফায়াক্সুরুনা’ (আর আমার পরে কোনো নবী হবেন না। তবে অনেক খলিফা হবেন)। খলিফার কাছে আনুগত্যের বায়াত করা মানুষের কর্তব্য। উপর্যুক্ত হাদিসে সে নির্দেশও স্পষ্টভাবে দেওয়া হয়েছে। অতএব ইসলামে রাজনীতি নেই বা ইসলাম ও রাজনীতি পৃথক এ কথার কোনো যৌক্তিকতা নেই।

মহানবী (সা.) এর ওফাতের পর নবুয়তের ধারাবাহিকতায় খেলাফতে রাশেদা (৬৩২-৬৬১ খ্রি.) ৩০ বছর, খেলাফতে উমাইয়া (৬৬১-৭৫০ খ্রি.) ৮৯ বছর, খেলাফতে আব্বাসিয়া (৭৫০-১২৫৮ খ্রি.) ৫০৮ বছর ও খেলাফতে উসমানিয়া (১২৯৯-১৯২৪ খ্রি.) ৬২৫ বছর মিলিয়ে সুদীর্ঘ ১ হাজার ৫২ বছর স্থায়ী ছিল। সাড়ে এক সহস্র বছরের সুদীর্ঘ খেলাফত-ইতিহাসের সর্বশেষ নিদর্শন ছিল তুরস্কের খেলাফতে উসমানি। ৩ মার্চ ১৯২৪ খ্রিষ্টাব্দে নব্য তুর্কি জাতীয়তাবাদী নেতা মোস্তাফা কামাল পাশার নেতৃত্বে তুরস্কের ন্যাশন্যাল অ্যাসেম্বলির পঞ্চম বার্ষিক অধিবেশনে গৃহীত একই আইনের মাধ্যমে খেলাফতের বিলুপ্তি ঘোষণা করা হয়।

পরদিন প্রত্যুষের আগেই একদল পুলিশ ও সামরিক কর্মচারী খলিফা দ্বিতীয় আবদুল মজিদের প্রাসাদে হানা দিয়ে তাকে সপরিবারে গাড়িতে পুরে এক থলে কাপড় ও পাথেয়স্বরূপ কয়েকটি টাকা খয়রাত দিয়ে সুইজারল্যান্ডের দিকে হাঁকিয়ে দেয়। এভাবে ৩ মার্চ ইসলামের ইতিহাসে এক কুখ্যাত ও ভয়াবহ দিন হয়ে রইল। (আবদুল কাদের, তুরস্কের ইতিহাস, পৃ. ২৪৭-২৪৮)।

১৯২৪ সালে খেলাফত-ব্যবস্থার অবলুপ্তির পর মুসলিম ঐক্য প্রকাশের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় এক বিশাল শূন্যতার সৃষ্টি হয়। মুসলিম ঐক্যের প্রতীক সর্ববৃহৎ এ প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানের বিলোপের পর নির্বাসিত খলিফা সুলতান আবদুল মজিদ সুইজারল্যান্ডে এক সংবাদ সম্মেলন আহ্বান করেন এবং খেলাফত অবলুপ্তিসংক্রান্ত তুরস্কের সংসদীয় অধ্যাদেশকে প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনের মাধ্যমে খেলাফত অবলুপ্তির কারণে মুসলিম বিশ্বের ঐক্য ও সংহতির ক্ষেত্রে যে অস্থির পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে সে বিষয়ে আলোচনার জন্য বিভিন্ন মুসলিম সম্প্রদায়ের নেতৃত্বের প্রতি জোর আহ্বান জানান এবং খেলাফত পুনঃস্থাপনের জন্য একটি লিখিত প্রস্তাবনা পেশ করেন।

ফলে ১৯২৬ খ্রিষ্টাব্দের মে মাসে কায়রোতে ইসলামি শিক্ষার সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন আলেম ও বিদ্বান ব্যক্তির উদ্যোগে খেলাফত সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনে খেলাফতকে ‘ইসলামের জন্য অত্যাবশ্যকীয়’ ঘোষণা করা হয়। সৌদি বাদশাহ আবদুল আজিজ ইবনে সউদের আমন্ত্রণে ১৯২৬ সালের জুন মাসে আরও একটি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় পবিত্র মক্কা নগরীতে। এ সম্মেলনে আলোচিত বিষয়ের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল একটি স্থায়ী সংগঠন স্থাপনের মাধ্যমে এ উদ্যোগকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ প্রদান।

সম্মেলন ‘ইসলামি বিশ্বের কংগ্রেস’ নামে একটি সংগঠন স্থাপনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, যা প্রতি বছর পবিত্র মক্কায় এক সভায় মিলিত হবে। কায়রো ও মক্কা সম্মেলনের পর নবতুরস্কের প্রতিষ্ঠাতা মোস্তাফা কামাল যিনি খেলাফত ব্যবস্থাকে বিলুপ্ত করেন। এ ব্যবস্থা অবলুপ্তির ফলে সৃষ্ট শূন্যতা পূরণে উত্থাপিত বিভিন্ন প্রস্তাবনার প্রতি অনুকূল মনোভাব ব্যক্ত করেন। তিনি ১৯২৭ সালের অক্টোবর মাসে নিজস্ব রাজনৈতিক চিন্তাধারার সমর্থনে ছয় দিনব্যাপী আয়োজিত যে বিস্তৃত বক্তৃতা প্রদান করেন। সেখানে তিনি বলেন

‘ভবিষ্যতে ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকার মুসলিম সম্প্রদায়গুলো যখন স্বাধীনতা অর্জন করবে তখন তাদের দেশের প্রতিনিধিরা একটি সম্মেলনে মিলিত হয়ে একটি উচ্চ পর্ষদ গঠন করবে। …যে একটি ‘প্যান-ইসলামি’ যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থার গোড়াপত্তন হবে তাকে ‘খেলাফত’ নাম দেওয়া যেতে পারে এবং যে ব্যক্তি উচ্চ পর্ষদের সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হবেন তাকে ‘খলিফা’ উপাধি দেওয়া যেতে পারে। (তবে) সমগ্র বিশ্বের সমস্যা মোকাবিলা ও সমাধানের দায়িত্ব কোনো এক ব্যক্তি বা এক রাষ্ট্রের ওপর ছেড়ে দেওয়া কোনোভাবেই যৌক্তিক বা সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত হতে পারে না।’ (একমেলেদ্দিন ইহসানোগলু (অনুবাদ : মো. আমানুল হক), নব্য শতকে মুসলিম বিশ্ব : ইসলামি সম্মেলন সংস্থা
(১৯৬৯২০০৯), পৃ. ১৭)।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

বাংলাদেশ কোথায় যাবে, তা অন্য রাষ্ট্র নির্ধারণ করবে না: পররাষ্ট্র উপদেষ্টা

ইসলামে রাজনীতি ও রাষ্ট্র ব্যবস্থা

আপডেট টাইম : ০৫:৩৬:২৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ৫ ফেব্রুয়ারী ২০১৮

হাওর বার্তা ডেস্কঃ রাজনীতি, রাষ্ট্র পরিচালনা এবং দেশ শাসন নবুয়তি ধারাবাহিকতারই অংশ। হজরত দাউদ (আ.) ও সোলায়মান (আ.) এর রাজত্বের কথা তো কোরআন মজিদে সবিস্তারে উল্লেখ আছে। নবীজির আগমনের মাধ্যমে নবুয়তের ধারা শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত এ ধারাবাহিকতা অব্যাহত ছিল। শেষ নবীর পর আর কোনো নবী আসবে না। তবে এই রাজনীতির ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে তার খলিফাদের মাধ্যমে।
হাদিসে সে বিষয়টিও নিশ্চিত করা হয়েছে

আধুনিক ইসলামি রাষ্ট্রের আদি উৎস হচ্ছে খেলাফত, যা নবুয়তি ধারাপ্রস্রবণ থেকে উদ্ভূত হয়েছে। বর্তমানে ধর্মকে বিরাষ্ট্রীকরণ বা ধর্মের রাজনীতির সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার করা হচ্ছে। এটা অন্যান্য ধর্মের ক্ষেত্রে সঠিক হলেও হতে পারে; কিন্তু ইসলামের নিজস্ব নীতি-আদর্শ ও দর্শন অনুযায়ী ধর্মের এ বিরাষ্ট্রীকরণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ নবুয়ত ও সিয়াসত বা রাজনীতি দুটোর মধ্যে অঙ্গাঙ্গি সম্বন্ধ, পরস্পরে ওতপ্রোতভাবে জড়িত, দুটোর মাঝে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। মহানবী মুহাম্মদুর রাসুলুল্লাহ (সা.) এর পূর্ববর্তী সব নবী রাজনীতি করেছেন। খেলাফত তার ধারাপ্রস্রবণ থেকে উদ্ভূত হয়েছে। সে খেলাফতই হচ্ছে আধুনিক ইসলামি রাষ্ট্রের আদি উৎস। হাদিস শরিফে পরিষ্কার এসেছে।

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) এরশাদ করেন, ‘বনি ইসরাইলের নবীরা তাদের উম্মতকে শাসন করতেন। যখন কোনো একজন নবী ইন্তেকাল করতেন, তখন অন্য একজন নবী তার স্থলাভিষিক্ত হতেন। আর আমার পরে কোনো নবী হবেন না। তবে অনেক খলিফা হবেন।’ সাহাবারা আরজ করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! আপনি আমাদের কী নির্দেশ করছেন? তিনি বললেন, ‘তোমরা একের পর এক করে তাদের বায়াতের হক আদায় করবে। তোমাদের ওপর তাদের যে হক রয়েছে তা তোমরা আদায় করবে। অবশ্য তারা তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্বের বিষয়ে আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করবেন।’
(বোখারি : ৩৪৫৫)।

এখানে ‘তাসুসুহুমুল আম্বিয়া, কুল্লামা হালাকা নাবিয়্যুন খালাফাহু নাবিয়্যুন’ (নবীরা তাদের উম্মতকে শাসন করতেন। যখন কোনো একজন নবী ইন্তেকাল করতেন, তখন অন্য একজন নবী তার স্থলাভিষিক্ত হতেন) বয়ানটুকু গুরুত্বপূর্ণ। নবীরা উম্মতকে শাসন করতেন, একাদিক্রমে প্রত্যেক নবীই তাদের উম্মতকে শাসন করেছেন। অর্থাৎ রাজনীতি, রাষ্ট্র পরিচালনা এবং দেশ শাসন নবুয়তি ধারাবাহিকতারই অংশ। হজরত দাউদ (আ.) ও সোলায়মান (আ.) এর রাজত্বের কথা তো কোরআন মজিদে সবিস্তারে উল্লেখ আছে। নবীজির আগমনের মাধ্যমে নবুয়তের ধারা শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত এ ধারাবাহিকতা অব্যাহত ছিল। শেষ নবীর পর আর কোনো নবী আসবে না।

তবে এই রাজনীতির ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে তার খলিফাদের মাধ্যমে। হাদিসে সে বিষয়টিও নিশ্চিত করা হয়েছে। বলা হয়েছে, ‘ওয়া ইন্নাহু লা নাবিয়্যা বা’দি, ওয়া সায়াকুনা খুলাফা ফায়াক্সুরুনা’ (আর আমার পরে কোনো নবী হবেন না। তবে অনেক খলিফা হবেন)। খলিফার কাছে আনুগত্যের বায়াত করা মানুষের কর্তব্য। উপর্যুক্ত হাদিসে সে নির্দেশও স্পষ্টভাবে দেওয়া হয়েছে। অতএব ইসলামে রাজনীতি নেই বা ইসলাম ও রাজনীতি পৃথক এ কথার কোনো যৌক্তিকতা নেই।

মহানবী (সা.) এর ওফাতের পর নবুয়তের ধারাবাহিকতায় খেলাফতে রাশেদা (৬৩২-৬৬১ খ্রি.) ৩০ বছর, খেলাফতে উমাইয়া (৬৬১-৭৫০ খ্রি.) ৮৯ বছর, খেলাফতে আব্বাসিয়া (৭৫০-১২৫৮ খ্রি.) ৫০৮ বছর ও খেলাফতে উসমানিয়া (১২৯৯-১৯২৪ খ্রি.) ৬২৫ বছর মিলিয়ে সুদীর্ঘ ১ হাজার ৫২ বছর স্থায়ী ছিল। সাড়ে এক সহস্র বছরের সুদীর্ঘ খেলাফত-ইতিহাসের সর্বশেষ নিদর্শন ছিল তুরস্কের খেলাফতে উসমানি। ৩ মার্চ ১৯২৪ খ্রিষ্টাব্দে নব্য তুর্কি জাতীয়তাবাদী নেতা মোস্তাফা কামাল পাশার নেতৃত্বে তুরস্কের ন্যাশন্যাল অ্যাসেম্বলির পঞ্চম বার্ষিক অধিবেশনে গৃহীত একই আইনের মাধ্যমে খেলাফতের বিলুপ্তি ঘোষণা করা হয়।

পরদিন প্রত্যুষের আগেই একদল পুলিশ ও সামরিক কর্মচারী খলিফা দ্বিতীয় আবদুল মজিদের প্রাসাদে হানা দিয়ে তাকে সপরিবারে গাড়িতে পুরে এক থলে কাপড় ও পাথেয়স্বরূপ কয়েকটি টাকা খয়রাত দিয়ে সুইজারল্যান্ডের দিকে হাঁকিয়ে দেয়। এভাবে ৩ মার্চ ইসলামের ইতিহাসে এক কুখ্যাত ও ভয়াবহ দিন হয়ে রইল। (আবদুল কাদের, তুরস্কের ইতিহাস, পৃ. ২৪৭-২৪৮)।

১৯২৪ সালে খেলাফত-ব্যবস্থার অবলুপ্তির পর মুসলিম ঐক্য প্রকাশের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় এক বিশাল শূন্যতার সৃষ্টি হয়। মুসলিম ঐক্যের প্রতীক সর্ববৃহৎ এ প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানের বিলোপের পর নির্বাসিত খলিফা সুলতান আবদুল মজিদ সুইজারল্যান্ডে এক সংবাদ সম্মেলন আহ্বান করেন এবং খেলাফত অবলুপ্তিসংক্রান্ত তুরস্কের সংসদীয় অধ্যাদেশকে প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনের মাধ্যমে খেলাফত অবলুপ্তির কারণে মুসলিম বিশ্বের ঐক্য ও সংহতির ক্ষেত্রে যে অস্থির পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে সে বিষয়ে আলোচনার জন্য বিভিন্ন মুসলিম সম্প্রদায়ের নেতৃত্বের প্রতি জোর আহ্বান জানান এবং খেলাফত পুনঃস্থাপনের জন্য একটি লিখিত প্রস্তাবনা পেশ করেন।

ফলে ১৯২৬ খ্রিষ্টাব্দের মে মাসে কায়রোতে ইসলামি শিক্ষার সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন আলেম ও বিদ্বান ব্যক্তির উদ্যোগে খেলাফত সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনে খেলাফতকে ‘ইসলামের জন্য অত্যাবশ্যকীয়’ ঘোষণা করা হয়। সৌদি বাদশাহ আবদুল আজিজ ইবনে সউদের আমন্ত্রণে ১৯২৬ সালের জুন মাসে আরও একটি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় পবিত্র মক্কা নগরীতে। এ সম্মেলনে আলোচিত বিষয়ের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল একটি স্থায়ী সংগঠন স্থাপনের মাধ্যমে এ উদ্যোগকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ প্রদান।

সম্মেলন ‘ইসলামি বিশ্বের কংগ্রেস’ নামে একটি সংগঠন স্থাপনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, যা প্রতি বছর পবিত্র মক্কায় এক সভায় মিলিত হবে। কায়রো ও মক্কা সম্মেলনের পর নবতুরস্কের প্রতিষ্ঠাতা মোস্তাফা কামাল যিনি খেলাফত ব্যবস্থাকে বিলুপ্ত করেন। এ ব্যবস্থা অবলুপ্তির ফলে সৃষ্ট শূন্যতা পূরণে উত্থাপিত বিভিন্ন প্রস্তাবনার প্রতি অনুকূল মনোভাব ব্যক্ত করেন। তিনি ১৯২৭ সালের অক্টোবর মাসে নিজস্ব রাজনৈতিক চিন্তাধারার সমর্থনে ছয় দিনব্যাপী আয়োজিত যে বিস্তৃত বক্তৃতা প্রদান করেন। সেখানে তিনি বলেন

‘ভবিষ্যতে ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকার মুসলিম সম্প্রদায়গুলো যখন স্বাধীনতা অর্জন করবে তখন তাদের দেশের প্রতিনিধিরা একটি সম্মেলনে মিলিত হয়ে একটি উচ্চ পর্ষদ গঠন করবে। …যে একটি ‘প্যান-ইসলামি’ যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থার গোড়াপত্তন হবে তাকে ‘খেলাফত’ নাম দেওয়া যেতে পারে এবং যে ব্যক্তি উচ্চ পর্ষদের সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হবেন তাকে ‘খলিফা’ উপাধি দেওয়া যেতে পারে। (তবে) সমগ্র বিশ্বের সমস্যা মোকাবিলা ও সমাধানের দায়িত্ব কোনো এক ব্যক্তি বা এক রাষ্ট্রের ওপর ছেড়ে দেওয়া কোনোভাবেই যৌক্তিক বা সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত হতে পারে না।’ (একমেলেদ্দিন ইহসানোগলু (অনুবাদ : মো. আমানুল হক), নব্য শতকে মুসলিম বিশ্ব : ইসলামি সম্মেলন সংস্থা
(১৯৬৯২০০৯), পৃ. ১৭)।