ঢাকা ০২:০৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ২০ জুন ২০২৬, ৬ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হেলথ কার্ড, বিশেষায়িত হাসপাতালসহ স্বাস্থ্যখাতে একগুচ্ছ পরিকল্পনা

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১২:৩২:৫৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ২০ জুন ২০২৬
  • ১ বার
রেকর্ড পরিমাণ স্বাস্থ্য বাজেট, সর্বজনীন ডিজিটাল হেলথ কার্ড, ব্যাপক জনবল নিয়োগ এবং নতুন বিশেষায়িত হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার মতো একগুচ্ছ উচ্চাভিলাষী সংস্কার বাস্তবায়নের মাধ্যমে এক নতুন যুগে পদার্পণ করতে যাচ্ছে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত। দেশব্যাপী সাশ্রয়ী মূল্যে চিকিৎসা সেবার পরিধি বাড়ানো এবং রোগীদের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে বড় ধরনের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট এবং সাম্প্রতিক বেশ কিছু উদ্যোগের মধ্য দিয়ে সরকারের একটি সমন্বিত কৌশলের প্রতিফলন ঘটেছে। যার উদ্দেশ্য রোগীদের আর্থিক বোঝা কমিয়ে একটি সহজে প্রাপ্য, রোগ প্রতিরোধ-কেন্দ্রিক এবং প্রযুক্তি-নির্ভর স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলা।

এই রূপান্তরের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে স্বাস্থ্য খাতে সরকারের বরাদ্দ প্রায় দ্বিগুণ করার সিদ্ধান্ত। বিদায়ী অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের ৩৫ হাজার ৪৭৭ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে আগামী অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ করা হয়েছে ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা।

এই বরাদ্দ দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১.০১ শতাংশ, যা স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় বাড়ানোর বিষয়ে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতির ক্ষেত্রে একটি বড় পদক্ষেপ।গত ১১ জুন সংসদে বাজেট পেশ করার সময় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী স্বাস্থ্য খাতের বিনিয়োগকে মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং জাতীয় সমৃদ্ধির মূল ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করেন।

সরকার বিশ্বাস করে যে, জনস্বাস্থ্যের উন্নয়নের পাশাপাশি অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতা এবং সমাজকল্যাণ বজায় রাখার জন্য স্বাস্থ্য সেবা জোরদার করা অপরিহার্য। সরকারের স্বাস্থ্য ভাবনার একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো—শুধু চিকিৎসা-কেন্দ্রিক মডেল থেকে সরে এসে রোগ প্রতিরোধ, প্রাথমিক রোগ নির্ণয় এবং কমিউনিটি-ভিত্তিক সেবাকে অগ্রাধিকার দেওয়া।

এ লক্ষ্য অর্জনে দেশের প্রতিটি ইউনিয়ন এবং শহরের প্রতিটি ওয়ার্ডে আধুনিক প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু করেছে সরকার।

প্রতিটি কেন্দ্রকে কমিউনিটি ক্লিনিক এবং প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমে সহায়তা দেওয়া হবে, যারা তৃণমূল পর্যায়ে প্রতিরোধমূলক যত্ন, মা ও শিশু স্বাস্থ্যসেবা, পুষ্টি সহায়তা এবং প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান করবেন।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, এ উদ্যোগের ফলে বড় হাসপাতালগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ কমবে, অবহেলিত অঞ্চলের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তি সহজ হবে এবং সাধারণ মানুষের পকেট থেকে চিকিৎসা বাবদ বাড়তি খরচ কমে আসবে।

স্বাস্থ্য খাতের এই সংস্কার পরিকল্পনার আরেকটি বড় অংশ হলো জনবল বৃদ্ধি। হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানগুলোর দীর্ঘদিনের শূন্যপদ পূরণে সরকার অবিলম্বে ৫ হাজার এমবিবিএস ডাক্তার নিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে।

পাশাপাশি, ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা করা হয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশই হবেন নারী।এই বর্ধিত জনবল মা ও শিশু স্বাস্থ্যসেবা, রোগ প্রতিরোধ কর্মসূচি এবং কমিউনিটি-ভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করবে। এই উদ্যোগকে গতিশীল করতে সরকার ইতোমধ্যে শত শত নতুন নার্সিং ও মিডওয়াইফারি পদ তৈরি করেছে। সরকারের এই স্বাস্থ্য কৌশলের অন্যতম প্রধান অংশ জুড়ে রয়েছে ডিজিটাল রূপান্তরও।

সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা কাঠামোর আওতায় প্রতিটি নাগরিক পর্যায়ক্রমে একটি করে ডিজিটাল হেলথ কার্ড পাবেন, যা একটি সমন্বিত রোগী ব্যবস্থাপনা ও রেফারেল সিস্টেমের সাথে যুক্ত থাকবে। এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীরা দেশের যেকোনো স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র থেকে রোগীদের চিকিৎসার ইতিহাস, রোগনির্ণয়ের রেকর্ড এবং প্রেসক্রিপশন দেখতে পারবেন।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই ব্যবস্থা চিকিৎসার ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে, একই চিকিৎসার পুনরাবৃত্তি কমাতে এবং পুরো স্বাস্থ্যসেবা নেটওয়ার্কে জবাবদিহিতা জোরদার করতে সাহায্য করবে। সরকারের এই সংস্কার পরিকল্পনা শুধু সেবা প্রদানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং চিকিৎসা শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যখাতের মানবসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্র পর্যন্ত বিস্তৃত।

২০৩০ সালের মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং উন্নত ক্লিনিক্যাল প্রশিক্ষণ পদ্ধতির সমন্বয়ে একটি আধুনিক যোগ্যতা-ভিত্তিক (কম্পিটেন্সি-বেসড) এমবিবিএস শিক্ষাক্রম চালু করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, চিকিৎসা শিক্ষাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যখাতের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সক্ষম চিকিৎসক তৈরি করতেই এই সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এছাড়া মেডিকেল ও ডেন্টাল শিক্ষার্থীদের জন্য স্টুডেন্ট লোন ও ব্যাংক লোনের সুবিধা চালুর পরিকল্পনা করছে সরকার। মেধাবী শিক্ষার্থীরা যাতে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যেতে পারেন এবং আর্থিক সীমাবদ্ধতা যেন তাদের একাডেমিক অগ্রযাত্রায় বাধা না হয়, সেজন্য একটি বিশেষ অর্থায়ন কর্মসূচির কথা বিবেচনা করা হচ্ছে।

শিক্ষা সংস্কারের পাশাপাশি দেশের সরকারি মেডিকেল কলেজগুলোর একাডেমিক ভবন, ল্যাবরেটরি, লাইব্রেরি, ডরমিটরি ও প্রশিক্ষণ সুবিধার আধুনিকায়নের ঘোষণা দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

বাজেটে দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার খরচ কমানোর পদক্ষেপও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। হার্টের স্টেন্ট, ডায়ালাইসিস ফিল্টার এবং আরও বেশ কিছু জরুরি চিকিৎসাসামগ্রীর ওপর থেকে ট্যাক্স ও ভ্যাট প্রত্যাহার করায় হাজার হাজার রোগী বড় ধরনের স্বস্তি পাবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

কর্মকর্তারা মনে করছেন, এর ফলে হার্টের স্টেন্টের দাম ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত এবং প্রতি সেশনে ডায়ালাইসিস চিকিৎসার খরচ প্রায় ৮০০ টাকা কমে আসতে পারে।

স্বাস্থ্য বিশ্লেষকরা এই পদক্ষেপগুলোকে পকেট থেকে হওয়া চিকিৎসা ব্যয় (আউট-অফ-পকেট এক্সপেন্ডিচার) কমানোর ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন, যা বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ।

এদিকে সরকারের সাম্প্রতিক উদ্যোগগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে, স্বাস্থ্যসেবার এই সম্প্রসারণ কেবল নীতিগত ঘোষণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে চলেছে। বর্তমানে চলমান সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলোর একটি হলো খুলনা, বরিশাল, রংপুর, রাজশাহী ও কুমিল্লায় ২০০ শয্যাবিশিষ্ট পাঁচটি বিশেষায়িত শিশু হাসপাতাল চালু করা।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, আগামী ছয় মাসের মধ্যে এই হাসপাতালগুলো পুরোদমে চালু হবে বলে আশা করা হচ্ছে। নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ), কেন্দ্রীয় শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং উন্নত রোগনির্ণয়ের সুবিধাসম্পন্ন এই হাসপাতালগুলো রাজধানীর বাইরে শিশু স্বাস্থ্যসেবার মান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত করবে।

আসবাবপত্র ও চিকিৎসাসামগ্রী সংগ্রহের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে এবং নিয়োগ প্রক্রিয়া চলমান থাকায় হাসপাতালগুলো চালুর প্রস্তুতি দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছে।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন সম্প্রতি জানিয়েছেন, এ হাসপাতালগুলোতে রোগীরা তাদের বাড়ির কাছাকাছি বিশেষায়িত চিকিৎসা সেবা পাবেন। ফলে পরিবারগুলোকে শিশু চিকিৎসার জন্য দূর-দূরান্তে ভ্রমণের ভোগান্তি পোহাতে হবে না।

এই শিশু হাসপাতালগুলো চালুর পরিকল্পনা মূলত সরকারের একটি বৃহত্তর প্রচেষ্টারই অংশ, যার লক্ষ্য হলো অব্যবহৃত স্বাস্থ্য অবকাঠামো সচল করা এবং আঞ্চলিক জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায় আরও বেশি বিশেষায়িত সেবা পৌঁছে দেওয়া।

সার্বিকভাবে দেখলে— স্বাস্থ্যখাতে বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি, জনবল বৃদ্ধি, ডিজিটাল স্বাস্থ্য উদ্যোগ, চিকিৎসা শিক্ষা সংস্কার, কর রেয়াত সুবিধা এবং নতুন বিশেষায়িত হাসপাতাল স্থাপন বাংলাদেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্য খাতকে নতুন রূপ দেওয়ার একটি সমন্বিত প্রচেষ্টারই ইঙ্গিত দেয়।

বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া যত সামনে এগোচ্ছে, নীতি-নির্ধারকরা আশা করছেন যে এই উদ্যোগগুলো এমন একটি স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সাহায্য করবে যা আরও বেশি সমতাভিত্তিক, দক্ষ এবং জনগণের চাহিদার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

হেলথ কার্ড, বিশেষায়িত হাসপাতালসহ স্বাস্থ্যখাতে একগুচ্ছ পরিকল্পনা

আপডেট টাইম : ১২:৩২:৫৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ২০ জুন ২০২৬
রেকর্ড পরিমাণ স্বাস্থ্য বাজেট, সর্বজনীন ডিজিটাল হেলথ কার্ড, ব্যাপক জনবল নিয়োগ এবং নতুন বিশেষায়িত হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার মতো একগুচ্ছ উচ্চাভিলাষী সংস্কার বাস্তবায়নের মাধ্যমে এক নতুন যুগে পদার্পণ করতে যাচ্ছে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত। দেশব্যাপী সাশ্রয়ী মূল্যে চিকিৎসা সেবার পরিধি বাড়ানো এবং রোগীদের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে বড় ধরনের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট এবং সাম্প্রতিক বেশ কিছু উদ্যোগের মধ্য দিয়ে সরকারের একটি সমন্বিত কৌশলের প্রতিফলন ঘটেছে। যার উদ্দেশ্য রোগীদের আর্থিক বোঝা কমিয়ে একটি সহজে প্রাপ্য, রোগ প্রতিরোধ-কেন্দ্রিক এবং প্রযুক্তি-নির্ভর স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলা।

এই রূপান্তরের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে স্বাস্থ্য খাতে সরকারের বরাদ্দ প্রায় দ্বিগুণ করার সিদ্ধান্ত। বিদায়ী অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের ৩৫ হাজার ৪৭৭ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে আগামী অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ করা হয়েছে ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা।

এই বরাদ্দ দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১.০১ শতাংশ, যা স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় বাড়ানোর বিষয়ে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতির ক্ষেত্রে একটি বড় পদক্ষেপ।গত ১১ জুন সংসদে বাজেট পেশ করার সময় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী স্বাস্থ্য খাতের বিনিয়োগকে মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং জাতীয় সমৃদ্ধির মূল ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করেন।

সরকার বিশ্বাস করে যে, জনস্বাস্থ্যের উন্নয়নের পাশাপাশি অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতা এবং সমাজকল্যাণ বজায় রাখার জন্য স্বাস্থ্য সেবা জোরদার করা অপরিহার্য। সরকারের স্বাস্থ্য ভাবনার একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো—শুধু চিকিৎসা-কেন্দ্রিক মডেল থেকে সরে এসে রোগ প্রতিরোধ, প্রাথমিক রোগ নির্ণয় এবং কমিউনিটি-ভিত্তিক সেবাকে অগ্রাধিকার দেওয়া।

এ লক্ষ্য অর্জনে দেশের প্রতিটি ইউনিয়ন এবং শহরের প্রতিটি ওয়ার্ডে আধুনিক প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু করেছে সরকার।

প্রতিটি কেন্দ্রকে কমিউনিটি ক্লিনিক এবং প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমে সহায়তা দেওয়া হবে, যারা তৃণমূল পর্যায়ে প্রতিরোধমূলক যত্ন, মা ও শিশু স্বাস্থ্যসেবা, পুষ্টি সহায়তা এবং প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান করবেন।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, এ উদ্যোগের ফলে বড় হাসপাতালগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ কমবে, অবহেলিত অঞ্চলের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তি সহজ হবে এবং সাধারণ মানুষের পকেট থেকে চিকিৎসা বাবদ বাড়তি খরচ কমে আসবে।

স্বাস্থ্য খাতের এই সংস্কার পরিকল্পনার আরেকটি বড় অংশ হলো জনবল বৃদ্ধি। হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানগুলোর দীর্ঘদিনের শূন্যপদ পূরণে সরকার অবিলম্বে ৫ হাজার এমবিবিএস ডাক্তার নিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে।

পাশাপাশি, ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা করা হয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশই হবেন নারী।এই বর্ধিত জনবল মা ও শিশু স্বাস্থ্যসেবা, রোগ প্রতিরোধ কর্মসূচি এবং কমিউনিটি-ভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করবে। এই উদ্যোগকে গতিশীল করতে সরকার ইতোমধ্যে শত শত নতুন নার্সিং ও মিডওয়াইফারি পদ তৈরি করেছে। সরকারের এই স্বাস্থ্য কৌশলের অন্যতম প্রধান অংশ জুড়ে রয়েছে ডিজিটাল রূপান্তরও।

সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা কাঠামোর আওতায় প্রতিটি নাগরিক পর্যায়ক্রমে একটি করে ডিজিটাল হেলথ কার্ড পাবেন, যা একটি সমন্বিত রোগী ব্যবস্থাপনা ও রেফারেল সিস্টেমের সাথে যুক্ত থাকবে। এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীরা দেশের যেকোনো স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র থেকে রোগীদের চিকিৎসার ইতিহাস, রোগনির্ণয়ের রেকর্ড এবং প্রেসক্রিপশন দেখতে পারবেন।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই ব্যবস্থা চিকিৎসার ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে, একই চিকিৎসার পুনরাবৃত্তি কমাতে এবং পুরো স্বাস্থ্যসেবা নেটওয়ার্কে জবাবদিহিতা জোরদার করতে সাহায্য করবে। সরকারের এই সংস্কার পরিকল্পনা শুধু সেবা প্রদানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং চিকিৎসা শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যখাতের মানবসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্র পর্যন্ত বিস্তৃত।

২০৩০ সালের মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং উন্নত ক্লিনিক্যাল প্রশিক্ষণ পদ্ধতির সমন্বয়ে একটি আধুনিক যোগ্যতা-ভিত্তিক (কম্পিটেন্সি-বেসড) এমবিবিএস শিক্ষাক্রম চালু করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, চিকিৎসা শিক্ষাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যখাতের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সক্ষম চিকিৎসক তৈরি করতেই এই সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এছাড়া মেডিকেল ও ডেন্টাল শিক্ষার্থীদের জন্য স্টুডেন্ট লোন ও ব্যাংক লোনের সুবিধা চালুর পরিকল্পনা করছে সরকার। মেধাবী শিক্ষার্থীরা যাতে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যেতে পারেন এবং আর্থিক সীমাবদ্ধতা যেন তাদের একাডেমিক অগ্রযাত্রায় বাধা না হয়, সেজন্য একটি বিশেষ অর্থায়ন কর্মসূচির কথা বিবেচনা করা হচ্ছে।

শিক্ষা সংস্কারের পাশাপাশি দেশের সরকারি মেডিকেল কলেজগুলোর একাডেমিক ভবন, ল্যাবরেটরি, লাইব্রেরি, ডরমিটরি ও প্রশিক্ষণ সুবিধার আধুনিকায়নের ঘোষণা দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

বাজেটে দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার খরচ কমানোর পদক্ষেপও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। হার্টের স্টেন্ট, ডায়ালাইসিস ফিল্টার এবং আরও বেশ কিছু জরুরি চিকিৎসাসামগ্রীর ওপর থেকে ট্যাক্স ও ভ্যাট প্রত্যাহার করায় হাজার হাজার রোগী বড় ধরনের স্বস্তি পাবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

কর্মকর্তারা মনে করছেন, এর ফলে হার্টের স্টেন্টের দাম ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত এবং প্রতি সেশনে ডায়ালাইসিস চিকিৎসার খরচ প্রায় ৮০০ টাকা কমে আসতে পারে।

স্বাস্থ্য বিশ্লেষকরা এই পদক্ষেপগুলোকে পকেট থেকে হওয়া চিকিৎসা ব্যয় (আউট-অফ-পকেট এক্সপেন্ডিচার) কমানোর ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন, যা বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ।

এদিকে সরকারের সাম্প্রতিক উদ্যোগগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে, স্বাস্থ্যসেবার এই সম্প্রসারণ কেবল নীতিগত ঘোষণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে চলেছে। বর্তমানে চলমান সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলোর একটি হলো খুলনা, বরিশাল, রংপুর, রাজশাহী ও কুমিল্লায় ২০০ শয্যাবিশিষ্ট পাঁচটি বিশেষায়িত শিশু হাসপাতাল চালু করা।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, আগামী ছয় মাসের মধ্যে এই হাসপাতালগুলো পুরোদমে চালু হবে বলে আশা করা হচ্ছে। নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ), কেন্দ্রীয় শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং উন্নত রোগনির্ণয়ের সুবিধাসম্পন্ন এই হাসপাতালগুলো রাজধানীর বাইরে শিশু স্বাস্থ্যসেবার মান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত করবে।

আসবাবপত্র ও চিকিৎসাসামগ্রী সংগ্রহের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে এবং নিয়োগ প্রক্রিয়া চলমান থাকায় হাসপাতালগুলো চালুর প্রস্তুতি দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছে।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন সম্প্রতি জানিয়েছেন, এ হাসপাতালগুলোতে রোগীরা তাদের বাড়ির কাছাকাছি বিশেষায়িত চিকিৎসা সেবা পাবেন। ফলে পরিবারগুলোকে শিশু চিকিৎসার জন্য দূর-দূরান্তে ভ্রমণের ভোগান্তি পোহাতে হবে না।

এই শিশু হাসপাতালগুলো চালুর পরিকল্পনা মূলত সরকারের একটি বৃহত্তর প্রচেষ্টারই অংশ, যার লক্ষ্য হলো অব্যবহৃত স্বাস্থ্য অবকাঠামো সচল করা এবং আঞ্চলিক জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায় আরও বেশি বিশেষায়িত সেবা পৌঁছে দেওয়া।

সার্বিকভাবে দেখলে— স্বাস্থ্যখাতে বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি, জনবল বৃদ্ধি, ডিজিটাল স্বাস্থ্য উদ্যোগ, চিকিৎসা শিক্ষা সংস্কার, কর রেয়াত সুবিধা এবং নতুন বিশেষায়িত হাসপাতাল স্থাপন বাংলাদেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্য খাতকে নতুন রূপ দেওয়ার একটি সমন্বিত প্রচেষ্টারই ইঙ্গিত দেয়।

বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া যত সামনে এগোচ্ছে, নীতি-নির্ধারকরা আশা করছেন যে এই উদ্যোগগুলো এমন একটি স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সাহায্য করবে যা আরও বেশি সমতাভিত্তিক, দক্ষ এবং জনগণের চাহিদার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে।