ঢাকা ০১:৪০ অপরাহ্ন, শনিবার, ২০ জুন ২০২৬, ৬ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিনিয়োগ পরিবেশের অভাবে অর্থপাচার

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১২:২৯:৩৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ২০ জুন ২০২৬
  • ০ বার

বিদেশের একটি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ তাদের ব্যবসার প্রসার করবে বা বিনিয়োগ বাড়াবে। এজন্য একজন বাংলাদেশিকে ছদ্মনাম ‘জাফর আহমেদ’ পরামর্শক হিসেবে নিয়েছে। ‘জাফর আহমেদ’ তার কাজের জন্য বড় অঙ্কের একটি অর্থ পেয়েছেন। কিন্তু এই অর্থ তিনি বিনিয়োগ বা ব্যবহার করতে গিয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদক এবং বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের-বিএফআইইউ নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হচ্ছেন। বৈধ অথচ বাংলাদেশের তাত্ত্বিকতা ও আইনের অপপ্রয়োগে এই ধরনের আয়ের টাকা দেশে বিনিয়োগ প্রশ্নের মুখে পড়ায় বাধ্য হয়েই ‘জাফর আহমেদ’ হুন্ডি অথবা এলসি’র নামে বিদেশে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে পাচার করছেন। মূলত দেশে বিনিয়োগের সুযোগ না থাকা বা হয়রানি এড়াতে ব্যক্তির উপার্জিত অর্থ নিরাপদে সরিয়ে নেয়ার উদ্দেশ্যে বাণিজ্যের আড়ালে এই কারসাজি করা হয়। এভাবে অর্থপাচার আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। এক্ষেত্রে এনবিআর-এর জটিল কর নীতি, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, দুর্বল প্রশাসন ও দুর্নীতি বাংলাদেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান বাধা। বিশেষ করে ব্যবসায়ীদের হয়রানির কারণ অনেকটাই দায়ী। অথচ এই অর্থ দেশে সহজে বা বিনা প্রশ্নে বিনিয়োগের সুযোগ থাকলে প্রতিদিন দেশের অর্থ বিদেশে পাচার হতো না বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, সামষ্টিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, উচ্চ সুদহার, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে বিনিয়োগকারীরা  নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। আর নিরাপদ হিসেবে অর্থপাচার করছেন। তথ্যমতে, এক বছরের ব্যবধানে সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের জমা অর্থের পরিমাণ প্রায় ৪১ শতাংশ বেড়েছে। যার প্রভাবে দেশে বেসরকারি বিনিয়োগ ২২ শতাংশে নেমে এসেছে, যা এক দশকে সর্বনি¤œ। আওয়ামী লীগের শাসনামলের ১৫ বছরে দেশ থেকে ২৩৪ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে। স্থানীয় মুদ্রায় যা ২৮ লাখ কোটি টাকা। এই পরিমাণ টাকা গত পাঁচ বছরে দেয়া দেশের জাতীয় বাজেটের চেয়েও বেশি। আলোচ্য সময়ে প্রতি বছর পাচার হয়েছে ১৬ বিলিয়ন ডলার বা এক লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ ১৫ বছরের পাচারের অর্থ দিয়েই ৭৮টি পদ্মা সেতু করা সম্ভব ছিল।

অর্থপাচারের ফলে দেশের বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিনিয়োগে নানা কড়াকরিতে অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি বেসরকারি খাত কার্যত ধীরগতিতে চলছে। এ থেকে উত্তরণে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সব ধরনের জটিলতা দূর করতে হবে। দেশের অভ্যন্তরে বিনিয়োগের পরিবেশ যদি ভালো থাকে তাহলে অর্থপাচার সচরাচর কম হয়। মূলত বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে অবৈধ অর্থ উপার্জনের সুযোগ অবারিত কিন্তু সে অনুযায়ী বিনিয়োগের অনুকূল ও কার্যকর পরিবেশ না থাকার কারণেই অর্থপাচার বাড়ছে। একই সঙ্গে দেশের অর্থনীতিতে পর্যাপ্ত পরিমাণ অবৈধভাবে অর্জিত টাকা আছে কিন্তু সঙ্গত কারণে সেই টাকা বিনিয়োগ করা হয় না বা যায় না। যার ফলে অর্থপাচার বাড়ছে। তাই দেশের টাকা দেশে রাখতে সরকারকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। কারণ এই টাকা দেশে থাকলে কিছু না হলেও ভ্যাট, ট্যাক্স থেকেও বড় অঙ্ক পেত সরকার। দেশের অর্থনীতি চাঙ্গায় বিশেষ করে আবাসন ও পুঁজিবাজারের মতো খাতগুলোতে বিনা শর্তে এই টাকা বিনিয়োগের সুযোগ দেয়া গেলে সংশ্লিষ্ট খাতগুলো চাঙ্গা হবে। বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়বে। উদাহরণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো বিশেষ করে আরব আমিরাত, সউদী আরব, কাতারসহ বিভিন্ন দেশে বিনিয়োগ টানতে কর সুবিধা, ভিসা সুবিধা, শতভাগ বৈধ মালিকানার সুবিধাসহ নানামুখী সুযোগ দিচ্ছে। তুরস্ক সরকারও এই সুযোগ দিয়ে রেখেছে। এর আগেও সউদী, আরব-আমিরাত এবং তুরস্ক সরকার এই সুযোগ দিয়ে বিনিয়োগ এনে দেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা রেখেছে। চলমান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এসব দেশ থেকে অনেক বিনিয়োগকারী চলে যাওয়ায় নতুন করে আবারো সুবিধা দিয়ে বিনিয়োগ টানছে দেশগুলো। বাংলাদেশকেও এই ধরনের সহজ বিনিয়োগের সুযোগ নিতে হবে বলে উল্লেখ করেন বিশেষজ্ঞরা।

এনবিআর’র সাবেক চেয়ারম্যান ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেছেন, মানিলন্ডারিং বা অর্থপাচার প্রত্যেক দেশের জন্যই রক্তক্ষরণ। বিশেষ করে যেসব দেশ বৈদেশিক মুদ্রা ও বিনিয়োগের সংকটে ভোগে তাদের জন্য মানিলন্ডারিং উভয় সংকট ও বহুমুখী মারাত্মক সমস্যার সৃষ্টি করে। কারণ পুঁজি সংকটগ্রস্ত দেশ থেকে টাকা যদি বিদেশে চলে যায় তাহলে নানা ধরনের জটিলতা সৃষ্টি হয়। বোঝা যায় ওই দেশ পুঁজি ধরে রাখতে পারছে না। তিনি বলেন, জাপান বা আমেরিকার মতো বড় অর্থনীতির একটি দেশ থেকে মুদ্রা পাচার বা মানিলন্ডারিং হলে তাদের হয়তো খুব একটা ক্ষতি হয় না। কারণ এই ক্ষতি তারা পুষিয়ে নিতে পারে। তাদের উদ্বৃত্ত পুঁজি আছে। কিন্তু বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশ থেকে পুঁজি পাচার বা মানিলন্ডারিং হলে সেই ক্ষতিপূরণ করা সম্ভব হয় না। কষ্টার্জিত কিংবা দুর্নীতিজাত যে অর্থ নিজেদের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ব্যবহৃত হতে পারত, সেই অর্থ বিদেশে বিনিয়োগে ব্যবহৃত হতে দেয়াটাই আত্মঘাতী। এজন্য পৃথক ব্যবস্থা নিয়ে দেশের অর্থ দেশের উন্নয়নে যাতে ব্যবহার করা যায় সে পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানান ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ।

সূত্রমতে, দেশে বিনিয়োগের পরিবেশ না থাকায় বাড়ছে অর্থপাচার। এর জন্য বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশের অভাব, যেমন- রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, দুর্বল আর্থিক খাত এবং আস্থার সংকটের কারণে পুঁজি মালিকরা দেশে বিনিয়োগ করতে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। ফলে অর্জিত মুনাফা নিরাপত্তা ও অধিকতর লাভের আশায় অবৈধ পথে বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। অথচ অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ থাকলে দেশের টাকা দেশেই থাকত। অতীতে সাধারণত আবাসন ও পুঁজিবাজারের মতো খাতগুলোতে এই টাকা বিনিয়োগের সুযোগ দেয়া হতো, যাতে সংশ্লিষ্ট খাতগুলো চাঙ্গা থাকে। তবে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগ নিয়ে প্রতিবছর বাজেট আসলেই এনবিআরকে ব্যবহার করে একটি গোষ্ঠী সুশীল সাজার চেষ্টা করে। গোষ্ঠীটি নানা বিষয় দার করায় যাতে এই অর্থ বিনিয়োগে না আসে। আর যে কারণেই প্রতিদিনই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে হুন্ডি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ঋণপত্র বা এলসি খোলার আড়ালে পণ্যের প্রকৃত মূল্য লুকিয়ে আন্ডার ইনভয়েসিং এবং ওভার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে বড় অঙ্কের অর্থপাচার করছে। ভারত, মালয়েশিয়া, দুবাইসহ বিভিন্ন দেশে বাড়ি ক্রয় করছে। এভাবে বাণিজ্যে কারসাজির মাধ্যমে বড় অঙ্কের অর্থ বিদেশে চলে যাচ্ছে।

গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটি-জিএফআই এবং সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের-সিপিডি তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে চলে যাওয়া মোট অর্থের প্রায় ৮০ শতাংশই এই দুই পদ্ধতিতে পাচার হয় এলসির মাধ্যমে। বাকিটা হুন্ডির মাধ্যমে। এই ধারাবাহিকতায় এক বছরের ব্যবধানে সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের জমা অর্থের পরিমাণ প্রায় ৪১ শতাংশ বেড়েছে। ২০২৫ সালের হিসাব অনুসারে, ওই দেশের ব্যাংকে বাংলাদেশিদের জমা অর্থের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৩ কোটি ৪১ লাখ সুইস ফ্রাঁ (সুইজারল্যান্ডের মুদ্রা)। ২০২৪ সালে এর পরিমাণ ছিল প্রায় ৫৯ কোটি সুইস ফ্রাঁ। গত বৃহস্পতিবার প্রকাশিত সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের-এসএনবি বার্ষিক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। প্রতি সুইস ফ্রাঁ ১৫২ টাকা ধরলে সুইস ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুসারে সুইস ব্যাংকে ২০২৫ সালের শেষে বাংলাদেশিদের অর্থ জমার পরিমাণ ১২ হাজার ৬৭৮ কোটি টাকা। প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২১ সালের পর গত বছরই (২০২৫ সাল) বাংলাদেশিদের সর্বোচ্চ পরিমাণ অর্থ জমা হয়েছে সুইস ব্যাংকগুলোতে। গত ১০ বছরের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অর্থ জমা হয় ২০২৫ সালে। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে বিনিয়োগের পরিবেশ বা হয়রানি বাড়ায় দেশ থেকে টাকা পাচারের পরিমাণ বেড়েছে। মূলত কয়েকটি মাধ্যমে টাকা পাচার হয়। এর মধ্যে রয়েছেÑ আমদানিতে মূল্য বেশি দেখানো (ওভার ইনভয়েসিং), রফতানিতে মূল্য কম দেখানো (আন্ডার ইনভয়েসিং), হুন্ডি এবং ভিওআইপি ব্যবসা। এছাড়া বড় বড় ঘুষ লেনদেন হয় দেশের বাইরে ডলারে, যা পাচারকৃত টাকারই অংশ। গত কয়েক বছরে সরাসরি বিদেশে লাগেজ ভর্তি করে ডলার নিয়ে যাওয়ার তথ্যও রয়েছে। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী, একজন বাংলাদেশি নাগরিক ব্যক্তিগত ও ট্যুরিস্ট ভিসায় বিদেশ ভ্রমণের জন্য বছরে সর্বোচ্চ ১২ হাজার মার্কিন ডলার (বা সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা) ব্যবহার বা খরচ করতে পারবেন। যদিও ১২ হাজার ডলারের পুরোটাই নগদ নেওয়া যায় না। একজন ব্যক্তি নগদ বা নোট আকারে সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার ডলার সাথে রাখতে পারবেন। অর্থপাচার রোধে হাস্যকর এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের। অথচ বর্তমান মূল্যস্ফিতিতে উড়োজাহাজ ভাড়া, হোটেল ভাড়াসহ সব খাতে ব্যয় কয়েক গুণ বাড়ার পরও প্রায় এক যুগ আগে করা এই নিয়মেই আছে বাংলাদেশ ব্যাংক। যে কারণেও অনেকে অন্যভাবে বিদেশে টাকা পাঠিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। যদিও সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, বিদেশ ভ্রমণে বাৎসরিক ব্যয়ের অঙ্ক অনেক কম। এখন সব ব্যয় আগের থেকে ডাবল হয়েছে। তাই এই অঙ্ক বাড়ানো হবে। দ্রুতই এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি।

এদিকে প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে পাচারের অর্থ ফেরানোর কথা বলা হয়েছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন দেশে পাচারকারীদের সম্পদ জব্দ করতে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে বিভিন্ন সময়ে ঢাকঢোল পিটিয়ে সম্মেলন করে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে নানাবিধ পদক্ষেপ নিয়েও কোনো ফল না আসায় এবার দেশীয় বিনিয়োগে গুরুত্ব দিচ্ছে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ-বিডা। বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন বলেছেন, বিদেশি বিনিয়োগের তুলনায় বর্তমানে দেশীয় বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর বেশি গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের কারণে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় বিদেশি বিনিয়োগকারীরা নতুন বিনিয়োগে সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন বলে উল্লেখ করেন তিনি। এই পরিস্থিতিতে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ সম্প্রসারণে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।

চৌধুরী আশিক বলেন, আগামী ২২ জুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পাঁচ দিনের সফরে চীন যাচ্ছেন। গত পাঁচ বছরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশে বিনিয়োগের অন্যতম বড় উৎস এখন চীন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, প্রধানমন্ত্রীর এ সফর নতুন বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করবে এবং দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরো জোরদার হবে। সূত্রমতে, ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার অভ্যুথানের পর স্বৈরাচার আওয়ামী সরকারের অনেক মন্ত্রী, এমপি এবং আওয়ামী ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ীরা দেশ ছাড়েন। তাদের অনেকের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হয়। এসব কারণে তাদের অনেকে বিশ্বের এক দেশ থেকে অন্য দেশে অর্থ স্থানান্তর করে থাকতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। আবার বিগত সরকারের সময়ে বিপুল অর্থ দেশ থেকে পাচার হয়েছেÑ এমন তথ্য উঠে এসেছে সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অর্থনীতি নিয়ে শ্বেতপত্রে। পাচার হওয়া অর্থও বিভিন্ন উপায়ে সুইস ব্যাংকে জমা হতে পারে।

বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের-বিএফআইইউ প্রধান কর্মকর্তা ইখতিয়ার উদ্দিন মো. মামুন ইনকিলাবকে বলেন, অর্থপাচার রোধে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। পাশাপাশি আগের পাচার করা অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনতে আমরা কাজ করছি।
বিএফআইইউ দীর্ঘদিন থেকেই পাচারের অর্থ উদ্ধারের চেষ্টা করছে, এ পর্যন্ত পাচারের কোনো অর্থ ফেরত আনতে পেরেছে কি না, এ বিষয়ে তিনি বলেন, যুক্তরাজ্যে পাচার হওয়া ২৫ মিলিয়ন (আড়াই কোটি) মার্কিন ডলারের সম্পদ জব্দ হওয়ার পর তা দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া চলছে। এছাড়া কোনো টাকাই ফেরত আনা সম্ভব হয়নি। ইখতিয়ার উদ্দিন মো. মামুন বলেন, ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবা বাড়ার সঙ্গে ই-কমার্স প্রতারণা, ট্রেড-বেইজড মানিলন্ডারিং ও সাইবার ঝুঁকি বেড়েছে। এসব অপরাধ মোকাবিলায় প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, ঝুঁকিভিত্তিক কমপ্লায়েন্স ও সন্দেহজনক লেনদেন বিষয়ে রিপোর্টিং জোরদার করা হয়েছে।

অর্থপাচারের বিষয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক শিক্ষক প্রফেসর ড. মইনুল ইসলাম বলেন, আশা করা হয়েছিলÑ ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশ থেকে অর্থপাচার কমবে। কিন্তু সুইস ব্যাংকের এই হিসাব প্রমাণ করে, অর্থপাচার কমেনি। এটি অর্থনীতির জন্য মোটেও ভালো ফল বয়ে আনছে না। দ্রুতই পদক্ষেপ নিয়ে দেশের অর্থ দেশে বিনিয়োগের সঠিক পরিবেশ সৃষ্টির কথা বলেন তিনি।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

বিনিয়োগ পরিবেশের অভাবে অর্থপাচার

আপডেট টাইম : ১২:২৯:৩৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ২০ জুন ২০২৬

বিদেশের একটি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ তাদের ব্যবসার প্রসার করবে বা বিনিয়োগ বাড়াবে। এজন্য একজন বাংলাদেশিকে ছদ্মনাম ‘জাফর আহমেদ’ পরামর্শক হিসেবে নিয়েছে। ‘জাফর আহমেদ’ তার কাজের জন্য বড় অঙ্কের একটি অর্থ পেয়েছেন। কিন্তু এই অর্থ তিনি বিনিয়োগ বা ব্যবহার করতে গিয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদক এবং বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের-বিএফআইইউ নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হচ্ছেন। বৈধ অথচ বাংলাদেশের তাত্ত্বিকতা ও আইনের অপপ্রয়োগে এই ধরনের আয়ের টাকা দেশে বিনিয়োগ প্রশ্নের মুখে পড়ায় বাধ্য হয়েই ‘জাফর আহমেদ’ হুন্ডি অথবা এলসি’র নামে বিদেশে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে পাচার করছেন। মূলত দেশে বিনিয়োগের সুযোগ না থাকা বা হয়রানি এড়াতে ব্যক্তির উপার্জিত অর্থ নিরাপদে সরিয়ে নেয়ার উদ্দেশ্যে বাণিজ্যের আড়ালে এই কারসাজি করা হয়। এভাবে অর্থপাচার আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। এক্ষেত্রে এনবিআর-এর জটিল কর নীতি, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, দুর্বল প্রশাসন ও দুর্নীতি বাংলাদেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান বাধা। বিশেষ করে ব্যবসায়ীদের হয়রানির কারণ অনেকটাই দায়ী। অথচ এই অর্থ দেশে সহজে বা বিনা প্রশ্নে বিনিয়োগের সুযোগ থাকলে প্রতিদিন দেশের অর্থ বিদেশে পাচার হতো না বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, সামষ্টিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, উচ্চ সুদহার, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে বিনিয়োগকারীরা  নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। আর নিরাপদ হিসেবে অর্থপাচার করছেন। তথ্যমতে, এক বছরের ব্যবধানে সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের জমা অর্থের পরিমাণ প্রায় ৪১ শতাংশ বেড়েছে। যার প্রভাবে দেশে বেসরকারি বিনিয়োগ ২২ শতাংশে নেমে এসেছে, যা এক দশকে সর্বনি¤œ। আওয়ামী লীগের শাসনামলের ১৫ বছরে দেশ থেকে ২৩৪ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে। স্থানীয় মুদ্রায় যা ২৮ লাখ কোটি টাকা। এই পরিমাণ টাকা গত পাঁচ বছরে দেয়া দেশের জাতীয় বাজেটের চেয়েও বেশি। আলোচ্য সময়ে প্রতি বছর পাচার হয়েছে ১৬ বিলিয়ন ডলার বা এক লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ ১৫ বছরের পাচারের অর্থ দিয়েই ৭৮টি পদ্মা সেতু করা সম্ভব ছিল।

অর্থপাচারের ফলে দেশের বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিনিয়োগে নানা কড়াকরিতে অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি বেসরকারি খাত কার্যত ধীরগতিতে চলছে। এ থেকে উত্তরণে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সব ধরনের জটিলতা দূর করতে হবে। দেশের অভ্যন্তরে বিনিয়োগের পরিবেশ যদি ভালো থাকে তাহলে অর্থপাচার সচরাচর কম হয়। মূলত বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে অবৈধ অর্থ উপার্জনের সুযোগ অবারিত কিন্তু সে অনুযায়ী বিনিয়োগের অনুকূল ও কার্যকর পরিবেশ না থাকার কারণেই অর্থপাচার বাড়ছে। একই সঙ্গে দেশের অর্থনীতিতে পর্যাপ্ত পরিমাণ অবৈধভাবে অর্জিত টাকা আছে কিন্তু সঙ্গত কারণে সেই টাকা বিনিয়োগ করা হয় না বা যায় না। যার ফলে অর্থপাচার বাড়ছে। তাই দেশের টাকা দেশে রাখতে সরকারকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। কারণ এই টাকা দেশে থাকলে কিছু না হলেও ভ্যাট, ট্যাক্স থেকেও বড় অঙ্ক পেত সরকার। দেশের অর্থনীতি চাঙ্গায় বিশেষ করে আবাসন ও পুঁজিবাজারের মতো খাতগুলোতে বিনা শর্তে এই টাকা বিনিয়োগের সুযোগ দেয়া গেলে সংশ্লিষ্ট খাতগুলো চাঙ্গা হবে। বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়বে। উদাহরণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো বিশেষ করে আরব আমিরাত, সউদী আরব, কাতারসহ বিভিন্ন দেশে বিনিয়োগ টানতে কর সুবিধা, ভিসা সুবিধা, শতভাগ বৈধ মালিকানার সুবিধাসহ নানামুখী সুযোগ দিচ্ছে। তুরস্ক সরকারও এই সুযোগ দিয়ে রেখেছে। এর আগেও সউদী, আরব-আমিরাত এবং তুরস্ক সরকার এই সুযোগ দিয়ে বিনিয়োগ এনে দেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা রেখেছে। চলমান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এসব দেশ থেকে অনেক বিনিয়োগকারী চলে যাওয়ায় নতুন করে আবারো সুবিধা দিয়ে বিনিয়োগ টানছে দেশগুলো। বাংলাদেশকেও এই ধরনের সহজ বিনিয়োগের সুযোগ নিতে হবে বলে উল্লেখ করেন বিশেষজ্ঞরা।

এনবিআর’র সাবেক চেয়ারম্যান ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেছেন, মানিলন্ডারিং বা অর্থপাচার প্রত্যেক দেশের জন্যই রক্তক্ষরণ। বিশেষ করে যেসব দেশ বৈদেশিক মুদ্রা ও বিনিয়োগের সংকটে ভোগে তাদের জন্য মানিলন্ডারিং উভয় সংকট ও বহুমুখী মারাত্মক সমস্যার সৃষ্টি করে। কারণ পুঁজি সংকটগ্রস্ত দেশ থেকে টাকা যদি বিদেশে চলে যায় তাহলে নানা ধরনের জটিলতা সৃষ্টি হয়। বোঝা যায় ওই দেশ পুঁজি ধরে রাখতে পারছে না। তিনি বলেন, জাপান বা আমেরিকার মতো বড় অর্থনীতির একটি দেশ থেকে মুদ্রা পাচার বা মানিলন্ডারিং হলে তাদের হয়তো খুব একটা ক্ষতি হয় না। কারণ এই ক্ষতি তারা পুষিয়ে নিতে পারে। তাদের উদ্বৃত্ত পুঁজি আছে। কিন্তু বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশ থেকে পুঁজি পাচার বা মানিলন্ডারিং হলে সেই ক্ষতিপূরণ করা সম্ভব হয় না। কষ্টার্জিত কিংবা দুর্নীতিজাত যে অর্থ নিজেদের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ব্যবহৃত হতে পারত, সেই অর্থ বিদেশে বিনিয়োগে ব্যবহৃত হতে দেয়াটাই আত্মঘাতী। এজন্য পৃথক ব্যবস্থা নিয়ে দেশের অর্থ দেশের উন্নয়নে যাতে ব্যবহার করা যায় সে পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানান ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ।

সূত্রমতে, দেশে বিনিয়োগের পরিবেশ না থাকায় বাড়ছে অর্থপাচার। এর জন্য বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশের অভাব, যেমন- রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, দুর্বল আর্থিক খাত এবং আস্থার সংকটের কারণে পুঁজি মালিকরা দেশে বিনিয়োগ করতে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। ফলে অর্জিত মুনাফা নিরাপত্তা ও অধিকতর লাভের আশায় অবৈধ পথে বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। অথচ অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ থাকলে দেশের টাকা দেশেই থাকত। অতীতে সাধারণত আবাসন ও পুঁজিবাজারের মতো খাতগুলোতে এই টাকা বিনিয়োগের সুযোগ দেয়া হতো, যাতে সংশ্লিষ্ট খাতগুলো চাঙ্গা থাকে। তবে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগ নিয়ে প্রতিবছর বাজেট আসলেই এনবিআরকে ব্যবহার করে একটি গোষ্ঠী সুশীল সাজার চেষ্টা করে। গোষ্ঠীটি নানা বিষয় দার করায় যাতে এই অর্থ বিনিয়োগে না আসে। আর যে কারণেই প্রতিদিনই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে হুন্ডি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ঋণপত্র বা এলসি খোলার আড়ালে পণ্যের প্রকৃত মূল্য লুকিয়ে আন্ডার ইনভয়েসিং এবং ওভার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে বড় অঙ্কের অর্থপাচার করছে। ভারত, মালয়েশিয়া, দুবাইসহ বিভিন্ন দেশে বাড়ি ক্রয় করছে। এভাবে বাণিজ্যে কারসাজির মাধ্যমে বড় অঙ্কের অর্থ বিদেশে চলে যাচ্ছে।

গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটি-জিএফআই এবং সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের-সিপিডি তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে চলে যাওয়া মোট অর্থের প্রায় ৮০ শতাংশই এই দুই পদ্ধতিতে পাচার হয় এলসির মাধ্যমে। বাকিটা হুন্ডির মাধ্যমে। এই ধারাবাহিকতায় এক বছরের ব্যবধানে সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের জমা অর্থের পরিমাণ প্রায় ৪১ শতাংশ বেড়েছে। ২০২৫ সালের হিসাব অনুসারে, ওই দেশের ব্যাংকে বাংলাদেশিদের জমা অর্থের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৩ কোটি ৪১ লাখ সুইস ফ্রাঁ (সুইজারল্যান্ডের মুদ্রা)। ২০২৪ সালে এর পরিমাণ ছিল প্রায় ৫৯ কোটি সুইস ফ্রাঁ। গত বৃহস্পতিবার প্রকাশিত সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের-এসএনবি বার্ষিক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। প্রতি সুইস ফ্রাঁ ১৫২ টাকা ধরলে সুইস ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুসারে সুইস ব্যাংকে ২০২৫ সালের শেষে বাংলাদেশিদের অর্থ জমার পরিমাণ ১২ হাজার ৬৭৮ কোটি টাকা। প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২১ সালের পর গত বছরই (২০২৫ সাল) বাংলাদেশিদের সর্বোচ্চ পরিমাণ অর্থ জমা হয়েছে সুইস ব্যাংকগুলোতে। গত ১০ বছরের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অর্থ জমা হয় ২০২৫ সালে। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে বিনিয়োগের পরিবেশ বা হয়রানি বাড়ায় দেশ থেকে টাকা পাচারের পরিমাণ বেড়েছে। মূলত কয়েকটি মাধ্যমে টাকা পাচার হয়। এর মধ্যে রয়েছেÑ আমদানিতে মূল্য বেশি দেখানো (ওভার ইনভয়েসিং), রফতানিতে মূল্য কম দেখানো (আন্ডার ইনভয়েসিং), হুন্ডি এবং ভিওআইপি ব্যবসা। এছাড়া বড় বড় ঘুষ লেনদেন হয় দেশের বাইরে ডলারে, যা পাচারকৃত টাকারই অংশ। গত কয়েক বছরে সরাসরি বিদেশে লাগেজ ভর্তি করে ডলার নিয়ে যাওয়ার তথ্যও রয়েছে। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী, একজন বাংলাদেশি নাগরিক ব্যক্তিগত ও ট্যুরিস্ট ভিসায় বিদেশ ভ্রমণের জন্য বছরে সর্বোচ্চ ১২ হাজার মার্কিন ডলার (বা সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা) ব্যবহার বা খরচ করতে পারবেন। যদিও ১২ হাজার ডলারের পুরোটাই নগদ নেওয়া যায় না। একজন ব্যক্তি নগদ বা নোট আকারে সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার ডলার সাথে রাখতে পারবেন। অর্থপাচার রোধে হাস্যকর এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের। অথচ বর্তমান মূল্যস্ফিতিতে উড়োজাহাজ ভাড়া, হোটেল ভাড়াসহ সব খাতে ব্যয় কয়েক গুণ বাড়ার পরও প্রায় এক যুগ আগে করা এই নিয়মেই আছে বাংলাদেশ ব্যাংক। যে কারণেও অনেকে অন্যভাবে বিদেশে টাকা পাঠিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। যদিও সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, বিদেশ ভ্রমণে বাৎসরিক ব্যয়ের অঙ্ক অনেক কম। এখন সব ব্যয় আগের থেকে ডাবল হয়েছে। তাই এই অঙ্ক বাড়ানো হবে। দ্রুতই এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি।

এদিকে প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে পাচারের অর্থ ফেরানোর কথা বলা হয়েছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন দেশে পাচারকারীদের সম্পদ জব্দ করতে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে বিভিন্ন সময়ে ঢাকঢোল পিটিয়ে সম্মেলন করে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে নানাবিধ পদক্ষেপ নিয়েও কোনো ফল না আসায় এবার দেশীয় বিনিয়োগে গুরুত্ব দিচ্ছে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ-বিডা। বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন বলেছেন, বিদেশি বিনিয়োগের তুলনায় বর্তমানে দেশীয় বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর বেশি গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের কারণে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় বিদেশি বিনিয়োগকারীরা নতুন বিনিয়োগে সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন বলে উল্লেখ করেন তিনি। এই পরিস্থিতিতে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ সম্প্রসারণে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।

চৌধুরী আশিক বলেন, আগামী ২২ জুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পাঁচ দিনের সফরে চীন যাচ্ছেন। গত পাঁচ বছরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশে বিনিয়োগের অন্যতম বড় উৎস এখন চীন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, প্রধানমন্ত্রীর এ সফর নতুন বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করবে এবং দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরো জোরদার হবে। সূত্রমতে, ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার অভ্যুথানের পর স্বৈরাচার আওয়ামী সরকারের অনেক মন্ত্রী, এমপি এবং আওয়ামী ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ীরা দেশ ছাড়েন। তাদের অনেকের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হয়। এসব কারণে তাদের অনেকে বিশ্বের এক দেশ থেকে অন্য দেশে অর্থ স্থানান্তর করে থাকতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। আবার বিগত সরকারের সময়ে বিপুল অর্থ দেশ থেকে পাচার হয়েছেÑ এমন তথ্য উঠে এসেছে সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অর্থনীতি নিয়ে শ্বেতপত্রে। পাচার হওয়া অর্থও বিভিন্ন উপায়ে সুইস ব্যাংকে জমা হতে পারে।

বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের-বিএফআইইউ প্রধান কর্মকর্তা ইখতিয়ার উদ্দিন মো. মামুন ইনকিলাবকে বলেন, অর্থপাচার রোধে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। পাশাপাশি আগের পাচার করা অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনতে আমরা কাজ করছি।
বিএফআইইউ দীর্ঘদিন থেকেই পাচারের অর্থ উদ্ধারের চেষ্টা করছে, এ পর্যন্ত পাচারের কোনো অর্থ ফেরত আনতে পেরেছে কি না, এ বিষয়ে তিনি বলেন, যুক্তরাজ্যে পাচার হওয়া ২৫ মিলিয়ন (আড়াই কোটি) মার্কিন ডলারের সম্পদ জব্দ হওয়ার পর তা দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া চলছে। এছাড়া কোনো টাকাই ফেরত আনা সম্ভব হয়নি। ইখতিয়ার উদ্দিন মো. মামুন বলেন, ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবা বাড়ার সঙ্গে ই-কমার্স প্রতারণা, ট্রেড-বেইজড মানিলন্ডারিং ও সাইবার ঝুঁকি বেড়েছে। এসব অপরাধ মোকাবিলায় প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, ঝুঁকিভিত্তিক কমপ্লায়েন্স ও সন্দেহজনক লেনদেন বিষয়ে রিপোর্টিং জোরদার করা হয়েছে।

অর্থপাচারের বিষয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক শিক্ষক প্রফেসর ড. মইনুল ইসলাম বলেন, আশা করা হয়েছিলÑ ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশ থেকে অর্থপাচার কমবে। কিন্তু সুইস ব্যাংকের এই হিসাব প্রমাণ করে, অর্থপাচার কমেনি। এটি অর্থনীতির জন্য মোটেও ভালো ফল বয়ে আনছে না। দ্রুতই পদক্ষেপ নিয়ে দেশের অর্থ দেশে বিনিয়োগের সঠিক পরিবেশ সৃষ্টির কথা বলেন তিনি।